ফিমেল
অর্ঘ্য ঘোষ
( প্রথম কিস্তি )
পা আর চলে না সোহাগবালার। একে বয়সের ভার, তার উপরে গেটে বাত। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে মিছিলে পা মেলাতে হয় তাকে। কিলোমিটার দুয়েক হাটলে তবেই মিলবে একটা করে শাড়ি আর টিফিনের প্যাকট। মিছিল শেষে পার্টি অফিসে পৌঁচ্ছোতেই কর্মীরা হাক দেন, কই গো ফিমেলরা সব এদিকে এসো। কথাটা কানে যেতেই এক লহমায় সামনে এসে দাঁড়ায় অতীত। কীর্নাহারের পশ্চিমপট্টিতে ছিল সোহাগবালাদের বাড়ি। বাবা ছিলেন স্থানীয় স্কুলের অস্থায়ী নাইট গার্ড। যৎসামান্য যা বেতন পেতেন তা নেশার পিছনেই ফুঁকে দিতেন। আর পাঁচ ভাইবোনের মুখে দুবেলা দুটি ভাত তুলে দিতে হেন কাজ নেই যা করতে হয়নি মাকে। বাবা স্কুলের দারোয়ান হলেও পাঁচ ভাইবোনের কারো স্কুলের চৌকাঠ মাড়ানো হয়নি। তারই মধ্যে সোহাগবালার চেহারাতে আলাদা একটা শ্রী ছিল। আর সেটাই কাল হয়েছিল তার। সেবারে গাজনের মেলায় তাদের পাড়ায় যাত্রার আসর বসেছিল। সেখানে মহিলা চরিত্রে অভিনয় করার জন্য কাটোয়া থেকে আনা হয়েছিল ফিমেল হিসাবে পরিচিত অভিনেত্রীদের। তাদের অন্যতম ছিলেন শেফালি রায়।
পুকুর ঘাটে স্নান করতে গিয়ে মায়ের সংগে আলাপ হয় শেফালীর। সব শুনে শেফালি মাকে বলেন, ওকে আমার হাতে ছেড়ে দাও। আমি ওকে গড়ে পিঠে নেব। তখন ওর রোজগারেই তোমরা পায়ের উপর পা তুলে খাবে।
প্রস্তাবটা মায়ের কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার সামিল। একটা পেট তো কমবে। তার উপরে পায়ে পা তুলে খাওয়ার প্রলোভন। সোহাগ তখন আর মেয়ে নয়, নিছকই একটা পেট আর পেট ভরানোর উপাদান। শুনে কেঁদে ভাসিয়েছিল সোহাগ। কতই বা বয়েস তখন তার। বড়ো জোর ১২ কি ১৩। মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, মা আমাকে ওদের সংগে পাঠিও না। তোমাদের ছেড়ে আমি থাকতে পারব না। আমি বরং আরো দুটো বাড়িতে ঝিগিরি করব। কিন্তু মা কোন কথাই কানে তোলেন নি। চোখ পাকিয়ে বলেন, তোমার মতো বয়েসে আমি বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে ঢুকেছিলাম। কোন আপত্তিই টেকে না সোহাগের। পরদিন সকালে মা পরিপাটি করে চুল বেধে দিয়েছিলেন। পুটুলিতে একটা জামা প্যান্ট ভরে দিয়ে মা চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, বুঝিসই তো মা আমাদের অবস্থা। নাহলে মেয়েকে কেউ অতদুরে পাঠায় ? মন খারাপ করিস না। তোর বাবা মাঝে মধ্যে যাবে। তোকে নিয়েও আসবে। পুটুলি বগলে গোরুর গাড়িতে গিয়ে বসেছিল ছোট্ট মেয়েটি। চোখের জলে ঝাপসা হতে হতে মিলিয়ে গিয়েছিল বাবা মা, ভাই বোনেদের মুখ।
কাটোয়ায় শেফালির বাড়িতে ঝিয়ের কাজের পাশাপাশি অভিনয়ের তালিম নেওয়া শুরু হয় তার।স্টেজে অভিনয়ের পাশাপাশি তার শরীরকেও পন্য করে তোলে শেফালি। যাত্রার উদ্যোক্তাদের মনোরঞ্জনের জন্যও তাকে ব্যবহৃত হতে হয়। এজন্য উদ্যোক্তারাও ভাড়ার জন্য শেফালির কাছেই ভীড় জমাত। মাঝে মধ্যে চোখ ফেটে জল আসত। মনে হোত বাড়ি পালাতে। কিন্তু সে পথও ছিল না। ততদিন পুরোপুরি ফিমেল হয়ে উঠেছে সে। বাবা মাঝে মধ্যে আসতেন। শেফালির কাছে থেকে টাকা নিয়ে যেতেন। কিন্তু একবারও তাকে বাড়ি যাওয়ার কথা তুলতেন না। বরং বাড়ির প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতেন। একদিন কথায় কথায় সোহাগ জানতে পারে সামনের মাসেই বোনের বিয়ে।আনন্দে নেচে উঠে তার মন। কতদিন পরে বাড়ি যাবে। মা ভাই বোনদের সংগে দেখা হবে। ভাইয়ের জন্য একটা ভালো জামা, মা আর বোনের শাড়ি, বাবারও একটি ধুতি জামা কিনে নিয়ে যেতে হবে। শেফালিদির কাছে অগ্রিম কিছু টাকা নিয়ে একে একে সব কিনে রাখে। বাবা আসতেই চেপে ধরে তাকে। বলে, বাবা তুমি আচ্ছা তো। বোনের বিয়ে আর তুমি আমাকে বলোই নি। কবে নিয়ে যাবে আমাকে বলো? শুনেই বাবা চোখ পাকিয়ে বলে ওঠেন, তাহলে আর দেখতে হবে না। তোমার কথা গোপন করেই বিয়ে ঠিক করা হয়েছে। নাহলে ফিমেলের বোনকে কেউ তো আর বউ করে ঘরে তুলবে না। শুনে মুখ কালো হয়ে যায় সোহাগের। মনে মনে ভাবে বাবার কাছেও আজ আমি শুধুই ফিমেল। মুখে কেবল বলে, ও তাই ? তারপর কেনা জামা কাপড়ের ব্যাগটা তুলে দেয় বাবার হাতে।বাবা চলে যায়।একবারও ফিরে তাকায় না।
অঝোর ধারায় ঝাপসা হয়ে যায় সোহাগের চোখ। মনে হয় বালিশে মুখ গুজে কিছুক্ষণ কাদে। কিন্তু সেই অবকাশ কোথাই তার। সে যে ফিমেল। শেফালিদির বাড়িতে আর থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। মানুষ নয়, তাকে একটা টাকা উৎপাদনের যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। রাতের পর রাত অভিনয় তো করতেই হচ্ছিল, তার উপরে বাঁধা বায়না পাওয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের মনোরঞ্জনও করতে হত তাকে। বাপ কাকার বয়েসী লোকগুলো মদ খেয়ে হামলে পড়ত তার উপরে। তাদের বিকৃত লালসা মেটাতে গিয়ে কতবার যে মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছে তার ঠিক নেই। মরতে পারে নি তাহলে যে বাড়ির লোকেরা না খেয়ে মরবে। একবারও মনে হয়নি বাড়িটা আর তার নেই। কতবার পালাতে ইচ্ছে হয়েছে। কিন্তু কোথাই পালাবে ? সমাজ তো তার গায়ে সেটে দিয়েছে ফিমেলের তকমা। শুধু ভগবানকে বলে,কেন আমাকে একটু কুৎসিত করলে না। কেন কেন ? দরমা বেড়ার ঘরে হুমদো একটি লোকের তলায় নিষ্পেষিত হতে হতে বোবা কান্নায় চাপা পড়ে যায় সব জিজ্ঞাসা। অগত্যা মুখ বুজে মেনে নিতে হয় শেফালিদির শোষণ। দুবেলা দুটি খাওয়া আর মাসে মাসে বাবার হাতে যৎসামান্য কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে সমস্তটাই আত্মসাত করেন তিনি। তার রোজগারের টাকাতেই শেফালিদি লাইট, মাইক, পোষাক কিনে অপেরা খুলে বসেন। সেখানে সাইন বোর্ডে লাইট, মাইক,পোষাকের সংগে তার অর্ধনগ্ন ছবি ছাপা হয়। লেখা হয় লাইট, মাইক, পোষাক এবং উন্নতমানের ফিমেল ভাড়া পাওয়া যায়।
