Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

শহীদের মা - ১

                                     
                     
Add caption

  অর্ঘ্য ঘোষ
 

  ( প্রথম কিস্তি ) 


বিড়িতে সুতো জড়াতে জড়াতে কয়েক ফোটা চোখের জল কুলোর মশলার উপর পড়তেই সম্বিত ফেরে শহীদের মায়ের। শহীদের মা কথাটা কেমন যেন বিদ্রুপের মনে হোল জাহেদার।অথচ কথাটা যখন প্রথম শুনেছিল তখন তার সারা শরীরে কাঁটা ফুটে উঠেছিল। খাড়া হয়ে উঠেছিল প্রতিটি লোমকুপের লোমও। শব্দটার অর্থ সম্পর্কে অবশ্য সম্যক কোন ধারণা ছিল না তার। কিন্তু মুন্সীদের টিভিতে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান দেখে শব্দটা যে ভালো কিছু একটা বটে সেই ধারণাটুকু গড়ে উঠেছিল। তাছাড়া অত মান্যি গন্যি করা মানুষগুলো যখন বার বার কথাটা বলছে তখন তা কি আর খারাপ হতে পারে ?  নিজের মনকেই যেন জিজ্ঞাসাটা করে জাহেদা। ১৭ বছর আগে শোনা সেই কথাটা আজও যেন কানে বাজছে। কেউ বলছে , আম্মি তুমি তো শহীদের মা। সুরবান গিয়েছে তো কি হয়েছে। আজ থেকে আমরা সবাই তোমার পোলাপান। কেউ বা বলছে, আজ থেকে তুমিই আমাদের মা। তুমি যে শহীদের মা। সেদিন ওইসব কথা শুনে সব যেন কেমন সত্যি মনে হয়েছিল। শুধু অবাক লেগেছিল ওইসব সুবাস ছড়ানো চকচকে পোশাক পড়া মানুষগুলো তার সন্তান শুনে।  তার সুরবানের গায়ে সুবাস তো দুরের কথা নতুন পোশাক জোটে নি কোনদিন। পাঁচুন্দির হাট থেকে  ওর বাবার এনে দেওয়া ছেঁড়া ফাটা সেকেণ্ডহ্যাণ্ড পোশাক পড়েই তো কেটেছে। সেই সুরবানের মতো এই চকচকে পোশাকের লোকগুলো কি করে তার সন্তান হবে ?  


                                                   ওইসব  সাতপাঁচ কথা ভাবতে ভাবতেই জাহেদা ভুলে গিয়েছিল সামনেই সার দিয়ে শোয়ানো রয়েছে সাদা কাফনে ঢাকা ১১ টি মৃতদেহ। একের পর এক তাদের মুখের ঢাকা সরিয়ে পুলিশের লোকেরা জিজ্ঞেসা করে চলেছে  --- এইটা -- এইটা ? সে যে কি মানসিক চাপ তা আজও মনে আছে জাহেদার। একের পর এক নিহতদের মুখ দেখে না বোধক ঘাড় নাড়তে নাড়তে তার মনে হতে শুরু করেছিল তাহলে বোধহয় নিহতদের মধ্যে সুরবান নেই। জাহেদা শুনেছিল অনেকে পালিয়ে গিয়ে প্রান বাচিয়েছে। তার সুরবানও নিশ্চয় ওই দলে আছে সনাক্তকরণের জন্য যখন একটার পর একটা নিহতদের মুখের ঢাকা খোলা হচ্ছিল তখন আল্লার কাছে সেই প্রার্থনাই করছিল সে। ওইসব পলাতকদের তালিকাতেই যেন থাকে তার সুরবান। কিন্তু শেষ মৃতদেহের ঢাকাটা খুলতেই নিথর হয়ে যায় জাহেদা। ওই তো কেমন নিচিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে তার একমাত্র পুত্র সন্তান সুরবান হোসেন। সবে গোফের রেখা গজিয়েছে। গালে চিকন দাড়ি ঠোটের কোনে যেন তখনও লেগে রয়েছে মিলিয়ে যাওয়া হাসির রেশ। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না জাহেদা। ছেলের মুখটা নাড়াতে নাড়াতে ডুকরে কেঁদে ওঠে সে -- বাপজান  একবার আম্মা বলে ডাক। তুই যে বলে গেলি বাপ, চপ সানা দিয়ে পান্তা ভাত খাবি।আমি যে পান্তা ভাত করে রেখেছি ,লক্ষী বাপ আমার খেয়ে যা। 


