Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুনমা- ১২



                 ঠাকরুনমা

                                 

                        অর্ঘ্য ঘোষ       


                           ( দ্বাদশ কিস্তি ) 

           

বলতে বলতে মেয়ের মৃতদেহের পিছনে পিছনে ছুটতে থাকে। আর বেসামাল হয়ে পায়ে কাপড় জড়িয়ে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারায় অন্নপূর্ণা। যখন জ্ঞান ফেরে চোখ মেলে দেখে সে ছবির কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। আর ছবি পাখা করতে করতে চেয়ে আছে তার মুখের দিকে। ছবি চোখে মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। একেই বোধ হয় বলে নারীর টান। হৈমন্তীর ওই ঘটনাটার জন্য কিছুক্ষণ আগেই যে মেয়ের চোখে ঘৃণা আর রাগ দেখেছিল সেইই চোখই এখন কেমন মায়া মমতায় ভরা। পরম মমতায় কেমন তার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সে চোখ খুলে চাইতেই ছবি উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করে -- এখন কেমন লাগছে মা তোমার ?  যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।
---- কেন রে কি হত ? মরে যেতাম বড়ো জোর। ভালোই হতো জ্বালা জুড়াত। আর কারও মাথা খেতে হত না। মাকে কথা শেষ করতে দেয় না মেয়ে। হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে। গলায়  অভিমান ঝড়িয়ে সে বলে , আবার সেই অলুক্ষণে কথা। আমি না হয় হৈমীদিদির ব্যাপারটা পুরোটা  না জেনে তোমার উপর রাগ করে ছিলাম। কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম এছাড়া তো কোন পথ ছিল আমাদের। বেশ আর কথা বলতে হবে না।  তুমি শুয়ে থাকো , আমি তোমার জন্য একটু সরবত করে আনি। বলে উঠে যায় ছবি। আর সে শুয়ে শুয়ে হৈমন্তীর কথা ভাবতে থাকে। সেই ভাবনার মাঝে ভীড় করে সৌরভ, সায়ন্তন, কণা, রঞ্জুরা। এলোমেলো হয়ে যায় সব ভাবনা। মাথার ভিতরটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করে ওঠে। রাতে  হৈমন্তীকে দাহ করে ফেরেন গোমস্তাকাকারা। আর ফের ছবিকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে অন্নপূর্ণা। 
গোমস্তাকাকা স্বান্তনা দিয়ে তাকে শান্ত করেন। তারপর তারা একে একে চলে যেতেই শুন্যতায় ডুবে যায় বাড়িটা।


                                    রাতে মেয়ের পাশে শুয়ে অন্নপূর্ণা ভাবতে থাকে ছবি চলে গেলে বাড়িতে সে একা থাকবে কি করে ? গৌরব তো সবদিন বাড়িতে থাকে না। পাড়ারও কেউ তো তাদের সঙ্গে  মেশে না। ঘরে - বাইরে একঘরের মতো থাকতে থাকতে সে পাগল হয়ে যাবে না তো ? দেখতে দেখতে হৈমন্তীর শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ পেরিয়ে যায়। কাজ তো কত !  করতে হয় তাই নিয়ম রক্ষার্থে নমো নমো করে কাজটা করিয়ে দেন গোমস্তাকাকা। অন্নপূর্ণা ভাবে এবার তো ছবিকে স্বামীর ঘরে পাঠাতে হবে। কিন্তু কথাটা পাড়তেই বেঁকে বসে ছবি। মাকে জড়িয়ে সে বলে, আমাকে আর ওখানে পাঠিও না মা। আমি আর ওখানে যাব না। আমি গেলে তোমাকে কে দেখবে ?
 --- তাই কি হয় রে মা ? বিয়ের পর মেয়ে বাপের বাড়িতে পড়ে থাকলে লোকে কি বলবে ? 
---- ছাড়ো তো মা লোকের কথা। লোকে তো আমাদের সবকিছুই খারাপ বলে।আজ পর্যন্ত কোন লোকে আমাদের কোন ভালোকে ভালো বলেছে ?
---- বেশ , লোকের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু বিয়ের পর যে মেয়েদের স্বামীর ঘরই আসল ঘর। তাছাড়া আমি চোখ বুজলে তোকে দেখবে কে ?
আর কোন কথা বলে না ছবি। কেমন যেন গুম মেরে যায়। অন্নপূর্ণা ভাবে , হয়তো তাকে একা ফেলে যেতে হচ্ছে বলে ছবির মন খারাপ। তাই মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে , আমার জন্য চিন্তা করিস না। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। সামনেই তো পুজো। তখন আবার গোমস্তাকাকা গিয়ে তোকে নিয়ে আসবে। অগ্যতা বিকালের দিকে গোমস্তাকাকার সঙ্গে  স্বামীর ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় ছবি। যাওয়ার আগে তার সে কি কান্না। যেন চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে। অন্নপূর্ণা যত মেয়েকে স্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে মেয়ের কান্না তত তাকেও আকুল করে তোলে। দীর্ঘক্ষণ মা-মেয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই চলে।


