ঠাকরুনমা
অর্ঘ্য ঘোষ
( পঞ্চবিংশ কিস্তি )
ওরা তো কারও সাতে পাঁচে থাকে না।তবু তাদের সংগেই কেন বার বার এমন হয় ভেবে পায় না অন্নপূর্ণা। তবে মেয়ের বিয়ের আগে পাত্র নিয়ে যে খুঁতখুঁতানি ভাবটা ছিল সেটা কেটে যায়।অয়ন একটু হাবাগোবা ধরণের ঠিকই কিন্তু বাবার মতোই খুব ভদ্র। বাসন্তীর জন্য এর চেয়ে ভালো আর কি'ই বা তারা করতে পারত ? মনে মনে সেই কথা ভেবে স্বান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করে সে।কপালে থাকলে ওই ছেলেতেই সুখী হবে বাসন্তী।তাই ওই নিয়ে আর কোন আক্ষেপ করতে চায় না অন্নপূর্ণা।তাকে গ্রাস করে নেয় অন্য চিন্তা।বিক্রি করতে করতে জমি - জায়গা প্রায় সব শেষ।থাকার মধ্যে রয়েছে একটি পুকুরের ৪ আনা অংশ।বাকিটা রয়েছে তিনআনি জমিদারদের। তাই পুকুরটার প্রতি তাদের নজর রয়েছে তাদের অংশটা কেনার জন্য কতবার গোমস্তাকাকাকে বলেছে , অন্নপূর্ণা কানে তোলে নি। কিন্তু আর তো কানে না তুললে চলবেও না। ১২আনা অংশ তিনআনিদের থাকায় অন্য কেউ সেই পুকুর নিতেও চাইছে না। তাছাড়া পুকুরটা তিনআনিদের দিলে তারা সায়ন্তনকে তাদের মুদিখানায় ডালিদারির কাজটাও দেবে বলেছে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ওদেরই পুকুরটা দেওয়া যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয় অন্নপূর্ণার। পুকুর বিক্রি করে যা টাকা পাবে তাতে টেনেটুনে মাস খানেক চলে যাবে। তারপর মাস পূর্ণ হলেই তো সায়ন্তন বেতন পেয়ে যাবে। ওইভাবেই কোনরকমে জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে নিতে হবে। তারপর সৌরভ চাকরি বাকরি কিছু একটা পেয়ে গেলে আর চিন্তা নেই।
সায়ন্তন এবং গোমস্তাকাকাও তার মতেই সায় দেন। কিন্তু তিনআনির বাবুরা পুকুরের দামটা খুবই কম বলছেন , কার্যত সুযোগ বুঝে হাতিয়ে নিতে চাইছেন। তা নিয়ে কিছুটা দোটানায় পড়ে অন্নপূর্ণা। গোমস্তাকাকা তাকে বোঝায়, ওদের দেওয়া ছাড়া তো আর কোন গতি নেই মা। ওদের দাপটের মাঝে কে কিনতে আসবে ওই পুকুর ? এমনিতেই ওরা বলে বেড়াচ্ছে কে কিনছে, কিনুক তো দেখি। ওই কেনাই হবে। মাছ খেতে কোনদিনই পাবে না। সব ছেঁকে ধরে নেব। তাই কারও কারও কেনার ইচ্ছা থাকলে ওই হুমকির ভয়ে পুকুর কিনতে কেউ আর এগিয়ে আসছে না।
---- তাহলে উপায় কি কাকা ?
---- তিনআনিরা যা ফাঁদ পেতেছে তাতে পুকুর ওদেরকেই দেওয়া ছাড়া উপায় নেই মা। দাম হয়তো অনেক কম দিচ্ছে , কিন্তু দোকানের কাজটাও তো পাওয়া যাচ্ছে। এই বাজারে একটা স্থায়ী আয়ের সংস্থান তো কম নয়। গোমস্তাকাকার কথাতে সায় দেয় সায়ন্তনও। তিনআনিরা ওদের দোকানে কাজ করার জন্য দিনে দুবার খাওয়া সহ মাসে ১০০ টাকা করে মাইনা দেবে বলেছে। অন্নপূর্ণা হিসাব করে দেখেছে টিপে টিপে খরচ করলে ওই টাকাতে কোন রকমে সংসারটা চলে যাবে। হিসাব করে চলার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে ---- মেয়েদের স্কুল ছাড়িয়ে দেয়। তার মধ্য ছোটমেয়েটার পড়াতে একটু মাথা ছিল। স্কুল ছাড়িয়ে দেওয়ায় সে খুব কান্নাকাটি করেছিল। অন্নপূর্ণা বলেছিল, খুউব হয়েছে, আর লেখাপড়া করে কাজ নেই। ছাগল-ভেড়াকটা চড়ালে কাজ দেবে। মুখে ওই কথা বলেছিল বটে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার খুউব কষ্ট হয়েছিল। মেয়ে পড়তে চাইছে অথচ সে তাকে স্কুল ছাড়িয়ে ছাগল- ভেড়া চড়াতে বলছে। মা হয়ে অক্ষমতার জ্বালাটা তাই হজম করা খুব কষ্টকর হয়।
তারপর থেকেই মেয়েরা ছাগল -- ভেড়া চড়িয়ে বেড়ায়। কখনও ঘাস কেটে কখনও বা জ্বালানী কুড়িয়ে আনে। বাগানে বাগানে ফল-মাকড়ও কুড়িয়ে আনে। তা দিয়েই এক আধটা দিন চলে যায় তাদের। মেয়েদের দেখে নিজের মেয়েবেলার কথা মনে পড়ে যায় তার। তাদেরও তো অভাবের সংসার ছিল। তারও ওইভাবে আম-জাম- তাল কুড়িয়ে বেড়িয়েছে। কিন্তু তাদের নিয়ে কোন কথা হত না। কারণ তাদের ছিল একটাই পরিচয়। সেটা হলো গরীব। গরীবের ছেলেমেয়েরা তাল, আম, জাম কুড়িয়ে বেড়াবে না তো কারা বেড়াবে ? কষ্ট করে কুড়ানো ওইসব ফল সব সময় গরীবের ছেলেরা খেতেও পায় না। একবাটি মুড়ি কিম্বা একথালা ভাতের বিনিময়ে বড়োলোকেরা তা হাতিয়ে নেয়। সাপ খোপের ভয়, ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে, রাতের অন্ধকারে নিজেদের কুড়ানো ফল খাওয়ার লোভ জয় করে তুলে দিতো অন্যের হাতে। ছেলেমেয়েদের মধ্যেই নিজের সেই মেয়েবেলাটার সাদৃশ্য খুঁজে পায় অন্নপূর্ণা। কিন্তু তার ছেলেমেয়েদের পরিচয় শুধু গরীরই তো নয়, তারা যে জমিদারবাড়ির সন্তান। পাঁচজনে পাঁচকথা বলার সুযোগ ছাড়ে না। সবই কানে আসে তার কেউ কেউ তো তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই বলে, ভোররাতে সোমত্ত মেয়েদের তাল কুড়াতে পাঠানো না অন্য কিছু , কে জানে বাবা ! লজ্জাও করে না। ইঙ্গিতটা বুঝতে পারে অন্নপূর্ণাও, তাই মেয়েদের পায়ে সে একরকম বেড়িই পড়িয়ে দেয়। কেবল ছেলে দুটো বারণ শোনে না। কিন্তু একটা ঘটনার পর থেকে ছেলেদেরও আর যেতে দেয় না ।
