এইতো সমাজ
( ধারাবাহিক নাটক )
( মানুষ কেন বিপথে যায় , কি করেই বা ঘুরে দাঁড়ায় , সেই কাহিনীই এই নাটকে তুলে ধরা হয়েছে।স্কুল জীবনে লেখা সেই নাটকই ধারাবাহিক ভবে তুলে ধরা হল আপনাদের দরবারে । নজর রাখুন ।সঙ্গে থাকুন।ধন্যবাদ )
অর্ঘ্য ঘোষ
( দ্বিতীয় দৃশ্য )
স্থান - এক ধর্ম্মরাজতলা প্রাঙ্গণ। মলয় ও প্রণবের কথপোকথন।
( মলয়ের পরণে পুর্ব্বে পরিহিত পাজামা, জামা আর প্রনবের পরনে প্যান্ট জামা। প্যান্টের তলায় জামা গুঁজে পড়া।)
প্রণব - কি রে তোদের প্রেম কদ্দুর ?
মলয় - আরে তোরা তো আছা , এক ক্লাসে পড়ি সেইজন্য দুটো হেসে কথা বলি বলে মনে করিস হেডমাস্টারের ভাইঝির সঙ্গে আমি প্রেম করছি।
প্রণব - কেন এক সঙ্গে পড়ি তো আমরাও।
মলয় - তোদের ভাই দেখছি দিবা সপ্ন দেখার অভ্যাস আছে।
প্রণব - তার মানে ?
মলয় - মানেটা বুঝলি না , চা ওয়ালার ছেলে , যার বাবা কিনা এক চা ওয়ালা তার সঙ্গে ধনী হেডমাস্টারের ভাইঝির প্রেম কাহিনী শুনেছিস কখনো ?
প্রণব - কেন শুনবো না , সিনেমা - থিয়েটারে তো হামেশাই দেখা যায় , সবই কি মিথ্যা ?
মলয় - মিথ্যা কেন হতে যাবে, হয়তো কিছু কিছু সত্যি । কিন্তু এ অভাগার ক্ষেত্রে সে অঘটন ঘটবে না। তা তোমরা দেখে নিও।
প্রণব - ঠিক আছে, দেখা যাবে কতদিন ডুবে ডুবে জল খেতে পার।
মলয় - না , তোর সঙ্গে তর্ক করলে চলবে না , তোরা বড়লোক।তোদের মতো তো বাড়ি গেলেই খেতে পাবো না, আমাদের খাবার যে নিজেকেই যোগাড় করতে হয় , যাই একটু দেখি বাপুজী দোকানে আছে।
( প্রস্থান )
প্রণব - শালা ছোটলোক, বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে চাদে। মেয়েটাও যে কী , ওর দিকে ছাড়া আর কারো দিকে যেন তাকাবার সময় নেই। আহা ওর পাশে মলয়কে কেমন মানায় , ঠিক যেন বাঁদরের গলায় চন্দ্রহার।ছি ছি কৃষ্ণারও একটা রুচি বলতে নেই।
( সালোয়ার কামিজ পরিহিতা কৃষ্ণার প্রবেশ )
কৃষ্ণা- মলয়, মলয় এই মলয়।
প্রণব - কে কৃষ্ণা ?
কৃষ্ণা - হাঁরে প্রনব , এখানে মলয় ছিল না ?
প্রণব - তোমার অত মলয় মলয় কেন বলতো , কেন আমরা তো রয়েছি।
কৃষ্ণা - কেন, তোদের কি ?
প্রণব - তুমি একজন হেডমাস্টারের ভাইঝি, আর মলয় কিনা একটা চাওয়ালার ছেলে তোমার পাশে ওকে বডড বেমানান লাগে।
কৃষ্ণা - না মোটেই তা নয়, বরং বেশ ভালই মানায় , তোর চোখে যদি বেমানান লাগে তো তুই বন্ধ করে থাকিস ।
প্রণব - ঠিক আছে দেখা যাবে , তোমার এই মানান বোধটা কতদিন থাকে।
( প্রস্থান )
কৃষ্ণা - লম্পট একটা , শুধু মেয়েদের পিছনে পিছনে কুকুরের মতো ঘুর ঘুর ওর স্বভাব।স্পষ্ট করে কথা বলতেই শেখেনি তার আবার মেয়েদের সান্নিধ্য পাবার লোভ দেখ না ?
( ঝোলা হাতে মলয়ের প্রবেশ )
মলয় - কার সঙ্গে যেন কথা বলছিলে কৃষ্ণা ?
কৃষ্ণা- কার সঙ্গে আবার , ওই প্রণব বাঁদরটার সঙ্গে।
মলয় - কেন কি হলো আবার ওর সঙ্গে ?
কৃষ্ণা - কি আর হবে , খালি খালি আমার সঙ্গে গায়ে পড়ে কথা বলতে আসে আর শুধু আমার কাছে তোমার নিন্দা করবে।
মলয় - কিন্তু কৃষ্ণা , যে নিন্দার পাত্র , তার নিন্দা করবে না তো কি'ই বা করতে পারে বলো।
কৃষ্ণা - কেন কোথায় তুমি নিন্দার বলতো, বরং প্রণবের চেয়ে অনেক অনেক ভালো।
মলয় - কিন্তু ভালো হলেও প্রণবের বাবার মতো তো আমার বাবার পয়সা নেই , আমার বাবা যে চা ওয়ালা , এটাই তো আমার সবচেয়ে বড় পরাজয়।
কৃষ্ণা -নাও নাও আর বাজে বকতে হবে না।
মলয় - কেথায় বাজে বকলাম ?
