ঠাকরুনমা
অর্ঘ্য ঘোষ
( অষ্টম কিস্তি )
সায়ন্তন বলে --- তবে তাই দাও খুলে। যা হওয়ার হবে।যেন খাদের কিনার থেকে ভেসে আসে সায়ন্তনের কঠস্বর। কিন্তু আর কিছু ভাবার সময় নেই। দরজায় একসঙ্গে অনেক পায়ের লাথির শব্দ পায় অন্নপূর্ণা।সে বলে -- খুলছি বলছি তো। দরজাটা ভেঙে দেবে নাকি শেষ পর্যন্ত।
------ তাড়াতাড়ি করো , নাহলে আমাদের তাই করতে হবে।
অগত্যা এক মুহুর্তে যতগুলো ঠাকুরদেবতার নাম মনে আসা সম্ভব, সবাইকে স্মরণ করে দরজার ছিটকানিতে হাত রাখে অন্নপূর্ণা। আর ছিটকানি খোলার শব্দ বাইরে পৌঁছোতেই আশ্চর্য রকম নিশ্চুপ হয়ে যায় সব কোলাহোল।ছিটকানি খুলতে গিয়েও হাত কেপে যায় অন্নপূর্ণার।কিন্তু আর তো পিছিয়ে আসার জায়গা নেই। তাই চোখ বন্ধ করে সে খুলে ফেলে ছিটকানি।আর সঙ্গে সঙ্গে ওঁত পেতে থাকা বাঘের মতো তিনআনিদের মেজ আর ছোটভাই ঝাঁপিয়ে পড়ে সায়ন্তনের উপর। দুজনে খপ করে সায়ন্তনের দুই হাত ধরে টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। বাইরে তখন তিনআনি আর বামাপদদের অনেক লোক। ভয়ে মুখ শুকিয়ে যায় সায়ন্তের।দরজার সামনেই তাকে চড় থাপ্পড় মারতে শুরু করে ওরা। তারপর টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই ছেলেমেয়েরা বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলিকে লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে সায়ন্তনকে পিছমোড়া করে বেধে ফেলে ওরা। ছেলেমেয়েদের সামনে ওইভাবে হেনস্থায় বড়ো করুণ দেখায় সায়ন্তনের মুখ। তার চোখে জল গড়িয়ে পড়ে। আর তা দেখে ছেলেমেয়েগুলো কাউকে কাকু, কাউকে জ্যেঠু, কাউকে দাদু বলে পায়ে আছড়ে পড়ে। কেঁদে কেঁদে তারা বলে,মাকালী, রাধারমণের দিব্যি বলছি বাবা চুরি করে নি।তোমরা বাবাকে ছেড়ে দাও।বাবা কতদিন পেট ভরে খেতে পায়নি। মারলে মরে যাবে। বাবা ছাড়া
আমাদের যে আর কেউ নেই গো।
কেউই ওদের কথা কানে তোলে না। বরং টিপন্নী কাটে, সব এক একটা রক্তবীজের ঝাড়। কেমন শেখানো বুলি বলছে দেখ। এরাও বড় হয়ে এক একটা চোর হবে। আর কোন কথা শোনার মত অবস্থা ছিল না অন্নপূর্ণার। তাদের সামনে দিয়েই পিছমোড়া দিয়ে বাধা অবস্থাতেই পশুর মতো টানতে টানতে সায়ন্তনকে দোকান ঘরের দিকে নিয়ে যেতে থাকে উন্মত্তের দল। সেই অবস্থাতেও সায়ন্তনের সঙ্গে চোখাচোখি হয় অন্নপূর্ণার। সে চাউনি বড়ো করুণ। কিসের যেন ছায়া সে দৃষ্টিতে। বলির আগে হাড়িকাঠে বাঁধা ছাগশিশুর মতো চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। কিন্তু অন্নপূর্ণার অত ভাবার সময় নেই। সে বুঝতে পারে ওদের পাতা ফাঁদে সে পা দিয়ে ফেলেছে। ফাঁদই তো , না হলে সায়ন্তনকে ধরার পর ওরা একবারও চোরাই মাল খুঁজতে ঘরে ঢুকল না।অন্নপূর্ণা তখনই বুঝে যায়, চুরিটা আসলে সাজানো। সে চেপে ধরে দফাদার, চৌকিদারদের। কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গেই সে বলে, তোমরা যে বললে ঘর খোল চোরাই মাল আছে কিনা দেখব, কই দেখলে না তো। ওরা সবাই আমতা আমতা করে। তা দেখে অন্নপূর্ণা ফের বলে , থাক আর কিছু বলতে হবে না তোমাদের। যা বোঝার তা আমি বুঝে গিয়েছি। আইনের রক্ষক হয়ে আমাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে একদল কসাইয়ের হাতে আমার নির্দোষ স্বামী কে তুলে দিলে।তোমরা আইনের লোক, তোমাদের হাত লম্বা।আইনের ফাঁক গলে তোমরা হয়তো বেরিয়ে যাবে।কিন্তু ওই উপরে একজন আছেন, তার বিচারে তোমরা পার পাবে না। তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে , এখন ভালোয় ভালোয় আমার সামনে থেকে বিদায় হও। না হলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমি মাথা ঠুকে মরব।
ওই কথা শোনার পরই তাদের বাড়ির সামনের ভীড়টা ফাঁকা হয়ে যায়। সবাই গুটিগুটি পায়ে তিনআনিদের দোকানঘরের দিকে হাঁটা লাগায়। অন্নপূর্ণাদের বাড়ি থেকে ঢিলছোড়া দুরত্বেই ওদের দোকানঘর। একটা রাস্তার এপার--ওপার। সেখান থেকেই ভেসে আসছে সায়ন্তনের কাতর আর্তনাদ। পরক্ষণেই ওদের পৌশাচিক উল্লাসে চাপা পড়ে যাচ্ছে সেই আর্তনাদ। আঁধার সরিয়ে সবে তখন উঁকিুদিচ্ছে আলো। নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে তার। তারই ভুলে আজ সায়ন্তনকে বিনা দোষে কসাইসদের হাতে মার খেতে হচ্ছে।আর ভাবার সময় নেই তার। দ্রুত স্নান সেরে এসে সে ভেজা কাপড়েই পালাক্রমে দুর্গা, কালী আর রাধারমণ মন্দিরে হত্যে দিয়ে পড়ে ছেলেমেয়েগুলোও ঠায় হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মধ্যেই হাঁফাতে হাঁফাতে হাজির হন গোমস্তাকাকা। অন্নপূর্ণা তার কাছে কেঁদে পড়ে , কাকা যা আশংকা করেছিলাম তাই হোল। লোকটাকে ওরা মেরে ফেলবে বোধ হয়।