দিনটার কথা আজও ভোলে নি সে। সেদিন ভোরে তাল কুড়াতে গিয়ে একটা নারকেলও কুড়িয়ে পেয়েছিল গৌরব। অমুল্য ধন পাওয়ার আনন্দে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু তিনআনির ছোটকর্তা নারকেলটা কেড়ে নিয়ে ঠেসে কান মুলে দেয় তার। শুধু তাই নয়, বলেছিল হারামজাদা ছেলে নারকেল চুরি করেছিস ? ফের যদি বাগানে দেখি মেরে ঠাং ভেঙে দেব।গৌরব অবশ্য এক ফোটাও কাদে নি সেদিন। বাড়ি এসে বলেছিল , জানো মা আজ না তালের সংগে একটা নারকেলও কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নারকেল দিয়ে তালবড়া করে সবাই মজা করে খাব। কিন্তু ছোটবাবুটা হাত মুচড়ে কেড়ে নিল। আবার বলল এবার ওদের বাগানে গেলে ঠাং ভেঙে দেবে। ওদের তো কত নারকেল। এই নারকেলটা না নিলে আমরা কেমন খেতে পারতাম বলো ? লাঞ্ছিত হয়ে ছেলে কাদে নি, কেঁদে ফেলেছিল অন্নপূর্ণা নিজে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল , দেখিস একদিন আমরা নারকেল কোঁড়া দিয়েই তালবড়া করব। কিন্তু আমার মাথার দিব্যি রইল তোরা আর ওদের বাগানে যাবি না।অন্নপূর্ণা সেদিন ভয় পেয়েছিল সত্যিই যদি তেমন কিছু হয়। যা মারহাট্টা ওদের বাড়ির ছোট ছেলেটা। সেই তিনআনিদের দোকানে তাই সায়ন্তনের কাজ করা নিয়ে কিছুটা দোটানা ছিল অন্নপূর্ণার। যদি সায়ন্তনকে তেমন কিছু করে বসে ওরা? কিন্তু সব শুনে গোমস্তাকাকা বলেন, কবে কি বলেছে তা নিয়ে এত ভাবছো কেন মা? বেকায়দায় পড়লে মানুষকে বেঁচেবর্তে থাকার জন্য কত কিছু করতে হয়। তাছাড়া এতক'টা মুখে অন্ন যোগাবে কি করে ? আমার সেই অবস্থা থাকলে কি আর দাদাঠাকুরকে ওই কাজ করতে যেতে দিতাম মা ? আমিই ওই কাজ করতাম। সায়ন্তনও বলে, তাছাড়া আমি তো চুরি করছি না। কাজ করব, মাইনে নেব। আর খুউব বেশিদিন ওই কাজও আমাকে করতে হবেনা। বড়খোকা একটা চাকরি বাকরি পেলেই কাজ ছেড়ে দেব।
অগত্যা ঘাড় পাততে হয় অন্নপূর্ণাকে। সে স্বামীকে বলে, তবে তুমি কথা দাও অপমানিত হলে তুমি আর ওই কাজ করবে না। আমি বরং লোকের বাড়ি মুড়ি ভেজে, ধান সিদ্ধ করে সংসার চালাব। ওই কাজ আমার জানা আছে।
---- আর তাতে বুঝি আমার খুব সম্মান বাড়বে। লোকে বলবে এতদিন বাবার ঘাড়ে বসে খেয়েছে। এবার বৌয়ের ঘাড়ে চেপেছে। সায়ন্তনের কথাতে সায় দেন গোমস্তাকাকাও। অন্নপূর্ণার আর কোন ওজর আপত্তি ধোপে টেকে না। ছেলেমেয়েগুলো অন্তত খেয়ে পড়ে বাঁচবে ভেবে অন্নপূর্ণা আর কিছু বলে না। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক। দুমাসের মাথায় তার প্রমাণ পায় অন্নপূর্ণা।শেষ পর্যন্ত ৩০০ টাকায় পুকুরের অংশটা তিনআনিদেরই বিক্রি করে দেয় অন্নপূর্ণা। বিনিময় ওরা সায়ন্তনকে মুদিখানায় চাকরিটাও দেয়। প্রথম মাসটা পুকুর বিক্রি আর সায়ন্তনের বেতনের টাকায় কোন রকমে চলে যায়। আরও কিছুদিন চলত। কিন্তু তিনআনিদের জন্যই সেটা সম্ভব হয়নি। সায়ন্তনের বেতনের টাকাটা ওরা নগদে দেয় নি। দোকানের চাল ডাল দিয়ে শোধ করেছে ওরা। তার উপরে বাজার চলতি দামের চেয়ে অনেক বেশী দাম ধরে নেওয়া হয়েছে ওইসব জিনিসপত্রের। অন্নপূর্ণা হিসাব করে দেখেছে ৭৫ টাকার জিনিসপত্র দিয়েই একমাসের বেতন শোধ করেছে ওরা। তবু মুখ বুজে সব সহ্য করে নেয় সে। তাছাড়া উপায়ও তো কিছু নেই। তাদের যে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। তাই সব জেনে বুঝেও মেনে নিতে হয় তিনআনিদের শোষণ।
