ঠাকরুনমা
অর্ঘ্য ঘোষ
( ষোড়শ কিস্তি )
তার আশঙ্কাই যেন সত্যি হয় শেষ পর্যন্ত । বিপর্যয়ের কালো ছায়া ঘনিয়ে আসে জমিদার বাড়িতে। কয়েকদিন ধরেই শ্বশুরমশাই আর ভাসুরদের মধ্য কেমন একটা চাপা উদ্বেগ লক্ষ্য করছিল অন্নপূর্ণা। কিন্তু কয়েকদিন পর বিষয়টি আর চাপা থাকে না। সেদিন সকালে তখন সবার হাতে চায়ের কাপ। পিওন এসে একটি চিঠি ধরিয়ে দিল শ্বশুরমশাইয়ের হাতে। চিঠিটি পড়ে গুম মেরে গেলেন শ্বশুরমশাই। সবাই তখন তার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই মুখ খোলেন তিনি। কিন্তু এক লহমায় গলার জোর যেন অনেকখানি কমে গিয়েছে। ক্ষীণ স্বরে বলেন, যা ভয় করেছিলাম তাইই হয়েছে সরকারের ঘর থেকে চিঠি এসেছে, বেশিরভাগ জমিই ছেড়ে দিতে হবে। জমিদারি প্রথা আর থাকবে না। কথাটা শুনেই সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। দুশ্চিন্তায় পড়ে অন্নপূর্ণাও। ভাসুদের তো দুটি করে মেয়ে। তারই কেবল সাতটি ছেলেমেয়ে। তার মধ্যে আবার একটি প্রতিবন্ধী। তাছাড়া ভাসুরদের সব নিজস্ব সঞ্চয় রয়েছে। তাদেরই কেবল কিছু নেই। জমিদারি তহবিল থেকে মাসিক যৎসামান্য কিছু টাকা মেলে , তাতেই স্বামীর হাত খরচ সহ ছেলেমেয়েদের টুকিটাকি খরচ জোরাতিলি দিয়ে চালাতে হয়। তাই জমিদারি চলে গেলে কি হবে ভেবে পাইনা অন্নপূর্ণা।স্বামী যে কোন কাজ করে পরিস্থিতির সামাল দেবেন সেই সম্ভাবনাও নেই।কারণ আর পাঁচটা জমিদারবাড়ির ছেলেদের যা হয় তার স্বামীর ক্ষেত্রেও তাইই হয়েছে।ছোট থেকে বিলাস ব্যসনে মানুষ হওয়ার ফলে না হয়েছে লেখাপড়া, না হয়েছে কোন কাজ করার মানসিকতা। বাপের বাড়ির অবস্থাও তো ওই। সেখান থেকেও কোন সাহার্য্য পাওয়ার সম্ভবনা নেই।
একটা ভরসার জায়গা ছিল গোমস্তাকাকা। কিন্তু জমিদারি চলে গেলে গোমস্তাকাকারও তো একই হাল হবে। ভগবান যদি কোনদিন মুখ তুলে চান তাহলে সেই গোমস্তাকাকার দায়িত্ব নেবে। কারণ গোমস্তাকাকা তাকে নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করেন। কিন্তু ভগবান কোনদিন তার আশা পূরণ করবে বলে মনে হয়না।বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তো সরল সাধাসিধে মানুষের প্রতি ভগবান মুখ তুলে চাওয়ারই সময় পায় না বলে অন্নপূর্ণার মনে হয়। তাই সব থেকে মুষড়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। কেমন যেন একটা বিপর্যয়ের আচ পায় সে। তাকে আরও শঙ্কিত করে তোলে শ্বশুরমশাইয়ের দীর্ঘনিশ্বাস। মনকে স্বান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তিনি নানা রকম আশার কথা শোনান। পরক্ষণেই আবার নিজেই হতাশায় মাথা নাড়ান। তার ওই ভাবগতিক দেখে শাশুড়িমা প্রশ্ন করেন -- তাহলে কি হবে ?