---- আমিও এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম মা। শোন ঠাকুরের কাছে হত্যে পরে দেবে। এখন চলো বন্ধুবরণ আর রমাপতিবাবুর কাছে গিয়ে দেখি কিছু উপায় হয় কিনা।ভেজা কাপড়েই উদভ্রান্তের মতো গোমস্তাকাকার সংগে ছোটে গ্রামেরই ইউনিয়ন বোর্ডের সদস্য বন্ধুবরণ ঘোষের বাড়ি। তার পায়ে আছড়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। কাঁদতে কাঁদতে বলে , দাদা সেদিন আপনারা যা বলেছিলেন ছেলের মৃতদেহ কোলে নিয়ে আমরা তা মেনে নিয়েছিলাম।তারই প্রতিফল আমাদের এইভাবে পেতে হবে? লোকটাকে আপনি বাঁচান দাদা, নাহলে কসাইরা ওকে মেরে ফেলবে। সবকিছু শোনার পর বন্ধুবরণবাবু বলেন , শোন মা তোমার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু ওরা আমার কথা শুনবে না। উল্টে কিছু বলতে গেলে আমাকেও চুরির বমাল সামলায় বলে অপবাদ দেবে। তার চেয়ে আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি তুমি ইউনিয়নবোর্ডে যাও।সেখান থেকেই বরং কিছু একটা ব্যবস্থা হয় কিনা দেখ।
বন্ধুবরণবাবুর কাছে থেকে চিঠি নিয়ে তারা ছোটে ইউনিয়নবোর্ডের অফিসে। তখন সবে অফিসে এসে বসেছেন প্রেসিডেন্ট রমাকান্তবাবু। চিঠিটা দিয়ে তারও পা জড়িয়ে ধরে অন্নপূর্ণা। পা জড়িয়ে ধরেই সে বলে , বাবু আমি স্বীকার করছি আমার স্বামী চোর। কিন্তু বিশ্বাস করুন কাল রাতে ও বাড়ি থেকে বেরোয়ই নি। তিনআনির বাবুরা আক্রোশ বশে ওকে চোর অপবাদ দিয়ে তুলে নিয়ে গিয়েছে। আপনাদেরই দফাদার-চৌকিদাররা গিয়েছিল বলে আমি সরল বিশ্বাসে দরজা খুলে দিয়েছি। সেই দফাদার -- চৌকিদারদের দাঁড় করিয়ে ওরা ওকে নৃশংসভাবে মারছে। আপনি একটা কিছু করুন বাবু, নাহলে ওরা ওকে মেরে ফেলবে।
---- আমি আর কি করবো, এর আগেও তো তোমার স্বামী চুরি করে ধরা পড়ে অস্বীকার করেছে। তারপরে আবার মারের চোটে স্বীকার করেছে। এক্ষেত্রেও যে তেমনটা হবে না তার বিশ্বাস কি আছে ?
---- আমার কথা আপনি বিশ্বাস করতে পারছেন না বাবু, আচ্ছা বলুন তো এর আগে কোনদিন আমি এভাব আপনার কাছে ছুটে এসেছি ?
----- বেশ, তুমি বাড়ি যাও দেখছি আমি কি করা যায়। একজন চৌকিদারকে দিয়ে বরং থানায় খবর পাঠাচ্ছি। পুলিশ এসে যা করার করুক।
------ কিন্তু পুলিশ আসতে আসতে ওরা যে ওকে মেরে ফেলবে বাবু। আপনি গিয়ে যদি একটু দাঁড়াতেন তাহলে লোকটা প্রানে বেঁচে যেত। আপনি একটু দয়া করুন বাবু।
----- না, সেটা হয় না। সেটা আমার এক্তিয়ারের বাইরে।
অন্নপূর্ণা বুঝে যায় এখানে কিছু হওয়ার নয়। তার মনে অনেক কথা ভীড় করে আসে। মনে পড়ে যায়, সৌরভ বাস চাপা পড়ার সময় এই রমাপতিবাবুরাই বাসমালিককে আইনী জটিলতা থেকে বাঁচাতে সেদিন নিজে থেকে ছুটে গিয়েছিলেন। তার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, বাবু গো তোমাদের এক্তিয়ারের সীমাটা কি আমাদের মতো গরীবের ক্ষেত্রেই বাঁধা।কিন্তু প্রশ্নটা আর করা হয় না অন্নপূর্ণার। উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে আসে গৌরব। তাকে দেখেই বুকটা ধক করে ওঠে তার। সায়ন্তনের কিছু হয়ে গেল নাকি, সেই আশংকায় বুকটা কেঁপে ওঠে। ছেলের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় সে।
---- কি হলো রে , ছুটছিস কেন ?
---- মা তাড়াতাড়ি দেখবে চলো , মুখে গামছা বেঁধে তিনআনিদের দোকানের লোকটা ভূধর পুকুরের পাড় আর আমাদের বাড়ির পিছনের বাগানে অনেক চাল, গম আর ডাল ছিটিয়ে দিয়ে চলে গেল। বাবা তো অনেকদিন পেটে ভরে খায় নি , তাই বাবা ফিরে এসে পেট ভরে খেতে পাবে বলে দিদি সেইসব চালডাল কুড়োচ্ছিল। লোকটা দিদিকে বলল ওইসব কুড়ালে হাত কেটে নেবে। ওরা কি রকম লোক দেখ, সেবারে ভোজে আমাকে খেতে দিল না, কত খাবার কুকুরকে খাইয়ে দিল, কত চালডাল ছড়িয়ে দিল, অথচ আমাদের কুড়োতেও দিল না।
হায়রে শিশুর মন ! অভুক্ত বাবাকে ওইভাবে মার খেতে দেখে কত উতলা হয়ে পড়েছে। বাবা যাতে অন্তত একটা দিন পেটপুরে খেতে পায় তার জন্য ছড়িয়ে দেওয়া চাল গম কুড়িয়ে রাখছে। ওরা জানেও না তাদের বাবাকে ফাঁসাতেই ওইভাবে চালগম ছড়িয়ে দেওয়া হল। গৌরব বুঝতে না পারলেও অন্নপূর্ণার বুঝতে বাকি থাকে না সায়ন্তনের বিরুদ্ধে চুরির মামলাটা জোড়ালো করতেই ওইভাবে চালগম ছড়িয়ে দেওয়া হল। পুলিশ এলে চুরির চালগম ওইখানে ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে বলে রিপোর্ট লিখিয়ে নেবে। এরকম তো কতবার হয়েছে। অন্নপূর্ণা বুঝতে পারে সায়ন্তনকে ফাঁসাতে বেশ আটঘাট বেঁধেই নেমেছে ওরা।
