Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

শহীদের মা -৪



          শহীদের মা 

                     

           

              অর্ঘ্য ঘোষ 


                ( চতুর্থ কিস্তি )   



মেয়েকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে বলে , তা আনিস আমার জন্য বুকে ব্যাথার কয়েকটা বড়ির আনিস দেখি। কিছুক্ষণের মধ্যেই চাষাপাড়া থেকে চাল,ডাল, সবজির সংগে বুকে ব্যাথার বড়ি নিয়ে ফেরে শাহানারা। তারপর গ্লাসে করে জল নিয়ে বড়ি খাইয়ে ছাড়ে।  জাহেদা বলে , আয় আমার কাছে একটু বোস দেখি। কিছু কথা আছে।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় মেয়ে। তারপর মায়ের পাশে বসে বলে - বলো তাড়াতাড়ি কি বলবে ?  ভাতের জল চাপিয়ে এসেছি কিন্তু। 
জাহেদা বলে , হ্যারে ধুপসড়ার আনোয়ারকে তুই দেখেছিস।
---- হ্যা, কেন ?  
--- ওকে তোর পছন্দ হয় ? 
----- পচ্ছন্দ হয় মানে কি বলতে চাইছো মা তুমি ? 
---- মানে ওর সঙ্গে তোর বিয়ে ঠিক করেছি।
-----  কি যে বলো না মা তুমি।  ওরা কত বড়ো লোক ,  আনোয়ার শিক্ষত ছেলে আমাকে বিয়ে করতে যাবে কেন ?
----- করবে রে করবে। আমার চাকরিটা তো ওকেই দিলাম। তিনমাস টেনিং থেকে ফেরার পর বিয়েটা হবে। তাছাড়া পয়সার অভাবে লেখাপড়াটাই যা হয়নি, কিন্তু মেয়েটা তো আমার ফেলনা নয়। বলে মেয়ের চিবুকে হাত বুলিয়ে দেয় মা।
 -- কি যে তুমি বলো না মা , যেন তোমার মেয়ের চেয়ে আর সুন্দরী আর নেই , বলে রান্নাচালার দিকে চলে যায় মেয়ে।

              
                           আর সেদিকে চেয়ে জাহেদা ভাবে তাইতো এতদিন ভালো  করে মেয়েটার দিকে নজর করা হয় নি। আহামরি না হলেও খুব একটা ছ্যা ছ্যাও নয়। এই বয়েসের মেয়েরা সুন্দর হওয়ার জন্য কত রকম কি করে। আর তাদের অভাবের সংসার। ভালো করে দুবেলা খাবারই জোটে না। না হলে একটু যত্নআত্তি পেলে কেউ হেলাফেলা করতে পারত না তার মেয়েকে। আনোয়ারও নিশ্চয় শাহানারাকে দেখেছে। তারও নিশ্চয় ওকে পছন্দ। নাহলে শুধু চাকরির জন্যই তো বিয়ে করতে রাজী হয়ে যেত না। ভালোই হবে , শাহানারা সুখীই হবে। শুধু রুকসানা আর সোনালীর জন্যই মনটা কেমন করে তার। যদি শাহানারার বিয়েতে ওদের আনা যেত। কিন্তু সেই যে বিয়ের পর চলে গিয়েছে তারপর আর কোন খবর নেই। কুরবানকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, ওর মেয়ে বলেছে ওরা নাকি ভালোই আছে। কিন্তু কাজের খুউব চাপ। সময় পেলেই আসবে। দুবছরেও আর সেই সময় হয়ে ওঠে নি। এমনটা তো হওয়ার ছিল। এক হিসাবে ভালোই হয়েছে। ওরা এলে ধুমধাম করে বোনের বিয়ে দেখে হয়তো ওদের মন খারাপ হত। নিজের ভাগ্যকে দোষ দিত। তার চেয়ে ওরা কিছু জানবে না , শুনবে না তা এক হিসাবে ভালোই হবে। কি ভাগ্য জাহেদার। অক্ষমতার জন্য নিজের মেয়েদেরও সে এড়িয়ে যেতে চাইছে। তার চেয়ে হতভাগিনী আর কে আছে? তবে দিলরুরকে আনাতে হবে। সেই যে বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করে চলে গিয়েছিল তারপর থেকে আর কোন যোগাযোগ নেই। দুটি ছেলেমেয়ের মা হয়েছে সে। ধুপছায়া বেশি দুরের গ্রাম তো নয়। কানাঘুষোয় সবই শুনতে পায়। জামাই নাকি মদ খেয়ে দিলরুবারর গায়ে হাত তোলে। বাপের বাড়ি থেকে টাকা পয়সা নিয়ে আসার জন্য চাপ দেয়। কিন্তু দিলরুবা তো তার মায়ের অবস্থা জানে। তাই মার হজম করে। কিন্তু কাউকে কিছু বলে না। জাহেদা ভাবে , শাহানারার সংগে বিয়েটা হয়ে গেলে দিলরুবাকে কিছু টাকা দেওয়ার জন্য আনোয়ার বলবে। চাকরি পাওয়ার পর আনোয়ার এতসব শুনবে তো ?  কাঁটার মতো প্রশ্নটা বিধে যায় জাহেদার মনে।
          