----- সহজে আমি ছেড়ে দেব না। সরকারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যাব। মদনকে একবার ডেকে পাঠাও তো।
একটু পরেই গোমস্তাকাকা এসে পৌঁছোন। শ্বশুরমমশাই তার উদেশ্যে বলেন , খবর সব শুনেছো নিশ্চয়। তিনআনিদের খবর কি ? ওদের কাছেও নিশ্চয় চিঠি আসবে। তিনআনির জমিদার হরশংকর একসময় শ্বশুরমাশাইদেরই শরিক ছিলেন। কিন্তু এখন আর কোন সৌহাদ্যই নেই। বরং এখন মুখ দেখাদেখি বন্ধ। সুযোগ পেলেই কোণঠাসা করার চেষ্টা করে তাদের। হরশংকরবাবুদের কথা উঠতেই গোমস্তাকাকা বলেন , চিঠি একটা ওদের নামেও এসেছে শুনেছি। কিন্তু তাতে তো ওদের খুউব একটা বেকায়দা করতে পারবে না।
---- কেন ? কেন ?
----- কর্তাবাবু , ওরা বিপদের আঁচ পেয়ে আগেই সম্পত্তি সব আলাদা আলাদা নামে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। এখন ওদের জমিজমা সিলিং আওতার নিচেই পড়বে। আপনাকেও কতদিন বলেছি , আপনি কানেই তোলেন নি ?
----- তাহলে এখন উপায় ?
----- উপায় একটাই , ভালো জমিগুলো রেখে বাকিগুলো সরকারকে ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
------ কক্ষনো না, জীবন থাকতে এক ছটাক জমিও ছাড়ব না। আমি হাইকোর্টে যাব।
------ কর্তা ছোটমুখে বড় কথা হয়ে যাবে। কিন্তু পুরুষানুক্রমে আপনাদের নুন খেয়েছি তাই সব সময় এই পরিবারের ভালোই চেয়েছি। তাই বলি কি কর্তা, কেস কাছারি ভালো জিনিস নয়। কত পরিবার শেষ হয়ে গিয়েছে , তার উপরে এ তো সরকারের নীতির বিরুদ্ধে কেস , সহজে এঁটে ওঠা যাবে না।
---- তুমি সব জেনে বসে আছো। আর জ্ঞান দিতে হবে না তোমাকে। তুমি জমির দলিলপত্র সব ঠিক করো। আমি কালই কলকাতায় হাইকোর্টে যাব।
যথারীতি পরদিনই মামলা দায়ের হয়। দিনের পর দিন চলে সেই মামলা। শেষপর্যন্ত মদনের আশংকাই সত্যি হয়। মামলা লড়তে লড়তে বাড়ির সোনা দানা, সমস্ত সঞ্চয় নিশেষ হয়ে যায়। বিকিয়ে যায় ভালো ভালো জমি। এমন কি চড়া সুদে বাঁধা পড়ে যায় বাড়িটিও। তাও শেষ রক্ষা হয় না।সেদিন মামলার রায় বেরোনোর কথা। সকাল থেকেই সারা বাড়িতে চাপা উত্তেজনা। শাশুড়িমা ঠাকুরঘরে পুজোয় ব্যস্ত। শ্বশুরমশাই ইজিচেয়ারে আধশোয়া। তার চোখেমুখে দুঃচিন্তার ছাপ। গোমস্তাকাকা কলকাতায় আছেন। রায়ের খবর নিয়ে ফিরবেন। বাড়িতে সেদিন কার্যত নাওয়া খাওয়া বন্ধ। সবাই গোমস্তাকাকার ফেরার জন্য প্রতীক্ষায় রয়েছে। অন্নপূর্ণার তারই মাঝে ছেলে মেয়েগুলোকে কোন রকমে স্নান করিয়ে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে শুধুই ঠাকুরকে ডেকে চলেছে সে। দুপুরের দিকে গোমস্তাকাকা ফেরেন। তার মুখ দেখে আর কারও বুঝতে বাকি থাকে না রায় কি হয়েছে ? সবাই কেমন অদ্ভুত রকম চুপচাপ হয়ে যায়। কেবল শ্বশুরমশাই গোমস্তাকাকাকে জিজ্ঞাসা করেন --- কি মদন , শেষরক্ষা হলো না তাহলে ?
