Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

শহীদের মা - ২


শহীদের মা 

     

 অর্ঘ্য ঘোষ 

 ( দ্বিতীয়  কিস্তি )



আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটির ভিতরে চলে যাবে তার সুরবান। শেষবারের মতো আর একটিবার যদি দেখে আসতে পারত তাকে। আর কোনদিন তো দেখা হবে না ! কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটি হয়ে যায়। গ্রামবাসী, আত্মীয় স্বজনদের পাশাপাশি কবরে মাটি দেন সুকুলবাবুরাও। মাটি দিতে আসা লোকদের খাওয়ার জন্য একত্রে স্কুলেই রান্নার ব্যবস্থা করে পার্টির লোকেরা। সমবেত শোক যেন পরিবারগুলিকে একদিনেই এক ছাতার নীচে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। খাওয়া দাওয়ার পর স্কুল চত্বরেই নিহতদের পরিবারের লোকেদের নিয়ে বসেন করুণাময়ী। কথায় কথায় জানা যায় , অন্যান্য পরিবারে দ্বিতীয় উপার্জনক্ষম ব্যক্তি থাকলে জাহেদার পরিবারে সুরবানই ছিল একমাত্র রোজগেরে। সবার কথা শোনার পর করুণাময়ী বলেন , আপনাদের কোন চিন্তা নেই। পার্টির জন্য আপনাদের পরিবারের লোকেদের প্রান গিয়েছে তাই আপনাদের পরিবারের দায়িত্ব আমাদের পার্টি নেবে।প্রতিটি পরিবারের ১ জনকে যোগ্যতা অনুযায়ী রেলে চাকরী দেওয়া হবে। অভিযুক্তরা যাতে উপযুক্ত সাজা পায় তার জন্যও যতদুর যেতে হয় পার্টি যাবে।নিহতেরা শহীদের মর্যাদা পাবেন। তাদের স্মৃতিতে তৈরি করা হবে শহীদবেদী। আর তাদের মৃত্যুর দিনটি প্রতিবছর শহীদ দিবস হিসাবে পালন করা হবে। করুণাময়ীর কথা শেষ হতেই কেউ কেউ শোকের আবহ ভুলে হাততালি দিয়ে ওঠেন। করুণাময়ী কটমট করে তাকাতেই তা আর সংক্রামিত হতে পারে না।

                       তারপরই পার্টির তরফে মৃত পরিবারগুলির হাতে কিছু করে টাকা তুলে দেন সুকুলবাবু। আর যাওয়ার আগে করুণাময়ী জাহেদাকে আলাদা করে ড়েকে আরও কিছু টাকা দিয়ে বলেন , কিছু চিন্তা করবেন না। আপনার কথা আমার মনে থাকবে। যতদিন রেলের চাকরিটা না হয় ততদিন যাতে আপনার কোন অসুবিধা না হয় তা দেখার জন্য রানাকে বলে গেলাম। আমিও খবরাখবর রাখব। আবার চোখে জল চলে আসে জাহেদার। করুনাময়ীর হাত দুটো জড়িয়ে সে কোন রকমে বলতে পারে, আল্লা তোমাকে আরও বড়ো করুক। তোমার আয় পয় বারুক ধন। আল্লা তোমাকে একদিন রানী করবে দেখো। জাহেদার হাত দুটো ধরে করুণাময়ী বলেন, সেই আর্শিবাদই করুন। একসময় হুটার বাজিয়ে একে একে গ্রাম ছাড়ে করুণাময়ীদের গাড়ির কনভয়। আর  তারপরই এক নিঝুম শুন্যতা গ্রাস করে নেয় গ্রামটাকে।বাড়ি ফেরার পথে নিহতের পরিবারের লোকেরা  করুণাময়ীকে নিয়েই আলোচনায় মেতে ওঠে। কেউ বলে, মেয়ে একখানা বটে বাপু। কেমন দেখলি কথার ঝাঁঝে পুলিশগুলোকেও চুপ করিয়ে দিল।কেউ বা বলে, নামের মতোই ওর শরীরেও মায়া -- মমতায় ভরা। নাহলে কেউ অতদুর থেকে ছুটে আসে। এই বাজারে এককথায় চাকরির ব্যবস্থা করে দেয় ? চাকরিটা পেলে আর আমাদের খাওয়া পড়ার কোন চিন্তা থাকবে না। জাহেদাই কেবল চুপ করে থাকে। সে মনে মনে ভাবে, কি বিচিত্র মানুষের মন। চাকরি পাওয়ার স্বপ্নে মশগুল এই মানুষগুলোকে দেখে কেউ বলবে ২৪ ঘন্টা আগেই তারা  সন্তান, স্বামী কিম্বা কোন প্রিয়জনকে হারিয়েছে। 