সাইন বোর্ডটা দেখলেই আরো মন খারাপ হয়ে যায়। সে আজ আর মানুষ নয়। লাইট মাইকের মতো একটা ভাড়া খাটানোর সামগ্রী পদবাচ্য মাত্র। কিন্তু বেশিদিন আর শেফালিদির খপ্পরে থাকতে হয় না তাকে। এক যাত্রার আসরেই পরিচয় হয় বোলপুরের বিবেক গায়ক অরূপ বিশ্বাসের সংগে। পাশাপাশি কয়েকটি মঞ্চে অভিনয়ের সুবাদে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে দুজনের। অরূপ তাকে বলে, পালিয়ে চলো আমার সংগে। দুজনের রোজগারে যাত্রাদল খুলব। প্রস্তাবটা মনোপুত হয়। বিশ্বাসকে বিশ্বাস করে একদিন যাত্রার আসর শেষে উধাও হয় দুজনে। লাভপুরের গরুর হাটের কাছে যাত্রাদলের ছোট্ট একটি ঘরে সংসার পাতে তারা। সোহাগের চোখে তখন নিজেদের যাত্রাদল খোলার স্বপ্ন।দিনরাত পরিশ্রম করে রোজগারের সমস্ত টাকা তুলে দেয় অরূপের হাতে। কিন্তু দল খোলার ব্যাপারে অরূপের কেমন যেন গাছাড়া ভাব লক্ষ্য করে সোহাগ। চেপে ধরে জিজ্ঞেস করে , কি গো খুলবে না দল? হচ্ছে হবে গোছের জবাব দিয়ে পাশ কাটিয়ে যায় অরূপ। কেমন যেন বদলে যেতে থাকে সে। আগের মতো সেই কথায় কথায় বিবেকের গান গেয়ে ওঠে না। ভালো করে কথাও বলে না। এখন বায়না না থাকলে রাতে বাড়িও ফেরে না। শেষে একদিন দেখা যায়, ঘরের টাকাকড়ি গয়নাগাটি সহ দলের অল্প বয়সী মেয়েটাকে নিয়ে তাকে নিস্ব করে পালিয়েছে তার বিশ্বাস।
বিশ্বাস হারিয়ে দুচোখে অন্ধকার দেখে সোহাগ। ঘরে কানাকড়িও নেই। দুমাসের ঘর ভাড়া বাকি। কি খাবে, কোথাই যাবে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। চূড়ান্ত অস্থিরতার মধ্য দিন যায়। সময় আস্তে আস্তে সব ভুলিয়ে দেয়। অভিনয়ের মাধ্যমেই আবার শুরু হয় পথ চলা। অভিনয় করতে করতেই আবার মেক আপ ম্যানের সুনীল মন্ডলের সংগে ঘনিষ্ঠতা হয়। আবার শুরু হয় দল গড়ার স্বপ্ন দেখা। তাছাড়া এ লাইনের মেয়েদের সমাজ এমনিতেই সস্তা মনে করে। মনে করে যা কিছু ইচ্ছে করা যায় তাদের সংগে। তাই মাথার উপর একজন থাকাটাও খুব জরুরী। কিছুটা সেই তাগিদেও সুনীলের হাতে সিঁদুর পড়ে সোহাগ। দল গড়ার জন্য ফের শুরু হয় টাকা জমানো। কিন্তু আগের মতোই গাছাড়া ভাব দেখা যায় সুনীলের মধ্যেও। শেষে একদিন সোহাগ জানতে পারে, সুনীলের বাড়িতে তার স্ত্রী ছেলে মেয়ে রয়েছে। সেই কথা তুলতেই খিস্তির বন্যা বইয়ে দেয় সুনীল, তুই কি ভেবেছিলি মাগী। সাতঘাটের জল খাওয়া তোর মতো ফিমেলকে আমি ঘরে তুলব। যেটুকু পাচ্ছিস তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারিস থাক, নাহলে পথ দেখ। চোখ ফেটে জল আসে। অনেক কথা মনের মধ্যে ভীড় করে আসে। মনকে বোঝায়, তাদের মতো মেয়েদের তো পুরোপুরি কিছু পাওয়া ভাগ্যে লেখা নেই। প্রেম ভালোবাসা , ঘর সংসার সবই হাত তোলা। ওই সুখও বেশিদিন স্থায়ী হয় না।
সুনীলও একদিন সবকিছু নিয়ে হাওয়া হয়ে যায়।আগেরবারের আঘাতে মচকে ছিল, এবারে যেন ভেংগে পড়ে সোহাগ। কারণ ততদিনে তার পেটে সুনীলের সন্তান। সব জেনেও মানুষকে এই অবস্থায় কেউ কি ফেলে পালাতে পারে ? ওই পরিস্থিতিতেও নিজের ভাবনায় হাসি পায় সোহাগের। তারা তো আর মানুষ নয়, তারা তো শুধুই ফিমেল। মানবিক ব্যবহারও তাই তাদের প্রাপ্য নয়। তবু লজ্জার মাথা খেয়ে পেটের শত্রুটার কথা ভেবে ঠিকানা খুঁজে খুঁজে একদিন পৌঁছোয় সুনীলের বাড়ি। সব শুনে মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠেন সুনীলের স্ত্রী। বলেন, আহা হা হা। মরণ দেখে বাঁচি না। ঘটা করে আবার সিথেয় সিঁদুর পড়েছে দেখ। লজ্জাও লাগে না। ফুর্তি করে পেট বাঁধিয়ে আবার ঢঙ করতে এসেছে। কথাগুলো শুনে মরমে মরে যায় সোহাগ। কোনরকমে বলেতে পারে, দিদি তুমিও তো মেয়ে। আমার কথাটা একবার ভাব। আমি কি করব ? ওকে একরারটি ডেকে দাও। ফের খিচিয়ে ওঠেন সুনীলের স্ত্রী। হাড়ের ভিতর গরম সিসের মতো ঢুকে যায় তার কথাগুলো, কি করবি তা আমরা কি জানি। পেট খসিয়ে আবার কাউকে ধরে নে। নাহলে গলায় কলসি বেধে কুয়ে নদীতে ডুবে মর। এখানে লোক খিটকেল করবি না বেশ্যা মাগি। নইলে ঝেটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব। সশব্দে মুখের উপর বন্ধ হয়ে যায় দরজা। নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে যায় সোহাগের। মনে মনে বলে, ঠাকুর প্রতিদিন আসরে নামার আগে তোমার স্মরণ নিই। কিন্তু কেন আমাদের সংগে বার বার এমন হয়? কেন যে ডাল ধরি তাই ভেঙে যায় ?
