Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

শহীদের মা - ৩

 

    শহীদের মা 

           

    

   অর্ঘ্য ঘোষ 


     ( তৃতীয় কিস্তি )



তা থেকে নিজের কমিশন আর বায়নার টাকা কেটে বাকিটা তুলে ধরে জাহেদার দিকে। জাহেদার হাত তখন যেন পক্ষঘাত। কিছুতেই টাকা হাতে করতে পারে না। মনে মনে ভাবে, বিয়ে নিয়ে কত জায়গায় 
তো কত অঘটনের কথা শুনেছে। কলকাতায় পতিতাপল্লী যাওয়া কথা শুনে কত মেয়েকে গ্রামের সহৃদয় ছেলে এগিয়ে গিয়ে বিয়ে করছে।বিহারে বিয়ের ক্ষেত্রেও আসরে গিয়ে গ্রামের ছেলেদের বিয়ের কথাও শুনেছে। জাহেদা ভাবে তার মেয়েদের ক্ষেত্রেও কি তেমন কোন অঘটন ঘটতে পারে না ?  ঘটবে কি করে, তার যে পোড়া কপাল। নাহলে শহীদের মা হয়ে মেয়েকে বিয়ের নামে বলি দিতে হয় ?  না, তার ক্ষেত্রে সে রকম কেউ এগিয়ে আসে না। বরং কুরবানের টাকা ভর্তি বাড়ানো হাত দেখে প্রতিবেশীরা কৌতুহলে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করে। গুজ-গুজ, ফিস-ফাস ছাপিয়ে স্পষ্ট হয় তাদের কণ্ঠস্বর।  তারই মধ্যেই পাশের বাড়ির আমিনার কথাটাই যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো যন্ত্রনাদায়ক হয়ে ওঠে। আমিনা যেন তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই বলে, আজকালকার দিনে বাড়িতে একপাল মেয়ে থাকাও ভালো। কেমন মোটা টাকা পাওয়া যায় গো। এবার খাও কেন পায়ের উপর পা তুলে। আর আমিনাদের আলোচনার খোরাক হতে পারে না জাহেদা। কুরবানের হাত থেকে টাকা কটা নিয়ে সটান ঢুকে যায় ঘরে। সেখানে তখন রুকসানা আর সোনালী বিয়ের পোশাক পড়ে তৈরি। তাদের দিকে বেশীক্ষণ চেয়ে থাকতে পারে না। কোনরকমে নমো নমো করে বিয়ে হয়ে যায়। এবার তাদের বিদায় দিতে হবে। 

                             মা মেয়ে কেউউ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। মেয়েরা শেষবারের মতো ঘুরে ফিরে দেখে নেয় বাড়ির চারপাশ। এতদিন ধরে যে ছাগল গরুগুলো তারা চড়িয়েছে সেগুলির গায়ে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেয়। গবাদি পশুগুলিও তাদের শরীর চেটে আনুগত্য প্রকাশ করে। বাবার কাছে বিদায় নিয়ে , ছোটবোনগুলোকে  আদর করে দুইবোন। দুরে দাঁড়িয়ে এসব দেখতে দেখতে বিরক্তি প্রকাশ করে মধ্যবয়স্ক লোক দুজন। তাদের চোখমুখে কেমন যেন লালসার আগুন। তা দেখে অজানা আশংকায় শিউরে উঠে দুই বোন। জানে না তাদের নিয়ে গিয়ে কোথাই তুলবে ওরা। হিন্দি ভাষাও তো জানে না। নিজেদের পরিনতির কথা আর ভাবতে পারে না ওরা। শুধু বহু বছর আগে পাথরচাপুড়ীর মেলাতে সবার সংগে তোলা ছবি ১ টি করে নিয়ে চৌকাঠের বাইরে পা রাখে ওরা। ওইটুকুই তো তাদের কাছে আমৃত্যু নাড়ীর সংগে যোগসূত্র হয়ে থাকবে।  সেই সময় জাহেদা এসে কুরবানের থেকে পাওয়া টাকা কিছু করে দুই মেয়ের হাতে তুলে দিতে যায়। দুজনেই হাত সরিয়ে নেয়। দুই মেয়ের  গলা জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে মা। কান্নার দমকে কারও কথাই স্পষ্ট হয়না। তারই মধ্যে নিজেকে সামলে জাহেদা বলে, টাকা কটা রাখো ধন। ভিন জায়গায় কখন কি দরকারে লাগে বলা যায় না। আল্লায় করে তোমারা যেন সুখী হয়ো মা। আর পরজন্মে যেন তোমরা  আমার পেটে এসো না মা। বড়োলোকের ম্যাইয়ার পেটে এসো। বলে দুই মেয়ের আঁচলে টাকাগুলো বেঁধে দিয়ে কপালে চুমু খেয়ে ছুটে ঘরে ঢুকে কান্নায় লুটিয়ে পড়ে জাহেদা। মেয়েরা একে একে গিয়ে উঠে বসে ভটভটিতে। ভটভটি স্টার্ট করার শব্দ শুনে দরজায় এসে দাঁড়ায় জাহেদা। গ্রামের রাস্তায় ভটভটি যত এগিয়ে যায় মেয়েদের সংগে ততই দুরত্ব বাড়ে তার। মেয়েরা মিলেয়ে যাওয়ার আগেই ঝাপসা হয়ে যায় শহীদের মায়ের চোখ।
           
