Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুনমা -৭



          ঠাকরুনমা 

                       

            

            অর্ঘ্য ঘোষ


               ( সপ্তম কিস্তি )  


ছেলের প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারে না অন্নপূর্ণা। তার চোখের কোন দুটো চিক চিক করে ওঠে। আর ছেলের কথা শুনে সায়ন্তনের চোখে যেন জ্বলে ওঠে আগুন। এই সায়ন্তনকে কেমন যেন অচেনা লাগে অন্নপূর্ণার। পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করতে ছেলেকে নিয়ে পড়ে সে। বলে শোন ,  না দিক ওরা খেতে, আজ আবার সেদিনের মতো রুটি পায়েস হবে। আজ সেজদির জন্মদিন। হই হই করে দাদা -- দিদিদের সেই খবর দিতে ছোটে গৌরব। তিনআনিদের বাড়িতেও তখন বেশ হই চই। অন্নপূর্ণাদের বাড়ি থেকেই সামিয়ানা খাটানো খাওয়ানোর জায়গাটা স্পষ্ট দেখা যায়। সেখানে তখন আলাদা করে ব্রাহ্মণদের খাওনোর আয়োজন চলছে। হঠাৎই ভীষণ রকম চঞ্চল হয়ে উঠে সায়ন্তন। দাঁড়িয়ে কি যেন দেখার চেষ্টা করে।তারপর অন্নপূর্ণাকে কাছে ডেকে বলে, আচ্ছা দেখ তো পরিবেশন করেছে ওই যে কালো মতো ছেলেটা ওদের সেই বড়ো জামাই নয় ?
---- হ্যা, তাতে কি হয়েছে ?
----- আরে বুঝছো  না কেন ? ছেলেটি তো ব্রাহ্মণ নয়। কলেজে পড়তে পড়তে ওদের বড়ো মেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করছিল। তাই নিয়ে দীর্ঘদিন কোন সম্পর্ক ছিল না। মনে পড়েছে এবার ? 
----- হ্যা মনে পড়েছে। তা ওদের ব্যাপার ওরা বুঝবে। তোমার এত মাথাব্যাথা কেন ?
 ---- তাই হয় ? আমাদের সব ব্যাপারে ওদের  মাথাব্যাথা হলে ওদের এক--আধটা ব্যাপারে মাথা না ঘামালে চলে ?
----- কি করতে চাও তুমি ?
----- দেখ না , শালাদের ঘোল ঘেটে দিয়ে আসছি। জাতের অহংকার ঘুচিয়ে ছাড়ব আজ। 



                                                          অন্নপূর্ণা বুঝে যায় কি ঘটতে চলেছে। সে স্বামীকে আটকানোর চেষ্টা করে। ----- না, তুমি শত্রুতা বাড়াতে যাবে না। ওরা সব পারে। কি করে কি করে ফেলবে তা কেউ আগে থেকে জানতেও পারবে না। 
----- করতে আর বাকিটা কি রেখেছে ? এরপর যা পারে করুক। আমিও এবার থেকে কি করতে পারি দেখাচ্ছি ওদের।
 অন্নপূর্নাকে ঠেলে সরিয়ে সোজা খাওয়ার জায়গায় হাজির হয় সায়ন্তন। স্বামীর বিপদের কথা ভেবে লজ্জার মাথা খেয়ে পিছনে পিছনে ছোটে অন্নপূর্ণাও। সেখানে তখন ডাল মেখে সবে ভাতের গ্রাস মুখে তোলার উপক্রম করেছে ব্রাহ্মণের। হঠাৎ তাদের সামনে হাত জোর করে দাঁড়ায় সায়ন্তন। তিনআনিরা তাকে ওই অবস্থায় দেখে কিছুটা হকচকিয়ে যায়। বুঝতেই পারে না কি ঘটতে চলেছে। সায়ন্তন কিন্তু কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই বলতে শুরু করে, মাননীয় ব্রাহ্মণ  সমাজ আমি এখানে নিমন্ত্রিত নই, তবুও আপনাদের কথা ভেবেই আমাকে ছুটে আসতে হয়েছে। আমি চোর হতে পারি কিন্তু আমিও ব্রাহ্মণ সন্তান। আর তাই ব্রাহ্মণ হয়ে ব্রাহ্মণের অবমাননা সইতে না পেরেই ছুটে এসেছি। আপনারা হয়তো জানেন না এই তিনআনিরবাবুরা জেনেশুনে আপনাদের জাত মারার উপক্রম করেছেন। ওই যে দেখছেন ডাল পরিবেশন করছে যে ছেলেটি , সে বাবুদের বড় জামাই।  সে আসলে জল অচল অব্রাহ্মণ। এখন আপনারই বিবেচনা করুন আপনারা কি করবেন ? সায়ন্তনের কথা শুনতে শুনতে অন্নপূর্ণা কোথাই যেন হারিয়ে যায় । সায়ন্তন যে এমন গুছিয়ে কথা বলতে পারে তা তো জানা ছিল না। 


