Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুনমা - ১১



        ঠাকরুনমা 

                       


            অর্ঘ্য ঘোষ  


        ( একাদশ  কিস্তি )



আবার মন থেকে মেনেও নিতে পারে না। এই দোটানা থেকে তাকে উদ্ধার করে একটি চিঠি। দেখতে দেখতে রঞ্জুর কলকাতা যাওয়া মাস তিনেক হয়ে গেল। কয়েকদিন পরেই পুজো। তার ফেরার অপেক্ষায় দিন গোনে অন্নপূর্ণা। কতদিন দেখে নি মেয়েটাকে। এবার তার বাড়ি আসার কথা। কিন্তু বাড়ি সে আসে না। তার লেখা চিঠি আর কিছু টাকা নিয়ে এসে পৌঁছোয় রাজহাটের বাবুদের বাড়ির লোক। তার মুখ থেকেই অন্নপূর্ণা জানতে পারে মাস খানেক আগেই কাউকে কিছু না বলে পাশের ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকারের সঙ্গে  কোথাই যেন চলে যায় রঞ্জু। বাবুরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার কোন সন্ধান পায়নি। তাই দু'মাসের বেতন আর রঞ্জুর রেখে যাওয়া চিঠিটা পাঠিয়ে দিয়েছেন বাবুরা। টাকাটা নিতে কিছুতেই হাত উঠছিল না। যে মেয়েই তাকে ছেড়ে চলে গেল, তার রোজগারের টাকা নিতে মন চায় না। কিন্তু বাবুদের বাড়ির লোকটি তার হাতে টাকা ক'টা গুঁজে দিয়ে চলে যায়। সে চলে যেতেই চিঠিটা চোখের সামনে মেলে ধরে অন্নপূর্না। চিঠির মধ্যেই যেন ভেসে ওঠে মেয়ের মুখ। চিঠিতেই সে অনুভব করে মেয়ের স্পর্শ। ট্যারা বাঁকা  হরফে রঞ্জু লিখেছে , জানি মা তুমি কষ্ট পাবে। কিন্তু আমাদেরকে নিয়েও তো তোমার কষ্ট কম নয়। সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে দেখছি তোমাকে।  তাই আমি তোমাকে সে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে অজানা পথে পাড়ি দিলাম।জানিনা কপালে কি আছে। পারলে ক্ষমা করো। চিঠিটা পড়তে পড়তেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে অন্নপূর্ণার।  খুব দুশ্চিন্তা হয় রঞ্জুর জন্য। এমন তো কতই শুনেছে বাইরে কাজ করতে গিয়ে কারও সঙ্গে  চলে যাওয়ার পর কত মেয়ের আর খোঁজখবর মেলে নি। এই তো পাশের ফুলিয়া গ্রামেই একটি ছেলে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পরপর তিনটি মেয়েকে নিয়ে কোথাই যেন চলে যায়। কয়েক মাস পর  ছেলেটি ফিরে এলেও মেয়েগুলি আর কোনদিন ফেরেনি। অন্নপূর্ণা শুনেছে মেয়েগুলিকে নাকি মোটা টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়।


