Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুনমা-৫



           ঠাকরুনমা

                       

             

                অর্ঘ্য ঘোষ  



               ( পঞ্চম  কিস্তি )



তোরা সুখে শান্তিতে থাকিস। বলতে বলতেই গলা বুজে আসে শাশুড়িমায়ের।আর নির্বাক হয়ে যায় অন্নপূর্ণা। সে ভেবে পায় না মানুষ কি করে এত ফন্দিবাজ হতে পারে। যে মা তাদের পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন , সমস্ত ঝড় ঝাপটা থেকে পাখির  পাখার মতো আড়ল করে রক্ষা করেছেন, যে ভাই কুড়িয়ে পাওয়া আম, জাম দাদাদের না দিয়ে খায়নি, সেই মা--ভাইকে কি করে এত সহজেই দূরে সরিয়ে দিতে পারে ? বিষয়টি জানার পরই ছুটে আসেন গোমস্তা কাকা।শ্বাশুড়িমাকে বলেন, মা ঠাকরুন আপনাদের আমাদের বাড়ি যেতে বলতে পারতাম, কিন্তু আমি তো আপনাদের কর্মীমাত্র। তাই জমিদার বাড়ির কর্ত্রী , বৌ ছেলেকে আমার বাড়িতে দেখলে নিন্দুকরা হাসার সুযোগ পাবে। তাই আমার বাড়িতে আপনাদের যেতে বলতে পারব না। কিন্তু কর্তাবাবু বৈঠকখানা বাড়িটা ছোটবৌমার নামে লিখে দিয়ে গিয়েছেন। আপনারা দিব্যি সেখানেই গিয়ে উঠতে পারবেন। আমি সমস্ত ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
------ এটা তো আমার জানা ছিল না মদন। আমার জন্য ভাবি না। হভভাগী এই মেয়েটার কথা ভেবেই আমার দুঃচিন্তা হচ্ছিল এতক্ষণ। যাক ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন। তুমি বরং কাল সকালে এসে সব ব্যবস্থাপাতি করে দিও। আজকের রাতটা থাকার ছাড় আছে।শেষ রাতটুকু স্বামী--শ্বশুরের ভিটেয় কাটিয়ে নিই।  সে রাতে আর কেউ খাবার মুখে তুলতেপারে নি। শাশুড়িমা উঠে গিয়ে নিজের ঘরে দোর দিয়েছিলেন। আর ছেলেমেয়েদের খাইয়ে নিজে জল খেয়ে বিছানা নিয়েছিল অন্নপূর্ণাও।

                     
                          কিন্তু ভাসুরদের ঘরে অবশ্য অন্য চিত্র। দিব্যি শোনা যাচ্ছিল তাদের হাসি, হৈ-হুল্লোর। কিছুতেই ঘুম আসে না অন্নপূর্ণার চোখে। কাল সকালেই এই বাড়ি ছেড়ে খড়ের চালের মাটির বৈঠকখানা বাড়িতে উঠে যেতে হবে। মাটির বাড়ি নিয়ে অবশ্য তার কোন আক্ষেপ নেই। তার দুঃচিন্তা মাটির বাড়ি প্রতিবছর রক্ষণাবেক্ষণ করা নিয়ে।ঘুমোন নি শাশুড়িমাও। অনেক রাত্রি অবধি তার ঘরের ভেণ্টিলেটারের ফাঁক থেকে আলোর রেখা দেখতে দেখতে কখন ভোর হয়ে যায় টের পায় না সে। সকাল সকাল উঠে পড়ে। কাল বিকেল থেকে শাশুড়িমা মুখে কুটোটি পর্যন্ত কাটেননি। তাই এক গ্লাস দুধ গরম করে নিয়ে গিয়ে কড়া নাড়ে শ্বাশুড়ি মায়ের দরজায়। কিন্তু বার বার কড়া নাড়া স্বত্ত্বেও কোন সাড়া মেলে না। এমনকি দরজা ধাকাধাক্কি করেও কোন লাভ হয়না। এরকম তো কখনও হয়না। খুউব পাতলা ঘুম শাশুড়িমায়ের। কতবার এক ডাকেই দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছেন।কেমন কু ডাকে অন্নপূর্ণার মন। জা-ভাসুররা কেউ তখন বিছানা ছেড়ে ওঠেন নি। তাই সঙ্গে  সঙ্গে বড় মেয়েকে দিয়ে গোমস্তাকাকাকে  ডাকতে পাঠায়। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে ছুটে আসেন গোমস্তাকাকা। ততক্ষণে জা--ভাসুররাও উঠে পড়েছেন। সাত সকালে অন্নপূর্ণার সক্রিয়তায় তারা কিছুটা বিরক্তই হয়। কিন্তু অন্নপূর্ণা কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। সে বলে, গোমস্তাকাকা আর দেরী করা ঠিক হবে না। যেমন করেই হোক দরজা ভাঙার ব্যবস্থা করুন। তার কথা শেষ না হতেই দুই ভাসুরই হই হই করে ওঠেন --দরজা ভাঙো মানেটা কি ? বাড়িটা আর জমিদারবাড়ি নয়। তাই ভাঙো বললেই  ভাঙা  যায় না।