                                             একসময় গোমস্তাকাকা তাড়া দেন -- দিদি,  এরপর দেরী করলে তো আর শেষ বাসটাও পাব না।সেই কথা শুনে মাকে ছেড়ে প্রথমে হরিতলায় তারপর মা আর গোমস্তা কাকাকে প্রনাম করে ছবি। অন্নপূর্ণা মেয়ের চিবুক ছুঁয়ে চুমু খায়। আস্তে আস্তে বাড়ির বাইরে পা রাখে মেয়ে। আর সে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ঠায় সে দিকে চেয়ে থাকে মা। ছবি কিন্তু একবারও পিছন ফিরে চায় না। অন্নপূর্ণার মনে হয় , জোর করে স্বামীর ঘরে পাঠানো হচ্ছে বলেই ছবি অভিমানে ওই রকম আচরণ করছে। কিন্তু পরদিন তার ভুল ভাঙে। কথা ছিল ছবিকে পৌঁচ্ছে দিয়ে রাতটুকু সেখানে কাটিয়ে ভোর ভোর ফিরে আসবেন গোমস্তাকাকা। কিন্তু তার পরিবর্তে উর্ধশ্বাসে সাইকেল হাঁকিয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় একটি ছেলে। তাকে দেখেই বুকের ভিতরটা কেমন ধ্বক করে ওঠে অন্নপূর্ণার। ছেলেটির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই সে বলে ওঠে , ঠাকরুনমা আমাকে আপনাদের গোমস্তা পাঠালেন। খুব বড়ো বিপদ হয়ে গিয়েছে। আপনার মেয়ে ভোরবেলায় গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
কথাটা শুনেই কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে সে। কিছুতেই বিশ্বাস হয় না কথাটা। কোন রকমে বলতে পারে --কালই তো গেল ,  কি এমন হয়েছিল যে ওকে আত্মহত্যা করতে হলো ? 
 ----- তা তো আমি বলতে পারব না ঠাকরুনমা। গোমস্তাবাবু জানতে পাঠিয়েছেন ওখানেই সৎকার করে দেওয়া হবে , না মৃতদেহ এখানে আনার ব্যবস্থা করা হবে ?
অন্নপূর্ণা ভেবে পায় না কি বলবে সে।গৌরবও বাড়িতে নেই , যে ওকে পাঠাবে।নিজে কোন সিদ্ধান্তেও পৌঁছোতে পারে না।তাই বলে , গোমস্তাকাকা যা ভালো বুঝবেন তাই করতে বলো।ছেলেটি চলে যেতেই কপাল চাপড়াতে থাকে সে।তার ঝরে পড়ে তীব্র আক্ষেপ --- তোর মনে যে এই ছিল তা একটুও বুঝতে দিলিনা মা। এমনি করে চলে যাবি জানলে কিছুতেই জোর করতাম না। অভিমানটাই বড়ো হলো? একবার মায়ের কথা ভাবলি না। বিড়বিড় করে আর সমানে কেঁদেই চলে অন্নপূর্ণা।


                                     বিকালের দিকে দাহকাজ সেরে গোমস্তাকাকা ফেরেন। তাকে দেখে আরও জোরে কেঁদে ওঠে সে। বলে, কাকা সবাই কি এভাবে আমাকে একা করে চলে যাবে  ? 
কেঁদে ফেলেন গোমস্তা কাকাও। কাঁদতে কাঁদতেই বলেন , মা তুমি তো শেষ বেলাকার মুখখানি দেখনি। মুখে সেই ছোটবেলাকার দুষ্টুমিভরা হাসিটা লেগে ছিল । ভাবখানা এমন, যেন বলতে চাইছে নাও এবার কই ধরো দেখি আমায়।
---- কাকা, আর বলেন না, আমি সইতে পারছি না।
---- সইতে কি আমি পারছি ? বুকের ভিতরটা ফেটে যাচ্ছে। নিজের তো কেউ নেই , ওদেরই কোলে পিঠে করে  মানুষ করেছি। ওদের মুখ দেখেই নিজের কেউ না থাকার অভাব ভুলেছি। সেই মুখেই আমাকে আগুন ছোঁওয়াতে হল। তার আগে আমি চলে গেলাম না কেন ?
---- কাকা সবই আমার কপাল। জানিনা কোন পাপে আমার এই শাস্তি হচ্ছে। 
--- মা গো, এ আমারই ভুল। আমিই তখন ভালো করে খোঁজখবর নিইনি। লোকটা শুধু মাতালই নয় , বিকৃত রুচির একটা জানোয়ার। বন্ধুদের জুটিয়ে এনে ফুর্তির আসর বসিয়ে টাকা রোজগার করত।জোর করে মদ খাওয়াত ।তারপর বেহুশ শরীরটার  ওপর পাশবিক অত্যাচার করত। কোন আপত্তি করলেই সিগারেট -- বিড়ির ছ্যাকা দিত। এর আগের বউ দুটোও একই কারণে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে।  ছবিমাও  সেই অত্যাচার সইতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। দোষ আমারই, একবাড়ি থেকেও কাল আমি কিছুই আচ করতে পারলাম না।
 --- আপনার আর ভুল কিসের ? আমার জীবনটাই যে ভুলে ভরা। তাই বোধ হয় একের পর এক মাসুল দিয়ে চলেছি। জানি না  আর কত মাসুল আমাকে দিতে হবে ? 

      

                                                    বেশ কিছুক্ষণ স্বান্ত্বনা দেওয়ার পর গোমস্তাকাকাও চলে যান। আর বাড়িটা যেন গিলে খেতে আসে তাকে। একা বসে বসে সে ভাবতে থাকে একদিন আগেও এইসময় এই বাড়িতেই ছিল ছবি। আজ সেই ছবিই ছবি হয়ে গেল। মনে মনে খুব আক্ষেপ হয় তার। মা হয়েও সে পড়তে পারল না মেয়ের চোখের ভাষা। মেয়ের মনে লুকিয়ে থাকা জ্বালা যন্ত্রণা উপলব্ধিই করতে পারল না। পারলে যে আজ ছবিকে হারাতে হত না। ছবির কথা ভাবতে ভাবতেই একসময় মাটিতেই ঘুমিয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। রাতের অন্ধকার মুছে আলোয় ভরে যায় দশদিক। কেবল অন্নপূর্ণাকে আচ্ছন্ন করে রাখে বিষাদের অন্ধকার। এখন আর সবদিন ভিক্ষা করতেও যায় না। গৌরব কোথায় খায় , কোথায় থাকে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। ইচ্ছে হলে কোনদিন বাড়ি আসে, তো কোনদিন আসে না।আন্নপূর্ণা নিজেও এক দিন খায় তো দুদিন খায় না। খিদে,তেষ্টাই যেন হারিয়ে গিয়েছে। দ্রুত শরীর মন ভেঙে পড়ছে। সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই তার। বেশিরভাগ সময় বিছানাতেই পড়ে থাকে।বাঁচার ইচ্ছেটাই যেন হারিয়ে ফেলেছে। কেবল সায়ন্তনের খুনের সুবিচারের আশা তাকে কোনরকমে বাঁচিয়ে রেখেছে। দেখতে দেখতে সেই দিনটা এসে পড়ে। সেদিন সায়ন্তনের মামলার রায় বেরনোর দিন। তাই সেদিন সকাল থেকেই কিছুটা উদ্বিগ্ন  দেখায় অন্নপূর্ণাকে। রায় নিয়ে ভিতরে ভিতরে একটা চাপা উত্তেজনাও কাজ করে। ভাসুরদের স্বাক্ষ্যে খুনীরা শেষ পর্যন্ত রেহাই পেয়ে যাবে না তো ?  শাস্তি হলে ওদের ফাঁসি না ,  যাবজ্জীবন সাজা হবে ? এমনই নানা প্রশ্ন ভীড় করে তার মনে। আর তিনআনিরা যদি বেকসুর খালাস পেয়ে ফিরে তাহলে কি আর তারা গ্রামে থাকতে পারবে ? 