কৃষ্ণা - যত সব বাজে কথা , এই শোন আজ আর আমার সময় নেই।সন্ধ্যা হয়ে এলো। বাড়ি ফিরতে হবে। অনেকক্ষণ এসেছি , ওই বাঁদরটার সঙ্গে বকতে বকতেই সময়টা চলে গেল। আজ আমি কেমন -
( প্রস্থান )
মলয় - কৃষ্ণার কাছে আমি ভালো, কিন্তু না , এ হয়তো আমার ঠিক হছে না , প্রেম আমাদের মতো চা ওয়ালার ছেলেদের সাজে না , আমরা যে চা ওয়ালা , প্রেম করা ওই প্রণবদেরই সাজে ,আমাদের সাজে না।
( চন্দনের প্রবেশ )
চন্দন - কে বললে সাজে না , প্রেম সবার জন্য , ধনী দরিদ্রের ব্যাবধানের বেড়া এখানে নেই।
মলয় - কিন্তু চন্দন দা -
চন্দন - দেখ মলয় , লায়লীকে ভালবেসে মজনু পাগল হয়েছিল ওদের মধ্যে ধনী দরিদ্রের কোন ব্যবধান ছিল ?
মলয় - কিন্তু চন্দনদা ওরা আর আমরা যে এক নয়।
চন্দন - কে বললে, কোথায় লেখা আছে , কিসে আমরা ছোট , গরীব বলে , না মলয় প্রেম ধনী দরিদ্র বাছে না।
মলয় - চন্দন দা
চন্দন - লোকের কথা শুনলে চলবে না বুঝলি, লোকে তোকে গাদা গাদা উপদেশ দেবে কিন্তু সাহার্য্য একবিন্দুও করবে না। এই আমাকেই দেখ না , আমি গুন্ডামি করি ,চুরি করি, লোকে কত কি বলে। লোকের কথায় যদি চলতাম তাহলেআমাদের অনাহারে মারা যেতে হত। ঐ প্রণবদের বাবার মতো আমাদের বাবার তো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নেই।
মলয় - চন্দন দা তুমি এবার ঐ অন্ধকারের পথটা ছেড়ে দাও চন্দন দা।
চন্দন - মলয় , অন্ধকার ছাড়া আমাদের জন্য আলোর পথ কে খুলে রেখেছে বলতে পারিস ? কালো পথই যে আমাদের আমাদের নিয়তি রে । আমিও চেয়েছিলাম সৎভাবে বাঁচতে কিন্তু ঐ পালবাবুদেরই নিষ্ঠুরতা আমাকে অসৎ পথে নামিয়েছে , দেয়নি সৎভাবে বাঁচতে।
( প্রস্থান )
( ময়লা ধুতি ছেঁড়া পাঞ্জাবী পড়িয়া শর্মাজীর প্রবেশ )
শর্মাজী - খোঁকা, এই খোঁকা -
মলয় - কি বলছো বাপুজী?
শর্মাজী - হাঁরে খোঁকা , গতবার পুজোতে মিলিকে ওরা পাঠায় নি , জামা কাপড় পাঠাতে পারিনি বলে।তোর বৃত্তির টাকা কিছু কিছু করে জমিয়ে দুটো কাপড় কিনে তোর অভাগিনী বোনটাকে আনতে পারিস তো দেখিস।
মলয় - আছা বাপুজী।
শর্মাজী - ওদিকে হতভাগা মেয়েটাকেও এক হাজার টাকা বাকী বরপণের জন্য খোঁটা শুনতে হয় ওর শাশুড়ির কাছে, ওর স্বামীর কাছে।
মলয় - তা আমি জানি বাপুজী , কিন্তু কি করি বলো ? আমি যে বেকার।
শর্মাজী -তোর কী দোষ বল , দোষ আমাদের কপালের। আমরা যে ভালো কপাল আসতে পারি নাই ,আমারা যে পাপীরে খোঁকা।
মলয় - তুমি অমন হতাশ হয়ে পড়ো না বাপুজী, আমি যেমন করেই হোক টাকা যোগাড় করে মিলিকে আনবো।
শর্মাজী- তুই পারবি খোঁকা , পারবি মিলিকে আনতে ?
মলয় - তুমি শান্ত হও বাপুজী।
শর্মাজী - কী করে শান্ত হয় বলতে পারিস খোঁকা ? অভাগিনী মেয়েটার কথাই আমাকে অশান্ত করে তোলে রে ,ও যে বড় অভিমানিনী শাশুড়ির অত্যাচারের কথা মনে করে আমি যেশিউরে উঠি।
মলয় -তুমি বৃথা চিন্তা করছ বাপুজী , মিলি মোটেই সেরকম নয় , দরিদ্র বাপুজীরর দুঃখ সে বোঝে , ও ঠিক সব মানিয়ে নেবে।
শর্মাজী- তাই যেন হয় রে , তাই যেন হয়।
( পর্দা নামিয়া আসে )



No comments:
Post a Comment