                               আগুন ঝড়া দৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়ে থাকে অন্নপূর্ণা। এর আগে ভাসুরদের মুখের উপর কথা বলা দুরে থাক, মুখ তুলে চায়নি পর্যন্ত। কিন্তু এদিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না সে। তীব্র শ্লেষ ঝরিয়ে বলে, বটঠাকুর আপনার কি ? দেখছেন মায়ের কোন সাড়াশব্দ নেই, আর আপনারা দরজার কথা ভাবছেন। মায়ের চেয়েও কি একটা দরজার দাম আপনাদের কাছে বেশি ?
----- কিন্তু এমনও তো হতে পারে মা ঘুমিয়ে আছেন। তখন তো শুধু শুধু দরজাটা নষ্ট হবে।
---- ভগবান করুন তাই যেন হয়। তখন না দরজার জন্য একটা কিছু নিজেদের নামে লিখে নেবেন। বলে কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ দেয় না সে। দরজায় গিয়ে ধাক্কা মারতে শুরু করে। তার দেখাদেখি হাত লাগান গোমস্তাকাকাও। বার কয়েক ধাক্কা দিতেই ছিটকানি উপড়ে খুলে যায় দরজা। আর ঘরে ঢুকেই নিজেকে ধরে রাখতে পারে না অন্নপূর্ণা। তার আশঙ্কাই  সত্যি হয়। দেখা যায় গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে ছাদের হুকে ঝুলছে শাশুড়িমায়ের নিথর দেহ।টেবিলের উপর চশমা চাপা দেওয়া সুইসাইড নোট। তাতে লেখা -- জমিদারবাড়ির বৌ হয়ে এবাড়িতে ঢুকেছিলাম। জমিদারবাড়ির বৌ হয়েই বেরিয়ে গেলাম।
       

                                          কান্নায় ভেঙে পড়ে অন্নপূর্ণা । শাশুড়িমায়ের মৃতদেহ আঁকড়ে সেই কেঁদেই চলে। কিন্তু সে সুযোগও তার বেশিক্ষণ মেলে না। শাশুড়িমায়ের মৃতদেহ সৎকারে জটিলতা দেখা দেয়। একে অর্থাভাব, তার উপরে আত্মহত্যা জনিত মৃত্যুর কারণে ময়না তদন্তের ঝামেলা। তাই পুলিশকে ধরে কয়ে গোপনে গ্রামের শ্মশানেই সৎকারের ব্যবস্থা করেন গোমস্তাকাকা। তাতে খরচের ধাক্কা অনেকটাই কমে আসে।কিন্তু ভাসুররা সেটুকু দিতেও কার্পণ্য করেন। অগত্যা অন্নপূর্ণাকেই শেষ সম্বল ছোট ছেলে গৌরবের মুখে ভাতের চুলোটি টা এনে তুলে দিতে হয় গোমস্তাকাকার হাতে। শ্মশানবন্ধুরা শাশুড়িমায়ের মৃতদেহ নিয়ে বেরিয়ে যেতেই জিনিসপত্র নিয়ে জমিদারবাড়ি ছেড়ে বৈঠকখানাবাড়িতে গিয়ে ওঠে অন্নপূর্ণা। তাছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না তার। ভাসুররা জানিয়েই দিয়েছিল, জমিদারবাড়িতে থাকার মেয়াদ তাদের শেষ। শাশুড়িমায়ের কাজের দোহাই দিয়ে আর পড়ে থাকা চলবে না। খড়ের ওই চালাঘরটুকু তো তার নামে লিখে দিয়েছেন শ্বশুরমশাই। তাই সেখানে গিয়েই উঠতে হবে তাদের। তাই নিয়ে দু' কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়ে না দুই জা' ও। তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই তারা বলে, তোমার বাবা তো তোমাদের কথা ভাবেনি। ছোট বৌমায়ের নামে একটা বাড়ি লিখে দিয়েছেন।যদি পাওনাদারের কাছে থেকে আমাদের বাবারা বাড়িটি ছাড়িয়ে না নিত আমাদের তো পথে গিয়ে দাঁড়াতে হত।কই আমাদের কথা তো ভাবেন নি তোমার বাবা। জা'রা এমন ভাব করছিল যেন তাকে একটা সাতমহলা প্রাসাদ লিখে দেওয়া হয়েছে। সে তো একার জন্য কোনদিন কিছু চায়নি।


                                           আর শুনতে পারছিল না সে। তাই শুন্য হাতে বেরিয়ে আসে জমিদার বাড়ি থেকে। আর আনবেই বা কি ? ওই তো কিছু বাসনকোসন আর বিছানাপত্র ।আর নিয়ে আসে শ্বশুর--শাশুড়ির একটা করে ছবি। বৈঠকখানাবাড়িতেই শাশুড়ির তেরাত্রি অশৌচ পালন করে অন্নপূর্নারা। সে এক মাসই অশৌচ পালন করতে চেয়েছিল। কিন্তু খরচের ভয়ে গোমস্তাকাকা পুরোহিতের কাছে গিয়ে বিধান নিয়ে আসেন অপঘাতে মৃতদের ক্ষেত্রে নাকি তিনদিনই অশৌচ পালনের নিয়ম। ভাসুর -- জা ' রা অবশ্য সেটুকুও পালন করে না। দিব্যি তারা বন্ধুবান্ধব এবং শ্বশুরবাড়ির লোকেদের নিয়ে আমোদ ফুর্তি করে। সবই কানে আসে অন্নপূর্ণার। সে ভেবে পায় না যাদের বাবা-মায়ের স্মৃতি এখনও দগদগে হয়ে আছে তারা কি করে এমন হই হুল্লোড় করতে পারে ? তাই সে ভাসুরদের উপর আর কোন ভরসাই করে না। গোমস্তাকাকার সাহার্য্যে গুটি কয়েক আত্মীয় স্বজন আর শ্মশানবন্ধুকে খাওয়ানোরও ব্যবস্থা করে। তিন দিনেই সব কাজ চুকে যায়। এক্ষেত্রেও ভাসুররা হাত গুটিয়ে থাকেন। বাবা--মায়ের কোন দায়ই তার পালন করে না। কিন্তু বাবা মায়ের সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা করার সময় চুলচেরা হিসাবের বেলায় তাদের উৎসাহের অন্ত নেই। জমি সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে সায়ন্তনের তেমন কোন আগ্রহ নেই। আর ভাগ বাটোয়ার করার মতো আছেই বা কি ? বেশিরভাগই তো ভেষ্ট হয়ে গিয়েছে। আর যেটুকু ছিল তার সিংহভাগ বিকিয়ে গিয়েছে মামলার পিছনে। গোমস্তাকাকা বার বার বলে দিয়েছিলেন , মা তুমি কিন্তু যোগলকূণ্ডুর বাগানের জমি আর শিবসাগর পুকুরটা চাইবে। তোমার ভাসুরদের তো চিনি  , ভালো ভালো সম্পত্তিগুলো নিজেরা নিয়ে তোমাদের ডাঙা--ডহরগুলো দেবে।



