Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ফিমেল -২



          ফিমেল 

                   

           

          অর্ঘ্য ঘোষ


           (  দ্বিতীয় কিস্তি )
           


 বড়ো একা লাগে সোহাগের। তিনদিন হলো ছেলে বৌমা বাড়ি ছাড়া। ফিরতে আরও চারদিন বাকি। ফাঁকা বাড়িতে কিছুতেই মন টেকে না। সময় কাটাতে খুলে বসে পোশাকের বাক্স। বর্ষার মরসুম আসছে। তিন-চারটে মাস আর বায়না হবে না। তাই পোশাকে ন্যাপথলিন দিয়ে ভরে রাখতে হবে। পোশাক ঘাটতে ঘাটতে কোথাই যেন হারিয়ে যায় সোহাগ। প্রথমদিকে ওইসব পোশাক পড়ে যখন স্টেজে নামত তখন নিজেকে রাজকন্যা মনে করত। মনে মনে ভাবত ঠিক একদিন কোন রাজকুমার  হাত ধরে নিয়ে যাবে তাকে। ভাবতে ভাবতেই চটকা ভাঙে ছন্দার ডাকে। কিছুটা কটাক্ষ করেই ছন্দা বলে , দেখ গো দিদি কে এসেছে তোমার খোঁজে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতেই কপাল কুঁচকে যায় সোহাগের। চোখের সামনে এ কাকে দেখছে সে। তাকে দেখতেই অন্য বাড়িগুলি থেকেও উঁকিঝুঁকি মারছে বেশ কিছু কৌতুহলী মুখ। তাদের চোখে মুখে কোন একটা নাটক দেখার তীব্র আগ্রহ।  নিজেদের জীবনটাই যাদের নাটক, তারা কোথা থেকে যে নাটক দেখার এত উৎসাহ পায় কে জানে!  নাটকটা আর জমতে দিলে হবে না। তাই ছন্দাকে বলে, ঠিক আছে আমি ওনার সংগে কথা বলে নিচ্ছি। তারপরই ছন্দাকে বিদায় করে সদর দরজা বন্ধ করে দেয় সোহাগ। ছন্দাদের কৌতুহল হওয়াটা যে স্বাভাবিক তা আগন্তুক মহিলাকে দেখে টের পেয়েছিল সে। মহিলা যে অন্য আর কেউ নয়, যার সন্তান সে গর্ভে ধারণ করেছে সে যে তারই স্ত্রী। ওই মহিলাই যে একদিন তাকে বাড়ি থেকে ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছিল। আজ হঠাৎ তার বাড়িতে কেন ?

                      জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই মহিলা বলে ওঠেন, ভাই তোমাকে কিছু বলার মুখ আমার নেই। তোমার বাড়িতে আসার সাহসও আমার ছিল না। কিন্তু উনিই  ঠেলেঠুলে পাঠালেন তোমার কাছে। অবাক হয়ে যায় সোহাগ --- আমার কাছে ? হ্যা ভাই উনি বললেন, যাই হোক না কেন সোহাগের মনটা খুউব ভালো। সবকিছু শুনলে কিছুতেই মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে না -- নাগাড়ে বললেন মহিলা। আর ধৈর্য্য রাখতে পারে না সোহাগ।  বলে,  খোলসা করে বলুন তো কি বলতে এসেছেন ? মহিলা কিছুটা ইতস্তত করে বললেন,  ভাই উনি খুউব অসুস্থ। পয়সার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না। যে যেখানে ছিল সবাই হাত গুটিয়ে নিয়েছে। এখন তুমি যদি সাহার্য্য না করো তাহলে উনি বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন।শুনে  চাঁ করে মাথায় রক্ত চড়ে যায় সোহাগের। ওই লোকটাই তাকে অন্তস্বত্ত্বা অবস্থায় বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে তার যথাসর্বস্ব নিয়ে পালিয়েছিল। এই মেয়েটাই তার বিপদের কথা কানেই তোলেনি। ঝাঁটা পেটা করে বাড়ি থেকে তাড়ানোর কথা বলেছিল। সেকথা মনে পড়তেই সোহাগ কিছুটা বিদ্রুপের সংগে বলে, আমিই বা হাত বাড়িয়ে দেব ভাবলেন কি আপনারা? জবাবে মহিলা বলেন, আমরা তোমার সংগে যাই করি না কেন, তুমি তো একদিন লোকটাকে ভালোবেসেছিলে। সেই ভালোবাসার দোহাই দিয়েই বলছি তুমি ওকে বাঁচাও। কথাগুলো শোনার পর কেমন যেন অবশ হয়ে যায় সোহাগ। মুখে কথা সরে না।

