Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুনমা - ২




          ঠাকরুনমা 

                         

               

           অর্ঘ্য ঘোষ


             ( দ্বিতীয়  কিস্তি ) 


প্রতিবেশীদের কথার হুল তাকে মনে পড়িয়ে দেয় তার অযোগ্যতার কথা। কিন্তু সেসব ছাপিয়েও অন্য এক যন্ত্রনায় ভিজে যায় দিদির দুচোখ। সেটা অন্নপূর্ণার চোখ এড়ায় না। দিদির কষ্টটা কোথাই তা সে অনুভব করে। আসলে তাপসদার সঙ্গে  দিদির বিয়ে ঠিক হওয়ার পর ঘনিষ্ঠতা গড়ে না উঠলেও কিছুটা কাছাকাছি তো দুজনে হয়েছিল। পথ ঘাটে দেখা হলে কথাবার্তা হত দুজনের। ওই বয়সে আর পাঁচটা মেয়ের মতোই দিদিও তাপসদাকে ঘিরে রঙিন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। তাই স্বপ্নটা ভেঙ্গে  যাওয়ায় দিদিও মনে মনে বেশ ভেঙ্গে পড়ে।  একদিন স্নান করতে গিয়ে পুকুরঘাটে দিদিকে একা পেয়ে ধরেছিল অন্নপূর্ণা। বলেছিল , দিদি তোর কষ্টটা আমি বুঝি। আমি কিছুতেই এই বিয়ে করব না। আজই বাবাকে বলব। আর যদি করতেই হয় আগে তোর বিয়ে হবে তারপর। তাপসদার বাড়ির লোকেরা তো ঠিক কথাই বলেছে। আগে থেকে ঠিক করে রাখা বিয়ে আর এক মেয়ের বিয়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়া কোন পাত্রপক্ষই মানবে না।সব শুনে দিদি চোখ পাকিয়ে বলেছিল, তোমাকে পাকা বুড়ির মতো এনিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। তাছাড়া ওই বাড়িতে আমি আর বিয়েই করব না। যারা একটা বছর অপেক্ষা করতে পারে না , তারা সারাজীবন আমাকে বইবে কেমন করে ?
----- কিন্তু তুই যে ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট পাচ্ছিস দিদি। আমি যে তা সইতে পারছি না।
------ তুই সব জেনে বসে আছিস। কে বলল আমি কষ্ট পাচ্ছি ? আমার বোনটা জমিদারবাড়ির বৌ হবে তার থেকে বড়ো আনন্দ আর কি হতে পারে বল। তখন না হয় আমার একটা ভালোঘর দেখে বিয়ে দিয়ে দিবি। কিরে দিবি তো ? 



                       আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না অন্নপূর্ণা। দিদিকে জড়িয়ে ধরে পুকুর ঘাটেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। কান্না ধরে রাখতে পারে না দিদিও। কতক্ষণ যে তারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল তার ঠিক নেই। দুই বোনের আলিঙ্গন দৃশ্যের স্বাক্ষী হয়েছিল কেবল সান বাঁধানো নির্জন পুকুর ঘাট।  সম্বিত ফিরেছিল জল পিপি পাখির ডাকে। দুই বোনকে রাঙিয়ে দিয়েছিল গোধুলি বেলার ডুবু ডুবুু সূর্যের এক অন্য রকম আলো। ফেরার আগে বোনের হাতটা মাথায় তুলে ভগবতী সেদিন বলেছিল, আমার মাথা ছুঁয়ে কথা দে তুই কাউকে কিচ্ছুটি বলবি না। জমিদারবাড়ির বৌ হওয়া ক"জনের  ভাগ্যে জোটে রে। তারপর আমাদের বাড়ির অবস্থা তো জানিস। আমাদের তিন বোনকে পার করা নিয়ে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। সেখানে অতবড়ো ঘরে নিখর্চায় তোর বিয়ে হচ্ছে। ভাব তো বাবা মায়ের কতটা চাপ কমে যাচ্ছে। অন্নপূর্ণা সব বোঝে। তাদের মতো ঘরে মেয়ে মানেই তো বোঝা। কিন্তু দিদির মনের ভাবটাও সে বোঝে। আসলে বোনের ভালো ঘরে বিয়ের সুযোগটাকে সে কিছুতেই হাতছাড়া হতে দিতে চায় না। তারপর একদিন আর্শিবাদ হয়ে যায় অন্নপূর্ণার। সোনার হার দিয়ে আর্শিবাদ করে যান জমিদারবাবু। মাস খানেকের মাথায় বিয়ের দিনও ঠিক হয়। দিদি হাসি মুখে কোমর বেধে বিয়ের সমস্ত কাজ করতে শুরু করে। অন্নপূর্ণা বোঝে দিদি আসলে হাসি দিয়ে কান্না লুকোতে চাইছে। বিয়ের পর তার যদি সেই সুযোগ থাকে তাহলে দিদির একটা ভালো ঘরে বিয়ের ব্যবস্থা করবে সে। 