                              যাই হোক আর তো কিছু করার নেই তার। চাকরীর সমস্ত কাগজে সে তো টিপছাপ দিয়েই দিয়েছে। খবর এসেছে সেই কাগজ দেখিয়ে কাজে যোগ দিয়েছে সবাই।নিহতদের  কারও স্ত্রী, কারো ভাই, কারো ছেলে চাকরিতে যোগ দিয়েছে। রক্তের সম্পর্ক আছে এমন লোককেই চাকরি দেওয়া হয়েছে। তারই কেবল ব্যতিক্রম ঘটেছে। কিন্তু আনোয়ার তার রক্তের সম্পর্কের কেউ না হলেও আর কিছুদিনের মধ্যেই তাদের আপনার জন হয়ে উঠবে। কে জানে চাকরির কাগজে কি সম্পর্ক লিখেছে রানারা। মাস খানেকের মধ্যেই সবার বাড়িতে বেতনের টাকা এসে পৌঁচ্ছোয়। কেবল তারই কিছু আসে না। একদিন রানাকে ধরে জাহেদা। সরাসরি বেতনের কথা বলতে কেমন যেন বাঁধে। তাই জিজ্ঞাসা করে, কই আনোয়ার তো কোন খবর নেয় না আমাদের।
------- নেবে, নেবে। আসলে ও তো ট্রেনিং - আছে। তাই বেতন এবং সময় কোনটাই পায় না। কোন জবাব দেয় না জাহেদা।  ভাবে হবে হয়তো। আর তো দুটো মাস। দেখতে দেখতে কেটে যাবে। মনে মনে ভাবে বটে কিন্তু বাস্তবটা অত সোজা মনে হয় না জাহেদার।   দুটো মাস কেন , একটা দিনও যেন কাটতে চায় না। সবদিন আর গাঁ বেড়াতে যেতে পারে না। সহানুভূতির সংগে সরে গিয়েছে সহযোগিতার হাতও। তার উপরে কয়েক দিন হল দুই সন্তানকে নিয়ে ফিরে এসেছে দিলরুবা। টাকা পয়সার জন্য অত্যাচার তো লেগেই ছিল, তার উপরে আনোয়ারকে চাকরিটা দেওয়ার খবর জানাজানি হওয়ার পর থেকেই মাত্রাটা আরও বেড়ে যায়।  দিলরুবাকে তার বর জামসেদ বলে -- তোর মাকে বল, আনোয়ারের বদলে চাকরিটা আমাকে দিতে।
------ তা হয় না। ওই চাকরিটার বিনিময়েই শাহানারাকে বিয়ে করবে আনোয়ার। আর চাকরীতে সে বহালও হয়ে গিয়েছে। 
------- আর আমি যে তোকে কিছু না নিয়েই বিয়ে করেছি। সে কথা তোর মায়ের মনে ছিল না।
------ তুমি তো আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে।
------- নিকুচি করেছে তোর ভালোবাসা। আমার বাড়িতে আর তোর জায়গা হবে না। যা তোর 
চাকরীওয়ালা বোনের ভাতার তোকে খাওয়াবে।