                                    কিন্তু অন্নপূর্ণার প্রবৃত্তি হয় না ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ভাসুরদের কাছে নিজের দাবি জানাতে। এতদিন যাদের সামনে গলা তুলে কথা বলেনি তাদের সামনে কি করে গিয়ে সে নিজের দাবি নিয়ে দাঁড়াবে? তারফলে গোমস্তাকাকা যা আশংকা করেছিলেন তাইই ঘটে। বন্টননামাপত্রে সায়ন্তনের সই করাতে এসে গোমস্তা কাকা বললেন , মা যা ভেবেছিলাম ,তাই হয়েছে। ভালো ভালো জমিজমাগুলো  নিজেরা নিয়ে ওরা তোমাদের দিয়েছে ডোবা আর ডাঙা ডহর। কিছুই চাষ হবে না ওতে। আধা দামে সব বিক্রি করে দিতে হবে। তবে তোমরা যদি চাও তাহলে সই না করে নাহ্য ভাগের দাবি জানাতে পারো।
 ---- তা হয় না কাকা। আগে যখন বলেছি হাতে তুলে ওরা যা দেবেন তাই আমরা মেনে নেব তখন আর কথা পাল্টাতে পারব না।
----- তাহলে তোমাদের চলবে কি করে মা ?
----- জমি সম্পত্তি থাকলেই যে চলে না তা আপনি তো আমার চেয়ে ভালো জানেন কাকা । আপনিই তো জমিদারদের চকমিলানো দালানে সুখ গড়াগড়ি খেতে দেখেছেন। সেই জমিদারবাড়ির কর্তা--কর্ত্রীকে গৃহহারা হওয়ার ভয়ে ধরাধাম ছেড়ে চলে যেত হল।
 ---- কিন্তু তাহলে এতগুলি পেট তোমাদের চলবে কি করে মা ?
---- ভগবান যদি চান তো চলবে। নাহলে যা হওয়ার হবে। ভেবেও তো কিছু করতে পারব না।
----- তা অবশ্য ঠিক মা। দুর্বলের তো ভগবান ছাড়া কেউ নেই। কিন্তু ভগবানও যে দুর্বলকে দেখার সময় পাননা। তাই তো বড়ো চিন্তা হয়।
 সায়ন্তনের সই করিয়ে নিয়ে চলে যায় গোমস্তাকাকা। আর অন্নপূর্ণা ভাবতে বসে অনাগত ভবিষ্যতের কথা। নিশ্চিত আয়ের কোন সংস্থান নেই। অথচ ৯ টা পেট। শুধু তাই নয়, রয়েছে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার চিন্তা। সেটা অবশ্য আর বেশিদিন করতে হবে না। কারণ অর্থাভাবে না পারে ওদের বই কিনে দিতে, না পারে টিউশনি মাস্টারের ব্যবস্থা করে দিতে। তাই মাস্টার মশাইরা বলে দিয়েছেন বছর বছর ফেল করার জন্য স্কুলে আর না আসাই ভালো।


                                           কিন্তু তারা একবারও খতিয়ে দেখেন নি কেন ছেলেমেয়েগুলো বছর বছর ফেল করছে। তার উপরে রয়েছে মেয়েদের চিন্তা। সব মেয়ে গুলো একেবারে মাথায় মাথায়। বলতে নেই গুনে সরস্বতী না হলেও রূপে তাদের কেউ অলক্ষী বলবে না। সবথেকে চিন্তা হৈমন্তী কে নিয়ে। ভগবান তাকেও রূপ দিতে কার্পণ্য করেন নি। কিন্তু দেন নি চলার ক্ষমতা। বিপদে  পড়লে ছুটে পালিয়ে আত্মরক্ষা করতেও পারবে না। মেয়েটাকে নিয়ে যে কি করবে ভেবে পায় না অন্নপূর্ণা।সবকিছু নিয়ে প্রথমে সে সায়ন্তনের সংগেই আলোচনা করাই ঠিক করে।সেইমত রাতে খাওয়াদাওয়ার পর ছেলেমেয়েদের ঘুম পাড়িয়ে তারা দুজনে খেতে খেতে কথা শুরু করে। বিয়ে হয়ে এসে থেকে দেখছে সায়ন্তন এমনিতে তেমন বৈষয়িক নয়।কিন্তু পর পর বাবা - মাকে হারিয়েও সেই লোকটাই যেন ক' টা দিনেই  চিনে ফেলেছে বাস্তবটাকে। তবে তারও তো হাত পা বাঁধা।পরিবারের ছোট ছেলে বলে চাদর ছেঁড়া  আদরে মানুষ হয়েছে। আদরের জন্যই না হয়েছে লেখাপড়া , না হয়েছে কোন কাজ শেখা। বাবা- মা তার শরীরে কোনদিন কোন ঝড়ঝাপটাই  লাগতে দেননি।  তাই এই পরিস্থিতেতে তাকে চরম অসহায় দেখায়। অস্বস্তি কাটাতে সে বলে , তোমার দুশ্চিন্তা আমার চোখ এড়ায় না গো। দুশ্চিন্তা আমারও হয়। এতদিন মাথার উপর বাবা--মা ছিলেন তাই আমাকে গায়ে কাঠি নিতে হয়নি। কুটোটি কেটেও দুটো করতে হয়নি। আয়েসেই কাটিয়ে দিয়েছি। স্বামী হিসাবে তোমার কোন শখ আহ্লাদই পূরণ করতে পারি নি। সেই সব কথা ভেবে আজ আমার খুউব খারাপ লাগে জানো।   কিন্তু এবার ছেলেমেয়েগুলোর মুখ চেয়ে আমাকে কিছু একটা করতেই হবে। আমাকে মুনিস খাটতে তো কেউ নেবে না , নাহলে মুনিসই খাটতাম। ভাবছি তিনআনিদের মুদির দোকানে ডালিদারি করব। ওরা লোক নেবে শুনছি।