                                                              গৌরবের সঙ্গে  সংঘাত বাঁধবে ওদের। তখন কি ওরা ছেড়ে কথা কইবে ? তিনআনিদের সঙ্গে  যোগ দেবে ভাসুররাও। তখন কোথাই যাবে তারা। পরক্ষণেই মনকে স্বান্ত্বনা দেয়, সে রকম কিছু হবে না।দুই ভাসুর বিপক্ষে স্বাক্ষী দিলেও তাদের পক্ষেও তো স্বাক্ষী দিয়েছেন অনেকে। তাছাড়া জলজ্যান্ত একটা লোককে পিটিয়ে খুন করাটা তো আর মিথ্যা হয়ে যাবে না। বড়ো কিছু শাস্তি না হলেও একেবারে বেকসুর খালাস নিশ্চয় পাবে না ওরা। ততদিনে না হয় গ্রাম ছেড়ে চলেই যাবে তারা। আশা-নিরাশার দোলাচলের মধ্যেই দ্রুত স্নান সেরে আদালতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় সে।কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা। তার সঙ্গেই রামপুরহাট মহকুমা আদালতের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। আদালতেও সেদিন চাপা উত্তেজনা। উকিল-মহুরী, বার কাউন্সিল সর্বত্র সেদিনের রায়ের বিষয় নিয়ে আলোচনা। নির্ধারিত সময়ে গোমস্তাকাকার সঙ্গে  আদালত কক্ষে গিয়ে বসে অন্নপূর্ণা। তার মনে তখন চরম টানাপোড়েন। মনে হচ্ছিল , রায় যাই হোক , সেটা যত তাড়াতাড়ি ঘোষিত হয় ততই ভাল। সে আর চাপ নিতে পারছে না।যথা সময়ে  আদালতে প্রবেশ করেন বিচারক।আদালতে তখন পিন পড়লেও শোনা যাওয়ার মতো নিঃস্তব্ধতা। আদালত কক্ষের খাঁচার ভিতরে ততক্ষণে এনে ঢোকানো হয়েছে অভিযুক্তদের। বিচারক একবার তাদের দিকে ,  একবার গোটা আদালত কক্ষে চোখ বুলিয়ে নিলেন। আর তখন থেকেই অন্নপূর্ণার বুকের ভিতরে কি হয়, কি হয় ভাবটা আরও বেড়ে যায়। হাতজোড় করে সে বিচারকের দিকে চেয়ে বসে থাকে। বিচারক প্রথমে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসা করেন --- আপনাদের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ রয়েছে। আপনাদের কিছু বলার আছে ? উত্তরে অভিযুক্তরা সমস্বরে বলে ওঠে -- হুজুর আমরা নির্দোষ। আমাদের মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে। আদালতের প্রচলিত এই নিয়মগুলো কেমন বিষ্ময়কর মনে হয় অন্নপূর্ণার।অন্নপূর্ণা যতদুর জানে তাতে বিপ্লবী আর কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ছাড়া কোন অভিযুক্ত তার বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে না।স্বাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রেও ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়েও অনেকে মিথ্যা কথা বলেন। দুটি ক্ষেত্রেই তো সায়ন্তনের খুনের মামলাই জলজ্যান্ত প্রমান।


                                  তবু বছরের পর বছর ধরে ওই নিয়ম চলে আসছে। ওইসব ভাবনার মাঝেই বিচারকের গলার স্বরে সচকিত হয়ে ওঠে অন্নপূর্ণা। রায় পড়তে শুরু করেন বিচারক। খুব ধীরে ধীরে বিচারক বলেন , প্রাথমিক ভাবে পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রজু করেছিল। কিন্তু তার স্বপক্ষে কোন স্বাক্ষ্য প্রমাণ দাখিল করতে পারে নি। তাই স্বাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস ঘোষণা করা হল। বিচারকের কথা শেষ হয় না অন্নপূর্ণা চিৎকার করে ওঠে ---- না----- আ। তার চিৎকারে আদালতের স্তব্ধতা খান, খান হয়ে ভেঙে পড়ে, প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে সারা আদালত চত্বর। সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে অন্নপূর্ণার উপর। বিচারকও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। অন্নপূর্ণা তখন দাঁড়িয়ে বলতে থাকে -- হুজুর , পুলিশ স্বাক্ষ্য প্রমাণ দিতে না পারলে আমার স্বামীর খুনটা তো মিথ্যা হয়ে যেতে পারে না। কেউ তো খুনটা করেছে। তাহলে কেন আমি বিচার পাবো না? কেন -- কেন হুজুর ?
বিধবার ওই মর্মস্পর্শী প্রশ্নে আলোড়ন পড়ে যায় আদালত কক্ষে। অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠে খোদ বিচারকের মুখে। তাকে বড়ো কঠিন প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন বিধবা।কারণ পুলিশের নথিতেই খুনের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। অথচ প্রমাণের অভাবে সব জেনেও অভিযুক্তদের কোন সাজা দেওয়া সম্ভব হলো না। তাই অস্বস্তি এড়াতে তিনি বলেন , দেখুন মা এই বিচার যদি আপনার মনোপুত না হয় তাহলে আপনি উচ্চ আদালতে পুনঃবিচারের আর্জি জানাতে পারেন।আইনে সেই নিয়ম আছে। আপনার উকিল দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে আপনি সরকারি সহয়তাও পেতে পারেন।



