শহীদের মা
অর্ঘ্য ঘোষ
( পঞ্চম কিস্তি )
জেলায় বানীব্রতকে বললেই হত। ওকে গিয়ে বলুন। তারপর না হয় চাষাপাড়ায় শহীদ সমাবেশে যখন যাব তখন দেখা করবেন , সব শুনব। জাহেদা বলতে যায়, বানীব্রতর কাছেও গিয়েছিলাম। কিন্তু সেও জানিয়ে দিয়েছে ব্লক নেতৃত্বের কাছে যাও। ব্লক নেতৃত্ব মানে তো সেই রানা--- মালেক। তারা তো তার সংগে সমানে লুকোচুরি খেলছে। চাষাপাড়ার সমাবেশ তো ঢের দেরি। ততদিন তাদের চলবে কি করে ? মনের কথা মনেই থেকে যায়, বলা আর হয় না। হাত নাড়তে নাড়তে গাড়িতে উঠে যান করুণাময়ী। হুস করে বেরিয়ে যায় তার কনভয়। নেতা আর কর্মীদের ভীড় এড়িয়ে করুনাময়ীর দৃষ্টি পৌঁছোয় না তারই দিকে তাকিয়ে থাকা জাহেদার জলভরা করুণ দুটি চোখে দিকে। জাহেদা কেবল দেখতে পায় তার দিকে রাগী রাগী চোখে চেয়ে আছে রানা , মালেকরা। এ চোখের ভাষা ততদিনে ভালোই চেনা হয়ে গিয়েছে তার। ছেলের খুনের মামলা থেকে সরে দাঁড়ায় নি বলে তৎকালীন শাসকদলের দাপুটে নেতা নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের চোখেও দেখেছিল ওই দৃষ্টি। জাহেদা দেখে বানীব্রত - রানা ও মালেককে কাছে ডেকে তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে কি যেন বলছেন। রানা --মালেকরাও ঘাড় নাড়ছে। তাকে নিয়ে ওদের কিসের এত আলোচনা তা ভেবে পায় না জাহেদা। শুধু তার মনে একটাই আক্ষেপ , করুণাময়ী তার কথা ভালো করে শুনলেনই না। তাই একরাশ হতাশা গ্রাস করে নেয় জাহেদাকে। অথচ করুনাময়ীর কাছে বহু আশা নিয়ে এসেছিল। করুণাময়ীকে একবার তার কষ্টের কথা জানাতে পারলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ভেবেছিল।
করুনাময়ী নিজেও তো তাদের গ্রামে গিয়ে সেই কথাই তো বলে এসছিলেন ছেলের মাটি দেওয়ার দিনে। বলেছিলেন, আপনি শহীদের মা। আপনার কোন অমর্যদা হতে দেব না। কথাটা আজ কেমন যেন হাস্যকর মনে হচ্ছে তার। আজ আর অবশ্য করুণাময়ীর কথাতে ট্রেন থামে না। কিন্তু রাজ্যের রানী হয়েছেন করুণাময়ী। সেদিনটার কথা মনে পড়ে যায় জাহেদার।ছেলের মাটি দেওয়ার দিনে, সে আল্লার কাছে দোওয়া মোনাজাত করেছিল করুণাময়ীকে রানী করার জন্য। আল্লা তার সেই প্রার্থনা শুনেছেন। করুণাময়ীর কি সে কথা মনে আছে ? না থাকাটাই স্বাভাবিক। তার মতো কতজনই তো একই প্রার্থনা করেছে। সবার কথা কি মনে রাখা সম্ভব ? সে দাবি জাহেদাও করে না। তার অন্য উপায় থাকলে করুনাময়ীকে সে বিরক্ত করতে এতদুরে ছুটে আসত না। রেলে না হোক অন্য যে কোন একটি কাজ , নিদেনপক্ষে কোন একটা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করুণাময়ী নিশ্চয় করে দেবে ভেবেছিল সে। জাহেদা শুনেছে , মাওবাদীদের চাকরি , মদ খেয়ে মৃতদের ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে সরকার। আর যাদের মৃত্যুকে ইস্যু করে সরকার গড়ে উঠেছে তার সহায় সম্বলহীন মা কিছুই পাবে না ? শুধু শহীদবেদীতেই খোদিত ছেলের নামটুকুই তার সান্ত্বনা ? শুধু ওইটুকুই ? মনের মধ্যেই প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে থাকে। মনটা খুউব খারাপ হয়ে যায় তার।কোন লাভ তো হলোই না , শুধু শুধু বাস ট্রেনের ভাড়াটাই গেল। ওই টাকাতে যে তাদের দুদিন চলে যেত। এক একটা দিন পেরোনো যে তাদের কাছে কি তা জাহেদাই জানে। করুনাময়ীর কাছে যাওয়ার মাসুল অবশ্য জাহেদা গুনতে হয় কিছুদিন পরেই।
