ফিমেল
অর্ঘ্য ঘোষ
( তৃতীয় কিস্তি )
ফের শুরু হয়ে যায় ঘর ভাঙার তৎপরতা। সোহাগরা একরার হান্নানের কাছে ছোটে, একবার বিধায়ক সানিরুল ইসলামের কাছে ছোটে। কিন্তু হচ্ছে হবে আর দেখব দেখছি আশ্বাস শোনা ছাড়া কাজের কাজ কিছু হয় না। সোহাগরা বুঝে যায় তারা ব্যবহৃত হয়েছে। নিজের লড়াইটা নিজেদেরই লড়তে হবে।প্রশাসন ফের ২৪ ঘন্টার মধ্যেই বাড়ি খালি করে দেওয়ার নোটিশ পাঠায়। নাহলে প্রশাসনকে বাড়ি ভাঙতে হলে তার জন্য খরচ ধার্য্য করা হবে বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়। চরম দোটানায় পড়ে যাত্রাপাড়ার মানুষগুলো। রত্না বলে, ও দিদি শেষ পর্যন্ত কি হবে? ঘরও হারাব, আবার টাকাও দিতে হবে না তো! সোহাগ দেখে মানুষগুলোর চোখে মুখে কেমন যেন বিভাজন রেখা ফুটে উঠেছে। কেমন যেন সংশয়ের ছাপ। সোহাগ উপলব্ধি করে, এটাকে আর বাড়তে দিলে হবে না। সংক্রামণের মতো তা ছড়াতেই থাকবে। প্রশাসন তো সেটাই চায়। কোন রকমে দাবিদারদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে মনোবল ভেঙে দেওয়াটাই তাদের উদ্দেশ্য। সোহাগ তাই রত্নাদের আশস্ত করার চেষ্টা করে। সে বলে , এটা হচ্ছে প্রশাসনের একটা চাল। বাড়িটা ছাড়া আমাদের আছেটা কি ? কি করে বাড়ি ভাঙার টাকা আমাদের কাছে থেকে আদায় করবে ? বড়ো জোর জেলে নিয়ে গিয়ে ঢোকাবে তো! তা একপক্ষে ভালোই হবে। বাড়ি ভাঙার পর তো আর গাছতলাতে থাকতে হবে না। দুবেলা খাবারও জুটবে। কি বলো ভজনকাকা ?
এই বিপদের মুখেও সোহাগের রসিকতায় আত্মবিশ্বাস ফেরে যাত্রাপাড়ায়। ভজনকাকা বলেন, মরার আবার খাড়ায় ঘায়ের ভয় কি ? যেদিন যা হওয়ার হবে। মুহুর্তে প্রত্যয়ী হয়ে উঠে সবাই। সবার মুখ থেকে একটাই কথা বেরিয়ে আসে, আমাদের হারাবার আছেটাই বা কি? ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ে সোহাগের। এই সময়টা সবাই একসঙ্গে থাকাটা জরুরী। কারণ প্রশাসন কিম্বা শাসক দলের লোকেরা তাদের পরিকল্পনা বানচাল করতে কাউকে একা পেলেই মগজ ধোলাই করে দেবে। সেটাকেই সব থেকে ভয় পায় সোহাগ। তাদের লড়াইটা তো চূড়ান্ত অসম। যেন দাঁড়িপাল্লার একদিকে চেপে রয়েছে সব থেকে ভারী বাটখারা। অন্যদিকে তাদের ওজন নেহাতই অকিঞ্চিৎকর। হাজার চেষ্টা করেও সমতায় আনা সম্ভব নয়। কিন্তু সোহাগ জানে সবাই একসংগে নাড়ালে উলটো দিকের পাল্লাটাকে কিছুটা হলেও নাড়িয়ে দেওয়া যায়। সেই চেষ্টাই করে সে। ঠিক হয় এখন থেকে থাকা খাওয়া সব একসংগে হবে। একা একা কেউ বাজার কিম্বা শৌচকর্ম পর্যন্ত করতে যাবে না। এইভাবে কয়েকদিনের মধ্য গোটা যাত্রাপাড়া যেন একটি পরিবার হয়ে ওঠে। আর সোহাগ হয়ে ওঠে সেই পরিবারের কর্ত্রী। কয়েকদিনের মধ্যেই পুনর্বাসনের দাবি সম্বলিত পোষ্টারে ছেয়ে দেওয়া হয় সর্বত্র। সেই পোষ্টার দেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করে। সোহাগরা হাত জোড় করে তাদের সবিনয়ে জানায়, আমাদের লড়াইটা আমাদেরই লড়তে দিন। খুব শিক্ষা হয়েছে আমাদের। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় গিয়ে আর আমরা মুখ পোড়াতে চায় না। যদি আমাদের দাবির প্রতি সহমত পোষণ করেন তাহলে কোন রাজনৈতিক দলের ব্যানার ছাড়াই পাশে থাকুন। যাদের বাড়ি ভাঙার আশংকা রয়েছে তারাও আসে। জানিয়ে যায় তারাও সংগে আছে।
ঠিক হয়, যাই হোক না কেন বুলডোজ্রার বাড়ি ভাঙতে এলে তারা ভিতরেই বসে থাকবে।যাত্রাপাড়ার মানুষগুলোর মুখে ফুটে ওঠে প্রতিরোধের অভিব্যক্তি। কিন্তু আচমকা যেন পরিস্কার আকাশে ঘনিয়ে আসে কালো মেঘ। বিভাজনের যে আশংকা সে এতদিন করছিল তার ছায়া ঘনিয়ে আসে। যাত্রা পাড়ার মানুষগুলোর মধ্যে নয়, বিভাজন রেখা ফুটে ওঠে তার নিজের বাড়িতে। তার অজান্তেই সুখময়কে পার্টি অফিসে ডেকে পাঠান হান্নান। সেখানে বসিয়ে ভালো করে মগজ ধোলাই করে ছেড়ে দেয় পার্টির নেতারা। তার নমুনা বাড়ি ফিরেই পায় সোহাগ। যে ছেলে এতদিন তার চোখে চোখ রেখে কথা বলে নি, এদিন সেই ছেলেই বলে কিনা তোমার এত বাড়াবাড়ি করার কি দরকার ? ছেলের মুখের দিকে চেয়ে সোহাগ বোঝার চেষ্টা করে কথাগুলো তার নিজের, না শেখানো বুলি। এরকম ভাবে তার সঙ্গে তো কোনদিন কথা বলে নি সুখ। তাই জিজ্ঞেস করেন, মানে কি বলতে চাইছিস তুই ? ছেলে বলে, দেখ আমাদের তো আলাদা বাড়ি রয়েছে। যাত্রা অফিস ভাঙা পড়লে আমাদের কি ? আমরা অফিস বাড়িতে সরিয়ে নিয়ে আসব। কিন্তু যাদের সরিয়ে নিয়ে আসার জায়গা নেই তাদের কি হবে ? ছেলের দিকে প্রশ্নটা ছুড়ে দেয় সোহাগ। সুখ বলে, তা নিয়ে তোমারই বা অত মাথা ব্যাথা কেন? এ কি বলছিস তুই , একসংগে এতদিন আছি। সবাই একটা পরিবারের মতো হয়ে গিয়েছি। তাছাড়া আমাদের অবস্থাও যদি অন্যদের মতো হতো -- কথা গুলো বলে ছেলের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সোহাগ। সুখ বলে, তুমি সরে এলে পার্টি আমাকে একটা লোনের ব্যবস্থা করে দেবে বলেছে। সোহাগ বলে , তাহলে তলায় তলায় এই ব্যাপার ? তাছাড়া পার্টিও তোমার ওই মাতব্বরি ভালো চোখে দেখছে না -- মাকে বলে ছেলে।
কথা হারিয়ে ফেলে সোহাগ। এসব কি বলছে সুখ ? কিছুটা সামলে নিয়ে সে বলে, যে পার্টি এতগুলো বিপন্ন মানুষের সামান্য একটু ভালো করতে পারে না তারা ভালো চোখে দেখল না মন্দ চোখে দেখল তা নিয়ে কিছু যায় আসে না। আমার চেয়ে তাহলে ওরাই তোমার আপন হলো, ওরাই বড়ো হলো-- প্রশ্নটা মায়ের দিকে ছুড়ে দেয় সুখ। প্রশ্নটা কিছুটা যেন অস্বস্তিতে ফেলে দেয় সোহাগকে। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে সে বলে, ছোট বড়ো -- আপন পরের ব্যাপার নয়। রক্তের সম্পর্কেই যে সবসময় আপন, বা বড় নির্ধারিত হয় এমন নয়। সময় এবং পরিস্থিতিই তা নির্ধারণ করে দেয়। এই যেমন দেখ, এখন আমার থেকেও তোর কাছেই তো পার্টির লোকেরা বড় হয়ে উঠেছে। কিন্তু ওই লোকগুলোর কথা ভাব, ওরা কিন্তু আমাকেই আপন করে নিয়েছে। তাই তাদের কি করে আমি পর করি বল ? তাহলে যা ভালো বোঝ করো, এরপর কিছু হলে আমাকে কিছু বলতে এসো না -- গোমরা মুখে কথাগুলো বলে ঘরে ঢুকে যায় সুখ। খুব কষ্ট হয় সোহাগের। ভেবেছিল তার লড়াইয়ে ছেলেকেও পাশে পাবে। কিন্তু মায়ের লড়াইয়ের থেকেও তার কাছে নিজের স্বার্থটাই বড়ো হল। সামন্য একটা লোনের জন্য মা'কে দুকথা শুনিয়ে দিতে তার আজ একটুও বাঁধছে না। অথচ সে তার যথা সর্বস্ব তুলে দিয়েছে ছেলে বৌমায়ের হাতে। তাদের পরিবারে বোধ হয় ফাটল ধরে গেল।এরপর ছেলে বৌমা তার সংগে ভালো করে কথা বলবে বলে মনে হয়।
সে না বলুক, সে সহ্য করে নেবে। ওরা ভালো থাকলেই হল। কেবল নাতিটার কথা ভেবে খুউব কষ্ট হচ্ছে তার। তার মধ্যেও টানাপোড়েন শুরু হয়ে যাবে না তো! দিদির সংগে হঠাৎ করে বাবা -মায়ের শীতল ব্যবহার ওইটুকু শিশু মনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে না তো ? এইসব ভাবতে ভাবতে খুব মুসড়ে পড়ে সোহাগ। আঘাতটা যে উলটো দিক থেকে আসবে তা স্বপ্নেও ভাবে নি সে। সব শুনে চিন্তিত হয়ে পড়ে রত্নারা। তাদের কথাতেই ধরা পড়ে তার ছাপ। রত্নারা প্রশ্ন করে, এরপর তাহলে কি করবে দিদি? একমাত্র ছেলেকে তো আর ফেলে দিতে বলতে পারব না। ভজনকাকাও বলে, সেটাই তো ঠিক। আমাদের কথা ভেব না। কপালে যা আছে তা হবে। ভজনকাকার কথা শেষ হয় না, সোহাগ চিৎকার করে ওঠে, না-- আ---। আমি এর শেষ না দেখে ছাড়ব না।শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধের প্রস্তুতি। সন্ধ্যের মুখে থানা থেকে লোক এসে বলে যায়, শেষবারের মতো তাদের ১২ ঘন্টা সময় দেওয়া হচ্ছে অনত্র সরে যাওয়ার জন্য। এরপর জেদ ধরে বসে থাকলে তার পরিনাম হবে মারাত্মক। শাসকদলের প্রতিনিধিরাও শাঁসিয়ে যায় , বিরোধী দলের উসকানিতে নাচছো তো, বুঝবে মজা। সোহাগরা জানিয়ে দেয়, আমরা কারও উসকানিতে নাচছি না। কেউ আমাদের কথা ভাবে নি।তাই নিতান্ত বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে ।কারণ আমাদের তো আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। যা হওয়ার হবে, আমরা ঘর ছেড়ে বেরোব না। ঘর চাপা পড়ে মরতে হয় মরব। ভালোই হবে সব চুকে যাবে।
সেদিন রাতে আর কেউ নিজের ঘরে যায় ফেরে না। এক জায়গায় রান্না করা হয়। কিন্তু দুশ্চিন্তায় বড়োরা কেউ মুখে খাবার তুলতে পারে না। ছোটদের খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে গোল হয়ে আলোচনায় বসে সবাই। সোহাগ বলে , কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে ঘরে বসে থাকলে ওরা খুব সহজে ভাঙতে পারবে বলে মনে হয় না। বলেই কেমন যেন খটকা লাগে সোহাগের। তার এই কথাটা