Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ফিমেল - ৪




            ফিমেল 

                     

       

         অর্ঘ্য ঘোষ


              ( চতুর্থ কিস্তি )




কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যায় তাদের কাছে। গরাদের ফাঁক থেকেই তারা দেখতে পায় থানার সামনে দুধ সাদা গাড়ি থেকে নামছেন চকচকে পোশাক পড়া কিছু মানুষ। বড়বাবুর কাছে অনুমতি নিয়ে লকআপের সামনে দাঁড়ান তারা। তাদের মধ্যে একজন হাতজোড় করে বলেন, আমি বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। আপনাদের কথা সব শুনেছি। আমাদের দল ক্ষমতায় থাকলে এমনটা হোত না। আমাদের সরিয়ে যে আপনারা কতবড়ো ভুল করেছেন তা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। যাই হোক সামনেই পঞ্চায়েত ভোট, আমাদের ফিরিয়ে এনে সেই ভুলের সংশোধন করুন।আর ওইভাবে কোন দলের ব্যানার ছাড়া আন্দোলন করাও যায় না। আমাদের দলে আসুন , আপনাদের দাবির বিষয়টি আমরা বিধানসভায় তুলব। ভ্রু কুঁচকে যায় সোহাগের। এখানেও ভোট। দেখছে তারা যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে , সে নিয়ে কোন কথা নেই , তাদের সমস্যা নিয়ে কোন কথা নেই , স্রেফ ভোটের কথা বলতেই অত দুর থেকে আসা ? ভোট ছাড়া কি রাজনীতির লোকেরা কিছুই বোঝে না ? নিজেদের দাবি জানাতে গেলেও রাজনৈতিক দলে নাম লেখাতেই হবে ?  রাজনৈতিক দলে নাম লেখানো না হলে তাদের সমস্যার কথা বিধানসভায় তুলে ধরা যাবে না ? 


                       এইসব কথা ভাবতে ভাবতেই সোহাগ দেখে থানা জুড়ে কেমন যেন একটা চাঞ্চল্যের ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধী দলনেতারা চলে যেতেই সন্ধ্যার মুখেই হুটার বাজিয়ে থানার সামনে এসে দাঁড়ায় চকচকে গাড়ির বিশাল এক কনভয়। গোটা থানা চত্বর পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ হয়ে যায়। সোহাগ দেখে বিধায়ক সানিরুল ইসলামের সঙ্গে গাড়ি থেকে নামছেন ফর্সা পাজামা- পাঞ্জাবী পড়া একটি লোক। সংবাদ মাধ্যমের দৌলতন রাজ্যের  গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী মীরহাদ মুকিমকে চিনতে অসুবিধা হয়না সোহাগের।এত আয়োজন দেখে  সোহাগ ভাবে ,  দুদিন ধরে তাদের ঘটনাটা ঘিরে যে হারে খরচ হচ্ছে তার সামান্য একটা অংশ খরচ করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।কিন্তু কেই বা আর কবে এভাবে ভেবেছে ? সরকার তো একটা গৌরী সেন বই তো নয়। সরকার যারা চালায় তাদের কাছে গৌরী সেনের টাকা অপব্যয় হলে কি'ই বা এসে যায় ? এইসব ভাবনার মধ্যেই  সেন্ট্রি তাদের বের করে নিয়ে যায় বড় একটি হলঘরে সেখানে তখন উলটো দিকের চেয়ারে বসে রয়েছেন মন্ত্রী, বিধায়ক সহ সব চকচকে পোশাক পড়া লোকেরা। পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন, বি, ডি,ও, থানার বড়োবাবু, শাসক দলের নেতা আব্দুল হান্নানরা। বি,ডি,ও, বড়োবাবুর দিকে চেয়ে মন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি এতদুর গড়াতে দিলেন কেন ? হাত কচলে বি,ডি,ও ,  বড়োবাবু এমন কি শাসক দলের নেতা হান্নানও বলে উঠেন, স্যার এদের পুনবার্সণের ব্যবস্থা করে দেব বলা হয়েছিল। কিন্তু ওরা বিরোধী দলের কথা শুনে পাকাপাকি ভাবে তারাশংকর ভবনটাই চাইছিল। 