ছেলের হাত ধরে ছুটতে ছুটতে বাড়ির দিকে ফেরে তারা। ফেরার পথেই দেখতে পায় তিনআনিদের দোকানের সামনে মেলার মতো লোক ভেঙে পড়েছে। পিছমোড়া দিয়ে তখনও বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে সায়ন্তনকে। আর গোল করে তাকে ঘিরে মাঝেমধ্যেই পৌশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ছে একদল মানুষ।অন্নপূর্ণা বুঝতে পারে বাঁধা মানুষটির উপরে নানা ধরণের প্রহারের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ওই ধরণের উল্লাস করা হচ্ছে। মানুষ এত নৃশংস ও হয়! সে আর সহ্য করতে পারে না। দ্রুত ঘরে ঢুকে যায়। সায়ন্তনকে বাঁচানোর আর কোন উপায় নেই দেখে শেষপর্যন্ত লজ্জার মাথা খেয়ে বাসন্তীর দেওর সন্দীপনকেই একটা খবর দেওয়ার জন্য গোমস্তাকাকাকে পাঠায়। তারই মধ্যে কোন এক ফাঁকে বাবাকে দেখে এসে সমানে কাঁদতে থাকে গৌরব আর ছোট মেয়ে ছবি। থেকে থেকেই তারা শিউরে ওঠে। গৌরব বলে , জানো মা ----যে পারছে সেই বাবাকে মারছে। কেন মা, বাবা তো সবার বাড়িতে চুরি করে নি , তাহলে বাবাকে ওরাও মারবে কেন ? বাবার সারা শরীরে রক্ত ঝড়ছে। হাতে পায়ের নখও ওরা সাঁড়াশি দিয়ে টেনে তুলে দিয়েছে। বাবা যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে আর বলছে, আমি চুরি করি নি ,বিশ্বাস করো। আর মেরো না, আমি মরে যাব। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তত ওরা হো,হো করে হেসে উঠছে। কখনও গায়ে ছুঁচ ফোটাচ্ছে , কখনও কাটার ঝোঁপে ফেলে দিচ্ছে। আবার কখনও বা পিঁপড়ের ঝাঁকেও ফেলে দিচ্ছে। বাবার কত কষ্ট হচ্ছে বলো মা। একটা পিঁপড়ে কামড়ালেই আমাদের কত জ্বালা করে। আর বাবাকে তো ঝাঁকে ঝাঁকে পিঁপড়ে কামড়াচ্ছে, হাত বাঁধা থাকায় বাবা তো কিছু করতেও পারছে না। শুধু উঃ-আঃ করছে। আর শুনতে পারে না অন্নপূর্ণা। কানে আঙুল দেয়। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা। কান্নায় ভেঙে পড়ে ছেলেমেয়েরাও। একটু সামলে উঠতেই ফের ছবি শুরু করে জানো মা বাবা শুধু একটু জল দাও -- একটু জল দাও করছে। আর ওরা শুধু জল খাবি, নে খা বলে বাবার মুখের কাছে জলের গ্লাস নিয়ে গিয়ে ফেলে দিচ্ছে। মা আমরা যাবো , বাবাকে এক ঘটি জল দিয়ে আসব ? অন্নপূর্ণা বলে, তাই যা।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসে ছেলেমেয়ে দুটো। অন্নপূর্ণা জিজ্ঞেস করে -- কি রে কি হলো ? বাবাকে জল দিতে দিল না বুঝি ? কান্নার দমকে কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারে না ওরা। কিছুটা সামলে ওঠার পর সৌরভ বলে, জানো মা, আমাদের দেখে বাবা জল খাওয়ার জন্য হাঁ করেছিল , আমরা জলটা বাবার মুখে ঢেলে দিতে যাচ্ছিলাম তখন ওদের ছোটবাবু ছুটে এসে লাথি মেরে ঘটিটা ফেলে দিয়ে বলল , বাবাকে তোরা কি জল খাওয়াবি , দেখ আমি কেমন জল খাওয়ায়। তারপর সবার সামনে বাবার মুখে পেচ্ছাপ করে দিল। তেষ্টার চোটে বাবাও তা খেয়ে নিতে বাধ্য হল জানো মা। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না অন্নপূর্ণা। রাধারমণের মন্দিরে কপাল ঠুকতে থাকে সে। একসময় তার কপাল ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। মেয়েরা জোর করে তুলে ঘরে নিয়ে যায় তাকে। সেদিন কেউ আর জলস্পর্শ পর্যন্ত করে না। খিদে -- তেষ্টার বোধটাই চলে যায় সবার। দুপুর গড়িয়ে যায়। স্নান - খাওয়া করে আবার মজা দেখতে ভীড় জমায় মানুষ। পালাক্রমে তিনআনিরাও স্নান খাওয়া করে আসে। আর কুকুরের মতো জিভ বের করে ধুকতে থাকে শুধু অভুক্ত একটা মানুষ। আর অভুক্ত থাকে তার পরিবার। মজা দেখতে আসা মানুষদের একবারও মনে হয় না , সকাল থেকে যে অমানবিক মার খাচ্ছে , সেও আসলে একটা মানুষ। তারও খিদে-- তেষ্টা পায়। আবার কারও মনে হলেও বাবুদের দাপটের ভয়ে একটি কথাও বলতে পারে না। ওদিকে তখন নতুন উদ্যমে উল্লাস শুরু হয়েছে। নতুন যারা হাজির হচ্ছে তাদেরও হাত নিশপিশ করে ওঠে।বাঁধা মানুষকে মারার বীরত্ব দেখানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে কেউই চায় না। তার মধ্যে হাজির হয় দুই ভাই ববি আর বীরু। তারা স্থানীয় আর এক প্রভাবশালী পরিবারের ভাগ্নে। তারাই বা প্রভাব দেখানোর সুযোগ ছাড়বে কেন ?
