ঠাকরুনমা
অর্ঘ্য ঘোষ
( দশম কিস্তি )
দেরি হয়ে গিয়েছে ভেবে সেদিন ধড়মড় করে উঠেই স্নান -- প্রাতঃকৃত্যের জন্য মাঠের দিকে ছোটে সে। কিন্তু যোগলকুন্ডুর বাগান পর্যন্ত গিয়েই মাথা ঘুরে যায় তার। মাটিতেই ধপ করে বসে পড়ে। সামনেই আম গাছের ডাল থেকে ঝুলছে আলতা রাঙা ফরসা দুটি পা। উপরের চাইতেই দেখে পরিপাটি করে বাঁধা চুল , পরণে আকাশ নীল শাড়ি, কেমন লক্ষ্মী প্রতিমার মতো ঝুলছে কণা।ঠোঁটের কোনে হাসির আড়ালে যেন লেগে রয়েছে এক রাশ অভিমান। ভোরের দিকে কাল ঘুমে পেয়েছিল তাকে।কখন কণা বেরিয়ে আসে একটুও টের পায়নি। কাল তো কণাকে সেই মরার কথা বলেছিল। সেইজন্যই কি কণা তাকে লোকলজ্জার হাত থেকে মুক্তি দিয়ে গেল। মনে মনে কণাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার জন্য নিজেকেই দায়ি করে অন্নপূর্ণা। সে ওইভাবে গায়ে হাত তুলে মরার কথা না বলে যদি বাঁচার পথ খোঁজার চেষ্টা করত, তাহলে হয়তো কণাকে চলে যেতে হত না। কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার জন্য পথও যে বন্ধ। ততক্ষণে তার কান্নায় একে একে যোগলকুন্ডুর বাগানে এসে হাজির হয় গ্রামের মানুষ। শুরু হয় গুজগুজ। নানা কথা কানে আসে তার। যেন তাকে শোনানোর জন্য বলা হয় কথাগুলো। কেউ বলে, হবে না রূপের বড্ড গুমোর হয়েছিল। গুমোর যে ভগবানই সইতে পারে না গো। দেখছোই তো তার ফল। কেউ আবার বলে, এখন কাঁদলে হবে কি। মেয়েকে তো মা'ই লেলিয়ে দিয়েছিল। ভেবেছিলে বিনি পয়সায় ছেলেটাকে জামাই করে ঘরে তুলবে। আর সইতে পারছিল না অন্নপূর্ণা।
সেইসময় এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা। গ্রামবাসীদের গুঞ্জন কিছুটা থমকে যায়। গোমস্তাকাকা এসেই গাছ থেকে কণাকে নামানোর ব্যবস্থা করেন। তারপর অন্নপূর্ণাকে বলেন , মা তোমার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আর সময় নষ্ট করাটাও ঠিক হবে না।আমার মনে হয় থানা পুলিশের ঝামেলায় না গিয়ে গ্রামের শ্মশানেই তাড়াতাড়ি দাহ করে দেওয়া ভালো হবে।এখন তুমি অনুমতি দিলেই কণা দিদিভাই কে নিয়ে আমরা রওনা দিতে পারি।
-- কাকা , আপনি যেটা ভালো মনে করবেন সেটাই করুন। আমি আর কি বলব ? তারপরই যোগলকুন্ডুর বাগান থেকেই কণাকে শ্মশানে নিয়ে চলে যায় ওরা। আর কান্নায় ভেঙে পড়ে অন্নপূর্ণা। ছেলেমেয়েরা তাকে ধরে ঘরে নিয়ে যায়। কেউ কেউ অভীকদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু অন্নপূর্ণার মন সায় দেয়নি। কণা তো চলেই গিয়েছে , থানা পুলিশ করে তাকে তো ফেরত পাবে না।