                                                ওইসব মেয়ের বাড়ির লোকেরা পুলিশের কাছেও গিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ নাকি মেয়েগুলোকে উদ্ধারের চেষ্টা করার পরিবর্তে বাবা- মাকে মেয়ের চরিত্র নিয়ে নোংরা নোংরা কথা বলে। লোকে বলাবলি করে মেয়ে বিক্রির টাকার একটা ভাগ পুলিশও নাকি পায়। তাই আর মেয়ে পাচার হয়ে গেলে আর কেউ শুধু শুধু পুলিশের নোংরা কথা শুনতে থানায় যায় না। আর সে সুযোগটাই কাজে লাগায় পাচারকারীরা। গরিব ঘরের মেয়েগুলোকে বিয়ে কিম্বা কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ফুসলে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয় পাচারকারীরা। মেয়ে মানে যেন মানুষ নয় , আর পাঁচটা সামগ্রীর মতো একটা ভোগ্য পণ্য। আর তার জন্যই কত না ফাঁদ। রঞ্জু সে রকম কোন ফাঁদে পা দিল না তো ?  মনে মনে খুব দুশ্চিন্তা হয় মেয়েটার জন্য। বুকের ভিতর একটা কষ্ট যেন দলা পাকিয়ে ওঠে। ভগবান তার কথা কানে তোলে না তবু অভ্যাস বসেই তার উদ্দেশ্যে হাত জোড় করে বলে, ঠাকুর মেয়েটাকে তুমি দেখো। ওকে তুমি সুখী কোর।  রঞ্জু ওইভাবে চলে যাওয়ায় মনে মনে খুব ভেঙে পড়ে সে। মেয়েগুলোর এই পরিনিতি তাকে ভাবিয়ে তোলে। তাই সে ঠিক করে ছবিকে ওইভাবে হারিয়ে যেতে দেবে না।  ওই লোকটার সঙ্গেই বিয়ে দেবে তার।  আর যাই হোক না কেন , একটা পরিচিত ঠিকানায় তো থাকবে মেয়েটা। আর কপালে  সুখ না থাকলে তো কিছু হবে না।জমিদার বাড়িতে বিয়ে হয়ে তার কপালে তো ভালোই সুখ জুটেছে। অন্যদিকে বাসন্তীর  জামাইটা একটু ন্যালাক্ষেপা হলেও তাকে নিয়ে তো ছেলেমেয়ের মা হয়ে দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে সে। তাদের কাছে তো বেঁচে থাকাটাই বর্তে যাওয়ার সামিল।কপালে থাকলে এই বিয়েতেও ছবি সুখী হবে। তবু কোথাই যেন একটা খটকা থেকে যায়। কিছুতেই মন মানে না।মায়ের এই দোটানা ভাব চোখ এড়ায় না ছবির। কানাঘুষো বিয়ের ব্যাপারটা সেও শুনেছে। কেমন লোকের সঙ্গে  বিয়ে হচ্ছে তাও আর অজানা নেই তার। ভিতরে ভিতরে সেও পুড়ছে কয়েকদিন ধরে। বিয়ে নিয়ে সব মেয়েরই একটা আবেগ, উচ্ছাস,  রঙিন স্বপ্ন থাকে। কিন্তু কয়েকদিন ধরেই মেয়েটাকে কেমন যেন মনমরা দেখায়। 


                                                  পরিস্থিতিই তাকে বুঝিয়ে দেয় যাদের জীবনের সব রঙ হারিয়ে গিয়েছে তাদের স্বপ্ন দেখা মানে তাদের শুধু শুধু মন খারাপ করা। মেয়ের মনের টানাপোড়েন চোখ এড়ায় না অন্নপূর্ণারও। মেয়েকে কাছে ডেকে পাশে বসায় সে। পরম মমতায় গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে , তোর মনের অবস্থা আমি জানি মা। হাত পা বেঁধে জলে ফেলে দিতে হচ্ছে তোকে।কষ্ট আমার কি কম হচ্ছে ! আমি তোদের অক্ষম মা। আমার যে আর কোন পথ নেই।আমাকে ক্ষমা কর মা, আমাকে ক্ষমা কর।তারপর মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে অন্নপূর্ণা।মেয়েও মায়ের বুকে মুখ রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। দীর্ঘক্ষণ পর ছবি বলে , তুমি অত ভাবছো কেন মা ?  দিদির বিয়েটা যখন মেনে নিতে পেরেছো তখন আমাকে নিয়ে ভাবছো কেন ? আমার কপালে লেখা আছে বলেই না এই বিয়ে হচ্ছে। তারপর কান্না লুকোতে অন্যদিকে চলে যায় ছবি।অন্নপূর্ণার মনে পড়ে বাসন্তীর  বিয়ের সময় বরকে দেখে কত কেঁদেছিল মেয়েগুলো।সেদিন কেউ কপালের লেখার কথা তোলে নি। বার বার বলেছিল, একি করলে তোমরা মা ? 
সে'ই বরং কপালের দোহাই দিয়ে মেয়েদের সান্ত্বনা দিয়েছিল। দুর্বল ,গরীব মানুষদের নিজের মনকে বোঝানোর এই এক হাতিয়ার আছে। কপালের দোহাই দিয়ে  তারা মনের জ্বালা জুড়ায়।  আজ সেই কপালের দোহাই দিয়েই তাকে সান্ত্বনা দিয়ে গেল ছবি।অন্নপূর্ণা তার দুর্দশার কথা ভাবে।ভেবে কোন কুলকিনারা পায় না সে। শেষপর্যন্ত গোমস্তাকাকার সঙ্গে  কথা বলে ছবির বিয়েটা চূড়ান্ত করে ফেলে সে। ঠিক হয় লাভপুরের ফুল্লরা মন্দিরে বিয়েটা হবে। সেই মতো রঞ্জুর বেতনের দরুন পাওয়া টাকা থেকে ছবির জন্য একপ্রস্ত বিয়ের পোশাক কেনা হয়। ঠিক হয় গোমস্তাকাকাই ছবিকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বিয়েটা দেবেন।