জিজ্ঞাসু চোখে দেওয়ালে ঝোলানো রামকৃষ্ণের ছবির দিকে তাকিয়েই থাকে সোহাগ। ক্রমাগত হাত বদল আর ব্যবহৃত হতে হতে ততদিনে বাস্তবকে অনেকটাই চিনে ফেলেছে সোহাগ। এবার শুরু হয় বেচে থাকার জন্য তার একক লড়াই। বেচে যে তাকে থাকতেই হবে। কারণ পেটে বাড়ছে আর একটা প্রান। প্রতিনিয়ত তার অস্তিত্ব টের পাই সে। কতজন কত পরামর্শ দিয়েছে। কেউ বলেছে, চল আমার চেনা কবিরাজ আছে। সব খালাস করে দেবে। কেমন
নিঝঞ্ঝাট হয়ে যাবি। কেউ বা বলেছে, হ্যারে ওর বাবার পরিচয় কি হবে ? সব শুনে চিৎকার করে উঠেছে সোহাগ --- না , ও আমার পরিচয়েই বেড়ে উঠবে। আমিই ওর বাবা, আমিই ওর মা ।অনাগত সন্তানের কথা ভেবে অনলস পরিশ্রম শুরু করে সে। দুর--দুরান্তে বায়না নিয়ে অভিনয় করতে চলে যায়। কিছু করে টাকা জমাতেও শুরু করে। তার এই অসহায়তার সুযোগে কতজন হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসেছে। সেসব সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছে সে। কারণ ওইসব হাতের ভাষা ততদিনে তার ভালো রকম চেনা হয়ে গিয়েছে। ওইসব হাতই তো মঞ্চে পুরস্কার হিসাবে ১০/২০ টাকার নোট সেপটিপিন দিয়ে ব্লাউজে গেঁথে দেওয়ার অছিলায় অস্যভতা করে। ওইসব হাতই তো মহড়ার সময় অভিনয় বুঝিয়ে দেওয়ার অজুহাতে স্পর্শ সুখ খোঁজে। পেটে সন্তান আসার পর থেকে ওইসব হাতের নাগাল কায়দা করে এড়িয়ে যায়। কেমন যেন গা ঘিন ঘিন করে। কিন্তু সবক্ষেত্রে পারে কি ? অভিনয়ের সময় অনেকেই অনাব্যশক কারণে শরীরের উপরে হামলে পড়ে। সাজঘরে কুইংগিত দেয়। সহকর্মীরা দেখেও দেখে না। কারণ ওটাই দস্তুর। ওই সুযোগটুকুর জন্যই তো অনেকে যাত্রা মঞ্চস্থ করার ঝক্কি পোহান। সেটুকু তাদের না দিলে যে বায়নাই হবে না। তাই সোহাগকেও কিছুটা মানিয়ে নিতে হয়। নাহলে ঘেন্না ধরে গিয়েছে।
যাত্রাদলের কেমন সব গালভরা নাম। কোথাও শিল্পী সংঘ তো কোথাও শিল্পী বন্দনা। কিন্তু কোথাও এক ফোঁটা শিল্পীর সম্মান জোটে না। ঠায় রোদে খোলা গরুর গাড়িতে পোশাক, লাইট, মাইকের বাক্সের উপর বসে অভিনয়স্থলে পৌঁচ্ছানো, তারপর গবাদি পশুর মতোই গোয়াল চালায় গাদাগাদি করে পুরুষ সহকর্মীদের সংগেই একত্রে ঠাই। এত অবমাননা অন্য কোন শিল্পে আছে কিনা জানা নেই সোহাগের। পায়ের তলায় একটু মাটি পেলেই ওই অবমাননা আর সইবে না সে। তাই পায়ের তলার মাটি খোজা শুরু হয়েছে তার। মাস খানেক ধরে মঞ্চে নামা বন্ধ রয়েছে। প্রসবের দিন আসন্ন। নিধারিত দিনে ভর্তি হয় হাসপাতালে। একা একে বারে একা। সংগে কেউ নেই। থাকার কথাও নয়। কিন্তু এসময় সবাই আত্মীয় স্বজনদের পাশে দেখতে চাই। পশুদের প্রসবের সময়ও পুরুষটি দাঁড়িয়ে থাকে তার সন্তানের জন্মদাত্রীর পাশে। সে কি তাহলে পশুরও অধম? প্রশ্নটা মনে জাগতেই ম্লান হাসি ফুটে ওঠে সোহাগের মুখে। সে হাসির আড়ালে লুকানো ব্যথা জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে চোখে। ভর্তির সময় হাসপাতালের কর্মীরা জিজ্ঞাসা করেন -- কি নাম আপনার স্বামীর ? সোহাগ জানায়, ভগবান দাস। কর্মীরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই সে বলে, কেমন ব্যাকডেটেট লাগছে তো? কি করব বলুন ওতে তো আমার কোন হাতে নেই। নামটা তো শ্বশুর শাশুড়ীরা রেখেছিলেন। তারা একটু প্রাচীনপন্থী মানুষ ছিলেন কিনা। ওই পরিস্থিতিতে নিজের রসিকতায় নিজেই অবাক হয়ে যায়।
কিন্তু ওটুকু করতে নাপারলে যে জটিলতার সম্ভাবনা ছিল তা সে ভালোই জানে। পরদিন সকালে ফুটফুটে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। জ্ঞান ফিরতেই জানলা দিয়ে চেনা মুখ খোঁজে সোহাগ। কিন্তু ছেলের কান্নায় সম্বিত ফেরে। কি বোকা সে, কে আছে তার ? তাকে দেখতে আসার মতো কেউ তো নেই। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে চোখের জলে ভিজতেই থাকে সোহাগের অভিমানী বুক। পরদিন ছেলেকে নিয়ে পাড়ায় ফেরে সোহাগ। পাড়া বলতে ছোটলাইনের ধার ঘেষা কয়েকটি খড়ের চালের মাটির বাড়ির যাত্রার বুকিং অফিস। ওইসব অফিসেই লাইট, মাইক, পোষাকের সংগে ফিমেলদেরও বায়না নেওয়া হয়। পাড়াটির চলতি নাম যাত্রাপাড়া। সেই বাড়িগুলির মধ্যে একটি সোহাগের। ছেলে কোলে সেই বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই দূর থেকে ঊকিঝুকি শুরু হয়ে যায় বাড়িগুলি থেকে। চাবি নিয়ে দরজাটা খুলে দেওয়ার জন্যও এগিয়ে আসে না কেউ। শুধু তার পোষা অভুক্ত কুকুরটা পায়ের কাছে এসে লেজ নাড়াতে থাকে। শুরু হয় ছেলেকে মানুষ করা এবং পায়ের তলায় মাটি খোঁজার লড়াই। ছেলে থেকেই তার সুখের দিন শুরু হবে ভেবে ছেলের নাম রাখে সুখময়। আদর করে সুখ বলে ডাকে। রাতে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে গল্প বলে। যাত্রার ডায়লক শোনায় কখনও বা নিজের ভাগ্যহত জীবনের কথাও রেখে ঢেকে বলে। বলতে বলতেই চোখ দিয়ে জল গড়ায়। টের পেয়ে ছেলে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে, মা তুমি কেদ না। তোমার কান্না দেখে যে আমারও কান্না পায়। বলতে বলতেই ফুপিয়ে ওঠে সুখ। ছেলেকে কাছে টেনে চুমায় চুমায় ভরিয়ে দেয় সোহাগ। ছেলেও মায়ের গলা জড়িয়ে বলে, মা তুমি আর কাদবে না বলো। আমি বড়ো হয়ে তোমাকে সুখী করব। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না মা। ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। বলে, জানি তো সোনা। সেই আশাতেই তো আমি বেচে আছি। ছেলে আর অভিনয় নিয়েই দিন কাটে সোহাগের।