কিন্তু আরও একটি মেয়ের সর্বনাশের আশংকায় সে ওই পথে যায় নি। কালই শুনে এসেছে সামনের মাসেই নাকি অভীকের বিয়ে। হবু বরের কীর্তির কথা শুনে সেই মেয়েটিও যদি কণার মতোই একই পথ বেছে নেয় ? সে তো মা , মা হয়ে একটি মেয়ের ক্ষতি হয় এমন কাজ সে করবে কি করে ? আস্তে আস্তে শোকের আবহ কমে আসে। কিন্তু কণার মৃত্যু ঘিরে বিড়ম্বনার অন্ত থাকে না অন্নপূর্ণার। ভিক্ষা করতে যাদের বাড়িতেই যায় তারই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কণার কথা জিজ্ঞেস করে। আর একই কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। এই এক সমস্যা চাইলেও কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না। বিপদ আপদ কিছু হলেই অন্যের জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়। যারা জানতে চান না তারাও একই সমস্যার মুখে পড়েন। কিন্তু লৌকিকতার কিম্বা সামাজিকতার জন্য তাদেরও অন্যকে জিজ্ঞেস করতে হয়। অন্নপূর্ণাও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু আজ সে অনুভব করে বিষয়টা কতটা বিড়ম্বনার।
কণার কথা মনে পড়তেই বুকের ভিতরটা মোচর দিয়ে ওঠে অন্নপূর্ণার। পান্তা ভাত খেতে খুব ভালোবাসত কণা। ছেলেমেয়েদের মুখে তো কোনদিনই ভালো কিছু তুলে দিতে পারে নি। পান্তাভাতকেই ওরা অমৃত মনে করে খেত।মনে পড়ে মাটির হাঁড়িতে জল দিয়ে দিয়ে তিনদিনের এলিয়ে পড়া ভাত , আমানি কি প্রিয়ই ছিল ওদের। পোস্ত কেনার সামর্থ্য তো ছিল না তাই কুড়তি কলাইবাঁটা, রসুনের কোয়ার মতো গোটা গোটা ছাঁচি পেয়াজ আর কালো তেঁতুলের টক। গ্রীস্মকালে তো কাদর -- নদী সব শুকিয়ে যেত , তাই সে সময় সায়ন্তনের মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যেত। তিনআনির বাবুরা তখন তাদেরই কাছে থেকে নামে মাত্র দামে কেনা বাড়ির পিছনের পুকুরে জাল ফেলত। সৌরভটা একটা মাছের জন্য পুকুর পাড়ে ঘুরঘুর করত। বাবুরা ঝুড়ি ভর্তি করে মাছ নিয়ে চলে যেত। কেউ ফিরেও দেখত না। সৌরভ তখন জেলেদের রোদে মেলে দেওয়া জালে আটকে থাকা চুনোমাছ একটা একটা করে কুড়িয়ে আনত। সে বলত , ছিঃ বাবা ওইভাবে কেউ মাছ কুড়িয়ে আনে ? লোকে দেখলে কি বলবে ? কণা -- রঞ্জুকেও একই কথা কতবার বলেছে তার ঠিক নেই। ওরা দু'বোন সন্ধ্যে বেলায় বাড়ির সামনের ডোবা থেকে কুড়োজালি কিম্বা গামছা ছেঁকে চুনোমাছ ধরে আনত। সে চোখ পাকিয়ে কপট রাগ দেখিয়ে বলত , সোমত্ত মেয়ে লোকে দেখলে কি বলবে ? কিন্তু ছেলেমেয়েদের আনা সেই মাছই তেঁতুল দিয়ে টক করে দিত। আজ সব মনে পড়ে যাচ্ছে। গ্রীষ্মের রাতে বাড়ির দাওয়ায় চ্যাটাই বিছিয়ে মাঝখানে পান্তার হাড়ি রেখে গোল হয়ে বসত সব। সে কোনদিন পান্তা ভাতের জলটুকু ফেলত না। সবদিন তো পেট ভরে ভাত জুটত না। ছেঁকে নেওয়া ভাতের ওই আমানি দিয়েই সেই ঘাটতি পূরণ হতো। হাড়ির আমানির উপর প্রথমে একটু সরষের তেল আর একটু নুন দিয়ে গ্লাস - বাটিতে পরিবেশন করত। বাড়িতে একটাই কাঁসার গ্লাস ছিল। সেইটা নিয়েই ছেলেমেয়েদের ঝগড়া বেঁধে যেত। তখন আসরে নামতে হতো সায়ন্তনকে।