                                                   সেইমতো একদিন ভোর ভোর, একটু অন্ধকার থাকতেই চুপি চুপি ফুল্লরা মন্দিরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায় ওরা। লোকের চোখে পড়লে তো হাজারো প্রশ্নের জবাবদিহি করতে হবে। সইতে হবে নানা টিকাটিপ্পনী।তাই খুব সন্তর্পণে ওদের গ্রামের রাস্তা পার করে দিয়ে আসে সে।বিয়ে নয়, যেন পাচার করছে মেয়েকে।সেই হিসাবে দেখতে গেলে এতো একধরনের পাচারই। না হলে সব জেনে শুনে ছোট মেয়েটাকে কেউ ওইরকম একটা বাপের বয়সী লোকের হাতে তুলে দেয় ? বিয়ের আসরে বরকে দেখে ছবির মনের অবস্থাটার কথা ভেবে খুব কষ্ট পায় সে।যখন হঠাৎ বাপের বয়সী লোকটাকে বর বেশে দেখবে তখন ছবির মনের অবস্থা কেমন হবে তা অনুমান করে অন্নপূর্ণা।কিছুতেই মন থেকে বিয়েটাকে মেনে নিতে পারবে না সে। কিন্তু তাদের মতো পবিবারের মেয়েদের ক"টা কাজই বা মনের মতো হয়। মেনে আর মানিয়েই তো নিতে হয় সবকিছু। তার থেকে এই বিষয়টা কে আর ভালো বুঝবে। সেই বিয়ে হয়ে আসার পর থেকেই তো সে পরিস্থিতির সঙ্গে  আপোষ করেই চলেছে। বিয়ে দিয়ে বিকালের দিকে ফেরেন গোমস্তাকাকা। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে চলে যান তিনি। আর খুব মন খারাপ হয়ে যায় অন্নপূর্ণার। একে একে তার সংসার প্রায় শুন্য হয়ে পড়ে। গৌরব এখন বাড়ি থেকে কখন বেরোয় কখন ফেরে তার ঠিক নেই  কোন! হৈমন্তী তো সন্ধ্যা হলেই ঘুমিয়ে পড়ে। গভীর রাত্রি পর্যন্ত কেবল ঘুম আসে না তার।  দুশ্চিন্তায়, নিঘুমে কেটে যায় রাতের পর রাত। সে ভিক্ষায় বেড়িয়ে গেলে হৈমন্তীকে কে দেখবে ?  তাকে ঘিরে একটা আশংকা স্বস্তি দেয় না অন্নপূর্ণাকে। এক দিন সেই আশংকাটাই সত্যি হয়।

