Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুনমা-৩

\

        ঠাকরুনমা

                     

    

      অর্ঘ্য ঘোষ


        (  তৃতীয়  কিস্তি  )


তখন বাবার হাসিটা খুউব করুণ দেখাচ্ছিল। মেয়ের সুখের জন্য বাবারাই তো সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে এমন হাসি হাসতে পারে ।শাশুড়িমায়ের কথা শুনে বাবাকে কিছুটা হতাশ দেখাচ্ছিল। তাই বাবার সঙ্গে শাশুড়িমায়ের কি কথা হচ্ছে জানতে খুউব কৌতুহল হয় তার। সে বৈঠকখানাঘরের কিছুটা কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে শাশুড়িমায়ের গলা।
--- ছোটবৌমা তো সন্তান সম্ভবা।  আমাদের পরিবারের নিয়ম হল প্রথম বার অন্তঃস্বত্ত্বা অবস্থায়  কোথাও যেতে নেই। তাই আপনার দুই মেয়ের বিয়েতে ওকে তো পাঠাতে পারব না। তবে যৌতুক নিয়ে আমাদের গোমস্তা যাবে। লৌকিকতা বলেও তো একটা কথা আছে।এই আশংকাটাই মনে মনে করছিল অন্নপূর্ণা ।বিয়েতে তাকে হয়তো যেতে দেওয়া হবে না। সেটাই সত্যি হল।তবে পারিবারিক নিয়মের কথা বলে তাকে অনেকখানিই অস্বস্তির হাত থেকে  বাঁচিয়ে দিয়েছেন শাশুড়িমা। বাবার মনটা অন্তত বুঝবে। আত্মীয়-- স্বজন, পাড়া --প্রতিবেশীদের কাছে অন্তত তার না যাওয়ার একটা ব্যাখ্যা দিতে পারবে। অন্তঃস্বত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি সত্যি হলেও , নিয়মটা শুধু তাকে আটকে রাখার জন্যই অজুহাত হিসাবে খাড়া করা হল কিনা তা নিয়ে অবশ্য সন্দেহ রয়েছে তার মনে। 


                      শ্বশুর-শাশুড়িমা বেরিয়ে যেতেই চা নিয়ে ঘরে ঢোকে সে। বাবা তাকে দেখে উচ্ছস্বিত হয়ে ওঠে। বিয়ের যোগাড়পাতি কতদুর কি হয়েছে খোজ নেয় সে। বাবা জানায়, গরু ছাগল সব বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি বাড়ির সামনেও একফালি জমিটাও বিক্রি করতে হয়েছে। তাতেও সবদিক সামাল দেওয়া যায়নি। এখনও একটা গলার হার কেনা বাকি রয়েছে।অন্নপূর্ণার মনে পড়ে যায় সে একদিন বড়ো মুখ  করে দিদিকে বলেছিল তার ভালো ঘরে বিয়ের ব্যবস্থা করবে সে।সেই ক্ষমতা কোথাই তার? বিয়ের পর কান, নাক, হাত আর গলায় এক গাছা হার ছাড়া সব গয়না খুলে দিতে হয়েছে শাশুড়িমাকে। সামান্য কিছু টাকা জমেছিল তার। সেই টাকা ক'টা আর গলার হারটা খুলে বাবার হাতে তুলে দিতে যায় সে। বাবা হাত সরিয়ে নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলে --- না, না এ আমি নিতে পারব না। তোর শ্বশুরবাড়ির জিনিস আমি নিতে পারব না। তুই চিন্তা করিস না ,  ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে।
 ----- বাবা এই হারটা শ্বশুরবাড়ির নয়। এটা তো তুমিই আমাকে দিয়েছিলে। বলে বাবার হাতে জোর করে হার আর টাকা কয়েকটা গুঁজে দেয় অন্নপূর্ণা। যাবার আগে বাবা বলে , তুই থাকবি না বিয়েতে। আমাদের কারও ভালো লাগবে না। কিন্তু  পরিবারের প্রচলিত নিয়ম তো মানতে হবে। অন্নপূর্ণা ভাবে কত সরল তার ভালোমানুষ বাবা। একবারও তার মনে নিয়মটা নিয়ে কোন সন্দেহই জাগল না। তার  মনে হল না নিয়মটা আসলে একটা অজুহাত মাত্র। 



