Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

মনের মণিকঠায় -- ২২ ( জয়তারা - কল্পতরু ও শক্তিদাদুর কথা)





             মনের মণিকোঠায়                  



                                                      
                        


                              অর্ঘ্য ঘোষ



( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )






                জয়তারা-কল্পতরুর কথা 






                        ( ৪৩ )   





   


জয়তারা-কল্পতরু আসলে ছিলেন দুই ভাই। দুজনেই ছিলেন ভিক্ষাজীবি। তাদের আদি বাড়ি ছিল লাভপুরের তরুলিয়া গ্রামে । সেখানে নাকি ভিক্ষাজীবিদের আধিক্যের কারণে তারা আত্মীয়তার সুবাদে দীর্ঘদিন আগে ময়ূরেশ্বরের রামকৃষ্ণপুর গ্রামে বাড়ি তৈরি করে বসবাস শুরু করেন। তাদের একমাত্র জীবিকাই ছিল ভিক্ষা। এখনও রামকৃষ্ণপুর গ্রামে তাদের বংশধরেরা বাস করেন।



                                        বড়ভাইয়ের আসল নাম ছিল কামাখ্যাপদ স্বর্ণকার। ছোট ভাইয়ের নাম রামপদ স্বর্ণকার। বড়ভাই ছিলেন একটু লম্বা। এক চোখ ছিল নষ্ট। পায়ে কুলআঁটি থাকার জন্য ভালো ভাবে হাঁটতে পারতেন না। ছোটভাই তুলনায় একটু বেঁটে খাটো , কিন্তু খুব দ্রুত হাঁটতে পারতেন।দুই ভাইয়ের এই  বৈপরীত্যের জন্য এলাকার মানুষজন তাদের নামকরণ করেছিলেন জয়তারা আর কল্পতরু। 


                        

                               সে সময় লোকপাড়া --সাঁইথিয়া রুটে জয়তারা এবং কল্পতরু নামে দুটি  বাস চলাচল করত। কল্পতরু ছিল আকারে বড়ো  এবং তার গতি ছিল কম। অন্যদিকে আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট জয়তারার গতি ছিল বেশি। তাই এলাকার মানুষ মজা করেই তাদের ওই নামকরণ করেছিলেন।মজা করে করা ওই নামকরণের আড়ালেই একদিন কার্যত হারিয়ে যায় তাদের আসল নাম। দুই ভাইকে নাম জিজ্ঞেস করলে তারাও জয়তারা - কল্পতরু নামই বলতেন।


                                                          দুই ভাই ছিলেন বেশ মজার মানুষ। একই সঙ্গে বাড়ি থেকে ভিক্ষায় বেরোতেন। জমির আলে বসে একটা বিড়ি দুইভাইয়ে খেতে খেতে ঠিক করে নিতেন সেদিন কে কোনদিকে ভিক্ষায় বেরোবেন। ছোটভাই জয়তারা ছিলেন বিপত্নীক।বাড়িতে রান্না করার কেউ ছিলেন না। তাই ভিক্ষার চেয়ে তিনি মাঝে মধ্যেই ভাত খাওয়ানোর আবদার করতেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে সপ্তাহে অন্তত একটা দিন তিনি আমার মায়ের কাছে ভাত খাওয়ার বায়না ধরতেন।সেইসব দিন একেবারে কলপাতা  পেড়ে বসে পড়তেন। মাকে উদ্দেশ্য করে বলতেন , আজ মা জননীর হাতে আমার দুটি অন্ন লেখা আছে মা।রান্না হয়েছে মা ? না হয়েছে তো  তাড়াতাড়ির কিছু নেই। আমি বসছি , তুমি রান্না করে নাও মা। বলা বাহুল্য মা আর কিছু বলার সুযোগ পেতেন না। 



                                                           বড়ভাইয়ের অবশ্য ভিক্ষা পেলেই হতো । তিনি এসে বলতেন , মাগো ভিক্ষা দিয়ে তাড়াতাড়ি বিদেয় করো মা। আরও পাঁচবাড়ি ঘুরতে হবে।আজ দুই ভাই-ই নেই।কিন্তু এলাকার মানুষের মনের মণিকোঠায় জয়তারা-কল্পতরুর স্মৃতি হয়ে রয়ে গিয়েছেন তারা।




                ------০------





                     শক্তিদাদুর কথা 



                                                                      

                        ( ৪৪ )





শক্তিদাদু আমার দাদুকে দাদা বলতেন সেই সূত্রে আমি তাকে বলতাম দাদু। ময়ূরেশ্বরের ঘাগড়াপাড়া গ্রামে ছিল তার বাড়ি। পুরো নাম শক্তি কুমার পাল। পেশায় ছিলেন বেলেড়া প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক।নিপাট ভদ্রলোক বলতে যা বোঝায় তিনি ছিলেন তাই। সাদা ধুতি , ফুল সার্ট জামা আর ভারী ফ্রেমের চশমাতে একেবারে আদর্শ শিক্ষকের মতোই দেখাত তাকে।বাস্তবে ছিলেনও তাই। পাঠ্য বই তো বটেই অন্যান্য অনেক বইয়ের কোন পাতায় কি আছে তা বলে দিতে পারতেন অনায়াসে। হাতের লেখাটিও ছিল চমৎকার।টিউশানি করতেন না , কিন্তু কোন ছাত্রছাত্রী সে তার স্কুলের হোক বা নাই হোক তাকে সাহার্য্য করতে কোন বিরক্তি বোধ করতেন না।আর ছিলেন অসম্ভব ক্রীড়ানুরাগী। নিজে ভালো ফুটবল খেলতেন।