কিন্তু দুমাসের মাথায় আসল স্বরূপ প্রকাশ পায় ওদের। তার আশঙ্কাই সত্যি হয়। ততদিনে পুকুরটা রেজিস্টারি করে নিয়েছে ওরা। তারপর মাস পূর্ণ হওয়া স্বত্ত্বেও বার বার তাগাদা দিয়েও নগদ টাকা কিন্বা চাল ডাল কিছুই মেলে না। বেশি তাগাদা দিলে মারমুখী হয়ে ওঠে তারা। ঘরে তীব্র অভাব। কাজ করেও বেতন না পেয়ে মেজাজ গরম হয়ে যায় সায়ন্তনের।কড়া করে দু'কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়ে না সে। আর যাই কোথায় ? সেখানে তখন হাজির ছিল ওদের মারকুটে ছোটছেলেটা। সে আচমকা ঝাপিয়ে পড়ে সায়ন্তনের উপর। বাকিরাও তখন থেমে থাকে না। সবাই মিলে বেধড়ক মারধোর করে চোর অপবাদ দিয়ে দোকান থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেয় সায়ন্তনকে। ছোট ছেলেটা শাসায়, শালা হারামজাদা--- চুরি করে আবার বেতন চাইছে। মেরে মুখ ভেঙে দেব। চুপচাপ বাড়ি চলে যা। নাহলে পুলিশের হাতে তুলে দেব , তখন সারাজীবন ঘানি টানবি। রাগে অপমানে লজ্জায় মাথা নীচু করে বাড়ি ফিরে আসে সায়ন্তন।আর তাকে দেখে শিউড়ে ওঠে অন্নপূর্ণা। সারা গায়ে কালশিটে, বিভিন্ন জায়গায় রক্ত ঝড়ছে। পশু নাহলে , মানুষ হয়ে কি কেউ মানুষকে এমনভাবে মারতে পারে ? বেতন দেওয়ার ইচ্ছে না থাকলে বলে দিলেই তো হত , চোর অপবাদ দিয়ে এভাবে মারার কি দরকার ছিল ? এই আশঙ্কাটাই তো সে করেছিল। তা যে এত তাড়াতাড়ি সত্যি হয়ে যাবে তা ভাবতে পারে নি। ঘরে এক ফোটা ওষুধ ও নেই। গাঁদার পাতা থেঁতলে স্বামীর ক্ষতস্থানগুলোতে লাগাতে লাগাতে কখন যে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে তা বুঝতে পারে নি অন্নপূর্ণা। খেয়াল হয় স্বামীকেও ফুঁপিয়ে উঠতে শুনে। কান্না বড়ো সংক্রামক। কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ছেলেমেয়েরা। বাবার ওই অবস্থা দেখে তাদের চোখও ঠল ঠল করছে। তাই কান্না থামিয়ে স্বামীকে স্বান্ত্বনা দেয় সে। খবর পেয়ে ছুটে আসেন গোমস্তাকাকা। তিনিও সায়ন্তনকে দেখে কেঁদে ফেলেন। তার গলায় ঝড়ে পড়ে আক্ষেপ
--- চরম বোকা বনে গেলাম মা।এতদিন জমিদারি সেরেস্তায় কাজ করেও ওদের চালাকিটা ধরতে পারলাম না পুকুরের অংশটা আধা দামে হাতানোর জন্যই ওরা যে এভাবে চাকরি দেওয়ার নাটক করবে আমি ভাবতেও পারি নি মা। দেখো ভগবান ওদের ভালো করবে না।
---- ভগবানের প্রতি আর আমার ভরসা নেই কাকা।
---- কিন্তু মা , দুর্বল আর গরীব মানুষের তো ভগবান ছাড়া গতিও নেই।
ওই ঘটনার পর খুবই মুসড়ে পড়ে অন্নপূর্ণা।বাড়িতে কানাকড়িও আর সম্বল নেই।ঘটিবাটিটুকু পর্যন্ত বিকিয়ে দিয়েছে। কি করে যে ছেলেমেয়েগুলোর মুখে দুবেলা দুটো খাবার তুলে দেবে তাই ভেবে দিশাহারা হয়ে পড়ে সে। থাকার মধ্যে আছে কয়েকটা ছাগল - ভেঁড়া। তাই বিক্রি করে কোনরকমে জোড়াতালি দিয়ে চলছে সংসার। কিন্তু সে আর ক'দিন , তারপর কি হবে তা ভেবে কোন কুল কিনারা পায় না অন্নপূর্ণা। সায়ন্তন সমানে বিভিন্ন জায়গায় ছোটখাটো যেকোন ধরনের কাজের চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু কোথাও কোন সুবিধা করতে পারছে না। তিনআনিরা যে হাতে -- ভাতে দুদিক থেকেই মেরে ফেলেছে।তারা চোর অপবাদ দিয়ে দাগিয়ে দেওয়ায় সায়ন্তন যেখানেই যায় সেখানেই তাকে শুনতে হয় , আরে তুমিই তো চুরি করে ধরা পড়েছিলে না ? আবার চুরির মতলবে কাজ খুঁজতে এসেছো। যাও এখান থেকে। সায়ন্তন যত তাদের আসল ঘটনটা খুলে বলতে যায় তত তারা মারমুখী হয়ে ওঠে। কেউ তার কথা কানে তুলতেই চায়না। জগতের এই হলো নিয়ম। একবার কাউকে অপরাধী হিসাবে দাগিয়ে দিলেই হলো। কেউ আর সত্যি মিথ্যা খতিয়েও দেখে না। এমন কি গণপ্রহারে অংশ নেওয়া মানুষজন অনেক সময় খোঁজও নেন না যাকে মারা হচ্ছে তার অপরাধটা আসলে কি। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কোন পথচারী হয়তো হঠাৎ দেখলেন হাতপা বেঁধে কাউকে মারা হচ্ছে , অমনি তার হাত নিশপিশ করে ওঠে। বাঁধা মানুষকে মারার এমন সুযোগ অনেকেই হাতছাড়া করতে চান না। ঘা কতক লাগিয়ে দিয়ে নিরাসক্তের মতো বাজার করতে চলে যান। আসলে বাধা অবস্থায় মানুষকে মেরে মানুষ বোধহয় পৌরুষ জাহিরের পৌশাচিক উল্লাস খুঁজে পায়।