                                         তার সম্বিত ফেরে তুমুল হই হট্টগোলে। চেয়ে দেখে ব্রাহ্মণেরা খাবারের পাতা ছেড়ে উঠে পড়েছেন। সবার গলায় এক সুর ---- কাজটা কিন্তু আপনারা ভালো করলেন না। এরপর আপনাদের বাড়িতে আমরা পাত পাড়ব কিনা ভাবতে হবে। বিশেষ করে সেই অনুষ্ঠানে তোমার এই জামাইটা থাকে তাহলে তো কোন কথাই নেই।
 রাগে ফেটে পড়ে তিনআনিরা। ছোট ছেলেটা সায়ন্তনের উপরে ঝাপিয়ে পড়ার উপক্রম করতেই সে বলে , মারবি তো মার। কিন্তু মনে রাখিস রাত কারো বাবার নয়। যে অন্ধকারে  চড়ে বেড়াতে পারে রাত তার। আমাকে এখন মারলে রাতের অন্ধকারে চোরাটানে মেরে তোদের ঠাং ভেঙে দেব। সারাজীবন ল্যাংচাবি। সায়ন্তনের কথা শুনে ' থ' হয়ে যায় অন্নপূর্না। এ কে কথা বলছে ? 'থ' হয়ে যায় ওদের বাড়ির ছোট ছেলেটাও। কিন্তু ফের হাত তুলে মারতে আসে সায়ন্তনকে। আর সায়ন্তনও তার দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বলে, নে মার দেখি তোর হিম্মত কত। এবার থেকে গায়ে হাত দিলেই তোদের পুকুরে বিষ ঢালব, ধানের মড়াইয়ে আগুন লাগাব। পুলিশে দিবি তো? জেল থেকে ফিরে এসে তোদের ভালো পা'টাও ভেঙে দেব। সারাজীবন বিছানায় পড়ে থাকবি। ক ' বার জেলে পাঠাবি। ১২৫ টা কেস আমার নামে। আরও কয়েকটা বাড়বে বড়োজোর। আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, কিন্তু আমি যদি মার খেয়ে মরে যায়, তোদের জেলে যেতে হলে  তোরা মরে যাবি। ইয়া বড়ো বড়ো মশা , তোদের মতো বাবুদের রক্ত পেলে চুষে খেয়ে নেবে। আর জেলে যে সব দাগি আসামীরা আছে তারা আমার বন্ধু। যখনই শুনবে তোরা আমাকে মেরে জেলে গিয়েছিস তখন ওরা তোদের মেরে সাইজ করে দেব। কই হাত গুটিয়ে নিলি ? কেন মার ? 


                                                  সবাই নির্বাক হয়ে যায় সায়ন্তনের কথা শুনে। ব্রাহ্মণেরা বলে, এক্ষেত্রে বাপু ওর গায়ে হাত তোলাটা তোমাদের অন্যায় হবে। ওই তো আমাদের জাতটা বাঁচালো। অগ্যতা কিল খেয়ে কিল হজম করতে হয় তিনআনিদের। আর নিঝঙ্ঝাটেই  বাড়ি ফিরে আসে অন্নপূর্না -- সায়ন্তন। বাড়ি ফিরেই সায়ন্তকে নিয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। বলে --- আচ্ছা, তুমি এত সাহস পেলে কি করে ?
----- মানুষের দেওয়ালে পিঠ গেলে তখন সাহস আপনা থেকেই জন্মায়। আর ভয় কেটে যাওয়া মানুযকে তখন ভয় দেখানো মানুষেরাই ভয় পেতে শুরু করে। অন্নপূর্ণাও তা উপলব্ধি করে। সেদিনের ওই ঘটনার পর থেকে আর হুট করে সায়ন্তনকে কেউ ঘাটায় না কিন্তু ভয় কাটে না অন্নপূর্ণার। তার চোখে ভেসে উঠে তিনআনিদের আক্রোশ ভরা চাউনি। সে জানে তিনআনিরা বিষধর সাপের চেয়েও খল। লেজে যখন একবার পা পড়েছে ওরা ছোবল না মেরে ছাড়বে না। তাই স্বামীকে বলে , সব তো চুকেবুকে গিয়েছিল। তুমি আবার ওইসব করতে গেলে কেন ?
 ---- দেখ, জাতের প্রশ্ন তুলে ওরা আমাদের মেয়ের বিয়েতে ভাংচি দিয়েছিল, সেটা আমি ভুল গিয়েছিলাম। কিন্তু ওইটুকু একটা ছেলেকে পাতা থেকে তুলে মারধোর করাটা আমার মনে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছিল।সেটা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলামনা। তাই ভাবলাম, আমার ছেলেকে যারা একপাতা ভাত দিতে পারে নি তাদের ভাতের কি গতি করি দেখ।
 সত্যিই অন্নপূর্ণা দেখে খাবার নিয়ে ওদের অধোগতির সীমা নেই। ব্রাহ্মণেরা  না খেয়ে চলে যাওয়ায় প্রচুর খাবার বেঁচে যায়। সেইসব খাবার কাজের লোকেরা নিয়ে গিয়ে পুকুর পাড়ে ফেলে দেয়। আর কুকুরে তা কাড়াকাড়ি করে খায়। অন্নপূর্ণা ভাবে, অথচ ওই খাবারই এক পাতা তার  ছেলেকে খেতে দেয় নি ওরা। তবে এভাবে খাবার নষ্ট হওয়ায় তার খুব খারাপও লাগে। তাদের মতোই বহু মানুষ দুবেলা পেট ভরে খেতে পায় না। অথচ কত দামী দামী খাবার নষ্ট হয়ে গেল। এজন্য পরোক্ষে নিজের স্বামীকেও কিছুটা দায়ী করে সে। সেই কথা ভাবতেই ফের তার মনে ছায়া ফেলে এক অজানা আশংকা। স্বামীকে তাই সে বলে , হ্যাগো ওরা তোমার কোন ক্ষতি করবে না তো ? 
------ সে চেষ্টা কি আর করবে না ? নাহলে যে ওদের রাতে ঘুমই হবে না। তবে যা ভড়কি দিয়েছি তাতে কিছু করার আগে এবার ওরা ভাববে। তাছাড়া এই গ্রামে আর আমরা বেশদিন থাকবও না। সৌরভ কিছু একটা কাজ পেলেই আমরা অন্য কোথাও চলে যাব। এ গ্রামে থাকলে নিজের তো বটেই, ছেলেমেয়েদেরও সারাজীবন চোর বদনাম সইতে হবে।


