কবিতাগুচ্ছ --১৪
অর্ঘ্য ঘোষ
মুখোমুখি বাড়ি
এ বাড়ি ওবাড়ি , মাঝে বিভেদের পাঁচিল।
ও বাড়ির দাপটে এ বাড়িতে শান্তি নেই এক তিল ।
এ বাড়ির কথাগুলো ও বাড়ির কানে বাজে ভারী।
ও বাড়ির কর্তার তাই এ বাড়ির সঙ্গে রয়েছে আড়ি।
এ বাড়ির কর্ত্রীরও ও বাড়ির সঙ্গে নেই মুখ দেখাদেখি।
ও বাড়ির কিশোরীর সংগে এ বাড়ির কিশোরের রোজ হয় চোখাচোখি।
এ বাড়ির দরজা জানলা সব মুখোমুখি।
ও বাড়িতে বিভেদের পর্দা তবু রাখে আলো ঢাকি।
এ বাড়ির জানলায় উদাস কিশোরী
ও বাড়ির কিশোরের মনটাও ভারী।
এ বাড়ির শব্দেরা ও বাড়ির চোকাঠে মাথা কুটে মরে
ও বাড়ির কিশোর মন ভরে এ বাড়ির কিশোরীর নুপুরের রুনুঝুনু সুরে।
এ বাড়ির কিশোরী দুবেণী ঝুলিয়ে স্কুলে যেতে চায় আশপাশ।
ও বাড়ির কিশোরকে দোলা দেয় বসন্ত বাতাস।
এ বাড়ির কিশোরীর নাকের নোলক,
ও বাড়ির কিশোরের মনে গড়ে মায়ালোক।
এ বাড়ির গাছের পাতাটিরও পড়াটা বারণ ও বাড়ির উঠোনের মাঝে।
ও বাড়ির কিশোরের চিঠি তবু পায় ঠাঁই ও বাড়ির কিশোরীর বইয়ের ভাজে।
এ বাড়ির কিশোরীর মনে গড়ে ওঠে ভালোবাসা।
ও বাড়ির কিশোরের চোখে জ্বাল বোনে স্বপ্ন-আশা।
এ বাড়ির মেয়েটির দুর শহরে বিয়ে হয় পাকা।
ও বাড়ির ছেলেটির মনে হয় বিশ্বভূবন ফাঁকা।
এ বাড়ির মেয়েটি চোখের জলে ভাসে।
ও বাড়ির ছেলেটি শুধু ম্লান হাসি হাসে।
এ বাড়িতে যেদিন সকাল থেকেই সানাই বাজে।
ও বাড়ির ছেলেটি সেদিন শহরে ছোটে মিথ্যে কাজে।
এ বাড়িতে সন্ধ্যে থেকেই জ্বলে ওঠে রঙ বেরঙএর আলো।
ও বাড়ির ছেলেটি চুপি চুপি ঘরে ফেরে মুখ করে কালো।
এ বাড়ির মেয়েটির বুক ফেটে যায় অব্যক্ত যন্ত্রনায়।
ও বাড়ির ছেলেটির মন করে শুধু হায় হায়।
এ বাড়ির মেয়েটির বুক ফাটে তবুও কথা ফোটে না মুখে
ও বাড়ির ছেলেটি তখন দুয়ার দিয়েছে ঘরে ঢুকে।
এ বাড়িতে হঠাৎ থেমে যায় মেয়েটির বিয়ের সানাই।
ও বাড়ির ছেলেটির তখন কোন হুঁশ নাই।
এ বাড়ির মেয়েটির হবু বর তখন পণ না পেয়ে গিয়েছে চলে।
ও বাড়ির ছেলেটি তখন সরবতে ঘুমের বড়ি ফেলেছে গুলে।
এ বাড়িতে তখন কান্নার রোল , বুঝি বা লগ্নভ্রষ্টা হয় মেয়ে।
ও বাড়ির ছেলের দরজায় কড়া নাড়ে বন্ধুরা সে খবর নিয়ে।
এ বাড়ির মেয়েটি তখন মনে মনে ভাবে অন্য কথা ,
ও বাড়ির ছেলেটির বন্ধুরা তখন ঘামায় মাথা।
এ বাড়িতে কর্তারা চিন্তায় ছেঁড়েন মাথার চুল।
ও বাড়ির ছেলেটিকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে আর করে না ভুল।
এ বাড়িতে আবার বেজে ওঠে সানাই, জ্বলে ওঠে নিভে যাওয়া আলো।
ও বাড়ির কর্ত্রীকে এ বাড়ির কর্তা বলেন , বেয়ান আছেন তো ভাল ?
