Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুনমা - ৯




       ঠাকরুনমা  

                     


          অর্ঘ্য ঘোষ।


          ( নবম কিস্তি ) 


ওদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন থেকে তার একার। তাই এবার থেকে শুরু হয় তার বেঁচেবর্তে থাকার একক লড়াই। একসঙ্গে দুটি লড়াই একা লড়তে হবে তাকে। একটা স্বামীর খুনের আইনী লড়াই। অন্যটা খাওয়া পড়ার লড়াই। আইনের লড়াইয়ে অবশ্য তার পাশে সন্দীপন - গোমস্তাকাকারা রয়েছেন।খাওয়া পড়ার লড়াইয়ে কেউ কেউ পাশে থাকার আশ্বাস দিলেও তা সবিনয় এড়িয়ে গিয়েছে অন্নপূর্ণা। কারণ বাসন্তী আর বোনের শ্বশুরবাড়ির সাহার্য্য সে নিতে পারবে না। আর এতদিন যারা তাদের পাশে দাঁড়ায় নি তাদেরও কাছে হাত পাততেও পারবে না। যে কোন একটা কাজ তাকে খুঁজে নিতেই হবে। কাজ বলতে পরের বাড়িতে ধানসিদ্ধ, মুড়িভাজা কিম্বা ঝিগিরি। কিন্তু তাদের গ্রামের ক'জনেরই বা পয়সা দিয়ে ওইসব কাজ করানোর সামর্থ্য আছে? যাদের আছে তাদের কাছে গিয়েও কোন লাভ হয় না। সবাই জানায়, ছোটজাত হলে কথা ছিল। কিন্তু ব্রাহ্মণের বিধবাকে দিয়ে ওই জাতীয় কাজ করে মহাপাতকের ভাগী হতে তারা পারবে না। কথাটা শুনে হাসি আসে অন্নপূর্ণার। হায়রে ব্রাহ্মণের বিধবা! বর্ণ শ্রেষ্ঠত্বের কত গাল ভরা বিশেষণ ! ওই বিশেষণের বেড়িই তার জীবনে যেন নাগফাঁস হয়ে দেখা দিয়েছে। কারও কাছে হাত পাতবে না ভেবেছিল। কিন্তু হাত পাতা ছাড়া যে তার আর কোন গত্যন্তর রইল না।তবে সে সাহার্য কারও নেবে না ,  হাত পেতে দোরে দোরে ভিক্ষাই করবে। বাসন্তী আর মায়ের আনা চাল ডালে কয়েকটা দিন চলে যাবে। আর সেই রসদ থাকতে থাকতেই ভিক্ষার থালা হাতে পথে নামতে হবে তাকে। ছেলেটা বড়ো না হওয়া পর্যন্ত তাকে ভিক্ষা করেই সংসারটা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এতদিন মাথার উপরে সায়ন্তন ছিল , স্থায়ী রোজগেরে না হলেও অভাবের দিনগুলোতে তো লড়াইয়ে পাশে পেয়েছে। 