                                              খেলাধূলার সুবাদেই তার সঙ্গে আমার নৈকট্য গড়ে ওঠে। প্রতিবাদ ক্লাবের পরিচালনায় তখন বাইরে থেকে বড় বড় দল এনে ফুটবল এবং কবাডি প্রতিযোগিতা হত।সোনার মেডেল ছাড়াও ওইসব দলকে আসা যাওয়ার খরচ দেওয়া এবং খাবারের ব্যবস্থা করতে হত। সেই খরচ সংস্থানের জন্য আমরা তখন গ্রামে গ্রামে চাল এবং অর্থ সংগ্রহ করতাম। বেশ মনে আছে , অধিকাংশ বাড়িতে যখন যৎসামান্য কিছু চাল দেওয়া হত অত্যন্ত বিরক্তি সহ তখন শক্তিদাদু সমাদরে বসিয়ে চা খাওয়াতেন। তারপর এক ধামা চাল আর ২০০ টাকা দিতেন। তখনকার দিনে ২০০ টাকা ছিল বেশ মূল্যবান।



                                    শুধু অর্থ সাহার্য্য নয় , প্রতিদিন মাঠে এসে আমাদের উৎসাহ যুগিয়েছেন। কিন্তু কোন দিন তাকে ডায়াসে বসাতে পারি নি।এক মাঠ দর্শকের মাঝে বসে খেলা দেখে বাড়ি গিয়েছেন। একবার জোর করে তাকে ডায়াসে তুলেছিলাম।সেদিনটার কথা আমার বেশ মনে আছে।এখন লোকপাড়ায় যেখানে এ , টি , এম কাউন্টার হয়েছে সেদিন সেখানে কবাডি খেলার ফাইন্যাল হচ্ছে। শক্তিদাদু যথারীতি এসে আমার হাতে দুটো ১০০ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে বললেন , খরচপাতি সব উঠেছে ? আমি বলেছিলাম , কই আর উঠল দাদু ? আপনার মতো ক'জন সাহার্য্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ? এখনও দেড় হাজার টাকা ঘাটতি চলছে। শুনে উনি আমার হাত থেকে ২০০ টাকা ফেরত নেন। আমি ভাবি , ঘাটতি শুনে আরও বেশি দেবেন।তাই আমি বলি , ওতেই হবে দাদু , আপনাকে আর বেশি দিতে হবে না। উনি বলেন, আমি তো বেশি টাকা আর আনিও নি  নাহলে আর কিছুটা বেশিই দিতাম। অনেকবার তো বলেছো , তোমাদের মঞ্চে উঠি নি।আজ চলো তোমাদের মঞ্চেই বসি।  



                                           আমরা তো মহানন্দে শক্তিদাদুকে নিয়ে  গিয়ে মঞ্চে বসালাম। আরও বেশ কিছু  ব্যক্তিকেও মঞ্চে বসানো হল। কে যেন আমার বাবাকেও বসিয়ে দিয়ে গেল। খেলা শুরু হওয়ার আগে শক্তিদাদু মাইকে আমাদের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে দু'চার কথা বলার পর আমাকে ইশারায় মঞ্চে ডাকলেন। তারপর আমার হাতে সেই দুশো টাকা তুলে দিলেন। সেই দেখে মঞ্চ জুড়ে উশখুশ শুরু হয়ে যায়।দেখি মঞ্চে যারা ছিলেন তাদের কেউ পকেটে হাত ঢুকিয়েছেন , কেউ পরিচিত কাউকে ডেকে টাকা ধার চাইছেন। এমন কি আমার বাবাও আমাকে ডেকে কানে কানে বলেন , হ্যারে টাকা পয়সা তো সঙ্গে আনি নি। ১০০ টাকা দে , নাহলে তো মান-সম্মান থাকে না। বলাবাহুল্য সেদিন ওই মঞ্চেই প্রায় ২০০০ টাকা সংগৃহিত হয়েছিল।



                           যাওয়ার সময় শক্তিদাদু হাসতে হাসতে বলেছিলেন , কি ভাই সেই যে একটা কথা আছে না , পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। মিলল তো ? আজ শক্তিদাদু নেই।কিন্তু তার মতো ক্রীড়ানুরাগীর অভাব আজ খুব অনুভব করি। 

                    ( চলবে )

                

                  পড়ুন / পড়ান 



             নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


          ১৯  নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে





                ধারাবাহিক উপন্যাস 



                       সালিশির রায় 

                                                                

সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --

                   


                                                                  


খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ। 

   

                ------০------

                                                                                                                  

2 comments:

  1. আজ কাল খেলার মাঠে শক্তিদাদুদের বড়ো অভাব অনুভব করি। একটা সময় গ্রামের প্রত্যেকটি খেলাই হতো। শুধু তাই নয়। সময় মতো সোৎসাহে টুর্নামেন্টও হতো।

    ReplyDelete
  2. ঠিক বলেছেন। ধন্যবাদ

    ReplyDelete