                         আসলে মানুষের শোকের আয়ু খুব কম। প্রথম যখন প্রিয়জনকে হারায় তখন মনে হয় বুঝি খাওয়া , দাওয়া, ঘুম সব ত্যাগ করে ফেলবে।কিন্তু শোকের তীব্রতা কমে আসে। স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে পরিবার।  একটা প্রজন্ম বড়োজোর ছবিতে মালা দেয়। পরের প্রজন্মে মাকড়সার জালে ঢাকা পড়ে যায় সেই ছবি। কখন যেন হারিয়ে যায় নামটাও। তাদের মতো পরিবারে শোকের অবকাশ তো আর কম। দুবেলা দুটি মোটা ভাত কাপড়ের জন্য যাদের বলদের মতো ঘানি ঘুরতে হয় তাদের শোক করার মতো সময় কোথাই ? পেট যে তাদের কাছে বড়ো বালাই।সারসত্যটা অনুভব করে জাহেদাও। সময় আস্তে আস্তে ভুলিয়ে দেয় শোক। পার্টির লোকেরা মাঝে মধ্যে খোঁজখবর নিয়ে যায়। তাদের কাছে থেকেই জাহেদারা জানতে পারে সেদিনের ঘটনায় নিহত এবং আহতদের জন্য রেলে ১৫ টি চাকরি বরাদ্দ করেছেন করুণাময়ী। শীঘ্রই চাকরি প্রাপকদের নাম পাঠাতে হবে। আশায় বুক বাঁধে জাহেদারা। শোকের রেশ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই চাষাপাড়া বাসস্ট্যান্ডে তৈরি হয় শহীদবেদী। সেখানে অন্যান্যদের মধ্যে লেখা হয় সুরবানের নামও। কোথাও যাওয়ার জন্য বাসস্ট্যান্ডে বাস গেলেই সেই নামের উপর হাত বোলায় জাহেদা। হাত বোলাতে বোলাতেই যেন সুরবানের স্পর্শ পায় সে। মনে হয় যেন বেদীর নীচেই ঘুমিয়ে আছে তার ছেলে।মনে মনে করুনাময়ীকে আরও একবার ধন্যবাদ জানায় জাহেদা।শহীদবেদী তৈরি না হলে এই অনুভূতির পরশ তো তার পাওয়া হত না ।দেখতে দেখতে বছর গড়িয়ে যায়। সহানুভুতির ছোঁওয়ায় এই কয়েকটা মাস বেশ কেটে যায়। কোন আচ লাগে না জাহেদাদের। কেবল মাঝে মধ্যে সুরবানের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখে অলক্ষ্যে চোখের জল ফেলে। খুব সাবধানে তাকে লুকিয়ে ফেলতে হয় চোখের জল।কারণ সুরবানের বাবা এমনিতেই শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে রয়েছে।ছেলের শোক উঠলে তার অবস্থা আরও খারাপ হবে। 