                                 সেটাই ছিল অনেক। তার উপরে রয়েছে মেয়েদের চিন্তা। খাওয়া পড়ার থেকে একা কি করে চার - চারটে মেয়েকে সামলে রাখবে সেই দুশ্চিন্তায় রাতে ভালোভাবে ঘুমোতে পর্যন্ত পারে না। সব থেকে দুশ্চিন্তা তার হৈমন্তীকে নিয়ে। কোন বিপদ আপদ হলে সে তো নিজেকে বাঁচাতে কোন প্রতিরোধই করতে পারবে না। এতদিনে সমাজকে তার ভালোই চেনা হয়ে গিয়েছে।অসহয়তার সুযোগ নিতে ভালোমানুষীর মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষেদের নখ দাঁত বেড়িয়ে পড়তে দেরি হবে না। সায়ন্তন যতদিন ছিল ততদিন তাকে ওই দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। তার দাপটে মেয়েদের কেউ উত্যক্ত করতে সাহস পায়নি। ওইসব কথা ভাবতেই গোমাস্তাকাকা এসে পৌঁছোন। তাকে সব কথা খুলে বলে সে। আর সেই কথা শুনে গোমস্তাকাকা  আক্ষেপে কপাল চাপড়াতে শুরু করেন। নিজের মনেই বিড় বিড় করেন তিনি।  ---  শেষ পর্যন্ত আমাকে এও দেখতে হলো মা ? পেটের দায়ে  জমিদারবাড়ির বৌকে আজ ভিক্ষা করতে হচ্ছে। এককালে  এই বাড়ির ভাত বারোভুতে খেয়েছে। বংশ পরম্পরায় আমরাও তোমাদের অন্নেই প্রতিপালিত। অথচ এই তোমার এই দুর্দিনে আমি তোমার কোন উপকারেই লাগতে পারছি না। আমার যদি সেই বয়েস থাকত তাহলে কিছুতেই তোমাকে ভিক্ষার থালা হাতে নিয়ে রাস্তায় নামতে দিতাম না। কিন্তু আমি যে অক্ষম হয়ে পড়েছি। এ সহ্য করা যে কত কষ্টের তা আমি কাউকে বলে বোঝাতে পারব না মা।
 ---- কাকা আপনি শুধু শুধু কষ্ট পাবেন না। এতো আমার নিয়তি। এ বাড়ির বৌ হয়ে আসার পর থেকে ভগবান তো আমার একের পর এক পরীক্ষা নিয়েই চলছেন। জানি না আর কত পরীক্ষা আমাকে দিতে হবে।
 ---- আমিও তো তাই ভাবি মা। আর ভগবানকে বলি ,  ঠাকুর এবার তুমি মুখ তুলে চাও।
---- আমি আর ওসব কিছু ভাবি না কাকা। আমি ভিক্ষায় বেরিয়ে গেলে আপনি পারলে মেয়েগুলোকে একটু দেখবেন।
---- সে নিয়ে তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না। আমার দ্বারা যেটুকু সম্ভব তা তুমি না বলে দিলেও আমি করব মা।



                                            শুরু হয় অন্নপূর্ণার নতুন জীবন। থালা হাতে গৃহস্থের বাড়ির দরজায় দাঁড়াতেই কেমন যেন বাধো বাধো ঠেকে। কিছুতেই আর ভিক্ষা চাইতে পারে না। গৃহকর্ত্রী তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। সে কোনরকমে বলতে পারে -- হরিবোল, দুটি ভিক্ষা দাও মা।
--- ও, বলে গৃহকর্ত্রী একমুঠো চাল এনে তার থালাতে অবজ্ঞাভরে ফেলে দেয়। আর দু'চোখ জলে ভরে যায় তার।একদিন সে কত ভিক্ষারীকে ভিক্ষা দিয়েছে আর আজ তাকেই ভিক্ষাপাত্র হাতে তুলে নিতে হয়েছে। 'হরিবোল, একমুঠো ভিক্ষা দাও মা ' বলতে দিয়ে যেন নাড়ী ছিঁড়ে যায়। তবু বলতে হয়। না হলে যে অন্নপূর্ণার অন্য উপায় নেই। কিন্তু নিজের গ্রামে বেশিদিন তার ভিক্ষা করা সম্ভব হয় না। তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই লোকেরা বলাবলি করে --- পাপ-- পাপ , নাহলেই কি এই হয় ?  দেখছো না ও জমিদারবাড়িতে পা দেওয়ার পর থেকেই একের পর এক বিপদ ঘনিয়ে আসে।জমিদারি গেল , শ্বশুর-শাশুড়ি গেল, ছেলে গেল। শেষে স্বামীকে হারিয়ে এখন ভিক্ষার থালাই হলো সম্বল। পাপ না হলে কি এমন হয় ? ওই তো আরও দুটো বউ তো আছে ,  কই তাদের তো এমন দুর্দশা হয় নি। লোকের কথা শুনে শুনে অন্নপূর্ণার মনে হয় সে আসলে পাপী। কিন্তু কি পাপ যে করছে তা সে জানে না। জ্ঞানত এ জন্মে তো সে কোন পাপ করে নি। তাহলে কি সে গতজন্মের পাপের ফল ভোগ করছে ? লোকের মুখে বার বার ওই কথা শুনতে শুনতেই নিজের মনকে প্রশ্নটা করে অন্নপূর্ণা। কিন্তু একই কথা বার বার শুনতে শুনতে তিতিবিরক্ত হয়ে সে গ্রামে ভিক্ষা করাই ছেড়ে দেয়। ভোর ভোর উঠে স্নান সেরে সে ভিক্ষা করতে চলে যায় দূর গাঁয়ে চুপি সারে  ফেরে সন্ধ্যার অন্ধকারে। কিছু চাল - মুড়ির সংগে একরাশ অবসাদ আর ক্লান্তি নিয়ে ফেরে সে। কিন্তু তারই মাঝে বিভিন্ন গ্রামের মেয়ে বৌ'দের সঙ্গে কথা বলে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে তার মন। 