রেশনে তার জন্য বরাদ্দ স্থায়ী সরকারি ত্রানের গম আনতে গিয়ে শোনে এবারে প্রাপকের তালিকায় তার নাম পাঠায় নি পঞ্চায়েত। নিজেদের অপরাধ ঢাকতে রানারা মাঝে মধ্যে তার পাশ বইয়ে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় কর্মসংস্থাণ সুনিশ্চিতকরণ প্রকল্পে মজুরীর কিছু করে টাকা ঢুকিয়ে দিত। কিন্তু এবারে অন্যান্যদের টাকা ঢুকলেও তার পাশবইয়ে কোন টাকাই ঢোকে নি। কিছু একটা যে হবে তা সেদিন বানীব্রতর সংগে রানাদের আলোচনা দেখেই আন্দাজ করেছিল। কিন্তু ওরা যে তাদের পেটে লাথি মারবে তা ভাবতেও পারে নি। এই রানা , বানীব্রতদের কাছে আবার যেতে বলেছিল করুণাময়ী। ওদের কাছে গিয়ে কিছু হবে না তা ভালোই জানে জাহেদা। শহীদ দিবসকে ঘিরে সে শুধু আশায় বুক বাঁধে জাহেদা।শহীদ দিবসে তো মঞ্চে করুণাময়ীকে নাগালের মধ্যেই পাবে , তখন সব শোনার পর একটা কিছু ব্যবস্থা নিশ্চয় করবে করুনাময়ী। একটা আশার সঞ্চার হয় তার মনে। তার মধ্যেই একদিন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় ডাকপিওন। তার হাতে তুলে দেয় একটি চিঠি। দোলাচল শুরু হয় তার মধ্যে। তাহলে কি করুনাময়ীই পাঠিয়েছে চাকরির চিঠি ? অথচ সেই করুণাময়ীকেই সে কত ভুল ভেবেছিল ! কিন্তু ওই চিঠিই কেড়ে নেয় তার রাতের ঘুম।
দেখা যায় চিঠিটি করুণাময়ী পাঠাননি। কোন সরকারি দফতর থেকেও আসেনি। চিঠিটি উত্তরপ্রদেশের বেগুসরাই থেকে পাঠিয়েছে তার বড়ো মেয়ে রুকসানা। আর সেই চিঠির প্রতিটি ছত্রে ছড়িয়ে আছে তার দুই মেয়ের কান্না ভেজা করুণ কাহিনী। শুনতে শুনতেই গা শিউড়ে উঠেছে তার। মেয়েদের তাহলে কি নরক যন্ত্রনা পোহাতে হচ্ছে তা ভেবে অস্থির হয়ে ওঠে মায়ের মন। চিঠিতে রুকসানা লিখেছে -- মা, তোমরা কেমন আছো জানি না। আমরা ভালো নেই মা , একদম ভালো নেই। তোমরা কষ্ট পাবে বলে এতদিন তোমাদের জানায় নি , জানানোর সুযোগও ছিল না। সোনালী আর আমি পাশাপাশি গ্রামে থাকি। যে লোকদুটো আমাদের বিয়ে করে নিয়ে এসেছিল তারা আসলে আমাদের কিনে এনেছিল। ওদের বাড়িতে স্ত্রী ছেলেমেয়ে আছে। আমরা থাকি ওদের খাটাল বাড়িতে। সারা দিনমান যব, ভুট্টার জমিতে কাজ করি, যাঁতা ঘুরিয়ে আটা আর ছাতু বানাতে হয়। হাতে ফোস্কা পড়ে ঘা হয়ে যায়। তবু রেহাই মেলে না। মেলে না একফোঁটা ওষুধও। আর রাতে ওদের পাশবিক চাহিদা মেটাতে হয়। আমাদের একটি করে ছেলেমেয়েও হয়েছে। কিন্তু ওরা বাবার পরিচয় পায় না। ওরাও জমি কিম্বা খাটালে কাজ করে। গরু মোষ চড়ায়। জ্বরজ্বালা হলেও বিশ্রাম নেই। কাজ না করলে প্রচন্ড মারধোর করে। খেতে দেয় না। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমরা মুখ বুজে সব সহ্য করেছি। কিন্তু এখন আমরা আর আগের মতো কাজ করতে পারি না। তাই ওরা আড়কাঠির মাধ্যমে দুবাইয়ে এক শেঠের কাছে আমাদের বিক্রি করে দিয়ে সেই টাকায় আবার নতুন মেয়ে আনবে বলে ঠিক করেছে। আমাদের দাম ঠিক হয়েছে তিরিশ হাজার টাকা। দুবাই পাঠাতে অনেক ঝামেলা আছে বলে আড়কাঠি বলেছে ওই টাকাটা,পেলেই সে আমাদের ছেড়ে দেবে। মা, যদি পারো আমাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যাও। গ্রামে না খেয়ে মরে যাওয়াও ভালো। কিন্তু এখানে