তিনআনিদের সাজানো চুরির তত্ত্ব তাদের জানার কথা নয়। তাই তারা নিজেদের বাহাদুরী দেখাতে আর কে ওই চুরির সঙ্গে জড়িত ছিল তা কবুল করার জন্য শহুরে কায়দায় প্রহার শুরু করে। মামার দৌলতে শহরে থাকার অভিজ্ঞতা তাদের যথেষ্টই রয়েছে। কিন্তু হাজার মারধোরে কোন নাম কবুল করাতে পারে না তারা। পারবে কি করে, যেখানে চুরিটাই হয়নি যেখানে নাম আসবে কি করে ? কিন্তু তাতে যে লোক সমক্ষে দুই ভাইয়ের সম্মান থাকে না। তাই তারা নিজেরাই স্থানীয় ছিঁচকে চোর শ্রীকান্ত দলুইয়ের নাম টেনে আনে। তারপর বলে , বল শ্রীকান্ত ছিল তাহলে তোকে ছেড়ে দেব , না হলে তোকে খুন্তি পুড়িয়ে ছ্যাঁকা দেব। সেই ভয়ে সায়ন্তন ওদের সপক্ষে ঘাড় নেড়ে দেয়। আর যায় কোথায়। দুই ভাই বুকের ছাতি ফুলিয়ে বলে , দেখেছো আমরা ওর হাবভাব দেখেই বুঝেছিলাম। এ ব্যাটার সঙ্গে আরও কেউ আছে।দুই ভাইয়ের প্রশংসায় সবাই ধন্য ধন্য করে ওঠে। সবাই বলাবলি করে , হবে না ওরা বাইরে ঘোরাফেরা করা ছেলে। দেখলে না ওদের মারের ধরণটাই আলাদা। সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিয়ে আসা হয় শ্রীকান্তকে। সে এসেই তার নাম করার জন্য সায়ন্তনের বুকে গুম গুম করে কিল মারতে শুরু করে। ততক্ষণে জ্বালা-যন্ত্রনার বোধ হারিয়ে ফেলেছে সায়ন্তন। সে কেবল ক্ষীণ স্বরে বলে চলে, একটু জল -- একটু জল। সেই সময় সেখানে হাজির হন স্কুলমাস্টার প্রত্যুষ ঘোষ। তিনি বলেন , হা রে করেছিস কি লোকটা মরে যাবে যে। ওর বাঁধন খুলে মুখে একটু জল দে।
মাস্টারের কথা শুনে ঝাঁঝিয়ে ওঠে তিনআনির বাবুরা। তারা বলে, তুমি এখান থেকে যাও তো মাস্টার। তোমাকে বেশি দালালি করতে হবে না। ও ওইরকম ভান করে পড়ে আছে। খুলে দিলেই ছুটে পালিয়ে গেলে কে দায়িত্ব নেবে শুনি ?
----- বেশ ও যদি পালিয়ে যায় তোরা না হয় আমাকেই বেঁধে পুলিশের হাতে তুলে দিস।
ওই কথা শুনে উপস্থিত জনতাও একই কথা বলে। শেষ পর্যন্ত দড়ি খুলে জল দেওয়া হয় সায়ন্তনের মুখে। ছেলেমেয়েরা পালাক্রমে দেখে এসে সব বলে অন্নপূর্ণাকে। আর শুনেই শিউরে ওঠে সে। আর এত নিপীড়ন সহ্য করতে না জানি সায়ন্তনের কত কষ্ট হচ্ছে।ক্রমেই ধৈর্য্য হারা হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা।সন্দীপনকে নিয়ে এখনও আসছে না কেন গোমস্তাকাকা ? রাত ভোর থেকে সরগরম হয়ে থাকা তিনআনিদের দোকান চত্বরটাতে হঠাৎ নেমে আসে আশ্চর্য রকম নিস্তব্ধতা। গুটিগুটি পায়ে বাড়ির পথে পা বাড়ায় মজা দেখতে আসা মানুষজন। দূর থেকে ভেসে আসে জীপের হর্ণের শব্দ।
কান পেতে শব্দটা শোনার চেষ্টা করে অন্নপূর্ণা। এ গ্রামে এক বামাপদবাবুর বাস ছাড়া গাড়ি কালেভদ্রে ঢোকে। তাহলে এ নিশ্চয় পুলিশের গাড়ি। ইউনিয়নবোর্ডের চেয়ারম্যানের খবর পেয়েই বোধ হয় তারা এল। অন্নপূর্ণার মনে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। এবার নিশ্চয় সায়ন্তনকে পুলিশের হাতে তুলে দেবে ওরা। আরও একটা মিথ্যা মামলা হয়তো ঘাড়ে চাপবে , কিন্তু অমানসিক মারের হাত থেকে সে রক্ষা পাবে। প্রানে বেঁচে তো যাবে।তারপর আর তারা এই গ্রামে থাকবে না। বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে চলে যাবে অন্য কোথাও। কিসের মোহে থাকবে এ গ্রামে। কে আছে তাদের ? এত বড়ো এই বিপদের দিনে গোমস্তাকাকা ছাড়া কেউ তো পাশে এসে দাঁড়ায় নি। ভাসুর -- জা 'রা এসময় তার পাশে এসে দাঁড়ালে সে কত বল-ভরসা পেত। ভাসুররা চেষ্টা করলে হয়তো সায়ন্তনকে মারের হাত থেকে বাঁচিয়ে ছাড়িয়েও আনতে পারত। কিন্তু মজা দেখতে আসা মানুষজনের মতো ওরাও দুর থেকে বারন্দা কিম্বা জানলা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখেছে। অন্নপূর্ণা ভাবে সায়ন্তন তো শুধু তার স্বামীই নয়, ওদের যে এক মায়ের পেটের ভাই। একদিন তো সবাই এক বিছানায় শুয়েছে, এক থালায় খেয়েছে। তাহলে কি করে সব ভুলে গেল ওরা। এখন তো ভাই বলে পরিচয় দেয় না।অন্নপূর্ণা দুই ভাসুরকেই বলতে শুনেছে , চোরটা আমাদের ভাই নয়। আমাদের ভাই মরে গিয়েছে। কত সহজেই মরে যাওয়ার কথা বলে দেয় ওরা। কিন্তু মায়ের পেটের ভাইকে ভদ্রভাবে বেঁচে থাকার পথ দেখিয়ে দিতে পারে না। তাই এ যাত্রায় রক্ষা পেলে গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে তারা। সৎ ভাবে বাঁচার চেষ্টা করবে। কিন্তু তখনও সে আন্দাজ করতে পারে নি গ্রাম ছেড়ে যাওয়া আর তাদের হবে না। ততক্ষণে সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। টের পায় কিছুক্ষণ পরেই।