                                       তারপরই দিলরুবাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই জামসেদ বলে ওঠে তোকে আমি তালাক দিলাম। তালাক -- তালাক --- তালাক।আশ্চর্য হয়ে যায় দিলরুবা। এই মানুষটাকেই ভালোবেসে একদিন সবকিছু ছেড়ে এসেছিল। মুখে আর কোন কথা সরে না তার। ওই তিনটি শব্দেই হারিয়ে গেল তার স্বামীর ঘর করার অধিকার। ছেলে দুটিকে নিয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বাপের বাড়িতেই এসে ওঠে সে। তারপর থেকেই আরও তিনটি পেটের খাই খরচ বেড়ে যায়। ভিক্ষার পাশাপাশি তাই যে যখন সময় পায় বিড়ি বেধে , কাঁথাস্টিচের কাজ করে দু"পয়সা আয় করার চেষ্টা করে। তারই মাঝে জাহেদা স্বপ্ন দেখে, একদিন তাদের সংসারে সুখ আসবে। আনোয়ার ফিরে আসা পর্যন্ত যা একটু দুখ কষ্ট। তাই আনোয়ারের ফিরে আসার দিন গোনে সে। একদিন খবর আসে ট্রেনিং শেষ করে আনোয়ার ফিরেছে। আশায় বুক বাধে জাহেদা। স্বপ্নের জাল বোনে শাহানারাও। জাহেদা ভাবে, আনোয়ার তো একসংগে তিন মাসের বেতন নিয়ে ফিরেছে। তার কিছু অংশ তো তারও প্রাপ্য হয়। তার জন্যই তো চাকরিটা পেয়েছে আনোয়ার।  তাহলে কেন সে তাদের কিছু দেবে না ? কিছু পেলে সংসারের অভাবটা যে একটু ঘোচে। পরক্ষণেই  মনকে সংযত করে। এ কি ভাবছে সে ? হবু জামাইয়ের কাছে সে প্রাপ্য বুঝে নিতে চাইছে। আসলে অভাবের হা মুখ জাহেদার ভাবনাগুলো কেমন যেন এলোমেলো করে দেয়।
          

                               মন থেকে ভাবনাগুলোকে সরায় সে। আর তো মোটে কয়েকটা দিন। শাহানারার সংগে বিয়েটা  হয়ে গেলে এ সংসারের দায়িত্ব আনোয়ারই নেবে। রানা -- মালেকদের সংগে তেমনই তো কথা হয়ে আছে। তখন আর গাঁ বেড়াতে যাবে না সে। তবে জামায়ের কামাইয়েও খাবে না। বিড়ি বেধে আর কাথা সেলাই করেই নিজের পেটের ভাতটুকু নিজেই করে নিতে হবে। দিলরুবা আর প্রতিবন্ধী মেয়েটার কিছুটা দায় কি আর আনোয়ার নেবে না? ১৫ দিনের ছূটিতে ফিরেছে আনোয়ার। রানাদের ধরে এবার বিয়ের ব্যবস্থাটা করে ফেলতে হবে। কিন্তু আনোয়ার গ্রামে ফেরার পর থেকে তাদের নাগালই তো পাচ্ছে না জাহেদা। চাষাপাড়ার পার্টি অফিসে গেলে বলে, এখানে কথা হবে না। সন্ধ্যায় আপনার  বাড়িতে যাব। সেখানে বসেই সব ফাইন্যাল হবে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গভীর হয়। প্রতীক্ষায় থাকে জাহেদা। কিন্তু রানারা আসে না। শেষে একদিন রানাদের বাড়িতেই যাই সে। বাইরে থেকেই রানার গলার আওয়াজ পায়। কড়া নাড়তেই দরজা খুলে বেড়িয়ে আসে রানার স্ত্রী আবেদা। তারপর তাকে দেখে ভিতরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে জানায় , রানা বাড়িতে নেই। পার্টির কাজে কলকাতা গিয়েছে। ফিরতে ৪/৫ দিন দেরী হবে। একই ঘটনা ঘটে মালেকের বাড়িতেও। কেমন একটা সন্দেহ দানা বাঁধে জাহেদার মনে। বাড়িতে থেকেও রানারা কেন তার সংগে দেখা করতে চাইছে না , কেন তার সংগে লুকোচুরি খেলছে ওরা, তা বুঝতে পারে না সে।