---- হ্যা কর্তা, মামলায় আমাদের হার হয়েছে। আমি তো প্রথমেই বলেছিলাম সরকারের সঙ্গে লড়াই করে পেরে ওঠা যাবে না। আপনি শুনলেন না তখন। তাহলে তো এভাবে ধনেপ্রাণে শেষ হয়ে যেতে হত না।
----- যাও যাও , তুমি আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে এসো না দেখি। বিদেয় হও এখন আমার সামনে থেকে।
গোমস্তাকাকা চলে যাওয়ার পর কাগজপত্র নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে যান শ্বশুরমশাই। তারপর থেকেই খুউব একটা ঘর থেকে বেরোতেন না। যখন বেরোতেন কথা বলতে বলতেই বিনা কারণেই মেজাজ হারিয়ে চেঁচামেচি শুরু করতেন। এত উত্তেজিত হয়ে পড়তেন মনে হোত বুঝি এখনই হার্টফেল করবেন। তখন আবার তাকে ধরে ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসতে হত। শ্বাশুড়িও এখন সকাল হলেই ঠাকুরঘরে ঠুকে যান। সারাদিন বিড় বিড় করেন --- ঠাকুর একি করলে তুমি ?এর থেকে আমাদের তুমি টেনে নিলে না কেন ? তার ওই আর্তি প্রতিধ্বনিত হয়ে যেন জমিদার বাড়ির খিলান, ঘুলঘুলি, কার্ণিসে গুমরে গুমরে মাথা কুটে মরে। গোমস্তাকাকা দুবেলা আসেন, খোঁজখবর নিয়ে যান। কিন্তু তিনি কোন আশার আলো দেখাতে পারেন না। অন্নপূর্ণাকে যাওয়ার সময় চুপিচুপি বলে যান , মা ঘোর দুর্যোগের ছায়া দেখছি। জানি না কি করে কি হবে। জমি ভেষ্ট হওয়ার খবর কেমন করে সবাই জেনে গিয়েছে। কেউই আর তাই খাজনা দিতে চাইছে না। মুখের উপর বলে দিচ্ছে , আবার খাজনা কিসের ? জমি তো এখন সরকারের হয়ে গিয়েছে। খাজনা দিতে হয় তো সরকারকেই দেব। নিজস্ব জমি বলতেও তো আর বিশেষ কিছু নেই। বেশিরভাগই চলে গিয়েছে মামলার পিছনে। যেটুকু আছে , সেটুকুরও খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে প্রজারা। তারাও পরিস্কার জানিয়ে দিচ্ছে , আগে পরিস্কার হোক, এই জমি সরকারের না জমিদারের। তবেই না খাজনা।
---- তাহলে কি হবে কাকা ?
----- কি হবে তা তো আমিও ভেবে পাচ্ছি না মা। ঠাকুরকে ডাকো। তাছাড়া তো আর পথ নেই মা।
------ কিন্তু ঠাকুর তো আমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না কাকা।
------ মা, ঠাকুর তো মানুষের কাছে পরীক্ষা নেন। পরীক্ষায় পাশ করলে তবেই তিনি ভক্তের ডাকে সাড়া দেন। ধরো তোমার এখন সেই পরীক্ষা চলছে।
গোমস্তাকাকা যতক্ষণ থাকেন ততক্ষণ মনে তবু কিছুটা সান্ত্বনা , কিছুটা বল ভরসা পায় অন্নপূর্ণা। কারণ এই বিপর্যয়েও স্বামী সায়ন্তনের কোন হোলদোলই নেই। আসন্ন বিপদের কোন আচই গায়ে মাখে না। সে দিব্যি আছে তার মাছ ধরা, তাসখেলা নিয়ে।তাই গোমস্তাকাকা চলে গেলেই গোটা জমিদার বাড়িটিকে নিঝুম পুরীর মতো মনে হয় অন্নপূর্ণার।