                            যথাসময়ে জমিদারবাবুর ছোট ছেলে সায়ন্তনের সংগে বিয়ে হয়ে যায় অন্নপূর্ণার।  যাবতীয় স্ত্রী আচার শেষ করে বোনর হাত ধরে পাল্কিতে তুলে দেয় ভববতী। দুজনের চোখেই তখন জল। দিদি সেদিন সায়ন্তনকে বলেছিল , ছোট থেকেই আমরা তিন বোন একসংগে আছি। এই প্রথম ও বাড়ির বাইরে পা রাখল। ওকে তুমি যেন সুখে রেখো। লজ্জায় লোকজনের সামনে সায়ন্তন সেদিন অবশ্য কোন কথা বলতে পারে নি। কিন্তু অন্নপূর্ণার মনে হয়েছিল , দিদি নিজের সুখের পথে কাঁটা দিয়ে তার জন্য সুখের দরজা খুলে দিল। হাসির আড়ালে চাপা পড়ে গেল বোবা কান্না। মেয়েরা তো এরকমই হয়। প্রিয়জনের জন্য নিজেকে বলি দিতে বোধ হয় মেয়েরাই পারে। আসার সময় সারা রাস্তা সে দিদির কথা ভাবতে ভাবতেই আসে। শ্বশুরবাড়িতে পা রাখার পর হাজার ব্যস্ততার মাঝেও মন থেকে দিদির ভাবনা যায় না। কিন্তু বিয়ে, বৌভাতের জন্য তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয় সেই ভাবনা। কারণ পড়তি অবস্থা হলে কি হবে, আয়োজনের কোন ত্রুটি রাখেন নি শ্বশুরমশাই। বসানো হয়েছিল রসুন চৌকির বাজনা। চন্দননগর থেকে এসেছিল আলো। আর লাভপুরের পূর্ণা থেকে বাজিকররা এনেছিলেন রকমারি সব বাজিপটকা। খাওয়া- দাওয়ারও ছিল এলাহি আয়োজন। অন্নপূর্না আশা করেছিল বৌভাতে দিদিও আসবে। কিন্তু কয়েকজন আত্মীয় আর বোনকে নিয়ে এসেছিলেন কেবল বাবা। 