                                বাবা চলে যেতেই খুব মন খারাপ হয়ে যায় তার। এই সময় বাবার পাশে দাঁড়াতে পারলে কত সুবিধা হত। তাদের তো তেমন কেউ নেই। নিজের বিয়ের যোগাড়পাতি হয়তো দিদি--বোনকেই করতে হবে।  নিজেকে খুউব অসহায় লাগে তার। জমিদারবাড়ির বউঠাকরুন সে। কিন্তু সাধারণ পরিবারের একজন গৃহবধুও তার থেকে অনেক ভালো অবস্থায় থাকে।স্বাচ্ছল্য না থাকলেও তাদের পরিবারে আত্মীয়তা আছে।নিছক লোক দেখানো লৌকিকতা নয় , আন্তরিকতার বন্ধনে বাঁধা সেই আত্মীয়তা।  হঠাৎ একদিন খাওয়ার সময় তার গলার দিকে নজর পড়তেই শ্বাশুড়ি মা বলেন, ছোটবৌমা তোমার গলার হার কোথাই গেল ? সত্যি কথাটাই বলে সে। আর তা শুনেই খাপ্পা হয়ে ওঠেন শাশুড়িমা।  সবার সামনেই বলে ওঠেন --এই জন্যই বুঝি মেয়ের সঙ্গে  এত গুজগুজ ফুসফুস হচ্ছিল সেদিন ? নিমন্ত্রণপত্র দিতে আসাটা তাহলে বাহানা ছিল। আসল উদ্দেশ্য ছিল মেয়ের হার হাতানো ? জা"রা বলে , আর ওই তো নিমন্ত্রণপত্রের ছিরি। মনে হচ্ছে যেন শ্রাদ্ধবাড়ির কার্ড।কার্ড দেখলেই বোঝা যায় কাদের কেমন রুচি। আমাদের গ্রামের চাষাভুষোরাও এখন এর চেয়ে ভালো কার্ড করে। কার্ড দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিয়ে কেমন হবে। আরে বিবাহিত মেয়ের হার নিয়েই যদি বিয়ে দিতে হয় তাহলে বড়োলোকি করে কার্ড ছাপানোর কি দরকার ছিল ? খুব ভাগ্য ভাল পরিবারের কাউকে যেতে হচ্ছে না। নাহলে তো লজ্জায় মাথা কাটা যেত। চোখের  জল বাগ মানেনা  অন্নপূর্নার। তার তো অজানা নয়, সে চাষাভুষো পরিবার থেকেই এসেছে। কোনদিন কোন বড়াইও সে করে না।তবু কেন বার বার একই প্রসঙ্গ তুলে বিদ্রুপ করা ? তাদের বাড়িতে কার্ড ছাপানোর চল নেই।মুখেই, বড়োজোর সুপারি দিয়েই এতদিন নিমন্ত্রণ করা হয়েছে।