                                                                বিচারকের কথা শেষ না হতেই ফের পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে অন্নপূর্ণা -- হ্যা, আমি পুনঃ বিচার চাই, এখনি ,এই মূহুর্তে। ১৫ বছর ধরে এই মামলা লড়তে লড়তে আমি সব কিছু হারিয়ে ফেলেছি। অন্য জায়গায় পুনঃবিচার শেষ হতে হতে আমিই হয়তো মরেই যাব। যা করার আপনিই করুন হুজুর। আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের সাজা দেখতে চায়। বিচারক বলেন -- তা কি করে হয় মা ? এ আদালতে তো আর তোমার ওই বিচার সম্ভব নয়। 
----- তাহলে আপনার সামনেই এই আদালতে আমি মাথা ঠুঁকে মরব। বলে দেওয়ালে মাথা ঠুঁকতে শুরু করে অন্নপূর্ণা।
 আর ওই ঘটনায় হতচকিত হয়ে পড়ে গোটা আদালত। বিব্রত বোধ করেন বিচারক। বিচারকের বিব্রত ভাব লক্ষ্য করে সরকারি আইনজীবি বলে ওঠেন , হুজুর সম্ভবত ওই মহিলা পাগল। আপনি ওকে আদালতকক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিন। নির্দেশ দিতে হয় না। আদালতের কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা এসে অন্নপূর্ণার দুই হাতে ধরে। আবার চিৎকার করে ওঠে সে ---- হুজুর, বিশ্বাস করুন আমি পাগল নই। বিশ্বাস করুন হুজুর, আপনি বিশ্বাস করুন ---- ---। তার কথা কেউ কানেই তোলে না। পুলিশকর্মীরা টেনে হিচড়ে তাকে আদালত কক্ষের বাইরে এনে ফেলে দেয়। কান্নায় ভেঙে পড়ে অন্নপূর্ণা।

                                                                           আদালত চত্বরে পড়ে কাঁদতে থাকে সে । তখন তাকে দেখে সবাই পাগলিই ভাবে। আর তার আচরণ দেখে আদালতের মানুষজন যেন মজা দেখার খোরাক পেয়ে যায়।  দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে নানা রকম মন্তব্য করতে থাকে তারা।একসময় তার দুপাশে এসে দাঁড়ায় গোমস্তাকাকা আর সন্দীপন।তারা অন্নপূর্ণাকে আদালত চত্বরের বাইরে নিয়ে আসে। দুজনেই কোন কথা বলতে পারে না। কি'ই বা বলবে এই পরিস্থিতিতে? স্বান্ত্বনা দেওয়ার কোন ভাষা খুঁজে পায় না তারা।  কোন রকমে অন্নপূর্ণাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তারা চলে যাওয়ার উপক্রম করতেই অন্নপূর্ণা বলে ওঠে -- এই দিনটার জন্য আমি এতদিন আশায় আশায় বুকে বেঁধেছিলাম। সব শেষ হয়ে গেল। একটা মানুষকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে খুন করেও কিচ্ছু হল না ওদের। যেন খাদের কিনার থেকে ভেসে আসে তার কণ্ঠস্বর। গোমস্তাকাকা --সন্দীপনের মুখেও হতাশার ছাপ। সন্দীপন বলে , যথাসাধ্য লড়েও কিছুই করতে পারলাম না। একজন আইনজীবি হিসাবে এই ব্যর্থতার দায় আমারই।
গোমস্তাকাকা বলেন, তুমি এভাবে বলছো কেন ? তুমি না থাকলে তো এ মামলা আদালত পর্যন্ত গড়াতোই না। সে যা হওয়ার তা তো হয়েছে ,  কিন্তু আর কি কিছুই করার নেই ?
---- করার আছে বলতে উচ্চ আদালতে পুনঃবিচারের আর্জি জানাতে পারি আমরা। কিন্তু তাতে অনর্থক অর্থব্যয় ছাড়া কিছু লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না। 
---- কেন -- কেন,  কোন লাভ হবে না বলে মনে হচ্ছে তোমার ? কত মামলায় তো শুনি পুনঃবিচারে অন্য রকম রায় হয়েছে।
 ---- তা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা হওয়ার সম্ভবনা নেই বললেই চলে।
---- কেন ?
---- উচ্চ আদালতে তো নতুন করে স্বাক্ষ্য প্রমাণ দাখিলের কোন সুযোগ নেই সেখানে লড়াই চলে মূলত নিম্ন আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার ফাঁকফোঁকর আর বিভিন্ন আদালতের রায় আর ধারা - উপধারাকে কেন্দ্র করে।  কিন্তু ওরা পুলিশের তদন্তকারী অফিসার , সরকারি আইনজীবি এবং স্বাক্ষীকে টাকা খাইয়ে সেইসব ফাঁকফোঁকর মেরে রেখেছে। আর তাই অন্যান্য বিষয়গুলিও আমরা খুব একটা কাজে লাগাতে পারব না। 
---- বেশ , মানুষের আদালতে বিচার নাই বা হলো ? উপরে তো একজন রয়েছেন , তার কাছে নিশ্চয় সুবিচার হবে। গোমস্তাকাকার কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ হো -----হো শব্দ করে হেসে ওঠে অন্নপূর্ণা। টানা হাসির দমকে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারে না সে। 


                                                                        গোমস্তাকাকা আর সন্দীপন অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তার দিকে। অন্নপূর্ণাকে তখন কেমন অচেনা লাগে।  তাদের মনে সংশয় উকি দেয় , সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গেল না তো অন্নপূর্ণা ! বেশ কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে সে বলে , স্বান্ত্বনা দিচ্ছেন কাকা ? উপরওয়ালার কথা বলছেন ? তিনি কি সত্যিই আছেন ? থাকলেও এত উপরে আছেন যে ,আমাদের মতো এত নীচে থাকা মানুষের কাছে তার বিচার পৌঁছোয় না। জীবনভর তো সেটাই দেখে আসছি। আপনারও তো তা অজানা নয় কাকা। 
 --- সে তো জানি মা। কিন্তু আমাদের তো সেই উপরওয়ালার প্রতি ভরসা রাখা ছাড়া গতিও নেই।
আবার শব্দ করে হেসে ওঠে অন্নপূর্ণা। সেই হাসি আর থামতেই চায় না। একসময় হাসি থামিয়ে সুর করে বলে ওঠে --- অগতির গতি তুমি ওগো দয়াময়।কোথাও  তোমার দয়া খুঁজে নাহি পায়। কিছু বুঝলেন কাকা ? ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনেছিলাম। কেমন আমার জীবনে মিলে গেল দেখুন।
----- মা তুমি একটু মাথা ঠাণ্ডা করো। দেখ ঠাকুর ঠিক একদিন মুখ তুলে চাইবেন।
---- কাকা আপনি আমাকে ঠাকুরের কথা শুনিয়ে মাথা ঠান্ডা রাখতে বলছেন। আপনি কি আমাকে বাচ্চা পেয়েছেন কাকা ? মাথা কি ঠান্ডা রাখা যায় ?
সন্দীপন আর গোমস্তাকাকা বিস্ময়ে  চেয়ে থাকেন অন্নপূর্ণার মুখের দিকে। আর অন্নপূর্ণা আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলে -- কাকা আপনাকে আমি মান্য করি, কিন্তু সাবধান করে দিচ্ছি আর কখনো ওই অন্ধ ঠাকুরের কথা তুলবেন না, আমার মাথায় আগুন জ্বলে যায়। 
----- বেশ মা তাই হবে।
---- সবাই বলে যার কেউ নেই, তার ভববান আছে। সবাই ভুল বলে। যার কেউ নেই তার ভগবানও নেই। 