                                             কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় এক। অন্নপূর্ণার জীবনে  এমন ঘটনা তো বহুবার ঘটেছে। তবে এবারে ঘটনায় সবাই বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই হারিয়ে ফেলে। সেদিন ছিল সৌরভের  জন্মদিন। বাঁচিয়ে রাখা পয়সায় সন্ধায় পায়েস - রুটি করেছিল অন্নপূর্ণা। সৌরভরা বিকালে সেদিন বাসতলায় খেলতে গিয়েছিল। তিনআনিদের মহাদেব পুকুরের পাড়ে বামাপদ চট্টোরাজের বাসটা দাঁড়ায় বলে জায়গাটাকে সবাই বাসতলা বলে। জায়গাটায় রয়েছে একটা মাত্র চা -- তেলেভাজার দোকান আর বামাপদবাবুর ডিসপেনসারি। সেই জন্য বিকালের দিকে অনেক লোকের আড্ডাস্থল হয়ে ওঠে বাসতলা।  সৌরভরাও দু'ভাই মাঝে মধ্যে যায়। আজও গিয়েছে। অন্নপূর্ণা রুটি--পায়েস তৈরি করে বসে থাকে। সৌরভরা ফিরলেই সবাইকে খেতে দেবে। কিন্তু এতক্ষণ তো ওদের চলে আসার কথা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চলল তবু ওদের কোন খবর নেই কেন ? হঠাৎ ছুটে আসে বাসতলার চায়ের  দোকানদার গদাই। হাফাতে হাফাতে সে বলে , ঠাকরুনমা তাড়াতাড়ি বাসতলায় চলুন। আপনাদের বড়ো বিপদ হয়ে গিয়েছে। 
বিপদের কথা শুনে বুকটা ধক করে ওঠে অন্নপূর্ণার। সৌরভ-- গৌরব তো ওখানেই গিয়েছে ওদের কোন বিপদ হলো না তো? সায়ন্তন আর সে ছুটে যায় বাসতলায়। সেখানে পৌঁছোতেই মাথা ঘুরে যায় অন্নপূর্ণার। বামাপদের বাসের সামনে পড়ে রয়েছে তাদের স্বপ্ন , রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত সৌরভের নিথর দেহ। আর দাদার মাথাটা কোলে নিয়ে সমানে কেঁদে চলেছে গৌরব। 


                               ছেলের কাছে গিয়েই চেতনা হারিয়ে ফেলে অন্নপূর্ণা। বাসতলা তখন লোকে লোকারণ্য। সবার মুখেই তখন দুর্ঘটনার আলোচনা। কেউ বলে , ডাইভারের কোন দোষ নেই। সৌরভই পিছন থেকে লাফিয়ে  নামতে গিয়ে চাকার তলায় চলে যায়। কেউ বলে, বাসের লোকেদেরও লক্ষ্য রাখা  উচিত ছিল। বিতর্কের মধ্যেই বাসতলায় ছুটে আসেন গোমস্তাকাকা।  এসে পৌঁছোন বাসমালিক বামাপদ চট্টোরাজ , ইউনিয়ন বোর্ডর প্রসিডেন্ট রমাপতি চৌবে , ইউনিয়িন বোর্ডের স্থানীয় সদস্য বন্ধুবরণ ঘোষ। রমাপতি এবং বন্ধুবরণ আবার বামাপদর বন্ধু স্থানীয়। তারা এসে সায়ন্তনকে বলে , যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে। এখন এ নিয়ে থানা-পুলিশ করতে গেলেই ঝামেলা বাড়বে পোষ্টমর্টেম, হ্যানোত্যানো, বারো সতেরো করতে করতে লাশের অধোগতির শেষ থাকবে না। তার থেকে দুই পক্ষে বসে একটা মীমাংসা করে নিয়ে স্থানীয় শ্মশানে দাহ করে দিলেই ভালো হয়। অন্নপূর্ণার তখন ওই সব কথা শোনার মতো অবস্থা ছিল না। সে তখন ছেলের মৃতদেহ আঁকড়ে কেঁদেই চলেছে। ঘন ঘন চেতনাও হারাচ্ছে। খবর পেয়ে মেয়েরাও ছুটে এসেছে। তারও মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। মাথায় হাত দিয়ে ছেলের মৃতদেহের পাশে বসে আছে সায়ন্তন। তারও চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। তাদের হয়ে বামাপদদের সঙ্গে কথা বলছেন গোমস্তাকাকা। উপস্থিত পাঁচজনের মধ্যস্থতায়   ঠিক হয়, বাস মালিক সৌরভের সৎকারের জন্য ১০০ এবং ক্ষতিপূরণ বাবদ ১০০০ টাকা দেবেন। সৎকারেরর টাকাটা আজ দেওয়া হবে। ক্ষতিপূরণের টাকাটা চূড়ান্ত করার আগে সায়ন্তনের মতামত নিতে আসেন গোমস্তাকাকা। সায়ন্তনের তখন কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না। তারই মাঝে কোনরকমে শুধু বলতে পারে, আপনারা যেটা ভালো মনে করবেন করুন। আমার আশার আলো নিভে গেল, আমি আর ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে কি করব ? 