সমায় গড়িয়ে চলে। সুখ প্রাইমারীর গন্ডী ছাড়িয়ে হাইস্কুলের চৌকাঠে পা রাখে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও মাধ্যমিকের বেশি আর এগোতে পারে না সে। ওই পরিবেশে সত্যিই সেটা সম্ভবও নয়। বায়না থাকলে ছেলেকেও সংগে নিয়ে যেতে হয়। রাতের পর রাত মা"কে ওই পরিস্থিতিতে দেখে এমনিতেই কেমন যেন হয়ে যায় সুখ । তার উপরে পাড়ায় অন্য দলের মালিক, ম্যানেজার, বায়না করতে আসা যাত্রা পার্টির লোকেদের মদ খেয়ে হল্লা, খিস্তি খেউর শুনতে শুনতে সে কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নিত্য নতুন পোষাক, ফুর্তির দিকেই তার বেশি মনোযোগ সোহাগও বুঝে যায় এ ছেলের পিছনে পড়াশোনার জন্য খরচ করা মানেই টাকা জলে ফেলা। তাই হাল ছেড়ে দিয়ে ছেলেকে স্থিতু করার কথা ভাবতে থাকে। নিজেরও বয়েস হচ্ছে। আর সে রকম ডাক মেলে না। নায়িকার রোল তো আর কেউ দেয় না। সাইড রোলে পয়সাও কম। তাই বিকল্প কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করে সে। হঠাৎ সেই সুযোগও মিলে যায় একদিন। তার পাশেই রামকৃষ্ণ অপেরা। মালিক মারা যাওয়ার পর তার ছেলে সাজ পোষাক সহ সব কিছু বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। সোহাগ তার সবর্স্ব দিয়ে সেটি কিনে নেয়।ছেলের নামে তার অপেরার নাম হয় সুখময় অপেরা। ছেলেকে করে দল ম্যানেজার। নিজেও অভিনয় ছেড়ে দিয়ে দল পরিচালনা শুরু করে।নিজের দল করার স্বপ্নটা এভাবে পূরণ হয়ে যাবে ভাবতেও পারে নি সোহাগ। তাই দ্বিগুন উদ্যমে দলটাকে গড়তে শুরু করে সে। তার সুদক্ষ পরিচালনায় ভালো শিল্পী, যন্ত্রী, গায়করা যোগ দেয় তার দলে। অন্যদের পিছনে ফেলে বায়নাও বাড়তে থাকে তার দলে।
একদিন মুর্শিদাবাদ থেকে হাজির হয় সুবর্না দাস নামে সুশ্রী একটি মেয়েও। কথায় কথায় জানা যায়, বাপ মা মরা মেয়েটির তিনকুলে কেউ নেই। জংগীপুরের একটি পঞ্চরস দলে অভিনয় করত সে। কিন্তু দলের মালিকের কুনজর ছিল তার উপর। তার লালসা থেকে বাঁচতেই সে পালিয়ে এসেছে। সোহাগের পা জড়িয়ে ধরে মেয়েটি বলে, মাসী আমাকে তোমার দলে একটু জায়গা দাও। কোন টাকা পয়সা চাই না। দুটি খেতে পড়তে দিলেই হবে। চকিতে নিজের ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ে যায় সোহাগের। এই লাইনের এই দস্তুর। সবাই অসহয়তার সুযোগ নিতে চায় মেয়েটিকে তুলে ধরে সোহাগ। কেমন যেন মায়াবী মুখ বাপ মা মরা মেয়েটার। বলে, শোন মেয়ে তোমাকে আমি ঠাই দিতে পারি। কিন্তু বসিয়ে বসিয়ে তো খাওয়াতে পারব না বাপু। আমার সেই সামর্থ্যও নেই। তোমায় অভিনয় করেই খেতে হবে। পঞ্চরসের সংগে যাত্রার অভিনয়ের কিছুটা পার্থক্য আছে। তোমাকে তালিম দিয়ে গড়ে পিঠে নেব। কিন্তু কোনদিন ল্যাং মারবে না তো ? কথা শেষ হওয়ার আগেই মেয়েটি বলে ওঠে, মাসীমা নয়, আজ থেকে তুমি আমার মা হলে। মেয়ে কি মাকে কোনদিন ল্যাং মারতে পারে বলো ? সেই থেকেই সুবর্নার ঠিকানা হয় সুখময় অপেরা।যাত্রাস্থলে সোহাগই তাকে সংগে করে নিয়ে যায়। মেয়ে বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাই মায়ের সামনে মেয়ের সংগে কেউ বেচাল করার সাহস দেখায় না। পাখার আড়ালে মেয়েটিকে যেন আগলে রাখে সোহাগ। এমনি ছত্রছায়া দিয়ে তাকেও কেউ আগলে রাখত তাহলে কি জীবনটা তার এরকম হত? সাজঘরে বসে ভাবতে থাকে সোহাগ।
বাপ-মা মরা মেয়েটা সোহাগের কাছেই থাকে। কেমন যেন মায়া পড়ে গ্যাছে মেয়েটার উপরে। মনের কোনে একটা সুপ্ত ইচ্ছেও উকি দেয় । যদি মেয়েটাকে বৌ করে ঘরে তোলা যেত। যদি ওর একটা ঘর সংসার হোত।
ভাগাভাগি নয়, যদি একটা পুরোপুরি নিজের মানুষ হোত মেয়েটির। একটা নিজের ঘর, একটা নিজের মানুষ সব মেয়েই চায়। ভাগ্যের পরিহাসে সমাজের মুলস্রোত থেকে ছিটকে গেলেও তারাও তো মানুষ। সেই মনটা তো তাদের মরে যায় না। কোথাও এক রাতের জন্য রানী সাজে তো কোথাও ভরা সংসারের সুখী গৃহিনী। রাতের পর রাত ওইভাবে সাজতে সাজতে ঘর সংসারের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের লাইনের মেয়েদের শুধু রঙ মেখে সঙ সাজাই সার হয়, সংসার হয় না। শুধু তাদের দীর্ঘনিশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। কেউ তা টেরও পাই না। সমাজ তাদের বিনোদন আর ভোগের সামগ্রী করেই রাখে। বাপ-মা মরা মেয়েটাকে যদি দেওয়া যেত নিজের একটা সংসার, একটা মানুষ! কথাটা একদিন পেড়েই ফেললেন ছেলের কাছে।বললেন-- হ্যারে সুখ সুবর্ণাকে তোর কেমন লাগে ? ইঙ্গিতটা বুঝতে পারে ছেলে। লজ্জা ঢাকতে সে'ই পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় -- কেন বলতো মা? জবাবে সোহাগ বলে, ভাবছি ওকে তোর বৌ করে ঘরে তুলব। ছেলে বলে, সে তুমি যা ভালো বোঝ করো। ছেলের মত তো জানা হোল, এবার সুবর্ণার মতটাও জানা দরকার। তার কাছেও কথা পাড়ে সোহাগ। কথাটা শুনেই সুবর্ণা বলে, মা তোমার পায়ে ঠাই দিয়েছো, তোমার পায়েই থাকতে চাই। বুঝতে আর কিছু বাকি থাকে না সোহাগের। মনে মনে বলে, ওরে ছুড়ি রে। তলায় তলায় এতদুর। জল তাহলে অনেক দূর গড়িয়েছে।
