Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুনমা - ১




               ঠাকরুন মা 

                               
 

                    অর্ঘ্য ঘোষ


                       ( প্রথম কিস্তি ) 


তালপুকুরে ঘটি ডোবার দিন বাবুদের অনেকদিন আগেই হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাবুবাড়ির খেতাবটুকু আজও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে অন্নপূর্ণাকে। হোক না চারআনি জমিদার বাড়ির ছোট তরফ। কিন্তু তাকে আজও কেউ ঠাকরুন মা, কেউ বা গিন্নীমা বলেই ডাকে। ডাকটা কেমন যেন বিদ্রুপের মতো মনে হয় অন্নপূর্ণার। কারণ ওই খেতাবটুকুই তার বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।একই বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছিল তার স্বামীকেও। খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার জন্য তারও জোটে নি কোন ভদ্রস্থ কর্মসংস্থান। জীবন ধারণের তাগিদেই তাই তাকে বেছে নিতে হয়েছিল নানা উন্ছবৃত্তি। আর সেই কারণেই অকালে স্বামীকে হারাতে হয় তাকে।  না হলে হয়তো আজ তাকে ভিক্ষাবৃত্তি করতে হত না। পরের বাড়ি মুড়িভেজে, ধানসিদ্ধ করে চালিয়ে নেবে ভেবেছিল সে। কিন্তু কেউ তাকে সেই কাজ দেয়নি।  একে জমিদার বাড়ির গিন্নিমা, তার উপরে ব্রাম্ভ্রণের বিধবাকে দিয়ে ওইসব কাজ করিয়ে মহাপাতক হতে চায় নি কেউ! তাই শেষ পর্যন্ত ভিক্ষাবৃত্তিই বেছে নিতে হয় তাকে। কিন্তু গ্রামে ভিক্ষাও করতে পারে না সে। প্রথমদিকে দিন কতক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বেশিরভাগই মুখ বেজার করত। কি কারণে গ্রামের লোকেরা তারসঙ্গে ওইররকম ব্যবহার করত তা সেদিন বোঝে নি সে। বুঝেছিল অনেক পরে। আসলে টাকা পয়সা না দিলেও ভগবান তাকে আর তার ছেলে মেয়েকে রূপ দিয়েছিলেন অঢেল। আর পয়সাওয়ালা ঘরের গৃহিনীদের সেটাই হয়ে উঠেছিল গাত্রদাহের কারণ। সেইদিক থেকেও এক অর্থে ভগবান তাকে মেরেই রেখেছেন।


                          তারপর থেকেই কে কি বলবে সেই আশংকায় নিজের গ্রাম ছেড়ে দুর দুরান্তের গ্রামে যায় অন্নপূর্ণা। গড়পড়তা ভিক্ষাজীবিদের থেকে তাকে মেলাতে পারেন না ওইসব গ্রামের বাসিন্দারা। তার মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে গৃ্হস্থ বাড়ির বৌ'ঝিরা তার সংগে আলাপ জমায়। জানতে চায়, কেন তাকে ভিক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকেই বলে, মা তোমাকে দেখে ভিক্ষা করার মতো মেয়ে মনে হয় না! জবাবে, নিজের জীবনের করুণ কাহিনী তাদের খুলে সে। শুনতে শুনতে তার মতো ওইসব বৌঝিদের চোখ শুকনো থাকে না। আচলে চোখ মুছতে মুছতে তারা বলে , কেদ না মা। দেখো একদিন ভগবান ঠিক মুখ তুলে চাইবেন। অন্নপূর্ণা জানে শেষ পর্যন্ত শেষপর্যন্ত সেই ভগবানের মুখ তুলে চাওয়ার কথাই বলবে সবাই। কিন্তু ভগবান যে কি কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তা সে জানেনা। ভগবানের কথা উঠলে তাই তার অভিমান হয়।  সেইজন্যই যেচে সে কাউকে তার জীবন যন্ত্রণার কথা বলতে চায় না। কিন্তু বছরের পর বছর ধারাবাহিকভাবে তার জীবন কাহিনী শুনতে শুনতে  দূর দুরান্তের গ্রামের মানুষজন প্রায় সবাই তার কথা জেনে গিয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই তাকে শুধু একজন ভিক্ষারিণী হিসাবেই দেখেন না বরং একটু সহানুভুতির চোখেই দেখেন। কেউ বলে, ঠাকুরুন মা আজ আমাদের বাড়িতে নাম গান উপলক্ষ্যে লুচি মিষ্টির ফলার হবে। আপনিও চাট্টি খেয়ে যাবেন।  কেউ বা বলে, গিন্নিমা ,  আজ আমার নাতির  মুখেভাত।  আপনি  আমাদের সংগেই সেবা দেবেন গো।যা ঘুরেছেন ঘুরেছেন, আর গাঁ ঘুরতে হবে না ।আমরাই যাবার সময় পুষিয়ে দেব ক্ষণ ভালো ভালো খাবারের সামনে বসে কিছুতেই তা মুখে তুলতে পারে না অন্নপূর্ণা। ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোর কথা মনে পড়ে যায় তার। কতদিন যে এইরকম ভালো খাবার ওরা চোখে দেখে নি তার ঠিক নেই। 