                                              চোখ ফেটে জল আসে অন্নপূর্ণার। আবার ভালোও লাগে। স্বামীর উদ্যোমী মনোভাবটা তাকে ভরসা দেয়, সাহস যোগায়। সে ভাবে, পরিস্থিতিই মানুষকে কত বদলে দেয়। জমিদারবাড়ির ছোট ছেলে হওয়ার সুবাদে সায়ন্তনকে কোন কাজই  করতে হয়নি বলে কাজ করার মানসিকতাই ছিল না এতদিন। কিছু করার উদ্যোমটাই হারিয়ে ফেলেছিল।  কিন্তু সব উপেক্ষা করে সে যে কিছু করব বলেছে তাতেই খুব খুশী হয় অন্নপূর্ণা। তার কেবল খারাপ লাগে জমিদারবাড়ির ছেলে হয়ে সায়ন্তনকে আর এক জমিদারের মুদিখানায় কাজ করতে হবে ভেবে। তাই সে বলে , শোন , তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। যতদিন কিছু না পাওয়া যায় ততদিন ডাঙা--ডহর বিক্রি করে চলুক। তুমি দেখ আরও ভালো কিছু কাজ পাও কিনা ।আর সৌরভটাকে প্রাইভেট মাস্টার দিয়ে পড়িয়ে যদি মানুষ করা যায় তাহলেএকদিন হয়তো আর আমাদের দুঃচিন্তা করতে হবে না। হতাশার মধ্যে সৌরভই একমাত্র আশার আলো। অন্যান্য ছেলেমেয়েরা বছর বছর ফেল করে। কিন্তু সৌরভ প্রতিবছর ক্লাসে ফার্স্ট হয়। বই, টিউশানি জোটে না, তবু পরের বই ধার করে নিজের চেষ্টায় সে এগিয়ে চলেছে।  তার কথা ভেবে গর্ব হয় সায়ন্তনেরও। সে বলে, তাহলে গোমস্তাকাকার সঙ্গে আলোচনা করে কিছু জমি বিক্রি করে দিয়ে সংসার চালাও, আর ওর পড়াশোনার পিছনে একটন নজর দাও।পারলে ছেলেমেয়েগুলোর জন্য একটু দুধ--ঘি, মাছ -- মাংসের ব্যবস্থা কোর। তাতে শক্তি এবং বুদ্ধি দুইই বাড়বে।
 অন্নপূর্ণাও তা জানে। তার ভাসুরের মেয়েদের জন্য কত এলাহি আয়োজন। তার ছেলেমেয়েদের দেখিয়ে দেখিয়ে কত সব নাম না জানা খাবার খায় তারা খোলা বারন্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।  আর তার ছেলেমেয়েরা পেট ভরে সবদিন খেতেও পায় না। তাদের মা'রা কপট শাসন করে বলে, ছিঃ ওইভাবে দেখিয়ে দেখিয়ে খেতে আছে মা। দেখছ না কেমন তাকিয়ে আছে। নজর লেগে যাবে যে। পেটে ব্যাথা করবে তখন বুঝবে। দাও -- দাও ওদের নাম করে থুতু দিয়ে এক টুকরো খাবার মাটিতে ফেলে দাও। যত সব রাক্ষসের দল এসে জুটেছে। তারপর বারন্দা থেকে থুতু দিয়ে একটুকুরো খাবার আসে পড়ে তার ছেলেমেয়েদের সামনে। তখন আর কোনদিকে না তাকিয়ে মেয়েদের হাত ধরে অন্যদিকে নিয়ে চলে যায় ছোট জা।


                                                       চোখ ফেটে জল আসে অন্নপূর্ণার। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে ছেলে মেয়েদের উপর। ছোটটাকে কান ধরে কয়েকটা চড় কসিয়ে দেয়। চোখ পাকিয়ে বলে, রাক্ষস ছেলে তোদের এত নোলা কেন। পেট না ভরে তো এবার সবাই মিলে আমার মুন্ডুটাই চিবিয়ে খা। তোদেরও পেটের জ্বালা জুড়োক, আমিও শান্তি পায়। মার খেয়ে সশব্দে কেঁদে ওঠে গৌরব। বাসন্তী ছুটে এসে মায়ের মারের হাত থেকে ভাইকে বাঁচায়। বলে, মা তুমি শুধু শুধু ভাইকে মারলে। ওর কি দোষ বলো ? ওদের তো কত জায়গা , আমাদের তো এইটুকুই। ওরা তো খাওয়ার সময় এদিকে না এলেই পারে।  অন্নপূর্ণাও সব বোঝে, তবু কেন যেন মাঝে মাঝে এমন করে মেজাজ হারিয়ে ফেলে বুঝতে পারে না। শুধুই কি খাবার ?  ভাসুরের মেয়েরা কত সুন্দর সুন্দর জামা - প্যাণ্ট পড়ে। কত দামী দামী খেলনা তাদের। তার ছেলেমেয়েরা দূর থেকে লোভাতুর চোখে চেয়ে থাকে। ছেলেমেয়েগুলোর মুখ দেখেই অন্নপূর্ণা বুঝতে পারে খেলনাগুলো একবার ছুঁয়ে দেখতে খুব ইচ্ছে ওদের। কিন্তু ভাসুরের মেয়েরা ওদের কাছেই ঘেঁষতে দেয়না। ছেলেমেয়েগুলো কেমন করে যেন বুঝে যায় , ওই রকম পোশাক, খেলনা কিনে দেওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের বাবা-- মায়ের নেই। তাই কোনদিন ওসবের জন্য বায়না করে না তারা। কিন্তু শিশু মন তো! ভাসুরের মেয়েদের ভালো পোশাক, খেলনা দেখে অবাক চোখে চেয়ে থাকে। খুউব কষ্ট হয় অন্নপূর্ণার। অক্ষমতার জ্বালা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায় তাকে।  তারও ইচ্ছা হয় ছেলেমেদের মুখে একটু ভালো খাবার , গায়ে একটা ভালো পোশাক কিম্বা হাতে একটা পচ্ছন্দসই খেলনা  তুলে দিতে, কিন্তু কোনদিন  ছেলেমেয়েদের হাতে তা তুলে দিতে পারবে কিনা তা ভেবে পায়না সে।