সব কেমন স্পষ্ট মনে পড়ে যাচ্ছে আজ। ছেলেমেয়েরা হাত চেটে চেটে খেত আর বলত এমন স্বাদ নাকি আর হয় না। আসলে ভালো খাবারের স্বাদ তো তেমন পায় নি ওরা। কেবল গৌরবটা এখানে ওখানে বিনা নিমন্ত্রণে লুকিয়ে খেয়ে এসে সাতকাহন করে গল্প করত। ওইভাবে খেয়ে আসার কৃতিত্ব জাহির করতে ছাড়ত না সে। বড়ো মুখ করে বলত , তিনবার ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার পর কি কৌশলে সে খেয়ে এসেছে। শুনতে শুনতে চোখে জল চলে আসত অন্নপূর্ণার। নিজেকে সামলে নিয়ে বলত, ছিঃ বাবা , লোকে দেখলে কি বলবে ? নিমন্ত্রণ না করলে কেউ পরের বাড়িতে ওইভাবে খেতে যায় ? কণা বলত , যেদিন মার খাবে সেদিন টের পাবে চুরি করে খাওয়ার মজা।সে ঘটনা তো তিনআনিদের বাড়িতেই হয়েছিল। সেদিনের কথাও ভুলতে পারে নি অন্নপূর্ণা। গ্রামে ভোজ কাজ হলে তাদের কেউ নিমন্ত্রণ করত না। তাদেরই বাড়ির সামনে দিয়ে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বাবা মায়ের হাত ধরে ভোজ খেতে যেত। আর তা দেখে গৌরব বলত , মা আমাদের কেউ নিমন্ত্রণ করে না কেন ? আমরাও কিন্তু ওদের নিমন্ত্রণ করব না। তখন বুঝবে কেমন মজা। অন্নপূর্ণা ছেলেমেয়েকে সান্তনা দিয়ে বলত , একদিন আমরাও ওই রকম খাওয়া দাওয়া করব দেখিস। খাওয়া শেষে হাত চাটতে চাটতে কণা কতদিন বলেছে , পান্তা ভাতে একটু পোস্ত বাঁটা না হলে ঠিক জমে না যেন ,মা। তখনও একইভাবে সান্তনা দিয়ে অন্নপূর্ণা বলেছিল , সুদিন এলে পোস্ত বাঁটাও খাওয়াবো তোদের। সেই সুদিন আর আসে নি। একে একে চলে গিয়েছে , সৌরভ - সায়নন্ত আর কণা। ওইসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন তার দু'চোখ জলে ভরে যায় তা টের পায় না অন্নপূর্ণা।
যতদিন যায় অন্নপূর্ণার লড়াই তত তীব্র হয়। একদিকে তীব্র অভাব অন্য দিকে মামলা নিয়ে দুশ্চিন্তা। তারই মাঝে রঞ্জুকে নিয়ে দোটানায় পড়ে সে। সেদিন ভিক্ষা করতে গিয়েছিল রাজহাটের বাবুদের বাড়িতে। বাবুদের বড়ছেলে বিপুল কলকাতায় চাকরি করে। সে স্ত্রী - ছেলেমেয়ে নিয়ে সেখানেই থাকে।