অদ্ভুত এক ভালো লাগায় ভরে যায় সোহাগের মন। তার নিজের না হোক, তারই মতো ভাগ্য বিড়ম্বিত একটি মেয়েরও অন্তত নিজের সংসার, নিজের মানুষের নিশ্চয়তা দিতে পারল সে। শুরু হয়ে যায় বিয়ের তোড়জোড়। সুবর্ণাকে নিয়ে বাজার করা শুরু করে সোহাগ। নিজের কিছু সোনা রূপোর গয়না ছিল সেগুলো ভেংগে হবু বৌয়ের পচ্ছন্দ মতো হাল ফ্যাসানের গয়না করতে দেওয়া হয়। গোটা যাত্রাপাড়া কবজি ডুবিয়ে খাওয়ার জন্য বলা হয় ক্যাটারারকে। কোন দিকেই খুত রাখতে চাই না সোহাগ। কেবল একটা বিষয়েই তার খুতখুতানি যায় না। ছেলে মেয়ে দুটোর চার হাত এক করে দেওয়ার মতো যদি মুরুব্বি গোছের নিজের কেউ থাকত! বাপ- মা মরা মেয়েটার কথা না হয় বাদই গেল। দলের মেকাপম্যান ভজনকাকা ওকে মেয়ের মতোই দেখেন। তিনিই সম্প্রদান করবেন বলে ঠিক করে বসে আছেন। কিন্তু ছেলেটা ? তার প্রতি কোন দায় দায়িত্ব পালন না করুক, বাবা হিসাবে হাত ধরে এই দরজাটা যদি পার করে দিয়ে যেত। কতবার ভেবেছে, আর একবার লজ্জার মাথা খেয়ে লোকটাকে কথাটা গিয়ে বলে। কিন্তু শুধু শুধু অপমানিত হতে হবে ভেবে নিরস্ত হয়েছে।শেষে মদনদা ওই দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন। মদনদা দলে বাঁশী বাজান। সুখকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। অবশেষে নির্ধারিত দিনে বেজে ওঠে সানাই। ভেসে আসে বৈদিক মন্ত্রোচারণ -- যদিদং হৃদং ---।
ওই মন্ত্র শুনতে শুনতে কোথাই যেন হারিয়ে যায় সোহাগ। মঞ্চে কতবার যে ওই মন্ত্র উচ্চারণ করেছে তার ঠিক নেই। এ জীবনে আর সত্যিকারের মন্ত্র উচ্চারণ তার করা হোল না।তার কানে শুধু বাজতেই থাকে -- যদিদং হৃদং ---। বিয়ের মতোই পরবর্তী অনুষ্ঠানগুলিতেও কোন খুত রাখতে চায় না সোহাগ। হোক না ফিমেলের , কিন্তু একমাত্র ছেলে তো! সবেধন নীলমনি, তার নাড়ী ছেঁড়া ধন। কেবল স্ত্রী আচারের সময় কিছুটা সমস্যা পড়তে হয় তাকে। ভোজে কবজি ডুবিয়ে খেয়ে গেলেও স্ত্রী আচারে হাত লাগাতে এগিয়ে আসে না কেউ।মানুষের এই এক সমস্যা, সবাই লাথি ঝাঁটা খাচ্ছ ঠিক আছে,কিন্তু তারই মধ্যে কেউ যদি একটু মাথা তুলে দাঁড়ায় তাহলে বাকিরা হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে। ফিমেল হলেও তারাও তো সেই মানুষই। অগত্যা দলের যন্ত্রী, গায়ক, অভিনেত্রীদের পরিবারের মহিলাদের নিয়েই স্ত্রী আচার সারতে হয়। ভজনকাকা সুবর্ণাকে সম্প্রদান করেছিলেন তাই তিনিই নিজের কাঁধে দ্বিরাগমনের দায়িত্ব চাপিয়ে নেন। সোহাগদের বাড়ি থেকে ভজনকাকার বাড়ি কাছেই। দিব্যি রিক্সায় করে যাতায়াত করা যায়। কিন্তু ছেলে বৌমায়ের জন্য চার চাকার গাড়ির ব্যবস্থা করে সোহাগ। দেখে পাড়ার সুলতা, মনিকা, ছন্দারা নাক কোঁচকায়। দ্বিরাগমন থেকে ফেরার পরই সুখ-সুবর্ণাকে পুরীতে হনিমুনেও পাঠায় সে। নিজে তো আর ওসবের মর্ম জানে না। অভিনয়ের সুবাদেই জেনেছে। এত বাড়াবাড়ি আর সহ্য করতে পারে না পাড়ার মেয়েরা। তারা "কালে কালে দেখব কত, ভিখিরিরও ঠাট রাজার মত" জাতীয় মন্তব্য হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয়।
ওসব গায়ে মাখে না সোহাগ।অথচ সোহাগ কখনো কোন বিষয়ে হিংসা করে না। বরং সব সময় পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। এইতো সেদিন জ্বরে বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল মনিকা। পয়সার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছিল না।
শোনার পরই সোহাগ তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। শুধু তাই নয় , সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত দুবেলা তার বাড়িতে খাবার পৌঁছে দিয়েছে। বায়নার অভাবে ছন্দা চোখে অন্ধকার দেখছিল। নিজের বায়না সে ছন্দাকে ধরে দিয়েছে। কয়েকদিনেই সবাই কেমন ভুলে গিয়েছে। ওদেরই বা দোষ কি? ওরা তো ভুলে যেতেই পারে। তার নিজের বাড়ির লোকেরাও কি তাকে মনে রেখেছে? বাড়িটা কি তার আর নিজের আছে? আদৌ কোনদিন নিজের ছিল ? একাকী ঘরে মনের মধ্যে প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতেই থাকে। পিঠাপিঠি পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল মেজ। নাম একটা রাখতে হয় বলেই হয়তো তার নাম রাখা হয়েছিল সোহাগ। কিন্তু সোহাগ জিনিসটা আসলে কি, মাথায় দেয় না খায় তা জানা ছিল না এই সেদিন পর্যন্ত। শুধু সোহাগেরই নয়, তাদের মতো প্রতিটি পরিবারেই একই ছবি। এখন অবশ্য নানা সুযোগ সুবিধা হয়েছে বলে শুনেছে সোহাগ। কিন্তু তাদের সময় এইসব সুযোগ ছিল না। দিন কতক বই আর চ্যাটাই বগলে স্কুলে যাওয়ার পরই আর ধৈর্য রাখতে পারত না বাবা-মা।
বই তাকে তুলে রেখে ছেলে মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিত ঝুড়ি আর কেদে। একপাল ছাগল নিয়ে মাঠে মাঠে ঘাস কেটে বেড়াত তারা। বাগানে বাগানে আমের সময় আম, তালের সময় তাল কুড়িয়ে বাবুদের বাড়িতে দিয়ে আঁচলে মুড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরত তারা। বাবা--মায়ের মুখে হাসি ফুটে উঠত। ঘাস কাটা, নালা ছেঁচে কুচো মাছ ধরায় তাদের সংসারে সুসার হয়। লেখাপড়ায় শুধু সময় নষ্ট। ছেলেদের সেই তো বাবুদের বাডিতে মাহিন্দারি, মেয়েদের ঝিগিরি। একটু বড়ো হলেই কলকাতা কিম্বা বিহার। একে একে সব যেন ছবির মতো ভেসে ওঠে। তাদের বাড়ির পাশেই ছিল কবিতা আর প্রসাদী দিদিদের বাড়ি। দুজনেই বেশ সুন্দরী।বাবুদের বাড়ির ছেলেরা সেইজন্য দিনরাত ঘুরঘুর করত ওদের পাড়াতে। সেই জন্য বেজায় খাপ্পা হয়ে ওঠেন বাবুরা। একদিন বাড়ি চড়ে যা ইচ্ছে তাই বলে যান সুদেববাবু। কবিতা দিদি আর প্রসাদীদিদির বাবাকে ডেকে বলেন, হ্যারে রামা-শ্যামা তোদের কি আক্কেল বলতে কিছু নেই। বুড়ো ধাড়ি মেয়েগুলোকে বাড়িতে রেখেছিস এখনো। যেমন করে হোক বিদায় কর। এরপর কিছু একটা অঘটন ঘটে গেলে তোদের গুষ্টি সুদ্ধো গ্রাম ছাড়া করব। রামা কাকারা সেদিন মাথা নিচু করে পায়ের নখ দিয়ে মাটি আঁচড়ে ছিলেন। কিছু বলতে পারেন নি। কি'ই বা বলতে পারতেন ? মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য কোথাই তাদের ?