                                 
                                                 চোখ দিয়ে তার গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা। আজই গৌরবের জন্মদিন, আর আজই কিনা সে তার গায়ে হাত তুলল ? দুরে দাঁড়িয়ে তখনও ঠোট ফুলিয়ে চলেছে ছোট্ট ছেলেটা। হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকে অন্নপূর্না। কিন্তু গৌরব তখন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে গোঁ ধরে দাঁড়ায়।  অন্নপূর্ণা বোঝে মারের জ্বালার থেকে থেকেও বিনা দোষে শাস্তি পাওয়ার অভিমান তার বুকে বেশি বেজেছে। তখন ছেলের অভিমান ভাঙাতে তৎপর হয় মা। সে বলে ওঠে, ঠিক আছে , ঠিক আছে। মেরেছি বলে আমার ডাকে   আসবি না তো , বেশ যে হাত দিয়ে তোকে মেরেছি এই দেখ সেই হাতই আমি ঠুকে ভেঙে দিচ্ছি। বলে নিজের হাত দুটো সত্যি সত্যি সান বাঁধানো মেঝেতে ঠুকতে শুরু করে অন্নপূর্ণা। আর নিমেষে গৌরব ছুটে এসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কেঁদে ওঠে মা'ও। অন্য ছেলেমেয়েরাও ছুটে এসে মা'কে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কিছুক্ষণ পর সবাইকে শান্ত করে অন্নপূর্ণা বলে, শোন আজ বিকালে মোড়ের দোকান থেকে এক প্যাকেট গুড়ো দুধ আর ভেলিগুড় নিয়ে আসবি দেখি।পায়েস আর গরম গরম রুটি করে দেব তোদের। ওই সঙ্গে একটা লুডোও নিয়ে আসবি। আজ আর সন্ধ্যায় কাউকে পড়তে হবে না। সবাই একসংগে  লুডো খেলব। তার মুখের কথা শেষ হয়না। ছেলেমেয়েরা কলরব করে ওঠে -- আজ আমাদের ছুটি, গরম গরম রুটি। সামন্য একটু পায়েস আর রুটি, তাতেই ওদের মুখে ফুটে ওঠে কেমন স্বর্গীয় হাসি। অন্নপূর্ণাভাবে, এই জন্যই বোধহয় বলে শিশুর মধ্যেই ঈশ্বরের বাস।
     
     
                                                     ছেলেমেয়েদের নিয়ে দিনটা খুব আনন্দে কাটে। সায়ন্তনও সেদিন বাড়িতেই ছিল। এসেছিলেন গোমস্তাকাকা। নিজের ওই অভাবের মধ্যেও গোমস্তাকাকা গৌরবের জন্য লাল টুকটুকে একটা জামা এনেছিলেন।জামাটা পেয়ে ছেলের সে কি আনন্দ।বেশ সুন্দর মানিয়েছিল গৌরবকে।মাঝে একবার অন্নপূর্ণা মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল , আপনি আবার এসময় এসব আনতেগেলেন কেন ? আর গোমস্তাকাকার রাগ দেখে কে ? কিছুটা অভিমানহত হয়ে তিনি বলেন, কেন আমি কি এতই গরীব হয়ে গিয়েছি যে আমার নাতির জন্মদিনে একটা জামাও দিতে পারব না ?
---- বেশ কাকা, আমার ঘাট হয়েছে। আমার আর কোনদিন এমন কথা বলব না।
আর কথা এগোয়না হই হই করে এসে পড়ে ছেলেমেয়ের বন্ধুর দল। তারা অধিকাংশ নিন্মবর্গ অর্থাৎ সমাজ যাদের ছোটলোক বলে দাগিয়ে দিয়েছে সেইসব পরিবারের ছেলে।তথাকথিত ভদ্রলোকতথা বড়োলোকের ছেলেমেয়েরা তো তাদের সংগে মেশে না। তার ছেলেমেয়েরাও বড়োলোকের ছেলেমেয়েদের এড়িয়েই চলে।এ ব্যাপারে বাবার ধারা পেয়েছে ছেলেমেয়েরাও।বাবার মেলামেশার লোকও সেই বাগদি ভল্লার দল।দাদাঠাকুরের ছেলের জন্মদিনের খবর পেয়ে হাজির হয় তারাও। তাদের মধ্যে কেউ এনেছেন জমির একটা কুমড়ো, কেউবা আলু, কেউবা চাল। সেসব অন্নপূর্ণার পায়ের সামনে নামিয়ে রেখে ওরা বলে, ঠাকুরুনমা আমরা সব চাষাভুষো মানুষ। অন্য কিছু তো দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাই বাড়িতে যা ছিল খেতের ফসল তাই এনেছি। ঠাকুরুনমা ! সম্বোধনটা খট করে কানে লাগে। এতদিন লোকেশ্বাশুড়িমাকেই ওই সম্বোধন করেছে। সে ছিল বউঠাকুরুন। সাধারনত পরিবারের বড় বউই ওই সম্বোধনে সম্বোধিত হন। সেই প্রসঙ্গ তুলতেই ওরা হই হই করে ওঠে, আপনারা ছাড়া তো জমিদারবাড়ির কেউ আমাদেরই মানুষই মনে করে না। তাই আপনিই  আমাদের ঠাকরুনমা।সেই থেকেই অন্নপূর্ণা ঠাকরুনমা হয়ে ওঠে।