                                      চার অক্ষরের ওই শব্দটাই আবহমানকাল থেকে মেয়েদের মেরে রেখেছে। ওই শব্দটার মোহেই ভালোবাসার মানুষের পায়ে যথাসর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে নিস্ব হয়েছে তারা। সোহাগই বা তার ব্যতিক্রম হবে কি করে ? ছেলের বিয়ের পর ব্যাগে রাখা শেষ সম্বল ১০ হাজার টাকা মহিলার হাতে তুলে দেয়। টাকা নিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলতে বলতে চলে যান তিনি। সোহাগ ভুলে যায়, ওই লোকটির কাছে থেকে সিথিয় সিন্দুর দুরের কথা, চুড়ান্ত অবমাননাকর সতীন পদবাচ্য হওয়ার অধিকারও  তার নেই। পিতৃ পরিচয়ের অধিকার দুরের কথা, ওই লোকটির মৃত্যুর পর তার ছেলে পারলৌকিক কাজে অংশ নেওয়ারও অধিকার পাবে না। সোহাগ সব ভুলে যায়। তখন তার কানে যেন বেজে যায় মঞ্চে বহুবার গাওয়া --- ভালোবাসি ভালোবাসি গানটা। ছেলে-বৌ নিয়ে এখন সুখেই দিন কাটছে সোহাগের। বছর ঘুরতেই তার ঘর আলো করে আসে নতুন অতিথি নাতি। নিজের ছেলের জন্মের সময় কেউ তার পাশে ছিল না। কিন্তু বৌমায়ের প্রসবের সময় শাশুড়ি নয় , মায়ের মতো পাশে থেকে সবদিক সামলেছে সে। সুবর্ণাও অবাক হয়ে দেখেছে সব। মনের আবেগ চেপে রাখতে পারে নি। সোহাগকে জড়িয়ে বলেছে, তোমার পায়ে ঠাই না পেলে আমার যে কি হত ভেবে কুলকিনারা পায় না। তাহলে আর ওসব কথা ভেবে লাভ নেই । বরং দাদুভাইয়ের একটা নাম ভেবেছি, কেমন হবে বল দেখি-- বলে সোহাগ । কি -- কি নাম ভেবেছো গো মা তুমি-- আগ্রহ ঝরে সুবর্ণার গলায়। ওর নাম শুভময় রাখব ভেবেছি। সুখময়ের ছেলে শুভময়। সুখময়ের জন্য আমার সংসার সুখের মুখ দেখেছে। আর শুভময়ের জন্য এবার থেকে সব কিছুই শুভ হবে -- একটানা নিজের ভাবনার কথা বলে যায় সোহাগ। নামটা খুউব ভালো হবে -- সম্মতি জানাই সুবর্ণাও।