                          না এলেই বোধ হয় ভালো ছিল। অন্নপূর্না লক্ষ্য করছিল জমিদার বাড়ির চড়া আভিজাত্যের আলোয় বাবাদের কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে দেখাচ্ছিল। নিমন্ত্রিতদের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া দুরের কথা, ভালো করে কেউ তাদের সংগে কথা পর্যন্ত বলে নি। তবু বোকার মতো মুখে হাসি ঝুলিয়ে আধো অন্ধকারে বাবারা একাকী কয়েকটা চেয়ারে বসেছিলেন। চোখ ফেটে জল আসছিল তার। মনে হচ্ছিল ছুটে বাবাদের কাছে চলে যায়। কিন্তু শাশুড়ি তাকে সিংহাসনে বসিয়ে দিয়ে বলে গিয়েছেন, মনে রেখ এটা জমিদার বাড়ি। জমিদারবাড়িননিজস্ব একটা আদব কায়দা রয়েছে। এখানে চাপা হাসি, আর মাপা কথা বলাটাই দস্তুর। নিমন্ত্রিতরা সব বিদায় না হওয়া পর্যন্ত উঠবে না। আজ এতদিন পরেও সব মনে আছে অন্নপূর্ণার। সেদিন তাকে নববধুর সাজে দেখে কতজন কত প্রশংসা সূচক কথা বলছিল, উপহার দিচ্ছিল, কিন্তু সেদিকে তার মন ছিল না। নিজেকে কেমন যেন জল ছাড়া মাছের মতো মনে হচ্ছিল। অনেক রাতে নিমন্ত্রিতদের খাওয়া দাওয়ার পর বাবাদের সংগেই খেতে বসে অন্নপূর্ণাও। ৫ কিমি দূরে তাদের বাড়ি।  বাবারা এসেছেন সাইকেলে।  রাতেই ফিরে যাবে সবাই। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাদের রাতে থাকার জন্য একবার  বলেও নি। অন্নপূর্ণার মনে হয় বাপের বাড়ির সংগে তার বোধ হয় সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। যাওয়ার আগে একবার বাবার সংগে একান্তে দেখা হয়।প্রনাম করতেই বাবা মাথায় হাত রেখে বলেন, সুখী হও মা। বাবাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। কিছুটা দূর থেকেই শাশুড়ি মায়ের গলা শোনা যায়, বৌমা রাত্রি হয়েছে। ওনাদের তো যেতে হবে। এবার ওনাদের ছেড়ে দাও। বাবারা চলে যেতেই এক নিঃসীম শুন্যতা গ্রাস করে নেয় তাকে।



                        বিয়ের পাট চুকতেই সেই শুন্যতা আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। রঙ চটে যাওয়া জমিদার বাড়ির দরদালানে ভেঙে পড়েছে খিলান। শেওলা ধরা দেওয়ালে একটা সোঁদা সোঁদা গন্ধ। সর্বত্র কেমন যেন একটা নি:প্রান ভাব। তার মধ্যে একপাল পায়রা বকম বকম করে প্রানের সঞ্চার ঘটায়। ওদের সংগেই সখ্যতা গড়ে ওঠে তার। অবচেতন মনে ফিরে আসে গ্রামের পুকুরে ডুব সাঁতার,  মাঠে ছোলা কলাই তোলা, আখ মাড়াই কলে আখ কিম্বা গরম গুড় খাওয়া, ভাদ্র মাসের ভোরে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে তাল কুড়ানোর কথা। আর কি কোনদিন তার গ্রামে ফিরে যাওয়া হবে না ? তার আশংকাটাই যেন সত্যি হয়। কয়েকদিন পরেই শ্বশুরমশাইয়ের সামনে কথাটা বলেই ফেললেন শাশুড়িমা। কোনরকম রাখঢাক না করেই তিনি বললেন, দেখ বৌমা তোমাকে দেখে তোমার শ্বশুরমশাইয়ের ভালো লেগেছিল। তাই তোমাকে আমরা মেনে নিয়েছি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে  তোমাদের গুষ্ঠিশুদ্ধো সবাইকে আমাদের মেনে নিতে হবে।জলে তেলে কোনদিন মেশে নি, আর আজও মিশবে না ।তোমার বাপের বাড়ির লোকজনরা এ বাড়িতে না এলেই ভালো।পরিচয় দিতে আমাদের খুউব অস্বস্তি হয়। তোমারও বাপের বাড়ি ভুলতে হবে। শ্বশুরমশাইও সব শুনলেন। কিন্তু মুখে একটি কথাও বললেন না। তার মানে শ্বাশুড়ি মায়ের কথায় তারও সায় রয়েছে। আর স্বামীকে বলা না বলা সমান। এ বাড়িতে তার মতামতের কোন মুল্যই নেই।  বাবার অন্নে প্রতিপালিত ছেলের বৌ হওয়া যে কি জ্বালা তা হাড়ে হাড়ে টের পায় অন্নপূর্না।