                                       
                                                 কয়েকদিন ধরেই জাহেদার কোন কাজে মন বসে না। কেবলই মনে পড়ে রুকসানা আর সোনালীর কথা। মনকে মাঝে মধ্যে প্রবোধ দিয়ে সান্তনা খোঁজার চেষ্টা করে। যেখানেই থাকুক, যেমনই থাকুক প্রানে বেঁচে তো আছে। সুরবানের মতো পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে তো হয়নি। ওইভাবেই দিন কেটে যায়। সময় এক আশ্চর্য মলম। ছেলে হারানোর মতোই মেয়ে হারানোর জ্বালা কিছুটা ভুলিয়ে রাখে জাহেদাকে। মেয়েদের বিহার পাঠানোর জন্য পাওয়া টাকায় স্বামী আর ছোট মেয়ে রেশমীর চিকিৎসার তোড়জোড় শুরু করে সে। কিন্তু তার ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে যায়। একদিন রাতে হঠাৎ বুকের ব্যথা ওঠে দিলসাদের। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই হার্টফেল করে মৃত্যু হয় তার। স্বামীর মৃত্যুতে যেন আকাশ ভেঙে পড়ে জাহেদার মাথায়। অক্ষম হোক, শয্যাশায়ী হোক মাথার উপর পুরুষ মানুষ বলতে একমাত্র স্বামীই ছিল। তিনটি মেয়েকে নিয়ে এবার কি করবে সে ভেবে পায় না।  একের পর এক আঘাতে ভিতরে ভিতরে চূর্ণ হয়ে যায় জাহেদা।কিন্তু কাদারও সময় পায় না। টাকা-- পয়সা দিতে হবে বলে পার্টির অনেকেই আর তাদের খবরাখবর রাখে না। তাই মেয়েদের নিয়েই স্বামীর পারলৌকিক কাজের ব্যবস্থা করতে নেমে পড়তে হয় তাকে। আত্মীয়দের খবর পাঠানো , চাষাপাড়ার বাজার কাফনের কাপড় কিনে আনা, মাটি দিতে আসা লোকজনের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা তাকেই একে তাকে ধরে করতে হয়। শেষ বেলায় যখন নতুন কাপড় পড়িয়ে স্বামীকে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। স্বামীর বুকে আছড়ে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতে বলে , তুমিও আমাকে ফেলে চলে গেলে সুরবানের বাপ। এখন আমি মেয়েদের নিয়ে কি করে থাকব বলে যাও। কান্না আর কিছুতেই থামতে চায় না। শেষে মেয়েরা তুলে নিয়ে যায় মাকে।