         
                                                      ছবি চলে যাওয়ার পর থেকে হৈমন্তীর জন্য আর সবদিন ভিক্ষা করতে যায় না। একদিন এনে তিনদিন খায়। সেদিন সকাল থেকে খুব মেঘ করছে। দু'দিন ধরে গৌরবও বাড়িতে নেই। এই অবস্থায় হৈমন্তীকে বাড়িতে একা রেখে কিছুতেই ভিক্ষা করতে যেতে মন চাইছিল না অন্নপূর্ণার। কিন্তু না গেলেও উপায় নেই। বাড়িতে এক ছটাকও চাল-ডাল নেই। ভিক্ষায় না বেরোলে আর হাঁড়ি চড়বে না। তাই হৈমন্তীর হাতের কাছে পান্তাভাত - জল সব গুছিয়ে রেখে মেঘ মাথায় করেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় সে। কিন্তু একটা গ্রাম ঘুরতেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে। গ্রামের বিল্ববাসিনী তলার নাটমন্দিরে আটকে পড়ে অন্নপূর্ণা। হৈমন্তীকে ঘিরে খুব দুঃচিন্তা হয় তার। এই বৃষ্টি বাদলার দিনে মেয়েটা বাড়িতে একা কি করছে কে জানে ? কোন সমস্যায় পড়ল না তো ? কতদিন তো হৈমন্তীকে একা রেখেই সে ভিক্ষা করতে বেরোয় ,কিন্তু আজ তার মনটা বেশিই অস্থির হচ্ছে হৈমন্তীর জন্যে। কোন প্রয়োজন হলে এই অবস্থায় বাইরেও বেরোতে পারবে না। ঘণ্টা খানেক পরও বৃষ্টি থামে না। নানান দুশ্চিন্তায় নাটমন্দিরে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না অন্নপূর্ণা। বৃষ্টি মাথায় করেই বেড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বাড়ির দোরগোড়ায় পা রাখতেই যেন তার হৃদস্পন্দন থমকে যায়। অন্যদিন এসময় সাধারণত হৈমন্তী ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু তার পায়ের শব্দ পেয়ে আও ,আও করে কেঁদে ওঠে। অব্যক্ত ভাষায় কি যেন বলার জন্য হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসার চেষ্টা করে। মেয়েকে দেখে "থ" হয়ে যায় অন্নপূর্ণা। মেয়েকে দেখেই সে বুঝে যায় এতদিন মনে মনে যা আশঙ্কা  করেছিল তাই ঘটেছে। মেয়ের পোশাক ছেঁড়া , সারা শরীরে আচড়ানো- কামড়ানোর দাগ। কেউ যে খুবলে খেয়েছে সারা শরীর। "নিম্নাঙ্গ"এর পোশাক ভেসে যাচ্ছে  রক্তে। 


                                                 অন্নপূর্ণা বোঝে সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। মেয়েও আকারে ইঙ্গিতে মাকে সেই কথাই বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু সেই সর্বনাশ তার কে করল সেই ইঙ্গিতও  সে কিছুতেই দিতে পারেনা। দেবেই বা কেমন করে ? জন্মের পর থেকে প্রতিবন্ধকতার কারণে বাড়ি থেকে তো বিশেষ একটা বেরোয় নি। গ্রামের ক'টা মানুষকেই বা সে চেনে ? অন্নপূর্ণা ভাবে কে এমন পাষণ্ড , ওই রকম একটা মেয়েকে একা পেয়ে এভাবে সর্বনাশ করে গেল ? 
ছেলেছোকড়া -- থেকে বুড়ো , অনেক মুখই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাদের চোখের ভাষা মনে,মনে পড়ার চেষ্টা করে সে। কিন্তু কাউকে নিশ্চিত ভাবে চিহ্নিত করতে পারে না। আর নিশ্চিত করেই বা কি হবে ? বরং ঘটনা পাঁচকান হলেই বিপত্তি বাড়বে। থানা-পুলিশ করে কোন লাভ তো হবেই না মাঝখান থেকে সবাই একটা আলোচনার খোরাক পেয়ে যাবে। আর জবাব দিহি করতে করতে সে ক্লান্ত হয়ে যাবে। সব কিছু শোনার পর অধিকাংশই তো তাকেই দুষবে। বলবে, প্রতিবন্ধী মেয়েটাকেও ভাড়া খাটাচ্ছে। কম তো চেনা হলো না সমাজকে। কেউ কোন দায়িত্ব নেবে না , কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করতে, সামাজিক অনুশাসনের দোহাই দিয়ে একঘরে করতে, কেউ পিছপা হয় না। বিষয়টি চেপে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত মনে হয় তার। তাই মেয়ের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে সে। কিন্তু হৈমন্তী আও, আও করে আকারে ইংগিতে তার সঙ্গে  যে ভাবে পাশবিক অত্যাচার   করেছে তা বোঝানোর চেষ্টা করে। জ্বালা, যন্ত্রনার ইংগিত দেয়। তীব্র রাগের সঙ্গে  সঙ্গে  চোখে জল চলে আসে অন্নপূর্ণার। তার মনে তখন শুধু  একটাই আশঙ্কা  , কণার মতো যদি এই মেয়েটারও সেই সর্বনাশ হয়ে যায়,  তাহলে কি হবে ? মেয়েকে নিয়ে কোথাই যাবে তখন ? কণার মতো হৈমন্তীর যে ------------------আর ভাবতে পারে না অন্নপূর্ণা। 