বিপুলের মা সুপ্রিয়া বলে , ঠাকরুনমা তোমার তো শুনেছি ৪/৫ টা মেয়ে। আমার বড়ছেলের কলকাতার বাড়িতে একটা রান্নার লোক চাই। তা দেবে তোমার একটা মেয়েকে পাঠিয়ে ? খাওয়া পড়া বাদ দিয়ে মাসে ১০ টা করে টাকা দেবে। পুজোতে ৭ দিনের ছুটি পাবে। অন্নপূর্ণা পড়ে যায় দোটানায়। অত দুরে মেয়েকে পাঠাতে মন চায় না। হাজার অভাবেও তো এতদিন ছেলেমেয়েদের কাছ ছাড়া করে নি। আবার সংসারের যা হাল তাতে মাসে মাসে ১০ টাকা কম কথা নয়। তার উপরে একটা পেট কমবে। হায় রে ভাগ্য , পরিস্থিতির চাপে নিজের মেয়েকেও পেট ভাবতে হচ্ছে।তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সুপ্রিয়া বলে, আজই তোমাকে কিছু বলতে হবে না। তুমি বরং বাড়িতে আলোচনা করে এসে সামনের দিন বলো। অন্নপূর্ণা মনে মনে ভাবে বাড়িতে তার আলোচনা করার আছেই বা কে ? তবে হ্যা , গোমস্তাকাকার সঙ্গে আলোচনা তাকে করতে হবে , আর রঞ্জুরও মত নিতে হবে । সে যেতে না চাইলে অন্নপূর্ণা তাকে কিছুতেই জোর করবে না। তাই সুপ্রিয়াকে সে বলে , বেশ মা তাই হবে। বাড়িতে আলোচনা করে সামনের দিনে এসেই তোমাকে জানিয়ে যাব। দ্বিমুখী মন নিয়েই বাড়ি ফেরে অন্নপূর্ণা। রঞ্জুকে বলতে সে তো একপায়ে খাড়া। কলকাতার কত গল্প শুনেছে সে। সেখানে যাওয়ার আনন্দে আর খুশীতে ধরে না তার। বার বার জিজ্ঞাসা করে, কবে যেতে হবে মা ?
--- হ্যা রে , আমাদের ছেড়ে থাকতে তোর কষ্ট হবে না ? কিছুটা থমকায় রঞ্জু। একটু ভেবে বলে, তা তো হবেই। কিন্তু তাতে যে তোমার চাপ কিছুটা কমবে মা। এখানে তো লোকে কি বলবে ভেবে কিছু করতে দেবে না।
---- মায়ের কথা তোরা খুউব ভাবিস না রে ?
---- বা, রে আমরা বুঝি একাই ভাবি ? তুমি যে আমাদের কথা ভেবে এতকিছু করো।
---- আমি যে মা, আমাকে তো ভাবতেই হবে।
কথা বলতে বলতেই এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা। সব শুনে তিনি বলেন, মা এ এক হিসাবে ভালোই হবে। রাজহাটের বাবুরা ভালো লোক ওদের কাছে ভালোই থাকবে রঞ্জুমা। তুমি আর অমত কোর না। সেই মতো কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ায়, একদিন রঞ্জু বাবুদের বাড়িতে পৌঁচ্ছে দিতে যায় অন্নপূর্ণা। ফেরার সময় কেঁদে ফেলে সে। নিজেকে ধরে রাখতে পারে না রঞ্জুও। মাকে জড়িয়ে কান্নাভেজা গলায় সে বলে, তুমি কিন্তু এবার একটু কম গাঁ ঘুরবে। আমার চাপটা তো কমে যাচ্ছে। মাসে মাসে বেতনের টাকাটাও কাজে লাগবে।
--- তোকে বুঝি এতদিন আমি চাপ মনে করতাম ? আজ ১৬ টা বছর যখন চাপ মনে হয়নি, আজও মনে হয় না। আস্তে আস্তে পুটুলিতে বাঁধা জিনিসপত্র নিয়ে গাড়িতে ওঠে রঞ্জু।