সোহাগও ভেবে পায় নি বাবুদের ছেলের জন্য কেন কবিতাদিদিদেরই বিদায় করতে হবে ? বাবুরা তাদের ছেলেগুলোকে এপাড়ায় আসা বন্ধ করে দিলেই তো পারে। কিন্তু সেসব কিছুই হয় না। কয়েকদিন পর আড়কাঠি ধরে কবিতাদিদিকে কলকাতা আর প্রসাদীদিদিকে বিয়ের নামে বিহারে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন রামা কাকারা। সেই থেকে হারিয়ে যায় কবিতাদিদিরা। তাই বাবা তাকে যখন কাটোয়ায় শেফালিদির কাছে পাঠায় তখন কবিতাদিদিদের থেকে নিজেকে ভাগ্যবতী মেনেছিল সোহাগ। আর যাই হোক মাঝে মধ্যে বাবা-মা, ভাই-বোনগুলোর সংগে দেখা তো অন্তত হবে। কিন্তু সে ভাবনা তার ভুল। বাড়ি যাদের বাইরে পাঠায় তাদের বোধহয় ভিতরে ঢোকার অধিকার হারিয়ে যায়। কতদিন বাবা-মা, ভাই-বোনদের দেখে নি সোহাগ। বাড়ি থেকে আসার সময় সবার সংগে বেনেপাড়ার মেলায় তোলা ছবিটা সংগে নিয়ে এসেছিল। চোখের সামনে সেটা মেলে ধরতেই মুখগুলো সব কেমন আবছা হয়ে আসে। টপটপ করে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে সাদাকালো ছবিটিতে। তাড়াতাড়ি কাপড়ের আঁচল দিয়ে মোছে সোহাগ। নাড়ি সংগে যোগ বলতে তো ওই ছবিটাই সম্বল। তাই নাড়িছেঁড়া ধনের বুকে ছবিটাকে আঁকড়ে ধরে থাকে সে।
পুকুর ঘাটে স্নান করতে গিয়ে মায়ের সংগে আলাপ হয় শেফালীর। সব শুনে শেফালি মাকে বলেন, ওকে আমার হাতে ছেড়ে দাও। আমি ওকে গড়ে পিঠে নেব। তখন ওর রোজগারেই তোমরা পায়ের উপর পা তুলে খাবে।
প্রস্তাবটা মায়ের কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার সামিল। একটা পেট তো কমবে। তার উপরে পায়ে পা তুলে খাওয়ার প্রলোভন। সোহাগ তখন আর মেয়ে নয়, নিছকই একটা পেট আর পেট ভরানোর উপাদান। শুনে কেঁদে ভাসিয়েছিল সোহাগ। কতই বা বয়েস তখন তার। বড়ো জোর ১২ কি ১৩। মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, মা আমাকে ওদের সংগে পাঠিও না। তোমাদের ছেড়ে আমি থাকতে পারব না। আমি বরং আরো দুটো বাড়িতে ঝিগিরি করব। কিন্তু মা কোন কথাই কানে তোলেন নি। চোখ পাকিয়ে বলেন, তোমার মতো বয়েসে আমি বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে ঢুকেছিলাম। কোন আপত্তিই টেকে না সোহাগের। পরদিন সকালে মা পরিপাটি করে চুল বেধে দিয়েছিলেন। পুটুলিতে একটা জামা প্যান্ট ভরে দিয়ে মা চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, বুঝিসই তো মা আমাদের অবস্থা। নাহলে মেয়েকে কেউ অতদুরে পাঠায় ? মন খারাপ করিস না। তোর বাবা মাঝে মধ্যে যাবে। তোকে নিয়েও আসবে। পুটুলি
বগলে গোরুর গাড়িতে গিয়ে বসেছিল ছোট্ট মেয়েটি। চোখের জলে ঝাপসা হতে হতে মিলিয়ে গিয়েছিল বাবা মা, ভাই বোনেদের মুখ।
আর মাসে মাসে বাবার হাতে যৎসামান্য কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে সমস্তটাই আত্মসাত করেন তিনি। তার রোজগারের টাকাতেই শেফালিদি লাইট, মাইক, পোষাক কিনে অপেরা খুলে বসেন। সেখানে সাইন বোর্ডে লাইট, মাইক,পোষাকের সংগে তার অর্ধনগ্ন ছবি ছাপা হয়। লেখা হয় লাইট, মাইক, পোষাক এবং উন্নতমানের ফিমেল ভাড়া পাওয়া যায়।
কিছুটা সেই তাগিদেও সুনীলের হাতে সিঁদুর পড়ে সোহাগ। দল গড়ার জন্য ফের শুরু হয় টাকা জমানো। কিন্তু আগের মতোই গাছাড়া ভাব দেখা যায় সুনীলের মধ্যেও। শেষে একদিন সোহাগ জানতে পারে, সুনীলের বাড়িতে তার স্ত্রী ছেলে মেয়ে রয়েছে। সেই কথা তুলতেই খিস্তির বন্যা বইয়ে দেয় সুনীল, তুই কি ভেবেছিলি মাগী। সাতঘাটের জল খাওয়া তোর মতো ফিমেলকে আমি ঘরে তুলব। যেটুকু পাচ্ছিস তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারিস থাক, নাহলে পথ দেখ। চোখ ফেটে জল আসে। অনেক কথা মনের মধ্যে ভীড় করে আসে। মনকে বোঝায়, তাদের মতো মেয়েদের তো পুরোপুরি কিছু পাওয়া ভাগ্যে লেখা নেই। প্রেম ভালোবাসা , ঘর সংসার সবই হাত তোলা। ওই সুখও বেশিদিন স্থায়ী হয় না।
মতো ঢুকে যায় তার কথাগুলো, কি করবি তা আমরা কি জানি। পেট খসিয়ে আবার কাউকে ধরে নে। নাহলে গলায় কলসি বেধে কুয়ে নদীতে ডুবে মর। এখানে লোক খিটকেল করবি না বেশ্যা মাগি। নইলে ঝেটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব। সশব্দে মুখের উপর বন্ধ হয়ে যায় দরজা। নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে যায় সোহাগের। মনে মনে বলে, ঠাকুর প্রতিদিন আসরে নামার আগে তোমার স্মরণ নিই। কিন্তু কেন আমাদের সংগে বার বার এমন হয়? কেন যে ডাল ধরি তাই ভেঙে যায় ?