                                              তারপরই কান্নায় ভেঙে পড়ে সায়ন্তন। তা দেখে এগিয়ে আসেন বন্ধুবরণবাবু। তিনি সায়ন্তনের ঘাড়ে হাত রাখেন। আর তাকে দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারে না সায়ন্তন। লোকে তারই মধ্য বন্ধুবরণবাবুকে বিবেচক হিসাবে কিছুটা হলেও সম্মান করেন।  তার হাত ধরে সায়ন্তন বলে, জানেন দাদা ছেলেটার পড়াশোনায় মাথা ছিল। ভেবেছিলাম ওর একটা কিছু হয়ে গেলেই আমি আর চুরি করব না। মেয়েগুলোর বিয়ে দিয়ে একটু ভালোভাবে বাঁচব। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল। এখন আমরা কোন আশায় বাঁচব দাদা ?
 ---- তোমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই, সায়ন্তন। কিন্তু তুমি সম্মতি না দিলে কিছুই চূড়ান্ত করা যাচ্ছেনা ভাই। 
------ যেখানে আপনার মতো মানুষ আছেন, গোমস্তাকাকা আছেন সেখানে আমি কি'ই বা আর বলব। আপনারা যেটা ভালো মনে করবেন সেটাই করুন।
সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে যায়। বামাপদবাবু গোমস্তাকাকার হাতে ১০০ টাকা তুলে দেন। তারপরই ধরাধরি করে বাড়ির উঠোনে এনে শোয়ানো হয় সৌরভকে।অন্নপূর্ণা সযত্নে রক্ত মুছিয়ে দিয়ে তাকে পড়িয়ে দেয় পরিস্কার জামাপ্যান্ট , কপালে দেয় চন্দনের ফোঁটা। তারপর নিয়ে আসে সৌরভেরই জন্মদিনে তৈরি পায়েসের বাটি। চামচে নিয়ে সেই পায়েস তুলে ধরে ছেলের মুখের সামনে। তারপর ছেলের মুখের দিকে চেয়ে বলে --- নে বাবা, মুখ খোল।অভিমান করে থাকিস না। দেখ তুই ভালোবাসিস বলে বেশি করে দুধ দিয়েছি আজ। খেয়ে নে বাবা। বলতে বলতেই ছেলের বুকের উপর কান্নায় ভেঙে পড়ে অন্নপূর্ণা। শ্মশান বন্ধুরা তাকে সরিয়ে সৌরভের দেহ তুলে নিয়ে চলে যায়। অন্নপূর্ণার কান্নায় ভারী হয়ে উঠে বাতাস।

           

                                              সৌরভের মৃত্যুর পর বাড়িটা যেন আরও নিঝুম হয়ে পড়ে। সবার মধ্যেই যেন একটা মনমরা ভাব। আসলে ওই একটি ছেলেকে ঘিরেই ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল পুরো পরিবার। সেই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় কাজ করার উদ্যোমও হারিয়ে ফেলেছে সবাই। এমন কি সায়ন্তন আর চুরি করতে যায় না। ঘরে সৃষ্ট হয় তীব্র অভাব। একমাস পুর্ণ হতে চলল বামাপদ ক্ষতিপূরণের টাকাটা এখনও দেন নি। বামাপদবাবুর কাছে টাকাটার জন্য গোমস্তাকাকাকে পাঠায় সে। বড়ো আশ্চর্য লাগে অন্নপূর্ণার। সৌরভের মৃত্যু একমাসও হয় নি। অথচ তারই মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের জন্য তাকে তাগাদা দিতে পাঠাতে হচ্ছে। এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কি বা হতে পারে , একজন মায়ের কাছে। পরিস্থিতিই তাকে বাধ্য করে। কিন্তু কিছুক্ষণই পরেই গোমস্তাকাকা মুখ চুন করে ফিরে আসে। শুধু সেদিনই নয়, বার কয়েক গোমস্তাকাকা বামাপদবাবু এমনকি রমাপতি এবং বন্ধুবরণের কাছে গিয়েও কোন সুরাহা করতে পারেনা। আজ নয় কাল এসো বলে শুধু হয়রান করেছেন বামাপদবাবু। বিষয়টি এখনও সায়ন্তনের কানে তোলেনি অন্নপূর্ণা। তুললে কি যে হত কে জানে। সৌরভের মৃত্যুর পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সায়ন্তন।  সংসার আর চলে না। কয়েকদিন ধরে দুবেলা আটা গোলা খেয়ে চলছে। আজ আর তাও নেই। সায়ন্তনকে কিছু বলা মানেই পরোক্ষে চুরি করতে প্ররোচিত করা। কিন্তু না বললেও নয়। ছেলেমেয়েগুলোর মুখে তো কিছু তুলে দিতে হবে। কথাটা পাড়তেই সায়ন্তন বলে, 
বামাপদবাবু টাকাটা দেন নি এখনও ?
এই আশংকাটাই করছিল অন্নপূর্ণা।যা মাথা গরম ,  টাকা দেয়নি বললে কি করতে কি করে ফেলবে তার ঠিক নেই।তাই সে বলে ,  দেবে ,  এইতো মাস পূর্ণ হলো।
----- দেবে মানে কি ? এখনও দেয়নি ? আমি তো ভাবলাম গোমস্তাকাকাকে দিয়ে দিয়েছে। আর মাস পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে  কি সম্পর্ক? ওর তো এক মাসের ভিতরেই দেওয়ার কথা ছিল। গোমস্তাকাকাকে  দিয়ে হবে না, শালাকে আমি দেখছি দাঁড়াও।



