অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি ।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
দানবাহাদুরের কথা
( ৭ )
দান বাহাদুর ছিলেন লোকপাড়া হাইস্কুলের নাইটগার্ড। ছোটখাটো চেহারার মানুষটি খাঁকি হাফ প্যান্ট আর জামা পড়ে থাকতেন।কোমরে গোঁজা থাকা চামড়ার থলিতে ঢাকা ছোট্ট এক ভোজালি।সেটা নিয়েই ছিল আমার অপার কৌতূহল। সব সময় মনে হোত একবার নিজে হাতে নাড়তে পেতাম। সেই লোভে প্রায়ই ওদের বাড়ি যেতাম। ওর ছেলে মানবাহাদুর আমাদের সঙ্গে পড়ত।সেই সূত্রে ওদের বাড়িতে যাতায়াতটা নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়। স্নান করার সময় দানবাহাদুর যখন ভোজালিটা খুলে রাখত তখন আমি আর মানবাহাদুর সেটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম। দানবাহাদুরের নজরে পড়লে বলতেন- দেখ বাবু, হাত কাটিয়া যাবে।
প্রথমদিকে দান বাহাদুররা স্কুল কম্পাউন্ডের মধ্যেই থাকতেন।পরে স্কুলের বাইরে বর্তমানে যেখানে সি,পি,এমের পার্টি অফিস রয়েছে সেখানেই একটা খড়ের চালাঘরে বাস করতেন।সেখানেই ছিল তাদের একটা ছোট্ট চা-বিস্কুটের দোকান। হয়তো স্কুলের বেতনে সংসার চলত না বলেই দোকান করতে হয়েছিল তাকে।আবার শুনেছিলাম স্কুল থেকে ঘণ্টা চুরি যাওয়ায় কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলেই নাকি তাকে দোকান করতে হয়েছিল।ঘণ্টা চুরির অভিযোগ নিয়েও অবশ্য নানা মুনির নানা মত প্রচলিত আছে।কারও কারও মতে , তাকে নাকি পরিকল্পিত ভাবে ফাঁসানো হয়েছিল।
ছোট্ট ওই দোকানঘরেই চার মেয়ে দুই ছেলে আর স্ত্রী'কে নিয়ে ছিল দানবাহাদুরের সংসার। মানবাহাদুরের দিদিরা দেখতে বেশ সুশ্রী ছিল। ছোট ছোট চোখে তাদের নেপালি দেবদেবীর মতো মনে হত। তখন আমি খুবই ছোট , তবু সেই বয়েসেই তাদের দেখে অন্যরকম একটা রোমাঞ্চ অনুভব করতাম।তাদের সবার নাম আজ আর মনে নেই। আবছা মনে পড়ে পার্ব্বতী , রাধা , আর লক্ষী ছিল সম্ভবত তাদের নাম।বাকিদের নাম আজ আর মনে নেই।
দানবাহাদুরের দোকানে একটা বিস্কুট ছিল খুব লোভনীয়। খাট্টাই নামের সেই বিস্কুট্টার তখন দাম ছিল সম্ভবত ৫ / ১০ পয়সা।বাড়ি থেকে সবদিন খাট্টাই কেনার মতো পয়সা মিলত না। সেই সব দিন ফেরার সময় খাট্টাইয়ের ব্যয়ামটার দিকে জুল জুল চোখে চেয়ে থাকতাম।ততদিনে খাট্টাই যে আমার খুব প্রিয় তা জানা হয়ে গিয়েছে দানবাহাদুরের।
তাই ব্যয়ামে হাত ভরে দুটো খাট্টাই বের করে একটা মানবাহাদুর আর একটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়েছেন।লজ্জা সংকোচে আমি হাত সরিয়ে নিতাম। দানবাহাদুর বলতেন - নাও না বাবু নাও , লজ্জা কিসের ? সেদিন বুঝি নি , আজ মনে হয় খাট্টাইয়ের ওই দামটাতে হয়তো তার অভাবের সংসারে কিছুটা সুসার হতো। আজ দান বাহাদুর নেই , কিন্তু কানে যেন আজও বাজে -- নাও না বাবু নাও , লজ্জা কিসের ?
----০---
নুনো খেপার কথা
( ৮ )
খেপা বলতে যা বোঝায় তা কিন্তু মোটেই ছিলেন না নুনো । কিছুটা আপনভোলা টাইপের ছিলেন । নিজের মনে থাকতেন।আর গান করতেন। আসল নাম ছিল ভক্তিপদ মণ্ডল।ডাক নাম নন্দ।তা থেকেই সম্ভবত নুনো।বীরভুমের ময়ূরেশ্বরের ঢেকা গ্রামে ছিল তার বাড়ি। অসম্ভব হাতের জোর ছিল।আমাদের ডেকে বলতেন -- দেখবি তো আয় , তারপর ঢিল ছুড়ে বড়ো বড়ো পুকুর দীঘি পার করে দিতেন।
এলাকায় কোন অনুষ্ঠান হলে সে বাড়িতে অবধারিত ভাবেই তার দেখা মিলত। তাবলে কিন্তু শুধু পাত পেড়ে খেতে যেতেন না তিনি। বিনা পারিশ্রমিকেই সেই অনুষ্ঠান বাড়িতে রান্না এবং খাওয়ার জন্য যত জল লাগত টিনের ভারে করে সব একাই বয়ে দিতেন নুনো।কর্মকর্তারা তাকে পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচতেন। তখন তো আর ঘরে ঘরে এত পাম্প , মোটর এমন কি টিউবয়েল ছিল না। দুরের টিউবওয়েল থেকে জল বয়ে আনতে হত।
তাই একসময় অনুষ্ঠান বাড়িতে নুনো অপরিহার্য হয়ে ওঠে। অন্যান্য নিমন্ত্রিতের সঙ্গে অনুষ্ঠান কর্তারা তাকেও নিমন্ত্রণ করতে শুরু করেন।ততদিনে নুনো নিজস্ব একটা ভারও করে ফেলেছেন। অনুষ্ঠানের আগের দিন থেকে ভোজবাড়িতে হাজির হয়ে যেতেন। ফিরতেন অনুষ্ঠান পার করে।কখনও কেউ কিছু হাতে তুলে দিলে নিয়েছেন , কিন্তু নিজে কোনদিন কারও কাছে কিছু দাবি করেন নি।
আমার মনে হয় বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের কাছে দৃষ্টান্ত হতে পারেন নুনো।যে লোকটি একদিন ভোজবাড়িতে বিনা নিমন্ত্রণে হাজির হয়েছেন , সেই লোকটিই তার কাজ দিয়ে অপরিহার্য্য হয়ে উঠেছেন। নেতারা সেই পথ অবলম্বন করলে ভোটের জন্য আর ছল চাতুরী করতে হবে না তাদের। মানুষ যেচেই তাদের ভোট দেবেন।আজ নুনো নেই , কিন্তু বহু ভোজবাড়িতে আজও নুনোর কথা আলোচিত হয়।



No comments:
Post a Comment