                                    দুশ্চিন্তায় ,দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারিয়ে যায় তার। ভালো করে খেতে পারে না। মেয়েকে একা ফেলে ভিক্ষা করতেও যেতে পারে না। কোন রকমে একবেলা আধবেলা খেয়ে কাটিয়ে দেয়  সবাই ।  গৌরবকেও কিছু বলতে পারেনা। যা মাথা গরম হয়েছে আজকাল। কি করতে কি করে বসবে তার ঠিক নেই। তখন বাবার মতো অবস্থা না হয় ! বাবার মতো অবস্থা ? কি ভাবছে সে ?এখন সব কিছুতেই তার মনে আগে খারাপটাই আসে। মনেরই বা দোষ কোথাই ? সব ক্ষেত্রে তো তার খারাপটাই হয়েছে। কাউকে কিছু বলতে না পেরে গুমরে গুমরে মরে। একবার ভাবে গোমস্তাকাকাকে কথা বলবে। পরক্ষণেই মত পাল্টায়। গোমস্তাকাকারও শরীর ভালো যাচ্ছে না। তাকে এই কথা বলে শুধু শুধু দুঃশ্চিন্তায় ফেলা হবে। গোমস্তাকাকার কথা ভাবতে ভাবতে তিন এসে পৌঁচ্ছোন। তাকে দেখে মনে একটু স্বস্তি পায় অন্নপূর্ণা। সংস্কার বশেই সে বলে, আসুন কাকা, আপনি অনেকদিন বাঁচবেন। এখনই আপনার কথা ভাবছিলাম।
----- আর বাঁচতে বলো না। এবার তোমাদের রেখে এবার যেতে পারলে বাঁচি।
----- ও কথা বলবেন না কাকা। আপনি চলে গেলে আমার কি হবে বলুন ?আপনি ছাড়া আমার পাশে কে আছে  ?তাছাড়া আপনি চাইলেই আপনাকে যেতে দিচ্ছে কে ?
------ বেশ মা ঘাট মানছি। এবার একটা কাজের কথা বলি শোন।
----- কি কথা ?
----- বিয়ে যেমন হোক , নিয়ম মতো দ্বিরাগমনে আসার জন্য ছবি দিদিদের তো বলতে যেতে হয়।
------ তা তো হয়ই। যাবার তো আর কেউ নেই। আপনিই বরং যান কাকা।
----- বেশ মা , আমি কালই গিয়ে ওদের একবারে সঙ্গে  করে নিয়ে আসব। 
কিন্তু পরদিন গোমস্তাকাকার সঙ্গে  একা আসে ছবি। মেয়েকে দেখে চমকে যায় অন্নপূর্ণা। এই কয়েকদিনেই একি হাল হয়েছে চেহারার। উদ্বিগ্ন হয়ে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে , হ্যারে জামাই এলো না কেন? তোর অসুখ বিসুখ কিছু হয়েছে নাকি ?