                                তার শ্বশুরবাড়ির কথা ভেবেই এই প্রথম কার্ড ছাপানো হল। তাই কার্ডের গুণাগুণ বাবা জানবে কেমন করে? আরও নানা কথা ভিড় করে আসে মনের মধ্যে। কিন্তু সে কেবল বলতে পারে --- বিশ্বাস করুন মা,  বাবা কিন্তু হারটা কিছুতেই নিতে চায়নি। আমিই জোর করে দিয়েছি। হারটা তো বাবারই দেওয়া। কথাটা শুনে শাশুড়িমা সেদিন শুধু আগুন ঝরা দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন, মুখে কিছু বলেন নি। সে ভেবেছিল, যাক বিষয়টা অল্পের মধ্যেই মিটে গেল। কিন্তু কয়েকদিন পরই তার ভুল ভাঙে। সেদিন সকাল থেকে মনটা খুউব খারাপ। সেদিনই যে দিদি -- আর বোনের বিয়ে। সকালেই শাশুড়িমা গোমস্তাকাকাকে দু'খানা আটপৌরে শাড়ি দিয়ে তার বাপের বাড়িতে পাঠায়।যাওয়ার আগে চুপিসারে শাশুড়িমা কি যেন বলেন তাকে। অন্নপূর্ণা মনে মনে ভাবে , তার গরীব ভালোমানুষ বাবার পান থেকে চুন খসলে তো সাত গুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়েন। নিমন্ত্রণ কার্ড ভালো হয়নি বলে কম খোঁটা শুনতে হয়নি তাকে। আর নিজেদের বেলা ?  সেই তো চাষাভুষোদের মতোই উপহার দিয়ে লোকদেখানো লৌকিকতা করতে পাঠানো হল।  তবে তার বাবা অবশ্য তাতেই খুশী হবে। কারণ উপহার নয়, তার কাছে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে কারও যাওয়াটাই বড়ো ব্যাপার। গোমস্তাকাকা সেই অর্থে তাদের পরিবারের কেউ নন ঠিকই , কিন্তু তিনি অনেক দিনের পুরনো মানুষ। জমিদারবাড়ির মুসকিল আসান বলতে তাকেই বোঝায়। গ্রামের মানুষজন তাকেই জমিদারবাড়ির লোক হিসাবেই দেখে। সেদিক থেকে বিয়েতে গোমস্তাকাকার যাওয়া মানেই লোকে জমিদারের যাওয়ারই সামিল বলে ধরে নেবে। তাতেই বাবার মুখ রক্ষা হবে। 


                                      কিন্তু শাশুড়িমা গোমস্তাকাকাকে কি কথা বললেন তা জানতে খুউব কৌতুহল হচ্ছে তার। গোমস্তাকাকা তাকে স্নেহের চোখে দেখেন। সেই ভরসায় তাকে একা পেয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করে অন্নপূর্ণা । কিন্তু গোমস্তাকাকা বলেন, সেকথা তো মা তোমাকে এখনই বলতে পারব না।গিন্নিমার নিষেধ আছে, এখনই যেন কথাটা পাঁচকান না হয়। বোঝই তো মা সব। তবে আমি ফিরে এলেই তুমি সব জানতে পারবে। অন্নপূর্ণা মনে মনে ভাবে শাশুড়িমা কি তাহলে গোমস্তা কাকার হাত দিয়ে কোন সাহার্য্য পাঠাচ্ছে। দুই জা যাতে জানতে না পারে তার জন্যই কি এত গোপনীয়তা ?  শাশুড়িমা সম্পর্কে সে কত কি খারাপ ধারণা পোষণ করেছিল। নিজেকে ধিক্কার দেয় সে। একদিন পরেই অবশ্য ধারণাটা তার পাল্টে যায়। মানুষ যে কত নির্মম হতে পারে তা সেদিনই বুঝেছিল সে। পরদিন সকালেই বিয়েবাড়ি থেকে ফিরে আসেন গোমস্তাকাকা।  মা কৌটো ভর্তি করে ভাজা মাছ, মিষ্টি পাঠিয়েছিল গোমস্তাকাকার হাত দিয়ে। তা দেখে শাশুড়িমা নাক সিটকে বলেন, মদন তুমি আবার ওসব বয়ে আনতে গেলে কেন ? 
কে খাবে ওসব বাসি খাবার ?  সরলার মাকে বরং দিয়ে দাও। শুনে খুউব কষ্ট হয় অন্নপূর্ণার। খাবার যাই হোক না কেন, তাতে যে মায়ের ভালোবাসার স্পর্শ লেগে রয়েছে। সে যে তার কাছে অমৃতের সমান। খুব লোভ হচ্ছে তার। কিন্তু তার তো আর মুখে তোলার উপায় নেই। কাজের মাসি সরলার মাকে সব দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাও ভালো শাশুড়িমা খাবার গুলো কুকুরকে খাইয়ে দিতে বলেন নি। গরীব মানুষ সরলার মা'রা ওই খাবার  খেয়ে নিশ্চয় খুশী হবে। তাহলেই তার মায়ের খাবার পাঠানোটা সার্থক হবে।