জিনিসপত্র আর কি? একটা বাড়িতে পরা ফ্রক। সায়ন্তনের সঙ্গে গিয়ে ব্রহ্মদৈত্য মেলায় কেনা সস্তার ভেজলিন আর পাউডারটা ছোট বোনকে দিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন আগে কেনা ওইসব জিনিসের আর তেমন গুণ - সুগন্ধ কিছুই নেই। তবু বড়ো সযত্নে জমিয়ে রেখেছিল। সাজগোজ করতে একটু ভালোবাসে মেয়েটা। তাই কৃপণের মতো একটু একটু করে খরচ করত, দিদি বোনেরা চাইলে একটুখানি দিত। আসার আগে পুরোটাই তুলে দিয়েছে বোনের হাতে। বোনও নেবে না। সে বলে , তুই শহরে যাবি। কত ভালো লোকেদের মাঝে থাকবি। তোকেই বরং সাজুগুজু করে থাকতে হবে। রঞ্জু বলে , সেখানে বুঝি সাজার জিনিস নেই ? বিদায় নেওয়ার সময় দুই বোনের চোখে গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা। আর অবাক চোখেব চেয়ে থাকে হৈমন্তী। সে তো আসলে কিছু বুঝতে পারে না।গাড়ির জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় অন্নপূর্ণা। মেয়ের মাথায় , চিবুকে হাত বুলিয়ে দেয়। বলে, সাবধানে থাকিস মা। রঞ্জু বলে , তোমরাও সাবধানে থেকো । আমার জন্য চিন্তা কোর না।
রঞ্জুকে নিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় বাবুদের গাড়ি। এক সময় মেয়ের হাতে রাখা হাতটাও নাগাল ছাড়া হয়ে যায় অন্নপূর্ণার। আর একরাশ শুন্যতা গ্রাস করে নেয় তাকে। বাড়ি ফিরেও শুধুই রঞ্জুর কথা মনে পড়ে। কয়েকদিন মন খারাপেই কেটে যায়। মেয়েটা কেমন পরিবেশে গিয়ে পড়ল, লোকজন সব কেমন জানতে খুউব ইচ্ছে করে। কিন্তু সে তো পুজো ছাড়া জানার কোন উপায় নেই। পুজো এখনও ঢের দেরি। সে সময় যদি শোনে ওরা লোক সুবিধার নয় তাহলে আর রঞ্জুকে ওদের কাছে পাঠাবে না। রঞ্জুর ভাবনার মাঝে তাকে আরও উতলা করে তোলে মামলার দুশ্চিন্তা। আজই স্বাক্ষ্যদান পর্ব শেষ হবে।আজ তিনআনিদের পক্ষে স্বাক্ষী দেবে দু' জন। তাদের স্বাক্ষ্যতেই নাকি ঘুরে যেতে পারে মামলার গতিপ্রকৃতি। গতদিন আদালতে তেমন কথাই শুনে এসেছে অন্নপূর্ণা। কিন্তু কারা সেই স্বাক্ষী হতে পারে ভেবে পায় না সে। তবে কি ? একটা সম্ভাবনার কথা উঁকি দেয় তার মনে। সেটা হলে সত্যিই খুউব বেকায়দায় পড়তে হবে তাকে। কিন্তু এখন থেকেই তা ভেবে মন দুর্বল করতে চায় না সে। সেদিন গোমস্তাকাকার সঙ্গে একটু সকাল সকালই আদালতে পৌঁছোয়। আর সেখানে পৌঁছোতেই মুষড়ে পড়ে সে। তার আশংকাই সত্যি হয়। দেখে তিনআনিদের উকিলের কাছে বসে চা খাচ্ছেন তার দুই ভাসুর। তাদের দেখে মাথার ভিতরটা কেমন এলোমেলো হয়ে যায় তার। ভেবে পায় না , ওরা কি স্বাক্ষী দেবে ? সেদিন সায়ন্তনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় সে যখন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল তখন তো একটিবারের জন্যেও বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন নি। সারাদিন মার খেয়ে ভাই যখন একটু জল ,একটু জল করে মারা যায় তখনও তো একটি বারের জন্য ও সেখানে যান নি। তাহলে ওরা কি দেখেছেন যে স্বাক্ষী দেবেন ?