                                                          অন্নপূর্ণার যে মস্তিক বিকৃতি শুরু হয়ে গিয়েছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যান গোমস্তাকাকারা। না হলে এভাবে অন্নপূর্ণাকে কোনদিন কথা  বলতে শোনে নি তারা। আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর সেই ধারণাটাই বদ্ধমূল হয় তাদের। অন্নপূর্ণার প্রতিটি কথাই অসংলগ্ন হয়ে পড়ে। এবার আক্ষেপ শোনা যায় গোমস্তাকাকার গলায় -- সব শেষ হয়ে গেল সন্দীপনবাবু  , এবার কি যে হবে ভেবে পাচ্ছি না। কথাটা কানে যেতেই আবার হেসে ওঠে অন্নপূর্ণা। হাসির দমকে সারা শরীর ফুলে ফুলে ওঠে। কিছুটা বিদ্রুপের সুরে সে বলে, কেন আপনার উপরওয়ালা আছে তো। তারপর কেটে কেটে উচ্চারণ করে --  উ--প --র --ও--য়া--লা! ভারি আমার উপরওয়ালা রে। তাকেই কে দেখে তার ঠিক নেই , উনি দেখবেন আমাকে। ওরে আমি তো সাগরে শুয়ে পড়েছি, শিশিরে গা ভেজার ভয় আর করি না।এবার যা পারিস কর। গোমস্তাকাকারা বোঝেন -- এসব মস্তিক বিকৃতির লক্ষণ।আরও কিছুক্ষণ অন্নপূর্ণাকে স্বান্ত্বনা দেওয়ার পর নিজের বাড়ি অভিমুখে রওনা দেন তারা। আর তারা চলে যেতেই আবার অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ে অন্নপূর্ণা। সেই হাসির শব্দে বাড়ির ঘুলঘুলিতে বাসা বেঁধে থাকা পায়রাগুলো ডানা ঝাপটে ওঠে। বাড়ির সামনে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা কুকুরটা আচমকা ভয় পেয়ে ডেকে ওঠে। একসময় অন্নপূর্ণাকে নিয়ে অন্ধকারে ঢেকে যায় বাড়িটা। অন্যদিকে তখন তিনআনিদের বাড়িতে আলোর রোশনাই। বিচার চলাকালীন যে দু-চারজন সহানুভূতিশীল হয়ে অন্নপূর্ণাদের দিকে ঝুঁকেছিলেন তারাও রাতারাতি  তিনআনিদের দলে গিয়ে ভীড়েছেন। তারাও উৎসবের আমেজে মাতোয়ারা। যেন রাজারা যুদ্ধ জয় করে ফিরেছেন। তাই প্রজারা নিবেদিত প্রান হয়ে আনুগত্য প্রদর্শন করছে। পাশের গ্রাম থেকে নিয়ে আসা হয়েছে ঢাক-ঢোল।  বিস্তর খানাপিনা , আমোদ- ফুর্তির আয়োজন। ভাসুর-জা'রাও ভিড়েছেন সেই দলে। তাদের তো নিমন্ত্রণ থাকবেই। এই যুদ্ধ জয়ে তারাও তো সৈনিক। সেই সময় উদভ্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে গৌরব।

                                            তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে অন্নপূর্ণা। মায়ের ওই অবস্থা দেখে সে বুঝে যায় তার বাবার খুনের মামলার পরিনতি। মুহুর্তে তার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে বীভৎস সেই দিনটার ছবি। মৃত্যু যন্ত্রনায় একটু জল, জল করে ছটফট করছে বাবা , আর ওরা বাবার মুখে প্রস্রাব করেদিয়েছিলো। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তার। চোখে জ্বলে ওঠে প্রতিশোধের আগুন। ঘরের ভিতর থেকে মোটা লাঠিটা নিয়ে সে তিনআনিদের বাড়ির দিকে ছুটে যায়। ছেলেকে ওইভাবে মারমুখী হয়ে বেড়িয়ে যেতে দেখে একটা কথাও বলে না অন্নপূর্ণা।আগে হলে মাথার দিব্যি দিয়েও ছেলেকে আটকাত সে। কিন্তু এখন তো ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করার বোধটাই সে হারিয়ে ফেলেছে। শুধু একটাই কথাই সে আউড়ে যায় -- সব শেষ হয়ে গেল। বিচার চাই হুজুর, আপনি বিচার করুন। গৌরব বেরিয়ে যাওয়ার পরই প্রচন্ড হই-হট্টগোল শোনা যায় তিনআনিদের বাড়িতে। আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন লোক ধরাধরি করে রক্তাক্ত অবস্থায় বেহুশ গৌরবকে ফেলে দিয়ে যায় অন্নপূর্ণার পায়ের কাছে। তার মাথা ফেটে তখন গলগল করে রক্ত ঝড়ছে। ছেলেকে ওই অবস্থায় দেখে কেমন যেন বিহ্বল হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। বেশ কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে থাকার পর দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ে সে। মনে হয় যেন তীব্র যন্ত্রনায় মাথার শিরা ছিঁড়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে যেন তার ঝাপসা হয়ে যাওয়া মনের পর্দাটা সরে যায়।  দৃশ্যমান হয়ে ওঠে অতীত। মনে পড়ে যায় সেই দিনটার কথা। সেদিনও এই ভাবেই তিনআনিদের দোকান ঘরের সামনে পড়ে ছিল সায়ন্তনের রক্তাক্ত নিথর দেহ। সে সেদিন সায়ন্তনের বুকের উপর আছড়ে পড়েছিল। সেই কথা মনে পড়তেই একটু স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে অন্নপূর্ণা। আর সেদিনের মতোই ছেলের রক্তাক্ত দেহ আঁকড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। পরম যত্ন্রে শাড়ির আঁচলে ছেলের রক্ত মুছিয়ে দিতে দিতে বলে -- কেন গেলি বাবা। কত রক্ত ঝরছে একটি বার চোখ মেলে দেখ। কোনদিন তো পেট ভরে খেতেই পাস নি, রক্ত হবে কি করে ?যেটুকু ছিল সেটুকুও এবাবে ঝড়ে গেলে তুই বাঁচবি কি করে বাবা? 