তো নিজের ইচ্ছায় মরারও উপায় নেই। না পারো, একবার অন্তত দেখে যাও। বিদেশে বিক্রি হয়ে গেলে আর তো জীবনে দেখা হবে না মা। সাতদিন সময় দিয়েছে ওরা। দেখ যদি কিছু করতে পারো। খাটালে একটি নতুন মেয়ে এসেছে। সে কিছুটা লেখাপড়া জানে বলেই তাকে ধরে চিঠিটা পাঠাতে পারলাম। নাহলে খবরটাও হয়তো দিতে পারতাম না। আর হ্যা , আড়কাঠি বারবার করে সাবধান করে দিয়েছে, পুলিশকে যেন কিছু জানানো না হয়। তাহলে ফল হবে মারাত্মক। সব জায়গায় নাকি ওদের লোক আছে। ওরা ঠিক জেনে যাবে।
ইতি -- রুকসানা।
নাতি যখন চিঠিটা পড়ছিল তখন জাহেদার চোখের সামনে যেন ভেসে উঠছিল সুদুর উত্তরপ্রদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে তার দুই মেয়ের করুণ রোজনামচা। চোখের জলে ভেসে যাচ্ছিল তার বুক। হাজার অভাব অনটনে যাদের সে বুকে করে মানুষ করেছে কিছু টাকার জন্য সেই মেয়েরাই অজানা অন্ধকারে হারিয়ে যাবে চিরতরে ? সব জেনেও মা হয়ে কিছু করতে পারবে না ? উতলা হয়ে উঠে তার মন ? কি করবে সে কিছু ভেবে কুল কিনারা পায় না। মেয়ে দুটিকে ছাড়িয়ে আনা দুরের কথা , দেখতে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্যও যে তার নেই। মনে মনে খুউব আক্ষেপ হয় তার। সেই সময় যদি রানাদের বিশ্বাস করে আনোয়ারের চাকরির কাগজে টিপছাপ না দিতে তাহলে কি আর তার আজ এই অবস্থা হতো? চাকরি থাকলে কি আর মেয়েদের ওইভাবে বিহারে পাঠাতে হত , না আজ তাদের ছাড়িয়ে আনার জন্য এত ভাবতে হত? টাকা জমা না থাকলেও কত জন ধার দিত। কিন্তু এখন কে দেবে তাকে ধার ? কত রকম সাতপাঁচ ভাবনা আসে তার মনে। এই সংকটে মনে মনে যে ডালটাই সে ধরতে যায় পরক্ষণেই সেটাকেই বড়ো পলকা মনে হয় তার। কিছুতেই স্বস্তি পায় না। নিজেকে যেন মনে হয় ফাঁসির আসামী। এক একটা মুহুর্ত পেরোয় আর বরাদ্দ সাতটি দিনের কথা মনে পড়ে যায় তার। মনে হয় দিনরাত্রি গুলো যেন আগের থেকে বড়ো দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে। জাহেদা শুনেছে, দুঃখের দিনরাত্রি নাকি দীর্ঘতর হয়। তার ক্ষেত্রে কি সবই উলটো ?
দেখতে দেখতে কেটে যায় দুটো দিন । কোন দিকেই টাকা যোগাড়ের কোন রাস্তা খুঁজে পায় না জাহেদা। এক একটা সেকেণ্ডও তার কাছে এখন মহা মুল্যবান হয়ে ওঠেছে। উত্তেজনায় , অক্ষমতার জ্বালায় মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছা করে তার। এইসময় পাশে কেউ একটা থাকলে বড়ো ভালো হতো। কিন্তু পাছে কিছু সাহার্য্য করতে হয় সেই আশংকায় গ্রামের লোকেরা তো বটেই আত্মীয়স্বজনরাও তাকে এখন এড়িয়ে চলে। তাছাড়া আত্মীয় স্বজন বলতে তার আছেই বা কে ? বাবা- মা মারা যাওয়ার পর থেকেই তো ভাইদের সংগে আর যোগাযোগ নেই। বাকি থাকে দিলরুবা আর শাহানারার শ্বশুরবাড়ি। তিন তালাকের পর দিলরুবার তো সে পাট চুকে গিয়েছে। শাহানারারও নাকি জামাইয়ের সংগে গন্ডগোল চলছে দেনা পাওনা নিয়ে। কিন্তু সে তো রানাদের বলেই দিয়েছিল তার কিছু দেওয়ার ক্ষমতা নেই। তারপরেও এমন তো হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া দেওয়া থোওয়ার ক্ষমতাই যদি থাকবে তাহলে বাপের বয়সী ওই রকম একটি লোকের হাতে সে কি মেয়েকে তুলে দিত ? তবে সরাসরি সে অবশ্য কিছু শোনে নি। কানাঘুষোয় কিছুটা কানে এসেছে মাত্র। সত্য মিথ্যা যাচাই করে দেখারও ফুরসত হয়নি তার। রুকসানাদের ছাড়িয়ে আনার টাকা যোগাড়ের জন্য এখন সবকিছু তার মাথায় উঠেছে। কোথাও কিছু আশার আলো দেখতে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সে ঠিক করে দলের সদর কার্যালয়ে যাবে। বানীব্রতকেই সমস্যার কথা খুলে বলবে। কিন্তু একদিন সেখানে গিয়ে শোনে বানীব্রত নাকি ১০ কিমি দুরের মন্দিরে হোম যজ্ঞ করতে গিয়েছে। অগত্যা সেখানেই যায় সে।