অন্নপূর্ণা আন্দাজ করে ওদের উকিলের শিখিয়ে দেওয়া কথাই আদালতে বলবেন ওরা। ঘটেও ঠিক তাই। দুই ভাই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলে , ঘটনার দিন সায়তনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় নি। সেদিন রাতে চিৎকার- চেঁচামেচি শুনে তারা তিন আনিদের দোকানের কাছে গিয়ে দেখে বমাল সহ ধরা পড়েছে তাদের ভাই সায়ন্তন। গোলমাল শুনে তখন বহু লোকই ছুটে আসে। তিনআনিরা নয়, জনতার গণ প্রহারেই মৃত্যু হয় সায়ন্তনের। আসলে সায়ন্তন এলাকার প্রায় সবার বাড়িতেই দীর্ঘদিন ধরেই কিছু না কিছু চুরি করছে। কিন্তু কেউ কখনও ধরতে পারে নি। তাই সবার একটা আক্রোশ ছিল। সেদিন হাতেনাতে ধরা পড়তেই সবাই সেই আক্রোশ মিটিয়ে নেয়। সরকারি উকিল স্বাক্ষ্যদান চলাকালীন চুপচাপ বসে থাকলেও সমানে লড়ে যায় সন্দীপন। সে জেরা করে প্রমাণ করার চেষ্টা করে ওরা আসলে মিথ্যা কথা বলছেন। কিন্তু ভাসুররা শেষ পর্যন্ত শেখানো বক্তব্যে অনড় থাকেন। তাই স্বাক্ষ্যদান শেষ হতেই সন্দীপনকে কেমন যেন হতাশ দেখায়। গোমস্তাকাকার চোখেমুখেও একই অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। সবাই বলাবলি করে , আপন লোকের স্বাক্ষী আদালতে সব থেকে বেশি গুরুত্ব পাবে। আর ওই সব কথা শুনতে শুনতে অন্নপূর্ণার মাথা নুইয়ে পড়ে। সে ভাবে ভিক্ষারী হয়ে সে ওদের প্রলোভন জয় করতে পারল , আর সব কিছু থাকা স্বত্ত্বেও ভাসুররা পারল না। টাকাটাই ওদের কাছে বড়ো হলো? আসলে তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটাই ঘটে। এই পরিস্থিতিতেও ছোটবেলায় পড়া কবিতার সেই লাইন দুটো মনে পড়ে যায় -- "এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি"।আজ তার জীবনেই সেটা সত্যি হয়ে গেল।
মনে মনে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়ে সে। এতদিন সায়ন্তনের খুনের মামলাটা নিয়ে একটা লড়াকু ভাব কাজ করত তার মধ্যে। সেই উদ্যোমি মনোভাবে একটা যেন চিড় ধরে যায় ভাসুররা তিনআনিদের হয়ে স্বাক্ষী দেওয়ার পর থেকে। তার লড়াইটা আরও তীব্রতর হয়ে পড়ে। একদিকে মামলা অন্যদিকে ছেলেমেয়ের নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় দিশাহারা হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। দিন দিন গৌরবটাও কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মাথার উপর অভিভাবক না থাকলে যা হয়, গৌরব সেই পথেই এগিয়ে যায়। স্কুল যাওয়া ছেড়ে একদল বন্ধু জুটিয়ে সব সময় আড্ডা দিয়ে বেড়ায়। সে ভিক্ষা করতে বেরিয়ে যায়, তাই টেরও পায় না ছেলেটার গতিবিধি। তবে তার চোখে কেমন যেন প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে দেখে অন্নপূর্ণা। সব জায়গায় বলে বেড়ায় , তিনআনিদের সে ছেড়ে দেবে না। আদালতে সাজা না হলে সে নিজে ওদের সাজা দেবে। মিথ্যা স্বাক্ষী দেওয়ার কথা শোনার পর থেকে জ্যাঠাদেরও ছেড়ে কথা বলে না। অন্নপূর্ণা যত বলে ওরে ওসব কথা বলিস না , ওরা কোনদিন তোকেও খুন করে দেবে। গৌরব কানেই তোলে না সে সব কথা।