এ বাড়ির বিভেদের দেওয়াল ভেঙে দেয় ও বাড়ির দমকা ঝড়।
ও বাড়ির সবাই হয়ে যায় আপন যারা ছিল এত কাল পর।
-----০----
অঙ্গীকার
লোভ লালসার পদপ্রান্তে বিক্রীত বিবেক ,
অনাগত শতাব্দীর কাছে অঙ্গীকার করো
এই পৃথিবীর বুকে আচ্ছে যত
পরিচয়হারা শিশু আর স্বীকৃতিহীন মাতৃত্ব
তাদের দেবে পরিচয় , দেবে স্বীকৃতি।
কামনার নখদন্তের ক্ষত চিহ্নে দেবে সান্ত্বনার প্রলেপ।
নগ্ন নির্ল্লজ কামনায় মাতৃত্ব দিয়েছো যারে
অঙ্গীকার করো স্বীকৃতি দেবে তারে।
তোমার কামনা হতে জন্ম নিল যে আজ
সারাটা জীবন সে কেন সইবে লোকলাজ ?
আত্মগ্লানির আগুনে দেবে আত্মাহুতি ?
শুধু জন্ম নয় , দিতে হবে প্রেম-প্রীতি ঘন ভাস্কর পরিচয়।
অঙ্গীকার করো , শুধু মাতৃত্ব নয়
সাদা সিথিতে তুলে দেবে সিঁদুর অক্ষয়।
----০----
স্তাবকতা
সেদিন ভোররাতে লুঠিত হলো
ফুটপাতবাসিনী মেয়েটির ইজ্জত।
দেশ জুড়ে দারুন শোরগোল
দেশ ও দশের মাথারা ঘন ঘন নাড়লেন মাথা
বললেন , এমন তো হতেই পারে
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে কেন এত কথা ?
আমরা তাবৎ স্তাবকের দল বললাম --- ঠিক- ঠিক-ঠিক।
কেন এত কথা ?
ভরা ভাদরে পেটের জ্বালায় ছেলেপুলে নিয়ে
বিষ বড়ি খেয়ে জ্বালা জুড়োল মদনা ডোমের পরিবার।
দেশ জুড়ে উঠল চরম ছি -ছি'কার।
মাথারা মাথা নাড়লেন ,
অস্ফুটে বললেন , এই হাভেতেরাই ডোবাবে শেষটায় ,
এত ডায়ডোল-রেশনেও যদি না ভরে পেট
তাহলে তো কিছুই করার নাই।
বোলে হরিবোল দিয়ে আমরা তাবৎ স্তাবকের দল বললাম -- ঠিক- ঠিক-ঠিক।
কিছুই করার নাই।
একই দিনে হাসপাতালে দশটি শিশুর মৃত্যু হলো ।
দেশ জুড়ে নিন্দার ঝড় বইল।
ঠান্ডা মাথায় মাথারা করলেন সহানুভূতির চুক-চুক-চুক।
বললেন , বিচ্ছিন্ন ঘটনা , সব বিরোধীদের তাকতুক।
আমরা তাবৎ স্তাবকের দল বললাম --- ঠিক-ঠিক--ঠিক।
সব বিরোধীদের তাকতুক।
এমনি করে করে
যদি কোনদিন বিপদ এসে দাঁড়ায় দুয়ারে ,
যদি কেউ লুঠে নেয় আমাদের বোনের ইজ্জত
পেটের জ্বালায় যদি কড়িকাঠে ঝোলে আমাদের মা
স্ত্রীর কোল খালি করে চলে যায় ছোট্ট খোকন সোনা ,
সেদিনও কি আমরা বলবো -- এ তো স্বাভাবিক ঘটনা ?

No comments:
Post a Comment