                              খুনের মামলাটা নিয়ে নাকি পুলিশ জোর তৎপড়তা শুরু করেছে। প্রথম দিকে তো প্রভাব খাটিয়ে মামলাটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল ওরা। কিন্তু সন্দীপন তার পরিচিত বিধানসভার এক নেতাকে বিষয়টি জানানোর পর থেকেই পরিস্থিতিটা পুরো বদলে যায়। মেয়েরা বলে, পুলিশ নাকি কয়েকদিন ধরেই ফেরার অভিযুক্তদের খোঁজে  তিনআনিদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে। আর তাদের জিপের শব্দ শুনে গাঢাকা দিচ্ছে ওরা। তাদের না পেয়ে পুলিশ কোনদিন ওদের চাল গমে এক করে ছড়িয়ে ফেলে দিচ্ছে , তো কোনদিন গরু-ছাগল ডাকিয়ে নিয়ে খোঁয়াড়ে দিয়ে আসছে। গ্রামের মানুষের কাছে এটাও একটা বিনা পয়সায় দেখার মতো মজার বিষয় হয়ে উঠেছে। এতকাল বাবুরাই সবাইকে তারে নাচিয়েছে , সেই বাবুদেরই এখন চরকি নাচন নাচতে দেখে বেশ মজা পাচ্ছে গ্রামবাসীরা। তিনআনিদের ওই চোর-পুলিশ খেলা আটকাতে শেষ পর্যন্ত দোকানের সামনে ক্যাম্প পর্যন্ত বসায় পুলিশ। পুলিশের এহেন তৎপরতায় ন্যায় বিচার সম্পর্কে আশান্বিত হয়ে ওঠে অন্নপূণা। খেতে বসে তাই নিয়ে ছেলেমেয়েদের সংগে নানা রকম আলোচনাও করে সে। গৌরব বলে ,  বাবাকে ওরা যেমন ভাবে কষ্ট দিয়ে দিয়ে মেরেছে পুলিশও ওদের তেমনই ভাবে মারবে তাই না মা। ওরাও একটু জল একটু করবে বলো? গৌরবের প্রশ্নের কোন জবাব দেওয়া হয়না অন্নপূর্ণার। তার আগেই তাকে চমকে দেয় দোরগোড়ায় পরিচিত গলার বৌমা ডাক।