                             বিষয়টা নজর এড়ায় না বাড়ির গৃহিনী গৃহকর্তাদের। তারা বলে, ঠাকরুন মা অপনি সব খেয়ে নিন। আপনার ছেলে মেয়ের জন্য বেঁধে দেওয়া হবে। যাবার সময় চাল, জমির ফসল সহ খাবারও বেঁধে দেয় অনেকে। আর তাদের মঙ্গলের জন্য সেই ভগবানের কাছেই প্রার্থনা করে সে। তার ভালো না হোক, তাকে যারা ভালোবাসে তাদের যেন ভালো হয়। কখন চোখে জল চলে আসে তার। তা দেখে বৌ-ঝিরা বলে, একেই বলে নারী জন্ম। জন্মে থেকে শুধুই জ্বালা। তা জ্বলছে বইকি অন্নপূর্ণা। জ্বালাটা যে ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা অবশ্য জানে না অন্নপূর্ণা। তবে এখন ভিতরটা তার জ্বলেপুড়ে খাঁক হয়ে গিয়েছে। তবে এমন হওয়ার কথা ছিল না। জমিদার বাড়ির বৌ হওয়ারও কথা ছিল না। তার দিদি বোনেরা দিব্যি চাষী পরিবারে বৌ হয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে দিব্যি সুখে ঘরকন্না করছে। তার তো ওই রকম একটা সংসার হতে পারত। দিব্যি ছায়া ঘেরা খড়ের চালের মাটির বাড়ি। তকতকে করে গোবর নিকানো উঠোনের এক কোনে তুলসী মঞ্চ। দুটো বলদ, বাছুর সহ একটি গাই। কয়েকটা ছাগল , হাস মুরগী। কিছুটা দুরেই ধানী জমি। এই ছিল তার কুমারী জীবনের স্বপ্ন।  স্বপ্নেও ভাবেনি ভগ্নপ্রায় জমিদার বাড়ির দরদালানে একদিন নববধু হিসাবে পা রাখতে হবে তাকে। যেখানে খাপ খাওয়াতেই গড়িয়ে যাবে কয়েকটা বছর। ওইসব কথা ভাবতে ভাবতেই হুড়মুড়িয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় অতীত।রূপ কারও কাছে আর্শিবাদ, আবার কারও কাছে অভিশাপ হয়ে উঠে বলে শুনেছে অন্নপূর্ণা। কিন্তু তার কাছে সেটা যে কি তা অবশ্য সে আজও বুঝে উঠতে পারে নি।