                                           তারপর ছেলের মাথাটা কোলে তুলে পাগলিনীর মতো  চিৎকার করে ওঠে। যে ঠাকুরকে নিয়ে কিছুক্ষণ আগেই তীব্র শ্লেষ ঝড়ে পড়েছিল তার গলায়। সেই গলাতেই এবার তীব্র আকুতি ঝড়ে পড়ে -- ঠাকুর তুমি একটি বারের জন্য চোখ খোল। একবার শুধু চেয়ে দেখ , যারা একদিন আমার ছোট্ট ছেলে টাকে  একমুঠো ভাত খেতে দেয় নি, খাবারের থালা থেকে মেরে তুলে দিয়েছিলো। তারাই আজ আবার   কেমন রক্ত ঝড়াচ্ছে দেখ। ঠাকুর আমাদের রক্তের কি কোন দাম নেই ? বলো ঠাকুর বলো বলো?ছেলেকে আঁকড়ে সমানে একই কথা বলেই চলে অন্নপূর্ণা। তার ওই আর্তি জমিদার বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে যেন ঠোক্কর খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে। অল্পক্ষণের মধ্যেই দুজন লোক নিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা। তারাই কাঁধাকাঁধি করে গৌরবকে হাসপাতালে নিয়ে যান। আর তারপরই ফের অন্নপূর্ণার মস্তিক বিকৃতির লক্ষণ আরও প্রকট হয়ে পড়ে। কখনও আপন মনে হো - হো করে হেসে ওঠে। কখনও বা কেঁদে ভাসায়।বাকি সময় অবোধ্য ভাষায় বিড়বিড় করে। নাওয়া -- খাওয়া সব শিকেয় ওঠে।গোমস্তাকাকা অবশ্য দুবেলাই খাবার নিয়ে আসেন। কিন্তু সেই খাবারও সবদিন মুখে তোলে না। ঢাকা দেওয়া পড়েই থাকে, কুকুর বিড়ালে খায়। নিশব্দে চোখের জল ফেলেন গোমস্তাকাকা। অন্নপূর্ণাকে তো প্রথম থেকেই নিজের মেয়ের মতোই দেখে এসেছেন। তাই যেদিকে জল পড়েছে সেদিকেই তিনি ছাতা হয়ে রক্ষা করেছেন তাকে। কিন্তু এখন স্বান্ত্বনাটুকুও দিতে পারেন না। পাছে ওই প্রসঙ্গ ধরেই সমানে বকা শুরু করে দেয় অন্নপূর্ণা সেই আশঙ্কাই এখন অন্নপূর্ণার সঙ্গে  মন খুলে কথাও বলতে পারেন না। বেশি বকলেই অন্নপূর্ণার মাথার গোলমাল আরও বেড়ে যায়। এ যে কি যন্ত্রনার তা কাউকে বলে বোঝানোর নয়। 


                            গ্রামের অনেক মানুষ অবশ্য অন্নপূর্ণার এই বকবকানিতে বেশ মজাই পায়। নাগালের মধ্যে পেলে উল্টোপাল্টা কথা বলে তাকে উত্তেজিত করে তোলে। তখন অন্নপূর্ণাও সমানে বকে যায়। আর ততই মাথার অসুখটা বেড়ে যায় তার। বহরমপুর থেকে অন্নপূর্ণার জন্য মাথার গন্ডগোল সারানোর ওষুধ আনার কথা ভেবে রেখেছে গোমস্তাকাকা। হাসপাতাল থেকে গৌরব বাড়ি ফিরলে তবেই বহরমপুর যেতে পারবে সে। কারণ এখন তো দুবেলাই তাকে হাসপাতাল ছুটতে হয়। বেশ কিছুদিন যমে মানুষে টানাটানির পর বাড়ি ফেরে গৌরব। কিন্তু ফেরে না তার মানসিক সুস্থতা। মায়ের মতো সেও পাগল হয়ে যায়।  ডাক্তাররা জানিয়েছেন , আঘাত জনিত কারণে মাথার স্পর্শকাতর স্নায়ু , শিরা-- উপশিরা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় তার মানসিক সুস্থতা ফেরানো আর সম্ভব নয়। এরফলে সে হারিয়ে ফেলে সমস্ত পুরনো স্মৃতি।নিজের মাকেও পর্যন্ত চিনতে পারে না সে। মাও চিনতে পারে না ছেলেকে।দুজনে পরস্পরের দিকে ভাবলেশহীন ভাবে চেয়ে থাকে শুধু। ধীরে ধীরে দুজনের পরিচয় হারিয়ে যায়। গ্রামের মানুষের মুখে মুখে মা--ছেলের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় পাগলি আর পাগল। লোকের মুখে শুনে শুনে মা ছেলেকে বলে -- তুই তো একটা পাগল রে। ছেলেও মাকে ছেড়ে কথা বলে না। সে বলে, তুই পাগলি। তোদের সাত গুষ্টি পাগল।  আর সেই দৃশ্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে একদল মানুষ। দুজনকে নিরস্ত করার পরিবর্তে তারা মজা পেয়ে ঘিরে ধরে দুজনকে। খাবারের লোভ দেখিয়ে নানা কথা বলে  দুজনকেই পরস্পরের বিরুদ্ধে তাতিয়ে তোলে। আর তাতেই মা--ছেলে চুলোচুলি বেঁধে যায়। হাততালি দিয়ে উঠে মজা দেখা মানুষজন। কিন্তু খাবার দেয় না কেউ। মজা দেখা হলে একে একে গুটি গুটি পায়ে সরে যায় সবাই।