                                        কথাটা ভেবে মনে মনে অনেকখানি সান্ত্বনা পায় অন্নপূর্ণা। কিন্তু পরক্ষণেই অশান্ত হয়ে ওঠে তার মন। গোমস্তাকাকা চলে যাওয়ার পর শাশুড়িমা তার গলায় একটা হার এনে পড়িয়ে দেন। হারটা পড়িয়ে দিয়ে শাশুড়িমা বলেন, আর যেন গলা থেকে হার খুলে  একে - তাকে দিয়ে দিতে না শুনি। হারটা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় সে। এ যে তার বাবাকে দেওয়া সেই হারটা। এতক্ষণে ,সেদিন গোমস্তাকাকার সাথে শাশুড়িমায়ের চুপিসারে কথা বলার কারণ  সে ধরতে পারে। অনুমান করতে পারে গোমস্তাকাকার তাকে এড়িয়ে যাওয়ার কারণটাও। বিয়ের দিন হার ফিরিয়ে নেওয়ায় সবার সামনে বাবাকে কতটা অপ্রস্তুত হতে হয়েছিল ভেবে খুব কষ্ট হয় তার। হারটা যেন কাটার মতো তার গলায় বেঁধে। বোনের গলা থেকে খুলে আনা হার পড়ে থাকতে তার যে কত কষ্ট হচ্ছে তা সেই জানে। বাবার কাছে আর সে মুখ  দেখাতেই পারবে না। বাবাই কি গ্রামের লোকের কাছে মুখ দেখাতে পারবে ? এমনিতেই জমিদারবাড়িতে মেয়ের বিয়ে নিয়ে তো কম কথা শুনতে হয়নি তাদের। তার উপরে এই বিষয়টা জানাজানি হওয়ার পর বাবাকে কতই না হাসির খোরাক হতে হয়েছে কে জানে। অথচ বাবা তো কিছুতেই হার নিতে চায় নি। বাবা বোধহয় আন্দাজ করেছিল এমন কিছু ঘটতে পারে। তার জন্যই এমনটা হয়েছে ভেবে  নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারে না সে। সেদিন কি হয়েছিল জানতে খুব ইচ্ছে করে তার। 


                             একদিন গোমস্তাকাকাকে একান্তে পেয়ে চেপে ধরে অন্নপূর্ণা -- কাকা, এত বড়ো অভিসন্ধির কথাটা সেদিন আমার কাছে চেপে গেলেন। বিয়ের আসরে বাবাকে কত বড়ো হেনস্থার মুখে পড়তে হলো বলুন তো ?
---- মা, আমি অনেকদিন জমিদারবাড়ির নুন খেয়েছি, আজও খাচ্ছি। তাই গিন্নিমার নির্দেশ অমান্য করে তোমাকে যদি সেদিন কথাটা বলে দিতাম তাহলে এবাড়ির ভাত কি আর আমার থাকত ? কাজ গেলে এই বয়সে আমি আর কি করতাম বলো মা ?
---- আপনি শুধু নিজের পেটের ভাতের কথাটাই ভাবলেন? একবারও বিয়ের আসরে ওই পরিস্থিতিতে একজন মেয়ের বাবার কি হতে পারে সেই কথাটা ভাবলেন না ?
----- মা গো আমাকে কি তুমি অতই কসাই ভাবো। জমিদারবাড়ির ভাত আমার পেটে আছে ঠিকই , ওই ভাতের জন্যই জমিদারবাড়ির নির্দেশে অনেক নির্মম কাজও করতে হয়। কিন্তু জমিদারদের মতো মনের মানুষ আমি যে আজও হয়ে উঠতে পারি নি।
 ----- মানে ? 
----- আমিও মেয়ের বাবা। আমারও একদিন তোমার বাবার মতোই পরিস্থিতি হয়েছিল। সমস্ত চাহিদা মেটানোর পর কথা মতো হএকটি আংটি দিতে পারিনি বলে বিয়ের আসর থেকে বর তুলে চলে গিয়েছিল পাত্রপক্ষ। কেউ সেদিন আমার পাশে দাঁড়ায় নি।
----- কি বলছেন আপনি ? 
----- লগ্নভ্রষ্টা হয়ে ভোররাতে গলায় দড়ি দিয়ে লোকলজ্জার হাত থেকে মেয়েটা আমাকে মুক্তি দিয়ে যায়।