                                               মানুষটা খুব একটা খারাপ নয়।  কিন্তু ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বাড়ির বর্তমান  প্রজন্মের সাধারণত যেসব গুণ থাকার কথা তা পুরোমাত্রায় সায়ন্ত্রনেরও ছিল। পুরোমাত্রায় আয়েশি, উদ্যমহীন, নেশাসক্ত। অন্নপূর্ণার বুঝতে বাকি থাকে না শুধু মাত্র ছেলেকে  বশে আনতেই শ্বশুরমশাই তাকে ঘরের বৌ করে এনেছেন। ওইসব কথা ভাবতে ভাবতেই তার খুউব কান্না পায়। কিন্তু শ্বশুর--শাশুড়ির সামনে কাঁদতেও পারে না। কাঁদার সুযোগ মেলে দ্বিরাগমনে বাপেরবাড়ি গিয়ে। স্বায়ন্তনকে তার বাবা--মা আসতে দেয়নি। পাছে তাদেরই প্রজার বাড়িতে গিয়ে জমিদার বাড়ির অহমিকায় ঘা লাগে বলেই তাকে আসতে দেওয়া হয়নি তা বুঝতে বাকি থাকে না অন্নপূর্নার। তাই নিয়ে বিয়ের আগের মতোই আর এক প্রস্ত টিকাটিপ্পনী হজম করতে হয় বাবা মাকে। সব কিছুর জন্য নিজেকেই দায়ি মনে হয় তার। বিশেষ করে দিদির চোখে সে চোখ রাখতে পারে না। দিদিটাও নানান ব্যস্ততার অজুহাতে কেমন যেন পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। অন্নপূর্ণা ভাবে এক হিসাবে দিদির ওই আচরণ তাকে অস্বস্তির হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। বড় মুখ করে বলেছিল, জমিদার বাড়িতে বিয়ের পর তার ভালো ঘরে বিয়ের ব্যবস্থা করবে। সে যে কত বড়ো ভুল ছিল তা এখন বুঝতে পারছে। জমিদার বাড়িতে সে বউঠাকুরণের তকমা পেয়েছে মাত্র। কিন্তু ওইটুকুই। ওই বাড়িতে নিজের ইচ্ছা মতো করার কিছু অধিকারই যে নেই। তাই কেমন যেন আনমনা দেখায় তাকে। সদ্য বিবাহিতা মেয়ের ওই ভাব চোখ এড়ায় না পূর্ণিমার। মেয়েকে একান্তে ডেকে মা জিজ্ঞেস করেন - হ্যারে দ্বিরাগমনে সায়ন্তন এল না কেন ? মায়ের এই প্রশ্নের মুখোমুখি যে তাকে হতে হবে তা জানত সে। 


                                            এ ক্ষেত্রে অন্যান্য মেয়েরা যা করে তাই করার কথা ভেবে রেখেছিল অন্নপূর্ণাও। মেয়ের মুখে একটু হাসি দেখার জন্য  বাবা--মা'রা সর্বশান্ত হয়ে মেয়ের বিয়ে দেন। তাই যাই হোক না কেন, বাবা -- মায়ের মুখে হাসি দেখার জন্য বিয়ের পর প্রথম বাপের বাড়ি গিয়ে মেয়েরাও শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে সাতকাহন করে বলে অন্নপূর্ণাও সেই রকমই গল্প পরিবেশন করতে যাচ্ছিল। কিন্তু মা'ই তাকে তখনকার মতো মিথ্যা বলার হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। জিজ্ঞেস করে ,  খুউব বুঝি কাজের চাপ ?
----- ঠিক ধরেছো। শ্বশুরমশাই তোঁ আর সবদিক সামাল দিতে পারেন না । তাই ওকেই সামাল দিতে হয়। 
 ---- তা ভালো, এই তো কাজের বয়েস। দ্বিরাগমনে আসা হলোনা তো কি হয়েছে। পরে সময় সুযোগ মতো জোড়ে এলেই হবে। সঙ্গে  সঙ্গে শাশুড়ি মায়ের কথা মনে পড়ে যায় অন্নপূর্নার। তাই সঙ্গে  সঙ্গে  সে বলে ওঠে, কি যে বলো না মা তুমি। এখনই আসার সময় পেল না, পরে আবার আসবে তা হলেই হয়েছে।
------ হ্যারে,  তাহলে প্রতিমা ভগবতীর বিয়েতেও কি তোরা আসবি না ?
------ সেটা এখন থেকে কি করে বলি বলোতো? এমনিতেই শ্বশুরমশাই বলেন বৌমা তোমার হাতের ঘোলের সরবত না হলে কিন্তু আমার চলবে না। আর শাশুড়ির আবার আমার সাজা পান না হলে ভাতই হজম হয় না। তাই দুজনেআমাকে কাছ ছাড়া করতে চান না। অভিমানহত গলায় মা বলেন, বুঝেছি বুঝেছি। আর বলতে হবে না। নতুন বাবা--মা পেয়ে আমাদের ভুলে গিয়েছো তো ? 