অন্যরা কেমন ভাবে নেবে কে জানে! ভাববে না তো নিজের নাতিটি তো আসবে না, অন্যের ছেলে মেয়ের প্রাণ নিয়ে বাজী ধরছে সে। কিন্তু সে তো তা চায়নি। সে চেয়েছিল, সবার মতো তার ছেলে-বৌমা, নাতিও থাকুক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে। কিন্তু ছেলে যে লোভের ফাদে গলা ঢুকিয়ে বসে আছে। অস্বস্তির ছাপ ফুটে ওঠে তার চোখে মুখে। সোহাগের মনের ভাবটা বুঝতে পারে রত্নারা। তাই তারা বলে, তুমি কিছু ভেব না তো দিদি। ছেলের নিষেধ উপেক্ষা করে তুমি যে আমাদের সংগে আছো তাতেই আমরা খুশী। আর আমাদের কাউকে চাই না। পরিবেশটা ভারি হয়ে যাচ্ছে দেখে ভজনকাকা বলে ওঠেন , ঘরের ভিতরে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে তার তো কিছু ঠিক নেই। তাহলে খাবার-দাবারের ব্যবস্থাও তো করে রাখতে হবে নাকি? আমাদের পেটে গামছা বেধে পড়ে থাকার অভ্যাস আছে, কিন্তু বাচ্চাগুলোর তো ঘন্টায় ঘন্টায় খাবার চাইবে। সোহাগ বলে , ঠিক বলেছো ওদের ভুলিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন রকম শুকনো খারার আনতে হবে। যে যা পারো দাও। তাই দিয়ে বাচ্চাদের খাবার আর অন্যান্য বাজারও সন্ধ্যেবেলায় করে আনবে।
সন্ধ্যে থেকেই সাজো সাজো রব পড়ে যায় যাত্রাপাড়ায়।সবাইকে যেন কথায় পেয়েছে আজ। কোথাই এই রকম আন্দোলন করে কি হয়েছিল সেই সব শোনা কথা আলোচিত হয় গভীর রাত্রি পর্যন্ত। ওইসব কথা বলেই নিজেদের মনোবল ধরে চেষ্টা করে তারা।কেউ কেউ বলে , আচ্ছা ওই টিভি, কাগজওয়ালাদের একটা খবর দিলে হয় না ? সোহাগ বলে, খুব ভালো বলেছো। ওরা থাকলে পুলিশ প্রশাসনের লোকেরা বাড়াবাড়ি করতে একটু ভয় পায়। কিন্তু এখন তাদের খোঁজ কি করে মিলবে ? ভজনকাকা বলেন, চিন্তা কোর না। ওরা হচ্ছে বানের আগে হদো। ঠিক দেখবে খবর পেয়ে নিজে থেকেই চলে আসবে। সোহাগ বলে, সেটা হলেই ভালো হয়। আমাদের সমস্যার কথাটা ওদের কাছে তুলে ধরতে হবে। নাহলে প্রশাসন আর পার্টির লোকেরা আমাদের সম্পর্কে ওদের উলটো বোঝাবে। তাহলে অনেকে আমাদের ভুল বুঝতে পারে। সেটা কিছুতেই হতে দেওয়া হবে না। কথা বলতে বলতেই যে যেখানে পারে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম আসে না কেবল সোহাগের চোখে। সে ভাবতে থাকে কি যে হবে শেষ পর্যন্ত কে জানে। ছেলে বৌমা পর হয়ে গেল।নাতিটাকেও আর আসতে দেয় না তার কাছে। হাজার ব্যস্ততার মাঝেও সকালে - বিকালে নাতিকে নিয়ে যে বাঁধা রুটিন ছিল কয়েকদিন ধরে তাও বন্ধ। ছেলে-বৌমাই এখন তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে নাতিকে স্কুল এবং পার্কে নিয়ে যায়। নাতিটা কেমন করুন দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকে। মা-বাবা তার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলে যায়। কোনদিন কি আর সম্পর্কটা স্বাভাবিক হবে না ?