         
                                                     অন্নপূর্ণা চেয়ে দেখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দুই ভাসুর।  তাদের দেখে খুব অবাক হয় অন্নপূর্ণা। সেই সায়ন্তন যেদিন খুন হলো সেদিন একবার মাত্র মুখ দেখাতে এসেছিলেন। তারপর আর খোঁজ নেই নি। তাই দুই ভাসুরকে দেখে কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারে না সে। কিছুটা সামলে নিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে একটু আড়ালে সরে যায় সে। সেখান থেকেই ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলে - বাবা , জ্যাঠামশাইদের বসতে মোড়া দুটো বের করে দাও তো। মোড়াতে বসে প্রথমে বড়ভাসুর বলেন, তোমরা কেমন আছো জানতে এলাম। 
----- কেমন আছি তা তো আপনাদের অজানা নয় বড়দা।
---- সে তো জানিই। সেই জন্যই তো তোমরা যাতে ভালো থাকো তাই একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
 ----- প্রস্তাব , কিসের প্রস্তাব ? 
এবারে কথা শুরু করেন ছোটভাসুর। তিনি বলেন , দেখ বৌমা আমরা ভেবে দেখলাম সায়ন্তন চলে গিয়েছে , সে তো আর ফিরবে না। মাঝখান থেকে আইন আদালত করতে গিয়ে শুধু শুধু  তোমার হয়রানি আর অর্থব্যয় হবে। 
---- শুধু শুধু ? 
--- তা নয়, তিনআনিদের সঙ্গে  লড়াইয়ে তুমি পেরে উঠবে ? 
---- লড়াই তো সবে শুরু হয়েছে , এখন থেকেই আপনারা ধরে নিলেন কি করে যে আমি পেরে উঠব না ? 
---- ওদের কত প্রভাব প্রতিপত্তি, অর্থবল। তোমার পাশে কে আছে ?
----- সেটা এক অর্থে ঠিকই বলেছেন , আপন বলতে অবশ্য আমার পাশে কেউ নেই। কিন্তু একেবারেই যে কেউ নেই তা ভাবলেন কি করে ?
ইচ্ছে করেই খোঁচাটা দিল অন্নপূর্ণা। এতদিন কোন খোঁজখবর রাখে নি আজ এসেছেন উপদেশ দিতে। কিন্তু ওদের অযাচিতভাবে আসার কারণটা কিছুতেই আন্দাজ করতে পারে না। তাই জিজ্ঞাসা করে --- তা আপনারা কি করতে বলছেন ? 
এবারে শুরু করেন বড়ভাসুর --- বলি কি বৌমা, যা হয়েছে  তা তো আর ফিরবে না। তুমি বরং ওই মামলাটা থেকে  সরে দাঁড়াও।
--- কি বলছেন আপনারা? সরে দাঁড়াব মানে ?
---- শুধু শুধু কি আর সরে দাঁড়াতে বলছি তোমাকে ?
---- তাহলে ?
 ---- দেখ , তিনআনিরা বলে পাঠিয়েছে তুমি যদি মামলা থেকে সরে দাড়াও তাহলে ওরা তোমাকে ৫ বিঘে জমি দেবে আর ওদের মেজকর্তার ছেলের সংগে তোমার মেজমেয়ে কনার বিনা পণে বিয়ে দেবে । 



                                                          ওই কথা শোনার পরই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে  না অন্নপূর্ণা। মেজাজ হারিয়ে ফেলে। তীব্র শ্লেষের সঙ্গে  বলে ওঠে -- কি বলছেন আপনারা ? সেদিন কোথাই ছিলেন যেদিন আপনারই ভাইকে ওরা বিনা অপরাধে পিটিয়ে খুন করল সেদিন তো একটিবারের জন্য ভাইকে বাঁচাতে ওদেরকে গিয়ে একটা কথা বলারও প্রয়োজন মনে হয়নি আপনাদের। আর আজ কিসের জন্য ওদের কে বাঁচাতে ছুটে এসেছেন তা কি বুঝিনা ভাবেন ?
 ----- মানে কি বলতে চাইছো তুমি ?
---- দেখুন দাদা , এতদিন আপনাদের সামনে  মুখ তুলে কথা বলিনি, কিন্তু আজ আপনারাই আমাকে কথা বলতে বাধ্য করলেন। আমি কি বলতে চাইছি তা আপনার ভালোই বুঝেছেন। তবু যখন না বোঝার ভান করছেন , তখন বলছি শুনুন ওরা কি শুধু আমাকেই জমি দেবে ? আপনাদের কিছু দেবে না তা যে বিশ্বাস হয়না দাদা।
 ---- তুমি কি আমাদের দালাল ঠাউরেছ নাকি ?
---- ঠাউরানোর কথা কেন বলছেন , আপনারা তো আসলে সেটাই করতে এসেছেন যেটা দালালরা করে। তবে সেটা যে সম্ভব হবে না দাদা। আমরা পেটে গামছা বেঁধে পড়ে থাকব তবু ওদের কাছ থেকে গোটা জমিদারিটা দিলেও নেব না। আর খুনির ঘরে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার থেকে গলায় দড়ি কলসি বেঁধে পুকুরে ডুবিয়ে দেব।
 ----- তোমাদের  কপালে দেখছি সেটাই লেখা আছে।
---- কপালে লেখা থাকলে তো আমারও কিছু করার নেই।  আপনাদেরও কিছু করার নেই দাদা। ভাগ্যের হাতে মার খেতে খেতে এখনও যখন মরি নি তখন বিচার শেষ না দেখে মরবও না।
 ---- ঠিক আছে সেটাই দেখা যাবে। 