                   
                      ওদের কথা শুনে থ হয়ে যায় সোহাগ। অভিনয়টাও যে ওরা তাদের চেয়েও ভালোই করে তা উপলব্ধি করে সে। কিন্তু আর বেশীক্ষণ ওদের অতি নাটকীয়তা সহ্য করতে পারে না ।হাত জোড় করে বলে , না স্যার আমরা সবাই বরাবর কাদাছিটে বাড়িতে থাকতে অভ্যাস্ত। পাকাপাকিভাবে অত বড়ো পাকা বাড়িতে থাকতেও পারব না। সে মোহও আমাদের নেই। আমরা চেয়েছিলাম যে কোন একটা মাথা গোঁজার ঠাই। যতদিন সেটা না হয় ততদিন আমাদের সেখানে থাকতে দেওয়া হোক। রিহের্সাল করার সুযোগ দেওয়া হোক। তালাবন্ধ হয়ে পড়ে থেকে সাপখোপের বাসা হওয়ার চেয়ে আমরা থাকলে কি এমন ক্ষতি হোত বলুন স্যার? সব শুনে মন্ত্রী বলেন , হুম। দেখছি আলোচনা করে আপনাদের জন্য কি করা যায়। তারপর মন্ত্রী উঠে বড়োবাবুর ঘরে যান। যেতে যেতেই নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলেন তারা। সোহাগ শুনতে পায় বি,ডি,ও মন্ত্রীকে বলছেন, এভাবে ওদের দাবি মেনে নিলে এরপর থেকে সবাই তো ছোটখাটো বিষয় নিয়েও আন্দোলন শুরু করে দেবে। লোকাল প্রশাসন চালানোটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। চাপা গলায় মন্ত্রী বলেন, আহা , বোঝেন না কেন সামনেই ভোট।  বিরোধীদের বিষয়টিকে কিছুতেই ইস্যু করতে দেওয়া হবে না। বরং আমাদের সহানুভূতিসম্পন্ন ভাবমূর্তিটাই তুলে ধরে ভোট ক্যাপচার করতে হবে।  হাত কচলে বি,ডি,ও বলেন, আর বলতে হবে না বুঝেছি স্যার। 


                  কিছুক্ষণ পর বিধায়ক এসে জানান, শুনুন আমাদের মুখ্যমন্ত্রী আপনাদের মতো মানুষের প্রতি খুউব সদয়। তিনিও চান না আপনারা নিরাশ্রয় হয়ে পড়ুন। তাই উনি আপনাদের সবার জন্য জায়গা সহ একটি করে বাড়ি তৈরি করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আর যতদিন তা না হয় ততদিন আপনারা তারাশংকর ভবনেই থাকবেন। অভিনয়ের চর্চাও করতে পারবেন। শুধু তাই নয়, আপনারা নিজের বাড়িতে চলে আসার পরও তারাশংকর ভবনে সবাই সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ পাবেন। এজন্য ওই ভবনে আধুনিকীকরণ করা হবে। আর আপনাদের নিশর্তে মুক্তি দেওয়া হল। আজ রাতটুকুর মতো আপনারা নিজের বাড়িতে গিয়ে থাকুন। কাল বি,ডি,ও অফিসের লোক গিয়ে আপনাদের তারাশংকর ভবনের তালা খুলে দিয়ে আসবে। বিধায়কের কথা শেষ না হতেই হাততালিতে ফেটে পড়ে সবাই। সোহাগকে জড়িয়ে ধরে রত্নারা বলে ওঠে, দিদি তোমার জন্যই এমনটা সম্ভব হলো। চলো চলো এবার বাড়ি চলো। যুদ্ধ জয়ের আনন্দ রত্নাদের চোখে মুখে। সেই আনন্দইওদের ভুলিয়ে দেয় সব যন্ত্রনা। স্থান- কাল- পাত্র ভুলে ওরা বাচ্চাদের মতো পরস্পরকে জড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে -- হিপ হিপ হুররে।  সোহাগ ভাবে সব হারানো মানুষেরাই বোধ হয় বাচ্চাদের মতো হয়ে যেতে পারে। তখন তাদের বাচ্চাদের মতোই গড়ে পিঠে নেওয়া যায়। কিছুদিনের মধ্যেই সেই প্রমাণও পায় সোহাগ। তারাশংকর ভবনে থাকার জায়গা মিললেও দলের অফিস করার জন্য কেউ আলাদা কোন ঘর পায়নি। এর ফলে বায়না করতে আসা যাত্রাপার্টিরা চরম বিভ্রান্তি পড়ে। অস্বস্তিতে পড়ে  সোহগরাও। 