তারই মধ্যে পালাক্রমে দুই জায়ের দরজাবন্ধ ঘরে কিসের যেন বৈঠক বসে ভাসুরদের সঙ্গে। নিজেকে বড়ো একা লাগে অন্নপূর্ণার। শ্বশুরমশাই নিজের ঘরে শয্যাশায়ী, শাশুড়িমা ঠাকুরঘরে, ভাসুর -- জা'রা নিজের ঘরে গোপন মিটিং-এ ব্যস্ত। কেমন যেন একটা দমবন্ধ পরিবেশ। এই পরিস্থিতিতে সব থেকে যে মানুষটির শক্ত থাকা প্রয়োজন ছিল সেই শ্বশুরমশাই আজ ভেঙে পড়েছেন। তাকে সব থেকে কাহিল করে ফেলেছে বন্ধক রাখা বাড়িরচিন্তা। কয়েকদিন আগেই যারা বাড়ি বন্ধক নিয়েছেন তারা এসেছিলেন। বলে গিয়েছেন টাকা না পেলে তিনদিনের মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে বাড়ি।তারপর থেকে আরও উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন শ্বশুরমশাই। কারণ বাড়ি বন্ধকের জন্য নেওয়া টাকা সুদেমুলে কয়েকগুণ হয়ে গিয়েছে। সেই টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্য এখন জমিদার বাড়ির নেই। তাই কয়েকদিন ধরেই রাতে ঘুম নেই শ্বশুরমশাইয়ের।সেদিন তো সন্ধ্যে থেকেই কেন যেন পাগল পাগল ভাব। রাত পো্হালেই ছেড়ে যেতে হবে বাড়ি। কিন্তু কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাছাড়া জমিদারদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াটা গ্রামের মানুষ বিশেষ করে তিন আনিদের হাসির খোরাক হতে হবে। সেটাই তার কাছে সব থেকে বেশি যন্ত্রণাদায়ক।
এই সময় ছেলেরাও তার পাশে নেই। বরং জা-ভাসুররা এই পরিস্থিতির জন্য শ্বশুরকেই দুষছে। আর তিনি আরও উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। চুপচাপ চোরের মতো ঘরে ঢুকে বিছানা নিচ্ছেন। লোকটাকে দেখে খুউব কষ্ট হয় অন্নপূর্ণার। কিন্তু তার তো কিছুই করার ক্ষমতা নেই। কেবল একবার শাশুড়িমা ঠাকুরঘর থেকে বেড়িয়ে এসে ভাসুরদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোরা তো ভালো ছেলে। এই পরিস্থিতিতে তোরা কোথাই বাবার সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পথ খুঁজবি, তা নয় লোকটাকে দগ্ধে দগ্ধে মারার চেষ্টা করছন। বাবা তো তোদের ভালোর জন্যই মামলা লড়তে গিয়েছিল। নাহলে আমরা আর ক'দিন ? সরকার নিয়েও যা থাকত তা দিয়েই তো দিব্যি চলে যেত আমাদের।
জবাবে বড় ভাসুর বলেন, মা তুমি আর বাবার হয়ে সাফাই গেয়ো না। আমাদের ভালোর জন্য নয় , জমিদারি জেদ বজায় রাখতেই বাবা মামলা করেছিলেন।তার কথা শেষ না হতেই ছোট ভাসুর বলেন , তাই বাবার সঙ্গে আর আলোচনা নয়। যা করার আমারই করব। শাশুড়িমা টের না পেলেও অন্নপূর্ণা পায় এক দুর্যোগের পুর্বাভাস। সেদিন সন্ধ্যা থেকেই আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা। মেঘ চিঁড়ে ঝলকে উঠেছে বিদ্যুৎ। কখনও বা দমকা ঝড়। অর্থাভাবে জমিদার বাড়ির পোটোম্যাক্সের আলোগুলো আর জ্বালানো হয়না। জ্বলে কয়েকটা টিমটিমে লন্ঠন। হাওয়ায় তির তির করে কাপে তার শিখা। একসময় দপ করে নিভে যায় দমকা হাওয়ায়। আর কাকতালীয় ভাবেই সেইসময় ফর ফর উড়ে যায় জমিদারবাড়ির ঘুলঘুলিতে বাসা বেধে থাকা একপাল বাদুর। দূরে কাছারিবাড়ি নিম গাছে আচমকা ডেকে ওঠে একটি পেচা। অমঙ্গলের আশংকায় অন্নপূর্ণার বুক কেপে ওঠে। অভ্যাস বসে কপালে -- বুকে হাত ছুঁইয়ে বার কয়েক রামনাম লেখে।
কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। হঠাৎই শ্বশুরমশাইয়ের ঘর থেকে ভেসে আসে শাশুড়িমায়ের কান্নার আওয়াজ। তখন ছেলেমেয়েরদের ঘুমপাড়াচ্ছিল অন্নপূর্ণা । সব ফেলে ছুটে যায় সেদিকে। গিয়ে দেখে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে শ্বশুরমশায়ের। যন্ত্রনায় চোখ কপালে উঠেছে। যেন দমবন্ধ হয়ে আসছে। কেবল বলছেন, না - না, আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিও না।লোকে হাসবে।কয়েক দিন সময় দাও। আমি তোমার সবটাকা মিটিয়ে দেব।বুঝতে বাকি থাকে না প্রলাপ বকছেন তিনি।সায়ন্তন নেই বাড়িতে। শাশুড়িমায়ের কান্না শুনেও ভাসুর-- জা'রা কেউ নিজেদের ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে না। অগত্যা বাসন্তীকে দিয়ে গোমস্তাকাকাকে ডাকতে পাঠায় অন্নপূর্ণা। তারপর রসুন তেল গরম করে শ্বশুরমশাইয়ের বুকে মালিশ করতে বসে। কিন্তু যন্ত্রনার কোন উপশম হয় না, বরং বেড়েই চলে। আর সমানে চলে প্রলাপ বকা। কখনও বলেন, হু হু বাবা দিয়েছি কেস ঠুকে। নে এবার কি করবি কর ? কখনও বা তাকে দেখে কবিতা আবৃত্তি করে ঊঠেন , কে তুমি মা শিয়রে বসি ----।শাশুড়িমা সমানে কেঁদে চলেন। নীরবে সেও কাদে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা। শুরু হয় ডাক্তারখানা নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড়। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। খিচুনি ওঠে শ্বশুরমশাইয়ের। আর তাতেই মৃত্যু হয় তার। শাশুড়িমায়ের সংগে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে অন্নপূর্ণাও। তাদের কান্না শুনে ভাসুর -- জা'রাও এসে পৌঁছোয় । সুর করে লোক দেখানো কান্নায় দৃষ্টি আর্কষণ করে তারা।
গোমস্তাকাকা লোকজন ডেকে সৎকারের তোড়জোড় শুরু করে দেন।
কিন্তু খরচপাতির ব্যাপারে ভাসুররা কেউ কোন উচ্চবাচ্যই করেন না। অন্যান্য ব্যবস্থাপত্র করে গোমস্তাকাকা সৎকারের টাকার জন্য শাশুড়িমায়ের সামনে এসে দাঁড়ান। কিছুটা অস্বস্তির সংগে বলেন, মা ঠাকুরুণ জমিদারি তহবিলে তো কোন টাকাপয়সা নেই। কর্তাবাবুর পারলৌকিক কাজের খরচাপাতি কি ভাবে হবে ? শাশুড়িমা ভাসুরদের মুখের দিকে তাকান। ভাসুররা তখন মুখ ঘুরিয়ে নেন। একে একে নিজেদের ঘরে গিয়ে ঢোকেন তারা। বিষয়টি বুঝতে বাকি থাকে না অন্নপূর্ণার। সে ঘরে গিয়ে নিজের গলার হার আর ছেলেমেয়েদের মুখেভাতে পাওয়া সোনারূপার গয়নাগুলো এনে তুলে দেয় শাশুড়িমমায়ের হাতে। সেগুলো হাতে নিয়ে শাশুড়িমা কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে যান। তারপর কান্না সামলে বলেন , মামলার পিছনে আমার -- তোমার যা গয়নাগাটি ছিল সব চলে গিয়েছে তোমার তো ওইটুকুই সম্বল। এতগুলো ছেলেমেয়ে রয়েছে, বিপদ আপদ আছে। গয়নাগুলো সব চলে গেলে তোমার কি হবে মা ?