                      প্রথা অনুযায়ী ছেলে বৌমা  কে নিয়ে একদিন উদ্ধারণপুরে গঙ্গাস্নানেও  যায় সোহাগ। আর যেতে গিয়ে স্মৃতি মেদুর হয়ে উঠে তার মন । লাভপুর থেকে কীর্ণাহার হয়ে উদ্ধারণপুর যায় বেশির ভাগ বাস। কীর্ণাহার ঢুকতেই তার চোখ দুটি বাসের জানলা দিয়ে কি যেন খুজে বেড়ায়। ওই যে লক্ষীতলা, কত কিতকিত খেলেছে সেখানে। ওই তো হারান কাকাদের বাড়ির পিছনে কাঁচামিঠে আমের গাছটা এখনও আছে। গ্রীষ্মের নির্জন দুপুরে অর্চনার সংগে ঢিল ছুড়ে আম পাড়তে গিয়ে ধরা পড়ে কত বকা খেতে হয়েছে তার ঠিক নেই। সব কেমন ছবির মতো ভেসে ওঠে চোখের সামনে। মাষ্টারপাড়ার মোড়ের মাথায় তাদের বাড়িটা সেই একই রকম আছে।  এই রাস্তায় যাওয়ার সময় কতবার তৃষ্ণার্ত চোখে বাড়িটার দিকে চেয়ে থেকেছে। যদি এক পলকের জন্য বাবা-মা, ভাই বোনগুলোকে দূর থেকে একটু দেখতে পেত। সেই বাড়ি ছাড়ার পর থেকে তো কারও সঙ্গে দেখাই হয় নি। শেফালিদির কাছে থাকার সময় বাবা তবু মাঝে মাঝে টাকা নিতে যেত। কিন্তু সেখান থেকে চলে আসার পর আর কোন যোগাযোগই নেই। কতবার মনে মনে ভেবেছন ভাইফোঁটায় একবার বাড়ি যাওয়ার কথা। কিন্তু তাকে ঘিরে বাড়ির লোকেরা যদি কোন অস্বস্তিতে পড়ে ভেবে সেই ইচ্ছে দমন করেছে ।।ভাইফোঁটার দিন যখন ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিয়ে বোনেরা শাখ বাজিয়ে উলুধ্বনি দিয়েছে তখন সে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছে। মনে মনে ভগবানকে জিজ্ঞেসা করেছে,ঠাকুর আমি কি পাপ করেছিলাম তুমি আমাকে ভাইয়ের কপালে ফোটাটুকু দিতে দিলে না ?

              ছোট্ট ভাইটার মুখটাও আজ আর স্পষ্ট মনে পড়ে না। শুধু তার মঙ্গল কামনায় প্রতিবছর ভাইফোঁটার দিনে ঘরের চৌকাঠে ফোঁটা দেয়। তাদের বাড়ির কাছের স্টপেজে বাস দাঁড়াতেই কিছুটা সংশয়ে পড়ে যায় সোহাগ। বাসে উঠে আসছে তার ছোট বোনটা না? শুভকে বৌমার কোলে দিয়ে মেয়েটির পাশের সিটে গিয়ে বসে সোহাগ। কথা বলেই বুঝতে পারে তার ধারণাই ঠিক। মেয়েটি তার ছোট বোন সবিতা। কথায় কথায় সোহাগ জানতে পারে, চাকটার এক দোজবরের সংগে বিয়ে হয়েছে তার। বাপের বাড়ি থেকে সেখানে ফিরছে। মদ খেয়ে বেহুশ হয়ে পড়ে থাকার জন্য স্কুলের ঘণ্টা চুরি যাওয়ায় বাবার স্কুলের চাকরিটা আর নেই। সবিতা বলে, জানিস দিদি তোর কথা উঠলেই মায়ের চোখ দিয়ে জল পড়ে। বলে, আমাদের জন্যই ওকে বলি হতে হল। একটা ঘর সংসারও হলো না ওর। সোহাগ বলে, বাদ দে আমার কথা। সবার ভাগ্যে তো সবকিছু থাকে না। বাড়ির কথা বল। বাড়ির কথা আর কি বলব। বাবার চাকরি চলে যাওয়ার পর থেকে খুউব অভাব। দুবেলা সবার দুমুঠো খাওয়াও জোটেনা। দাদা একটা রিক্সা কেনার খুউব চেষ্টা করছে। কিন্তু টাকার অভাবে পেরে উঠছে না। দাদা তোর কাছে গিয়ে চাইবে ভেবেছিল। কিন্তু মা বলে দিয়েছে, ওর প্রতি তো আমরা কিছু কর্তব্যই পালন করিনি। তাই টাকার জন্য ওকে খুঁজে বের করার দরকার নেই। আমারও অভাবের সংসার। তাই সবজেনেও আমি কিছু করতে পারি না, একটানা কথাগুলো বলে থামল সবিতা।