                             তিন বোনের মেজ সে। অন্য দুই বোনের থেকে দেখতে শুনতে অনেকটাই ভালো। যেমন গড়ন, তেমনই যেন দুধে আলতায় গোলা রঙ। যে দেখতে সেই বলত, যার ঘরে যাবে তার ঘর আলো করবে। কেমন লক্ষী প্রতিমার মতো গড়ন। মেয়ের প্রশংসায় বাবা-মায়ের মনে চাপা গর্ব হলেও এক লহমায় তা গ্রাস করে নিত একরাশ দুশ্চিন্তা। তাদের মতো পরিবারে লক্ষীশ্রীর কিই বা দাম আছে। সেই তো ধানসিদ্ধ, মুড়িভাজা নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারেই মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। দুদিনেই মেয়ের সোনার বরণ কালী হয়ে যাবে। রাখহরি -- পূর্ণিমা মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেন , এই মেয়েটার একটা ভালো ঘরে গতি করে দাও ঠাকুর। ভগবান বোধহয় সেদিন অলক্ষ্যে হেসেছিলেন , নাহলে কি এই হয়? সুন্দরী মেয়ের জন্য যে ধানসিদ্ধ , মুড়িভাজার যে কাজকে বাবা --মা খাটো করে দেখেছিলেন আজ সেই কাজই তাকে কেউ দিতে চাইনা। সব কথা আজ মনে পড়ে যাচ্ছে অন্নপূর্ণার। বাবা--মা আর তিন বোনকে নিয়ে ছিল তাদের সংসার। পাশের গ্রামের  জমিদার ভবতারণবাবুদের জমি চাষ করে কোনরকমে তাদের চলে যেত। অভাবের সংসারে বাবা তাদের লেখাপড়ার ব্যাপারে কোন রকম আপোস করেনি। রীতিমতো প্রাইভেট মাস্টার রেখে পড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনবোনই পাশের গ্রামের বড় ইস্কুলে পড়ত। তারই মধ্যে গ্রামেরই চাষী পরিবারের একটি ছেলের সঙ্গে দিদির বিয়ে প্রায় ফাইন্যাল।পঞ্জিকা দেখে দিনক্ষণ ঠিক করলেই হয়। কিন্তু হঠাৎ যেন বিনা মেঘে 
বজ্রপাত। থেমে যায় বিয়ের প্রস্তুতি।


                               দিদির বিয়ের জন্য সেবারে জমিদারের খাজনা দিতে পারেনি বাবা। সেই খাজনা আদায়ের জন্য গোমস্তাকে নিয়ে সটান জমিদারবাবু তাদের বাড়িতে হাজির। বাবা তার সামনে হাত কচলাতে কচলাতে বলেন, বাবু মেয়েটার বিয়ে নিয়ে খুব আতান্তরে পড়েছি। নাহলে খাজনা বাকি পড়ত না। এবারটা আমাকে সময় দিন।  আগামীবার একসঙ্গে দিয়ে দেব। বেশ তবে তাই দিও -- বলে জমিদারবাবু চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই দু'গ্লাস ঘোলের সরবত নিয়ে হাজির হয় অন্নপূর্ণা। তার হাত থেকনএকগ্লাস সরবত নিয়ে জমিদারবাবু বলেন, ঘোলের সরবত আমার খুউব প্রিয়। তা রাখহরি তোমার এই মেয়েরই বুঝি বিয়ে? বাহ ,  বেশ দেখতে মেয়েটি তো তোমার। তারপর কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকেন। বাবা ববলেন , না কর্তা ও তো আমার মেজমেয়ে অন্নপূর্ণা। বিয়ে তো বড় মেয়ে প্রতিমার। আমার তিন মেয়ে, ছোট---। বাবাকে আর কথা শেষ করতে দেন না জমিদার বাবু। বলেন, তাহলে তো আমাকে আর একবার বসতে হয়। তারপর কারো কিছু বলার অপেক্ষা না করেই মোড়ায় বসে পড়েন তিনি। গোমস্তাকে বলেন, তুমি যাও দিকিনি গ্রামে কার কত বাকি আছে একটু তাগাদা করে এসো। আমি ততক্ষণে আর গ্লাস সরবত খাই। নাগাড়ে কথাগুলি বলে জমিদারবাবু তার দিকে ফেরেন, কই গো মা অন্নপূর্ণা তুমি নিজে হাতে আর একগ্লাস ঘোলের সরবত করে আনো তো। দেখি কেমন তুমি পারো। সরবত নিয়ে ফিরতেই গ্লাস হাতে নিয়ে জমিদারবাবু বলেন, তুমিও একটু বোস মা। আগে তোমার বাবার সংগে কথা বলে নিই, তা বলো রাখহরি। তোমার কি মত শুনি ? বাবা বলে , কর্তা আপনি যা বলছেন তা তো আমাদের কাছে স্বপ্নের অতীত।আপনার ছেলের সংগে আমার মেয়ের বিয়ে মানে তো আকাশের চাঁদ পাওয়ার সামিল।কিন্তু জানেনই তো কর্তা ----।