------ কি আর হবে মা ? আমার সাত -- সাতটা ছেলেমেয়ে। বিপদ আপদ হলে ভগবান না দেখলে ওই গয়না ক'টাতেও কিছু হবে না।
----- মা, ছোটঘরের মেয়ে বলে এতদিন তোমাকে কত গঞ্জনা দিয়েছি। বুঝিনি ছোটঘরের মেয়েদেরও বড়ো মন থাকে। আজ বুঝলাম বড়ো ঘরে জন্ম হলেই মনটা সবার বড়ো হয়না।
----- থাক না মা, আজ আর ওইসব কথা না'ই বা তুললেন। ভুলে যান সবকিছু।
----- ভুলতে আর পারছি কই মা। একদিন এই হারই তোমার বোনের গলা থেকে আমি খুলিয়ে এনে কত না কথা শুনিয়েছি তোমাকে। আমার এমনই পোড়া কপাল সেই হারই শুধু নয়, ছোট ছোট নাতি-- নাতনীদের গয়নাও হাত পেতে নিতে হচ্ছে। বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আর তাকে স্বান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেকেও সামলাতে পারে না অন্নপূর্ণা। দুজনে দুজনকে জড়িয়ে কেঁদেই চলে।
কেউ টের পায় না জমিদারবাবুকে নিয়ে হরিধ্বনি দিতে দিতে শশ্মানবন্ধুরা কখন জমিদারবাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে। দুই ভাসুরের কেউই পারলৌকিক কাজের দায়িত্ব নেয় না। অগত্যা অন্নপূর্ণা আর সায়ন্তনকেই সেই দায়িত্ব নিতে হয়। শ্বশুরমশাইয়ের মৃত্যুর পর পরিবারে বিভাজন রেখাটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শ্রাদ্ধশান্তির কাজ চুকে যাওয়ার পর বাড়ি নিয়ে নুতন করে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে জমিদার পরিবারে। অন্নপূর্ণা ভেবেছিল হয়তো পাওনাদারের এবার তাদের বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার তাগদা দিতে আসবে। কিন্তু তাগাদাটা আসে অন্যদিক থেকে। অন্নপূর্ণা অবশ্য এই রকম কিছু যে একটা হতে চলেছে তার আভাস আগেই গোমস্তা কাকার কাছে পেয়েছিল। তাই সে কথাটা শুনে ততটা অবাক হয় না। কিন্তু কথাটা শোনার পরই হতবাক হয়ে যান শাশুড়িমা। শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ সবে চুকেছে।শোকের আবহাওয়া জমিদারবাড়িকে তখনও ঘিরে রয়েছে। একে একে আত্মীয় স্বজনরা সব বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। বাড়িটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে অন্নপূর্ণার। শ্বশুরমশাইয়ের অভাবটা খুব বেশি জানান দিচ্ছে। একটা মানুষই যে সবদিকে এতটা ভরে রেখেছিল তা আজ মর্মে মর্মে অনুভব করছে। ঘুরছে ফিরছে আর নানা কথা মনে পড়ছে। ইজিচেয়ারের কাপড়ে কাধের কাছে লেগে রয়েছে শ্বশুরমশাইয়ের মাথার চুলের তেলচিটে দাগ।অন্নপূর্ণার মনে পড়ে যায় ওই চেয়ারে আধশোওয়া হয়ে চা খেতে খেতে জমিদারির কাগজপত্র দেখতেন তিনি। বেতের শৌখিন লাঠিটা এখনও ঝোলানো রয়েছে দেওয়ালের পেরেকে। ওই লাঠি নিয়েই সকাল বিকাল হাঁটতে বের হতেন। স্নান করার আগে চকচকে করে নিয়মিত তেল মাখাতেন লাঠিটাতে।
এমনই নানা কথা মনে পড়ে অন্নপূর্ণার। উপযুক্ত মর্যাদা হয়তো সে পায়নি। কিন্তু তাকে তো এবাড়ির বৌ করে এনেছিলেন তিনিই। সেই দিনটার কথা আজও ভোলেনি সে।তার তৈরি ঘোলের সরবত খেয়ে কত প্রশংসা করেছিলেন। বিনা পণে নিজের ছেলের বৌ করে ঘরে এনেছিলেন। নাহলে হয়তো তিন--তিনটে মেয়ের বিয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে তার গরীব বাবার জিভ বেরিয়ে যেত। শ্বাশুড়িমা যখন তার সামনেই নানা কারণে গঞ্জনা দিতেন তখন প্রতিবাদ করতেন না ঠিকই কিন্তু নিজে কোনদিন অপমান সূচক কথাও বলেন নি। তিনি মাথার উপর ছিলেন বলেই সবাই তাকে পরগাছা মনে করলেও উপড়ে ফেলার সাহস দেখায় নি। কথাগুলো মনে পড়তেই কেমন যেন একটা মন খারাপ করা ভাব ঘিরে ধরে তাকে। ওইসব কথা ভাবতে ভাবতে কোথাই যেন হারিয়ে যায় অন্নপূর্ণা। কিন্তু জা-- ভাসুরদের গলা পেয়ে বাস্তবে ফেরে। সে তখন শাশুড়িমায়ের পাশে বসেছিল চুপচাপ। ওরাও একে একে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে। ওদের গতিবিধিতেই কেমন একটা অভিসন্ধি টের পাচ্ছিল অন্নপূর্ণা। কেমন যেন একটা লুকোছাপা ভাব।কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায় তার ধারণাই সত্যি। কিছুটা ইতস্তত করে বড় ভাসুর বলেন, মা একটা কথা বলার ছিল --
----- কি কথা বল ?