                      এতদিন যাত্রাপাড়ায় কোন পার্টি এলেই তাকে কি করে ভাংচি দিয়ে নিজের অফিসে ঢোকাবে তা নিয়ে আকচাআকচি লেগেই থাকত। কিন্তু ঘর ভাঙার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সবাই নিজের মতো হয়ে যাওয়ায় আগের মতো আচরণ করতে কেমন যেন বাধো বাধো লাগে সবার।  এর ফলে কেউ কেউ একতরফা বায়না পেতে শুরু করে। কারও আবার মাছি তাড়ানোর পরিস্থিতি হয়। সোহাগ দেখে এভাবে চললে অচিরেই তাদের নিজেদের মধ্যে একতাটা নষ্ট হয়ে যাবে। আর পার্টি কিম্বা প্রশাসন তার সুযোগ নিতে পারে।  পরিস্থিতির সামাল দেওয়ার জন্য মনে মনে একটা উপায় ভাবে সে। এক বিকালে সবাইকে জড়ো করে বিষয়টি খুলে বলে। সে বলে, আমার মনে হয় আমাদের এই পেশায় কেউ বড়োলোক হওয়ার আশা করে না। কোনরকমে চলে গেলেই হলো , কি বলো সবাই ?  সবার আগে ভজনকাকা বলে উঠে, তা বইকি। কোনরকমে চলে গেলেই হোল। কিন্তু সেটাই বা চলছে কই ? একেই যাত্রা আর হচ্ছে না, তার উপরে এখানে আসার পর নিদ্দিষ্ট ঠাই ঠিকানা হারিয়ে যাওয়ায় যেটুকু বায়না হচ্ছিল তাও একতরফা হয়ে যাচ্ছে।এরপর তো পেটে গামছা বেধে পড়ে থাকতে হবে। ভজন কাকার কথা শেষ হতেই সোহাগ বলে , সেটা যাতে না হয় তার জন্য আমি একটা উপায় ভেবেছি। আর সেটা বলব বলেই সবাইকে ডেকেছি। কি - কি সেই উপায় - আগ্রহ ঝড়ে পড়ে রত্না, ছন্দাদের গলায়। 



                              সোহাগ সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে তার পরিকল্পনা। সে বলে , আছা বাসস্ট্যান্ড, হাসপাতাল কিম্বা রেলস্টেশনে সার সার ভাড়ার গাড়ি, অটোরিক্সা , ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে প্রশ্ন জাগে না  সবার সবদিন ভাড়া জোটে তো ? জাগাটাই স্বাভাবিক, আমারও জেগেছিল। কিন্তু নাতিকে হাসপাতাল থেকে আনার সময় ভুলটা ভাঙে। চকচকে দেখে একটা গাড়ি ভাড়া করতে গেলে ড্রাইভার পাশের গাড়ি দেখিয়ে দেয়। খুউব রাগ হয়েছিল। বলেছিলাম, আপনি যাবেন না সেই বেশ। কার গাড়িতে যাব না যাব আপনি দেখিয়ে দেওয়ার কে ? ড্রাইভারটি বলে ,  দিদি মিছেই আমার উপর রাগ করছেন। নিয়ম অনুযায়ী এই মুহুর্তে যেতে হলে আপনাকে ওই গাড়িতেই যেতে হবে। কেন এরকম নিয়ম কেন -- আমি জানতে চাই। ডাইভারটি বলল, দিদি নিয়মটা আমরাই করেছি। সবার তো আর চকচকে গাড়ি নেই। কিন্তু আপনার মতো সবাই চকচকে গাড়িই খোঁজে। ফলে প্রথমদিকে চকচকে গাড়িগুলিই একতরফা ভাড়া পেত। বাকিরা মাছি তাড়াত। তখন আমরাই ঠিক করি লাইন অনুযায়ী পরপর ভাড়া নেওয়া হবে। তারপর থেকেই দেখা যায় দিনের শেষে সবার গড়পড়তা পুষিয়ে যাচ্ছে।রত্নারা প্রশ্ন তোলে, তাতে আমাদের কি এসে যায় ? সোহাগ বলে , আসে বইকি। আমরা যদিএকটাই অফিস করি এবং পালাক্রমে সবার জন্য বায়না নিই তাহলে কাউকে আর বসে থাকতে হবে না।


                           বিষয়টা সবার মনোপুত হয়। কেবল ভজনকাকা বলে উঠেন, আমরা ৩০ জনই তো মোটে লোক। একই সঙ্গে হেসেলের হাড়িটাও যদি এক করা যায় তাহলে আরও ভালো হবে। বহু খরচ বেঁচে যাবে। অন্তত যতদিন না নিজ নিজ বাড়ি হয় ততদিন যদি একসংগে থাকা যেত---! ভজনকাকার কথা শেষ হতে দেয় না রত্নারা। সমস্বরে সবাই বলে উঠে , এর মতো ভালো আর হয় না। শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। ঠিক হয় যৌথ অপেরার নাম দেওয়া হবে নতুন আলো। সেই মতো রাতারাতি লেখা হয় নতুন পোষ্টার। তাতে ফিমেলের জায়গায় লেখা হয় পেশাদার অভিনেত্রীর জন্য যোগাযোগ করুন। এই প্রথম সোহাগরা লাইট, মাইকের পদবাচ্য অবমাননাকর ফিমেলের তকমা ছেঁটে ফেলে নিজেদের অভিনেত্রী হিসাবে প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করে দিল। কয়েকদিনের মধ্যে ফলও মিলল হাতে হাতে।আগে নিজেদের মধ্যে আকচাআকচি থাকায় সুযোগ নিত যাত্রাপার্টিরা। নুন্যতম টাকার চুক্তিতে বায়না নিয়ে কিছুই থাকত না সোহাগদের। কিন্তু এখন একটাই অফিস হওয়ায় সোহাগরাই ভদ্রস্থ পারিশ্রমিক দাবি করতে পারে। একত্রে রান্নারও সুফল মেলে। সবদিকে খরচ তো সাশ্রয় হয়ই , অনেক সময়ও বেঁচে যায়। সেই সময়টুকু রিহের্সালে লাগানোয় শিল্পীদের উৎকর্ষতাও বাড়ে। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে নতুন আলোর নাম। ততদিনে রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনের কাছে পরিচিত নাম হয়ে উঠে সোহাগ। সেই পরিচিতি কাজে লাগিয়েই সোহাগ শিল্পীদের জন্য সরকারি ভাতা, অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ বীমার ব্যবস্থা করে ফেলে।