কেমন
নিঝঞ্ঝাট হয়ে যাবি। কেউ বা বলেছে, হ্যারে ওর বাবার পরিচয় কি হবে ? সব শুনে চিৎকার করে উঠেছে সোহাগ --- না , ও আমার পরিচয়েই বেড়ে উঠবে। আমিই ওর বাবা, আমিই ওর মা ।অনাগত সন্তানের কথা ভেবে অনলস পরিশ্রম শুরু করে সে। দুর--দুরান্তে বায়না নিয়ে অভিনয় করতে চলে যায়। কিছু করে টাকা জমাতেও শুরু করে। তার এই অসহায়তার সুযোগে কতজন হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসেছে। সেসব সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছে সে। কারণ ওইসব হাতের ভাষা ততদিনে তার ভালো রকম চেনা হয়ে গিয়েছে। ওইসব হাতই তো মঞ্চে পুরস্কার হিসাবে ১০/২০ টাকার নোট সেপটিপিন দিয়ে ব্লাউজে গেঁথে দেওয়ার অছিলায় অস্যভতা করে। ওইসব হাতই তো মহড়ার সময় অভিনয় বুঝিয়ে দেওয়ার অজুহাতে স্পর্শ সুখ খোঁজে। পেটে সন্তান আসার পর থেকে ওইসব হাতের নাগাল কায়দা করে এড়িয়ে যায়। কেমন যেন গা ঘিন ঘিন করে। কিন্তু সবক্ষেত্রে পারে কি ? অভিনয়ের সময় অনেকেই অনাব্যশক কারণে শরীরের উপরে হামলে পড়ে। সাজঘরে কুইংগিত দেয়। সহকর্মীরা দেখেও দেখে না। কারণ ওটাই দস্তুর। ওই সুযোগটুকুর জন্যই তো অনেকে যাত্রা মঞ্চস্থ করার ঝক্কি পোহান। সেটুকু তাদের না দিলে যে বায়নাই হবে না। তাই সোহাগকেও কিছুটা মানিয়ে নিতে হয়। নাহলে ঘেন্না ধরে গিয়েছে।
যাত্রাদলের কেমন সব গালভরা নাম। কোথাও শিল্পী সংঘ তো কোথাও শিল্পী বন্দনা। কিন্তু কোথাও এক ফোঁটা শিল্পীর সম্মান জোটে না। ঠায় রোদে খোলা গরুর গাড়িতে পোশাক, লাইট, মাইকের বাক্সের উপর বসে অভিনয়স্থলে পৌঁচ্ছানো, তারপর গবাদি পশুর মতোই গোয়াল চালায় গাদাগাদি করে পুরুষ সহকর্মীদের সংগেই একত্রে ঠাই। এত অবমাননা অন্য কোন শিল্পে আছে কিনা জানা নেই সোহাগের। পায়ের তলায় একটু মাটি পেলেই ওই অবমাননা আর সইবে না সে। তাই পায়ের তলার মাটি খোজা শুরু হয়েছে তার। মাস খানেক ধরে মঞ্চে নামা বন্ধ
রয়েছে। প্রসবের দিন আসন্ন। নিধারিত দিনে ভর্তি হয় হাসপাতালে। একা একে বারে একা। সংগে কেউ নেই। থাকার কথাও নয়। কিন্তু এসময় সবাই আত্মীয় স্বজনদের পাশে দেখতে চাই। পশুদের প্রসবের সময়ও পুরুষটি দাঁড়িয়ে থাকে তার সন্তানের জন্মদাত্রীর পাশে। সে কি তাহলে পশুরও অধম? প্রশ্নটা মনে জাগতেই ম্লান হাসি ফুটে ওঠে সোহাগের মুখে। সে হাসির আড়ালে লুকানো ব্যথা জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে চোখে। ভর্তির সময় হাসপাতালের কর্মীরা জিজ্ঞাসা করেন -- কি নাম আপনার স্বামীর ? সোহাগ জানায়, ভগবান দাস। কর্মীরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই সে বলে, কেমন ব্যাকডেটেট লাগছে তো? কি করব বলুন ওতে তো আমার কোন হাতে নেই। নামটা তো শ্বশুর শাশুড়ীরা রেখেছিলেন। তারা একটু প্রাচীনপন্থী মানুষ ছিলেন কিনা। ওই পরিস্থিতিতে নিজের রসিকতায় নিজেই অবাক হয়ে যায়।
সমায় গড়িয়ে চলে। সুখ প্রাইমারীর গন্ডী ছাড়িয়ে হাইস্কুলের চৌকাঠে পা রাখে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও মাধ্যমিকের বেশি আর এগোতে পারে না সে। ওই পরিবেশে সত্যিই সেটা সম্ভবও নয়। বায়না থাকলে ছেলেকেও সংগে নিয়ে যেতে হয়। রাতের পর রাত মা"কে ওই পরিস্থিতিতে দেখে এমনিতেই কেমন যেন হয়ে যায় সুখ । তার উপরে পাড়ায় অন্য দলের মালিক, ম্যানেজার, বায়না করতে আসা যাত্রা পার্টির লোকেদের মদ খেয়ে হল্লা, খিস্তি খেউর শুনতে শুনতে সে কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নিত্য নতুন পোষাক, ফুর্তির দিকেই তার বেশি মনোযোগ সোহাগও বুঝে যায় এ ছেলের পিছনে পড়াশোনার জন্য খরচ করা মানেই টাকা জলে ফেলা। তাই হাল ছেড়ে দিয়ে ছেলেকে স্থিতু
করার কথা ভাবতে থাকে। নিজেরও বয়েস হচ্ছে। আর সে রকম ডাক মেলে না। নায়িকার রোল তো আর কেউ দেয় না। সাইড রোলে পয়সাও কম। তাই বিকল্প কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করে সে। হঠাৎ সেই সুযোগও মিলে যায় একদিন। তার পাশেই রামকৃষ্ণ অপেরা। মালিক মারা যাওয়ার পর তার ছেলে সাজ পোষাক সহ সব কিছু বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। সোহাগ তার সবর্স্ব দিয়ে সেটি কিনে নেয়।ছেলের নামে তার অপেরার নাম হয় সুখময় অপেরা। ছেলেকে করে দল ম্যানেজার। নিজেও অভিনয় ছেড়ে দিয়ে দল পরিচালনা শুরু করে।নিজের দল করার স্বপ্নটা এভাবে পূরণ হয়ে যাবে ভাবতেও পারে নি সোহাগ। তাই দ্বিগুন উদ্যমে দলটাকে গড়তে শুরু করে সে। তার সুদক্ষ পরিচালনায় ভালো শিল্পী, যন্ত্রী, গায়করা যোগ দেয় তার দলে। অন্যদের পিছনে ফেলে বায়নাও বাড়তে থাকে তার দলে।