                                                             ছেলের সেলাই করা মাথার খুলির ভিতর থেকে রক্তরস চুইয়ে ভিজিয়ে দেয় মায়ের হাত। মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় খেলতে গিয়ে কিম্বা হোচট খেয়ে সামান্য রক্ত ঝড়লে কেঁদে  সারা হত সুরবান। দুব্বো ঘাস কিম্বা গাঁদা ফুলের পাতা থেঁতলে ক্ষতস্থানে টিপে ধরে থাকতে হত জাহেদাকে। রক্ত পড়া বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কান্না থামত না সুরবানের।বেড়িয়ে যাওয়া রক্তের ঘাটতি পূরণ করতে ওর বাবা হাজার অভাব  স্বত্তেও পরদিন ছেলের জন্য গোস্ত আনতেন চাষাপাড়ার বাজার থেকে। আর সেই সুরবানের শরীরেই আজ আর একফোঁটাও রক্ত নেই। শুধু জলের মতো বের হছে রক্ত রস। তা দেখে আবার ডুকরে  কেঁদে উঠে জাহেদা।তাকে জড়িয়ে কাদে সুরবানের বাবা এবং বোনেরাও।তাদেরই মতো আরও ১১ টি পরিবারের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে বোলপুর মহকুমা হাসপাতালের মর্গের বাতাস। চেতনা লুপ্ত হওয়ার আগে জাহেদা টের পায় তাকে সুরবানের কাছে থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কয়েকটা সুগন্ধী পোশাক পড়া হাত। সদ্য সন্তান হারানো ক্ষতে তাদের  কথাগুলো কেমন যেন সান্তনার প্রলেপ দিচ্ছিল।তার কানে আজও যেন বাজে সেই কথাগুলি - কেঁদ না, তুমি আজ আর শুধু সুরবানের মা নও, তুমি আমাদেরও মা। তুমি এক সন্তানকে হারিয়েছো, কিন্তু চেয়ে দেখ আজ আমরা তোমার হাজারো সন্তান। তুমি যে শহীদের মা।
              