মন্দিরে তখন মহা ধুমধাম। মন্দিরের বাইরে থেকেই সে শোনে ১ মন চন্দন কাঠ আর ১ মন ঘি দিয়ে হোম যজ্ঞ করাচ্ছে বানীব্রত। আরও সব এলাহি আয়োজন।মন্দিরের বাইরে দোকানদাররাই বলাবলি করছিল , দেখালে বাপু। আড়াইশো বছরের মন্দিরের ইতিহাসে রাজা জমিদারেরও এমন করতে পারে নি। যজ্ঞ সেরে বেরোনোর মুখে নিরাপত্তারক্ষীদের বেষ্টনী এড়িয়ে বানীব্রতর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে জাহেদা। কিন্তু তাকে গেটেই আটকে দেয় নিরাপত্তা কর্মীরা। গোলমাল দেখে এগিয়ে আসেন বানীব্রতর পার্সোন্যাল সেক্রেটারি শুভজিৎ রায়। জাহেদাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকে যায় তার। জানতে চান কি ব্যাপার ? জাহেদা হাত জোড় করে তার সমস্যার কথা খুলে বলে।সব শোনার পর শুভজিৎ বলে , তা এখানে এসেছেন কেন ? ওখানে তো রানা , মালেকরা আছে। ওদের বললেই তো হোত। এদের কে যে এখানে পাঠায় কে জানে! ঠিক আছে আমি বানীদাকে জানিয়ে দেব। একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়ে তার কথায়। কিন্তু জাহেদা দেখে শুভজিৎ বানীব্রতকে তার বিষয়ে কিছুই বলে না। কিন্তু তাকে তো আজ বলতেই হবে। তার হাতে যে আর সময় নেই। ফের সে বানীব্রতর কাছে পৌঁছানোর মরীয়া চেষ্টা করে।সংগে সংগে নিরাপত্তাকর্মীরা টেনে হিঁচড়ে তাকে দুরে সরিয়ে দেয়। বৃদ্ধা বলে এতটুকুও রেয়াত করে না তারা। জাহেদা শুনতে পায় যেতে যেতেই তাচ্ছিল্যের সুরে বানীব্রত বলছেন , জোটেও যত্ত সব।
ধুলো উড়িয়ে চলে যায় বানীব্রতদের গাড়ি। মন্দিরের বাইরে একটি গাছ তলায় বসে একটু দম নেয় জাহেদা। নিরাপত্তারক্ষীদের টানা হেঁচড়ায় পড়ে গিয়ে শরীরের বিভন্ন অংশে নুনছাল উঠে গিয়েছে। সমানে রক্ত ঝরছে জালাও করছে। কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই। জাহেদা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে হাওয়াই চটি আর কাপড়ের আঁচল। টানা হেঁচড়ায় দুটোই ছিঁড়েছে। বাইরে বেরোনোর সম্বল বলতে তো ওই দুটোই ছিল। ওই অবস্থাতে জাহেদা মনে মনে বানীব্রতদের যজ্ঞের হিসাব কষতে বসে। ঘি এবং চন্দন কাঠের দাম সম্পর্কে সম্যক কোন ধারণা না থাকলেও তা ৩০ হাজার টাকার অনেক বেশী হবে বলেই তার ধারণা। টাকাটা বানীব্রতদের কাছে হাতের ময়লা।নাহলে কি কেউ শুধু শুধু আগুনে পুড়িয়ে দিতে পারে অত টাকার ঘি আর চন্দন কাঠ ? অথচ টাকাটা পেলেই তার দুটি মেয়ের জীবন বেঁচে যেত। সে কথা কেউ বা ভাবে ? দলের নেতারা তো তার কথার কোন গুরুত্বই দিলেন না। অথচ দল যখন শাসন ক্ষমতায় ছিল না তখন ভোটের কাজে নামার কথা বলতে কতবার তাদের বাড়িতে গিয়েছেন ওইসব নেতারা। যা বলেছে মন দিয়ে শুনেছেন। এখন তো কেউ চিনতেই পারলেন না। জাহেদার মনে প্রশ্ন জাগে, ক্ষমতায় গেলে কি সবাই দুরের মানুষ হয়ে যায় ?