----- আসলে বাবার কাজের চাপে এতদিন তোমাকে বলা হয়নি কথাটা। কিন্তু আর না বললেও নয়।বড়ভাসুরের চোখে মুখে কেমন যেন একটা অপরাধী অপরধী ভাব ফুটে ওঠে। কথা বলতে বলতেই খেই হারিয়ে ফেলেন। তার ওই পরিস্থিতি দেখে আসরে নামেন ছোট ভাসুর। তিনি বেশ গুছিয়ে শুরু করেন --- জানোই তো মা বাবা যে রাতে মারা যান তারপর দিনই পাওনাদারদের বাড়ি দখল নেওয়ার কথা ছিল।
---- জানি তো, সেই কথাই তো ভাবছিলাম। কেন ওরা এখনও এলো না।
--- ওরা বাবার কাজের পরদিনই এসেছিল বাড়ির দখল নেওয়ার জন্য।তখনও বাড়িতে আত্মীয়স্বজনরা সবাই ছিলেন। লজ্জায় মাথা কাটা যেত সবার সামনে।কিন্তু সব শোনার পর আমাদের শ্বশুরমশাইরাই লজ্জার হাতে থেকে বাঁচিয়ে দেন।
----- মানে ?
এবারে কিছুটা সামলে নিয়ে আসরে নামেন বড় ভাসুর। তিনি বলেন -- তখন পাওনাদারের কাছে থেকে ওরাই বাড়িটা কিনে নেন। বলো মা কি উপকারটাই না করেছেন ওরা।
----- তা বটে বই কি। আর তো আমাদের গাছতলায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে না। এটা যদি বাবা বেঁচে থাকতে করতে পারতিস তাহলে তাকে চলে যেতে হত না। পরে হয়তো তোদের শ্বশুরমশাইদের টাকাটাও মিটিয়ে দিতে পারতেন উনি । তবু যা হয়েছে তাও ভালোই হয়েছে।
---- কিন্তু মা ওদের না একটা শর্ত আছে।
------ শর্ত ?
----- ওদের দুই মেয়ে ছাড়া এই বাড়িতে আর কেউ থাকুক তা ওনারা চান না।
এতক্ষণে বিষয়টা জলের মতো পরিস্কার হয়ে যায় অন্নপূর্ণার কাছে। আর সবটা শোনার পর হতভম্ব হয়ে যান শাশুড়িমা। তারপর মুখ খোলেন তিনি ----- হ্যা রে , বাড়িতে কি শুধু ওদের মেয়েরাই থাকতে পাবে? জামাই -- নাতনিরা পাবে না ?
দুই ভাসুরই একসংগে বলে ওঠেন ----- বা,রে আমরা থাকতে পাবো না কেন ?
------ জানি তো রে , আমাদের জায়গা হবে না এই কথাটা তোদের এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলতে হল কেন সেটাই বুঝতে পারছি না। ভয় নেই রে , তোদের শ্বশুরের কেনা বাড়িতে আমি থাকতেও পারতাম না। একটা কথা আছে জানিস তো, ঘরের চেয়ে পর ভাল, আর পরের চেয়ে গাছতলা ভালো। আমি দেখি কাশী ,বারানসী কোথাও একটা চলে যাব। সেখানে বাবা বিশ্বনাথের কাছে যদি ঠাই জোটে ভাল , নাহলে গাছতলায় পড়ে থাকব। তোরা সুখে শান্তিতে থাকিস। বলতে বলতেই গলার স্বর বুজে আসে শাশুড়ি মায়ের।


No comments:
Post a Comment