ভাবতে ভাবতেই জল গড়ায় সোহাগের চোখে। সেই জল শুকিয়েও যায়। কখন যেন একটু তন্দ্রার ভাব আসে তার। হঠাৎ সোরগোল পড়ে যায় যাত্রাপাড়ায়। সচকিত হয়ে উঠে সবাই। তখন সবে আলো ফুটি ফুটি ভোর। অদুরে মল্লিকদের বাগানে পাখিদের কিচির মিচির আর ডানা ঝাপটনোর শব্দ জানান দিচ্ছে রাত্রি শেষের বার্তা। আচমকা সজোরে কড়া নড়ে ওঠে দরজার। ঘুম ভেংগে বাচ্চা গুলো ফের পাশ ফিরে শোয়। দরজা খুলে বেড়িয়ে আসে সোহাগরা। আর চোখ খুলে চাইতেই হতচকিত হয়ে পড়ে তারা। দেখা যায়, সাতসকালেই যাত্রাপাড়া ঢোকার মুখেই দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রশাসনের বিশালাকার বুলড্রোজার। বি, ডি, ও, থানার বড়োবাবুরা সব প্যান্টের পকেটে হাত ভরে পায়চারি করছে। পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। এক পুলিশকর্মী কাঁধে মাইক ঝুলিয়ে ঘোষণা করছেন , যাত্রাপাড়ার বাসিন্দাদের জানানো যাইতেছে যে, ইতিপূর্বে আপনাদের বহুবার সরকারি জায়গা দখল মুক্ত করিবার কথা বলা হইয়াছিল। কিন্তু আপনারা কর্ণপাত করেন নাই। এক্ষণে আপনাদের এক ঘন্টা সময় দেওয়া হইতেছে , আপনারা অন্যত্র উঠিয়া যান। নচেৎ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে। ওই ঘোষণা শুনেই শুরু হয়ে যায় পারস্পরিক মুখ চাওয়া চাওয়ি। যাত্রাপাড়া ছাড়াও যাদের ঘর ভাঙার আশংকা রয়েছে গোলমাল শুনে এসেছিলেন তারাও। কিন্তু বিরাট পুলিশ বাহিনী দেখে আর ওই ঘোষণা শোনার পর একে একে গুটি গুটি পায়ে যাত্রাপাড়া ছেড়ে চলে যান তারা।
সোহাগেরা একেবারে একা হয়ে যায়। সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সোহাগের দিকে। প্রত্যয়ের সঙ্গে সোহাগ বলে , দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে আমাদের। পিছোনোর তো আর জায়গা নেই। যাই হোক না কেন দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হবে। চলো সবাই একসঙ্গে ঘরে গিয়ে বসি। তারই মধ্যে এসে পৌঁছোয় একদল সাংবাদিক। তাদের দেখে কিছুটা যেন স্বস্তি ফেরে যাত্রাপাড়ানমানুষগুলোর মধ্যে। ওসি, বি,ডি,ও'রা তাদের উদ্দেশ্য বলে, আপনারাও এসে গিয়েছেন দেখছি। এত সাতসকালে কে খবর দিল আপনাদের? সাংবাদিকদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে বলে , আপনারা কি ভেবেছিলেন চুপি চুপি সব সেরে ফেলবেন। কেউ টের পাবে না। আপনারা তো নিজেদের প্রচারমূলক খবর ছাড়া কিছু দেন না, কিন্তু আমাদের খবর দেওয়ার লোকের অভাব নেই। জবাবে বি, ডি,ও ওই সাংবাদিককে