                             আর কথগুলো শুনতে শুনতে চোখে  কখন জল চলে এসেছে তা টের পায়নি সোহাগ। বৌমাকে আড়াল করে ব্যাগ থেকে ৩০০০ টাকা বের করে বোনের হাত দুটো ধরে সোহাগ বলে, কথা দে বাড়ির কাউকে বলবি না টাকাটা আমি দিলাম। ভাইকে বলবি রিক্সা কিনতে তুইই টাকাটা দিয়েছিস। আর মাঝে মধ্যে আমার কাছে থেকে টাকা নিয়ে গিয়ে ওদের দিবি বল ? কোন কথা বলতে পারে না সবিতা। তারও চোখে তখন জল। কথা বলতে গেলে যে তা আর বাঁধ মানবে না। টাকাটা নিয়ে নেমে যায় সে। সোহাগ উঠে গিয়ে নাতিকে কোলে নিয়ে সুবর্ণার পাশে বসে। বোনের পরিচয় তাকে দেয় না। বলে, পরিচিত একজন। কিন্তু ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠে যন্ত্রনায়। নিজের বৌমার কাছেও তাকে বোনের পরিচয় গোপন করতে হলো। হায় রে ভাগ্য! শুধু গঙ্গাস্নান আর নাতির নামকরণই নয়,  সুখময়
অপেরাও নাম বদলে হয়ে যায় শুভময় অপেরা। নাতিই যে এখন নয়নের মনি হয়ে উঠেছে সোহাগের। সব সময় চোখে হারায়। এখন আর অভিনয় করতে যায় না সে। ওদিকটা ছেলে বৌমাই সামলায় , সে নাতিকে নিয়েই থাকে। শুভও তার খুউব ন্যাওটা হয়েছে। নাওয়া খাওয়া এমন কি গলা জড়িয়ে তার কাছে ঘুমানো পর্যন্ত। গল্প বলে বলে তাকে ঘুম পাড়ায় সোহাগ। ওর বাবাকেও তো একা হাতেই সব করতে হয়েছে। কিন্তু ছেলের চেয়ে নাতিকে নিয়েই সে যেন একটু বেশিই খুশী থাকতে দেখা যায় সোহাগকে। কথায় আছে  আসলের চেয়ে নাকি সুদ মিষ্টি। নাতিকে নিয়ে সকালে স্কুলে আর  বিকালে পার্কে যাওয়া রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে তার। শুভ তাকে দিদি বলে ডাকে। সে বলে ভাই।


                           কি ভাবে যে দিনগুলো কেটে যায় তা বুঝতেই পারে না সোহাগ।  মনে মনে মনে ভাবে এত সুখ এই পোড়া কপালে সইবে তো ?  তার আশংকাই যেন সত্যি হয়। যাত্রা পাড়ার উপর নেমে আসে বিনা মেঘে বজ্রপাত। তার আঁচ সোহাগকেও লাগে।তার আশংকাই যেন সত্যি হয়। যাত্রাপাড়ার উপর নেমে আসে বিনা মেঘে বজ্রাঘাত। তার আঁচ সোহাগকেও লাগে। আমোদপুর-কাটোয়া ছোটলাইনের ধার বরাবর সব যাত্রাদলের অফিস। সামনে দিয়ে চলে গিয়েছে সিউড়ি -- কাটোয়া সড়ক। একই সংগে শুরু হয়েছে ছোটলাইনকে বড়লাইনে রূপান্তরের কাজ, শুরু হয়েছে সড়ক সম্প্রসারণের কাজও। আর দুই'য়ের মাঝে পড়ে নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে যাত্রাপাড়ায়। কারণ রেল এবং সড়ক দফতর জায়গা ফাঁকা করে অন্যত্র উঠে যাওয়ার নোটিশ পাঠিয়েছে। তারপর থেকেই রাতের ঘুম উবে গিয়েছে যাত্রাপাড়ার।  অধিকাংশেরই অফিসের মধ্যেই ঘর গেরস্থালী। সমাজের মুলস্রোত থেকে ছিটকে এসে একদিন সবাই কোনরকমে একটা মাথা গোঁজার ঠাই গড়েছিল। ঠাই বলতে কাদাছিটে কিম্বা খলপা বেড়ার চালাঘর। এখন কোথায় যাবে তারা, খাবেই বা কি ? তাদের তো আর ফেরার কোন ঠিকানা নেই।  সোহাগের অবশ্য বাস করার জন্য কাছেই অন্য একটি বাড়ি রয়েছে। কিন্তু দলের অফিসটা তো তার এখানেই রয়েছে। তাছাড়া এতগুলো বছর যাদের পাশাপাশি একসংগে রয়েছে তাদের এই বিপদের দিনে নিজেকে কিছুতেই আলাদা ভাবতে পারে না সোহাগ।