বিধস্ত মন এবং শরীর নিয়ে বাড়িতে ফেরে সে। দিলরুবা খাওয়ার জন্য ডাকতে আসে। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে গিয়ে খাবারের থালার সামনে গিয়ে বসে। কিন্তু নাড়াচাড়া করা ছাড়া এক গ্রাস ভাতও মুখে তুলতে পারে না সে। দিলরুবা মায়ের এই অস্থিরতার কারণ জানে। কিন্তু কিছুই বলতে পারে না। সে নিজেই তো মুখ পুড়িয়ে ফিরে এসে মায়ের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার উপরে দিদিদের ছাড়িয়ে আনার জন্য মায়ের পাগল পাগল অবস্থা। তাই সে মাকে বলে, খেতে ইচ্ছে না হলে খেও না। জোর করে খেলে শরীর খারাপ হবে। তার চেয়ে হাত ধুয়ে শোও। আমি সব গুটিয়ে নিচ্ছি। মেয়ের কথা শুনে চুপচাপ উঠে যায় মা। হাত ধুয়ে বিছানা নেয় সে। কিন্তু ঘুম আসে না। নানা চিন্তা ঘুরপাক খায় মাথার মধ্যে। শেষ পর্যন্ত রানাদের কাছেই যাবে বলে ঠিক করে। জানে রানাদের কাছে গিয়ে তাকে অনেক বিদ্রুপ সহ্য করতে হবে। হলেও করার তো কিছু নেই। একদিন বিকালের দিকে সে চাষাপাড়ার পার্টি অফিসে যায়। সেখানে তখন অনেক লোক। তাদের মধ্য কেউ কেউ তাকে দেখে ভ্রু কোঁচকায়। একজন জিজ্ঞাসা করে--- কি চাই ? জাহেদা জানায় , একবার রানা আর মালেকের সঙ্গে দেখা করতে চায়। লোকটি বলে , এখন তো হবে না , গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। বলেই মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয় সে। আর বাইরের বেঞ্চে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে জাহেদা। ওই ঘরের মাথায় লেখা রয়েছে , চাষাপাড়া শহীদ কার্যালয়। অথচ শহীদের মা হয়ে তার সেই কার্যালয়েই প্রবেশাধিকার নেই।
মনে পড়ে একদিন এই ঘরে বসিয়েই করুণাময়ীরা তাদের শহীদের মা, বাবা, ভাই-বোন হিসাবে ১১টি পরিবারের ১১ জনকে বরণ করে কত সম্মান দেখিয়েছিলেন। সেদিন রানারাও ছিল। ওরাও সব দেখেছিল।কত মিষ্টি মিষ্টি কথাও বলেছিল। আর আজ রানাদের মিটিং- এর জন্য তার একবারও ভিতরে যাওয়ার সুযোগ নেই। রানাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য দরজা বন্ধ ঘরের বাইরে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয় তাকে। সবই তার কপাল। সন্ধ্যের মুখে দরজার পাশে তাকে বসে থাকতে দেখে বিরক্তি ঝড়ে পড়ে রানাদের চোখে মুখে। রানা বলে ওঠে , কি ব্যাপার আপনি এখানে ? আপনার তো হটলাইনে সরাসরি দিদির সংগে যোগাযাগ। তা সেখানে না গিয়ে আমাদের কাছে কেন ? জাহেদা বোঝে সেদিন বর্ধমানে করুণাময়ীর কাছে যাওয়া নিয়ে খোঁচা দিচ্ছে রানারা। কিন্তু তা গায়ে মাখলে তো তার চলবে না। তাই সে বলে, বাপ ভুল করেছিলাম, ক্ষমা করে দাও। আমার খুউব বিপদ। তোমরা না দেখলে কি আমাদের দেখার কে আছে বলো ? তারপর রানাদের সমস্ত খুলে বলে জাহেদা। সব শোনার পর রানারা বলে, তা আমরা কি করব ? ২০০/৫০০ টাকার ব্যাপার বটে যে যোগাড় করে দেব। তিরিশ হাজার টাকা কি মুখের কথা ? মুখের কথা যে নয় তা জাহেদাও জানে। কিন্তু এও জানে ওই টাকাটা এখন রানাদের কাছে কিছু ব্যাপারই নয়। দল ক্ষমতায় আসার পর রানারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। সবার দোতলাবাড়ি, দামী মোটরবাইক। কি নেই ওদের ?