বলেন, কিন্তু আপনারা তো ছবি তুলতে পাবেন না। সে অনুমতি নেই। সাংবাদিকও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সে সাফ জানিয়ে দেয় , প্রকাশ্যে আপনারা যা করতে পারেন তার ছবি তোলারও অধিকার সংবাদ মাধ্যমের আছে। তার জন্য কারও অনুমতির দরকার হয় না। তার চেয়ে বরং আপনারা আপনাদের কাজ করুন। আমাদেরও আমাদের কাজ করতে দিন। আর কথা বাড়ান না বি,ডি,ও।ওই বাদানুবাদ কিছুটা ভরসা যোগায় সোহাগদের। তারা সাংবাদিকদের হাতে তাদের দাবিপত্রের কপি তুলে দেয়। সব দেখে সাংবাদিকরা বলেন , আশ্চর্য তো এত জায়গায় জানিয়েও কোন রেসপন্স মেলেনি ? সোহাগ বলে, বিশ্বাস করুন ভাই আপনারা ছাড়া আমাদের সমস্যার কথাটা এর আগে কেউ ভালোভাবে শোনেই নি।
মাঝপথেই কথা বন্ধ হয়ে যায় সোহাগের। ফের বেজে ওঠে মাইক। ঘোষণা হয় , আর ৫ মিনিট সময় আছে। আপনারা বাইরে আসুন। প্রশাসন আপনাদের সংগে কথা বলতে চায়। এগিয়ে যায় সোহাগ। বি , ডি, ও সাহেবের মুখোমুখি দাঁড়ায় সে। নম্র স্বরেই বলে, বলুন কি বলতে চান। বি,ডি,ও বলেন, আপনাদের সেদিনই তো জানিয়ে দিয়েছিলাম জায়গা ছেড়ে উঠে যেতে হবে। সোহাগও বলে, আমরাও তো স্যার আপনাকে বলেছিলাম আমাদের যাওয়ার আর জায়গা নেই। আমাদের মাথা গোঁজার একটা ঠাইয়ের ব্যবস্থা করে দিন। আজকেও বলছি দিন একটা কিছু ব্যবস্থা করে আমরা সবাই সরে যাচ্ছি। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বি, ডি, ও বলেন, এতগুলো লোকের ব্যবস্থা করে দিন বললেই তো আর হোল না। কেন স্যার, তারাশংকর ভবনে আমাদের অস্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দিন আপাতত। তারপর না একটা করে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে দেবেন। আমরা উঠে চলে যাব। সরকার তো শুনি এত এত করছে। আমাদের মতো দুস্থ শিল্পীদের জন্য কি কিছুই করার নেই? বি, ডি, ও সাহেবের দিকে প্রশ্নটা ছূড়ে দেয় সোহাগ। রাগের মাত্রা চড়তে থাকে বি, ডি, ও তামালকৃষ্ণ বিশ্বাসের। দাঁত খিচিয়ে বলেন , মামার বাড়ির আবদার আর কি। ওনারা বলবেন আর সরকারি ভবনে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সোহাগও কম যায় না। গলা চড়িয়ে সেও বলে, কেন দিতে দোষ কোথাই ? সংস্কৃতি চর্চার জন্য গড়া ওই ভবন তো যখন যারা শাসন ক্ষমতায় আসে তাদের চেলা চামুণ্ডাদের আখড়া হয়ে ওঠে। আর এখন তো দিনের পর দিন তালা বন্ধ থেকে সাপ খোপ, ইঁদুর ছুঁচো, বাদুর চামচিকের বাসস্থান হয়ে উঠেছে। মানুষ থাকলে কি তার থেকেও খারাপ অবস্থা হবে ?