                                               অনাড়ম্বর ভাবেই মাটি হয়ে যায় দিলসাদের। তাতেই স্বামী আর রেশমির চিকিৎসার জন্য  রাখা সব টাকাই খরচ হয়ে যায়। রেশমির চিকিৎসা আর হয় না। অথচ প্রতিদিন কিছুটা করে ঠিকরে বেড়িয়ে আসছে চোখ। তার দিকে তাকালেই ভয় করে। এই বুঝে খুলে পড়ে যাবে চোখ দুটি। কি করবে কিছু ভেবে পায় না জাহেদা। তারই মধ্যে একদিন পাশের গ্রাম ধুপছায়া গ্রামের একটি ছেলের সংগে বাড়ি ছাড়ে সেজ মেয়ে দিলরুবা। কিছুটা অবাক হলেও মনে মনে যেন স্বস্তিই পায় জাহেদা। পড়শিদের চাপে রুকসানাদের মতো তাকে তো আর বিহারে পাঠাতে হবে না। যেমনই থাকুক চোখের দেখা তো দেখতে পাবে। তার উপরে একটা পেট তো কমল। পরক্ষণেই নিজের ভাবনায় চমকে যায় সে। নিজের মেয়ের পেটটাই বড়ো হলো তার কাছে। হায় আল্লা এ কি ভাবনার জন্ম দিলে তুমি আমার মনে -- আক্ষেপ ঝড়ে পড়ে তার গলায়। চতুর্থ মেয়ে শাহানারাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন -- হ্যারে দিলরুবার ব্যাপারে তুই কিছু জানতিস। আমতা আমতা করে শাহানারা। কিরে কিছু বল -- মেয়েকে তাড়া লাগায় মা। শাহানারা বলে, সব জানতাম কিন্তু ওকেও যদি বিহারে পাঠিয়ে দাও তাই কিছু বলি নি তোমাকে। কোন কথা সরে না জাহেদার মুখে। চোখে জল চলে আসে। তা দেখে মাকে জড়িয়ে ধরে শাহানারা বলে, মা আমাকে যেন বিহারে পাঠিও না, তাহলে আমি মরে যাব। মেয়েকে জড়িয়ে কেঁদে ওঠে জাহেদাও। বলে, নারে আর কাউকেই বিহারে পাঠাব না। দরকার হলে সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে যাব। মাকে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে মেয়ে। মেয়ের গালে কপালে চুমু খায় জাহেদা। চালের ফুটো দিয়ে তাদের উপর সূর্যের ছটা পড়ে যেন এক মায়ালোক সৃষ্টি করে।
                

                                                 কেমন যেন বিষন্ন দেখায় জাহেদাকে।একে একে পরিবারের সদস্যা সংখ্যা কমতে কমতে এখন মাত্র তিনটি প্রাণী তারা। বছর খানেকের মধ্যেই কত পরিবর্তন ঘটে গেল। স্বাছল্য বলতে যা বোঝাই তা কোনদিনই ছিল না তার সংসারে। বরং নিত্য অভাবের হা মুখ গিলতে আসত। তবু তাকে ঘিরে একটা বৃত্তে আবর্তিত হত সব কিছু মেয়েগুলোকে তো কোনদিনই স্কুলে পাঠাতে পারে নি। সুরবান কিছুদিন স্কুলে যাওয়া আসা করলেও প্রাথমিকের গন্ডী টপকানো হয়নি তারও।  তার আগেই অভাবের তাড়নায় স্কুল ছেড়ে দিয়ে গ্রামে গ্রামে মাথার ছেঁড়া চুল, প্ল্যাস্টিকের জুতো ছেঁড়া কেনা বেচার ব্যবসা ধরতে হয় তাকে। ওইটুকু বয়েসেই রোজগার করতে শুরু করেছিল সুরবান। ওর বাবাই ব্যবস্যাটা করে দিয়েছিল। কারণ নিজের দিনমজুরীর আয়ে আর সবদিক সামল দিতে পারছিল না সে। বাবা ছেলে যা আয় করত তা এসে তুলে দিত তার হাতে। টিপে টিপে  খরচ করে টাকা জমাত জাহেদা। সেই টাকা দিয়েই প্রথমে হাস-মুরগী, তা থেকে ছাগল-ভেড়া এবং শেষে এক জোড়া বলদও কেনা হয়েছিল। মেয়েরা কখনো পুকুর থেকে গুগলি তুলে, কখনও বা মাঠ থেকে ঝড়ে পড়া ধানের শিস কুড়িয়ে হাঁস--মুরগীর খাবার যোগাড় করত। মাঠে মাঠে ছাগল গরু চড়াত। আজ একে একে সব মনে পড়ে যাচ্ছে জাহেদার। সোনালীটা খুউব অমনোযোগী  ছিল।একবার মাঠে ছাগল চড়াতে গিয়ে অবস্থাপন্ন পরিবারের ছেলে মেয়ের সঙ্গে খেলায় মেতে গিয়েছিল। সেই ফাঁকে জমিতে ফসল খেয়েছিল বলে মিয়াঁরা চারটে ছাগল খোঁয়াড়ে দিয়েছিল। সোনালী হাতে পায়ে ধরে অনেক কাকুতি মিনতি করেছিল তাও শোনে নি মিয়াঁরা। ছাগল ছাড়াতে ২০ টাকা জরিমানা লেগেছিল। রাগে সোনালীর পিঠে চেলা কাঠের বাড়ি দিয়ে  জাহেদা বলেছিল, আজ তোর খাওয়া বন্ধ। কাঁদতে কাঁদত সোনালী সেই যে বিছানা নিয়েছিল সেদিন আর ডেকেও ওকে খাওয়ানো যায় নি। খেতে পারে নি জাহেদাও। 