                          গত কয়েকদিন ধরেই এলাকায় সাজো সাজো রব। রাত পোহালেই শহীদ দিবস। চাষাপাড়ায় তারই জোর প্রস্তুতি। বাঁধা হয়েছে তোরণ। সেখানে সব শহীদের নাম লেখা।  মঞ্চেও টাঙানো হয়েছে তাদের ছবি। ফুল মালায় সাজানো হয়েছে শহীদবেদীও। অন্যান্য নেতাদের সংগে আসছেন খোদ করুণাময়ীও। সারা জেলা তো বটেই, সংলগ্ন বর্ধমান এবং মুর্শিবাদবাদ জেলা থেকেও লোক আসবে। সন্ধ্যার দিকে প্রতিটি শহীদ পরিবারে পৌঁচ্ছে যায় এক সেট করে নতুন পোশাক। রানা এসে বলে যায় , চাচী দিদি আপনাদের জন্য ওইসব কাপড় কিনে পাঠিয়ে দিয়েছেন। নতুন কাপড় পড়ে কাল আপনারা শহীদ সমাবেশে যাবেন। দিদি সবার সামনে যখন জিজ্ঞেস করেবেন, আপনারা কেমন আছেন , কোন অসুবিধা নেই তো ? তখন কি বলবেন ? জাহেদা বলে, যা সত্যি তাই বলব। তোমরা থাকতে আমরা খারাপ থাকব কেন , আর সমস্যাই বা থাকবে কেন। জাহেদার জবাব শুনে হাসি ফুটে ওঠে রানার মুখে। মনে মনে সে ভাবে , জাহেদাদের ওই কথা শুনে দিদি নিশ্চয় খুশী হবে। আর জন্য উপহার হিসাবে দলে কোন গুরুত্বপূর্ন জায়গা দেবেন। পরদিন সকাল থেকেই চাষাপাড়া বাজারে শুরু হয়ে যায় মানুষের আনাগোনা। বেলা যত গড়ায়, ততই মানুষের ঢল নামে। চাপা উত্তেজনা জাহেদাদের মনেও। একবছর পর আবার দেখা হবে করুণাময়ীর সংগে। সে কি আগের মতোই তাদের আপন করে কাছে টেনে নেবে ? নেবে নিশ্চয় ,  নাহলে সভায় পড়ে যাওয়ার জন্য কাপড় কিনে পাঠায় ? বাড়ি থেকেই  জাহেদা  শুনতে পায় মাইকের স্লোগান। সমবেত কন্ঠ যেন গর্জে উঠছে , উঁচপুরের মহান শহীদ আমরা তোমায় ভুলছি না ভুলব না। কখনও বা ভেসে আসছে গানের সুর -- ও শহীদের মা তুমি আর কেঁদো না। তোমার এক ছেলে গিয়েছে , ছেলে রয়েছি হাজার জনা।।

                               শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, চোখ জলে ভরে আসে জাহেদার। তাদের তো কেউ এতদিন মানুষই মনে করত না, সম্মান দেওয়া তো দুরের কথা। ছেলেটা নিজের প্রান দিয়ে তাদের সম্মানের আসনে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছে।  চোখের জল সামলে  তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে সে। স্নান খাওয়া করে নতুন কাপড় পড়ে তৈরি হয়। কাছেই সভাস্থল , হেটেই একসংগে চলে যাবে বলে সদর দরজার চৌকাঠে পা রাখতেই উর্ধশ্বাসে মোটর বাইক হাকিয়ে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় রানা। জাহেদার উদ্দেশ্যে সে বলে , দাঁড়ান  চাচী  দিদি ফোন করেছিলেন। উনি আপনাদের জন্য গাড়ী পাঠাচ্ছেন। সেই গাড়িতেই আপনারা সভায় যাবেন। বিস্মিত হয়ে যায় জাহেদা। এত ব্যস্ততার মধ্যেও করুণাময়ী তাদের কথা মনে রেখেছেন। ভাবতে ভাবতেই ধুলো উড়িয়ে গ্রামে ঢোকে পেল্লায় একটা গাড়ি। সেই গাড়িতেই জাহেদারা সভাস্থলে পৌঁছোয়। করুণাময়ীরা আগেই মঞ্চে পৌঁচ্ছে গিয়েছেন। সামনে শুধু কালো কালো মাথা। মাইকে তখন একে একে শহীদ হিসাবে ঘোষণা করা হচ্ছে সুরবানদের নাম। গাড়ি মঞ্চের কাছে পৌঁছোতেই মঞ্চ থেকে নেমে  আসেন স্বয়ং করুণাময়ী। একে একে হাত ধরে মঞ্চে নিয়ে যান জাহেদাদের। ছোট্ট মঞ্চ, সবার  স্থান সংকুলানের সমস্যা। তবু একেবারে সামনের সারিতে বসানো হয় ১১টি পরিবারের ১১ জন সদস্যকে। করুণাময়ী সামনে এসে কাউকে পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম , কাউকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কারও বা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করেন , কি আপনারা সবাই ভালো আছেন তো ? কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো ? করুণাময়ীর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে যায় জাহেদারা। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন সবাই।কোন রকমে বলতে পারেন, মাথার উপর আপনি আছেন।আমাদের আর অসুবিধা কিসের ?  জাহেদাদের কথা শেষ হয়না। মাঝপথেই করুণাময়ী বলে ওঠেন , ছি ছি এমন ভাবে বলবেন না। আমি আপনার মাথায় থাকতে পারি ? বলুন আপনাদের আর্শিবাদের হাত আমার মাথায় আছে বলেই পাশে থাকতে পারছি।