এবারে আর মেজাজ ধরে রাখতে পারেন না ওসি শুভাশিস বোস। বলেন , এই মাগীই দেখছি নাটের গুরু। লিডারি করা ঘুচিয়ে দিচ্ছি দাঁড়া হারামজাদী। তারপরই যাত্রাপাড়ার মানুষগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ বাহিনী। লাঠির আঘাতে মাথা ফেটে যায় সোহাগের। সোহাগ দেখে মাথা ফেটে রক্ত ঝড়ছে ভজনকাকা, রত্না , ছন্দাদেরও। লাঠির ঘায়ে কারও হাত, কারও বা ভেঙেছে পা। বাবা-মায়ের ওই অবস্থা দেখে বাচ্চাগুলোও তাদের কাছে ছুটে যেতে গিয়ে লাঠিপেটা হয়েছে। যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। তবুও পুলিশ সমানে লাঠি চালাছে আর বলছে, বল হারামজাদী বেশ্যা মাগীরা আর আন্দোলন করবি ? সোহাগের চোখ দুটি কাকে যেন খোঁজে। দেখে দূরে দাঁড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে সুখ। পুলিশের লাঠিতে মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে। সেদিকে কোন খেয়াল নেই। তার চোখ জলে ভরে যায় এক অন্যরকম যন্ত্রনায়। এই সময় মানুষ পাশে আপনার জনকে দেখতে চায়। কিন্তু সোহাগের আপনার জনরা তো আর আপনার নেই। শুধু পোষা কুকুরটা তার ওই অবস্থা দেখে কেমন যেন এক অব্যক্ত যন্ত্রনায় ডেকেই চলে। সোহাগ মনে মনে ভাব যাক তবু তো একজন আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গরু ছাগলের মতোই পুলিশ ভ্যানে ভরে তাদের বিনা চিকিৎসায় লকআপে ফেলে রাখা হয়। অবোধ শিশুগুলোও বাদ যায় না। লকআপের ভিতর যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকে সবাই। বাবা -- মায়েদের ওই অবস্থা দেখে বাচ্চাগুলোও সমানে কেঁদে চলে। তারাও খিদে তেষ্টা ভুলে যায়।
লকাপের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা গুনতি করার সময় বড়োবাবু অশ্রাব্য খিস্তি দিয়ে বলেন, থাক সব পড়ে। কাল সকালে একবার হাসপাতাল ঘুরিয়ে কোর্টে চালান করে দেব। ওখানেই তোদের পুনবার্সন হয়ে যাবে। কথা বলা কিম্বা শোনার মতো অবস্থা ছিল না সোহাগদের। তাদের কেবল একটাই আক্ষেপ, সংবাদ মাধ্যমের সংগে কথা বলা হলো না। সাংবাদিকদের তাদের কাছে ঘেঁষতেই দেয়নি পুলিশ। তবু দূর থেকেই তারা তাদের রক্তাক্ত ছবি আর যন্ত্রনায় গোঙানির শব্দ ক্যামেরাবন্দী করে নিয়ে গিয়েছে। বাইরে কি হচ্ছে তা জানতে পারে না সোহাগরা। কিন্তু জল অনেক দূর গড়ায়। সমস্ত সংবাদ মাধ্যমে বড়ো বড়ো হেডিং দিয়ে ছাপা হয় খবরটা। কোথাও ছাপা হয়, মাথা গোঁজার ঠাই চেয়ে জুটল মাথায় পুলিশের লাঠি। কোথাও আবার লেখা হল, শান্তিপূর্ণ অবস্থানে শিশু - মহিলাদের নির্বিচারে পেটাল পুলিশ। ছাপা হলো তাদের রক্তাক্ত যন্ত্রনা কাতর ছবিও। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের দৌলতে ওই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। সারা রাজ্য তথা দেশ জুড়ে ছিছিকার ওঠে। মানবাধিকার, মহিলা সংগঠনগুলি সরব হয়। নিন্দায় সরব হন শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবিদের একাংশও। খোদ রাজ্যপাল ঘটনার নিন্দা করে সংবাদ মাধ্যমে বিবৃত্তি দেন। বিধান সভায় হইচই বাধিয়ে দেন বিরোধীদলের বিধায়করা। মুখ্যমন্ত্রীর বিবৃত্তি দাবি করে ওয়াক আউট করেন তারা। শাসক দলের অন্দরেও সমালোচনা শুরু হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই বলতে শুরু করেন, সামনেই পঞ্চায়েত ভোট। এই সময় এতটা বাড়াবাড়ি না করলেও হত।বিরোধীরা বিষয়টি ইস্যু করতে পারে। তাদের আশংকাই যেন সত্যি হয়। বিরোধী দলনেতা সুমন কল্যাণ বিধানসভায় ঘোষণা করে দেন, ওইসব শিল্পীদের সংগে কথা বলতে তারা ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন।
কার্যত ল্যাজে গোবরে অবস্থা হয়ে ওঠে সরকারেরর। বিরোধীরা পরিস্থিতির সুযোগ নিজেদের হাতে নিতে চলেছে দেখে মুখ্যমন্ত্রীও ঘোষণা করে দেন, এলাকার বিধায়কের নেতৃত্বে সরকারি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হচ্ছে। লক আপ খুলে ঘরে ঢোকেন বড়বাবু। চুলের মুঠি ধরে দাঁড় করান সবাইকে। মুখের সামনে বেতের লাঠিটা নাচিয়ে বলেন, যা বলছি কান খুলে শুনে রাখ, এবার থেকে যেই আসুক বলবি তোরা আগে পুলিশকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়েছিস। পুলিশ তোদের তাড়া করে গেলে ছুটে পালানোর সময় পড়ে গিয়েই তোদের এই হাল হয়েছে। কথাগুলো শুনে সবাই সোহাগের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। বিষয়টি বুঝতে পারেন বড়বাবু। এগিয়ে গিয়ে সোহাগের ফাটা চিবুকটা লাঠিটা দিয়ে একটু তুলে ধরেন। দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রনাটা হজম করে সোহাগ। বাচ্চাদের সামনে খিস্তি করে বড়বাবু বলেন, যা বললাম তার একটু বেচাল হলেই এমন ক্যালান ক্যালাব একমাস বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবি না। আর যখন উঠবি তখন বাপ মায়ের নাম ভুলে যাবি। যেদিন বাপ মায়ের নাম মনে পড়বে সেদিন নিজের নাম ভুলে যাবি। বুঝলি বেজন্মার দল। স্যার, আমরা তো কবেই শুয়ে পড়েছি। ভুলতে বসেছি বাবা-মা এমনকি বাবা মায়ের দেওয়া নিজের নামটাও। আপনি আর নতুন করে কি ভোলাবেন ? প্রশ্নটা সোহাগের ঠোটের ডগায় চলে এসেছিল, কোন রকমে সামলে নেয়। সোহাগ ভেবে পায় না তাদের উপরে পুলিশের এত রাগ কেন। তারা তো পুলিশের কোন পাকা ধানে মই দেয় নি। তারা তাদের সামান্য একটু মাথা গোঁজার ঠাই চেয়েছিল মাত্র। পুলিশেরও তো বাড়িতে বাবা-মা ভাই বোন আছে। তাহলে তারা যখন অন্যের বাবা-মা, ভাই-বোনকে খিস্তি কিম্বা লাঠিপেটা করে তখন কি একবারও মনে হয় না তাদের পরিবারের সংগে যদি কেউ এমন করে? যদি তাদেরই মতো বাবা-মা"কে ছেলের বয়সী কেউ তুই তোকারি করে কথা বলে তাহলে কেমন লাগবে? হঠাৎ থানায় সাজো সাজো রব পড়ে যায়। বিকালের দিকে অভুক্ত সোহাগদের বের করে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা করিয়ে আনা হয়। দেওয়া হয় মাংস রুটি। হলোটা কি পুলিশের -- ভেবে পায় না সোহাগরা।


No comments:
Post a Comment