কিছুদিনের মধ্যেই সায়ন্তনের জীবনেও সেটাই অমোঘ সত্য হয়ে দেখা দেয়। তিনআনিরা চোর হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার পর কোথাও কোন কাজ তো জোটেই নি, উল্টে বিপত্তি দেখা দেয় তার জীবনে। কোথাও বাগানের কলার কাঁদি , মাঠের আদা, দরমার মুরগি কিম্বা কলতলায় পড়ে থাকা এঁটো বাসন চুরি হলেই সবাই বলতে শুরু করে , এ নিশ্চয় ব্যাটা সায়ন্তনের কাজ। শালা সারাদিন কিছু কাজ করবে না , বসে বসে খাবে আর কোথাই কি আছে দেখে বেড়াবে। ধরে নিয়ে আয় ব্যাটাকে। তারপর থেকে যেখানেই যা চুরি হয় প্রথম সন্দেহটা গিয়ে পড়ে সায়ন্তনের উপরে। দল বেধে এসে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় তাকে। কতবার ওদের হাতে পায়ে ধরে আটকানোর চেষ্টা করেছে অন্নপূর্ণা। কোন লাভ হয়নি। তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে তুলে নিয়ে গিয়েছে সায়ন্তনকে। বাবা-- মায়ের ওই অবস্থা দেখে ছেলেমেয়েরা চিৎকার করে কেঁদে উঠেছে। ভাসুর - জা, পাড়া -- প্রতিবেশীরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখেছে। কিন্তু কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় নি। বরং দূর থেকে মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছে , যেমন কর্ম তেমনি ফল। বসে বসে খেলে মাঝে মধ্যে ওই রকম মারও তো খেতেই হবে বাবা। অন্নপূর্ণা ভাবে, ওরা কি একবার খোঁজ নিয়ে দেখেছে কেন সায়ন্তনকে বসে থাকতে হয়, আর বসে বসে তারা কি খায়। এই বিপদের দিনে একে একে সবাই তাদের পাশে থেকে সরে যায়। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য চোরের দায়ে ধরা পড়ার আশঙ্কায় অনেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। আত্মীয় স্বজনরাও মুখ ঘুরিয়ে নেয়। লজ্জায় অন্নপূর্ণাও কাউকে মুখ দেখাতে পারে না। সমাজে তারা একঘরে হয়ে পড়ে । বাদ যায় না ছোট ছেলেমেয়েগুলোও। তাদের দেখেই সমবয়সী ছেলেমেয়েরা মুখে মুখে ছড়া কাটে। লজ্জায় অপমানে মুখ চোখ লাল হয়ে যায় ছেলেমেয়েদের। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তাই তারা বাড়ি থেকে বেরোনোই বন্ধ করে দেয়। ছেলেমেয়েদের নিয়ে গৃহবন্দীর মতো দিন কাটে অসহায় অন্নপূর্ণার।
এই দুর্দিনে থাকার মধ্যে পাশে রয়েছেন একমাত্র গোমস্তাকাকা। তারও বয়েস হয়েছে। চোখে ভালো দেখেন না, ভালোভাবে চলতে ফিরতেও পারেন না। কিন্তু সায়ন্তনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর পেলেই ছুটে আসেন তিনি। তারপর ছুটে যান যারা ধরে নিয়ে গিয়েছেন তাদের কাছেও। হাতে পায়ে ধরে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করেন সায়ন্তনকে। ততক্ষণে মেরে হাতের সুখ করে নেওয়ার পর অনেকে বোঝেন সায়ন্তনকে ধরে আনাটা ভুল হয়ে গিয়েছে, তারা তখন গোমস্তা কাকার কথা শুনে সায়ন্তনকে ছেড়ে দেয়। আবার মারধোর করার পরেও যাদের আশ মেটে না তারা তুলে দেয় পুলিশের হাতে। আবার থানায় পুলিশ একপ্রস্ত পেটায়। তারপর চুরি ছিনতাইয়ের কেস দিয়ে কোর্টে চালান দেয়। কোর্ট থেকে গোমস্তাকাকা যখন জামিন করিয়ে নিয়ে ফেরে তখন আর মানুষটার দিকে তাকানো যায় না। মারের চোটে শরীরের বিভিন্ন জায়গা ফুলে ঢোল। ভাল করে হাটতেও পারে না। স্বামীর কষ্ট আর দেখতে পারে না অন্নপূর্ণা। ছেলেকে পাঠিয়ে ওষুধ আনায়। ওষুধ লাগিয়ে দিতে দিতে চোখ জল চলে আসে তার। সে ভেবে পায় না, কেন মানুষটাকে এভাবে বিনা দোষে শাস্তি পেতে হচ্ছে। শুধু এক-দুবার নয়, দিনের পর দিন একই ভাবে মার খেলে লোকটা তো মরে যাবে। সবদিন পেট ভরে খাওয়াও জোটে না , তার উপরে ওই মার হজম করা সহজ কথা নয়। খাবার জুটবেই বা কি করে ? পোষা হাস -- মুরগি , ছাগল --ভেঁড়া বিক্রি করে কোন রকমে যদিও বা শাকভাত জুটছিল , সেটাও বন্ধ হওয়ার মুখে। চোর সন্দেহে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধোরের পর তুলে দিচ্ছে পুলিশের হাতে। আর ছাগল-- ভেড়া বিক্রি করেই তাকে ছাড়িয়ে আনতে হচ্ছে।
শুধু নতুন কেসই নয়, পুরনো কেসগুলিতেও নির্ধারিত দিনে কোর্টে হাজিরা দিতে হয়। তারও খরচ আছে। যারা সায়ন্তনকে মিথ্যা অভিযোগে জেলে পাঠাচ্ছে তারা কেমন করে বুঝবে একবার মিথ্য মামলায় জেলে পাঠানো মানে তার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কয়েকদিনের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া। এইভাবে বার বার সন্দেহের বশে মার খেতে খেতে আর মিথ্যা অভিযোগে জেল খাটতে খাটতে সায়ন্তন কেমন যেন বদলে যেতে থাকে। নরম মনের লোকটার চোখে মুখে কেমন যেন মরীয়া ভাব ফুটে ওঠে। সব সময় কি যেন একটা চিন্তায় থাকে সে। ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে পড়লে একদিন রাতে সে সায়ন্তনকে চেপে ধরে ---- তোমার কি হয়েছে বলো তো ? কয়েকদিন ধরেই দেখছি তুমি কেমন যেন হয়ে গিয়েছো। তোমার ভাবগতিক আমার ভালো লাগছে না।
----- আমি একটা কথা কয়েকদিন ধরেই ভাবছি। তোমাকে বলবো বলবোও ভাবছিলাম।
----- কি কথা ?