                                   গোমস্তাকাকার কানে সব পৌঁছোয়। মা--ছেলের মধ্যে ওইভাবে ঝামেলা বাঁধিয়ে মজা দেখাটা কিছুতেই সহ্য করতে পারে না সে। ইচ্ছে হয় গিয়ে আচ্ছা করে দু'কথা শুনিয়ে দিয়ে আসে লোকগুলোকে। কিন্তু তা আর সম্ভব হয় না। তারই যে এখন-তখন অবস্থা। গৌরবকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসার পরই সে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে রয়েছে। বিছানায় শুয়ে শুয়েই সে অন্নপূর্ণার কথা ভাবে। অন্নপূর্ণাকে ঘিরে খুব উদ্বেগ হয় তার। মা-- ছেলের ওই তো অবস্থা। বিপদ আপদ একটা কিছু হয়ে গেলে কে দেখবে ওদের ?  গ্রামের মানুষ মজা দেখতেই জানে , সহানুভূতিশীল হয়ে পাশে দাঁড়াতে জানে না। সব পশুর অধম, না হলে কি মায়ের বিরুদ্ধে ছেলেকে তাতিয়ে দিয়ে মজা দেখে ? অন্নপূর্ণা আর গৌরব অবশ্য ওসবের ধার ধারে না। এক অর্থে মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে তাদের ভালোই হয়েছে। জগতের কোন কিছুতেই তাদের আর কিছু এসে যায় না। কেউ খাবার দিলে খায় ,  নিজের মনে গান গায়, হাসে। আবার কখনও  খালি পেটেও দিব্যি থেকে যায়। থাকার ও কোন ঠাঁই- ঠিকানা নেই। যে যেখানে পারে পড়ে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটিও ভেঙে পড়েছে। সেটি এখন ভাসুরাই ভোগ দখল করছে। যখন খিদেটা খুউব চাগার দিয়ে ওঠে তখন বাসতলা মোড়ের খাবারের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মা আর ছেলে। দোকানদাররা সামান্য চাট্টি মুড়ি আর অবিক্রীত একটা বাসি চপের লোভ দেখিয়ে দু'জনকে দিয়ে বাসন মাজা -- দোকানঘর ঝাঁট দেওয়ার কাজ করিয়ে নেয়। 

                                    একই দোকানে ওইভাবে কাজ করতে করতেও মা--ছেলের চুলোচুলি বেঁধে যায়। খাবারের ভাগ চলে যাওয়ার আশংকায় এক--একদিন মাকে দোকানের দিকে ঘেঁষতেই দেয় না ছেলে। সেইসব দিন দূর থেকে দাঁড়িয়ে জুল জুল করে ছেলের খাওয়া দেখে মা। ওইভাবেই দিন কাটে মা - ছেলের। তারই মধ্যে একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায় গৌরব। কিন্তু অন্নপূর্ণার কোন ভাবান্তর হয় না। সেই বোধটাই তো সে হারিয়ে ফেলেছে অনেকদিন আগে। বরং খাবারের দোকানে একা থাকা খাওয়ার  সম্ভবনায় যেন তাকে উচ্ছস্বিত মনে হয় দোকানদারদের। তারা টিপন্নীও কাটে -- পাগলি তোর তো পোয়াবারো হল রে। নে--নে কাজে লেগে পড়। দোকানদারদের ভাবখানাই এমন যেন অন্নপূর্ণাকে রাজ্যের একছত্র আধিপত্য দেওয়া হচ্ছে। আসলে সামান্য কিছু খাবারের বিনিময়ে হাজার কাজ করার বিনা পয়সার লোক তারা কোথাই পাবে ? তাই কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য মাঝেমধ্যে তারা ওই রকম তোয়াজের সুরে কথা বলে। আর তাই শুনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে চলে অন্নপূর্ণা। কিন্তু শরীর আর অত ধকল নিতে পারে না। তাই সবদিন কাজ করতে পারে না। আর কাজ না করলে দোকানদার খাবারও দেয় না। কিন্তু পেট তো বাগ মানে না। তাই এক -এক দিন পেটের জ্বালায় দোকানে সাজিয়ে রাখা খাবার তুলে মুখে পুরে দেয় অন্নপূর্ণা। আর যাই কোথাই? গরম খুন্তি নিয়ে শরীরে চেপে ধরে দোকানদার। যন্ত্রনায় ককিয়ে ওঠে অন্নপূর্ণা।পৌশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ে দোকানদার আর তার কর্মীরা। এইরকম উল্লাস তাদের আগে হয়নি। ওইভাবে খাবারে মুখ দেওয়ার জন্য কুকুর-- বিড়ালের গায়ে  অনেক গরমজল তারা দিয়েছে। আর অবোধ প্রাণীগুলো যখন যন্ত্রনায় ককিয়েছে তখন মজা পেয়েছে তারা। মানুষের যন্ত্রনাটা তাদের আরও মজা দেয়। অন্নপূর্ণাকে ওইভাবে যন্ত্রনায় কাতরাতে দেখে দোকানদার কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে -- খবরদার, হারামজাদী মাগীকে দোকানের ধারে পাশে ঘেষতে দিবি না। মাগী বসে বসে খাবে।


                                       কিন্তু পরদিন ফের দোকানে হাজির হয় অন্নপূর্ণা। শরীরের জ্বালা -- যন্ত্রণার চেয়ে পেটের জ্বালা যে অনেক বেশী। যেদিন কাজ করতে পারে সেদিন খাওয়া জোটে। যেদিন জোটে না সেদিন চুরি করে খেতে গিয়ে জোটে খুন্তি পোড়ার ছ্যাকা। দিনের পর দিন ওইভাবে ছ্যাকা খেতে খেতে সারা শরীরে দগদগে ঘা হয়ে যায়। এক ফোটাও ওষুধ জোটে না। তাই ঘা বেড়েই চলে। যখন মশা-মাছির জ্বালা অসহ্য হয়ে পড়ে তখন বাসন মাজার ছাই ক্ষতস্থানে লেপে দেয় অন্নপূর্ণা। একসময় জ্বালা যন্ত্রণার বোধও হারিয়ে যায়। বেশিরভাগ সময় বেহুশ হয়ে রাধারমণতলায় পড়ে থাকে। জ্বরের ঘোরে দিনের পর দিন কেটে যায় অচেতন অবস্থায়। ঘোরের মধ্যে কখনও স্বামী কখনও বা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে  বিড় বিড় করে কথা বলে।  তার জ্বর তপ্ত কপাল যেন একটু মমতার স্পর্শ চায়। তাই কখনও বলে ওঠে, কণা মা এলি, একটু পাশে বস। হৈমন্তী লক্ষ্মী মা আমার কপালে একটু হাত বুলিয়ে দে। পরক্ষণেই সে চিৎকার করে বলে ওঠে, ঠাকুর তুমি বিচার করো। আমি বিচার চাই। চেতনা লুপ্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত সে একই কথা বার বার বলেই যায়।  তার সেই আর্তি ঠাকুরেরই মন্দিরে যেন গুমরে গুমরে ওঠে।কোন আদালতেই বিচার মেলে না। শুধু বিচারের প্রতীক্ষায় কেটে যায় কত দুসহ দিন , কত বিনিদ্র রাত। কালের বিচার সভায় অন্নপূর্ণাদের "বিচারের বানী নীরবে নিভৃতে কাঁদে"। 