পুলিশের লোকেরা এসে সোজা তিনআনিদের বৈঠকখানা বাড়িতে উঠে। তাদের আপায়ণের জন্য সঙ্গে সঙ্গে গাছ থেকে পাড়া হয় কচি ডাব। সেখানে বসেই রিপোর্ট লিখে নেয় ওরা। কিন্তু সায়ন্তনের কি হল কিছু বুঝতে পারে না সে। গৌরবকে বলে, যা তো দেখে আয় তোর বাবাকে কি পুলিশের জীপে তুলে নিয়েছে না এখনও মারধোর করছে। গৌরবকে আর যেতে হয় না। পাড়ারই যোগনাথ হাজরা ছুটতে ছুটতে হাজির হয়। যোগনাথ সায়ন্তনেরই অনুগামী। সামান্য যে কয়েকজন মানুষ তাদের সংগে মেশে সে তাদের অন্যতম যোগনাথকে ওইভাবে ছুটে আসতে দেখে অন্নপূর্ণার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটা হিম স্রোত বয়ে যায়। যোগনাথের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই সে বলে, সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে ঠাকুরুনমা। কাকা আর নেই। মুখে জল দিতেই হেচকি তুলে নেতিয়ে পড়ল। সবার চোখের সামনে লোকটাকে ওরা মেরে ফেলল গো। কেউ কিছু বলল না। কথাটা শোনা মাত্রই দেওয়ালে মাথা ঠুঁকতে শুরু করে অন্নপূর্ণা। তার কান্নায় সবাই সচকিত হয়ে ওঠে। মেয়েরাও কান্নায় ভেঙে পড়ে। অন্নপূর্ণা কেমন যেন পাগলের মতো বিড়বিড় করতে থাকে , ঠাকুর আমরা নিজে খেতে পায় নি , কিন্তু তোমাকে ফুল জল না দিয়ে আমি কোনদিন জলস্পর্শ করিনি। আর তুমি আমার এতবড়ো সর্বনাশ করলে? তোমার এতবড়ো পৃথিবীতে একটা মানুষের ঠাঁই হলো না ? প্রলাপের মতো সমানে বকে চলে ,আর মুর্ছা যায় অন্নপূর্ণা। ছেলেমেয়েদেরও একই অবস্থা। একসময় ধৈর্যের বাঁধন ছিঁড়ে যায়। সবাই ছুটে যায় তিনআনিদের দোকান ঘরের সামনে। সেখানে তখন পড়ে রয়েছে সায়ন্তনের রক্তাক্ত নিথর দেহ। সারা শরীরে ছেঁকে ধরছে পিঁপড়ের সারি। সেই অবস্থাতেই মৃতদেহ জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে সবাই। একটু সামলে ওঠার পর সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে দোকানটার উপর। উন্মাদের মতো দোকানঘরের দরজায় ইট পাটকেল ছুড়তে থাকে অন্নপূর্ণা।
আসলে এই রকমই হয়। প্রতিকার না পেতে পেতে মানুষ কুশপুত্তলিকা দাহ করে মনের জ্বালা মেটানোর চেষ্টা করে। অন্নপূর্ণারও যেন সেই জ্বালামুখ খুলে যায়। সেই সময়ই তাদের বাড়ির আশেপাশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা চাল-গমের তদন্ত সেরে অন্যান্য পুলিশদের নিয়ে সেখানে এসে পৌছোন থানার বড়বাবু। সেখানে তখন তিনআনিদেরও সবাই হাজির। তারাই বড়বাবুকে উদ্দেশ্য করে বলে দেখছেন স্যার -- আপনার সামনেই দোকানটার উপর কি ধরণের হামলা চালাচ্ছে ওরা। শুনে বড়োবাবু বলেন, শুনুন এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। তাহলে কিন্তু আপনাদেরও তুলে নিয়ে যেতে বাধ্য হবো। ওই কথা শোনার পরই যেন জ্বলে ওঠে অন্নপূর্ণা। আগুন ঝড়া গলায় সে বলে, কিসের আইন , আইন আছে আপনাদের ? সারাদিন একটু জল, একটু জল করে খুন হয়ে গেল একটা লোক, আর আপনারা সেই খুনীদের বাড়িতেই ডাবের জল খেয়ে আমার বাড়ির আশেপাশের চালগম ছড়ানোর তদন্ত করে আইন দেখাচ্ছেন আমাক ? আপনাদেরই দফাদার -চৌকিদারদের দাঁড় করিয়ে রেখে জলজ্যান্ত একটা মানুষকে পিটিয়ে মারল যারা আপনারা তাদের অভিযোগ নিয়েই এতক্ষণ কাটিয়ে দিলেন। আমাদের কথা একবারও শুনতে চেয়েছেন ? আইনের রক্ষক হয়ে আপনার কি উচিত ছিল না আগে আমার সঙ্গে কথা বলা ?
----- দেখছেন স্যার , দেখছেন মাগীর আস্পর্ধা খানা দেখছেন ? আপনার সামনে কেমন সমানে চোপা করছে।
---- আস্পর্ধা আমি ঘুচিয়ে দিতে পারি। কিন্তু সদ্য স্বামী হারা হয়েছে বলে ছেড়ে দিচ্ছি। তারপর অন্নপূর্ণার দিকে ঘুরে বলে, এই মেয়ে শোন তোর স্বামীতো চোরের দায়ে বমালসহ ধরা পড়ে গণপিটুনিতে মরেছে। এখন থানা, পুলিশ , মর্গ করতে গেলে তোর জিভ বেড়িয়ে যাবে। তার চেয়ে একটা কথা বলি শোন , বাবুরা ভালো মানুষ তাই সৎকারের খরচাপাতি দিতে রাজী আছেন , সৎকারের লোকও দেবেন , তোকে খোরাকী বাবদ কিছু চালগমও দেবেন। গ্রামের শ্মশানেই বডিটাকে পুড়িয়ে দিলে আর তোকে কিছু ঝামেলা পোহাতে হবে না। তুই বরং এই কাগজে একটা সই কিম্বা টিপছাপ দিয়ে দে। আমি চলে যায়।
---- বাঃ, অফিসার বাঃ। ভাল বলেছেন তো।
আচমকা ভীড়ের মধ্যে অচেনা গলা শুনে সবাই ফিরে তাকায়। অন্নপূর্ণা দেখে ভীড় ঠেলে গোমস্তাকাকার সংগে এগিয়ে আসছে সন্দীপন।
অন্নপূর্ণা ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে । অশ্রুভারাক্রান্ত গলায় বলে, সেই এলে বাবা আর একটু আগে এলে হয়তো তোমার মেসোমশাইকে হারাতে হত না। বাড়ি থেকে তুলে এনে নিরপরাধ মানুষটাকে জল্লাদরা পিটিয়ে খুন করে দিল। ওদের যেন সাজা হয় তা তুমি দেখো বাবা। সবার দৃষ্টি তখন সন্দীপনের দিকে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন থানার বড়বাবুও। সেদিকে চেয়ে সন্দীপন বলে, আচ্ছা বড়বাবু একটা কথার জবাব দিন তো আপনাদের ভারতীয় দন্ডবিধির কোন ধারায় লেখা আছে মাতৃস্থানীয়া মহিলাদের তুই তোকারি করা যায় ?
---- কে রে তুই লাটের বাঁট, আমাকে ধারা শেখাতে এসেছিস ?