                                      প্রমাদ গোনে অন্নপূর্ণা। স্বামী বেরনোর উদ্যোগ নিতেই সে হাত চেপে ধরে বলে , না তুমি যাবে না। যা করার গোমস্তাকাকাই করবেন।
-----  গোমস্তাকাকাকে ওরা পাত্তাই দেবে না। শালাদের টাকার অভাব আছে ? আমার ছেলেমেয়েরা না খেয়ে থাকবে, আর  টাকা দেব বলেও ওরা টাকা দেবে না তা তো হবে না। বলেই হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে যায় সায়ন্তন। গোমস্তাকাকার মতো সেও দিন কয়েক খালি হাতেই ফেরে। দেখতে দেখতে তিন মাস পেরিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ধৈর্য্য হারা হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণাও। যদি না দেওয়ারই ইচ্ছে ছিল তা হলে দেব বলা কেন ? একদিন রমাপতিবাবু , বন্ধুবরণবাবুদের কাছেও যায় সায়ন্তন। সব শুনেও রমাপতিবাবু ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যান। আর বন্ধুবরণবাবু বলেন , বামাপদ এটা ঠিক করছে না। আমিও টাকাটা দিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলাম। কিন্তু দেব-- দিচ্ছি করছে। এমন হবে জানলে মাঝে থাকতাম না।সায়ন্তন বলে , দাদা সেদিন আপনারা যা বলেছিলেন আমি কিন্তু তা অমান্য করিনি। বামাপদর কাছে টাকাটা তো হাতের ময়লা। টাকাটা পেলে ছেলেমেয়েগুলো খেয়ে পড়ে বাঁচত। জানেন, আজ থেকে আর আমাদের হাড়ি চড়বে না।
জবাবে বন্ধুবরণবাবু কিছু বলতে পারেন নি। কিন্তু সায়ন্তনকে কিছু চাল-ডাল আর ১০ টাকা দিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল সায়ন্তন। বলেছিল , সোজা আঙুলে আর ঘি উঠবে না। শালাকে এবার দেখছি দাঁড়াও। এবার বাপ বাপ করে টাকা দিয়ে যাবে। আবার স্বামীকে চেপে ধরে অন্নপূর্ণা। বলে, না তোমাকে ওই ব্যাপারে কিছুই করতে হবে না। যা করার গোমস্তাকাকাই করবেন। টাকা দেয় ভালো, না দিলে ভিক্ষা করব। নাহলে বিষ খেয়ে মরব সবাই।



                                 তখনকার মতো চুপ করে যায় সায়ন্তন। কিন্তু ওর চোখ মুখ দেখে অন্নপূর্ণা বুঝতে পারে কিছু একটা পরিকল্পনা করছে সে। তাই স্বামীকে সে চোখে চোখে রাখে। একেই সেদিনের সেই ভোজের ব্যাপারটা নিয়ে তিনআনিদের চক্ষুশূল হয়ে রয়েছে সে, তার উপরে ওদের আত্মীয় বামাপদকেও যদি কিছু একটা করে বসে তাহলে আর দেখতে হবে না। দু'পক্ষ মিলে সায়ন্তনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতেও ওরা পিছপা হবে না। স্বামীকে চোখে চোখে রেখেও শেষরক্ষা হয় না। সেদিন স্নান করে পুকুরঘাট থেকে ফিরেই দেখে বাড়িতে সায়ন্তন নেই।  বাবা কোথায় গিয়েছে ছেলে-মেয়েরাও বলতে পারে না। তবে কি সে যা ভয় করছিল তাই হলো শেষ পর্যন্ত ?  কিছুক্ষণ পরেই অবশ্য হন্তদন্ত হয়ে ফেরে সায়ন্তন। তার চোখমুখে উত্তেজনার ছাপ। খুচরো-নোট মিলিয়ে ৫০ টাকার মতো তুলে দেয় তার হাতে। অন্নপূর্ণা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই সায়ন্তন বলে , আজ দিয়েছি শালা বামাকে। ঘোড়ায় চেপে রুগী দেখে ফিরছিল। টাকাটা চাইতেই উল্টোপাল্টা বলতে শুরু করল। আর গেল মেজাজ হারিয়ে। ঘোড়া থেকে ফেলে ব্যাটাকে দিলাম উত্তম মধ্যম। রুগী দেখার টাকা ক'টাও কেড়ে নিলাম। টাকাটা ওর'ও নয়। শালা কসাই , গরীবের রক্ত চুষে খায়। নাড়ী ধরেই জানতে চায় কত টাকা নিয়ে চিকিৎসা করাতে এসেছ। স্বামীর কথা শুনে ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ে অন্নপূর্না।কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে সে বলে, কতবার তোমাকে বললাম, আমার কথা শুনলে না। এবার  শ্বশুর -- জামাইয়ে একজোটে হয়ে তো বদলা নেবে।
---- সে কি আর জানি না। ছেলেমেয়েদের নিয়ে তুমি ঘরে ঢোক তারপর দেখছি। আসুক শালারা।
ছেলেমেয়েদের নিয়ে অন্নপূর্ণা ঘরে ঢুকতেই বিশাল রাম'দা নিয়ে দরজা আগলে বসে সায়ন্তন।
        