করুণাময়ীকে যত দেখছে তত অবাক হয়ে যাচ্ছে জাহেদারা। ক্ষনেকে আপন করে নেওয়ার মতো কি অমায়িক ব্যবহার। কোথাও এতটুকু অহংবোধ নেই। সভার শুরুতেই একে একে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন করুণাময়ী। তারপর মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলেন  -- কি বন্ধুরা যারা আমাদের দল করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন তাদের আমরা কোনদিন ভুলে যাব না তো ? উদ্বেলিত জনতা সমস্বরে বলে ওঠে --- না, জীবন থাকতে নয়।  ফের করুণাময়ী প্রশ্ন ছুড়ে দেন -- যারা আমাদের ১১ জন কর্মীকে নৃশংসভাবে খুন করল তাদের কি এরপরও আপনারা ক্ষমতায় বসিয়ে রাখবেন ?  জনতা গর্জে ওঠে -- না, কিছুতেই না। সামনের নির্বাচনে ওদের আমরা গদি ছাড়া করে ছাড়ব।ঠিক তো ? শহীদের মায়ের কসম খেয়ে বলুন -- করুণাময়ীর প্রশ্নে আবার গর্জায় জনতা, হ্যা, কসম খেয়ে বলছি ওদের গদিচ্যুত করতে আমরা জান লড়িয়ে দেব।সভার শেষ মুহুর্তে করুণাময়ী ঘোষণা করেন -- শুনুন সবাই , উঁচপুর কান্ডে নিহত এবং আহতদের জন্য রেলে ১৫ টি চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। শীঘ্রই নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে। তারপরই মঞ্চে ডেকে নেন রানাকে। জাহেদাদের দেখিয়ে বলেন, দেখ ওদের যেন কোন সমস্যা না হয়। কথা শেষ হতেই হাত নাড়তে নাড়তে কনভয়ের দিকে এগিয়ে যান তিনি। আর সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কোথাই যেন হারিয়ে যায় জাহেদারা।

                                       সময়ের সংগে সংগে কমতে থাকে শোকের তীব্রতা। কমতে থাকে সহমর্মিতা, সহানুভুতিও। অন্যান্য পরিবারগুলির অবস্থা ততটা করুণ নয়। কারণ তাদের পরিবারে আরও উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রয়েছে। কিন্তু জাহেদার তো তা নেই। বরং চাপটা আরও বেশি। সাতটা পেট, তার মধ্যে সুরবানের বাবা বিনা চিকিৎসায় বিছানায় পড়ে রয়েছে। প্রতিবন্ধী ছোট মেয়েটার অবস্থাও শোচনীয়। পার্টি থেকে যা সাহার্য্য করে তাতে সবদিক সামাল দেওয়া যায় না। সহানুভুতিসম্পন্ন মানুষেরাও হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। কাউকে কিছু বলতেও পারে না। কেমন যেন ইতস্তত লাগে। জাহেদা জানে, সব চাহিদা দীর্ঘদিন কেউ পূরণ করতে পারে না। তাই বেঁচেবর্তে  থাকার শুরু লড়াই হয় জাহেদার। গোপনে সে দুর - দুরান্তের গ্রামে ভিক্ষা করা শুরু করে। বিড়ি বাঁধা আর কাথাস্টিচের কাজও করে সে। মেয়েরাও হাত লাগায় সেই কাজে। পেটের ভাতের চেয়েও জাহেদার মাথায় রয়েছে মেয়ের বিয়ের দুশ্চিন্তা। তার মধ্যে দুটিকে এবারে পার না করলেই নয়। কিন্তু কে করবে তার মেয়েদের বিয়ে ? মেয়ের বিয়ে দেওয়ার মতো টাকা কোথাই তাদের ?  তবু চেনাশোনা যাকেই পায় মেয়ের বিয়ের কথা বলে। বলে রানা এবং পার্টির অন্যান্য নেতাদেরও। সবাই আশ্বাস দেয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। এই পরিস্থিতেতে জাহেদা রেলের চাকরীটার অপেক্ষায় থাকে। চাকরীটা পেলে তাদের সুদিন ফিরবে বলে মনে করে সে।  বাড়িতে বিয়ের যোগ্য মেয়ে থাকলে যে সামাজিক চাপ থাকে তা থেকে রেহাই মেলে না জাহেদারও। 