                                                          সন্ধ্যার মুখেই লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে গোটা  নাকোড়া গ্রাম। মৃতদেহগুলি ম্যাটাডোর ভর্তি করে গ্রামে ফিরিয়ে আনা হয়।শব  নিয়ে গ্রামে আসেন দলনেত্রী করুণাময়ী রায়,  সুকুল ব্যানার্জী ,বদন মুখার্জী  রণজয় মিত্ররা। সংগে ছিলেন বানীব্রত ব্যানার্জী,  সুভাশিস মণ্ডলের মতো জেলার নেতারাও।সংবাদ মাধ্যমের লোকেরাও ভীড় জমায়।  ভিড়টা মূলত ভেঙে পড়েছিল তাদের উঠোনেই। কারণ নিহতদের মধ্যে সুরবানই ছিল সবার ছোট। পরিবারের একমাত্র সক্ষম পুরুষ। পুরুষ কি তখন আদৌ হয়ে উঠেছিল সুরবান?  অর্থাভাবে ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে পারেনি জাহেদা। মেয়েরা ছাগল  গরু চড়ায়, ঘাস কাটে, জ্বালানী কুড়িয়ে আনে। আর খুন  হওয়ার কিছুদিন আগে পর্যন্ত গ্রামে গ্রামে হাঁসের পাখা, গরুর গোবাচি, প্লাস্টিকের জুতো ছেঁড়া কিনে বেড়িয়েছে সুরবান। সবে ছোট খাটো ঠিকার কাজ আর দিন মজুরী শুরু করেছিল। সেটাই যে ওর কাল হয়ে দাঁড়াবে তা ভাবতেও  পারে নি জাহেদা। সেই সুরবানের নিথর দেহ শোয়ানো  রয়েছে উঠোনের মাঝে। উঠোনে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই বললেই চলে।  নাকোড়া গ্রাম জুড়ে তখন কান্নার রোল। ১১ টি পরিবারে ১১ টি মৃতদেহ ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন পরিজনেরা। প্রতিবেশীরা পালাক্রমে এবাড়ি  - সেবাড়ি সান্তনা দিয়ে আসছেন। জাহেদাকেও জড়িয়ে ধরে রয়েছেন কয়েকজন। ছেলের মৃতদেহ জড়িয়ে নাগাড়ে কাঁদতে কাঁদতে তখন ঘন ঘন মুর্ছা যাচ্ছে মা। আবার চেতনা ফিরলে প্রতিবেশীদের জড়িয়ে ধরে বলে উঠেছে, ও হোসেনের আম্মা, সানোয়ারের খালা হ্যা গো এবার কি হবে ? কে দেখবে আমাদের ? 


                                                                      সন্ধ্যার অধো অন্ধকারের মধ্য জাহেদার ওই আকুতি ভরা প্রশ্ন সমস্ত কলরব ছাপিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে পরিবেশটাকে আরো যেন শোকবহ করে তোলে। প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দেয় , সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো। তাছাড়া আমরা তো আছি। একই আশ্বাস দেন পার্টির লোকেরাও। জাহেদা আজ ভেবে পায় না সেদিন সদ্য ছেলের হারানো শোকের মধ্যেও ওই কথাটা কি করে তার মনে এসেছিল? আসলে তখন কি আর মাথার ঠিক ছিল তার ! মাথায় মাথায় পাঁচ -- পাঁচটা মেয়ে। তার মধ্যে আবার ছোটটা প্রতিবন্ধী। বলের মতো চোখ ঠিকরে বেড়িয়ে আসছে প্রতিদিন। ডাক্তার অপারেশান করাতে বলেছেন। সে অনেক টাকার ব্যাপার। অত টাকা কোথাই তাদের ?চোখের জ্বালা কমাতে নিয়মিত একটা আইড্রপই কিনে দিতে পারে না মেয়েকে।  সুরবানের বাবাও চোখে ভালো দেখে না। তাই কেউ খুব একটা কাজেও ডাকে না তাকে। এক ছটাক জমি জিরেত নেই। থাকার মধ্যে এক কামরার খুপড়ি ঘর। তাতেই গরু- ছাগল,  হাঁস -- মুরগীর সংগে গাদাগাদি করে মাথা গুঁজে পশুর মতোই থাকা। তাদের সংসারে যে মানুষের থেকে ওইসব পশুদেরই যে দাম বেশি। ওইসব পশু থেকে সংসারে অনেক সুসার হয়। তারই মাঝে সুরবানই ধরেছিল সংসারের হালটা। সেই কথা মনে পড়তেই আবার ছেলের মৃতদেহ জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে জাহেদা। সেই সময় একটা কোমল হাতের ছোঁয়া অনুভব করে সে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন স্বয়ং করুণাময়ী রায়।  ততদিনে মুন্সীদের টিভির দৌলতে করুণাময়ী রায় জাহেদার কাছে পরিচিত মুখ। তাকে কাছে পেয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না সে। 