                       সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয় এই উত্তরণের কথা। স্থানীয় বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী নাট্য উৎসবে শিল্পী হিসাবে সংবর্ধিত করে সোহাগদের। সেদিন কেউ আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেন নি। কথাও হারিয়ে যায়। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমোয় না সোহাগরা। স্মারক উপহার গুলো পরম মমতায় হাত বুলাতে থাকে সবাই। হতশ্রদ্ধা ছাড়া কেউ তো কোনদিন তাদের সম্মান দেয় নি। সবার চোখে গড়িয়ে পড়ে আনন্দাশ্রু। কিন্তু মুহুর্তে সবার আনন্দাশ্রু কান্নায় পরিনত হয়। সোহাগের কাছে থেকে কথাটা শোনার পর আর কেউ নিজেকে ধরে রাখতে পারে নি। এমন কি হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠেন বয়স্ক মানুষ ভজনদাও। ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে বলে, তুমি পারলে ওই কথা বলতে। আমাদের কথা একবারও ভাবলে না ? এরপর কি হবে আমাদের ?  তাকে সান্তনা দিতে দিতে সোহাগ বলে, কি আবার হবে ? তোমরা সবাই খুউব ভালো থাকবে দেখো। কথাটা কয়েকদিন ধরেই তোমাদের বলব বলব ভাবছিলাম। কিন্তু এই পরিস্থিতির কথা ভেবেই বলতে পারছিলাম না। কিন্তু একদিন তো বলতেই হোত।  তাই আর দেরী করলাম না। দেখ আর আমার তোমাদের সংগে থাকা ভালো দেখায় না। আমার বয়েস হয়েছে। সেরকম কাজও নেই।তোমাদের রোজগারে বসে বসে খাচ্ছি। কিন্তু আর আমি তা পারব না। আমি বাড়ি ফিরে যাব ঠিক করেছি।  পারলে তুমি পারলে ওই কথা বলতে - এবার রত্নাদের গলা থেকে ঝড়ে পড়ে একরাশ অনু্যোগ। সোহাগ তাদের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্তনা দেয়, যখন আমার মতো বয়েস হবে তখন বুঝবি -- নিজের সম্মান নিজের কাছে।


                             বাচ্চা মেয়েদের মতো ঠোট উলটে অভিমানী গলায় ওরা বলে,  বুঝতেও চাই না যাও। আমরা তোমার পর বই তো নয়!  আমাদের ছেড়ে যেতে তো তোমার কোন কষ্টই হবে না। কে বলল তোরা আমার পর। আপনার জনদের তো পর করে দিয়ে তোদেরই তো আপন করে নিয়েছি রে। কিন্তু শিকড়ের একটা টান আছে জানিস তো। আমরা সবাই ছিন্নমুল হয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছি ঠিক কিন্তু ছিন্নমুলেরও যে শিকর হয়ে গজানো খুউব ইচ্ছে থাকে। যাই গিয়ে দেখি সেই শিকরের সন্ধান পাই কিনা।কেউ কেউ আবার অন্যেরকম গন্ধও পায়। দিন কয়েক বিয়ায়কের অফিসে যেতে দেখেছে সোহাগ। তাহলে কি তলায় তলায় বিধায়কের সংগে হাত মিলিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নিল ? তাদের কথা একবারও ভাবল না ? এরপর কি তাহলে প্রশাসন তাদের লাথি মেরে তাড়িয়ে দেবে ? উদ্বেগটা ধরে রাখতে পারল না কেউ কেউ। তারাই সরাসরি সোহাগকে প্রশ্নটা করেই ফেলে, এর মধ্যে অন্য কোন ব্যাপার নেই তো দিদি ? অন্য কোন ব্যাপার মানে - সোহাগের বিস্ময় ভরা জিজ্ঞাসা। মানে তুমি তো বার কয়েক বিধায়কের কাছে গেলে। তার সংগে কোন রফা করে আমাদের ফেলে চলে যাচ্ছ না তো -- ওরা সংশয় প্রকাশ করে। কথাগুলো শুনে যেন বোবা হয়ে যায় সোহাগ। ধাতস্থ হতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগে যায়। কিছুটা সামলে নিয়ে সে বলে, আমাকে তোমরা এই চিনলে? কেন আমি বার বার বিধায়কের কাছে গিয়েছি তা আজ আর আমি তোমাদের বলব না। পরে তোমরা জানতে পারে।