                                    সারা বছর সামান্য কারণেই পারস্পরিক খিটিমিটি লেগেই থাকে। কিন্তু বিপদের সবাই যেন একান্নবর্তী পরিবার হয়ে যায়। রত্নাদি, ছন্দা, মাধুরী, ভজনকাকা, সুমনদারা সবাই জড়ো হয় সোহাগের অফিসে। সবাই  সোহাগকে ধরে , তুমি বেশ বলিয়ে কইয়ে , তোমার মাথাও কাজ করে ভালো। এই বিপদে তুমিই একটা উপায় বের করো। চরম অস্বস্তিতে পড়ে যায় সোহাগ। বলে , না- না আমি কেন ?  ভজনকাকা তোমাদের মতো বয়স্করা থাকতে আমি কেন ?  আমি বরং তোমাদের পিছনে থাকব। যা বলবে তাই করব। সোহাগের কথা শেষ হতে দেয় না রত্নারা। হই হই করে উঠে তারা। সবাই বলে, আমরা ঠিক করেছি তোমাকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে। অগত্যা ঘাড় পাততে হয় সোহাগকে। কাজকর্ম সব চুলোয় ওঠে। কি করে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়  তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে। মাঝে মাঝে কখনও রত্না চা দিয়ে যায় , তো মাধুরী মুড়ি তেলেভাজা। চাঁদা তুলে এক হাড়িতে শুরু হয়ে যায় রান্না বান্নাও। আলোচনায় ঠিক হয়, সবাই মিলে বি,ডি,ও"র কাছে গিয়ে তাদের সমস্যার কথা বলে পুনর্বাসন চাইবে। বি , ডি, ও কোন ব্যবস্থা করলে ভালো, না করলে তখন অন্য ব্যবস্থা ভাবতে হবে। সেইমতো একদিন সবাই যায় বি,ডি,ও অফিস। তাদের লিখিত দাবিপত্র দেখে চশমার ফাঁক দিয়ে কেমন যেন অবজ্ঞার দৃষ্টি ছুড়ে দেন বি,ডি,ও তমালকৃষ্ণ বিশ্বাস। তাচ্ছিল্যের সুরে তিনি বলেন, সরকারি জায়গাতে এতদিন বসেছিলেন, আবার দাবি নিয়ে এসেছেন। উন্নয়ণের কাজে কোন রকম ব্যঘাত সৃষ্টি করলে ফল ভালো হবে না।  কথাগুলো শুনেই বি, ডি,ও সাহেবের সামনে যায় সোহাগ। চোখে চোখ রেখে বলে, স্যার  উন্নয়ণ আমরাও চায়। কিন্তু মানুষের মাথা গোজার ঠাই, পেটের ভাতের নিশ্চয়তার দায়ও তো সরকার অস্বীকার করতে পারে না। আর সরকারটাও  ভিন্নগ্রহের কোন জীব নয়। মানুষই সরকার গড়ে। তাই সরকারের সম্পত্তিতে মানুষেও অধিকার আছে।