                                      করুণাময়ী রায়ের হাত দুটি জড়িয়ে ধরে সে বলে ওঠে, মা তুমিও ছুটে এসোছো আমাদের কাছে। করুণাদেবী বলেন , আসব না ?  হার্মাদরা আমার ১১ জন জোয়ান ভাইকে খুন করল আর আমি কি তোমাদের কাছে না এসে থাকতে পারি মা ? আমরা যতদিন থাকবে, আমাদের দল  যতদিন থাকবে ততদিন তুমি আমাদের কাছে শহীদের মা হয়েই থাকবে।কোনদিন কোন অমর্যাদা হতে দেব না মা তোমার।আর কোন কথা বলতে পারে না জাহেদা। কেমন যেন অন্যরকম দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে করুণাময়ীর  দিকে। এমন মিষ্টি কথা কেউ তো কোনদিন শোনেনি তারা। ওই কয়েকটি কথাই তাকে ছেলে হারানোর শোক কিছুটা সামলে ওঠার ক্ষমতা দেয়। আর তাকে একটু সামলে উঠতে দেখেই ঘিরে ধরে সাংবাদিকের দল। উড়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে প্রশ্ন। কেউ জানতে চায়, ছেলে কতদিন ধরে পার্টি করত ? সাতসকালে ৪ কিমি দুরের মাঠে সে কি করতে গিয়েছিল?  তাকে খুন করা হল কেন ? অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলেও মুখে কিছুই বলতে পারে না জাহেদা। কারণ দলেরই নেতা গ্রামের রানা সেখ হাসপাতালেই এক ফাঁকে তাকে পই পই করে কারও কাছে মুখ খুলতে বারণ করে দিয়েছে। তাকে সাংবাদিকদের ঘিরে ধরা দেখে ছুটে আসে রানা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে সে বলে, আপনার কি কসাই নাকি ? দেখছেন একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে মায়ের ওই অবস্থা , তারমধ্যেও  আপনারা এই রকম করছেন ? দলনেত্রী রয়েছেন , যা বলার তিনিই বলবেন। চলুন -- চলুন দিদির কাছে চলুন। এরপর তার কাছ থেকে সাংবাদিকদের তাড়িয়ে নিয়ে স্কুলের দিকে চলে যায় সে। সেখানে দলের নেতা নেত্রীরা ক্যাম্প করে রয়েছেন।

                                            কিছুক্ষণ পরেই রানা এসে তাকেও ডেকে নিয়ে স্কুলেরই একটা ঘরে। সেখানে তখন বসে রয়েছেন দলের নেতা নেত্রীরা। তাদের মধ্যে করুণাময়ী রায় বলেন,  শুনুন সংবাদ মাধ্যম আপনার সংগে আলাদা করে কথা বলতে চায়। আমরা বলেছি, সুরবান আমাদের পার্টি মেম্বার ছিল। সেইজন্য বিরোধী পার্টির লোকেদের ওর  উপর রাগ ছিল। সে আক্রোশে কাল যখন ও মুনিস খাটতে গিয়েছিল তখন ওরা তাকে পিটিয়ে মারে। আপনিও ঠিক এই কথাই বলবেন। কথাগুলো শুনে কেমন যেন 'থ' হয়ে যায় জাহেদা। পুরোটা না জানলেও ঘটনাটা যে পুরোপুরি তা নয় সেকথা অজানা নয় তার।  পার্টির লোকেদের মুখেই তো সে শুনেছে , উচপুরের এক জোতদারের জমি নিয়েই তো বিরোধ। জোতদারকে ভাগ না দিয়ে জমির ফসল নাকি লুটে পুটে খাচ্ছিল বর্গাদার আর শাসক দলের নেতারা।  জোতদার বর্গাদার হঠিয়ে জমি দখল মুক্ত করার জন্য ধরেছিলেন রানা সেখদের। মোটা টাকার বিনিময়ে জোতদারের সংগে জমি দখলমুক্ত করে দেওয়ার চুক্তি করেছিলেন রানা সেখরা। ওরাই তো কাল সন্ধ্যায় বাড়িতে এসে বলে গিয়েছিল , উঁচপুরে ঘণ্টা তিনেক করে জমিতে ধান পুতে দিলে নগদ ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। সেই লোভনীয় প্রস্তাব হাতছাড়া করে নি সুরবান। সারা দিনমান কাজ করেও যেখানে ১০০ টাকা রোজগার হয় না, সেখানে বোকা ছাড়া ওই প্রস্তাব কেউ বা ফেরাবে ? কিন্তু মাঠে গিয়েই মালুম হয় কি ভুল তারা করেছে। জমির দখল ধরে রাখতে শাসক দলও তখন মরীয়া তারই ফাঁকে অবাধে লুটপাট হয়ে যায় গ্রামে। আর ডাকাত বলে পিটিয়ে মারা হয় সুরবানদের। 