                                              বলে একরাশ ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে চলে যায় দুই ভাসুর। আর খুব মন খারাপ হয়ে যায় অন্নপূর্ণার। এতদিন যা হয়েছে হয়েছে , ভাই খুন হওয়ার পর তার মাথার উপর তো কেউ নেই। এসময় ভাসুররা কোথাই তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সাহস যোগাবেন , ভাইয়ের খুনীদের সাজার ব্যবস্থা করবেন , তা নয় উল্টে টাকাপয়সা নিয়ে খুনিদের হয়েই দালালি করতে এসেছেন। ওদের তো অনেক আছে , তবু এত লোভ কেন ভেবে পায় না সে। ভাসুরদের কথা শুনে আরও জেদ চেপে যায়। শেষ না দেখে সেও ছাড়বে না। তাতে বাড়ি বিক্রি করে গাছতলাতে গিয়ে থাকতে হয় তাও সে পিছু হঠবে না। মামলা চালাতে উকিলের খরচ অবশ্য তাকে লাগে না। সরকারি উকিল তো আছেই , সবকিছু তদারকি করছে সন্দীপনও। উকিল বাদ দিয়েও টুকটাক খরচ তো আছে। ভিক্ষার টাকা বাঁচিয়ে সে সন্দীপনের অগোচরে ওইসব খরচ কিছুটা নিজে মেটানোর চেষ্টা করে। সব খরচ সন্দীপনের কাছে থেকে নিতে তার কেমন যেন লাগে। পরে তার টাকা মেটানোর কথা  শুনে সন্দীপন রাগারাগি করে। অন্নপূর্ণা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। সন্দীপন বলে , মাসীমা আসলে আপনি আমাকে আপন ভাবতে পারেন না তাই ---- 
----- কি যে বলো বাবা , তুমি না থাকলে এই মামলা তো তিনআনিরা তাদের দোকানতলাতেই চুকিয়ে দিয়েছিল। আমি কি এতদুরে আসতে পারতাম ?
 কিন্তু যত দিন যায় মামলা নিয়ে সন্দীপনকে ততই যেন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ দেখায়। আদালত চত্বরেই অন্নপূর্ণা কানাঘুষোয় শুনতে পায় , তাদের পক্ষে এ মামলা জেতা খুউব কঠিন। তিনআনিরা নাকি পয়সা দিয়ে তদন্তকারী পুলিশ অফিসারকে কিনে নিয়েছে। তাই বিস্তর ফাঁক -ফোকর রেখে মামলা সাজিয়েছেন ওই অফিসার। যাতে ফাঁক -ফোকর দিয়ে তিনআনিরা বেরিয়ে যেতে পারে। সরকারি আইনজীবিকেও নাকি ওরা ঘুষ দিয়ে হাত করেছে। তাই তিনি তিনআনিদের উকিলকে চেপে ধরেন না। শুধু একাই লড়ে যায় সন্দীপন। সন্দীপনই তাকে বলেছে , এখন মামলা জেতা পুরোপুরি স্বাক্ষীর উপর নির্ভর করছে। 