                      ম্লান হাসি ফুটে ওঠে মেয়ের মুখে। বলে , বারে অসুখ হতে যাবে কেন ? আর ও আসবে কি করে , ও না থাকলে যে বাস বন্ধ হয়ে যাবে। তখন মালিক ছেড়ে দেবে?মেয়ের কথায় ফিরে আসে অতীত। অন্নপূর্ণার মনে পড়ে যায় সেও সায়ন্তনকে ছাড়াই দ্বিরাগমনে গিয়েছিল। তাকেও মা একই কথা জিজ্ঞেস করেছিল। সে'ও মাকে খুশী করতে ছবির মতোই মনগড়া উত্তর দিয়েছিল। আসলে শুধু  তারা, মা--মেয়েই নয় , ধারাবাহিকভাবেই আবর্তিত হচ্ছে একই ঘটনা। তাই সে ছবিকে চেপে ধরে -- হ্যারে কান্তির সঙ্গে  তোর ভাবসাব হয়েছে তো? তোকে তার মনে ধরেছে তো ? 
এই প্রশ্নও ধারাবাহিক ভাবে আবর্তিত হচ্ছে। যেন মেয়েটিকেই ছেলের পছন্দ হওয়াটাই সব। মেয়ের পছন্দের কোন মূল্যই নেই। তার মতো মেয়েও সেই একই উত্তর দেয়। লজ্জা লজ্জা মুখ করে ছবি বলে , মা তুমি না -- বলে পুকুর ঘাটের দিকে চলে যায় ছবি। মেয়ের এই ভাব দেখে বাইরে থেকে স্বামী সোহাগিনী মনে হলেও ভিতরে চেপে রাখা যন্ত্রনাটা চোখ এড়ায় না মায়ের। তবে তা নিয়ে আর কোন উচ্চবাচ্য করে না সে। কারণ লাভ তো কিছু হবে না, মাঝখান থেকে মেয়েটা ভিতরে ভিতরে আরও রক্তাক্ত হয়ে পড়বে। ছবি বেশ কিছুদিন বাপের বাড়িতেই থাকবে। তার দ্বিরাগমনে আসার পরই আষাঢ় মাস পড়ে গিয়েছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মাস শেষ না হলে মেয়েদের বাপের বাড়ি থেকে যেতে নেই। এক হিসাবে ভালোই হলো। হৈমন্তীকে আর একা বাড়িতে রেখে ভিক্ষা করতে যেতে সাহস হচ্ছিল না। ছবি যে ক'টা দিন আছে সে ক"টা দিন সে নিশ্চিন্তে ভিক্ষায় বের হতে পারবে। এই কয়েক দিন সে বেশি বেশি করে গ্রাম ঘুরবে। যাতে ছবি চলে যাওয়ার পরও কিছুদিন ভিক্ষায় না বেরোলেও যেন  চলে যায়। হৈমন্তীকে ছবির দায়িত্বে রেখে বেশ নিশ্চিন্তেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলি। কেবল মাথার মধ্যে দিনরাত ঘুরপাক খাচ্ছিল অন্যরকম দুশ্চিন্তা।
        

     
                                      কবে মাস পূর্ণ হবে সেই প্রতীক্ষায় উদগ্রীব হয়ে থাকে তার মন। মাস পূর্ণ হলেই কণার মতো হৈমন্তীও চরম সর্বনাশের শিকার হলো কিনা বোঝা যাবে। দেখতে দেখতে মাস পূর্ণ হয় , সত্যি হয় তার আশঙ্কাই । মেয়েদের প্রতি মাসের প্রকৃতিগত প্রকাশ ঘটে না হৈমন্তীর। আকাশ ভেঙে পড়ে অন্নপূর্ণার মাথায়। কি করবে সে এখন ? কিছু ভেবে পায় না অন্নপূর্ণা। তবু দিনরাত সে এই সর্বনাশের হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় ভেবে চলে। কিন্তু বসে বসে ভাবারও তো অবকাশ নেই। যতদিন যাবে তত হৈমন্তীর শরীরে সর্বনাশের ছাপ স্পষ্ট হয়ে  উঠবে। তখন আর কিছু করার থাকবে না। যা করার তা দ্রুত  করতে হবে তাকে। কয়েকদিনের দীর্ঘ টানাপোড়নের পর শেষ পর্যন্ত মনের কোনে উঁকি দেওয়া সেই উপায়টাই কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয় সে। আর দেরী করতে চায় না সে।  সেদিন বাড়িতে গৌরব নেই।সকাল থেকে আকাশের ও মুখ ভার। তাই ওইদিন আর ভিক্ষায় বেরোয় না অন্নপূর্ণা। সকাল থেকেই হৈমন্তীকে নিয়ে পড়ে। স্নান করিয়ে সাজিয়ে গুজিয়ে দেয়। সারাদিনই হৈমন্তীকে নিয়ে কেটে যায় তার। হৈমন্তী পোস্তবাটা, মাছের টক দিয়ে পান্তাভাত খুব ভালোবাসে। তাই ছবিকে দিয়ে দোকান থেকে একটু বেশি করে পোস্ত আর জেলে পাড়া থেকে চুনোমাছ আনা করায়। নিজে হাতে চুনোমাছের টক করে। আর ছবিকে দেয় পোস্ত বাটতে। পোস্তর সঙ্গে দেয় দুটো বড়িও। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে ছবি। সে বলে , হাপিনার কবিরাজ দিয়েছে। ওই বড়ি খেলেই হৈমন্তী ভালো হয়ে যাবে। খুব গন্ধ তো , তাই কোন কিছুর সঙ্গে  বেটে খাওয়াতে বলেছে। সনিগ্ধ মনে বড়ি দুটো পোস্তর সঙ্গে  বেঁটে দেয় ছবি। নিজের হাতে হৈমন্তীর থালায় বেড়ে দেয় ভাত।


