অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
কিশোরী পালের কথা
( ৫৫ )
আমার ছেলেবেলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে কিশোরী পালের স্মৃতি। তাকে আমি কিশোরীদাদু বলতাম। উনি আমাকে ঘোষমশাই বলতেন। তার ঘোষমশাই বলা শুনে খুব গর্ব হত আমার।মনে হতো যেন কেউকেটা হয়ে গিয়েছি।কারণ কেউ কেউ দাদুকে ওই সম্বোধন করতেন।তাই শুনে ভাবতাম আমি তাহলে এবার দাদুর সমান হয়ে গিয়েছি। তার বাড়ি ছিল বর্ধমানের গোড়াপাড়া গ্রামে। আমাদের আত্মীয় দূর্গাচরণ ঘোষের বাড়ির দূর্গা প্রতিমা গড়তেন তিনি। কিন্তু আমাদের এলাকায় এসেছিলেন তারও আগে।তারা ছিলেন জাতিতে কুমোর। প্রথমে স্থানীয় ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে মাটির হাঁড়ি কলসি করতে এসেছিলেন তাদের কয়েকটি পরিবার। তাদের মধ্যে কিশোরী পাল পরবর্তীকালে ঘোষবাড়িতে ঠাকুর গড়া শুরু করেন।
তাকে নাকি ওই কাজে আমার দাদু সুহৃদরঞ্জন ঘোষ বহাল করেন। সে সময় দাদু ওই পরিবারের অভিভাবক স্বরূপ ছিলেন। কিশোরী পাল এবং আর একজন কুমোর দাদুকে এসে ঠাকুর তৈরি করব বলে ধরেন। দাদু তাদের দু'জনকে দুটি সিংহ তৈরি করে আনতে বলেন। কয়েকদিন পর কিশোরী পালই সিংহ তৈরি করে জমা দেন। অন্যজন আসেনই নি। ওই সিংহ দাদুর পছন্দ হয়ে যায়। তারপর থেকেই ঠাকুর গড়ার কাজে বহাল হয়ে যান তিনি। প্রথমদিকে সারা বছর ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে হাঁড়ি-কলসি গড়ার পাশাপাশি পুজোর সময় ঠাকুর গড়তেন।
পরবর্তীকালে হাঁড়ি-কলসী তৈরির ব্যবসা মন্দা হয়ে পড়ায় তারা ডাঙ্গাপাড়ার বাস গুটিয়ে গোড়াপাড়া ফিরে যান। কিন্তু পুজোর মাস দুয়েক আগে থেকেই প্রতিমা গড়তে হাজির হতেন। সঙ্গে আসত তার দুই মাতৃহীন ছেলে জগাই আর মাধাই। জগাই আমাদের থেকে বয়েস একটু বড়ো হলেও মাধাই ছিল আমাদেরই বয়সী।সেই বয়েসেই মাতৃহারা বলে জগাই-মাধাইয়ের উপর কেমন যেন সহমর্মিতা বোধ গড়ে উঠেছিল।বাড়ি থেকে ছোলা কলাই ভাজা , নাড়ু নিয়ে গিয়ে ওদের ভাগ না দিয়ে খেতাম না। মনে হোত , আহারে ওদের মা নেই , কে নাড়ু করবে ?