                                                  দুচোখ জলে ভিজে যায় গোমস্তাকাকার। নিজেকে ধরে রাখতে পারে না অন্নপূর্ণাও। লোকটার বুকের মধ্যে যে এতবড়ো একটা যন্ত্রনা লুকিয়ে আছে তা কোনদিন টের পায়নি সে। নিজেকে কিছুটা সামলে গোমস্তাকাকা ফের বলতে শুরু করেন --- গিন্নিমার নির্দেশ উপেক্ষা করতে যে পারব না তা আমি জানতাম। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ওই পরিস্থিতিতে মেয়ের বাবার কি হয় তা'ও আমার অজানা নয়। তাই গিন্নিমার নির্দেশ পাওয়ার পরই ঠিক করেছিলাম মেয়ের হারটা তো বাক্সবন্দী হয়ে পড়েই রয়েছে, এবার ভগবান কাজে লাগানোর সুযোগ দিয়েছেন। সেই হারটা নিয়েই তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তোমার বাবাকে সব খুলে বলে হারটা তুলে দিয়েছিলাম তার হাতে। কেউ জানতেও পারেনি কখন তোমার হার বদলে আমার মেয়ের হারটা তোমার বোনের গলায় পড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেদিন তোমার বোনকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন আমার মেয়েরই বিয়ে হচ্ছে।
নির্বাক হয়ে যায় অন্নপূর্ণা। কিছুতেই আর চোখের জল ধরে রাখতে পারে না সে। এমন মানুষও আছে ? গোমস্তাকাকা বলেন, ভবিষ্যতের জন্য হারটা রেখেছিলাম।কিন্তু আমাদের আর কিসেরই বা ভবিষ্যত ?  বুড়োবুড়ি ছাড়া আমাদের তো আর কেউ নেই।
----- কে বললো কেউ নেই ? আমি বুঝি আপনার মেয়ে নই? গোমস্তাকাকাকে প্রনাম করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে অন্নপূর্ণা। আর তার মাথায় তখন গোমস্তাকাকার আর্শিবাদের হাত। দুজনের কথা হারিয়ে,চোখ দিয়ে শুধু আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ে।  জমিদারবাড়ির চড়া আভিজাত্যের পর্দা ভেদ করে সহমর্মিতার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বিপরীত মেরুতে দুটি মানুষের হৃদয়। 

                                  অন্নপূর্ণার মনে হয় মায়া মমতাহীন জমিদারবাড়িতে পিতৃস্নেহ পাওয়ার মতো অন্তত একটি লোক সে এতদিনে খুঁজে পেল। আর অন্নপূর্ণার মধ্যেই মদন যেন খুঁজে পায় তার আত্মঘাতী মেয়ে অতসীকে। জমিদারবাড়ির কেউ জানতেও পারে না ওই ঘটনার কথা। কেমন যেন একটা ভালো লাগায় ভরে যায় অন্নপূর্ণার মন। কিন্তু অল্পদিন পরেই আবার শ্বশুরবাড়ির বিষনজরে পড়তে হয় তাকে। তার দুই জায়ের দুটি করে মেয়ে। তাই তার সন্তান সম্ভাবনাকে ঘিরে পরিরারে একটি পুত্রের জন্য আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু দুই জায়ের মতোই সে'ও কন্যা সন্তানেরই জন্ম দেয়। তারপরই মুখ ভার হয়ে ওঠে শাশুড়ি মায়ের। তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই বলেন , আমারই পোড়া কপাল। আগের দু'জন তো পারলই না, ইনিও সেই পথেরই পথিক হলেন। এখন বংশরক্ষা হলে হয়। শাশুড়িমায়ের ভাবখানাই এমন যে তার দুই জায়ের পুত্রসন্তান না হওয়ার দায়ও যেন তার। সে ইচ্ছে করলেই যেন পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে পারত। বদমায়েশি করেই পরিবারের বংশররক্ষার কথা না ভেবে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছে। তার এই পরিস্থিতিতে দুই জা অবশ্য মহা খুশী। অন্নপূর্ণা পুত্রসন্তানের জন্ম দিলে জমিদারবাড়িতে তার কদর বেড়ে যেতে পারে বলে এতদিন যেন তাদের পেটের ভাত হজম হচ্ছিল না। অন্নপূর্ণা ভাবে, শাশুড়িমা --আর তার দুই জা মেয়ে হয়েও আর একটি মেয়েকে কেন যে এত হেনস্থা করে মজা পায় কে জানে ?  