পঞ্চায়েত শাসনের ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই মূলত এ অঞ্চলের রাজনীতি আবর্তিত হয়। পঞ্চায়েত হাতে থাকলেই আরও অনেক কিছু হাতিয়ে নেওয়া যায়। যারা যখন ক্ষমতায় থাকে তারাই তখন তা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। এলাকার অনেকের মতো বিষয়টি অজানা নয় জাহেদারও। শহীদ পরিবারের বিষয়টিকে সামনে রেখেই ক্ষমতা দখল করে রানাদের আয়পয় বেড়েছে। অথচ শহীদের মা হয়ে মেয়েকে উদ্ধার করতে আজ ৩০ হাজার টাকাও তার জুটছে না। পোড়া কপাল আর কাকে বলে ? কয়েকদিন ধরেই একটা কথা রানাদের বলব বলব ভাবছিল সে। কিন্তু কেমন যেন একটা বাধো বাধো ঠেকছিল। তাই আর বলা হয়নি। শেষপর্যন্ত মরীয়া হয়ে কথাটা বলেই ফেলে জাহেদা। পার্টি অফিসে তখনও বেশ কিছু লোক রয়েছেন। তাদের সামনে কথাটা বলতে প্রথমে কিছুটা ইতস্তত লাগছিল তার। কিন্তু আর যে না বললেই নয়। তাছাড়া অন্যরাও জানলে হিল্লে একটা হলেও হতে পারে। তাই সরাসরি সে রানাদের বলে, আমার চাকরিটা আনোয়ারের বাপকে বেচে যে পাঁচ লাখ টাকা পেয়েছো হিসাব মতো সেটা আমারই পাওয়ার কথা। সবটা না দাও আমার এই বিপদে ৩০ হাজার টাকাটা তো দিতে পারো। কথাটা শোনার পরই উপস্থিত অন্যান্য নেতা কর্মীদের মধ্য কেমন যেন চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয়ে যায় ফিসফাস। তা দেখেই মেজাজ হারায় রানারা। এই মারে তো সেই মারে। শেষে বলে ওঠে , হারামজাদী মাগী আমাদের বদনাম করতে এসেছিস ? কি প্রমাণ আছে তোর কাছে ? রানাদের কথা শুনে 'থ' হয়ে যায় জাহেদা। এও তার কপালে ছিল। শহীদের মা হয়ে গেল হারামজাদী মাগী। খুউব কান্না পায় তার। কিন্তু কাঁদতে পারে না। কাদের কাছে কাঁদবে ?
তার অপমানে কেউ তো মুখ ফুটে কিছু বললোও না। তাই সে বলে, না বাপ প্রমাণ আমার কাছে কিছু নেই। ১০ টি শহীদ পরিবারের সদস্যের সংগে আনোয়ার রেলে যে এমনি এমনি চাকরি পায় নি আমার জায়গায় থাকলে তুমিও তা বুঝতে। তারপর আর এক মুহুর্তও সেখানে দাঁড়ায় না জাহেদা। সে বুঝে গিয়েছে সময় নষ্ট ছাড়া এখানে কিছু হবে না। শেষ চেষ্টা হিসাবে সে অন্যান্য শহীদের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চাকরি পাওয়ার পর তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। পাকা বাড়ি,জমিজিরেত হয়েছে তাদের। ১০টি পরিবার ধার হিসাবে যদি তাকে ৩০০০ টাকা করে দেয় তাহলে আর কোন চিন্তাই থাকে না।কিন্তু বাকি শহীদের বাড়িতে গিয়ে কাঁদুনি শোনা ছাড়া কোন লাভ হয় না। কেউ শোনায় এমাসে বাড়িতে একটা টিভি কিনবে , তো কেউ শোনায় বাড়ি তৈরির জন্য ইট নামাবে , আরও হাজার ফিরিস্তি। কেউ ভালো করে তার সমস্যার কথা কানে পর্যন্ত তোলে নি। অথচ বড়ো আশা করেছিল জাহেদা। সুরবানেরই পাশাপাশি কবরে শুয়ে আছে ওদের কারো বাবা, ভাই কিম্বা দাদা। দুঃখকষ্টের সেইসব দিনে সবাই কেমন এক পরিবারের মতো হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেটা যে নিছকই ক্ষণস্থায়ী তা তাদের পরিবারের সদস্যদের আচরণে তার প্রমাণ পায় জাহেদা। চাকরি পাওয়ার পর থেকেই কেমন যেন একটা বিভাজন রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে চাকরিটা পেলে হয়তো এই বিভাজন হত না। তারই মধ্যে একজনের একটি পরামর্শ মনে ধরে তার। শহীদ পরিবারের এক সদস্য জানান , এভাবে তুমি কোথাই টাকা পাবে? তার চেয়ে বাড়িটা বাঁধা দাও নয়তো বিক্রি করো। তাই করবে জাহেদা। কিন্তু কে কিনবে তার বাড়ি ? যাকেই বলে সেই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চায়। ৫০ হাজার টাকার বাড়ি ১২/১৩ হাজার টাকায় হাতিয়ে নিতে চায় সবাই।