                           সোহাগের এমন দীপ্ত জবাবে চমকে যায় তার সংগে আসা যাত্রা পাড়ার মানুষজন। মনে মনে ভাবে, ঠিক লোকের হাতেই তারা নেতৃত্ব তুলে দিয়েছে। চমকে যান বি , ডি,ও। কিন্তু তা বুঝতে দিতে চান না তিনি। বরং প্রশাসন সুলভ গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তূলে তিনি বলেন, ওইসব ডায়লগ বাজি যাত্রার আসরে আওড়াবেন। আমার যা বলার বলে দিয়েছি। এখন আপনারা যান। জবাবে সোহাগ বলে, স্যার আমাদেরও যা বলার আপনাকে বলেছি। এরপর অন্যরকম কিছু হলে তার দায় কিন্তু আপনিও এড়াতে পারবেন না।  এবারে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না বি,ডি,ও সাহেব। মেজাজ হারিয়ে ফেলেন তিনি। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলেন, আপনারা যাবেন না , আমাকে অন্যব্যবস্থা দেখতে হবে ? কার্যত গলা ধাক্কা খেয়ে বি,ডি,ও অফিস থেকে ফেরে সোহাগরা। এতটা দুর্ব্যবহার আশা করে নি কেউ। সবাই ভেবেছিলেন, বি,ডি,ও তাদের সমস্যার কথা শুনে কিছু একটা উপায় ঠিক বাতলে দেবেন। কিন্তু উলটো কথা শুনে কিছুটা যেন হতাশ হয়ে পড়েন তারা। সোহাগকে  কিন্তু হতাশা গ্রাস করতে পারে না। বরং কেমন যেন জেদ চেপে যায় তার। রাতে চোখের পাতা এক করতে পারে না সে। এতগুলো মানুষ তাকে বিশ্বাস করেছে, তার উপরে ভরসা রেখেছে , সে কি তার কোন দামই দিতে পারবে না? সব থেকে বড়ো কথা এতগুলো মানুষ তাদের পেশা ছেড়ে যাবে কোথাই ? তাদের জন্য তো আর কোন দরজা খোলা নেই। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে ভোর হয়ে যায় তা টের পায় না সোহাগ।   সকাল সকাল স্নান সেরে নাতিকে স্কুলে পৌঁচ্ছে দিয়ে সরাসরি যাত্রা অফিসে পা রাখে সোহাগ। সেখানে তখন ভজনকাকা, মদনদা, রত্নারা তারই অপেক্ষায় বসে। ঘরের কোনে গ্যাসে চায়ের জল চাপিয়েছে ছন্দা।

                        শুরু হয় পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা। ভজনকাকা বলেন , বি,ডি,ও'ই আমাদের কথা কানে তুললেন, তখন আর কেই বা আমাদের কথা শুনবে। জবাবে সোহাগ বলে, বি,ডি,ও আমাদের কথা কানে নেন নি  ঠিকই, কিন্তু তাতে হতাশ হলে চলবে না। কারণ বি, ডি,ও'ই তো প্রশাসনের শেষ কথা নয়। আমাদের অন্য কিছু ভাবতে হবে। চা পরিবেশন করতে করতে রত্না প্রশ্ন তোলে -- এরপর তাহলে আমরা কি করব ?  সোহাগ জানত এই প্রশ্নটার মুখোমুখি তাকে দাঁড়াতেই হবে। তাই রাতেই সে ভেবে রেখেছিল তাদের পরবর্তী কর্মপন্থা। সবিস্তারে তাইই সে তুলে ধরে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই সোহাগ বলে, আমরা আমাদের সমস্যার কথা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রীর কাছে লিখে পাঠাব। তারপর যাব ডি,এম এবং শাসকদলের নেতার কাছে। তাতেও কিছু কাজ না হলে তখন অন্যরকম ভাবতে হবে।  অন্যরকমটা কি শুনি -- জানতে চান মদনদা।সোহাগ বলে, প্রশাসনের চেয়ারে যে যখন বসে থাকে সে বি,ডি,ও"ই বলুন আর ওসি"ই বলুন সাধারণ মানুষকে তো তারা গরু ছাগলের বেশি ভাবে না ।তাই প্রশাসনকেই মাঠে ময়দানে আনতে হবে। সেবারে দেখলেন না ষষ্ঠীনগর মোড়ে ছাগল চাপা পড়ায় পাড়ার ছেলেরা পথ অবরোধ করেছিল ক্ষতিপূরণের দাবিতে। বাস ট্রাক সব আটকে পড়েছিল। খবর পেয়েই ছুটে এসেছিলেন ওসি, বি,ডিও।