ছেলেমেয়েদের নিয়ে সবসময় অজানা আশংকায় সিটিয়ে যায় অন্নপূর্না।সব থেকে আশংকা হয় তার হৈমন্তীকে নিয়ে। ভগবানকে তার বড়ো বিবেচনাহীন মনে হয়। হৈমন্তীকে এত রূপ যৌবন দিয়েছেন অথচ চলা ফেরা আর কথা বলার ক্ষমতা দেননি। নিজেকে রক্ষা করতেও তো পারবে না। কেউ সর্বনাশ করে দিয়ে গেলে নিজে নিজে কণার মতো জ্বালা জুড়াতেও তো পারবে না। নিজের ভাবনায় চমকে যায় অন্নপূর্ণা। কি ভাবছে সে নিজের মেয়ের সম্পর্কে ! সে কি পাগল হয়ে গেল ? বড়ো মায়া হয় প্রতিবন্ধী মেয়েটির প্রতি। কাছে ডেকে বসায় তাকে। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। হৈমন্তীও মায়ের গলা জড়িয়ে আও, আও করে উচ্ছাস প্রকাশ করে। অন্নপূর্ণা পরম যত্নে মেয়ের চুল বেঁধে ভালো করে সাজিয়ে দেয়। তারপর মেয়ের চিবুকটি তুলে ধরে চুমু খায়। মেয়েও আও আও করে চুমুয় চুমুয় মায়ের কপাল গাল ভিজিয়ে দেয়। অন্নপূর্ণা বলে , ওরে ছাড় ছাড় দম বন্ধ হয়ে মরে যাব যে। মেয়ে তত মাকে জড়িয়ে ধরে। এই মেয়ের জন্যই সে এতক্ষণ কি ভাবছিল !
পরিস্থিতি তাকে কোন জায়গায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে মা হয়েও মেয়ের আত্মহত্যার কথা ভাবতে হচ্ছে তাকে। অন্নপূর্ণা ভাবে , তার ছেলেমেয়েদের চাহিদা কত কম। একটু স্নেহের স্পর্শ পেলেই কত খুশী হয় তারা।অথচ তার এমনই অবস্থা, সেইটুকুও দিতে পারে না।হৈমন্তীটা কলাইবাঁটা মেখে পান্তাভাত খেতে খুব ভালোবাসে। সেটুকুও মেয়ের মুখে তুলে দিতে পারে না সে। মামলাটা চুকে গেলেই একদিন পেটে পুরে ছেলেমেয়েগুলোকে তাদের পছন্দের খাবার খাওয়াবে।গরীবদের এই ব্যাপার খুব বাঁচিয়ে দেয়। কোন একটা উপলক্ষ্য খাড়া করে দিব্যি পরিস্থিতির সামাল দেওয়ার সূযোগ মেলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটার পর একটা উপলক্ষ্য পেরিয়ে যায়,আশাটা আর পূরণ হয় না। অন্নপূর্ণার জীবনেই এমন কত ঘটনা ঘটেছে। ছেলেমেয়েরাও তা জানে। কিন্তু সেইসব প্রসঙ্গ তুলে মাকে আর অস্বস্তির মুখে ফেলতে চাই না তারা। কারণ মায়ের অবস্থা তারা এখন উপলব্ধি করে।কয়েকদিন ধরেই চরম দোটানায় পড়েছে অন্নপূর্ণা।কি করবে কিছু ভেবে পায় না।সেদিন গোমস্তাকাকা একটা প্রস্তাব নিয়ে আসেন। কিছুটা আমতা আমতা করে বলেন , মা কিছু যদি মনে না করো তাহলে একটা কথা বলি।
--- বলুন , আপনার কথায় কিছু মনে করব কেন ? আপনি ছাড়া আমাদের পাশে এ দুর্দিনে আর কে আছে বলুন কাকা ?