                                       পরদিনই জানা যায় সেকথা। বিধায়কের পি, এ একটা কাগজ রত্নাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, এই নিন আপনারা কলকাতার মতো এখানেও যে যাত্রা উৎসবের  দাবি জানিয়েছিলেন তা মঞ্জুর হয়েছে। আর আপনাদের দেওয়া হয়েছে উৎসব পরিচালনার দায়িত্ব। কথাগুলো শোনার পর মরমে মরে যায় যারা সোহাগের বিধায়কের কাছে যাওয়া নিয়ে অন্যরকম সন্দেহ করেছিলেন তারা।সোহাগ অবশ্য চুপ করে থেকে বিষয়টি উপভোগ করে। দেখে থমথম করছে সবার মুখ। চোখে বৃষ্টির আভাস। তারই মধ্যে নিজেকে কোন রকমে সামলে নিয়ে ভজনকাকা বলেন , ওদের কথায় তুমি কিছু মনে কোর না। আমরা তো জানি তুমি আমাদের জন্য কত ভাবো।আমাদের ভাবনা তোমাকে নিয়ে।  ছেলের কথা অমান্য করে আমাদের সংগে চলে এসেছিলে , সেখানে যদি আর তোমার ঠাই না হয় ? ম্লান হাসি ফুটে উঠে সোহাগের মুখে। কেমন যেন একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরে তাকে। সেসব কাউকে বুঝতে দিতে চায় না সে। তাই বলে , সে কথাও ভেবে রেখেছি। ছেলের সংসারেও আমি বসে বসে খাব না। বাড়ির সামনে যে চালাটা আছে সেখানে চা -- তেলেভাজার দোকান দেব। সামনেই বি , ডি, ও অফিস , রেজেষ্ট্রি অফিস পাড়া। বহু লোক আসে দুরদুরান্ত থেকে। দুদিনেই দোকান জমে যাবে। অন্তত নিজের পেটের ভাতটা ঠিক যোগাড় হয়ে যাবে। তাহলে আমাদের ত্যাগ করে যাওটাই তোমার চূড়ন্ত ? কান্নাভেজা চোখে সোহাগের দিকে প্রশ্নটা ছূড়ে দেয় রত্নারা। 


                                চোখ শুকনো থাকে না সোহাগেরও। কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ত্যাগ কি রে ?  বাড়িতে গেলেও মনটা তোদের কাছেই পড়ে থাকবে। যখন ডাকবি ছুটে চলে আসব। তোরাও দোকানে যাবি। কম কিম্বা বিনা পয়সায় দিতে পারব না কিন্তু। বরং একটু বেশি বেশি করেই দাম দিবিতোরা।আমার পেটের ভাতটুকু তো যোগাড় করতে হবে বল।  রসিকতাটুকু নিজের কাছেই কেমন করুণ মনে হয় সোহাগের। হৃদয়ের অন্তস্থলে কত ব্যাথা জমা থাকলে তবেই নিজেকে নিয়ে মানুষ এমন রসিকতা করতে পারে তা রত্নাদেরও অজানা নয়। যেকোন সময় বাঁধ ভাঙা  স্রোতের মতো তা প্লাবিত করে দিতে পারে সবাইকে। তাই কেউ আর কথা বাড়ায় না। রাতে কারও ভালো করে ঘুম হয় না। রাত পোহালেই চলে যাবে সোহাগ। রত্নারা সংগে যেতে চেয়েছিল। সোহাগ নিরস্ত করেছে। সবার কাছে বিদায় নিয়ে বগলে প্যুটলিটা নিয়ে তারাশংকর ভবন ছেড়ে এগিয়ে যায় সোহাগ।সংগে সংগে চলে তার পোষা কুকুরটি। আর পিছনে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেংগে পড়ে রত্নারা। একবারও পিছন ফিরে তাকাতে পারে না সোহাগ। পিছনে যে তার স্বপ্ন পড়ে রয়েছে। মাঝপথে স্বপ্ন ভেঙে  গেলে কার না কষ্ট হয় ? কষ্টের মধ্যেও একটা  আশা যেন সোহাগকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। আবার সে নিজের পরিবারের সংগে মিলিত হতে পারবে। তার নয়নের মনি নাতিকে কাছে পাবে। 