খেতে হবে। পঞ্চরসের সংগে যাত্রার অভিনয়ের কিছুটা পার্থক্য আছে। তোমাকে তালিম দিয়ে গড়ে পিঠে নেব। কিন্তু কোনদিন ল্যাং মারবে না তো ? কথা শেষ হওয়ার আগেই মেয়েটি বলে ওঠে, মাসীমা নয়, আজ থেকে তুমি আমার মা হলে। মেয়ে কি মাকে কোনদিন ল্যাং মারতে পারে বলো ? সেই থেকেই সুবর্নার ঠিকানা হয় সুখময় অপেরা।যাত্রাস্থলে সোহাগই তাকে সংগে করে নিয়ে যায়। মেয়ে বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাই মায়ের সামনে মেয়ের সংগে কেউ বেচাল করার সাহস দেখায় না। পাখার আড়ালে মেয়েটিকে যেন আগলে রাখে সোহাগ। এমনি ছত্রছায়া দিয়ে তাকেও কেউ আগলে রাখত তাহলে কি জীবনটা তার এরকম হত? সাজঘরে বসে ভাবতে থাকে সোহাগ।
ভাগাভাগি নয়, যদি একটা পুরোপুরি নিজের মানুষ হোত মেয়েটির। একটা নিজের ঘর, একটা নিজের মানুষ সব মেয়েই চায়। ভাগ্যের পরিহাসে সমাজের মুলস্রোত থেকে ছিটকে গেলেও তারাও তো মানুষ। সেই মনটা তো তাদের মরে যায় না। কোথাও এক রাতের জন্য রানী সাজে তো কোথাও ভরা সংসারের সুখী গৃহিনী। রাতের পর রাত ওইভাবে সাজতে সাজতে ঘর সংসারের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের লাইনের মেয়েদের শুধু রঙ মেখে সঙ সাজাই সার হয়, সংসার হয় না। শুধু তাদের দীর্ঘনিশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। কেউ তা টেরও পাই না। সমাজ তাদের বিনোদন আর ভোগের সামগ্রী করেই রাখে। বাপ-মা মরা মেয়েটাকে যদি দেওয়া যেত নিজের একটা সংসার, একটা মানুষ! কথাটা একদিন পেড়েই ফেললেন ছেলের কাছে।বললেন-- হ্যারে সুখ সুবর্ণাকে তোর কেমন লাগে ? ইঙ্গিতটা বুঝতে পারে ছেলে। লজ্জা ঢাকতে সে'ই পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় -- কেন বলতো মা? জবাবে সোহাগ বলে, ভাবছি ওকে তোর বৌ করে ঘরে তুলব। ছেলে বলে, সে তুমি যা ভালো বোঝ করো। ছেলের মত তো জানা হোল, এবার সুবর্ণার মতটাও জানা দরকার। তার কাছেও কথা পাড়ে সোহাগ। কথাটা শুনেই সুবর্ণা বলে, মা তোমার পায়ে ঠাই দিয়েছো, তোমার পায়েই থাকতে চাই। বুঝতে আর কিছু বাকি থাকে না সোহাগের। মনে মনে বলে, ওরে ছুড়ি রে। তলায় তলায় এতদুর। জল তাহলে অনেক দূর গড়িয়েছে।
ওসব গায়ে মাখে না সোহাগ।অথচ সোহাগ কখনো কোন বিষয়ে হিংসা করে না। বরং সব সময় পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। এইতো সেদিন জ্বরে বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল মনিকা। পয়সার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছিল না।
শোনার পরই সোহাগ তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। শুধু তাই নয় , সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত দুবেলা তার বাড়িতে খাবার পৌঁছে দিয়েছে। বায়নার অভাবে ছন্দা চোখে অন্ধকার দেখছিল। নিজের বায়না সে ছন্দাকে ধরে দিয়েছে। কয়েকদিনেই সবাই কেমন ভুলে গিয়েছে। ওদেরই বা দোষ কি? ওরা তো ভুলে যেতেই পারে। তার নিজের বাড়ির লোকেরাও কি তাকে মনে রেখেছে? বাড়িটা কি তার আর নিজের আছে? আদৌ কোনদিন নিজের ছিল ? একাকী ঘরে মনের মধ্যে প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতেই থাকে। পিঠাপিঠি পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল মেজ। নাম একটা রাখতে হয় বলেই হয়তো তার নাম রাখা হয়েছিল সোহাগ। কিন্তু সোহাগ জিনিসটা আসলে কি, মাথায় দেয় না খায় তা জানা ছিল না এই সেদিন পর্যন্ত। শুধু সোহাগেরই নয়, তাদের মতো প্রতিটি পরিবারেই একই ছবি। এখন অবশ্য নানা সুযোগ সুবিধা হয়েছে বলে শুনেছে সোহাগ। কিন্তু তাদের সময় এইসব সুযোগ ছিল না। দিন কতক বই আর চ্যাটাই বগলে স্কুলে যাওয়ার পরই আর ধৈর্য রাখতে পারত না বাবা-মা।
মাঠে মাঠে ঘাস কেটে বেড়াত তারা। বাগানে বাগানে আমের সময় আম, তালের সময় তাল কুড়িয়ে বাবুদের বাড়িতে দিয়ে আঁচলে মুড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরত তারা। বাবা--মায়ের মুখে হাসি ফুটে উঠত। ঘাস কাটা, নালা ছেঁচে কুচো মাছ ধরায় তাদের সংসারে সুসার হয়। লেখাপড়ায় শুধু সময় নষ্ট। ছেলেদের সেই তো বাবুদের বাডিতে মাহিন্দারি, মেয়েদের ঝিগিরি। একটু বড়ো হলেই কলকাতা কিম্বা বিহার। একে একে সব যেন ছবির মতো ভেসে ওঠে। তাদের বাড়ির পাশেই ছিল কবিতা আর প্রসাদী দিদিদের বাড়ি। দুজনেই বেশ সুন্দরী।বাবুদের বাড়ির ছেলেরা সেইজন্য দিনরাত ঘুরঘুর করত ওদের পাড়াতে। সেই জন্য বেজায় খাপ্পা হয়ে ওঠেন বাবুরা। একদিন বাড়ি চড়ে যা ইচ্ছে তাই বলে যান সুদেববাবু। কবিতা দিদি আর প্রসাদীদিদির বাবাকে ডেকে বলেন, হ্যারে রামা-শ্যামা তোদের কি আক্কেল বলতে কিছু নেই। বুড়ো ধাড়ি মেয়েগুলোকে বাড়িতে রেখেছিস এখনো। যেমন করে হোক বিদায় কর। এরপর কিছু একটা অঘটন ঘটে গেলে তোদের গুষ্টি সুদ্ধো গ্রাম ছাড়া করব। রামা কাকারা সেদিন মাথা নিচু করে পায়ের নখ দিয়ে মাটি আঁচড়ে ছিলেন। কিছু বলতে পারেন নি। কি'ই বা বলতে পারতেন ? মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য কোথাই তাদের ?


No comments:
Post a Comment