                                        শেষে একদিন ধুপসড়ার সালিম মিয়াঁর বাড়িতেই যায় জাহেদা। তাকে দেখেও না দেখার ভান করে সালিম মিয়াঁ। পারলে দরজা থেকেই বিদায় করে। কিন্তু অপমান গায়ে মাখলে তো তার চলবে না। সে যে মেয়ের মা। তাই সে সালিমকে সালাম জানিয়ে বলে, আপনারা তো আর কোন খবর নিলেন না। তা আপনারা না নিতেই পারেন। আপনি ছেলের বাপ। আমি মেয়ের মা। আমারই আগে আসা উচিত। তাই আমিই এলাম --কথা শেষ হয় না জাহেদার। তার আগেই কথা শুরু করে সালিম। গলায় রীতিমতো তাচ্ছিল্যের সুর। কিছুদিনের মধ্যে সে তার বেয়াই হতে যাচ্ছে অথচ সালামের কোন প্রত্যুত্তর নেই। সরাসরি তুমি - সম্বোধনে কথা শুরু করে আনোয়ারের বাপ। সে তা  করতেই পারে। ওরা জোতদার। শাহানারার বাপ হয়তো তাদের জমিতেই মুনিস খেটেছে। নিজের মনকে বোঝাই জাহেদা। আনোয়ারের বাপ বলে, তুমি কি বলতে এসেছো। আমি মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।
---- মানে ?
---- মানেটা তো আমিই জানতে চাইছি।
---- আসলে আমি আনোয়ারের সংগে আমার মেয়ের বিয়ে নিয়ে কথা বলতে এসেছিলাম।
----- বিয়ে! তোমার মেয়ের সংগে আমার ছেলের ?  তোমার মাথাটাথা ঠিক আছে তো ?
----- কেন, সেরকমই তো কথা হয়েছিল।
----- কথা! কার সংগে ?
---- কেন ,  রানা -- মালেকদের সংগে আপনার কথা হয়নি  , আমার চাকরিটা দিলে শাহানারার সংগে আপনার ছেলের বিয়ে দেবেন ?
----- শোন ,  ওদের সংগে আমার তেমন কোন কথাই হয় নি। তোমার চাকরি কিনা তাও জানি না। তবে আনোয়ারের চাকরিটা ওরা করে দিয়েছে বটে। কিন্তু মাগনা নয় , নগদ পাঁচ লাখ টাকা গুনে নিয়েছে। কথাটা শুনেই মাথাটা ঝিম ঝিম করে ওঠে জাহেদার। বুঝতে আর কিছু বাকি থাকে না তার। কেবল বুঝতে পারে না সে কোনদিকে যাবে , কার কাছে যাবে ?
       