     
                                            ভয়ে বুক কাঁপে অন্নপূর্ণার। সে যা ভেবেছিল তাইই ঘটার উপক্রম দেখা দেয়। কিন্তু একরোখা ভাবের জন্য তখনকার মতো বড়ো কিছু ঘটে না । কিছুক্ষণের মধ্যেই দলবল নিয়ে হাজির হয় ওরা দু'তরফ। তারমধ্যে তিনআনিদেরই লম্ফঝম্ফ বেশি দেখা যায়।একে তো ছেলের বিয়ের ওই ঘটনা নিয়ে পূর্ব আক্রোশ ছিলই।তার উপরে যুক্ত হয় বেয়াই বামাপদকে মারার ঘটনা। ----সে  বামাপদ প্রতিশ্রুত টাকা না'ই দিতে পারেন তাবলে সানার মতো ছিঁচকে চোরের তার গায়ে হাত তোলাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না ওরা। এ যে এক রকম তাদের গায়েই হাত তোলা। এর পরে সানাকে শায়েস্তা না করতে পারলে যে তাদের মান থাকে না। তাই বামাপদদের পারিষদদের থেকে 
তিনআনিদেরই বেশি গর্জন শোনা যায়। ওদের ছোট ছেলেটাই তড়পাই বেশি। তারই গলা শোনা যায় -- কই বেড়িয়ে দেখি শালা, তোর ঘাড়ে ক'টা মাথা।
হুংকার ছাড়ে সায়ন্তনও --- আয়রে শালারা, দরজা খোলাই আছে, সামনে আয় দেখিয়ে দিচ্ছি কার ঘাড়ে কটা মাথা।
ওই কথা শোনা মাত্র ওরা সবাই রে রে করে ছুটে আসে। আর তখন রামদা নিয়ে কাপালিকের মতো উঠে দাঁড়ায় সায়ন্তন। তাকে ওই অবস্থায় দেখে ভড়কে যায় লোকগুলো। আর তা দেখে গর্জন করে ওঠে সায়ন্তন ---- কি রে শালারা ভয় পেয়ে গেলি ?  সারাজীবন ধরে গরীব দুর্বল মানুষকে একা কেবল তোরাই মেরে যাবি ?  আয় এগিয়ে, এক এক কোঁপে ধর থেকে সব ক'টা মাথা নামিয়ে দেব। একটা খুন করলেও ফাঁসি , দশটা খুন করলেও সেই ফাঁসি। তাহলে একটা কেন, রক্তবীজের নাশ করে ছাড়ব।
ওরাও সায়ন্তনকে শাসায়, খুব বাড় বেড়েছিস না। শীঘই তোর বাড় ঘুচিয়ে দিচ্ছি দাঁড়া। মনে রাখিস পিপিলিকার পাখা হয় মরিবার তরে। তোর হয়েছে তাই। সায়ন্তনও ছেড়ে কথা বলে না । সে ' ও পাল্টা শাসায়, আরে যা যা, আমরা তো মরেই আছি। মরার আবার খাড়ার ঘায়ের ভয় কিসের। তোরা এখন মানে মানে পথ দেখ।  না হলে তোদের পাখনাগুলোই ঝুড়ে দেব, দেখবি শালারা।


                             বলে দা নিয়ে ওদের তাড়া করে যায় সায়ন্তন। তার ওই মুর্তি দেখে যেন কিছুটা ভয় পেয়ে রণেভঙ্গ দেয় ওরা। আর যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে অন্নপূর্ণার। কিন্তু মনে একটা অজানা আশংকা থেকেই যায় তার।তিনআনির ওরা লোক তো সুবিধার নয়।  ওরা সব পারে। পুরনো হয়ে যাওয়া বউকে আর পচ্ছন্দ না হওয়ায় ওরা প্রায় সবাই এক বা একাধিক মেয়েকে গলা টিপে কিম্বা গালে চড়িয়ে মেরে আবার বিয়ে করেছে। দীর্ঘদিন এক সাথে থাকার পরও যারা  বউকে, নিজের সন্তানের মা'কে ওইভাবে মেরে ফেলতে পারে, অন্যদের মারতে যে তাদের একটু হাত কাঁপবে না তা ভালোই জানে অন্নপূর্ণা। সায়ন্তনও কথাটা ভুল বলেনি ----পান থেকে চুন খসলেই ওরা দুর্বল গরীব মানুষকে বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে এসে বেধে মারধোর করে।এমন কি গরীবেরা কেউ ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে জুতো কিম্বা ভালো পোশাক পড়ে গেলেও তাকে নানা রকম শাস্তি পেতে হয়। কেউ হাল ফ্যাসানের চুল রাখলে নাপিত ডেকে নাড়িয়ে দেওয়ারও নজির আছে। প্রয়োজনে ওরা পায়ে পা লাগিয়ে ঝামেলায় ফেলেও লোককে অমানবিক শাস্তি দেয়। সবাই সব জানে, কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারে না। কারণ জমিদারি গেলেও ওদের দাপটে এখনও বাঘে গরুতে একঘাটে জল খায়।নিজেদের মধ্যে খুড়তুত, জ্যাঠতুত  ভাইয়ে -ভাইয়ে  তেমন একটা সদ্ভাব না থাকলে এই রকম পরিস্থিতিতে সবাই একজোট হয়ে প্রতিপক্ষের উপরে ঝাপিয়ে পড়ে। তার উপরে পোষা  লেঠেল বাহিনীও আছে ওদের। জমিদারি ঠাটবাট তো রয়েছেই। ওইসব কথা ভেবেই মনে মনে খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। সে শুধু ঠাকুরকে ডাকে --- ঠাকুর আর কিছু চাই না, তুমি ওদের আক্রোশ থেকে ওকে রক্ষা করো। 