----- ভাবছি চুরি করাই ধরবো।
----- মানে , কি বলছো তুমি ?
----- দেখ আমাদের তো দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। এবার তো সবাইকে অনাহারে মরতে হবে।
----- তা বলে তুমি চুরি করবে ?
---- সৎভাবে কাজ করার চেষ্টা করে তো অনেক দেখলাম। কিন্তু চোর অপবাদ আমাকে সেই সুযোগ দিল না।
----- ভিক্ষা করে খাবো তাও ভালো। কিন্তু ওই চিন্তা তুমি ছাড়ো।
----- তাতেও কিছু লাভ হবে না। একবার যখন চোর হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন যেখানেই কিছু চুরি হবে লোকে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। মারধোর করে পুলিশের হাতে তুলে দেবে। আর আমাকে ছাড়াতে গিয়ে তুমি ফতুর হয়ে যাবে।
----- তবুও তুমি আর একবার ভাবো। তুমি চোর হবে মানতে পারছি না।
------ ভাবাভাবির কিছু নেই। মানতে না পারারও কিছু নেই। চুরি না করেই যখন মার খেতে হচ্ছে, জেলে যেতে হচ্ছে আর অনাহারে থাকতে হচ্ছে তখন চুরি করেই মার খাওয়া , জেলে যাওয়া ভালো। তাহলে অন্তত ছেলেমেয়েগুলোকে অনাহারে থাকতে হবে না।
---- তাহলেও এই যুক্তি তোমার আমি মানতে পারছি না। এতদিন তোমাকে চোর অপবাদে মার খেয়ে জেল খাটতে হলেও নিজের মনের কাছে তো স্বচ্ছ ছিলাম। মনে মনে একটা স্বান্ত্বনা খুঁজে পেতাম, যাই হোক তুমি তো চুরি করো নি। কিন্তু সত্যি সত্যি চুরি করলে যে সেই স্বান্ত্বনাটা আর থাকবে না।
----- তোমার এই সততার দাম কি আছে বলো তো? কেউ কানাকড়ি মুল্য দেয়? কেউ কি ভেবে দেখে এই লোকটা চুরি করতে পারে কিনা ? তুমি কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবে যে আমি সত্যি চোর নই ? বরং লোকে উল্টোটাই ভাববে। তারা তো বলাবলিই করে, চুরি নিশ্চয় করেছে না হলে এত লোক থাকতে সবাই ওকেই বা বারবার ধরে নিয়ে যাবে কেন ?
---- কে কি বলল তাতে কি এসে যায় , নিজের মন যেটা বলে সেটাই তো আসল।
---- এই কথাটা তোমার আমি মানতে পারলাম ঠাকরুন। আমিও কয়েকদিন ধরে মনের সঙ্গে অহরহ যুদ্ধ করে চলেছি। কিন্তু কোন স্থিরতা পাচ্ছি না।
ঠাকরুন! এতদিন অন্যরা ঠাকুরুনমা বলে সম্বোধন করলেও সায়ন্তন এই প্রথম তাকে ঠাকরুন বলল। যখন জমিদারবাড়ির রমরমা ছিল তখন ওই সম্বোধনটাই সমীহ আদায় করে নিত। আজ নিতান্তই হাস্যকর মনে হয় তার। আপত্তি করেও লাভ হয়নি। কিছু মানুষ তাকে ওই সম্বোধনই করে। আজ সায়ন্তনও করল।
যুক্তি -- পাল্টা যুক্তিতে কখন রাত ভোর হয়ে যায় টের পায় না কেউ। অন্নপূর্ণা টের পায় সায়ন্তনের চোখে মুখে টানাপোড়নের স্পষ্ট ছাপ। টানাপোড়ন কম হয় না অন্নপূর্ণারও। সায়ন্তনের যুক্তিগুলো পুরোপুরি সে উড়িয়ে দিতেও পারে না। সত্যিই তো একটা মানুষ আর কত সহ্য করবে। কিন্তু নিজের স্বামীকে একটা সত্যিকারের চোর ভাবতেও তার কষ্ট হয়। একসময় ঘুমিয়ে পড়ে অন্নপূর্না। সকালে উঠে সায়ন্তনকে চা দিতে গিয়ে দেখে তার চোখে মুখে আর টানাপোড়নের চিহ্ন মাত্র নেই। তাহলে সায়ন্তন তার যুক্তিই মেনে নিল শেষ পর্যন্ত। কথাটা ভাবতে খুব ভালো লাগে তার। কিন্তু কয়েকদিন পর তার ভুল ভেঙে যায়। সেদিন সন্ধ্যা থেকেই তুমুল বৃষ্টি আর নিকশ কালো অন্ধকার। এক হাত দুরের মানুষকেও দেখা যায় না। বাড়িতে সেদিন এক ছটাকও চাল-ডাল নেই। কিছু কেনার মতো পয়সাও নেই। থাকার মধ্যে রয়েছে সামান্য কিছুটা আটা আর ভেলিগুড়। গুড় আর আটা গোলা খেয়েই সকাল সকাল শুয়ে পড়ে সবাই। কাল সকালে ছেলেমেয়েগুলোর মুখে কি তুলে দেবে ভেবে ঘুম আসছিল না অন্নপূর্ণার। সায়ন্তনও তা আঁচ করে ঘুমোয় নি দীর্ঘক্ষণ। বাইরে তখন প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝা। একই ঝড় বইছে দুজনের মনেও। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় এক সময় গভীর ঘুমে ঢলে পরে অন্নপূর্ণা। মাঝরাতে ঘুমে ভেঙে দেখে স্বামী পাশে নেই। সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমে আসে সে। দেখে কেউ কোথাও নেই। ঘরের সদর দরজা বাইরে থেকে আটকানো। গেল কোথাই মানুষটা ? মনে একটা কু ডাকে। তবে কি --!