                                  তারপর মেয়েকে কাছে বসিয়ে খাওয়াতে শুরু করে। থালায় তার পছন্দের খাবার দেখে মায়ের গলা জড়িয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করে হৈমন্তী।মেয়ের আদরে , সোহাগে অন্নপূর্ণার চোখে জল আসে। মেয়েটাকে তো এইভাবে কোনদিন যত্ন করে খাওয়াতে পারে নি। তাই খুব ধীরে ধীরে  খাওয়ায়। হৈমন্তী পোস্তবাটা মেখে খাওনোর জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে। কিন্তু কিছুতেই হাত ওঠে না তার। মায়ের মন তো , সময় যতক্ষণ দীর্ঘায়ত করা যায় সেইজন্য টক, ডিম ভাজা দিয়ে মেয়েকে খাওয়ায় সে। একসময় থালায় পোস্তববাঁটা আর কিছু ভাত ছাড়া কিছুই পড়ে থাকে না। তাই ভাতে পোস্তবাটা মাখে অন্নপূর্ণা। কিন্তু ভাতের গ্রাস মেয়ের মুখে তুলে দিতে গিয়েও বার কয়েক হাত সরিয়ে নিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত চোখ বন্ধ করে হৈমন্তীর মুখে তুলে দেয় পোস্ত মাখা ভাত। কয়েক গ্রাস ভাত খাওয়ার পরই যন্ত্রনায় ছটফট করতে শুরু করে হৈমন্তী। ছুটে আসে ছবি। মাকে বলে, একি করলে তুমি ! মা হয়ে মেয়েকে বিষবড়ি খাইয়ে মারলে ? পাপ হবে না ?
---- চোপ , আমাদের আবার পাপ পুন্য কিসের ?  আমি মরে গেলে কে দেখত ওকে ? শেয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খেত। তখন লোকে কি বলত ? মায়ের ওই মূর্তি দেখে চুপ করে যায় ছবি। সে ছুটে গিয়ে দিদির পাশে বসে মাথায় হাত বোলাতে থাকে। আর যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে হৈমন্তী। তখনও তার নীল হয়ে যাওয়া মুখে লেগে রয়েছে পোস্তমাখা ভাত। অন্নপূর্ণার হাতের মুঠোতেও তখন ভাতের গ্রাস।


                                         নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না সে। মেয়ের বুকে আছড়ে পড়ে। চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে -- এ আমি কি করলাম। কতদিন পোস্তবাটা ভাত খেতে চেয়েছিলি , দিতে পারিনি। আজ শেষ খাওয়া খাইয়ে দিলাম রে। আমাকে ক্ষমা করিস মা। এছাড়া তোকে বাঁচানোর আর কোন পথ আমার জানা ছিল না রে। খবর পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা। সব শুনে তার চোখেও জল।  সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তিনি বলেন , তুমিই বা কি করবে মা , গরীবদের তো মরেই এভাবে বাঁচার পথ খুঁজে নিতে হয়। কণার মতোই হৈমন্তীকেও ডাউকি নদীঘাটের শ্মশানে দ্রুত সৎকারের তোড়জোড় শুরু করেন গোমস্তাকাকা। তখনও হৈমন্তীকে জড়িয়ে কেঁদে চলেছে ছবি আর অন্নপূর্ণা। একসময় দেওয়ালে মাথা ঠুকতে শুরু করে অন্নপূর্ণা। পাগলের মতো করতে থাকে সে। বলে, আমি মরলেই তো সব চুকে যেত। কারও কোন কষ্ট দেখতে হত না ? বলে পোস্তবাটা মাখা অবশিষ্ট ভাত মুখে তুলতে যায়, ছবি ছুটে গিয়ে মাকে আটকায়।  বলে , মা তুমি কি পাগল হয়ে গেলে ?
---- পাগল হলে তো বেঁচে যেতাম রে। এই পাপ আমাকে করতে হত না। স্বামীকে খেয়েছি , সন্তানদের খেয়েছি , তবুও কেন পাগল হলাম না বলতে পারিস ? ভগবান এত নিষ্ঠুর আমাকে পাগলও করে দেয় না। 