যদি ওই টাকাতে তার মেয়ে দুটিকে ছাড়িয়ে আনা যেত তাহলে সে বিক্রি করতে আপত্তি করত না। তাতে সবাই মিলে গাছতলায় থাকত। কিন্তু ওই টাকায় যে তার একটা মেয়েকেও ছাড়ানো যাবে না। আর সেক্ষেত্রে সে কাকে বাদ দিয়ে কাকে ছাড়িয়ে আনবে? দুটিই তো তার নাড়ী ছেঁড়া ধন। অগত্যা হাল ছেড়ে দিতে হয় জাহেদাকে। দেখতে দেখতে নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যায়। আজই শেষদিন। সকাল থেকেই বিছানা নিয়েছে জাহেদা। নাওয়া খাওয়াও বন্ধ। শুধু গড়িয়ে পড়ছে চোখের জল। কত কথা মনে পড়ছে তার। আর আক্ষেপ ঝড়ে পড়ছে, মা হয়েও মেয়ে দুটোকে ফিরিয়ে আনতে পারল না সে। তাই আল্লার কাছে প্রার্থনা জানায়, আল্লা ওদের কপালে সুখ লেখ নি জানি।কিন্তু যেখানেই থাক, ওরা যেন সুস্থভাবে বেঁচে থাকে তা তুমি দেখো আল্লা। আল্লার কানে তার ওই প্রার্থনা পৌঁছোয় কিনা তা নিয়ে অবশ্য জাহেদারই সন্দেহ আছে। নাহলে তার উপরেই নেমে আসে একের পর এক বিপর্যয়! রুকসানাদের উদ্ধার করে আনতে না পারার আক্ষেপ কাটতে না কাটতেই একটি শিশুপুত্র নিয়ে ফিরে আসে শাহানারা। স্বামী তাকে মারধোর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। বিয়ের সময় রানাদের নাকি তাকে পণ বাবদ ২০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক পয়সাও দেয় নি। তাই সে শাহানারাকে তিন তালাক দিয়ে মারধোর করে তাড়িয়ে দিয়েছে।সে নাকি ফের বিয়ে করলে আরো বেশি টাকা পাবে।
একের পর এক আঘাতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে জাহেদা। মনে মনে ভাবে, তার তো কোন কসুর ছিল না , তবুও আল্লা কেন তার সংগে এমন করছেন। তাহলে কি পূর্ব জন্মের ফল ভোগ করতে হচ্ছে তাকে ? সবই তার ভাগ্য। নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কি"ই বা করবে সে। শুধু শেষ বারের মতো তার দুরবস্থার কথা করুণাময়ীককে বলতে চায়। এজন্য শহীদ দিবসের প্রতীক্ষায় থাকে সে। রাজ্যের রানী হুওয়ার পর অবশ্য আর শহীদ দিবসে আসার সময় পান না করুণাময়ী। তাই জাহেদারও ইচ্ছে পূরণ হয় না। তবে এবারে শহীদ দিবসে আসছেন তিনি। রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর এই প্রথম আসছেন। তাই আড়ম্বর অন্যান্যবারের তুলনায় অনেক বেশী। আশায় আশায় বুক বাঁধে জাহেদাও। এবার সে করুনাময়ীকে তার দুর্দশার কথা বলার সুযোগ পাবে। সকাল থেকেই তাই মনে মনে ঠিক করে রাখে কি বলবে তাকে। দুপুর গড়াতেই সে বেড়িয়ে পড়ে। আর ভালো করে হাঁটতেও পারে। তবু হাঁটেই যেতে হবে তাকে। তার মনে পড়ে, যেদিন হাটার সামর্থ্য ছিল সেদিন করুণাময়ী তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি পাঠিয়েছিলেন। আর আজ চিত্রটা বদলে গিয়েছে। সেদিন হয়তো তাদের গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল করুণাময়ীর। আর আজ যে প্রয়োজনটা তার। তাই হাফাতে হাফাতেই সভাস্থলে পৌঁছোয় সে। এবারের আয়োজন যেন কয়েকগুন বেশি। আগের তুলনায় মঞ্চটাও অনেক বড়ো হয়েছে। কিন্তু আগের মতো আর মঞ্চে ঠাই হয়না জাহেদাদের। সেখানে এখন দলের নেতাদের পাশাপাশি জাঁকিয়ে বসে রয়েছেন দলবদল করে আসা সুরবানের হত্যাকারীদেরই দাদা কিম্বা ভাইয়ের দল। আর দর্শকাসনে ঠাই হয়েছে জাহেদাদের।