দুশ্চিন্তায় আর দুচোখের পাতা এক করতে পারে না সে। দেওয়ালে হেলান দিয়ে ঠায় বসে থাকে। অনেকক্ষণ পর একটা বস্তা কাঁধে সায়ন্তন ফেরে। অন্নপূর্ণা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ঠোটে আঙুল ছুঁইয়ে তাকে চুপ করিয়ে দেয় সায়ন্তন। অন্নপূর্ণা তখনই বুঝে যায় সে যা আশংকা করেছিল তাই ঘটেছে। বস্তা খুলে সায়ন্তন এক কাঁদি কলা বের করে। তা দেখে অন্নপূর্ণা খুব চুপি স্বরে বলে, তুমি শেষপর্যন্ত সেই চুরি করলে।তার চেয়েও নিচু স্বরে সায়ন্তন বলে, চুরি না করলে ছেলেমেয়েগুলোর মুখে কি তুলে দেবে সকালে ?
---- তাবলে চুরির টাকায় ওদের খাওয়াতে হবে? সে যে বড়ো ঘেন্নার ব্যাপার হবে।
---- দেখ, চুরি না করেও আমরা সবার ঘৃনার পাত্র। আমাদের মতো মানুষের ঘেন্না বলে কিছু থাকতে আছে বলো ?
----- কিন্তু কাজটা তুমি একদম ভালো করো নি।যাদের কলা তারা যদি সব জেনে যায় ? তার চেয়ে বরং কলাবাগানেই কাদিটা ফেলে দিয়ে এসো।
---- তিনআনিদের বাগান থেকেই কেটে এনেছি কাঁদিটা। শালারা চুরি না করেও আমাকে চোর সাজিয়েছিল। আজ চুরি করে শোধ নিলাম।
স্বামীর কথাটা শুনেই আতকে ওঠে অন্নপূর্ণা। বলে , এ তুমি কি করেছো ? ওদের চেননা কি নিষ্ঠুর লোক ওরা ? জানতে পারলে রক্ষা থাকবে ? তার চেয়ে বরং ওদের কলাবাগানেই ফেলে দিয়ে এসো কাঁদিটা।
---- তোমার মাথা খারাপ। ভোর হয়ে আসছে। যখন কলা কেটে এনেছি তখন কেউ দেখেনি, এখন ফেলে আসতে গিয়ে যদি কারো চোখে পড়ে যায় , কি হবে ভেবেছো একবার? তাছাড়া ফেলে এলেও তো সকালে সেই চোরের দায়ে আমাকেই ধরবে।
কথাটা উড়িয়ে দিতে পারে না অন্নপূর্ণাও। উভয় সংকটে তার মাথা কাজ করছে না ভালো। তাই সায়ন্তকেই জিজ্ঞাসা করে , তাহলে উপায় ? ওরা যদি বাড়িতে খুঁজতে চলে আসে ?
---- তুমি কিছু চিন্তা কোর না তো, ভোর ভোর মাঠপলশা হাটে কলা কাঁদিটা বিক্রি করে ছেলেমেয়েদের জন্য খাবার কিনে আনব।
ছেলেমেয়েদের খাবার আনার জন্য নয়, চুরির আপদ বিদায় করতে অন্ধকার থাকতেই স্বামী হাটের উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেয় অন্নপূর্ণা। আর স্বামী বেড়িয়ে যেতেই দূর্গানাম জপ শুরু করে সে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমুল হই ইট্টগোল কানে আসে তার। দরজা খুলে বেরোতেই তিনআনিদের হাক -ডাক কানে আসে। ছোট ছেলেটার গলাই বেশি শোনা যায়, জানতামই এ সানা শালারই কাজ। তাই তক্কে তক্কে ছিলাম। শালার পাপ আজ পরিপূর্ণ হয়েছে বলেই বমাল সহ ধরা পড়েছে।দড়ি দিয়ে নারকেল গাছে বাধ হারামজাদাকে। আজ ভালো করে কলা খাইয়ে দিচ্ছি ওকে। আর শুনতে পারে না সে। মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে তার। বুঝতে বাকি থাকে না সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়েই গিয়েছে।
---- ঠাকুর এ তুমি কি করলে। আর যে কোথাও মুখ দেখানোর জো রইল না। তার উপরে এই খবর যদি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছোয় তাহলে হয়তো আর কোন সম্পর্কই রাখবে না ওরা। লোকটাকেও ওরা সহজে ছাড়বে না। কাল থেকে পেটে কিছু নেই । মার খেতে খেতে মরে যাবে না তো লোকটা ? কেউ তো আর বিশ্বাসই করবে না, এতদিন ওকে সন্দেহের বশে ধরে নিয়ে যাওয়া হত, এই ওর প্রথম চুরি। বরং সবাই উল্টোটাই ভাববে। ভেবে কিছু কুল কিনারা পায় না অন্নপূর্ণা। সেদিন সবার অভুক্ত অবস্থায় কাটে। ছেলেমেয়েদের বাড়ি থেকে বেরোতে দেয় না সে। খবর পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা।তিনআনিদের হাতে পায়ে ধরে সায়ন্তনকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু ওরা সাফ জানিয়ে দেয় , সায়ন্তনকে পুলিশের হাতেই তুলে দেবে। সেই মতো দিনভর নির্মম ভাবে মারধোরের পর সায়ন্তনকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় ওরা।
মাস খানেক পর জামিনে ছাড়া পেয়ে ফিরে আসে সায়ন্তন। কিন্তু সে এক সম্পুর্ণ অন্য মানুষ। বড্ড জেদী আর একরোখা হয়ে ওঠে সে জেলের ভিতরে। অল্পদিনেই চুরি করাটা তার নেশা হয়ে দাঁড়ায়। যেদিন যেখানে যা পায় তাই চুরি করে আনে। অন্নপূর্ণার শাসন- বারণ কিছুই মানে না। স্বামীর চুরির রোজগারের খাবার গলা দিয়ে নামতে চাই না তার। কিন্তু ছেলেমেয়েদের মুখ চেয়ে খেতেও হয়। না হলে ওদের মনে হাজারটা প্রশ্ন দেখা দেবে। চোখের সামনেই মানুষটাকে পুরোপুরি চোর হয়ে উঠতে দেখে খুব খারাপ লাগে তার। কিন্তু মনে মনে ভাবে, এজন্য তো সমাজই দায়ি। একটা ভালো মানুষকে ভালোভাবে সমাজই তো বাঁচতে দিল না।