                              রানাদের বিশ্বাস করে ডাহা ঠকে গেল । ওরা তো তার অবস্থা জানে। তাস্বত্ত্বেও এমনটা করতে পারল তার সংগে ? তাহলে শহীদের মা, শহীদের মা করাটা কি নিছকই লোক দেখানো। বিষয়টা সরাসরি করুণাময়ী, বানীব্রত, সংবাদ মাধ্যমকে জানাবে ঠিক করে সে। কিন্তু তার ধুপসড়া গ্রামে যাওয়ার কথা জানাজানি হতেই সন্ধ্যের মুখে ছুটে আসে রানা আর মালেক। প্রথমে মুখ খোলে মালেক।  
------ সব তো নিজে কানেই শুনে এলেন চাচী। ছেলের চাকরিটা নিয়ে সালিম এখন আর আপনার মেয়ের সঙ্গে বিয়েতে রাজী হচ্ছে না। সেইজন্যই লজ্জায় আমরা মুখ লুকোতে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। মালেকের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে যায় জাহেদা। কনসুন্দর অভিনয় করছে মালেক। ওর অভিনয় দেখে কথা হারিয়ে যায় তার। মনে মনে ভেবে রেখেছিল বলবে , খুউব তো শহীদের মা -- মা করো , আর ভুল বুঝিয়ে তার চাকরিটা তোমরা মোটা টাকায় বিক্রি করে দিলে বাপ। একবারও ভাবলে আমাদের কি হবে ? কিন্তু কিছুই বলতে পারে না ক্ষোভে দুখে যেন বাকরুদ্ধ হয়ে যায় জাহেদা। তার নীরবতার সুযোগ নিয়ে এবার মুখ খোলে রানা।
----- সালিম যে আমাদের সংগে এতবড়ো বেইমানী করবে তা ভাবতে পারিনি। এখন তো আর কিছু করারও নেই। উলটে পার্টির মুখ পুড়বে। আপনিও আর কাউকে বলতে যাবেন না। তবে চিন্তা করবেন না পঞ্চায়েত ভোটটা পেরিয়ে যাক,  দিদিকে ধরে আপনার যাতে অন্য একটা কাজ হয় তা দেখব। আর শাহানারার বিয়ের ব্যবস্থাও আমরাই করে দেব।

                            হতাশার মধ্যেও যেন কিছুটা আলোর আশা দেখে জাহেদা। মনকে বোঝাই এ ছাড়া করারই বা কি আছে তার ?  করুণাময়ীরা এসে তো প্রথমে রানাদেরই খোঁজ করেন। ওদের কথা বাদ দিয়ে কি তার কথা কানে তুলবেন ?  তার চেয়ে রানাদের ধরেই যাতে কিছু একটা হিল্লে হয় ,  তা করাই ভালো বলে মনে হয় তার। তাই  বলে --- দেখ বাপ, আমার তো আর কেউ নেই। তোমারাই আমার মা-- বাপ। তোমরা বাঁচালে বাঁচব, তোমার মারলে মরব। মালেক বলে , চাচী আপনার কোন চিন্তা নেই। আর কোন ভুল হবে না। শীঘ্রই শাহানারার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আর এ বারের ভোটে যদি পঞ্চায়েতের ক্ষমতা আমরা দখল করে দিতে পারি তাহলে দিদিকে বলে কয়ে চাকরির ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে। কেবল ভোট প্রচারে আপনাদের একটু সামনে থাকতে হবে। শহীদের পরিবারের লোকেদের দেখলে মানুষ আমাদেরই ভোট দেবে অগত্যা অন্যান্য শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংগে ভোটপ্রচারে নামতে হয় জাহেদাকেও। তাদের সামনে রেখে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে সহানুভূতি কুড়োন নেতারা। জাহেদার শরীর আর ধকল নিতে পারে না। তবু তাকে দুবেলা মিটিং মিছিলে পা মেলাতে হয়। যেমন করেই হোক পঞ্চায়েত জেতাতে হবে দলকে। না হলে তার চাকরি হবে না। চাকরিটা যে তার বড়ো দরকার। তাই আল্লার কাছে মোনাজাতও করে সে। বলে, আমার কসুর মাফ করে দাও আল্লা। দোয়া করো। পঞ্চায়েতে যেন এবার আমরা জিতি। না হলে যে আমাদের হারিয়ে যেতে হবে আল্লা। 