                      মাঝপথেই ভজনকাকা বলে উঠলেন, হ্যা হ্যা মনে আছে অবরোধ তুলতে ছেলেগুলোকে কি মিষ্টি মিষ্টি করে বোঝাচ্ছিলেন ওরা। শেষে ক্ষতিপূরণের টাকার ব্যবস্থা করে সমাধান হয়। সোহাগ বলে, তবে হ্যা আমরা অন্যদেরঅসুবিধায় ফেলে পথ অবরোধ করব না। ওরা যদি আমাদের ঘর ভাঙতে আসে আমরা ছেলে মেয়েদের নিয়ে ঘরেই বসে থাকব। আমরা তো না মরে বেচে আছি, না হয় সরকারের বুলড্রোজারে মারা পড়ব। কিন্তু দিদি, আমরা তো মাত্র তিরিশ জন। পুলিশ আমাদের মেরে তুলে দেবে না তো - সংশয় প্রকাশ করে রত্না। সোহাগ বলে, খুউব ভালো প্রশ্ন।অল্প সংখ্যক লোক হলে প্রশাসন কোন গুরুত্বই দেবে না। দেখলে ছাগল মরার পথ অবরোধের সময় পাড়ার ছেলেরা কেমন এককাট্টা হয়ে উঠেছিল। আমাদেরও ওই রকম জমায়েতের চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু দিদি ছাগল মরার পথ অবরোধের সময় ক্ষতিপূরণের টাকায় না হয় ফিস্ট খাওয়ার ব্যাপার ছিল, কিন্তু আমাদের তো তা নয়।আমরা কাউকে কিছুই দিতে পারব না। তাহলে শুধু শুধু কে আসবে আমাদের সংগে ? - প্রশ্নটা তোলে ছন্দা। সোহাগ বলে, আসবে আসবে। আমাদের মতো আরও অনেকের বাড়ি ভাঙা পড়বে। তাদের হয়তো আমাদের মতো এত খারাপ অবস্থা নয়, কিন্তু স্বেচ্ছায় কেউ নিজের খড়ের কুটোটি পর্যন্ত প্রানে ধরে অন্যকে দিতে পারে না। সেখানে একটু চেষ্টা করে বাড়ির ভাঙার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইবে কেউ।  আমাদের ওইসব মানুষকেও সামিল করার চেষ্টা করতে হবে। তাহলে অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের পাশে দাঁড়াবেন বলেই আমার মনে হয়।


          কথাটা মনোপুত হয় সবার। সবাই একযোগে বলে ওঠে, কথাটা ফেলেদেওয়ার নয়। আমাদের সবরকম চেষ্টাই করতে হবে। সংগে সংগে শুরু হয়ে যায় কাজ।কয়েকজন বেড়িয়ে পড়ে যাদের বাড়ি ভাঙার আশংকা রয়েছে তাদের সংগে কথা বলতে। কয়েকজনব্যস্ত হয়ে পড়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রীকে পাঠানোর কাজে। সোহাগ যায় স্কুলে থেকে নাতিকে আনতে। সোহাগের চোখে মুখে এখন একটা চ্যালেঞ্জের ছাপ। সবখানেই তো ভগবান তাকে হারিয়ে দিয়েছে। এই লড়াইটা তাকে জিততেইহবে -- মনে মনে শপথ নেয় সোহাগ।সবখানেই তো ভগবান তাকে হারিয়ে দিয়েছে। এই লড়াইটা তাকে জিততেই হবে মনে মনে শপথনেয় সোহাগ। ডি,এমের কাছে যাওয়াটাই সার হল। দেখা করার অনুমতি মিলল না। লিখিত আবেদন পত্রটাই কেবল জমা দেওয়া হোল মাত্র। ঠিক হয় একদিন শাসক দলের স্থানীয় নেতা আব্দুল হান্নানের কাছে যাওয়া হবে। তার কাছে যেতে খুব একটা মন ছিল না সোহাগের।দল বদলে শাসক দলে নাম লিখিয়ে নেতা হয়ে বসেছেন হান্নান। পুরোন দলে থাকার সময়সমবায়ের লক্ষ লক্ষ টাকা  নয়ছয়ের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এখনও প্রভাব খাটিয়েনামে -- বেনামে সরকারি, বেসরকারি জমি জলের দামে কিনে মোটা টাকায় বিক্রিরব্যবসা ফেঁদেছেন। ওই রকম লোক অন্যের জন্য ভালো কিছু করবে বলে মনে হয় নাসোহাগের। কিন্তু ভজনকাকারা বলেন , ওই ভুলটি করলে হবে না। পরে দোষ পেতে হবে।ওরা বলার সুযোগ পাবে, কই আমাদের তো কিছু বলো নি। তাছাড়া ভোটের আগে এসে ওরানিজে থেকেই তো মিষ্টি মিষ্টি করে বলে যায়, কোন কিছু সমস্যা হলে আমাদের বলবে।দেখিই না আমাদের কথা শুনে ওরা কি বলেন।