                                     কথায় কথায় রাত গড়ায় , লোকগুলোর খাবারের কি হবে ভেবে উতলা হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা । কারণ রুটি পায়েস ছেলেমেয়ে আর তাদের বন্ধুদের দিতেই শেষ হয়ে গিয়েছে। তাই খুব অপ্রস্তুত দেখায় তাকে। তার ওই অবস্থাদেখে অনেকেই ধরে ফেলে ব্যাপারটা। সবাই এগিয়ে এসে বলে,  মা ঠাকরুন আপনাকে কোন দুঃশ্চিন্তা করতে হবে না।আপনি কেবল হাড়িকুড়ি গুলো একটু বের করে দিন। দেখুন আমরা কি করি। এগিয়ে আসেন গোমস্তাকাকাও। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেদেরই আনা চাল-ডাল- সবজি দিয়ে বানিয়ে ফেলে খিঁচুড়ি আর টক। গোমস্তাকাকা, সায়ন্তন এবং সেও বসে পড়ে ওদের সঙ্গে। খেত -খেতেই অন্নপূর্ণা লক্ষ্য করে জমিদারবাড়ির বারন্দা থেকে তার ভাসুর - জা'রা তাকে উদ্দেশ্য করে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিচ্ছে নানা টিকা টিপ্পনী।অন্নপূর্ণার আজ আর ওই কথা গায়ে লাগে না।তার ছেলের জন্মদিনে ওদের মতো কেক কাটা হয়নি , মোমের নরম আলো জ্বলেনি, বক্সে হ্যাপি বার্থ ডে তু ইউ গানও বাজে নি।কিন্তু চাষাভুষো মানুষগুলো যখন খিঁচুড়ি - টক খেয়েই পরিতৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলে , কি সোয়াদ গো মা ঠাকুরুন। অনেকদিন মুখে লেগে থাকবে।  তখন সমস্ত অপ্রাপ্তি ছাপিয়ে এক অপার্থিব আনন্দে বুক ভরে যায় অন্নপূর্ণার। খাওয়া দাওয়ার পর বিদায় নেওয়ার সময়  সবাই যখন উচ্চস্বরে তার ছেলের জন্য শুভকামনা জানাচ্ছে , অন্নপূর্ণা দেখে তখন একে একে জমিদারবাড়ির বারন্দা থেকে মুখগুলো সব সরে যাচ্ছে।একে একে সবাই চলে যায়। তারপরই একরাশ দুঃশ্চিন্তা গ্রাস করে অন্নপূর্ণাকে।



                                                সমস্যার কথা সে খুলে বলে গোমস্তাকাকাকে। খুব শীঘ্রি কিছু টাকা যোগাড় করতেইহবে। বাড়িতে আর মাত্র দুদিনের চাল-ডাল রয়েছে।তারপর কি হবে?  অগত্যা জমি বিক্রির কথা গোমস্তা কাকাকে বলে সে। সব শুনে মদনকাকা বলেন, জমি-জিরেত বিক্রি করা একটা দুরারোগ্য রোগের মতো। একবার ধরলে আর আর ছাড়তে চায় না। শেষে গড়াতে গড়াতে ঘটির জল একদিন নিঃশেষ হয়ে যায়। তাছাড়া তাড়াহুড়ো করলে লোকে সুযোগ নেবে।আধা দামে হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে সবাই।
 ----- কিন্তু কাকা , জমি বিক্রি করা ছাড়া আমার যে আর কোন উপায় নেই।জমিদারবাড়ির ছেলে হয়ে উনি তিনআনিদের মুদিখানায় ডালিদারি করবেন বলছেন, এর থেকে খারাপ অবস্থা আর  কি হয় ?
----- বুঝি, মা সবই বুঝি। ভগবান যে কেন এত পরীক্ষা নিচ্ছেন সেটাই বুঝি না।আমারও তো সেই অবস্থা নয় মা ,  যে এই অবস্থায় তোমাদের পাশে দাঁড়াব।কর্তাবাবু গত হওয়ার পর থেকেই তো আমার বেতন বন্ধ। কোন রকমে একবেলা -- আধবেলা খেয়ে দিন কাটছে।
  ---- সে তো জানি কাকা। আপনার সামর্থ্য থাকলে কি আমার আর চিন্তা ছিল ? না জমি বিক্রির কথা ভাবতে হতো ? জন্ম না দিলেও আপনি তো আমার বাবাই।
আবেগঘন পরিস্থিতিতে দুজনেরই চোখ শুকনো থাকে না। কান্না লুকোতে চা করতে যায় অন্নপূর্ণা। কিছুক্ষণ পর গোমস্তাকাকাকে সে বলে,কাকা আপনি বেছে বেছে খারাপ জমিগুলো আগে বিক্রি করার ব্যবস্থা করুন। সেই টাকা দিয়ে একটা ছেলেমেয়েকেও যদি মানুষ করতে পারি তাহলে ওইসব জমিজমা আবার হবে।
 ---- তাই যেন হয় মা। ভগবান যেন এবার তোমার প্রতি মুখ তুলে চান।