সায়ন্তন তো চেষ্টার কোন ত্রুটি করে নি। এখন রাত্রি হলেই চুরি করতে বেড়িয়ে যায় সে। যেখানে যা পায় নিয়ে ফেরে। কোথাও কোথাও ধরা পড়ে মার খেয়ে জেলেও যায়। ফিরে এসে আবার শুরু করে। লজ্জায় আর কোথাও মুখ দেখাতে পারে না অন্নপূর্ণা। সব থেকে খারাপ লাগে বাপের বাড়ি আর মেয়ের বাড়ির কথা ভেবে। এরই মধ্যে দুদিন দু 'জায়গায় চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে সায়ন্তন। সেই থেকে মেয়ে আর অন্নপূর্ণার বাপের বাড়ির লোকেরা সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছে। এখন লোকে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের বাড়িটাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলে চোরের বাড়ি।ছেলেমেয়েরদের সামনে সেই কথা শুনে মরমে মরে যায় অন্নপূর্ণা।এখন তো ছেলেমেয়েরাও সব জেনে গিয়েছে। তাই মাঝে মধ্যে তাদের চোখে যেন ফুটে ওঠে প্রশ্ন চিহ্ন। অন্নপূর্ণা তাদের সমস্ত ব্যাপারটা খুলে বলে। বোঝায় , তাদের বাবা সৎই থাকতে চেয়েছিল। এই সমাজ তাকে সৎ থাকতে দেয়নি। তাদের জন্যই , তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্যই বাবাকে বাধ্য হয়ে ওই পথ বেছে নিতে হয়েছে। সব শোনার পর সৌরভ বলে, আমি চাকরি করে বাবাকে আর ওসব কাজ করতে দেব না।
সবাইকে সুখী করব। অন্নপূর্ণা বলে , সেই আশাতেই তো আমরা বেঁচে আছি বাবা।
অন্নপূর্ণা মনে মনে হিসাব করে একটা পাশ দিয়ে বেরোতে সৌরভের বছর তিনেক বাকি আছে। একটা পাশ দিয়ে বেরোতে পারলেই বাসন্তীর দেওর সন্দীপন ওর একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে বলেছে। বাসন্তীর শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তেমন যোগাযোগ না থাকলেও সন্দীপনের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র ছিন্ন হয়নি। সন্দীপন রামপুরহাট কোর্টের উকিল। সেইজন্য সায়ন্তনের মামলার সুবাদে তার সংগে যোগাযোগটা রয়ে গিয়েছে। তার উপরে সনইউনিয়ন বোর্ডের সদস্যও বটে। শাসক দলের হোমরা চোমরা সে। লোকে বলে তার কলমে নাকি কালি খায়। কারও জন্য কিছু লিখে দিলে তার সেই কাজ হবেই। তাই সৌরভকে ঘিরে আশায় বুক বাধে অন্নপূর্ণা। সৌরভের কিছু একটা হিল্লে হলেই সবার আগে সায়ন্তনকে সে ওই পথ থেকে সরিয়ে আনবে। তারপর একে একে মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। হৈমন্তীকে কেই বা আর বিয়ে করবে , তাদের অবর্তমানে তার যাতে খাওয়া পড়ার কোন সমস্যা না হয় তার একটা ব্যবস্থা করে যেতে হবে। গৌরবের যা মাথা তাতে লেখাপড়া হবে বলে মনে হয় না। তাই তাকে স্থিতু করার জন্য কোন একটা ব্যবসাপাতি করতে হবে। আর একটা কর্তব্য তার রয়েছে। গোমস্তাকাকা তার বাবার মতো। তার কাছে অন্নপূর্ণার অনেক ঋণ। তাদের কোন বিপদ আপদ হলে একমাত্র তিনিই ছুটে আসেন। পারুন বা নাই পারুন বিপদ থেকে উদ্ধারের সাধ্যমতো চেষ্টা করেন। সায়ন্তন যখন জেলে থাকে তখন রোজ দুবেলা খোঁজখবর নিয়ে যান। সেই ঋণ অন্নপূর্ণা ভুলবে কেমন করে ?
বাবা-- মায়ের ঋণ তো শোধ করা যায় না। শোধ করতেও সে চায় না। সে চায় ছেলে চাকরি পেলে তার পরিবারের মতোই তাদের দুঃখের দিনের ভাগীদার গোমস্তাকাকাকেও যেন সে সুখের ভাগীদার করতে পারে। কিন্তু সে সুখ কি বিধাতা তার কপালে লিখেছেন ? সেই কথাই ভাবে অন্নপূর্ণা। নাহলে একের পর এক উটকো ঝামেলা এসে চাপে তাদেরই ঘাড়ে? দিন কয়েক পরে সকাল থেকেই সরগরম হয়ে ওঠে গোটা গ্রাম। অবিরাম বেজে চলে সানাই। কখনও কখনও তা ছাপিয়ে কানে যেন তালা ধরিয়ে দেয় ব্যান্ডের বাজনা। হবে না'ই বা কেন ? তিনআনিদের বড় ছেলের রাতুলের বিয়ে বলে কথা। পরিবারে প্রথম অনুষ্ঠান করে বড়ো ছেলের বিয়ে হচ্ছে বলে আড়ম্বরের কোন ঘাটতি রাখে নি ওরা। আড়ম্বরের ঘাটতি পাত্রীপক্ষেরও নেই। বিয়ে হচ্ছে পাশের গ্রামের ডাক্তার বামাপদ চট্টোরাজের ছোটমেয়ে ঝর্নার সঙ্গে। তাদের পরিবারেও শেষ বিয়ে। তাছাড়া বামাপদবাবু শুধু তো ডাক্তারই নন , অনেক জমিজমার মালিকও। গ্রাম থেকে শহরে একটা বাসও চলে তার। অন্নপূর্ণাদের বাড়ি থেকেই দুই পক্ষের বাড়িই নজরে পড়ে।একটা কাঁদরের এপার -- ওপার।সকাল থেকেই হাওয়ায় ভেসে আসছে দু'বাড়ির ভোজের লোভনীয় রান্নার গন্ধ। তাদের বাড়ি থেকে দেখাও যাচ্ছে তিনআনিদের লোকজন খাওনোর জায়গাটা। গোটা গ্রামের নিমন্ত্রণ আছে। এমনকি তার ভাসুর--জা'দেরও নিমন্ত্রণ রয়েছে। নেই কেবল তাদেরই। গৌরবটা একটু খেতে ভালোবাসে। সকাল থেকেই বাতাসে ভেসে আসে পোলাও, মাছ, মাংস রান্নার সুগন্ধ------, আর গভীর ভাবে নাক টানে গৌরব। বলে কি সুন্দর গন্ধ গো মা ?