                 পরক্ষণেই সুর নামিয়ে তার মাথায় চুমু খেয়ে মা বলেন, এমন শ্বশুরবাড়ি ভাগ্য কটা মেয়ের হয় মা। তুমি যেন সারা জীবন শ্বশুরবাড়িতে সবার আদরের ধন হয়ে থেকো ।আর পারছিল না অন্নপূর্না। সুখীর অভিনয় করতে করতে সে হাফিয়ে  উঠেছিল। সেই সময় তাকে যেন স্বস্তি দিতে বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ায় জমিদার বাড়ির পালকি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে অন্নপূর্ণা। বাবা--মা'কে প্রনাম করে পাল্কিতে ওঠার জন্য পা বাড়িতেই সামনে এসে দাঁড়ায় দিদি আর বোন। তাদের দুজনের চোখ তখন ঠলো ঠলো। পাল্কি ছাড়ার আগে একটি প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলে , যোগলকুন্ডুর বাগানের গোলাপ জাম আর খেজুর  আছে। তুই খুউব ভালোবাসতিস। তাই আমরা ভোরবেলায় উঠে কুড়িয়ে এনেছি। পরে বাবার হাত দিয়ে করমচা আর কামরাঙ্গাও পাঠাব। নুন-লংকা গুঁড়ো মেখে খাবি, দেখবি খুউব ভালো লাগবে। তাদের কথা শেষ হয় না।  দুচোখে বৃষ্টি নামে অন্নপূর্ণার। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে তিন বোন।কাঁদতে কাঁদতেই অন্নপূর্ণার মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। তিনবোন ভোরে উঠে আম, জাম কুড়িয়ে আনত। কত সব জাম রয়েছে যোগলকূন্ডুর বাগানে। খুদি, কাদা আর গোলাপজাম। স্বাদও বিচিত্র। গোলাপ জামে কেমন যেন গোলাপের মতো গন্ধ। কুড়িয়ে এনে নুনজলে ভিজিয়ে রাখত সেইসব জাম। ঘুরত--ফিরত আর টপাটপ মুখে পুড়ত। 



                           জামায় দাগ লেগে যেত বলে মা খুউব বকাবকি করত। কিন্তু তারা কানেই তুলত না। মা তত রেগে যেত। কখনও কখনও চেলাকাঠ নিয়ে তেড়ে আসত। তারা ছুটে ছুটে পালাত। তাদের ধরতে না পেরে মা যখন রাগে চোখ মুখ লাল করে ফেলত তখন বাবা মুচকে মুচকে হাসত। মা যেত আরও ক্ষেপে। বাবা তখন তাদের পক্ষ নিয়ে বলত,  থাক না পূর্ণিমা। ওদের বকাবকি করছ কেন, আমরা কি কখনও ওদের ফলমুল কিছু কিনে খাওয়াতে পারি। ওরাই বরং কুড়িয়ে আনে বলে আমরা তালের সময় তাল, আমের সময় আমটা খেতে পায়।  বাবার কথায় তখনকার মত ক্ষান্ত দিত মা। কেবল কপট রাগ দেখিয়ে বলত, তোমার আশকারা পেয়েই ওরা দিন দিন ধিঙ্গী হচ্ছে  আর মাথায় উঠছে। বাবার মুখে তখন কেমন নির্ভেজাল হাসি লেগে থাকত।  স্বাচ্ছল্য ছিল না , কিন্তু দুখের অন্ন সুখের করে খাওয়ার মন ছিল।  ভাদ্র আশ্বিন মাস চরম টানের সময় যেত তাদের। মুড়ি দুরের কথা সবদিন ভাতের চালও জুটত না। ওরা তিনবোন কুড়ানো তাল অবস্থাপন্নদের বাড়িতে দিয়ে আঁচলে করে মুড়ি নিয়ে ফিরত। তারপর ঝুড়ির নিচে থালা রেখে  তাল ঘসতে বসত। ভগবতীর একটুও ধৈর্য্য ছিলনা। সে একটু করে তাল ঘসত ঝুড়ি তুলে তুলে মুখে পুরত। দিদি আর সে ওকে পেটুক বলে খ্যাপাত। মা বলতেন, থাক না বাপু ও তো ছোট খিদে সহ্য করতে পারে না।  ওর পিছনে লাগছিস কেন ?  তালঘষা হয়ে গেলে সবাই গোল হয়ে বসত। বদলে আনা মুড়ি আর তালের মারি তারিয়ে তারিয়ে খেত। খাওয়া শেষে বাবা পরিতৃপ্তির ঢেকুর তুলতেন। মনে হত যেন পোলাও -- বিরিয়ানি খেয়েছেন। আসলে বাবা ওরকমই। সারা বছর অভাবের সংগে লড়াই করে ক্ষতবিক্ষত হয়েও কাউকে বুঝতে দিতেন না নিজের ক্ষত। 