---- স্টপ ,স্টপ।আমি কিন্তু আপনার চেয়েও নীচে নামতে পারি। সেটা কি ভালো হবে ? আমি কে সেটা পরে জানবেন। আগে আমি যা জানতে চায় সেগুলোর ঠিকঠাক জবাব দিন। নাহলে এখনই আমার পরিচয়টা আপনি জেনে যাবেন।
সেই সময় দফাদার বড়বাবুর কানে কানে কিছু বলে। আর তারপরই বড়বাবুর মুখ চোখের ভাব পাল্টে যায়। বিনয় বিগলিত গলায় তিনি বলেন , ও দাদা পরিচয়টুকু আগে দেবেন তো। আপনার নাম অনেক শুনেছি,আগে জানলে আর --
----- আগে জানলে কি হতো ? বিশেষ পরিচয় না থাকলে বুঝি আপনাদের কাছে ভালো ব্যবহার আশা করা যায় না ?বেশ এ হিসাব আপনার সঙ্গে পরে হবে। আগে বলুন তো আপনাদের তদন্ত প্রক্রিয়া কি শেষ?
---- তা একরকম শেষের পর্যায়েই বলতে পারেন। সেই জন্যই তো ওদের বলছিলাম , গরীব মানুষ আইনী ঝামেলায় যেতে হবে না। টাকা পয়সা নিয়ে এখানেই যা হয় একটা কিছু করে নিলেই ভালো হয়। এখন আপনি এসেছেন তখন যা হয় একটা কিছু বোঝাপড়া করে নিন।
---- হ্যা , আমি যখন এসেই পড়েছি তখন আপনাকে ভালো করে ঝেড়ে কাপড় পড়িয়ে দিচ্ছি দাঁড়ান। আচ্ছা আপনার বোঝাপড়া নিয়ে এত মাথা ব্যাথা কেন বলুন তো ? আরও একটি গোপন বোঝাপড়ার কারণেই কি ? কিন্তু সেটা তো আমি হতে দেব বড়বাবু।
---- বেশ আপনি কি চাইছেন বলুন ?
----- আপনি তো ওদের চুরির অভিযোগ নিয়েছেন কিন্তু খুনের অভিযোগ নেননি কেন ?
--- দিন, নিয়ে নিচ্ছি।
----- নিতে তো আপনাকে হবেই। আপনি ছড়ানো চালগমের তদন্ত করে এসেছেন, চোরের বাড়ি দেখেছেন কি ?
----- এখনই দেখে আসা করাচ্ছি।
---- হ্যা, দেখে এসে কি পেলেন না পেলেন তার রিপোর্ট লিখে নকল দিন আমাকে।আর ওদের অভিযোগেরও নকল দিন।
ওসি তিনআনিদের অভিযোগের কার্বনকপি তুলে দেন সন্দীপনের হাতে। সেদিকে চোখ বুলিয়ে সন্দীপন বলে, আপনার দফাদার চৌকিদার দের একবার ডাকুন তো।ডাকতে হয় না তার আগেই হাজির হয় ওরা। সন্দীপন তাদের একজনকে বলে, কোন দরজির দোকান থেকে একটা ফিতে নিয়ে আসুন তো। সন্দীপনের কাণ্ডকারখানা দেখে সবাই কেমন হকচকিয়ে যায়। বড়বাবু পর্যন্ত বলে বসেন, আপনি কি করতে চাইছেন বলুন তো ?
--- যেটা আপনার করা উচিত ছিল অথচ করেন নি, আমি সেটাই করতে চাইছি।
ততক্ষনে ফিতে চলে আসে। সেটা হাতে নিয়ে সন্দীপন বলে, অভিযোগে ওরা লিখেছে দেখুন সিঁধ কেটে ১ কুইন্ট্যাল ওজনের ১০ বস্তা চাল, গম, ডাল আর নগদ ৩ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়েছে , কি তাই তো ?
ভ্যাবাচ্যাকা লেগে যায় বড়বাবুর। ঘটনার গতি প্রকৃতি কোন দিকে যাচ্ছে বুঝতে না পেরে হ্যা সূচক ঘাড় নাড়ে।তারপর সন্দীপন দফাদার - আর চৌকিদারদের উদ্দ্যেশ্য বলে --- আপনারা তো ভোর থেকে বাবুদের সঙ্গেই ছিলেন। তখন দোকান ঘরের দরজার তালা তো আক্ষতই ছিল , না ভাঙা ছিল ?
দফাদার-- চৌকিদারদাররা একবার তিনআনি বাবুদের একবার ওসি'র মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।
তা দেখে সন্দীপন তীব্র ঝাঁঝের সংগে বলে ওঠে -- ওদের মুখে কিছু লেখা নেই। আমি যা জিজ্ঞাসা করছি তার ঠিকঠাক উওর দিন।
দফাদাররা আমতা আমতা করে বলে, হ্যা স্যার বাইরে তালা দেওয়াই ছিল।
সন্দীপন বলে , এবার আসুন দেখি সিঁধের পরিসরটা মেপে নিই।
ফিতে দিয়ে মাপজোক করে দেখা যায় সিঁধের পরিসর চারদিকেই দেড়ফুট। মাপজোপ করার সময়ই দোকান ঘরের সিঁধের সামনে ভীড় জমায় কৌতুহলী জনতা। তাদের উদ্দেশ্যে সন্দীপন বলে , আচ্ছা দাদা আপনারা একটু লক্ষ্য করে দেখুন তো সিঁধের ভিতরে বাইরে কোন চাল, গম, কিম্বা ডাল পড়ে আছে কিনা।
উপস্থিত জনতা সমস্বরে বলে ওঠে , না --আ
---- তার মানে এই দাঁড়াচ্ছে এখানে বস্তা খুলে কিছু নিয়ে যাওয়া হয়নি। নিয়ে যাওয়া হয়েছে বস্তাভর্তি মাল। নাহলে যেখানে ভাগ বাটোয়ারা করার সময় চালগম পড়ে থাকে সেখানে বস্তা খুলে চালগম বের করে নিয়ে যেতে হলে নিশ্চয় কিছু পড়ে থাকত। তাই তো , নাকি গো দাদারা ?
জনতা এবারও সমস্বরে বলে ওঠে , হ্যা --- আ
--- বেশ আপনারই বলুন তো , ওই সিঁধের ভিতর দিয়ে ১ কুই: ওজনের কোন বস্তা বের করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব , অফিসার আপনিও বলুন ?
ওই কথা শোনার পরই গুঞ্জন ওঠে জনতার মধ্যে। সকলের কাছে ততক্ষণে স্পষ্ট হয়ে যায় চুরিটা আসলে সাজানো গল্প। সন্দীপন ওসির উদ্দেশ্যে বলে, কি অফিসার কি মনে হচ্ছে এবার ? একটা পরিকল্পিত খুনকে কেন ধামাচাপা দিতে চাইছিলেন কোন উদ্দেশ্যে
বলুন তো ?