                        যুক্তিটা মনোপুত হয় সোহাগের।অগ্যতা একদিন সবাই হান্নানের বাড়িতে যায়।দরখাস্তটা দেখে হান্নান বলেন , সবই তোবুঝলাম। কিন্তু পার্টির কাছে কিছু সাহার্য্য নিতে হলে পার্টিও তো কিছুপ্রতিদান চাইবে। তোমারা পার্টির মিটিং মিছিলে এসো। বিধানসভার  ভোটটা পেরিয়েযাক। তারপর তোমাদের জন্য কি করা যায় দেখছি। ততদিন তোমাদের ঘর যাতে না ভাঙেদেখব।হান্নানের কথা শুনে যাত্রাপাড়ার মানুষগুলোর ধরে কিছুটা যেন প্রান ফিরেআসে। বিধানসভা ভোটের মাস খানেক দেরী রয়েছে। তার মানে মাস খানেক কোন চিন্তানেই। আর আশ্চর্যজনক ভাবে সোহাগরা লক্ষ্য করে তাদের বাড়ি ভাঙার যাবতীয় প্রশাসনিক তৎপরতা রাতারাতি উধাও। এজন্য হান্নানকে মনে মনে সাধুবাদই জানায়তারা। কিন্তু হান্নানের শর্তটা তাদের কিছুটা দোটনায় ফেলে। সম্মান থাক বা নাই থাক সোহাগরা নিজেদের শিল্পীই মনে করে। সেই হিসাবে তাদের কাছে সব পক্ষের লোকইআসেন। সরাসরি কোনও রাজনৈতিক দলের মিটিং--মিছিলে গেলে অন্যপক্ষের মনে কিপ্রতিক্রিয়া হবে তা নিয়েই দোটানা শুরু হয় ওদের। 

                                          ভজনকাকা অবশ্য মনকে প্রবোধদেওয়ার মতো করে বলেন , তত ভাবলে চলবে না। আমাদের শিয়রে সংক্রান্তি। কথায় আছে যেমন কলি তেমন চলি। কত বড়ো বড়ো লোক রাতারাতি রঙ বদলে ফেললেন আর আমরা চুনোপুঁটি বই তো নয়। বাকিরাও ভজনকাকাকেই সমর্থন করে। সোহাগও আর না করতে পারে না।হান্নানের কাজকর্ম মন থেকে মানতে পারুক বা নাই পারুক অন্যদের মঙ্গলের কথা তাকেভাবতেই হয়। কারণ সবাই যে তাকেই ভরসা করে। অগত্যা হান্নানদের মিটিং মিছিলে পা মেলাতে দেখা যায় সোহাগদের। শুধু তাই নয়, প্রচারের শেষদিনে হাটতলায় তারা রাজ্যস্তরের নেতা মন্ত্রীদের সামনে শাসক দলের সাফল্যের উপর নাটক লিখে পরিবেশনও করে। শুনে ওইসব নেতা -- মন্ত্রীরাও হাততালি দিয়ে প্রশংসা করেন। ওই মিটিং-এনেতা মন্ত্রীরা তাদের ভাষণে উন্নয়ণের বন্যা বইয়ে দেন। ফের ক্ষমতায় এলে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার কথাও বলেন।ঘন্টার পর ঘন্টা ঠায় রোদে বসে ওইসব ভাষণ শুনতে শুনতেই কেমন যেন ঘোর লেগে যায় সোহাগদের। তারা মনে মনে ভাবে, যারা এতকিছু পারে তারা তাদের জন্য মাথা গোঁজার একটা ঠাই আর মোটা ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করতে পারবেন না তাই কখনও হয় ?  ঘোরটা অবশ্য কেটে যায় ভোটের পর।

                ( ক্রমশ )


No comments:

Post a Comment