জমিদারের যৎসামান্য জমি চাষ করেই তাদের সংসার চলে। জমি চাষ করার জন্য খোরাকি বাবদ যা ধান মেলে তা আষাঢ় -- শ্রাবণ মাসেই শেষ হয়ে যায়। চাষ শেষ দেড়গুণ ফেরত দেওয়ার শর্তে তখন আবার ধান দেড়ে নিতে হয়। ফসল তোলার পর জমিদারের পাওনা , দেড়েদের পাওনা মিটিয়ে দিয়ে বাবাকে ফিরতে হয় প্রায় খালি হাতে।মা যৎসামান্য পারিশ্রমিকের অন্যের  ধান সিদ্ধ করে, মুড়ি ভেজে জোড়াতালি দিয়ে কোন রকমে চালিয়ে নেন। এক মুহুর্তে মেয়েবেলাটা যেন ছবির  মতো স্পষ্ট ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে। পালকিটা দুলে উঠতেই সম্বিৎ ফেরে তার। ক্রমশ গ্রাম ছাড়িয়ে এগিয়ে চলে ছয় বেহারার দল। ঝাপসা হয়ে যায় তাদের বাড়ি, প্রিয়জনদের মুখ। বেহারাদের গানে ছন্দ ফেরে পালকি। কেবল অন্নপূর্ণার জীবনের ছন্দটা কোথাই যেন হারিয়ে যায়। কেবল অন্নপূর্নার জীবনের ছন্দটা কোথাই যেন হারিয়ে যায়। মা ঠিকই বলত বিয়ে সাদী সমানে সমানে হওয়াই ভালো। নিজেকে তার কেমন পুতুল পুতুল লাগে।  মেলা গিয়ে ভালো লাগলে ছেলে মেয়েরা পুতুল কিনে আনে।  তারপর ইচ্ছে হলে খেলে, না  ইচ্ছে হলে  আলমারিতে তুলে রেখে দেয়। নিজেকেও মাঝেমধ্যে জমিদারবাড়ির পুতুল মনে হয়। এমনিতে সব ঠিক আছে। এখন সে নতুন বৌ হিসাবে জমিদারবাড়ির নতুন বৌঠান।