                                                         সেদিনের কথা মনে পড়তেই চোখে জল আসে তার। সেদিন অভাবের সংসার থেকে ২০ টাকা জরিমানা দিতে হয়েছিল বলে রাগে মাথার ঠিক ছিল না। তাই ওড় গায়ে হাত তুলেছিল। আজ অনুভব করে, সেদিন কাজটা ঠিক করেনি সে।  তখন কতই বয়স ওর ? সোনালী শৈশবের হাতছানি উপেক্ষা করবে কেমন করে? ওরা তো আর জানে না স্বপ্নমাখা শৈশব তাদের জন্য নয়। তাদের শৈশব তো গ্রাস করে নিয়েছে অভাবের যাঁতাকল। সংসারে নিত্য অভাব ছিল, তবু যেন অন্য ভালো লাগাও ছিল। দিনের বেলা না হলেও রাতের বেলা সবাই গোল হয়ে উঠোনে খেতে বসত। জাহেদা বেড়ে দিত সবাইকে। খেতে খেতে কত গল্প হতো।বৃষ্টি বাদলার দিনে খিঁচুড়ি করত জাহেদা।  রুকসানা আর সোনালী খুউব খিচুড়ি ভালোবাসত।বার বার চেয়ে  চেয়ে নিত। এখন আর খিচুড়ি রান্না করে না জাহেদা। মেয়ে দুটোর কথা বড্ড মনে পড়ে তার। দুঃখের মধ্যেই সুখের খবর আসে। নিমেষে যেন গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে ১১ টি শহীদ পরিবার। নেতাদের মাধ্যমে তারা জানতে পারে রেলের চাকরি পাকা হয়ে গিয়েছে। কাগজপত্র নিয়ে শীঘ্রই যোগ দিতে যেতে হবে। সেইসব কাগজপত্র জমা করার জন্য নেতারা সব পৌঁছোন নিহতদের বাড়ি বাড়ি। কাগজপত্র জমাও করে নেয় তারা। সন্ধ্যার মুখে জাহেদার কাছেও আসে রানা আর আব্দুল মালেক। রানা বলে , একটা কথা ছিল চাচী। চাকরি তো আপনার বাঁধা। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকায় জাহেদা -- কি বলতে চায় ওরা ? এবার মালেক কথা শুরু করে , কিন্তু আপনার যা বয়েস তাতে কদিনই বা আর আপনি চাকরি করবেন ? আপনার বয়স ৫৭ চলছে। ৩ বছরেই চাকরি খতম হয়ে যাবে। পেনশন পাবেন বলেও মনে হয় না।    
---  তাহলে ? জাহেদা জিজ্ঞাসা করে।
রানা বলে, সেই নিয়ে আলোনা করব বলেই তো এসেছি।
 আচ্ছা চাকরিটা শাহানারার হয় না ? -- জাহেদা জানতে চায়।
না , মেয়েকে চাকরি দেওয়ার নিয়ম নেই -- মালেক বলে।  
 তাহলে উপায় ? --- উদ্বেগ ঝড়ে পড়ে জাহেদার গলায়। 
 রানা জানায় , উপায় আমরা একটা ভেবেছি। একসংগে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে  যাবে।
কি রকম --- আগ্রহী দেখায় জাহেদাকে।