                       কিন্তু অচিরেই তার সেই ভুল ভেঙে যায়। বাড়ির দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই তাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নেয় বৌমা। ছেলেও ঘরের ভিতর থেকে দেখে কেমন যেন নিলিপ্তের মতো ভাব করে থাকে। নাতিটা কেবল "দিদি এসেছে, দিদি এসেছে " বলে ছুটে আসছিল। কিন্তু ঘর থেকে তার বাবা বলে ওঠে, বাবু কাল না তোমার পরীক্ষা। এইসময় পড়া ফেলে তুমি কোথাই চললে ? থমকে দাঁড়ায় অবোধ শিশু। কান্না ভেজা চোখে দিদিকে দেখতে দেখতে ঘরে ফিরে যেতে হয় তাকে। কান্না পায় সোহাগেরও। ওই শিশুকে সে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। কিন্তু তাকে কাছে টেনে নেওয়ার অধিকারও তার নেই। সোহাগ অনুভব করে কোথাও যেন তাল কেটে গিয়েছে। কাপড়ের পুঁটলিটা নিয়ে নিজের ঘরে ঢোকে সে। ছেলে -- বৌমা কেউ তার সংগে সরাসরি একটা কথাও বলে না। তবে তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে ওরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, মা তো নয় ডাইনী। তখন আমাদের কথা না ভেবে এখন এসেছে ঘাড়ে চাপতে। আর কান্না চাপতে পারে না সোহাগ। ওদের জন্য কি না করেছে সে। আর আজ এই তার প্রাপ্য ? কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে সোহাগ। 


                                                দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়। কেউ তাকে খেতেও ডাকে না। মনকে শক্ত করে সোহাগ। ঠিক করে নিজের ভাত সে নিজেই যোগাড় করে নেবে। তেলেভাজার দোকানই দেবে। যৎসামান্য কিছু টাকা সে দুসময়ের জন্য সরিয়ে রেখেছিল। তা দিয়েই শুরু করে চা-তেলেভাজার দোকান।কয়েকদিনের মধ্যেই ভালোই জমে যায়। বি, ডি, ও অফিস, রেজিষ্ট্রি অফিসে এমন অনেক লোক আসেন যাদের কাজ সারতে দুপুর গড়িয়ে যায়।ওইসব লোকেদের কাছে অর্ডার নিয়ে ভাতও রান্না করে দেয় সোহাগ। তাতে দুপয়সা বেশি আয় হয়, নিজের খাওয়াটাও হয়ে যায়। দিনের শেষে যা লাভ হয় তার বেশির ভাগটাই তুলে দেয় ছেলে বৌমার হাতে। বিনিময়ে রাতের খাবারটুকু জোটে মাত্র।তা নিয়ে কোন অনুযোগ নেই সোহাগের। ওরা সুখী হলেই তার শান্তি। ভজনকাকা, রত্না, ছন্দারা মাঝে মধ্যে আসে। গল্প করার ফাঁকে ফাঁকে তারাও সোহাগের দোকান সামলে দেয়। সোহাগ ওদের কোনদিন তেলেভাজা মুড়ি, কোনদিন ভাত খাওয়ায়। ওরা জোর করে পয়সা দিতে আসে। চোখ মটকে সোহাগ বলে, খুউব বড়োলোক হয়ে গিয়েছিস মনে হচ্ছে। রত্নারাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। তারাও বলে, কেন আসার সময় তুমিই তো বলে এসেছিল ' দাম দিতে হবে কিন্তু "।কপট রাগে সোহাগ বলে, তবে রে হতছাড়ি , আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছিস?



                           এভাবেই হাসি ঠাট্টায় বাড়ির পরিবেশটা ভুলে থাকতে চায় সোহাগ। বৃহস্পতিবার বাজার বন্ধ। ওইদিন সোহাগ রত্নাদের কাছে চলে যায়। সারাদিন কাটিয়ে ফেরে। আসার সময় বলে, এই তো তোদের কাছেও খেয়ে গেলাম। এবার শোধবোধ হয়ে বগেল। রত্নারা বলে , শীঘ্রি যাচ্ছি আবার ধার রেখে আসব। শোধ নিতে তোমাকেও আবার আসতে হবে। বেশ কেটে যাচ্ছিল।কিন্তু সোহাগের শরীর যেন আর ধকল সইতে পারছিল না। দিন দিন শরীর শুকিয়ে চোখের কোনে কেমন যেন কালি পড়ছিল। প্রথম দিকে সোহাগ আমল দেয় নি। কাউকে কিছু বলেও নি। আর বলবেই বা কাকে। ছেলে- বৌমা তো কথাই বলে না তার সংগে। নাতিটাকে কাছে ঘেযতে দেয় না। কিন্তু একদিন রত্নাদের সামনেই মাথা ঘুরে পড়ে যায় সোহাগ। রত্নারাই তখন জোর করে নিয়ে যায় আশু ডাক্তারের কাছে। দেখে শুনে কেমন যেন গুম হয়ে যান আশুবাবু। কয়েকটা ওষুধ লিখে দিয়ে তিনি বলেন,কলকাতায় গিয়ে কয়েকটা পরীক্ষা করতে হবে। রত্না -- ছন্দারাই জোর করে সোহাগকে কলকাতায় নিয়ে যায়। কেমন যেন চিন্তিত দেখায় সোহাগকে। রত্নারা তাকে সাহস যোগায় , দেখ দিদি, পরীক্ষায় কিছুই মিলবে না। তুমি পুবোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে।  কিন্তু রিপোর্ট পাওয়ার পর কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যায় রত্নারা। ট্রেনেও বিশেষ কথা হয় না। পাশাপাশি সিট খালি থাকলেও সোহাগের কাছে বসে না ওরা। সোহাগ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, কি রে রিপোর্টে কি আছে?  তোরা কিছু বললি না। রত্নারা বলে, ওটা তো আশুবাবু দেখে বলবেন। ফিরে রত্নারা সরাসরি তারাশংকর ভবনে ফিরে যায়। বার বার বলা স্বত্ত্বেও সোহাগের দোকানে এক কাপ চা খেয়ে যেতেও রাজী হয়না তারা। 