                     তার বাড়ির কাছেই রয়েছে দূর্গা, কালী আর রাধারমণের মন্দির। এত কাছে থেকেও ঠাকুর কি তার এই প্রার্থনাটাও শুনবে না ?  নিজের মনকে প্রশ্ন করে অন্নপূর্ণা।  তার পাশে তো সেই অর্থে কেউ নেই। ঠাটবাট থাক বা  না থাক সাধারণত  জমিদার বাড়ির সঙ্গে  দুঃস্থ আত্মীয় স্বজনদের আত্মীয়তা গড়ে ওঠে না। তার ক্ষেত্রেও বাপের বাড়ির সঙ্গে  দুরত্ব ঘোচে নি কোনদিন। শ্বশুর--শাশুড়ি বেঁচে থাকাকালীন বাবাকে আত্মীয় নয়, একজন প্রজা হিসাবে দেখা হত। তারপরও দুরত্ব ঘোঁচে নিয়ে সায়ন্তনের কারণে। চোর জামাইয়ের সঙ্গে  তখন তারাই দুরত্ব তৈরি করে নেয়। এমন কি বাবা মারা যাওয়ার খবরও তাকে দেওয়া হয়নি। লোকমুখে খবর পেয়ে সে ছুটে গিয়েছিল। তবে কেউ তাকে  বাড়িতে যেতেও বলে নি। গ্রামের বাইরে কাঁদরের ধারে বাবার মুখাগ্নি দেখেই  ,নীরবে চোখের জল ফেলে ফিরে  আসতে হয়েছিল তাকে ।বড়ো জামাই মুখাগ্নি করেছিল।  তারপর থেকে মা  রয়েছে বোনেদের কাছে। আরও একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের  আত্মীয়তা গড়ে ওঠার সম্ভবনাও ঘুচে যায়। না জেনে বোনের বাড়িতেই চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় সায়ন্তন। ওরাও সায়ন্তনকে চেনে না। দেখেই নি তো কোনদিন। তাই ওরা ওকে বেঁধে লোকজন ডাকার উপক্রম করছিল। হইচই শুনে মা ,বোন বেরিয়ে এসে সায়ন্তনকে দেখে পরিস্থিতি সামাল দেয়। সায়ন্তনকে দেখে মা নাকি বলেছিল, তোমার পরিচয় দিতেও ঘেন্না হয়। এসব দেখার আগে আমার মরে যাওয়াই ভালো ছিল। যাও, গাঁয়ের লোক জাগার আগে চুপিচুপি পালাও। আর যেন কোনদিন তোমার মুখ দেখতে না হয়। তোমার পায়ে ধরে বলছি আমার  মুখে চুনকালি মাখাতে এসো না।পরে সায়ন্তনের মুখে সব শুনে মরমে মরে গিয়েছিল অন্নপূর্ণা। বাসন্তীর সংগেও যোগাযোগ নেই দীর্ঘদিন। বাবার পরিচয় যাতে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ছায়া না ফেলে তারজন্য অন্নপূর্ণাই দুরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে।


                                              তাদের সহায় বলতে রয়েছেন এক গোমস্তাকাকা। আর একজন হলো বাসন্তীর দেওর। সায়ন্তনের মামলার জন্যই তার সংগে যোগাযোগটা টিকে আছে। কিন্তু তা আদালতের বাইরে টেনে আনে নি অন্নপূর্ণা। তারও লজ্জা বলে একটা কথা আছে। ওই সব কথা ভেবেই মনে মনে খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। সে শুধু ঠাকুরকে ডাকে --- ঠাকুর আর কিছু চাই না, তুমি ওদের আক্রোশ থেকে স্বামীকে রক্ষা করো। তার বাড়ির কাছেই রয়েছে দূর্গা, কালী আর রাধারমণের মন্দির। এত কাছে থেকেও ঠাকুর কি তার এই প্রার্থনাটাও শুনবে না? ঠাকুর নিশ্চয় আর মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে না।   নিজের মনকে প্রবোধ দেয় অন্নপূর্ণা। কয়েকদিনের মধ্যেই তার ভুলটা ভেঙে যায়। দরজায় কড়া নাড়ে যেন কালান্তক যম।বামাপদকে মারধোরের পর থেকেই  কানাঘুষোয় নানা কথা শুনছিল অন্নপূর্ণা। তিনআনিরা  নাকি ছেড়ে কথা বলবে না। সে আশংকা তো অন্নপূর্ণারও রয়েছে। কিন্তু কি করবে সে ? এই বিপদের দিনে কার কাছে যুক্তি পরামর্শ নেবে।এসময় শ্বশুর -- শাশুড়ি কথা খুব মনে পড়ে তার। সেই নৈকট্য তাদের কোনদিনই তৈরি হয়নি ঠিকই, কিন্তু শ্বশুরমশাই ছিলেন বটগাছের মতো। ঝড়ঝাপটা পরিবারে গায়ে লাগতে দেননি।  একাই সামলে দিতেন। আসলে দাপুটে মানুষ বলতে যা বোঝাই তিনি ছিলেন তাই। যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনআনিরা ততদিন ট্যা--ফো করতে পারে নি। আর তার ছত্রছায়ায় শ্বাশুড়িমা'ও পরিবারের উপর কোন অমঙ্গলের ছায়া পড়তে দেননি। পুরনোদিনের সেইসব কথাই আজ বড়ো বেশী করে মনে পড়ছে। আজ সবাই যদি একজোট হয়ে থাকত তাহলে এই অবস্থা হত না। 