                                                      খোলসা করে রানা, ধুপসড়ার সালিম মিয়াঁর ছেলে আনোয়ার এবার বিয়ে পাশ করল। আপনি যদি ওকে নমিনী হিসাবে মানেন তাহলে চাকরিটা ও পেয়ে যাবে। শিক্ষিত বলে উঁচু পদও পাবে। আর চাকরিটা পেলে ও শাহানারাকে বিয়ে করে আপনাদের সংগেই ঘর জামাই হিসাবে থাকতে রাজী হয়েছে। এই প্রস্তাবে রাজী হলে সব দিক রক্ষা হয়। এখন ভেবে বলুন কি করবেন ? প্রস্তাবটা মনোপুত হয় জাহেদার। আবার মনে সংশয়ও দেখা দেয়। সালিম মিয়াদের অবস্থাপন্ন পরিবার একমাত্র ছেলে, দেখতে শুনতেও ভালো। তার মেয়ের সংগে বিয়ে হলে ভালোই মানাবে। ছোট মেয়ে জুবেদা আর তার দায়িত্ব নিলেই হবে। সে'ই বা আর কতদিন বাঁচবে?  ছোটটারও যা অবস্থা, সেও বেশিদিন বাঁচবে বলে মনে হয় না তারপর তো সব ওদেরই হবে। কিন্তু সালিম মিয়াঁ কি তার মেয়ের সংগে ছেলের বিয়ে দিতে রাজী হবে ?    প্রশ্নটা তুলতেই রানারা বলে ওঠে ,  হবে না মানে ?  এই বাজারে একটা চাকরির কম দাম ? তার উপরে আবার রেলের চাকরি। দুহাতে টাকা কামানোর জায়গা। এককথাতেই বাপ -- ছেলে রাজী হয়ে গিয়েছে। এখন আপনি মত দিলেই কথা আঁটিয়ে একেবারে কাগজপত্র করে নেব।                        
জাহেদা বলে , তাহলে আমার আর অমত কিসের। ও যদি শাহানারাকে বিয়ে করে আমরা যতদিন বাঁচব ততদিন আমাদের খাওয়া পড়ার দায়িত্ব নেয় তাহলে তার মতো ভালো আর কিই বা হতে পারে ?          রানারা বলে , আমরাও তো সেই ভেবেই প্রস্তাবটা দিয়েছি। তাহলে বিয়েটা কবে হবে -- জানতে চায় জাহেদা। মালেক বলে, কালই তো কাজে যোগ দিতে হবে। নাহলে বিয়েটা সেরেই নেওয়া হত। কাজে যোগ দেওয়ার পর  তিন মাসের ট্রেনিং। ট্রেনিং থেকে ফিরে আসার পরই বিয়ে।                             
তারপর বিয়ে করবে তো ? -- আবার সংশয় প্রকাশ করে জাহেদা।                            
চাচী মাঝে তো আমরা রয়েছি। আপনার কোন চিন্তা নেই। বিয়ে না করে যাবে কোথাই। আমরা ডেমি পেপারে সাক্ষী সহ বাপ -- ছেলের সই করিয়ে রাখব --- জাহেদাকে আশ্বস্ত করে রানারা। এরপর আর কোন সংশয় থাকে না জাহেদার। সে বলে, তাহলে তোমরা যা ভালো বোঝ করো।
         
                    
                                                        রানারা বেশ কিছু কাগজপত্রে টিপছাপ দিয়ে নেয় জাহেদার। যাবার সময় বলে যায়  , কথাটা যেন  পাঁচকান করবেন না চাচী।  বোঝেনই তো ভাংচি  দেওয়ার লোকের অভাব নেই। একেবারে বিয়েটা হয়ে যাক, তারপর সবাই জানবে।কথাটা শুনে কেমন যেন সন্দেহ জাগে জাহেদার মনে। সব জেনে শুনে চাকরির শর্তে বিয়ে। সবাই জানলে ক্ষতিটা কিসের?  বরং জানাটাই তো ভালো। তাহলে পরে আর বেগোরবাই করতে পারবে না। কিন্তু কি জানি, রানারা কি ভেবে কথাটা বলল। যাই হোক ওদের দৌলতেই চাকরি, ওরা কি আর তার খারাপ চাইবে ?
কিছু টাকাও জাহেদার হাতে দিয়ে মালেক বলে, যতদিন না বিয়েটা হচ্ছে ততদিন কোনরকমে একটু কষ্ট করে চালিয়ে নিন। তারপর তো আপনাদের সুখের দিন ।
জাহেদা বলে, সবই তো তোমাদের দৌলতে।
রানা বলে, তা বললে শুনছি না, কবজি ডুবিয়ে খাওয়াতে হবে কিন্তু।
--- সে ব্যবস্থাও তো তোমাদেরই করতে হবে বাপ। আমার অবস্থা তো জানো।
সে হবে, আপনাকে কিছু ভাবতে হবে না -- বলে চলে যায় রানারা। আর নানা ভাবনা ঘিরে ধরে জাহেদাকে। অনাগত সেই দিনটা যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।এর আগে তো তার বাড়ির উঠোনে বিয়ের আসর বসে নি বললেই চলে। রুকসানা আর সোনালীকে সে তো বিয়ের নামে বলি দিয়েছিল। এবারে আর তা হবে না।  শাহানারার বিয়েতে কোন রকম খুঁত রাখতে চায় না সে। রীতিমতো মৌলবি ডেকে বিয়ে পড়াবে। দেনমোহর উল্লেখ করে কাবিলনামা লেখা হবে। বসুনচৌকির বাজনাও আনবে। চাকরি করা বড়ো ঘরের ছেলের সংগে বিয়ে বলে কথা। তার বাড়িতেও তো শেষ বিয়ে। প্রতিবন্ধী মেয়েটাকে তো আর কেউ বিয়ে করবে না। 