                                 বাবার কথা শেষ হয় না। জমিদারবাবু বলে ওঠেন, ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে। মাকে আমিই সাজিয়ে নিয়ে যাব। তুমি কেবল নিয়ম রক্ষার্থে শাঁখা সিঁদুরটুকু দিও তাহলেই হবে। অবাক হয়ে যায় অন্নপূর্ণা । কার বিয়ে ? তাহলে কি জমিদারবাবু তার ছেলের সংগে দিদির বিয়ে দেবেন। গ্রামে হবে না দিদির বিয়ে ? সে এক হিসাবে ভালোই হবে। দিদি জমিদারবাড়ির বৌ হলে গ্রামের লোকেদের কাছে তাদের ওজন অনেক বেড়ে যাবে। কেউ আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে পারবে না। তারাও কেমন জমিদার বাড়ি বেড়াতে যেতে পারবে। উত্তেজনায় যেন ফুঁটতে থাকে সে। আর জমিদারবাবুর কথায় বাবা যেন কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। কোনরকমে  বলতে পারে , সে কর্তা আপনি যেমনটি বলবেন, তেমনটিই হবে। 
----- তাহলে তুমি একবার তোমার স্ত্রীর সংগে আলোচনাটা সেরেই এসো। আমি একেবারে আর্শিবাদের দিনক্ষণ ঠিক করেই যাব।
----- ও, মেয়েমানুষ কি আর বলবে কর্তা। তাছাড়া আপনারা হলেন আমাদের অন্নদাতা। আপনাদের কথা কি আমরা ফেলতে পারি ?
----- তাহলেও সে তো মেয়ের মা। তারও মতামত নেওয়া দরকার।
----- বেশ কর্তা আমি তাহলে কথা বলে এক ফাঁকে আপনাকে জানিয়ে আসব। ------ তাই কোর।
অন্নপূর্ণা ভাবে, দিদির কি ভাগ্য। একেবারে রাজরানী হয়ে যাবে।কিন্তু জমিদারবাবুর কথায় ভুল ভাঙে তার।  জমিদারবাবু তার দিকে ফিরে বলেন -- কিগো মা,  তুমি যাবে তো মা আমার ঘরে ?
শুনে লজ্জায় লাল হয়ে যায় তার মুখ। কি শুনছে সে ! দেখে জমিদারবাবু বলেছিলেন , বুঝেছি বুঝেছি। আর বলতে হবে না মা। সব যেন আজ ছবির মতো চোখের সামনে ভাসছে। জমিদারববাবু চলে যেতেই মায়ের সংগে সলা-পরামর্শ শুরু করে বাবা। প্রথম দিকে কিছুটা দোটানায় ছিলেন পূর্ণিমা। বাবাকে বলেছিলেন, হ্যাগো বিয়ে সাদি সমানে সমানে হওয়াটাই ভালো। কাঁধে কাঁধ না মিললে যে  দেঁড়ে টেনে হাফিয়ে মরতে হবে। তাছাড়া প্রতিমার বিয়েও ফাইন্যাল হয়ে আছে। দুটো বিয়ে সামাল দেবে কি করে ? বাবা তখন জমিদার বাড়িতে মেয়েকে পাত্রস্থ করার জন্য মরীয়া। এককথায় মায়ের সব আপত্তি নাকোচ করে দেন। বেশ জোরের সঙ্গে বলেন, কিসে আমরা কম? ওদের টাকা পয়সা আছে , আমাদের মেয়ের রূপ-গুণ  আছে। আর তা অন্যদের থেকে যথেষ্ট বেশি  আছে বলেই না জমিদারবাবু যেচে প্রস্তাব দিয়েছেন। বাবার যুক্তির কাছে পিছু হঠতে হয় মাকে ।অন্নপূর্ণা কিন্তু বাবার কথার সঙ্গে নিজেকে কিছুতেই মেলাতে পারে।রূপের কথা যদনমেনেও নেওয়া হয়, তাহলে ওই তো সেলাই ফোড়াই আর এইট পাশের বিদ্যাকে কেউ গুণ বলে না। আর তার থেকে ঢের সুন্দরী অনেক আছে। জমিদারবাবুর কি দেখে যে তাকে পছন্দ হলো ভেবে পায় না অন্নপূর্ণা।