                                                    সুরবান পার্টি মেম্বার হবে কি করে ? ওর তো সবে গোঁফ গজালো। নেতাদের জমি দখলের অভিসন্ধির কথাও  বিন্দুবিসর্গ জানত না। অভাবের সংসারে দুটো বাড়তি টাকা আসবে বলেই ও ধান পুঁততে যেতে রাজী হয়েছিল। তখন তো আর জানা যায়নি তাদের জীবন বাজি রেখে কত মোটা টাকার দাও মেরেছিলেন নেতারা।জানলে কি আর জাহেদাই ওকে যেতে দিত ? ওইসব কথা ভেবেই রানার মুখের দিকে তাকায় সে। এখনও ছেলের মাটি হয় নি। মিথ্যা বলাটা কি ঠিক হবে ? সম্বিত ফেরে রানার কথায়। সে বলে , দিদি যা বলছেন সাংবাদিকদের কাছে তুমি তাইই বলবে। তাতে তোমাদের ভালোই হবে। অগ্যতা শেখানো বুলিই আঊরাতে হয় তাকে। এখন থেকে যে ওদের দয়াতেই বেঁচেবর্তে থাকতে হবে তাদের। সে যে ওদের দলের শহীদের মা। তাদের কথা কি ফেলতে পারে ? সাংবাদিকদের কথা শেষ হতেই তাকে জেরা শুরু করে পুলিশ। জাহেদা যতই শেখানো কথা বলে পুলিশেরাও তত তাকে উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে নাজেহাল করে তোলে। আর তাই দেখে থাকতে না পেরে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন করুণাময়ী। পুলিশকে ধমকে ওঠেন তিনি। রীতিমতো তেজের সংগে বলেন , আচ্ছা লোক তো মশাই আপনারা। আপনাদের বাড়িতেও কি মা--বাবা নেই ? দেখছেন সদ্য ছেলেকে হারিয়ে কথা বলার অবস্থায় নেই মানুষটা। আর আপনারা সমানে তাকে খুঁচিয়ে যাচ্ছেন।