                                নির্বাচনের হাওয়া যত এগিয়ে আসে উত্তেজনার পারদ তত চড়তে থাকে। পঞ্চায়েত নিজেদের দখলে রাখতে মরীয়া হয়ে উঠে শাসকদল। অন্যদিকে উচপুরের গণহত্যাকে সামনে রেখে সহানুভূতির হাওয়া পালে লাগিয়ে সেই দখল ছিনিয়ে নিতে চায় রানারা। পাল্লা তাদের দিকেই ভারী। লোকের মুখেই শোনা যায়, অঘটন এবার একটা ঘটবে। সেই আশাতেই বুক বাঁধে জাহেদা। তারই মধ্যে একদিন শাহানারার বিয়ের একটি সমন্ধ নিয়ে আসে রানারা। মালেকের গ্রাম হালুন্দিতেই পাত্রের বাড়ি। জমিজমা আছে, বয়েসটা একটু বেশি। এর আগে দুবার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু একজন বৌও টেকে নি। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে একজন  নাকি বিষ খেয়ে মরেছিল, আর একজন পালিয়ে বেচেছিল। এমন লোকের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে কিছুতেই মন উঠছিল জাহেদার।  কিন্তু মালেকরা তাকে বোঝায় , হলোই বা একটু বেশি বয়েস। পুরুষ মানুষের আবার বয়েস নিয়ে মাথা ঘামালে চলে নাকি! বাড়িতে খাওয়া পড়ার অভাব নেই। এমন সমন্ধ কি হাতছাড়া করতে আছে ?  তাছাড়া শাহানারার দুই দিদিরও তো বিহারের দুই বয়স্ক লোকের সংগে বিয়ে হয়েছে। তাদের  তো কোন খোঁজখবরই নেই। তার তুলনায় এই সমন্ধ খারাপ কিসের? কেমন কাছে পিঠে থাকবে। মালেকের কথা শুনে কোন জবাব দিতে পারে না জাহেদা। কথাটা তো উড়িয়েও দিতে পারে না। দেখতে যতই সুশ্রী হোক, কোন রাজপুত্র এসে তার মেয়েকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে ? শেষে হয়তো সেই বিহারেই পাঠাতে হবে। রুকসানাদের মতোই শাহানারার বিয়ের জন্যও পরোক্ষে চাপ শুরু হয়েছে প্রতিবেশীদের। পুকুর ঘাটে যাওয়ার উপায় নেই।

                                  আনোয়ারের সঙ্গে বিয়ে না হওয়ায় মা মেয়েকে ঠারেঠোরে বিদ্রুপ করতে ছাড়ে না তারা। তাদেনশুনিয়ে শুনিয়েই বলে, বামন হয়ে গিয়েছিল চাঁদ ধরতে।  হাত পুড়িয়ে বাড়ি ফিরেছে। এখন হ্যারিকেন, লন্ঠন একটা কিছু ধরে নিলেই তো হয়। ওইসব খোঁচা জাহেদার কিছুটা গাসহা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সইতে পারে না শাহানারা। প্রতিবেশীরা তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে তোলে। সেইজন্য সে বাড়ি থেকে বেরোনো প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে সে। শুধু বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদে। আনোয়ারকে ঘিরে সে একটা সুখী সংসারের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সে স্বপ্ন তো পূরণ হয়ই নি, স্বপ্ন দেখার মাসুল হিসাবে প্রতিবেশীদের খোঁচা হজম করতে হচ্ছে।  তাই জাহেদা কিছু বলার আগে শাহানারাই রানাদের কথার জবাব দেয়। সে বলে ওঠে, ওই বিয়েতে তার অমত নেই। মেয়ের কথা শুনে চমকে ওঠে মা। কিন্তু এবারেও তাকে কিছু বলার সুযোগ দেয় না শাহানারা। রানাদের উদ্দেশ্যে সে বলে, আপনারা ওখানেই আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিন। জাহেদা বোঝে , অভিমানে নিজেকে বলি দিচ্ছে শাহানারা। নাহলে লেখাপড়া, সহবত শেখাতে না পারুক নিজ মুখে বিয়ের কথা বলার মতো বেহায়া নয় তার মেয়ে। কিন্তু কি'ই বা করতে পারে জাহেদা। অগত্যা সেও রানাদের প্রস্তাবে সায় দেয়। একদিন কোনরকমে নমো নমো করে বিয়ে হয়ে যায় শাহানারার। বাপের বাড়ি ছাড়ার সময় এক ফোটাও চোখের জল ফেলে না অভিমানী মেয়েটা। কিন্তু জাহেদা তো জানে কত কান্না জমাট বেধে রয়েছে ওর বুকে। মা যাতে ভেঙে না পড়ে তার জন্যই অভিনয় করল মেয়ে। কিন্তু শাহানারা বাড়ি ছাড়তেই কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে কান্নায় ভেঙে পড়ে জাহেদা। তার গলা থেকে ঝড়ে পড়ে আক্ষেপ --হা আল্লা কি কসুর আমাদের , ফুলের মতো মেয়েগুলোকেও কেন এভাবে বলি হতে হচ্ছে ?
             