                       তবে কথাটা শোনার পর থেকে তারও তো অবচেতন মনে কখন যেন নিজেকে জমিদারবাড়ির বৌ হিসাবে দেখার ইচ্ছে বাসা বেঁধেছিল বইকি। তবে মা  কিছুটা মিনমিন করে কেবল বলতে পেরেছিলেন --- কিন্তু প্রতিমার বিয়েটা ? বাবা বলেছিলেন, প্রয়োজনে প্রতিমার বিয়েটা একবছর পিছিয়ে দেব। তাতে ওরা একবছর অপেক্ষা করতে  রাজী থাকে ভালো। নাহলে ফের অন্য জায়গায় সমন্ধ দেখব। ওই রকম পাত্র অনেক মিলবে।কিন্তু জমিদারবাড়ির সমন্ধ আর আসবে ? তাছাড়া ওদের জমি চাষ করে , বলতে গেলে ওদের দয়ায় আমরা খেয়ে পড়ে বেঁচে আছি। বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে অপমানিত হয়ে ওরা যদি জমিজমা কেড়ে নেয় তখন কি হবে ভেবে দেখেছ। সত্যিই ভাবনার কথা।জমিদারবাবুদের জমিই যে তাদের খাওয়া পড়ার একমাত্র সংস্থান। তাছাড়া প্রস্তাব ফেরালে যদি বকেয়া 
খাজনার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন তাহলে তো প্রতিমার বিয়েটাও আটকে যাবে। তাই মা'ও শেষ পর্যন্ত সায় দেন বাবার কথায়। বলেন , তবে তাই কর। মুহুর্তের মধ্যে দাবানলের মতো সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে খবরটা। আর ছাইয়ের মতো হাওয়ায় উড়ে আসে নানা ব্যঙ্গ  বিদ্রুপ। 


               পাঁচুপিসি বলে -- বলি ও রাধার মা শুনেছো খবরটা। রাখার বাড়িতেই  এবার জমিদারের কাছারি হবে গো। খাজনা দিতে আর জমিদারবাড়ি যেতে হবে না। কেউ বা বলে, রাখার বৌ পুনোর তো আর গরমে মাটিতে পা পড়বে না গো। জমিদার মেয়ের রূপ দেখে ঘরের বৌ করে নিয়ে যাছে, মায়ের গরম তো হবেই । তবে জানি তো জমিদারদের ওই রকম বৌ এক -- আধটা নয় গো,  গন্ডা-- গন্ডা থাকে। শখ মিটে গেলেই সব ছুড়ে ফেলে দেয়। গ্রামের মাইক হিসাবে পরিচিত রুনু মোল্লান। হাড়ির খবর চালাচালি না করলে তার নাকি পেটের ভাত হজম হয়না। সেও ছড়া কেটে বলে সেই গো কথায় বলে না, বড়োলোকের বড়কথা ইলসে মাছের কুটি / কখনও আদরে ছেঁড়ে চাদর, কখনও ধুলোয় লুটোপুটি ।কেউ বলে তলায় তলায় অন্য ধান্ধা আছে কিনা দেখো গে।পুনোর বৌ'টারও ছিরিছাঁদ খারাপ নয়।জমিদারের খেয়াল বলে কথা।পুনোর বৌ'য়ের রূপে মজেই ওই সমন্ধ করছে কিনা কে বলতে পারে ?   পথ -ঘাট , মাঠ কোথাও কান পাততে পারে না অন্নপূর্ণারা। যেন খুব বড়ো একটা গর্হিত কাজ করে ফেলেছে ওরা।আসলে জমিদার বাড়িতে তার বিয়েটাকে কেউই মন থেকে নিতে পারে না।  বাবাও  মাকে সেই কথাই বলে , সব হিংসায় জ্বলে-পুড়ে মরছে বুঝলে। সবাই ভাবছে, আমাদের বাড়িতে মেয়ে থাকতে জমিদার কেন বেছে বেছে রাখার বিটিকেই বউ করে নিয়ে যাবে। আরে অত যদি গায়ের জ্বালা তা কথাটা জমিদারকে গিয়েই বল না। আমাদের হুল ফোটাচ্ছিস কেন বাপু। 