                                    আসলে মেয়েরা নিজেরাই অন্য মেয়েদের সম্মান দেয় না বলেই সমাজও এত অসম্মান করার সাহস পায়। এসব ভেবেই খুব খারাপ লাগে তার।  স্বভাবতই তার মা হওয়া নিয়ে খুউব একটা উচ্ছাস দেখা যায় না শ্বশুরবাড়িতে। বরং সবার মধ্যেই কেমন একটা বিরক্তি ভাব।  অবশ্য মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে সবকিছু ভুলে যায় সে। বসন্তকালে জন্ম বলে মেয়ের নাম রাখা  হয় বাসন্তী। অন্নপূর্ণার নিস্তরঙ্গ জীবনে বাসন্তীই যেন বয়ে আনে বসন্ত বাতাস। কিন্তু ৬ মাসের মাথায় বাসন্তীকে কেন্দ্র করেই চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে অন্নপূর্ণা। মেয়ের মুখেভাত উপলক্ষ্যে মামারবাড়ির তরফে কিছু দেওয়া থোওয়ার ব্যাপার থাকে। কিন্তু তার বাবার যা অবস্থা, তার উপরে সদ্য দুই বোনের বিয়ে দেওয়ার পর বাবার পক্ষে সেই লৌকিকতা বজায় রাখা যে কিছুতেই সম্ভব নয় তা ভালোই জানে অন্নপূর্ণা। মেয়ে হয়েছে বলে মুখেভাতের অনুষ্ঠান কিছু হবে না, কেবল নিয়ম রক্ষার্থে মুখে ভাতটুকু তুলে দেওয়া হবে মাত্র। কিন্তু মামার বাড়ির তরফে মেয়েকে কিছু দেওয়া না হলে কেউ কথা শোনাতে ছাড়বেন না। শাশুড়িমার কানভারী করে মজা দেখবে দুই জা। তার আভাস এখন থেকেই পাচ্ছে অন্নপূর্ণা। তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই সেদিন শাশুড়িমাকে বড়জা সুলতা বলছিল , মা আপনার আরো নাতনি আছে ঠিকই। কিন্তু আপনার ছোট বৌমার বাবার কিন্তু এখন একটাই নাতনি। দেখুন ভালো কিছু নিশ্চয় দেবে। তার সঙ্গে গলা মেলায় মেজো বৌ মঞ্জুও। সে বলে  , দিতে তো হবেই জমিদারবাড়ির ব্যাপার বলে কথা। আমাদেনবাবাকে তো সব দিতে হয়েছে। অন্নপূর্ণা বোঝে তার বাবার কিছু দেওয়ার সামর্থ্য নেই বলেই শাশুড়িমাকে তাতাচ্ছে ওরা। শাশুড়িমাও ওদের কথাকে মান্যতা দিতে বলেন, সে তো দিতেই হবে। ওইসব কথাবার্তা শুনে খুউব দুশ্চিন্তায় পড়ে অন্নপূর্না। 