তবে নিয়ে অবশ্য জাহেদার কোন অনুযোগ নেই। সে কেবল একটিবার কথা বলেতে চায় করুণাময়ীর সংগে। সেইজন্য প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে মঞ্চের সিঁড়ি কাছে। সিঁড়ি দিয়েই তো নামবেন করুণাময়ী। তখন নিশ্চয় তাকে দেখে কথা বলবেন। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হয় না। করুণাময়ী যখন সিঁড়ি নামছেন তখন জাহেদা, মা আপনি ভালো আছেন তো বলে তার দৃষ্টি আর্কষণ করে। ---- আপনারা সব ভালো তো ? হেসে জিজ্ঞাসা করেন করুণাময়ীও। কিন্তু জাহেদার আর বলা হয়ে ওঠে না সে কেমন আছে। রক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে গাড়ির কনভয়ের দিকে এগিয়ে যান করুণাময়ী। কিছুটা ছুটে করুণাময়ীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে সে। কিন্তু রক্ষীরা তাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। ধাক্কা সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যায় জাহেদা। কেউ ফিরেও তাকায় না।তাকেই মাড়িয়েই চলে যায় অনেকে। মাটিতে পড়ে পড়েই সে ভাবে, অত কাছে থেকে দেখেও কি করুণাময়ী তাকে চিনতে পারেন নি ? যেটুকু আশা ছিল তাও শেষ হয়ে যায়। খুব ভেঙে পড়ে জাহেদা। সভাস্থল ফাঁকা হয়ে গেলে কোনরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়ি ফেরে। শুরু হয় বেঁচে থাকার জন্য লড়াই। সে লড়াই আজও চলছে। বিড়ি বাঁধা আর কাঁথাস্টিচের কাজ করে দিন চলে তাদের। পুরোন দিনের কথা মনে পড়লেই টপটপ করে চোখের জল ঝড়ে পড়ে বিড়ির মশলার উপর। মশলা নষ্ট হলে মজুরী কেটে নেবে মহাজন। তাই তাড়াতাড়ি চোখ মুছে নেয় জাহেদা। শহীদের মায়ের চোখের জলের চেয়ে যে বিড়ির মশলার দামও অনেক বেশি।
( সমাপ্ত )
-------------------------------------------
আমার কথা
সম্পূর্ণ হলো শহীদের মায়ের কথা। এই ধারাবাহিকে আমার সঙ্গে ছিলেন তাদের অনেক ধন্যবাদ। কমেন্টস, লাইক দিয়ে যারা আমাকে প্রাণিত করেছেন তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছেন লেখাটি বই হিসাবে প্রকাশ করার জন্য। তাদের উদ্দেশ্য আমার সবিনয় নিবেদন, নিজের টাকায় নিজের বই ছাপার বয়েসটা অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছি। আসলে বই ছাপার জন্য আমি লিখি না। লিখি মনের খেয়ালে। পেশাগত কারণে খুব কাছে থেকে যেসব মানুষের জীবন যন্ত্রনা আমাকে নাড়িয়ে দেয় তা অন্যদের সংগে শেয়ার করার জন্যই তুলে ধরার চেষ্টা করি মাত্র। শহীদের মা তেমনই এক জীবন যন্ত্রনার কাহিনী। কিছুটা আমার দেখা , কিছুটা শোনা। আইনী জটিলতা এড়াতে এবং গল্পের প্রয়োজনেই গল্পের মোড়কে পরিবেশন করা হয়েছে নির্মম বাস্তব। গল্প চলাকালীণ অনেকের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল।প্রথমদিকে অনেকেই ভেবেছিলেন আমি বোধহয় বিশেষ একটি দলের প্রচার শুরু করেছি। পুলকিত হয়েছিলেন সেই দলের কর্মীরা। আর রেগে উঠেছিলেন বিপরীত মেরুর বাসিন্দারা। কয়েকজন রীতিমতো বিরক্ত হয়ে কটু মন্তব্যও করেছিলেন। পরে অবশ্য তাদের ভুল ভেঙেছে। প্রশংসা সূচক কমেন্টেসও করেছিলেন। আর প্রথমদিকে খুশী হয়েছিলেন যারা , গল্প যত এগিয়েছে ততই চটেছেন তারা। কেউ কেউ আমার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের উদ্দেশ্যে আমার জানান, আমি কোন দলকেই সাপোর্ট করি নি এ গল্পে। আমি গল্প বলেছি মাত্র। সেই গল্প বলা সারা। আমার কাজ শেষ। তবু কান পাতলে যেন আজও জাহেদার আকুতি শুনি ---- বাপজান বলো তো আমার কি কসুর????


No comments:
Post a Comment