                                                           গ্রামের লোক বিশেষ করে যাদের যুবক ছেলে রয়েছে তারা প্রায়ই বাড়ি বয়ে এসে নানা উপদেশ দিয়ে যায়। কেউ কেউ অকথা - কুকথা বলে, কুইংগিত দেয়।  এক বছরেরই মধ্যেই সবাই কেমন ভুলে যায় সে শহীদের মা। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তাদের দিনই চলে না মেয়ের বিয়ে দেবে কি করে ? জাহেদা বুঝে যায় মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে কেউ কিছু করবে না , যা করার তা নিজেকেই করতে হবে। কিন্তু করবেই বা কি, তা ভেবে পায় না সে। একমাত্র কলকাতা কিম্বা বিহার পাঠানো ছাড়া তো অন্য কোন পথ খুঁজে পায় না  জাহেদা।  গ্রামাঞ্চলে যাদের বিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য থাকে না তারা মেয়েকে কলকাতা কিম্বা বিহার পাঠায়।  উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকাকেই গ্রামের মানুষ বিহার হিসাবে চেনেন। ওই ব্যবস্থায় সংসারের কিছুটা সুসারও হয়।কলকাতার পতিতাপল্লী  থেকে মেয়েরা টাকা পাঠায়।আর বিহার তথা উত্তরপ্রদেশ থেকে বাপের বয়সী লোকেরা সব বাড়ির লোকেদের কিছুটাকা দিয়ে বিয়ে করে নিয়ে যায়। আসলে বিয়ের নামে বলি দেওয়া হয় ওইসব মেয়েদের। কারণ পরবর্তীকালে ওইসব মেয়েদের আর কোন খোঁজ মেলে না।কিছুদিন নিজের কাছে রেখে পতিতাপল্লীতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। গ্রামেই এমন ঘটনা অনেক আছে। সব জানে জাহেদা। কিন্তু পাড়া প্রতিবেশীদের কথার জ্বালায় বড়ো দুই মেয়েকে বিহারে পাঠানোরই সিদ্ধান্ত নেই সে।অসহায় জাহেদার সামনে যে আর ভিন্ন পথ নেই। সেই জন্য পাশের গ্রামের কুরবান সেখকে খবর পাঠায়। 