                        কয়েকদিন পর গোমস্তাকাকা একজন জমির খরিদ্দার নিয়ে আসেন।দামদর ঠিক করে গোমস্তাকাকার হতে টাকা মিটিয়ে দেন তিনি। খরিদ্দার চলে যাওয়ার পর গোমস্তাকাকা টাকাগুলো অন্নপূর্ণার হাতে তুলে দিয়ে বলেন, সাবধানে তুলে রেখ মা। পরে একদিন জমিটা রেজিস্ট্রি করে দিতে হবে।গোমস্তাকাকা চলে যাওয়ার উদ্যোগ নিতেই অন্নপূর্ণা এগিয়ে গিয়ে তার হাতে কিছু টাকা তুলে দিতে যায়। কিন্তু সবেগে হাত সরিয়ে নেন গোমস্তাকাকা। বলেন , না-না , এ আমি নিতে পারব না। ওই টাকায় তোমাদেরই ক'দিন চলবে তার ঠিক নেই।
----- আমাদের যতদিন চলবে আপনারও ততদিন চলবে। বাবা অনাহারে থাকলে মেয়ের বুঝি মুখে ভাত উঠবে ? গোমস্তাকাকাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টাকাটা তার হাতে গুঁজে দেয় অন্নপূর্ণা। তারপর থেকেই জমি বিক্রি করেই সংসার চলে অন্নপূর্ণার।সায়ন্তন ছোটখাটো কাজের চেষ্টা করেছে, অন্নপূর্ণাই তাকে ওইসব কাজ করতে দেয়নি।খুব দ্রুত ঘটির জল শেষ হয়ে আসছে। অন্নপূর্ণা ভেবে পায় না, তারপর কি হবে। তার মধ্যেই বাসন্তীকে নিয়ে দুঃচিন্তায় পড়তে হয় তাকে। আর তাকে ঘরে রাখা যায় না।এবার তার বিয়ে না দিলেই নয়। তাকে এখন পার করতে না পারলে বাকি মেয়েগুলোর বিয়ে কবে দেবে সে ? তাই নিয়ে গোমস্তাকাকার সংগে কথা বলে সে।



                   সব শুনে গোমস্তাকাকা বলেন , ঠিকই বলেছো মা , কিন্তু মেয়ের বিয়ে দিতে গেলে তো পণ -যৌতুক - দান সামগ্রী সব দিতে হবে। সব জমি বিক্রি করেও তো তা হবে না।তাছাড়া একটা মেয়ের বিয়েতে সব বিক্রি করে দিলে খাবে কি , বাকি মেয়েদেরই বা কি হবে ?
 --- তাহলে কি হবে কাকা ?
----- সেই তো মা , সবাই তো আর কর্তাবাবুর মতো নন, পছন্দ হলো তো ছেলের বৌ করে ঘরে তুলবেন।
---- ওই রকম কিছু হয় না কাকা ?
---- সে রকম সম্ভাবনা খুব কম। তবে একটা খবর পেয়েছি বাতাসপুরের জমিদার চন্দ্রকান্ত গাঙ্গুলী  তার বড় ছেলের জন্য একটি পাত্রী খুঁজছেন। কোন দাবিদাওয়া নেই। কিন্তু সমস্যা আছে ---
------ কি সমস্যা কাকা ?
 ---- এমনিতে সবই ঠিক আছে। ওরা পড়তি জমিদার বংশ হলেও এখনো যথেষ্ট জমিজমা আছে। এলাকায় ভালোমানুষ বলে পরিচিতিও রয়েছে।
 ---- তাহলে ?
---- কথাটা বলতে আমার কেমন বাধো বাধো লাগছে মা। আসলে ছেলেটাই একটু ন্যালাক্ষেপা। এমনি ভালো ছেলে , শরীর স্বাস্থ্যও ভালো।আমাদের বাসন্তী মা তো লক্ষী প্রতিমা।ওই ছেলের হাতে তুলে দেওয়ার কথা মনে স্থান দিতেই ইচ্ছা করছে না। কিন্তু পরিস্থিতিই ভাবতে বাধ্য করছে মা।
 --- সত্যিই তো কাকা। কি করব কিছুই ঠিক করতে পারছি না বেশ ওদের বাবার সঙ্গে কথা বলে দেখি। সন্ধ্যাবেলায় স্বামীর কাছে কথাটা পাড়ে অন্নপূর্ণা। শুনে এক কথাতেই না করে দেয় সায়ন্তন। তখন অন্নপূর্ণা তাকে বোঝায় -- দেখ আমাদের যা পরিস্থিতি তাতে এছাড়া গতি কি। একটা মেয়ে হলে তাও কথা ছিল। বাসন্তীকে আর ধরে রাখা যায় না।
তার বয়সী গ্রামের সব মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ওর মনের কথাটা একবার ভাবো। এত রূপ থাকা স্বত্ত্বেও আমরা ওর বিয়ে দিতে পারছি না। মা হয়ে আমার যে কি দুঃশ্চিন্তা তা আমিই জানি।