             ( সমাপ্ত )

                         ---------------------------------------------০----------------------------------------

                                                           আমার কথা 

                   শেষ হলো ঠাকরুনমায়ের কাহিনী। ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত ঠাকরুনমা কারও ভালো লেগেছে , কারও বা বিরক্তি উৎপাদন করেছে। বিরক্তি লাগাটাই স্বাভাবিক। এতদিন ধরে কোন ধারাবাহিক পোষ্ট এর আগে হয়েছে কিনা জানা নেই। তাই সকলকেই ধন্যবাদ। যারা এতদিন সংগে থেকে নানাভাবে মতামত দিয়েছেন তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কারণ তাদের উৎসাহই আমাকে যত্নবান করেছে। কতটুকু পেরেছি তার বিচারের ভার আপনাদের। ধারাবাহিকভাবে পোষ্ট চলাকালীন অনেকেই ঠাকরুনমাকে একটু সুখী দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু বিধাতা পুরুষই যার কপালে সুখ লেখেন নি লেখনীতে তাকে সুখী করলে তা হত নিছকই কষ্টকল্পনা। সে আশ্রয় আমি নিতে চাইনি। তবু ভালো লেগেছে ঠাকরুনমায়ের প্রতি এই সহমর্মিতা। আমি মনে করি একটি রচনার সার্থকতা সেখানেই। 


                       আসলে ঠাকরুনমা আমার খুব কাছে থেকে দেখা একজন ভাগ্য বিরম্বিতা মানুষ। সারাটা জীবন যার লড়াইয়ে কেটেছে। তাই একে গল্প না বলে ঘটনা বলাই ভালো। এই ঘটনার অধিকাংশটাই সত্যি। এ গল্পের অনেক চরিত্র আজও জীবিত রয়েছেন। তাই গল্পের প্রয়োজনে কিছুটা  কল্পনার  আশ্রয় নিতে হয়েছে।কালের গর্ভে ঠাকরুনমায়ের কাহিনী হয়তো একদিন হারিয়ে যেত। তাই আমি তার কথা আপনাদের দরবারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আশাকরি আপনাদের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন ঠাকরুনমা।  ১৯৭৪ সালের কথা। তখন গ্রাম শাসন করতেন ইউনিয়ন বোর্ডের কর্তারা। মূলত জোতদার--জমিদার বাড়ির বংশধর তথা প্রভাবশালীরাই ইউনিয়ন বোর্ডের কর্তা মনোনীত হতেন।ইউনিয়ন বোর্ডের আওতায় একজন দফাদারের অধীনে থাকত কয়েকজন চৌকিদার।  এলাকারশান্তি রক্ষার দায়িত্ব পালন করত তারা। যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যার কারণেপুলিশের দেখা কমই মিলত। 


                    দফাদারেরাই থানার সংগে যোগসূত্র রক্ষা করে চলতেন। কালেভদ্রে দারোগা গ্রামে আসতে বাধ্য হলেও ইউনিয়ন বোর্ডের কর্তা কিম্বাপ্রভাবশালীদের বাড়িতে বসেই রিপোর্ট লিখে নিয়েই চলে যেতেন। অনেকক্ষেত্রে দেখাযেত ওইসব প্রভাবশালীই মূল অভিযুক্ত। দারোগার সংগে প্রভাবশালীদের এহেন দহরমেরসুবাদে দফাদার চৌকিদারেরা তাদের আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হত। সেই সুবাদেশান্তিরক্ষার ওইসব প্রাথমিক স্তম্ভকে দাঁড় করিয়ে রেখেই নানা দুস্কর্ম করে পারপেয়ে যেতেন দুস্কৃতিরা। এমনই এক পটভূমিতে খাজনা আদায় করতে গিয়ে এক দুঃস্থপ্রজার সুন্দরী মেয়েকে দেখে ছেলের বৌ করেন আনেন গ্রামের চার আনির জমিদার। কৃষকপরিবারের সেই মেয়েটিই জমিদারবাড়ির বৌঠান থেকে হয়ে ওঠেন ঠাকরুনমা। 

                                                                 পূর্ব আক্রোশের বশে তার স্বামীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হাজারো লোকের সামনে পিটিয়ে খুন করে গ্রামেরই প্রতিপক্ষ তিনআনির জমিদাররা। বিচার শেষে আদালতকক্ষের স্তব্ধতা খানখান করে ভেঙে দেয় বিধবা ঠাকুরুনমায়ের একটি মর্মস্পর্শীপ্রশ্ন। সেদিন সংবাদ মাধ্যমের তৎপড়তা ছিল না বললেই চলে। তাই অনেকেরই অজানাইথেকে যায় সেদিনের সেই ঘটনা। বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায় ঠাকরুনমায়ের জীবনযন্ত্রনা। শুধু সেদিনের একটি বালকের স্মৃতিতে আজও ধরা আছে সেই ছবি। বড়োদের সংগে সেও দিনভর জীবন্ত একটি মানুষকে নিস্তেজ হয়ে এলিয়ে পড়তে দেখেছিল। কত রাত সে ঘুমভেঙে ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরেছে। কতদিন যে বমি করেছে তার ঠিক নেই।সেদিনের সেই বালক পরে খুব কাছে থেকে দেখেছিল ঠাকরুন মায়ের জীবন যন্ত্রনা। সেদিনের সেই বালকের স্মৃতি থেকেই  ঠাকরুন মায়ের কথা।

               
          
                                  ------০------
         

No comments:

Post a Comment