                                         জুবেদার কথা ভেবে অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস পড়ে জাহেদার। জুবেদার চিকিৎসাটাই ভালো করে করাতে পারছে না। মলম লাগিয়ে কোন রকমে যন্ত্রনা কমিয়ে রেখেছে মাত্র। আনোয়ারের সংগে শাহানারার বিয়েটা হয়ে গেলে ওকে ধরে জুবেদার অপারেশানের ব্যবস্থাটা করাতে হবে। ভাবতেই ভাবতেই চটকা ভাঙে শাহানারার ডাকে। সে বলে, মা ঘরে কিন্তু আর কিছুই নেই। রান্না হবে কিসে ?  তুমি গাঁ বেড়াতে যাবে না? গাঁ বেড়াতে যাওয়া ! কি গালভরা শব্দ। যেন সময় কাটানোর শৌখিন বিলাস। বাইরের কেউ শুনলে অন্তত তেমনটাই ভাববে বলে জাহেদার ধারণা। কিন্তু শব্দটার মধ্যে যে গ্লানি মিশে আছে কেবল জাহেদাই জানে। পেটের জন্যে দূর দুরান্তের গ্রামে থালা হাতে বাড়ি বাড়ি ঘোরা ,  কারও দয়া হলে  এক ছটাক চাল কিম্বা ৪ আনা পয়সা ছুড়ে দেয়। আবার কেউ হাত জোড়া ব্যস্ত আছি , খুচরো নেই পরে এসো বলে বিদায় করেন। একবারও ভাবেন না এক ছটাক চাল, কিম্বা ৪ আনা পয়সার জন্য ৫ কিমি রাস্তা উজিয়ে পরে কি যাওয়া যায়। ওইসব কথা শুনে মাঝে মধ্যে চোখ ফেটে জল আসে। তবু আবার সেই বাড়িগুলিতেই যায়। হতশ্রদ্ধার ভিক্ষাই তো এখন তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। মনে পড়ে কয়েকদিন ধরেই গাঁ বেড়াতে যেতে পারে নি। শরীরটা যেন আর বইছে না। আজও কেমন গা জ্বর জ্বর করছে। বুকেও ব্যাথা। এই অবস্থায় বেরিয়ে তার যদি কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে কে দেখবে মেয়ে দুটোকে? ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ে যায় মালেকদের দিয়ে যাওয়া টাকাগুলো আঁচলে বাঁধা রয়েছে। শাহানারাকে ডেকে সেগুলো তার হাতে দিয়ে বলে, আজ আর বেরোতে পারছি না রে। শরীরটা খুউব খারাপ। এই টাকাতেই কিছুদিন চলে যাবে দেখ। আর জুবেদার বোধ হয় চোখের মলমটা ফুরিয়ে গিয়েছে। চাষাপাড়ার বাজার থেকে আনিয়ে রাখিস। নাহলে যন্ত্রনায় রাত্রে ঘুমোতে পারবে না।


                   শাহানারা বলে, সে নাহয় আনব। কিন্তু তোমার বুঝি ওষুধ আনতে হবে না ? তুমিও তো রাতে ঘুমোও না। সারারাত উ - আ করো।জাহেদা বলে, আমার ওষুধ লাগবে না। ও এমনিই ভালো হয়ে যাবে।এমনি ভালো হবে না ছাই। আসলে তুমি পয়সা খরচের ভয়ে নিজে ওষুধ খেতে চাও না। আমরা না একদিন না খেয়ে থাকব। সেই টাকায় তোমার ওষুধ কিনব। তোমার কিছু হয়ে গেলে আমাদের কি হবে ভেবে দেখেছো -- ছোট্ট মেয়ের মতো অভিমানে ঠোট ফুলিয়ে কথাগুলি বলে শাহানারা। তার চোখের কোন চিকচিক করে ওঠে। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না জাহেদা। মেয়েকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে বলে ,  তা আনিস আমার জন্যে বুকে ব্যাথার কয়েকটা বড়ি আনিস দেখি।

            ( ক্রমশ  )


No comments:

Post a Comment