                       কিন্তু ওই সম্বোধনটার মধ্যেও যেন আভিজাত্য লুকিয়ে রয়েছে। বড়োলোকদের বাড়িতেই সাধারণত ওই ধরণের সম্বোধন শোনা যায়।তবু নিজেকে আস্তে আস্তে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করে সে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে কেমন যেন অন্য চোখে দেখে। বিশেষ করে তার দুই জা। এমনিতে কথাবার্তা খুউব একটা হয়না। যেটুকু হয় তার মধ্যেও তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের ভাব। আসলে তারাও সব পড়তি জমিদার বাড়ি থেকে এসেছে।   তাদের বাপের বাড়ি থেকে যখন কেউ আসে তখন তারা কত নামীদামী উপহার আনে। আর তার বাবা আনে জমির লাউ, কুমড়ো, পটল, মুলো। তাই অন্নপূর্ণাকে তারা ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না। তা নিয়ে অবশ্য অন্নপূর্ণার কোন অনুযোগ কিন্বা আক্ষেপ নেই। কিন্তু ওরা যখন তার গরীব বাবার প্রসঙ্গ তুলে খোটা দেয় তখন চোখ ফেটে জল আসে। কিন্তু সবার সামনে কাঁদতেও পারে। অনেক রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে কেঁদে একটু হালকা হয় সে। মনে মনে ভাবে মেয়ে হয়েও জা'রা কি করে আর একটা মেয়ের বাবা তুলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে পারে ? বাবার সম্মান তো সবার কাছেই সমান। শাশুড়িমা যখন কোন বিষয় নিয়ে ওদের বাপের বাড়ি তুলে খোঁটা দেয় তখন তো দিব্যি মুখ কালো হয়ে যায়। তবু কেন যে ওরা তার বাবার সম্পর্কে অপমান সূচক কথা বলে তা বোঝে না সে। বাবার কথা খুউব মনে পড়ে। এত কষ্ট , তবু সব হাসি মুখে হজম করে নেয় বাবা ।কবে আবার বাবার সংগে দেখা হবে কে জানে। খুউব ইচ্ছে করছে বাবাকে দেখতে। দিন কয়েক পরেই অবশ্য মেয়ের বাড়ি আসে রাখহরি। বাবার হাতে বিয়ের কার্ড দেখেই অন্নপূর্ণা আন্দাজ করে বাবা বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে এসেছে। 



                                   সেবারে গিয়েই তো শুনে এসেছিল পাশের গ্রামে একই বাড়িতে দুই ভাইয়ের সঙ্গে দিদি আর বোনের কথা চলছে। তাহলে কি একই সঙ্গে দুজনেরই বিয়ে হচ্ছে ? জানতে খুউব আগ্রহ হচ্ছে তার। কিন্তু সে সুযোগ নেই। বৈঠকখানায় বাইরের লোকের মতো কম্বলে বসে আছে বাবা। শ্বশুর আর শাশুড়িমা বসে রয়েছেন চেয়ারে। আরও চেয়ার খালি থাকা স্বত্বেও বাবাকে তাতে বসতে বলা হয়নি ।এ বাড়ির এটাই রীতি। অর্থকৌলিন্য না থাকলে তাদের নীচু নজরে দেখা হয়। ওইভাবেই বুঝিয়ে দেওয়া হয় পার্থক্য। কিন্তু বাবার সংগে এই আচরণ খুব ব্যাথা দেয় তাকে। তাদের অবস্থা দেখেই তো শ্বশুরমশাই যেচে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেলেন। তাকে বৌমা হিসাবে মানতে পারলে তার বাবাকে মানতে এতো অনীহা কিসের ? বাবা অবশ্য ওসব অপমান গায়েই মাখে না। ওটা যে এক ধরণের অপমান সেই বোধই নেই বাবার। বাবা সত্যিই খুব ভালো মানুষ। ভালো মানুষদেরই কপালেই যে কষ্ট লেখেন ভগবান। দূর থেকেই  অন্নপূর্ণা দেখতে পায় বাবা অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে  শ্বশুরমশাইয়ের টেবিলের সামনে বিয়ের কার্ডটা নামিয়ে রাখে। বিয়ের নিমন্ত্রণ নয়, বেয়াইও নয়।  যেন কোন অনুগত প্রজা খাজনা দিচ্ছে। শ্বশুরমশাই ফিরেও কার্ডটা দেখলেন না। বাবা হেসে কিছু যেন বলার চেষ্টা করছিলেন। দুর থেকে কিছু শুনতে পাচ্ছিল না সে। মাঝপথেই তাকে থামিয়ে দেন শ্বাশুড়ি মা। তখন বাবার হাসিটা বড়ো করুন দেখাচ্ছিল। মেয়ের সুখের জন্য বাবারাই তো পারে সমস্ত যন্ত্রনা ভুলে এমন হাসি হাসতে।


          ( ক্রমশ )


No comments:

Post a Comment