                                           সেই সময় সব যোগাড়পাতি করে গোমস্তাকাকা এসে দাঁড়ান হৈমন্তীর মৃতদেহের সামনে। অন্নপূর্ণার উদ্দেশ্যে বলেন , এবার হৈমীদিদিকে ছেড়ে দিতে হবে মা। আর দেরি করা ঠিক হবে না।কান্না সামলে মেয়েকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেয় অন্নপূর্ণা। কপালে গালে চুমু খেতে খেতে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। কাঁদতে কাঁদতেই বলে চলে, কত তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ,  অবহেলা সয়ে মা আমার এককোনে সংসারের আর পাঁচটা জিনিসের মতো পড়ে থেকেছিস। কোনদিন তোর আদর যত্ন করতে পারিনি মা।তারই মাঝে হৈমন্তীকে নিয়ে বেরিয়ে যান গোমস্তাকাকারা। আর সেদিকে ছুটে যায় অন্নপূর্ণা। কাপড় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কোনদিকে খেয়াল নেই তার। মনে মনে চরম আক্ষেপ হয় তার। এ কি করল সে ? কেন অন্য কোন উপায় ভাবল না ? হৈমন্তীর তো কোন দোষ ছিল না। তাহলে কেন সে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল ? কেন সে অন্য কোন উপায় ভাবল না ? কেন সে আইনের আশ্রয় নিয়ে সেই নরাধমের মুখোশ খুলে হৈমন্তীর দায়িত্ব নিতে বাধ্য করল না ? তা না করে সে কেন নিজের পেটের মেয়েকে খুন করল ? হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খায় তার মাথার মধ্যে। 


                                                       আর তত কান্নার দমকে ফুলে ফুলে ওঠে। মরার আগে  হৈমন্তী বুঝতেও পারলোনা তার জ্বালা যন্ত্রণার কারণ। বার বার হৈমন্তীর যন্ত্রনায় কাতর মুখটা ভেসে উঠছিল। সেই মুখে ফুটে ওঠা ভাষাই যেন তাকে প্রশ্ন করছিল -- মা পোস্তবাটা দিয়ে পান্তা ভাত খেতে চাইতাম বলে তুমি রাগ করে সরিয়ে দিলে মা। আমার বুক জ্বলে যাচ্ছে। তোমার মুখ হারিয়ে  যাচ্ছে মা। আর পোস্তবাটা খেতে চাইব না। আমাকে ভালো করে দাও। আর সইতে পারে না অন্নপূর্না। বলে ওঠে, আর বলিস না। আমি আর সইতে পারছি না রে। পরক্ষণেই ভুল ভাঙে তার। কার সঙ্গে  কথা বলছে সে ? হৈমন্তী তো আর নেই।  সে সমানে বিড় বিড় করে চলে --- ওরে মায়ের উপর অভিমান করে যাস নে, ক্ষমা করে দিয়ে যা মা। আমি যে কত অসহায় তা তো তোদের অজানা নয়। লক্ষ্মী মা আমার আমাকে ক্ষমা করে দে। বলতে বলতে মেয়ের মৃতদেহের পিছনে পিছনে ছুটতে থাকে। আর বেসামাল হয়ে পায়ে কাপড় জড়িয়ে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারায় অন্নপূর্ণা।

            ( ক্রমশ )


No comments:

Post a Comment