                                             কুরবানও তার দুই মেয়েকে বিহারে পাঠিয়েছে । সেই সূত্রে এখন আড়কাঠির কাজ করে। মেয়েদের মাধ্যমে সে যোগাযোগ করে অসহায় দুঃস্থ পরিবারের মেয়েদের বিয়ের নামে বাইরে পাচারের ব্যবস্থা করে। তাতে মেয়ের পরিবারকে কিছু টাকা দেওয়ার পরও মোটা কমিশন মেলে তার। বিকালের দিকে বাড়িতে আসে কুরবান। জানিয়ে যায় শীঘ্রই দুজন পাত্রকে নিয়ে আসবে।বায়না হিসাবে বিয়ের খরচ বাবদ কিছু টাকাও অগ্রিমও দিয়ে যায় । মেয়েদের সামনেই সব কথাবার্তা হয় , তাই তাদের কিছু জানতে বাকি থাকে না। বড়ো দুই মেয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারে না জাহেদা। হঠাৎ তাদের মুখ যেন কেমন ভাবলেশহীন হয়ে যায়। কেমন যেন অচেনা মনে হয় তাদের। নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হয় জাহেদার। গরু--ছাগলের মতো মেয়েদের বিক্রির জন্য বায়না নিল সে ? চোখের জল লুকোতে চুপিচুপি রান্না চালায় ঢুকে যায় অসহায় জাহেদা।  কিন্তু চোখের জল ধরে রাখতে কি পারে? হোক না অভাবের সংসার , দশ মাস দশ দিন সে তো গর্ভে ধারণ করেছে। নিজে না খেয়ে ওদের খাইয়ে বড়ো করেছে। চিরদদিনের  জন্য কোথাই হারিয়ে যাবে জেনেও ওদের বিহারেই পাঠাতে হচ্ছে তাকে।মায়ের এই দোলাচল অবস্থা চোখ এড়ায় না মেয়েদের। তারাও কাছে গিয়ে  জড়িয়ে ধরে মাকে। বড়ো দুই মেয়ে বলে, তুমি এত ভাবছ কেন, আমাদের ভাগ্যে যা আছে তা হবে।যাই হোক না কেন, দুবেলা দুমুঠো খেতে তো পাবো। সবাই না খেয়ে মরার থেকে তো ভালো। ওরা যা টাকা দেবে তা দিয়ে বাবার আর ছোটোর চিকিৎসাটা হবে। চাকরিটা না পাওয়া পর্যন্ত সংসারটাও কিছুদিন চলবে। 


                                    নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না জাহেদা। মেয়েদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। মা -- মেয়ের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। কেউ কোন কথা বলতে পারে না। জাহেদা কেবল মনে মনে বলে, কেন তোরা আমাদের অভাবের সংসারে এসেছিলি মা। মা -- বাবার কোন দায়িত্বই তো আমরা পালন করতে পারি নি। এখন বিয়ের নামে তোদের বিক্রি করে দিতে হচ্ছে মা। বুক ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু উপায় তো কিছু নেই বল ! পেটে গামছা বেধেও তো দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারতাম।কাউকে তো ওরা খাবার চায়নি। কারোর ছেলের মাথাও চিবিয়ে খায় নি। তাহলে আমার ঘরে আইবুড়ো মেয়ে থাকলে ওদের এত গায়ের জ্বালা কেন ? কখন চোখের জল শুকিয়ে আসে কেউ টের পায় না। সেদিন আর মুখে কেউ কিছু তুলতেও পারে না। প্রতিবন্ধী মেয়েটাও যেন আন্দাজে সব বুঝে যায়। খালি পেটেই একসময় মাটিতেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। ঘুমোতে পারে না কেবল জাহেদা আর তার দুই বড়ো মেয়ে। নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে রাত কখন ভোর হয়ে যায় টের পায় না জাহেদা। রুকসানা আর সোনালীরা তাদের পরিনতির কথা ভেবে দুচোখের পাতা এক করতনপারে না।  কয়েকদিন পরই মধ্য বয়স্ক দুজন লোককে নিয়ে হাজির হয় কুরবান। তারাই পাত্র। দুই মেয়েকে দেখে কুরবানকে পাশে ডেকে তারা ঠিক করে নেয় কাকে কার পছন্দ। সেই মতো দাম দরও হয়।  মানুষ নয়, হাটে যেন গরু ছাগল কেনা হচ্ছে বলে মনে হয় জাহেদার। কিছুক্ষণ পর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ওরা কুরবানের হাতে বেশ কিছু টাকা তুলে দেয়। তা থেকে নিজের কমিশন আর বায়নার টাকা কেটে বাকিটা তুলে ধরে জাহেদার দিকে। জাহেদার হাত যেন তখন পক্ষঘাত।

           ( ক্রমশ  )


No comments:

Post a Comment