                           তারপর থেকেই ওরা কেঊ আর দোকান মুখো হয় না। কি হলো জানতে একদিন সোহাগ নিজেই তারাশংকর ভবনে যায়। রত্নাদের বলে, কি রে আমি কি করলাম। তোরা আর দোকানে যাস না কেন?  তাকে দেখেই কিছুটা যেন অস্বস্তিতে পড়ে রত্নারা। কিছুটা ইতস্তত করে বলে, আমরা আর তোমার ওখানে  যাব না, তুমিও আর না এলেই ভালো হয়। সোহাগের গলা থেকে  বিষ্ময় ঝড়ে পড়ে -- এ কি বলছিস তোরা ? তুমি কষ্ট পাবে বলে তোমাকে সেদিন কিছু বলি নি।ডাক্তার সেদিনই রিপোর্ট দেখে বলেছিল, তোমার এডস হয়েছে ।বোঝই তো রোগটা কত মারাত্মক। ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার করি ----।রত্নাদের কথা শেষ হয় না মাথা ঝিমঝিম করে উঠে সোহাগের।একি শুনছে সে। ধপ করে মাটিতেই বসে পড়ে। তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে আসে তারাশংকর ভবন থেকে। কেউ কোন কথা বলে না।আশু ডাক্তারের কাছে আর যেতে হয় না।বিকালে মধ্যেই সবাই জেনে যায় কথাটা। জানে তার ছেলে বৌমাও।সেটা বাড়ি ফিরেই টের পায় সোহাগ।  অন্যদিনের থেকে আরও থমথমে পরিবেশ। তাই চুপচাপ নিজের ঘরে চোরের মতো ঢুকে যায় সোহাগ। কিন্তু শুনতে পায়  বৌমা বলছে , হাজার জনের সংগে ঢলানি ফুর্তি করে এমন একটা রোগ বাঁধিয়েছে। নিজে তো মরবেই, আমাদেরও মারবে। আমার একটাই ছেলে, হয় তুমি ওকে তাড়াও না হলে আমি ছেলেকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাব। কথাগুলোকে যে তাকে শোনানোর জন্যই বলা তা বুঝতে বাকি থাকে না সোহাগের।ছেলেও কেমন চুপচাপ শুনে গেল কথাগুলো।সমাজের সমস্ত ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে দশমাস দশদিন গর্ভ যন্ত্রনা সয়ে এই ছেলেকেই সে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিল। অন্ধকারে  হারিয়ে যেতে পারে বলেই এই মেয়েকে সে পুত্রবধু করে ঘরে তুলেছিল। আর সেই তারাই কিনা বলে দিল হাজার জনের ঢলানি ফুর্তি করেই সে এই রোগ বাঁধিয়েছে।