                      
                             গ্রামবাসীদের গায়ে জ্বালা ধরার কারণটা আন্দাজ করে অন্নপূর্ণাও। তাই তাদের টিকাটিপ্পনী গায়ে মাখে না সে। বরং হেসে ঠাট্টার ছলে জবাব দিতে ছাড়ে না সেও। তার  কষ্টটা অন্য জায়গায়। কষ্টটা আজও তার বুকে কাঁটার মতো বিধে আছে। কতই বা তখন বয়েস তাদের ?  দিদি টেনের  ছাত্রী। সে পড়ে নাইনে আর ভগবতী এইটে। পিঠোপিঠি তিন বোনে পুকুর ঘাটে সাঁতার কাটত, স্কুলে যেত। এক টিফিনের কৌটো থেকে মুড়ি খেত। একটা হ্যারিকেনেই গোল হয়ে বসে পড়ত তিনজনে। ভগবতী চিৎকার করে পড়ত বলে দিদির খুব অসুবিধা হত। দিদি এত বলত তবু ভগবতীর নাকি চেঁচিয়ে না পড়লে পড়া মুখস্থ হত না। তাই দিদিকে মানিয়ে নিত হত। কারণ তাদের বাড়িতে তো একটাই হ্যারিকেন ছিল। দিদির ওই মানিয়ে নেওয়া স্বভাবটাই তারও অস্বস্তির কারণ। কথাটা মনে পড়লে আজও নিজেকে অপরাধী মনে হয় তার। তিন বোনে এতদিন খাওয়া -শোওয়া সব একসংগেই করেছে এতদিন। কিন্তু জমিদার বাড়িতে তার বিয়ের প্রস্তাবের পরই কোথাই যেন একটা সুক্ষ্ম চিড় সৃষ্টি হয়। কারণ বাবা তার বিয়ের জন্য দিদির বিয়েটা একবছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য তার হবু শ্বশুরবাড়িতে কথা বলতে গিয়েছিলেন। তারা নাকি বাবাকে অপমান করে বিয়েটাই ভেঙ্গে  দিয়েছে। ছেলের বাবা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জমিদারের ছেলেটাই বুঝি ছেলে। আর তার ছেলে কিছু নয় ? জমিদারের ছেলের বিয়ের জন্য আগে থেকে ঠিক করে রাখা বিয়ে যারা পিছিয়ে দিতে পারে তাদের বাড়িতে আর বিয়েই নয়। ওই দিনেই অন্য জায়গায় ছেলে বিয়ে দিয়ে তবে ছাড়ব।বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার খবরটা দিদির কানেও যায়। তারপর থেকেই দিদিটা কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যায়।



                       এমনিতেই চাপা স্বভাবের দিদিকে দেখে কিছু বোঝার উপায় ছিল না। দিব্যি তার বিয়ে নিয়ে হাসি ঠাট্টায় মাতিয়ে রাখত। কিন্তু সেই হাসির ঠাট্টার আড়ালে কত যে যন্ত্রণা লুকিয়েছিল তা কেবল সেই টের পেত। কতদিন রাতে ঘুম ভেঙে দেখেছে দিদি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে দিদিকে কোন সান্ত্বনাও দিতে পারে নি।কারণ পাশের ঘরেই বাবা মা থাকতেন। তারা যদি জেনে যান সবকিছু, তাহলে চরম দোটানায় পড়বেন। তাছাড়া সে কিই"বা সান্ত্বনা দেবে ? তার জন্যই তো দিদির এই অবস্থা।কিন্তু দিদির যন্ত্রনাটা সে উপলব্ধি করে। বড় বোনের আগে ছোট বোনের বিয়ে হলে বড়বোনের মনে এক ধরণের হীনমন্যতা বোধ কুড়ে কুড়ে খাই। প্রতিবেশীরাই সেটা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আরও বাড়িয়ে দেয়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় না। তাদেরকে শুনিয়েই শুনিয়েই প্রতিবেশীরা হাওয়ায় কথা ছুড়ে দেয়। তার মধ্যে মাইক কাকীর গলাটা বেশি শোনা যায়। সে বলে ,বলি ও শান্তর মা ব্যাপারটা শুনেছো ? রাখার বড় মেয়েটার নাকি বিয়ে ভেঙে গিয়েছে গো। তার বদলে মেজটার নাকি জমিদারের ছেলের সংগে বিয়ে হচ্ছে। এরপর আর বড়টার ভালো ঘরে বিয়ে হবে ? সবাই তো খুঁতে বলবে। নাহলে বড় থাকতে ছোটর কেউ বিয়ে দেয় ? শান্তর মাও গলার স্বর উঁচুতে তুলে বলে, তা যা বলেছো কাকী। খুঁত যে নেই তারই বা ঠিক কি আছে ? নাহলে কি এক কথায় কেউ একবছর আগে থেকে ঠিক করে রাখা বিয়ে ভেঙে দেয় ? কথাগুলো দিদির কানেও যায়। প্রতিবেশীদের কথার হুল তাকে অহরহ মনে পড়িয়ে দেয় তার অযোগ্যতার কথা। কিন্তু সেসব ছাপিয়েও অন্য এক যন্ত্রনায় ভিজে যায়  দিদির চোখ।


         ( ক্রমশ )


No comments:

Post a Comment