                                                               এক অফিসার হাত কচলে কোন রকমে আমতা আমতা করে বলতে শুরু করেছিলেন, বোঝেনই তো ম্যাডাম এটা আমাদের রুটিন ডিউটি ---। কথা শেষ হয়না ওই পুলিশ কর্তার। ফের গর্জে ওঠেন করুণাময়ী --- আমাকে কিছু বোঝাতে আসবেন না। সব বুঝি আমি। ওনার যা বলার তা তো বলেই দিয়েছেন। কিন্তু ওই বয়ান কেন আপনাদের মনোপুত হচ্ছে না তা বুঝি না ভাবেন ? আসলে ওই বয়ানে কেস সাজালে আপনাদের রাজনৈতিক দাদারা যে বেজায় চটে যাবেন তাই না ?  তাই মনোমত কেস সাজাতে নিহতের পরিবারের লোকেদের দিয়ে আপনারা যা খুশী বলিয়ে নেবেন?  একটা কথা স্পষ্ট করে শুনে রাখুন,  আমার নামও করুণাময়ী। একটু বেচাল দেখলেই ঝেড়ে কাপড় পড়িয়ে ছেড়ে দেব। করুণাময়ীর কথার তোড়ে খেই হারিয়ে ফেলেন পুলিশ কর্তারা। আর কিছুটা থেমে করুণাময়ী সুকুলবাবুর উদ্দশ্যে বলে ওঠেন , সুকুলদা এদিকে আসুন তো। এইসব পুলিশ অফিসারদের নামগুলো ওদের জামার নেমপ্লেট দেখে নোট করে রাখুন। কলকাতায় গিয়ে আমায় দেবেন। কিছু লাভ হবে না জানি। তবু একবার বিধানসভার স্পিকারকে জানাব। কোন সাড়া পেলে ভালো, নাহলে দিল্লিতে সংসদে তুলোধোনা করে ছেড়ে দেব। করুণাময়ীর ওই রণংদেহী মুর্তি দেখে মাঝপথেই রণে ভঙ্গ দেন পুলিশ কর্তারা। ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ে জাহেদার। সে বোঝে, পুলিশও শক্তের ভক্ত নরমের যম।  যেভাবে একই কথা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করছিল তাতে খেই হারিয়ে কি বলতে কি বলে ফেলত তার ঠিক নেই !

                            তবে ওই ঘটনার পর করুণাময়ীর প্রতি আস্থা আরও বেড়ে যায় জাহেদার। একটি মেয়ের দাবরানি খেয়ে কেমন লেজ গুটিয়ে পালানোর পথ পায় না ষন্ডা মার্কা পুলিশ গুলোও। আর হবে নাই বা কেন?  করুণাময়ীর সংগেও এসেছে পুলিশের মতো পোশাক পড়া দু"গাড়ি ভর্তি নিরাপত্তারক্ষী। জাহেদা শুনেছে , করুণাময়ী নাকি মন্ত্রী। দেশে যেখানে যত ট্রেন চলে সবের মালিক নাকি ওই করুণাময়ী।সে ইশারা করলেই চালু ট্রেন থেকে যাবে, আবার থেমে থাকা ট্রেন চলতে শুরু করবে।সেই করুণাময়ীই তাকে মা বলে ডেকেছে।শহীদের মা বলেছে।কেমন যেন একটা চাপা গর্ব অনুভব করে জাহেদা।  পুলিশের লোকের চলে যেতেই শুরু হয়ে যায় মাটি দেওয়ার প্রস্তুতি।  সুগন্ধী দেওয়া জলে স্নান করানো হয় সুরবানকে। পড়ানো হয় নুতন পোশাক। কি সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। ছেলের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আক্ষেপ ঝড়ে পড়ে জাহেদার মনে। জীবিত অবস্থায় তো কোনদিন নতুন পোশাক পড়াতে পারে নি তাকে। পার্টির দৌলতে শেষ যাত্রায় তবুও জুটল এটুকুই যা সান্ত্বনা। কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয় সুরবানকে। কাঁদতে কাঁদতে যায় জাহেদাও।  সেখানে তখন একে একে আনা হচ্ছে অন্যান্য মৃতদেহ। কবরস্থানের পাশেই বাঁশবাগানে শুরু হয়েছে জানাজা নমাজের প্রস্তুতি শেষবারের মতো ছেলের কপালে চুম্বন একে দেয় জাহেদা।পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতেই বাঁধ ভাঙা  কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। প্রতিবেশীরা তাকে বাড়ির দিকে নিয়ে যায়। বাড়ি থেকেই শোনা যায় ---আলাহু আকবর, আলাহু আকবার। আশহাদু আললা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। জাহেদা বোঝে শেষ হলো জানাজার নমাজ। আর কিছুক্ষণের মধ্যে মাটির ভিতরে চলে যাবে তার সুরবান। শেষবারের মতো আর একটিবার যদি দেখে আসতে পারত তাকে। আর কোনদিন তো দেখা হবে না !

           ( ক্রমশ )


No comments:

Post a Comment