অন্নপূর্ণা মনে মনে ভাবে, গোটা গ্রামের নিমন্ত্রণ, তাদের করলে কি এমন ক্ষতি হোত। কথাবার্তা না থাকলেও ভোজ কাজে নিমন্ত্রণ তো অনেকেই করে। তারা যেত না কিন্তু ছেলেমেয়েগুলো তো একটু ভালো খেতে পেত। ভালো খাবার তো ওরা বহুদিন খায় নি। ছেলেকে কাছে ডেকে নেয় অন্নপূর্ণা। জড়িয়ে ধরে বলে, দাদা চাকরিটা পেয়ে যাক একবার , দেখ না তারপর আমারাও কি করি। দিদিদের বিয়েতে আমরাও ওর চেয়েও বড় ভোজ করব।
----- সে তো অনেক দেরি মা। আজ ওদের বাড়িতে চুপিচুপি খেয়ে চলে আসব ?
----- ছিঃ, বাবা কেউ দেখলে কি বলবে ?
----- কেউ দেখতে পাবে না মা। আমি চুপি চুপি যাব, আর ভিড়ের মধ্যে মিশে ঠিক খেয়ে চলে আসব।
এবারে মেজাজ হারিয়ে ফেলে অন্নপূর্ণা। চিৎকার করে বলে --- না। বিনা নিমন্ত্রেণে তুমি চোরের মতো খেতে যাবে না।
চোরের মতো ? কথাটা খট করে নিজের কানেই লাগে অন্নপূর্ণার। অবচেতন মনে এ কি বলল সে। বারান্দাতেই বসেছিল সায়ন্তন। সেও ঘুরে তাকায় তার দিকে। অন্নপূর্ণা বোঝে কথাটা সায়ন্তনেরও কানে লেগেছে। তাই ক্ষণেকে তার মুখটা কেমন গম্ভীর হয়ে যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য অন্নপূর্ণা বলে -- বিশ্বাস করো আমি কিছু ভেবে বলি নি। মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছে। তুমি রাগ কোর না যেন।
----- না, না এতে রাগ করার কি আছে ?
তাদের কথাবার্তার ফাঁকে কখন গৌরব বেড়িয়ে যায় টের পায় না অন্নপূর্ণা। কিছুক্ষণ পরেই গালে হাত বোলাতে বোলাতে কেঁদে বাড়ি ফেরে গৌরব। তার দুটো কানই লাল, গালে পাঁচটা আঙুলের ছাপ স্পষ্ট।
অন্নপূর্ণার আর বুঝতে বাকি থাকেনা কি ঘটেছে। গৌরব মুখ খোলার আগেই তার গালে সজোরে চড় কষিয়ে দেয় সায়ন্তন। বলে, হারামজাদা ছেলে মা অত পই পই করে বারণ করল , তারপরেও চোরের মতো খেতে চলে গেলি ? ঠিক হয়েছে তোর।বাবার চড় খেয়ে ককিয়ে ওঠে গৌরব। ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে অন্নপূর্ণা বলে , তুমি কি ? ছোট ছেলে লোভ সামলাতে পারে নি। তার শাস্তি তো ও নিয়েই ফিরেছে। তারপরেও তুমি ওর গায়ে হাত তুললে। আমার রাগ কি তুমি ওর উপর মেটাচ্ছো ? কেউ আর কোন কথা বলে না। নিমেষেই মার খাওয়ার কথা ভুলে যায় গৌরব। তার চড় খেয়ে লাল হয়ে থাকা গালে চোখের জলের দাগ তখনও স্পষ্ট হয়ে আছে। অন্নপূর্ণা ভাবে , আহারে ছেলেটা কত আশা নিয়ে খেতে গিয়েছিল। ওইটুকু তো একটা পেট। খেলে কি কম পড়ে যেত ? ভোজবাড়িতে তো কত খাবার ফেলা যায়। ছেলেকে কাছে ডেকে অন্নপূর্ণা জিজ্ঞেস করে -- ওদের মারে তোর খুউব লেগেছে নারে ?
কিছুক্ষণ ভেবে গৌরব বলে , না মা তেমন একটা লাগেনি। জানো আর একটু হলেই খাওয়া হয়ে যেত। ভিড়ের মধ্যে কেউ চিনতেও পারে নি। পাতাতে ভাত দিয়েছিল, ওদের বাড়ির ছোটকর্তা ডালও দিয়েছিল। আমি মেখে খেতে যাব সেইসময় আমার দিকে চোখ পড়তেই বলে উঠল --- আরে এটা সেই চোরের ব্যাটাটা না ?
অন্নপূর্ণা -- সায়ন্তন দুজনেই চমকে ছেলের মুখের দিকে তাকায়। আর একটু থেমে গৌরব ফের বলতে শুরু করে --জানো মা, ওই কথাটা শোনার পরই সবাই খাওয়া ফেলে আমার দিকে চেয়ে থাকে। আমি ছুটে পালিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ছোটকর্তা খপ করে আমাকে ধরে ফেলে মার লাগায়। তারপর আমার পাতার খাবারটা কুকুরকে খাইয়ে দিল জানো। ডালটাই যা হয়েছিল না মা, তাহলে অন্য রান্নাগুলো কেমন হবে ভাবে। আমাকে না হয় সব কিছু নাই দিত, ডাল ভাতটা তো দিতে পারত বলো।সেই তো কুকুরকেই খাইয়ে দিল, আমাকে দিলে কি এমন ক্ষতি হত বলো ? ছেলের প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারেনা অন্নপূর্ণা। তার চোখের কোন দুটো চিকচিক করে ওঠে।


No comments:
Post a Comment