তখন দু'বেলাই আমাদের ঠিকানা হয়ে উঠত ঠাকুর দালান। চোখের সামনে কাঠামোয় খড় বাঁধা , মাটি লেপা থেকে চক্ষুদান পর্যন্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। দাদুও যেতেন। প্রতিমা নিয়ে কিশোরীদাদুর সংগে নানা রকম আলোচনা করতেন। আমরা তারই মাঝে ঠাকুরের দালানের পাকা উঠোনে খেলতাম কুমিরডাঙ্গা , রুমালচোর , নুন তাড়াতাড়ির মতো নানা খেলা। ঠাকুরের কাঠামোতে মাটি লেপতে লেপতেই আমাদের খেলার দিকে চেয়ে থাকত মাধাই। আর অন্যমনস্ক হয়ে পড়ায় বাবার বকুনি খেত। তার চোখ মুখের ভাব দেখেই মনে হত , আমাদের সৌভাগ্য দেখে তার মন খারাপ হচ্ছে।অন্যদিকে তার সৌভাগ্য দেখেও আমাদের মন খারাপ হত।মনে হতো কেমন মাটি নাড়াচাড়া করতে পারছে মনের সুখে। কেউ কিছু বলার নেই।আর আমরা হাত দিলেই কত শাসন-বারণ।
মনে আছে জগাই একবার আমাকে পয়সা জমানোর জন্য বড়ো সড়ো ইঁদুরের একটা ব্যাঙ্ক করে দিয়েছিল। পয়সা বের করে নেওয়ার পরও সেটি আমার কাছে অনেকদিন ছিল।তারপর বন্যার সময় বাড়ি চাপা পড়ে সেটা ভেঙে যায়। ঘোষবাড়িতে কাঠামোয় মাটি দিয়ে কিশোরীদাদুরা চলে যেত গিধিলা গ্রামে ঠাকুরে মাটি দিতে। সেখানে একমাটির কাজ শেষ হলে লোকপাড়ায় আসতেন দোমাটি করতে। আর না আসা পর্যন্ত প্রতীক্ষায় দিন গুনতাম।সব থেকে কষ্ট হত যখন প্রতিমা নির্মাণের কাজ শেষ করে তারা বাড়ি ফিরে যেতেন তখন।মনে হোত যেন বেশ কিছুদিন আমাদের বাড়িতে কাটানোর পর কোন আত্মীয় বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। পুজোর মতোই তাদের জন্যও একটা বছরের অপেক্ষা বড়ো দুঃসহ মনে হোত।আজ কিশোরীদাদু নেই। জগাই-মাধাইরা কে কোথাই আছে তাও জানি না। কিন্তু তাদের কথা আজও ভুলি নি।
----০----
বাহাদুরদার কথা
( ৫৬ )
বাহাদুরদার ভালো নাম ছিল জয়নারায়ণ সরকার। আমাদের বাড়ির পিছনেই তাদের বাড়ি। বয়সে আমার থেকে বছর চার পাঁচের বড়ো ছিল বাহাদুরদা।ছোটবেলা থেকেই দেখেছি বাহাদুরদা বরাররই খুব ফিটফাট থাকতে ভালোবাসত। পোশাকের তেমন প্রাচুর্য ছিল না , কিন্তু যে পোশাকটি পড়ত সেটি ইস্ত্রি করে তবেই পড়ত। বাহাদুরদা একবার প্রতিবাদ ক্লাবের সভাপতি ছিল। সে সময় ক্লাবের কেউ কোথাও আক্রান্ত কিম্বা অপমানিত হলেই ঝাঁপিয়ে পড়ত। শুধু ক্লাবের ক্ষেত্রেই নয় , চেনা পরিচিত কেউ গিয়ে তার কাছে কোথাও অপদস্ত হওয়ার কথা বললেই হল , সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে তার প্রতিবিধান করে দিয়ে আসত। তাতে নিজের কি এসে গেল একবারও ভাবত না।
বাহাদুরদার সব থেকে ভালো গুণ ছিল খুব ভালো ফুটবল খেলতে পারত।ক্লাবের টিমের হয়ে প্রায় প্রতিটি মাঠেই খেলতে যেত। তার ব্যাকভলি যারা দেখেছেন তারা ভুলতে পারবেন না।একটা ব্যাকভলি মানেই অবধারিত গোল। তার ওই ব্যাকভলির দৌলতেই বহু মাঠে আমাদের ক্লাব নিশ্চিত হারের হাতে থেকে বেঁচে চ্যাম্পিয়ান হয়ে ফিরেছে। ভালো খেলার জন্য ব্যক্তিগত ভাবেই বহু স্মারক পেয়েছিল বাহাদুরদা।ক্লাবের পক্ষ থেকেও তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বছর দেড়েক আগে অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে তার। আজ বাহাদুরদা নেই , কিন্তু তার বহু স্মৃতি রয়ে গিয়েছে মনের মণিকোঠায়।
( চলবে )
পড়ুন / পড়ান
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।



কিশোরীদাদু জিন্দাবাদ ॥ ॥ দারুণ ॥ বাহাদুর ও ..॥
ReplyDelete