                                 কিন্তু তিনআনিরা নাকি সাক্ষীতেও তাক লাগিয়ে দেবে। অন্নপূর্ণা তাই আর ভাবতে পারে না। মাথাটা সবসময় কেমন যেন ঝিমঝিম করে। মনে মনে ভগবানকে বলে, ঠাকুর তোমার আদালতে তো তুমিই উকিল , তুমিই স্বাক্ষী, তুমিই বিচারক। তোমার তো কিছুই অজানা নয়। তুমিই এর বিহিত কোর।অন্নপূর্ণার প্রার্থনা বোধ হয় পৌঁছোয় না ঠাকুরের কানে।তাই ফের বিপর্যয় নেমে আসে তার সংসারে। এই বিপর্যয়ের দায় তার উপরে কিছুটা হলেও বর্তায়। কিন্তু অভীকের জন্য যে তাকে এতবড়ো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে তা কোনদিন ভাবেনি অন্নপূর্ণা। পাড়ারই ছেলে অভীক।  শিক্ষিত, দেখতে শুনতেও দিব্যি    ভালো। গ্রামে ভদ্রছেলে বলে পরিচিতিও রয়েছে। খুব গুছিয়ে কথা বলে। সৌরভকে টিউশানি পড়াত। ছ'মাস- ন'মাসে বেতনের টাকা পেত , তবু পড়াত আসত নিয়মিত। এমনকি সৌরভ মারা যাওয়ার পরও তার আসা যাওয়া বন্ধ হয়নি। প্রথমদিকে অন্নপূর্ণা ভেবেছিল , কয়েক বছরই তো সৌরভকে পড়িয়েছে, সেইজন্যই হয়তো সৌজন্যের খাতিরে দেখা করতে আসে। কিন্তু আস্তে আস্তে তার ভুলটা ভাঙে। কনার সঙ্গে  তার অন্য রকম সম্পর্কের আভাস পায়। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে কনাকেই চেপে ধরেছিল একদিন।
--- হ্যা রে, যা আন্দাজ করছি তা কি সত্যি ?
--- যা, কি যে বলো না মা তুমি।
বলে লজ্জায় মুখ লাল করে পালিয়ে যায় কনা। আর অন্নপূর্ণা ভেবে পায় না সে কি করবে! তবে তার মনে একটা গোপন আশার সঞ্চারও হয়। পয়সা খরচ করে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তো তার নেই। অভীকের সঙ্গে  বিয়ে হলে কণা সুখীই হবে। অর্থ কিম্বা গুণ না থাক,  কিন্তু  কণা  ঘর আলো করা মেয়ে। তাই সে অভীকের সঙ্গে  মেলামেশাতে কিছুটা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ই যোগায়। আর মায়ের এই মনোভাব জানার পরই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে ওরা দু'জনে। অন্নপূর্ণা ভাবে এ বয়েসে তো এটাই স্বাভাবিক। এরপরে তো বিয়ে হয়ে গেলে আর এইসব দিন পাবে না।


                                       আজ বড়ো আফশোস হয় , সেদিন যদি সে মনে মনে ওই কল্পনা না করত তাহলে হয়তো এই মর্মান্তিক দৃশ্য তাকে দেখতে হত না। একদিন কনাকে ডেকে সে বলে , হ্যা'রে তা এবার অভীককে বিয়ের জন্য বল। ও মত দিলেই ওর বাবা-- মায়ের সঙ্গে  কথা বলতে ওদের বাড়িতে যাব। কণা বলে ,  মা ও বলছে একটা চাকরি না পেলে ও কিছু করতে পারবে না। ওর বাড়িতে বিয়ে মেনে নেবে না।
---- ও, তাই ?  তাহলে চাকরির চেষ্টাই করুক বরং। তোদের বিয়েটা হয়ে গেলে আমি কিছুটা নিশ্চিন্ত হই। 

    কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে চাকরী পায় অভীক। আশায় বুক বাঁধে অন্নপূর্না। যাক, এবার কণাটার একটা গতি হয়ে যাবে। হাসি ফোটে কনার মুখেও। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেই হাসি ঢেকে দেয় দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। চাকরি পাওয়ার পর থেকে আর এদিক মাড়ায় না অভীক। তাই সব সময় কেমন উতলা দেখায় কণাকে। নাওয়া খাওয়া পর্যন্ত করে না। রাতেও ভালো ঘুমোয় না। একদিন রাতে ঘুম ভেঙে অন্নপূর্ণা দেখে বাইরে বসে কাঁদছে কণা। সে গিয়ে মেয়ের মাথায় হাত রাখে। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতেই সান্ত্বনা দেয় মেয়েকে -- আরে কাঁদছিস কেন? অভীক খুব ভালো ছেলে। হয়তো কাজের চাপে আসতে পারছে না। কয়েকদিন অপেক্ষা কর, দেখবি  ঠিক আসবে।ওই কথা শোনার পরই মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে কণা। কাঁদতে কাঁদতে সে বলে ,  কিন্তু আমার যে আর অপেক্ষা করার সময় নেই। আমি সর্বনাশ বাঁধিয়ে বসে আছি গো মা।কথা শেষ হয় না ,  কণা উঠে গিয়ে বমি করে। অন্নপূর্ণার বুঝতে বাকি থাকে না সর্বনাশটা আসলে কি? তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। এখন কি করবে সে ভেবে পায় না। সর্বনাশের জন্য নিজেকেও ক্ষমা করতে পারে না। মেয়ের একটা গতি লাগবে , সেটা  না ভেবে সে যদি রাশ আলগা না করত তাহলে হয়তো এমনটা হতো না। কিন্তু সেও তো একটা ডুবন্ত মানুষ। খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচতে চেয়েছিল। নাহলে মা হয়ে মেয়ের বিয়ে হওয়াটাকে গতি হওয়া ভাবে কেউ ? চিন্তায় চিন্তায় নিঘুমে কেটে যায় মা-- মেয়ের। আর বসে থাকা চলে না। মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে। তাছাড়া আর যে কোথাও মুখ দেখাতেও পারবে না সে। সবাই তো বলবে , মায়ের আশকারা  পেয়েই মেয়েরা এমন হয়েছে। মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে মা। সেই কথা শোনার আগে যেন তার মৃত্যু হয়। 


                                                সেদিন আর ভিক্ষা করতে বেরোয় না অন্নপূর্ণা। সকাল সকাল স্নান করে সে পৌঁছোয় অভীকদের বাড়ি। ঢোকার মুখেই অভীকের সঙ্গে  দেখা। তাকে দেখে অভীক কেমন যেন চোরের মতো পালিয়ে যায়। ভ্রু কুঁচকে যায় অন্নপূর্ণার। তাহলে কি ইচ্ছাকৃতভাবেই কণাকে এড়িয়ে যাচ্ছে সে ? কু 'গায় অন্নপূর্ণার মন। তারই মধ্যে সে গিয়ে দাঁড়ায় অভীকের বাবা সুনির্মলের সামনে। সেখানে তখন হাজির ছিলেন অভীকের মা আরতিদেবী ও। অন্নপূর্ণাকে দেখে দুজনেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। কিছুটা সংকোচের সঙ্গে  সে বলে , আমি জরুরী কথা বলতে এসেছিলাম।
----- জরুরী কথা ? অভীকের বাবা জিজ্ঞাসা করেন।
----- হ্যা , অভীক আর আমার মেয়ে কণা দুজন দুজনকে ভালোবাসে। বিয়েও করতে চায়। এবারে তো ওদের বিয়েটা না দিলেই নয়।
--- বিয়ে ? বাবা চোর আর মা ভিক্ষারী। তাদেরই মেয়ের সঙ্গে  আমার ছেলের বিয়ে ? তুমি দিনে স্বপ্ন দেখছো না তো ?
 ---  দেখুন আপনারা যা বলছেন সব ঠিক। কিন্তু আপনার ছেলে আমার মেয়েকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
---- প্রতিশ্রুতি ! খোঁজখবর  নিয়ে দেখ গে ওই রকম প্রতিশ্রুতি তোমার মেয়েকে আরও অনেকে দিয়েছে।
--- কি বলছেন আপনারা ?  আপনার ছেলে বিয়ে না করলে যে আমার মেয়েকে আত্মহত্যা করতে হবে। ওর গর্ভে যে আপনার ছেলের সন্তান রয়েছে।
--- কি যা তা বলতে এসেছো এখানে ? আগেই তো বললাম তোমার মেয়ের অনেক নাগর আছে। তাদের দায় কেন আমার ভালো ছেলেটার উপর চাপাতে এসেছো বলো তো? বদনাম দিয়ে মেয়েটাকে আমাদের ঘাড়ে গছাতে চাইছো ? ওই তো ছেলে দাঁড়িয়ে আছে , সে একবার সামনে এসে বলুক দেখি তুমি যা বলছো তা সত্যি , তাহলে দেখব। সে রকম ছেলের জন্ম আমরা দিই নি।