                       অগত্যা নিমরাজি হতে হয় সায়ন্তনকে। তার সম্মতি পাওয়ার পরই গোমস্তাকাকা সব পাকা করে ফেলেন।কেবল বাসন্তীর মুখের দিকে চাইতে পারে না অন্নপূর্ণা। কেমন যেন একটা অপরাধ বোধ কাজ করে। মনে সোনার প্রতিমা যেন জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে।এক বিকালে মেয়ের মাথায় চুল বেধে দিতে দিতে বলে, মন খারাপ করিস না। কথায় আছে, জন্ম, মৃত্যু ,বিয়ে -- তিন বিধাতা নিয়ে। যার যেখানে লেখা আছে তার তো সেখানে বিয়ে হবে মা।কপালে সুখ থাকলে দেখিস, ওতেই তুই সুখী হবি।বলে বটে, কিন্তু অন্নপূর্ণা নিজেও বোঝে মনকে তার প্রবোধ দেওয়া হচ্ছে।বাসন্তী অবশ্য মাকে জড়িয়ে ধরে বলে -- তুমি অত ভেব না তো মা। আমার কপালে যা আছে তাই হবে।পাত্রপক্ষের দাবি  কিছু নেই। তবু বিয়ে বলে কথা , টুকটাক কেনাকাটা আছে , দু'চার  জন আত্মীয় স্বজন - পাড়া প্রতিবেশীকে নিমন্ত্রণও করতে হবে।সব মিলিয়ে একটা বড়ো খরচের ধাক্কা। গোমস্তাকাকাকে বলে তাই  বাড়ির পিছনের গোটা  বাগানটাই বিক্রি করে দিতে হয়।  নির্ধারিত  দিনে অয়নের সঙ্গে  বিয়ে হয়ে যায় বাসন্তীর।অয়নকে দেখে পাড়া প্রতিবেশীরা কত টিকা টিপ্পনী করে। সুযোগ ছাড়ে না জা 'রাও।অন্নপূর্ণা শুধু মনে মনে বলে , ঠাকুর মেয়েটাকে সুখী কোর। 


                                    অন্য সবকিছু ঠিকঠাক মিটে গেলেও, গোল বাঁধে খাওয়া দাওয়ার সময়। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থেকে ১ জন করে নিমন্ত্রণ করা করা হয়েছিল। নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল ভাসুর--জা'দেরও। অন্নপূর্ণা নিজে গিয়ে বলে এসেছিল, দিদি তোমরা ছাড়া তো আমাদের কেউ নেই। যদি বিয়ের আগের দিন গিয়ে একটু দেখেশুনে দাও, তাহলে খুব ভালো হয়। জা'রা সেদিন কোন প্রত্যুত্তর করেন নি। আগের দিন তো দুরের কথা, ভোজের দিনও আসে নি। বারান্দা থেকে দেখেছে আর নাক কুঁচকে হাওয়ায় নানা মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছে। শুধু তারাই নয়, গ্রামের বেশিরভাগ অবস্থাপন্ন লোকেরা আসে নি। আসার মধ্যে এসেছিল তার বাবা -- মা আর সায়ন্তনের বাগদি - হাড়ি- ডোম সম্প্রদায়ের অনুগামীররা। তারাই সব কাজকর্ম করে। আর তারই জন্য গোলমাল বেঁধে যায়।  হাতে গোনা কয়েক জন বরযাত্রী এসেছিল।তাদের মধ্য একজন ছিল তিনআনিদের আত্মীয়।টিফিন খাওয়ার পর সে গিয়েছিল তাদের সঙ্গে  দেখা করতে।বরযাত্রীদের খেতে বসার সময় সে ফেরে। আর ফিরেই গন্ডগোল বাধিয়ে দেয়। খাওয়ার আসরেই সে সবাইকে শুনিয়ে বলে ওঠে, শুনুন সবাই পাত্রীপক্ষ আমাদের জাত মারার চেষ্টা করেছে। আমাদের খাওয়ার জন্য  নিষ্ঠাবান ব্রাম্ভ্রণের পরিবর্তে জল অচল ছোটলোকদের দিয়ে রান্না করানো হয়েছে। ওই কথা শোনার পরই হই হই করে খাওয়া ফেলে উঠে পড়ে সবাই। হাতে পায়ে ধরেও তাদের আর কিছুতেই বসাতে পারে না সায়ন্তন ---অন্নপূর্ণা।



                                     তারা ভাবে, জাতটাই এত বড়ো হলো ? জাত-পাতের  অহংঙ্কারে যারা পাশে এসে দাঁড়ায় নি তাদের তুলনায় এইসব বাগদি ভল্লাদের আন্তরিকতাকে তারা কি করে অস্বীকার করবে ? চায় না তাদের বড়োলোকী অনুকম্পা ,  বাগদি- ভল্লাদের ভালোবাসাকে তারা কোনদিন অসম্মান করতে পারবে না। ওই পরিস্থিতিতে অপ্রস্তুতে পড়ে যান চন্দ্রকান্তবাবু।ছেলের বিয়ে দিতে এসে যে এই অবস্থায় পড়তে হবে তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। তবে তিনি বিচক্ষণ এবং ভালোমানুষ। তাই সে আর সায়ন্তন যখন তার কাছে এই পরিস্থিতির জন্য হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে যায় তখন তাদের হাত জ্বড়িয়ে ধরে বলেন,ছি ছি, এ রকমভাবে বলে আমাকে অপরাধী করবেন না। আপনাদেরপরিস্থিতি আমি বুঝি।ও ব্যাটারা না খাক, আমার বাড়িতে ওদের দুদিন খাইয়ে পুষিয়ে দেব। আমি কিন্তু না খেয়ে যাচ্ছি না।হবু বেয়াইয়ের ব্যবহারে অবাক হয়ে যায় তারা।নিপাট ভদ্রলোক বোধহয় এদেরই বলে। সে বাকরুদ্ধ গলায় বলে, আপনি ভালোমানুষ শুনেছিলাম, কিন্তু এতটা যে ভালোমানুষ তা ভাবিনি।
----- এই শুরু করলেন আবার, আমাকে লজ্জায় ফেলে সময় নষ্ট না করে কারা পিছন থেকে কলকাঠিটা নাড়ল তা খুঁজে বের করুন দেখি ?  মুখে না বললেও কারও আর বুঝতে বাকি থাকে না তিন আনির জমিদারবাড়ি লোকেরাই তাদের আত্মীয়ের কানে বিষ ঢেলেছে। কিন্তু কেন তারা এমনটা করল তা ভেবে পায় না অন্নপূর্ণারা। ওরা তো কার‍ও সাতে পাঁচে থাকে না। তবু তাদের সংগেই কেন বার এমন হয় ভেবে পায় না অন্নপূর্ণা।

                 ( ক্রমশ )

No comments:

Post a Comment