                              সে তো পরিবারটাকে নিজেরই ভেবেছিল। নাহলে জমির মামলার জন্য শ্বাশুড়ি যখন একের পর এক তার  গয়নাগুলো শ্বশুরমশাইয়ের হাতে  তুলে দিচ্ছিলেন তখন সব জেনেও কিচ্ছুটি বলে নি। সে ভেবেছিল পরিবারের সুদিন এলে ওই রকম গয়না আবার হবে। কিন্তু সুদিন আর আসে নি। কেবল অন্নপূর্ণার গয়নাগুলিই মাঝখান থেকে চলে যায়। দুই জা কায়দা করে সে সময় নিজের নিজের গয়না বাপের বাড়িতে আছে বলে নিজেদের গয়নাগুলি বাঁচিয়ে নেয়। সেই কেবল পারেনি। সে ছিল দুঃস্থ প্রজার পরিবারের মেয়ে। সে তো ছিল করুণার পাত্রী। করুণাতে তো কোন দাবি বা অধিকার থাকে না, যেটুকু হাতে তুলে দেওয়া হয় সেটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।  অথচ গয়নাগুলো থাকলে তাদের হয়তো এই দুরাবস্থা হত না। শাশুড়িও হয়তো ভাবেন নি এমন বিপর্যয় নেমে আসবে। দুশ্চিন্তায় বেশ কিছুদিন ধরে রাতে ভালো ঘুম হয় না অন্নপূর্ণার। সেদিন সন্ধ্যা থেকেই টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। তাই সকাল সকাল খেয়ে শুয়ে পড়েছিল সবাই।রাত তখন ক'টা হবে ঠিক নেই। তবে বেশ কিছুক্ষণ আগে স্কুল হোস্টেলে রাত দুটোর ঘন্টা শুনেছে অন্নপূর্ণা। হঠাৎ তাদের দরজায় কড়া নড়ে ওঠে। ঘুম ভেঙে যায় অন্নপূর্ণার। ভিতর থেকেই অন্নপূর্ণা জিজ্ঞাসা  করে  -- কে ? জবাব আসে ---- আমি মোহন দফাদার। 
গলা শুনেই অন্নপূর্ণা চিনতে পারে ঝিলডাঙার মোহনকে।কোথাও চুরি হলে বহুবার সায়ন্তন রাতে বাড়িতে আছে না চুরি করতে গিয়েছে তা ঘুম ভাঙিয়ে দেখে গিয়েছে। এবারও কি সেই খবর নিতে এসেছে দফাদার ? ঘরের ভিতর থেকেই কিছুটা  আভাস পায় অন্নপূর্ণা। গলা শুনতে পায় পচা আর ভজা চৌকিদারেরও। তাই সে  জিজ্ঞেস করে , আবার 
কোথাই চুরি হলো গো দফাদার। আজ কিন্তু আমাদের ছেলের বাবা বাড়ি থেকে বেরোয় নি। তোমরা বরং অন্য জায়গায় দেখ।
 ---- অন্য জায়গায় দেখ বললেই তো হবে না। তিনআনিবাবুদের দোকানে চুরি হয়েছে। ওদের সন্দেহ তোমাদের ছেলের বাপই চুরিটা করেছে। বমালও তোমাদের ঘরেই রয়েছে। তুমি বাপু দরজাটা একবার খোল। বাবুরাও আছেন, ওরাও মিলিয়ে নিতে পারবেন তাদের সন্দেহ সত্যি না মিথ্যা।


                           তিনআনিদের কথা শুনে অমঙ্গলের আশংকায় বুকটা ধক করে ওঠে অন্নপূর্ণার। ততক্ষণে ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসেছে সায়ন্তনও। সে সবই শোনে। বাইরে তখন দরজা খুলে দেওয়ার জন্য জোর তাগাদা শুরু হয়েছে। সে উঠে দরজা খুলে দেওয়ার উপক্রম করতেই তার হাত চেপে ধরে সায়ন্তন। তার চোখেও তখন আতঙ্কের  ছাপ।কিছুটা ভীত সন্ত্রস্ত গলায় সে বলে, ওই ভুল কোর না। মনে হচ্ছে ওদের কোন পরিকল্পনা রয়েছে। সকাল হোক তারপর যা হয় হবে। সে সন্দেহ অন্নপূর্ণারও হয়। কিন্তু কতক্ষণ সে দরজা না খুলে থাকবে? এরপর তো ওরা দরজা ভেঙে  ঘরে ঢুকবে। তাই সে বলে , কি আর  পরিকল্পনা করবে? তুমি তো আর আজ চুরি করতে যাও নি। আমাদের ঘরে কোন চোরাই মালও নেই। দেখে মুখ বোঁচা করে ওদেরই ফিরে যেতে হবে। সবাই জানবে, শুধু তুমিই সব জায়গায় চুরি করো না। তুমি ছাড়াও চোর আছে। এতে আমাদেরই মঙ্গল হবে।
 --- তবু আমার মন কেমন যেন কু ডাকছে। তুমি বরং রাম'দাটা বের করে আমার হাতে দাও।আমি দরজার মুখে দাঁড়ায়।কেউ ঢুকলেই ধর থেকে মাথা নামিয়ে দেব।
--- তাতে খারাপই হবে। সবাই ধরে নেবে চুরিটা তুমিই করেছো। তাই ঘর খুলে বেরোতে ভয় পাচ্ছো। তাছাড়া ওইভাবে কতক্ষণ তুমি দরজা আটকে রাখবে ? একসময় তো পুলিশ এসে দরজা ভেঙে তোমাকে বের করবে। তখন রোখ চেপে যাবে ওদের।স্ত্রীর কথা শুনে সায়ন্তের চোখে মুখে ফুটে ওঠে দোটানার ছাপ। অন্নপূর্ণার কথাও ফেলে দেওয়ার নয়। দোটানায় পড়ে অন্নপূর্ণাও। যদি সায়ন্তনের আশংকাই সত্যি হয় ? তাহলে তো আর তার আফশোষের অন্ত থাকবে না। বাইরে তখন দরজা খোলার জন্য চাপ তীব্রতর হচ্ছে। চৌকিদারেরাও তাড়া দিচ্ছে -- আমাদের সংগে কুড়ুল আছে, এরপর কিন্তু দরজা ভাঙতে হবে। তীব্র খট খট শব্দে ফের নড়ে ওঠে দরজার কড়া। ছেলেমেয়েরাও ঘুম ভেঙে বিছানায় বসে চোখ কচলায়। স্বামী - স্ত্রী পরস্পরের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নীরবে চেয়ে থাকে। নীরবতা ভেঙে অন্নপূর্ণা বলে --কিছুই হবে না দেখো, দফাদার -- চৌকিদারের মতো সরকারি লোক যখন আছে তখন অন্যায় কিছু হবে না। 
সায়ন্তন বলে --- তবে তাই দাও খুলে। যা হওয়ার হবে।যেন খাদের কিনার থেকে ভেসে আসে সায়ন্তনের কন্ঠস্বর।

                 ( ক্রমশ )


No comments:

Post a Comment