গণপতি ঘোষের কথা
জ্ঞান হওয়ার আগেই বাবাকে হারিয়েছিলেন । জ্ঞান হওয়ার পর পেটের দায়ে নাম
লিখিয়েছিলেন গ্রামের বোলানের দলে । সেই দলের প্রয়োজনেই গান লেখা শুরু করেন। তারপর সেই গান
লেখাই নেশা হয়ে উঠে । আজও ৭৫ বছর বয়েসে সেই গানই লিখে চলেছেন গণপতি ঘোষ।
নানুরের বামুনডিহি গ্রামে এক প্রান্তিক চাষি
পরিবারে জন্ম গণপতিবাবুর ।তিন মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার । দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে দীর্ঘদিন আগে । যৎসামান্য
জমির আয় আর মাসিক হাজার টাকা শিল্পী ভাতায় কোন রকমে তার সংসার চলে যায় । কিন্তু
একসময় বহু কষ্টের দিন পার করে আসতে হয়েছে তাকে । জন্মের মাত্র আড়াই মাস বয়সে বাবা
মারা যান। অর্থাভাবে দশম শ্রেণীর পর ‘ফিজ দাখিলের’ টাকার অভাবে আর পরীক্ষা দেওয়া
হয়নি । তারপর একটু জ্ঞান হতেই নাম লেখান গ্রামের বোলান গানের দলে। দলের প্রয়োজনে
গান লেখার তাগিদ অনুভব করেন।
সেই
সময় গান লিখিয়ে হিসাবে পরিচিতি ছিল স্থানীয় লোককবি প্রয়াত অহিভূষণ মণ্ডলের । তার
কাছেই শুরু হয় গনপতিবাবুর গান হাতে খড়ি । তারপর থেকেই লিখে চলেছেন একের পর এক
বোলান , বাউল , ভাদু , ঝাপান , পাঁচলি গান। এপর্যন্ত লিখে ফেলেছেন পাঁচ হাজারেরও
বেশি গান । শুধু বীরভূমই নয় , তার লেখা গান নিতে ভীড় জমান বর্ধমান ,
মুর্শিদাবাদেরও বিভিন্ন লোকগানের দল ।বর্ধমানের মাসুন্দীর বোলান শিল্পী তরুণ সিংহ ,
মুর্শিদাবাদের পাঁচথুপির বাউলশিল্পী সাক্ষীগোপাল মালাকার , লাভপুরের ভাদুগানের
শিল্পী নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়রা জানান , গান অনেকেই লেখেন , কিন্তু গণপতিদার লেখা
না হলে গান ঠিক জমে না । তাই আমরা মূলত ওনার লেখা গানই পরিবেশন করি ।
নিছক বিনোদনই নয় , গানে মাধ্যমেই গনপতিবাবু
তুলে ধরেন সমাজ সচেতনা মূলক বিভিন্ন বিষয় ।বাবা-মাকে অবজ্ঞা , স্বাক্ষরতা অভিযান ,
পণপ্রথা , পরিবার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে হাল আমলের কন্যাশ্রী , সবুজসাথী
প্রকল্পও জায়গা করে নিয়েছে তার গানে ।কখনও লিখেছেন , বিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়া করলি
অনেক , আসল বিদ্যা শিখলি না / তাই তো বলি দানব হয়েই রইলি রে তুই মানব হলি না /
বাড়িতে তোর বুড়ো বাপ-মায়ের হলো না ঠাঁই / তোরও জায়গা হবে নাকো জেনে রাখিস কোন ভুল
নাই। আবার কখনও তার গানে ফুটে উঠে বাল্য বিবাহের কুফল বিষয়। নিজেই ভাঁজেন তার সুর-
মেয়ের বয়েস আঠারো আর ছেলের বয়েস একুশ ভোলামন ভুলে যেও না / তার আগেতে বিয়ের তাদের
যোগাড়যন্ত কর না / শ্রীঘরেতে হবে রে ঠাঁই , ছাড়ান পাবা না / তাই তো বলি বুঝে সুঝে
চল তুমি , কাঁচা আলে পা দিও না /
গান রচনার জন্য ইতিমধ্যেই তাকে সংবর্ধনা
জানিয়েছে , লাভপুরের বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী , কীর্ণাহার তরুণ সমিতি , নানুর
চণ্ডীদাস পাঠাগার , নানুরের মহুয়া পত্রিকা গোষ্ঠী , নানুরের শ্রীপাঠ উৎসব কমিটির
মতো বেশ কিছু সংস্থা । তাদের মধ্যে বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনীর উজ্বল মুখোপাধ্যায় ,
মহুয়া পত্রিকা গোষ্ঠীর রঘুরাজ সিংহরা জানান , গণপতিবাবুর গানে যেন মাটির গন্ধের
সঙ্গে মিশে আছে লোকশিক্ষার আলো। ক্ষুন্নিবৃত্তির তাগিদে কীর্ণাহারের দুটি কাপড়ের দোকানে খাতা লেখার কাজ করেন গণপতিবাবু ।খাতা লেখার ফাঁকে ফাঁকেই সুর ভাঁজেন । মাথার মধ্যে সবসময় ঘুরপাক খায় গানের কলি। সবিনয়ে জানান , মানুষের ভালোবাসাই আমাকে
দিয়ে লিখেয়ে নেয় ওইসব গান।
-----০----


No comments:
Post a Comment