কিছুটা ইতস্তত করে গোমস্তাকাকা বলেন , বালিয়ারার কান্তি চ্যাটার্জীর স্ত্রী মারা গিয়েছে। ফের বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজছে। একেবারে বিনা পণে ঠাকুর থানে বিয়ে করবে। বয়েস যদিও অনেক বেশি কিন্তু বাড়িতে খাওয়া পড়ার অভাব নেই। সাঁইথিয়ায় বাসে কন্ডাক্টারি করে। দুহাতে টাকা কামায়। গুমতা গ্রামে নিজের বাড়িও রয়েছে। যদি বলো মা তাহলে ছবি দিদির জন্য প্রস্তাব দিতাম।
--- কিন্তু কাকা , শুনেছি লোকটা নাকি ছবির বাবার বয়সী। ছবির বয়সী ছেলেমেয়েই নাকি রয়েছে ওর। তাছাড়া যাদের দুহাতে কাঁচা টাকা উপায়ের সুযোগ থাকে তাদের সেই টাকা ওড়ানোর নানা কুঅভ্যাসও থাকে।
----- সেটা অবশ্য তুমি ঠিকই বলেছো মা। তবে কি জানো , বিনা পয়সায় তো বিয়ে হবে না। তোমার তো মা এখন পয়সা--টাকা খরচ করে বিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। মাঝখান থেকে যদি কণা দিদির মতো কিছু একটা ঘটে যায়! তাই বলছিলাম আর কি ?
কণার কথা উঠতেই শিউরে ওঠে অন্নপূর্ণা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই আলতা রাঙা ফরসা দুটি পা। সে তো ওকে মরার কথা বলেছিল।না সে আর মৃত্যু দেখতে পারবে না।যাই হোক, ছেলেমেয়েগুলো যেন বেঁচেবর্তে থাকে। তাই সে বলে -- সেই তো কাকা , আপনি আমাকে বড়ো দোটানায় ফেললেন। কি করি বলুন তো ?
---- ঠিক আছে মা , আজকেই কিছু বলতে হবে না। তুমি বরং একটু ভেবেই বলো। প্রয়োজনে একবার ছবি দিদির সঙ্গে কথা বলে নিও।
খুব দোটানায় পড়ে যায় অন্নপূর্ণা। গোমস্তাকাকা ঠিকই বলেছেন, যতই রূপ থাকুক না কেন , বিনা পণে কে'ই বা তার মেয়েকে বিয়ে করবে ? যে সব ভিক্ষাজীবি বন্ধু তার মেয়েদের দেখেছে তারা সবাই বলেছে, অন্নপূর্ণা তোমার মতোই ভগবতীর রূপ তোমার মেয়েদের। যাদের ঘরে যাবে তাদের ঘর আলো করে রাখবে। কিন্তু কেউ তার মেয়েদের ঘর আলো করার জন্য হাত ধরে নিয়ে যেতে এগিয়ে আসে নি। বরং কু অভিপ্রায়ে উঁকিঝুঁকি মেরেছে রাতবিরাতে।অধিকাংশই পরিস্থিতির সুযোগ খুঁজেছে। সেই সুযোগের ফাঁদে পড়ে নিজেকে বলি দিতে হয়েছে কণাকে। কুদৃষ্টি রেহাই দেয় না তার প্রতিবন্ধী মেয়েটিকেও। তাই বাপের বয়সী লোকটার সঙ্গে ছবির বিয়ের বিষয়টা এককথায় উড়িয়ে দিতে পারে না। আবার মন থেকে মেনেও নিতে পারে না। এই দোটানা থেকে তাকে উদ্ধার করে একটি চিঠি।


No comments:
Post a Comment