                                        কাদাছিটের চালাঘরের দেওয়ালের ফাটলে কোথাই যেন হারিয়ে যায় জাহেদার আক্ষেপ। তারই  মধ্যে চরম দোটানায় পড়ে সে। মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য শাসক দলের কাছে থেকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে চাপ আসতে শুরু করে। আসে নানা লোভনীয় প্রলোভনও। দুটোই এড়িয়ে যাওয়া বর্তমান পরিস্থিতেতে কঠিন। তারপাশে তো সেই অর্থে কেউ নেই। ঘরেও নিত্য অভাব। সবদিন হাড়ি চড়ে না। আটাগোলা খেয়ে দিন কাটে। তবু দাঁতে দাঁত চেপে সব উপেক্ষা করে। ছেলের খুনীদের শাস্তি দেখতে চায় সে। একদিন সেই আশা পূরণ হয় তার। সেদিন চাষাপাড়া বাজারের প্রতিটি অলিগলিও আবিরে আবিরে রঙিন। বাজনা - মাইকের দাপটে কিছুদিন কানপাতাই দায় হয়ে উঠে।  এই আবেগ, উচ্ছাস কতটা আন্তরিক তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান জাহেদা।  সে নমুনা তো সে ইতিমধ্যে পেয়েই গিয়েছে। এই যে এত আড়ম্বর ঘিরে দেদ্দার খরচ হচ্ছে , কিন্তু কেউ খোজও রাখে না তারা কি খাচ্ছে কেমন আছে। উপলক্ষ্যটা এখন গৌণ হয়ে গিয়েছে। উদ্দেশ্যটাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। আসলে পঞ্চায়েত ভোটে বিষয়টি ইস্যু করতে চায় রানারা। ছেলের কথা আজ বড়ো মনে পড়ছে তার। আজ তারা একটা ইস্যুমাত্র।  মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। কিন্তু মন খারাপ করে বসে থাকাও চলে না। ক"দিন পরেই ভোট। নেতাদের সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে হয় শহীদ পরিবারের সদস্যদেরও।অন্যান্যদের মধ্যে কেমন যেন একটা উদ্দীপনা।তাদের বাড়ির কেউ না কেউ চাকরি পেয়েছে। তাদের সংসারে সমৃদ্ধি ফিরেছে। আর তার সংসারে অভাবের কালো ছায়া।শরীরও আর চাপ নিতে পারে না। তবুও যেতে হয় জাহেদাকে।