জনসমক্ষে ওই প্রশ্নে অস্বস্তিতে পড়ে হাত কচলাতে শুরু করেন বড়বাবুও। মিন মিন করে বলার চেষ্টা করেন --- না, মানে
----- শুনুন ওসব মানে টানে কিছু শুনতে চায় না , এতক্ষণ যা যা দেখলেন তা তদন্ত রিপোর্টে লিখে আমাকে কপি দিন। আর আপনি আপনার কাজ করুন। আইনে কি হবে সেটা সময় বলবে, কিন্তু আজ প্রমাণ হয়ে গেল মিথ্যা অভিযোগে প্রকাশ্যে একজনকে সরকারি প্রতিনিধি দফাদার-চৌকিদারদের সামনেই পিটিয়ে খুন করা হল।
---- তাহলে কি করতে বলছেন আপনি ? সন্দীপনের কাছে জানতে চান ওসি।
----- কি করতে হবে তা কি আপনি জানেন না ?
---- না, মানে আপনারা কি চাইছেন ----
------ চাওয়া চাওয়ির কিছু নেই। মাসীমার কাছে অভিযোগ লিখিয়ে নিয়ে খুনীদের গ্রেফতার করে কোমরে দড়ি বেঁধে গাড়িতে তুলুন।
----- কিন্তু দড়ি তো আনা হয় নি।
------ তাহলে কি বাবুদের বাড়িতে জামাই আদর খেতে এসেছেন ? খুনের তদন্তে এসেছেন আর অভিযুক্তদের বাঁধার জন্য দড়ি আনেন নি ? এমনি তে তো দেখি সামান্য পারিবারিক অভিযোগে ধৃতদের দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়ার সময় তৎপরতার অভাব হয়না। বেশ দড়ি আনেন নি তখন আর কি করবেন , ওদের দোকানেই দড়ি আছে দেখুন , সেই দড়ি দিয়েই বেঁধে নিয়ে যান ওদের। সেই মতো তিনআনিদের দোকান থেকেই ছোবড়ার দড়ি দিয়ে একসঙ্গে বাঁধা হয় সবাইকে। কয়েকজন অবশ্য ছুটে পালিয়ে যায়। গাড়িতে তোলার সময় তিনআনিদেনমেজকর্তা পীতাম্বর বলে ওঠে --- বড়বাবু এমন তো কথা ছিল না। আপনি ম্যানেজ করে দেবেন বলেছিলেন। নাহলে আমরাও পালিয়ে যেতাম।
----- তখন কি আর জানতাম আপনাদের চেয়েও ওদের খুঁটির জোর বেশী। জানেনই তো পুলিশ শক্তের ভক্ত নরমের যম। কথায় আছে না , আপনি বাঁচলে বাপের নাম।
পুলিশ তিনআনিদের নিয়ে চলে যেতেই জনমত সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। সকাল থেকে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল যে সব গ্রামবাসী তারাই বলাবলি করতে শুরু করে কাজটা বাবুরা ভালো করল না। নির্দোষ একটা মানুষকে বাড়ি থেকে তুলে এনে পিটিয়ে খুন করল, ভগবান কিছুতেই ওদের ক্ষমা করবে না। আমরা ওদের চালটাই এতক্ষণ ধরতে পারিনি। ধরতে পারলে এভাবে খুন করতে দিতাম না। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। মুহূর্তের মধ্যেই অন্নপূর্ণার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে গ্রামবাসী। অন্নপূর্ণা উপলব্ধি করে সন্দীপনের জন্যই এমনটা সম্ভব হয়েছে। সন্দীপনই যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে চুরির অভিযোগটা সত্যি নয়। সায়ন্তনকে খুন করার জন্যই আসলে চুরির নাটকটা সাজানো হয়েছিল। তারপরই গ্রামের মানুষের একাংশ ঘুরে যায়। সন্দীপন যদি আর একটু আগে আসতে পারত তাহলে হয়তো গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠত। আর সেই প্রতিরোধই বাঁচিয়ে দিতে পারত সায়ন্তনকে। তাই গলায় আক্ষেপ ঝড়ে পড়ে অন্নপূর্ণার গলায়। কিন্তু আক্ষেপ করার মতো সময় কোথাই তার ? গৌরবকে নিয়ে বেড়িয়ে যাবে সন্দীপন আর গোমস্তাকাকা। গ্রামের কয়েকজনও সঙ্গে যাবে। রামপুরহাট হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর তারাপীঠ শ্মশানেই মুখাগ্নি করে মৃতদেহ সৎকার করে দেওয়া হবে। তাদের পরিবারে বহরমপুরের গঙ্গাতীরেই সৎকারের রীতি প্রচলিত আছে। অন্নপূর্ণারও ইচ্ছা ছিল শেষবারের মতো সায়ন্তনকে একবার বাড়ি ফিরিয়ে এনে গঙ্গা দেবে। কিন্তু তাদের সব ইচ্ছে তো অপূর্ণই থেকে যায়। খরচের কথা ভেবেই ওই ইচ্ছেও তাকে ত্যাগ করতে হয়। তার তো ময়নাতদন্তের পর মৃতদেহ নিয়ে তারাপীঠে দাহ করারও সামর্থ্য নেই। নেহাতই এসময় দেবদুতের মতো সন্দীপন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাই। নাহলে স্বামীর সৎকারই আটকে যেত। সন্দীপন বলেছে , মাসীমা আপনি এসব নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। আমি সব সামলে দিচ্ছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে খবর পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসে পৌঁছোয় বাসন্তী , মা , দিদি আর বোন। লোক দেখানো লৌকিকতা করতে এসে দাঁড়ায় ভাসুর--জা'রাও। দুঃখ, দুঃখ মুখ করে সান্ত্বনার বানী শুনিয়েই কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে যায় ভাসুর আর জা'রা। তার অবস্থা তো ওদের অজানা নয়। কিন্তু কি করে কি হবে তা একবার জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন বোধ করে না। পাছে কোন আর্থিক দায় ঘাড়ে চাপে সেই আশংকায় লৌকিকতার নিয়ম রক্ষা করেই চলে যায়। ওরা বললেও অবশ্য অন্নপূর্ণা ওদের কাছে কিছু নিতে পারত না। দিনের পর দিন অভুক্ত কেটেছে, সব জেনেও যারা ফিরেও তাকায় নি তাদের সাহার্য্য নেওয়ার আগে মৃত্যুই শ্রেয় বলে মনে করে অন্নপূর্ণা। তার বাড়িতে তো হবিশ্যি করার মতো আতপচালটুকু ও পর্যন্ত নেই। বাসন্তীর শ্বাশুড়িমা অবশ্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই গুছিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। মা'ও এনেছেন। মা-বাসন্তীরা তো আছেই , গ্রামের লোকজনের আনাগোনায় ঘর প্রায় ভর্তি। কিন্তু ওই একটা মানুষের অভাবই যেন শুনত্যাকে প্রকট করে তুলেছে। দাহকাজ শেষ করে পরদিনই গোমস্তাকাকারা ফিরে আসেন। কান্নার রোল ওঠে বাড়িতে। গৌরব ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ছোট্ট হাত দুটো মেঝেতে