                           অন্নপূর্ণা দেখে উল্টো দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে অভীক। তার দিকে অনেকক্ষণ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। কিন্তু অভীক একটি বারের জন্যও  মুখ ঘোরায় না। অন্নপূর্ণা বোঝে তাদের মুখ পুড়তে চলেছে। কপাল পুড়তে চলেছে দুঃখী মেয়েটার।তাই শেষবারের মতো সে মরীয়া হয়ে অভীকের মায়ের পা দুটি জড়িয়ে ধরে বলে, দিদি আপনিও তো মেয়ে , আপনি তো বুঝুন  কোন মেয়েই এমন মিথ্যা অপবাদ দিতে পারে না। দ্রুত পা ছাড়িয়ে নিয়ে সরে যান তিনি। কিছুটা দূরে সরে গিয়ে বলেন, সামনের মাসেই ছেলের বিয়ে। ওদের একটাই মেয়ে।দেবে থোবে ভালো। তুমি এসময় ছেলেটার নামে মিথ্যা অপবাদ না দিয়ে বিদায় হও দেখি। চলো তুমি, আমি দরজা বন্ধ করব।কার্যত গলা ধাক্কা খেয়ে বাড়ি  ফিরে আসে অন্নপূর্ণা। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে কনার উপর। তাই তাকে সামনে পেয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না সে। চুলের মুঠি ধরে এলোপাথাড়ি চড় থাপ্পড় মারতে মারতে বলে -- হারামজাদী , নষ্টামি করার সময় মনে ছিল না।গলায় দড়ি দিয়ে মরতে পারলি না। তাহলে আমার হার জুড়োত। এভাবে জ্বলে, পুড়ে মরতে হত না। অত চড় থাপড় খেয়ে একটুও শব্দ করে না কণা। শুধু তার চোখের কোন দুটো চিক চিক করে। মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় অন্নপূর্ণার। রাগের মাথায় অত বড়ো মেয়ের গায়ে হাত তোলাটা ঠিক হয়নি। ওই বা কি করে জানবে ছেলেটা এমনি করে পালটি খেয়ে যাবে। ওইসব কথা ভাবতে ভাবতেই অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম আসে না অন্নপূর্ণার। শেষ রাতে কখন ঘুমিয়েছে টের পাই না সে। অন্যান্য দিন অন্ধকার থাকতেই ওঠে। প্রাত্যহিক কাজ সেরে ভিক্ষা করতে বেরিয়ে যায়। দেরি হয়ে গিয়েছে ভেবে সেদিন ধড়মড় করে উঠেই স্নান -প্রাতঃকৃত্যের জন্য মাঠের দিকে ছোটে। কিন্তু যোগলকুণ্ডুর বাগান পর্যন্ত গিয়েই মাথা ঘুরে যায় তার।  

           (  ক্রমশ  )


No comments:

Post a Comment