হার না মানার লড়াই
অর্ঘ্য ঘোষ
শারিরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সোঁজা হয়ে চলা দুরের কথা দাঁড়ানোরও ক্ষমতা ছিল না। তাই দেখে আত্মীয়রা কেউ বলেছিলেন , ও খাবে কি করে ? দাও ওকে কোন মসজিদে পাঠিয়ে। মৌলবি হলে দুটো খেতে পড়তে তো পাবে। কেউ বা বলেছিলেন আরব পাঠিয়ে দাও। ভিক্ষা করে খেতে পারবে। কিন্তু প্রতিবন্ধী বালকটি গর্জে উঠেছিল -- না , মৌলবীগিরি কিম্বা ভিক্ষা করে আমি কারও দয়ায় বেঁচে থাকতে চাই না। আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকতে চাই। সেদিন সেই বালকের কথা শুনে মুচকে হেসেছিলেন আত্মীয়রা।
কিন্তু অনমনীয় জেদের কাছে প্রতিবন্ধকতা যে কোন ব্যাপারই নয় তা আরও একবার প্রমান করে দিয়েছেন সেই বালক। তারই স্বীকৃতি স্বরূপ পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৩ ডিসেম্বর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাগৃহে তাকে রোল মডেল হিসাবে পুরস্কার দিতে চলেছে।সেদিনের সেই বালকটির নাম মহ: বদরুদ্দোজা।নলহাটির সোনারকুন্ডু গ্রামে এক প্রান্তিক চাষি পরিবারে জন্ম বদরুদ্দোজার। দুই ভাই এক বোন, সবাই জন্মপ্রতিবন্ধী। তাই করুণা আর অবহেলা ছোট থেকেই সঙ্গী তাদের।
কিন্তু ছোটবেলা থেকেই লড়াকু মনোভাব বদরুদ্দোজার। প্রতিবন্ধকতা থাকলেও খেলার প্রতি সেই ছেলেবেলা থেকেই তার তীব অনুরাগ। তাই নিয়মিত মাঠে যেতেন। কিন্তু শারিরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সাধারণ ছেলেরা তাকে খেলা নিতেন না। তাই নিজেই মূলত আদিবাসী ছেলেদের নিয়ে নলহাটি ইভেন গাওতা নামে একটা শক্তিশালী ফুটবল দল গড়ে তোলেন। একসময় সেই দল জেলা তো বটেই, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের মাঠ সুনামের সংগে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। টিম নিয়ে খেলোয়াড় নিয়ে তিনিও ছুটে গিয়েছেন সবর্ত্র। ওই দলে খেলার সুবাদে বেশ কিছু ছেলে বিভিন্ন জায়গায় সরকারি চাকরিতে বহাল হয়েছে।
শুধু তাই নয় , ১৯৮১ সালে প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন অবৈতনিক সাঁতার এবং আথলেটিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ৫৬ বছর বয়েসেও দুই ক্রীড়া শিক্ষক স্বপন লেট এবং কার্তিকচন্দ্র মণ্ডলের সহয়তায় আজও প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছেন। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েই প্রতিবন্ধী ছেলে মেয়েরা জাতীয় সহ বিভিন্ন স্তরের প্রতিযোগিতায় ২৯ টি সোনা, ২২ টি রূপো এবং ৮ ব্রোঞ্চ পদক ছিনিয়ে এনেছে। নির্বাচিত হয়েছেন রাজ্য প্রতিবন্ধী সম্মিলনীর জেলা সম্পাদকও।
জীবিকার ক্ষেত্রেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একদিকে পড়াশোনা অন্যদিকে সেলাইয়ের কাজ শেখা সমান তালে চালিয়ে গিয়েছেন। সকালে বাড়িতে পান্তা খেয়ে বেরোতেন। মা কৌটোয় চাট্টি মুড়ি- পিঁয়াজ ভরে দিতেন। আর চপ কিম্বা ঘুগনি কেনার জন্য দিতেন ১০ টা পয়সা। তাই নিয়ে বালক বদরুদ্দোজা প্রতিদিন ৯ কিমি হেঁটে নলহাটি বাজারে সেলাই শিখতে যেতেন। তারপর পিঁয়াজ আর জল ভিজিয়ে মুড়ি খেয়ে ১০ পয়সা বাঁচিয়ে বোনের জন্য খাতা পেনসিল কিনে নিয়ে যেতেন। সেই বোন এখন শিশুশিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষিকা।
ফিজ দাখিলের টাকার অভাবে নিজের অবশ্য প্রথমবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসা হয় নি। পরে টাকা যোগাড় করে পরীক্ষা দিয়ে মাধ্যমিক পাশ করেছেন।বছর দুয়েক সেলাই শেখার পর তদানীন্তন ম্যানেজার ক্রীড়াবিদ লোকনাথ দে'র সহয়তায় ব্যাংকের মাধ্যমে ১০৫০ টাকার একটা মাত্র সেলাই মেসিন নিয়ে নলহাটি রেল লাইন সংলগ্ন এলাকায় স্বাধীনভাবে সেলাইয়ের দোকান শুরু করেন। পাশাপাশি দীর্ঘ দরজি জীবনে বহু প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েকে হাতে ধরে সেলাই শিখিয়ে স্বনির্ভরও করেছেন তিনি।
( আই , এন , টি , ইউ , সি'র সংবর্ধনা )
সেই ব্যবসা থেকেই স্থানীয় নজরুল পল্লীতে দোতলা পাকা বাড়িও করেছেন। বাড়িতেও তৈরি করেছেন সেলাইয়ের কারখানাও। সেখানে ১০ জন কারিগর কাজ করেন। ২০১২ সালে স্ত্রী সাজেদাকে হারিয়েছেন। দুই ছেলে বৌমা নাতি নাতনিদের নিয়ে তার ভরা সংসার। মনের জোরে প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বদরুদ্দোজা রোল মডেল হয়ে উঠেছেন। তাই এদিন তার বাড়িতে গিয়ে তাকে সংবর্ধনা জানিয়েছে রামপুরহাট আই , এন , টি , ইউ, সি সংগঠন। তিনি আজ শুধু প্রতিবন্ধীদের নয় , সক্ষম মানুষজনের প্রেরণাস্থল হয়ে উঠেছেন। সবিনয়ে জনিয়েছেন , জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এভাবেই লড়াই করে যেতে চাই।

No comments:
Post a Comment