                             নির্বিঘ্নেই একদিন ভোট হয়ে যায়। হয় ফল ঘোষণাও। দেখা যায় শাসক দলের রমরমা বাজারেও রাজ্যে করুণাময়ীর দল হাতে গোনা যে কয়েকটি পঞ্চায়েত জিতেছে তার মধ্যে ধুপসড়া অন্যতম। ২৩ টি আসনের মধ্যে ২০ টিতে জিতেছে তার দল। এজন্য শহীদ পরিবারগুলিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন করুণাময়ী। দলে রানাদের উন্নতি ঘটেছে। ছোট নেতা মেজ, আর মেজ নেতা বড়ো নেতা হয়েছে। রানা ,মালেক  আবার পঞ্চায়েতেও গুরুত্বপূর্ন পদ পেয়েছে। কেবল দুঃখ ঘোচে নি জাহেদার। ফের তার সঙ্গে লুকোচুরি শুরু করেছে মালেকরা। পঞ্চায়েতে গেলে এখন আর দেখাও করে না। কখনও বা দেখা হলে খিচিয়ে ওঠে। চোখের জল ফেলতে ফেলতে বাড়ি ফেরে জাহেদা।নিজের পোড়া কপালকে দোষ দেয়। নাহলে সবাই চাকরি পেল আর তার ক্ষেত্রেই এমন হয় ? শেষ চেষ্টা হিসাবে একবার করুণাময়ীর সংগে দেখা করে সব খুলে বলার সিদ্ধান্ত নেয় সে। সেই মতো গ্রামের একজনকে ধরে দরখাস্ত লিখিয়ে নিয়ে সকাল সকাল দিলরুবাকে নিয়ে বর্ধমানের সার্কিট হাউসে হাজির হয় সে। একটি সভা করতে সেখানেই আসার কথা করুণাময়ীদের। জাহেদা ভেবেছিল গেটের মুখে দাঁড়িয়ে থাকবে। করুণাময়ী ঢোকার সময় নিশ্চয় তাদের চিনতে পেরে কাছে ডেকে নেবে। কিন্তু তাকে সার্কিট হাউসের কাছে ঘেষতেই দেয় না পুলিশ। বলে-- দেখা করার অনুমতি আছে? সে যত বলে, অনুমতি লাগবে না।  করুণাময়ী তাকে দেখলেই চিনতে পেরে নিজেই ডেকে নেবে। পুলিশ তত বলে ভাগ হিঁয়াসে বুড়ি। নাহলে ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করে দেব।

                                                             শেষ পর্যন্ত ঝামেলা দেখে এগিয়ে আসেন এক সাংবাদিক। সব শোনার পর তিনিই করুণাময়ীর সংগে দেখা করিয়ে দেন মিটিং শেষে। সেখানে তখন সুকুল ব্যানার্জী, বদন রায়দের মতো তাদের গ্রামে যাওয়া সব নেতারাই রয়েছেন।  কিন্তু কেউ যেন তাকে চিনতে পারে না। করুণাময়ীকেও কেমন যেন দুরের মানুষ মনে হয়। তাই খেই হারিয়ে ফেলে জাহেদা। অনেক কথা বলব ভেবে রেখেছিল, কিন্তু বলা হয় না। কেবল দরখাস্তটা হাতে দিয়ে কোন রকমে বলতে পারে, আপনার দেওয়া চাকরিটা আমি পাইনি।নেতারা বিক্রি করে দিয়েছেন। আমি খুউব কষ্টে আছি। ভালো করে খেতেও পায় না। সাংবাদিকদের সামনে কথাটা শুনে অস্বস্তিতে পড়েন করুণাময়ী। অস্বস্তি ঢাকতে তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন, কষ্ট করে এতদুরে এসেছেন কেন?  জেলায় বানীব্রতকে বললেই তো হত। ওকে গিয়ে বলুন। তারপর না হয় চাষাপাড়ায় শহীদ সমাবেশে যখন যাব তখন দেখা করবেন , সব শুনব। 

                      (ক্রমশ )


No comments:

Post a Comment