                             কোন পরিস্থিতিতে তাদের মতো মেয়েদের একাধিক পুরুষের ঘনিষ্ঠ হতে হয়। কেন তাদের হাত বদল হতে হয় তা একবারও ভেবে দেখল না ওরা। জীবনে চোখের জল বহু ঝড়েছে সোহাগের, কিন্তু এবারে কিছুতেই আর কান্না থামছে না তার। বালিশে মুখ গুজে বাচ্চাদের মতো বহুক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদে। তারপর এক সময় গুছিয়ে নেয় তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র। তারপর বাইরে এসে ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলে,  বাবা সুখ এবার থেকে আমি দোকানেই থাকব রে। আমার যা রোগ তাতে বেশিদিন তো আর বাঁচব না। কিন্তু তোদের তো আরো অনেকদিন পৃথিবী থাকতে হবে।তোরা সুখে থাকিস। তারপর থেকে সোহাগের ঠিকানা তার দোকান। রোগের খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই একে একে খদ্দেরও কমতে শুরু করে দোকানে।নিজের পেটের ভাতের যোগাড়টুকুও আর হয় না।কিন্তু পেট তো মানে না কোথাও ভোজ কাজের খবর পেলেই হাজির হয় সেখানে। একটি টিফিন প্যাকেটের লোভে যেকোন মিছিলে দীর্ঘপথ হাটে। কিন্তু সেই প্যাকেট খুলে কিছুতেই খাবার মুখে তুলতে পারে না। কান্নার সংগে দলা পাকিয়ে বেড়িয়ে আসে সেই খাবার।  নিজে তো কোনদিন ভালো খাবার পেলে খায় নি। ছেলে যতদিন ছোট ছিল ততদিন তাকে নিয়ে গিয়ে দিয়েছে, তারপর দিয়েছে নাতিকে। সেই ছেলে, নাতি এখন কতদুরের। দোকানের সামনে দিয়ে ছেলেকে স্কুলে নিয়ে আসা যাওয়া করে সুখ, কিন্তু ছোঁয়াচ লেগে যাবে বলে তার কাছে একটি বারের জন্যও ঘেঁষতে দেয় না।



                               অর্ধাহারে অনাহারে দিন দিন কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ে সোহাগ। দোকান চালা থেকে আর বেরোতেই পারে না। যেদিন খাওয়ার জোটে খায়। নাহলে জল খেয়েই কাটিয়ে দেয়।  না খেয়ে খেয়ে খাওয়ার ইচ্ছেটাই মরে গিয়েছে। এসময় মানুষের হাতের স্পর্শ পেতে বড়ো ইচ্ছে করে। কিন্তু মানুষ তার কাছ ঘেষে না। ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলতে চাই সবাই। কেবল পোষা কুকুরটা মাথার কাছে বসে থাকে। সেও যেন খিদে তেষ্টা ভুলে যায়। কখন দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে টের পায় না সোহাগ। কেবল সন্ধ্যা হলে ঠাকুর রামকৃষ্ণের ছবির সামনে কোন রকমে প্রদীপটা জ্বেলে বিছানা নেয় সে। সন্ধ্যা গড়িয়ে গভীর হয় রাত। কমে আসে প্রদীপের তেল। নিভু নিভু হয়ে আসে আলো। ঠাকুরকে বড়ো ঝাপসা দেখায়। কখন কোন আলোটা আগে নিভে যাবে তাই ভাবতে ভাবতে থাকে সোহাগ। কাছের মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজান। শোনা যায় "রাই জাগো রাই জাগো " টহল। সোহাগ টের পায় ভোর হল। ঘুম নেমে আসে তার চোখে। ঘুমের ঘোরেই সে বলে, সুখ এলি বাবা। আয় মাথার কাছে একটু বোস।পরক্ষণেই তার মুখে ফুটে ওঠে এক অপার্থিব হাসি। খুব কাছে থেকে না দেখলে বোঝাই যায না সেই হাসিতে কত কান্না লুকিয়ে আচ্ছে। সোহাগরা সারা জীবন ধরে অন্যকে সুখী করার চেষ্টা করে। একটুকু সুখের জন্য ওদের অন্তরের আকুতি করুণ হাসির অন্তরালে চাপা পড়ে থাকে। সংসার সমাজ তার খোজ রাখে না। সোহাগদের খোজ কবেই বা রেখেছে জগত  ? 


                ( সমাপ্ত )



            আমার কথা 



বন্ধুরা , ধারাবাহিক এই গল্পের সঙ্গে থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। এই কয়েকদিন আপনাদের মুল্যবান মতামত, লাইক, কমেণ্টস আমাকে অনুপ্রণিত করেছে। এজন্য আমি কৃতজ্ঞও। একটা কথা বলার আছে, গল্পের আঙ্গিকে পরিবেশিত হলেও ফিমেল নিছকই একটা গল্প নয়। বেশিরভাগটাই বাস্তব। হয়তো এক সোহাগের জীবনের সংগে  জড়িয়ে আছে আর সোহাগের জীবনচরিত। হাজার হাজার সোহাগ ছড়িয়ে নানা প্রান্তে। যাদের জীবন যন্ত্রনা প্রায় এক। ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার হয়ে সমাজের মুলস্রোত থেকে ছিটকনযাওয়া ওইসব সোহগরা সারা জীবন চোখের জলে বুক ভিজিয়ে চলে নীরবে নিভৃতে। আমি ওইসব সোহাগদের বঞ্চনার কথা কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। আপনার ভালো লাগলে প্রয়াস সার্থক হয়েছে জানব। ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন।

         ----০----


No comments:

Post a Comment