                            কিন্তু মুখেভাতের দিন অবাক হয়ে যায় সে। দেখে শাশুড়িমায়ের হাতে একটা সোনার চুলোটি, একজোড়া রূপোর বাঁক সহ অন্যান্য সামগ্রী তুলে দেয় বাবা। আর সেসব দেখে দুই জায়ের মুখ আঁধার হয়ে যায়। তারা ভেবে  রেখেছিল আজ একচোট নেবে তাকে। কিন্তু এখন নিজেরাই মুখ লুকানোর জায়গা পাচ্ছে না। কারণ শাশুড়ি নিজেই "থ' হয়ে গিয়েছেন। তিনিও ভাবতে পারেন নি তার বাবা সবকিছু তার হাতে ওইভাবে তুলে দেবে। অন্নপূর্ণা কিন্তু ভেবে পায়না বাবা কিভাবে এতসব যোগাড় করল। শেষে বাড়িটাও বিক্রি করে দিল নাকি? কাজকর্ম সব চুকে যাওয়ার পর বাবাকে একান্তে ডেকে  সে বলে  ---- এসবের কি দরকার ছিল? আমাকে না হয়  কিছুটা গঞ্জনাই সইতে হত। তাবলে বাড়ি বিক্রি করে এতসব ? এরপর কি তাহলে আমার জন্য শেষে তোমরা গাছতলায় থাকবে বাবা ? মেয়ের কথা শুনে বাবার মুখে ফুটে ওঠে করুণ হাসি।আক্ষেপ ঝরে পড়ে তার গলায় -- সেটা হলে তো ভালোই হতো রে। জন্মই শুধু দিয়েছি তোদের , বাবা হিসাবে কোন কর্তব্যই তো করতে পারি নি। আমার তো গাছতলাতেই থাকা উচিত ছিল। কিন্তু মদনদা সে আর থাকতে দিল কই ?
----- মদনদা! মানে কি আমাদের গোমস্তাকাকা ? কি করেছে ?
----- হ্যা রে , তোদের গোমস্তা কাকাই তো আমাকে দু-দুবার  বাঁচাল লোক লজ্জার হাত থেকে ।আগের ঘটনা তোর অজানা নেই ,আর এবার উনিই তো কয়েকদিন আগে গিয়ে ওইসব জিনিস দিয়ে এসেছেন। আমি প্রথমে নিতে চায় নি, কিন্তু উনি বললেন,  অন্নপূর্ণা বুঝি আমার মেয়ে নয় ? তখন আর হাত গুটিয়ে থাকতে পারিনি রে মা। 


                                              গোমস্তাকাকাকে যত দেখছে ততই অবাক হয়ে যাচ্ছে অন্নপূর্ণা। মানুষে মানুষে কত তফাত। তার শ্বশুরবাড়ির লোকরা তার আপনজন হয়েও দেনা-পাওনার ব্যাপারে কত নির্মম, আর তাদেরই অন্নে প্রতিপালিত হয়েও গোমস্তাকাকা কত মানবিক। অথচ যৎসামান্য বেতনে খুউব মেপেজুপে সংসার চালাতে হয় তাকে। সেই প্রসংগে কিছু বললেই একগাল হেসে উড়িয়ে দেবেন সব। বলবেন, মোটে তো দুজন মাত্র লোক। বেতনের সব টাকা নিজেদের কাজে লাগালে সংসারে হয়তো আরও কিছু সুখ কিনতে পারতাম। কিন্তু শান্তি কিনতে পারতাম কি ? আমার আর কতটুকুই বা সামর্থ্য ?সীমিত সেই সামর্থ্য দিয়েই আমি নিজের জন্য সুখ কেনার পরিবর্তে আমার চারপাশের মানুষগুলোর জন্য কিছু করে আমি শান্তি কিনতে চায়। 
-------  এইভাবে সবাইকে সব দিয়ে দিচ্ছেন, বিপদ আপদ যদি কিছু একটা হয় ?
------- আমার বিপদ আপদ কিছু হবে না। আর হলে কেউ না কেউ ঠিক পাশে দাঁড়াবে। নাহলে দিনরাত্রি হতো না, চন্দ্র সূর্য উঠত না।
গোমস্তাকাকার কথা শুনতে শুনতে কেমন যেন এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরে যায় অন্নপূর্ণার মন । অজান্তেই জল আসে চোখে। কতবড়ো হৃদয় থাকলে তবেই মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখা যায়, বিপদ আপদে ভরসা রাখা যায়।  শুধু তার ক্ষেত্রেই নয় , অন্নপূর্ণা বাবার মুখে শুনেছে অভাবের জন্য যারা জমিদারের খাজনা দিতে পারে না তাদেরও নানা ভাবে সাহার্য্য করেন গোমস্তাকাকা। 