সমানে চাপড় মারতে থাকে সে। ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে হাত দুটো ধরে অন্নপূর্ণা বলে , এমন করছ কেন বাবা? হাতে লেগে যাবে যে।
----- লাগাই ভালো মা। এই হাত দিয়েই বাবার মুখে, চিতায় আগুন দিয়েছি। কত করে বললাম আমি পারব না , গোমস্তাদাদু বলল, তুমি আগুন না দিলে বাবা স্বর্গে যেতে পারবে না। আমি বললাম বাবাকে একা স্বর্গে যেতে দেব না। তাও ওরা শুনলো না। জোর করে আমার হাত দিয়ে আগুন ছুঁইয়ে দিল। বাবার কত কষ্ট হলো বলো? ওরা অত মারল। তারপরে ওই আগুন। জানো মা, আগুনে বাবার খুব জ্বালা করছিল। তাই মাঝে মাঝে সোঁজা হয়ে উঠে পড়ছিল। আর ওরা লাঠির বাড়ি মেরে মেরে বাবাকে আবার আগুনে শুইয়ে দিচ্ছিল।
ছেলেকে জ্বড়িয়ে ধরে অন্নপূর্ণা বলে, বাবু আর বলিস না বাবা সইতে পারছি না।তবুও গৌরব বলে চলে , মা দেখ কার্তিক, নরেন, টুম্পা সবার বাবা আছে। আমাদেরই বাবা হারিয়ে গেল। এবার রাতে বাইরে বেরোতে ভয় পেলে কে বলবে , বাবু ভয় নেই যা, আমি আছি। শুধু ভাত খেতে না পারলে কে বলবে বাবু দাঁড়া চট করে একটা মাছ ধরে আনি। বলো মা এবার তুমি বকলে কে আমাদের আদর করে বলবে, বকুক গে, মা'ই তো। চোখের সামনে আমাদের বাবা ছাই হয়ে গেল মা।
কারও চোখ শুকনো থাকে না। গোমস্তাকাকা এগিয়ে এসে গৌরবকে সান্ত্বনা দেন -- দাদুভাই আমার কি কম কষ্ট হচ্ছে! তোমার বাবাকে বলতে গেলে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি। তাকেই চলে যেতে হল , কিছুই করতে পারলাম না। কিন্তু তোমাকে তো এখন থেকেই শক্ত হতে হবে। বাবা তো কারও চিরকাল থাকে না। তোমাকেই তো একদিন এই সংসারের হাল ধরতে হবে। তাও কান্না থামতে চায় না গৌরবের। শোকের আবহাওয়া ঘিরে রেখেছে গোটা পরিবারকে। তেররাত্রির পারলৌকিক কাজ শেষে একে একে ফিরে যায় সবাই। আর এক নিঃসীম শুন্যতা গ্রাস করে নেয় অন্নপূর্ণাকে। এতদিন ঘরভর্তি লোকের মাঝে মনে হতো সায়ন্তনও আছে। কোথাও কোন কাজে গিয়েছে, কাজ মিটলেই যেন ফিরে আসবে। কিন্তু সবাই চলে যাওয়ার পর অবচেতন মনের সেই ভাবনাটা হারিয়ে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সদ্য চলে যাওয়া সায়ন্তনের স্মৃতি বড়ো বেশি জীবন্ত মনে হয় অন্নপূর্ণার।
এখনও দেওয়ালে টাঙানো তারে ঝুলছে সেদিন রাতে খুলে রাখা সেই ছাই রঙা জামা। তাতে এখনও লেগে রয়েছে সায়ন্তনের গায়ের সেই পরিচিত গন্ধ। কড়িকাঠে সযত্নে রাখা মাছ ধরার ছিপ। মাছ ধরার বড়ো নেশা ছিল সায়ন্তনের। তাদের তো মাছ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। সায়ন্তনের দৌলতেই ছেলেমেয়ের পাতে একটুকুরো মাছ দিতে পারত অন্নপূর্ণা। তাই সায়ন্তন যখন মাছ নিয়ে ফিরত তখন ছেলেমেয়েগুলো হামলে পড়ত। সৌরভ - গৌরব তো ঘাড়ে চেপে বসে আবদার করত --- বাবা আজ গোটা মাথাটা কিন্তু আমি খাব। সায়ন্তন বলত , বেশ তাই খাস।
---- না, তুমি মাকে বলে দাও। নাহলে ভেঙে দেবে।
ছেলেদের কথা শুনে সায়ন্তনের মুখে ফুটে উঠত এক নির্ভেজাল হাসি। বলত , আচ্ছা আজ দুজনে আধখানা করে খাও। কাল দুটো মাছ ধরে আনব। তখন দুজনেই গোটা মাথা খেও। তখন ঠোট ফুলে ওঠতো মেয়েদের। তারা বলত , বাবা আমরা মেয়ে বলে বুঝি বানের জলে ভেসে এসেছি। আমরা মাথা পাব না ?
একগাল হেসে মেয়েদের কাছে টেনে নিয়ে ওদের বাবা বলত, তা কেন হবে ? তোরাও একদিন করে খাবি। সব কথা মনে পড়ছে আর চোখের জল কিছুতেই বাঁধ মানছে না অন্নপূর্ণার। তার চোখে জল দেখলেই ছেলেমেয়েগুলো কাঁদতে শুরু করবে। তখন কে কাকে সামলাবে ? তাই নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে সে। কিন্তু নিজেকে ধরে রাখতে পারছে কই? সৌরভের কথা মনে পড়তেই তো আবার চোখে জল আসে তার। কয়েক বছরের মধ্যেই সংসার থেকে দু'জন মানুষ চলে গেল। যখন সবাই ছিল অভাবের সংসারে তখন একটা পেট মানে বড়ো দায় মনে হত। আর আজ দু'জনের অভাবে কত নিঃসঙ্গ লাগছে। সৌরভ যখন চলে যায় তখন তার পাশে সায়ন্তন ছিল। দুজনেই শোক সামলেছে। সামলেছে বহু ঝড় ঝাপটাও। হতে পারে চোর , মাথার উপর পুরুষ মানুষ বলতে ওই একজনই তো ছিল। আজ সে সম্পূর্ণ একা। এতগুলো ছেলে মেয়ের মা -বাবা এখন সে। ওদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন থেকে তার একার। তাই এবার থেকে শুরু হল তার বেঁচেবর্তে থাকার একক লড়াই।


No comments:
Post a Comment