                         তাদের তো ঋণের অন্ত নেই গোমস্তা কাকার কাছে। শুধু বোনের হার কিম্বা বাসন্তীর মুখেভাতের ওইসব জিনিসপত্রই তো নয়, গোমস্তাকাকার উদার হৃদয়ের পরিচয় মিলেছে বারবার। বাসন্তীর মতোই প্রতিটি সন্তানের জন্যই গোমস্তাকাকা একইভাবে গোপনে বাবার হাতে সব কিনে দিয়ে এসেছেন।বংশরক্ষার তাগিদে শাশুড়ি মায়ের চাপে পুত্র সন্তানের জন্য পর পর পাঁচটি মেয়ের জন্ম দিতে হয় তাকে সেজমেয়ে হৈমন্তীর জন্মের পর খুউব মুষড়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। শ্বশুরবাড়ির লোকেদের কাছে গঞ্জনা শুনতে শুনতে তিতিবিরক্ত হয়ে পড়ে সে। অঢেল রূপের সঙ্গে  শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্ম নেয় হৈমন্তী। তার দুটি পা ' ই সরু লিকলিকে। হাঁটা চলা করতেই পারে না। হামাগুড়ি দিয়ে চলা ফেরা করে।  ভগবান কেন যে বারবার তার সঙ্গে  এমন করে তা ভেবে পায় না সে। তবে এসবের মাঝেও ভগবান কিছুটা যেন মুখ তুলে চান। পাঁচ মেয়ের পর তার কোল আলো করে আসে দুটি পুত্র সন্তান। একটি পুত্রের পর অবশ্য সে আর মা হতে চায় নি। কিন্তু শাশুড়ি জেদ ধরেছিলেন, এক ছেলের উপর ভরসা করা যায় না। বিপদ আপদ হতে কতক্ষণ। অগত্যা আবার মা হতে হয়েছিল তাকে।পুত্র সন্তান জন্মানোর পর প্রতিবন্ধী মেয়ে জন্ম দেওয়ার গঞ্জনাটা কিছুটা চাপা পড়ে যায়।কিন্তু অন্নপূর্নার চিন্তা যায় না মেয়েটাকে নিয়ে। জমিদারবাড়ির অবস্থাও সেই রকম নয়, নামটুকুই সম্বল। তার উপরে স্বামী তেমন কিছুই করে না। দুই ভাসুর তবু জমিজমা কিছুটা দেখাশুনো করে নিজ নিজ আখের গুছানোর চেষ্টা করে।

                                   গোমস্তাকাকার কাছেই আভাসে ইংগিতে তার কিছু খবর সে পায় গোমস্তাকাকাই বলেন , মা ছোটবাবু তো কিছুই দেখেন না। পরে কি যে হবে।
----- কি আর হবে কাকা, মাথার উপরে তো শ্বশুর --- শাশুড়ি আছেন। যা করার ওনারাই করবেন।
----- ওনারাও তো চিরদিন থাকবেন না, তখন কি হবে ?
---- তখন আপনি থাকবেন। আমাদেরটা আপনি দেখবেন।
---- আমিই কি আর তখন থাকব মা? জমিদারিও তখন আর থাকবে কিনা সন্দেহ। বিশেষ করে ছোটবাবুর জমি সব লুটে পুটে না নেয়।
 ----- সে যেদিন যা হওয়ার হবে। আগে থেকে ভেবে তো আর কিছু করতে পারব না। কথাগুলো  বলল বটে,  কিন্তু দুশ্চিন্তা উড়িয়ে দিতে পারে না সে। সাতটা ছেলে মেয়ে, তার মধ্যে আবার এক মেয়ে প্রতিবন্ধী। প্রতিবছর জমিদারির আয় কমছে। শ্বশুরমশাই প্রায়ই ভাসুরদের সঙ্গে  আলোচনা করেন জমিদারি আর থাকবে না মনে হচ্ছে।  সরকার নিয়ে নেবে। যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে ছেলে মেয়েদের নিয়ে যে পথে বসতে হবে অন্নপূর্ণাকে। তার আশংকায় যেন সত্যি হয় শেষ পর্যন্ত। বিপর্যয়ের কালো ছায়া ঘনিয়ে আসে জমিদারবাড়িতে।


                (  ক্রমশ )

 

No comments:

Post a Comment