Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

সালিশির রায় -- ৫৭





              সালিশির রায়


                          

        

                                    অর্ঘ্য ঘোষ

      (  কিস্তি --- ৫৭ ) 




এক সময় আস্তে আস্তে তার হাত ছাড়িয়ে হোমের গেট ছেড়ে বেড়িয়ে যায় শ্রাবণীদের গাড়ি। দিদিরা ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। মা-দিদিদের  সে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে যায়। যেতে যেতেই দিদির কথায় জানতে পারে , এরই মধ্যে ভাইয়ের কাছে গিয়েছিল জামাইদা। ভাই নাকি তার কথা বার বার জিজ্ঞেস করেছে। জামাইদা ট্রেনিং- এর কথা বলে এড়িয়ে গিয়েছে।ভাইয়ের কথা শুনে তার মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। কবে আবার তার সঙ্গে দেখা হবে কে জানে।
মা হঠাৎ বলে , বালিপাড়ায় তার পুনঃবার্সনের জন্য  প্রশাসন যে ঘর তৈরি করছে , তা প্রায় শেষের মুখে। তাহলে তো সে এবার সেখানে ফিরে যেতেই পারে।
অঞ্জলি বলে , কিন্তু প্রশাসন বিশেষ করে আলাপনবাবু চান সে হোমে থেকে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তবেই গ্রামে ফিরুক।
--- কিন্তু সে তো অনেকদিন দেরী হয়ে যাবে ? ততদিন কি আমি মেয়ের বাড়িতেই পড়ে থাকব নাকি রে ?
অঞ্জলি লক্ষ্য করে মায়ের সেই মানসিক অস্থিরতাটা আর নেই। বিচার-বিবেচনা বোধটা আগের মতোই কাজ করছে। তাই বিবাহিত মেয়ের বাড়িতে বেশি দিন পড়ে থাকাটা যে সম্মানের নয় তা উপলব্ধি করতে পারছে। যদিও সে জানে দিদির শ্বশুরবাড়িতে মায়ের কোন অসম্মান হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বিবাহিতা মেয়ের বাড়িতে থাকা নিয়ে যে ধারণা 
প্রচলিত আছে সে ধারণার বশেই মা কুণ্ঠা বোধ করছে। দিদি-- জামাইদার সামনে সে ওই বিষয়ে মাকে কিছু বলতেও পারে না।তার চোখে মুখে অসহয়তার ছাপ ফুটে ওঠে। তাকে ওই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে দিদি। একরাশ অভিমান ঝরিয়ে সে বলে , বিয়ে হয়ে গিয়েছে বলেই বুঝি আমি পর হয়ে গিয়েছি মা। আমার বাড়িতে থাকতে তোমার এত অস্বস্তি , অথচ বালিপাড়ায় অঞ্জলির বাড়িতে থাকতে তোমার সেই অস্বস্তি নেই। আমরা কি তোমাকে কোনদিন কোন অসম্মান করেছি ?
--- না রে, তা নয়। তোরা তো আমাকে মাথায় করে রেখেছিস। কিন্তু গাঁয়ের লোকে হয়তো পাঁচজনে পাঁচ কথা বলবে। তখন তা সহ্য করা খুব কঠিন হবে।
--- বাদ দাও তো গায়ের লোকের কথা। তুমি তাদের খাও না পড়ো ? ওসব নিয়ে মাথা ঘামিও না। অঞ্জলি পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে না দাঁড়ানো পর্যন্ত তুমি আমাদের সঙ্গেই  থাকবে। এমন সুযোগ ক'টা মেয়ে পায় ? ওকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সময়টুকু দাও মা।



                                   দিদির কথা শুনে কৃতজ্ঞতায় ভরে যায় অঞ্জলির মন। বাবা নিখোঁজ , দাদা থেকেও না থাকা। এই অবস্থায় দিদি এভাবে পাশে না দাঁড়ালে হোমে থেকেও তার দুঃশ্চিন্তার শেষ থাকত না। তাই দিদিকে জড়িয়ে ধরে সে বলে , তুই আমার সোনাদিদি, আমার মিষ্টি দিদি।তারপর আদরে আদরে দিদিকে অস্থির করে তোলে সে। আর দিদি ছটফট করতে করতে বলে --- ছাড় ছাড়, এবার আমাদের যেতে হবে না কি ?
দিদিকে ছেড়ে মাকে প্রনাম করে অঞ্জলি। খুব তাড়াতাড়ি আসার কথা দিয়ে দিদিরা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আর তারপর থেকেই মনটা খারাপ হয়ে যায় অঞ্জলির। ভাঙা বিয়েবাড়ির  মতোই হোমটা খাঁ খাঁ করছে। দিদিরা চলে যাওয়ার পর শুন্যতাটা আরও বেশি করে জানান দিচ্ছে। আলাপনবাবুও  নেই।কিছুক্ষণের জন্য  কোয়ার্টারে গিয়েছেন। খুব শীঘ্রই ফিরে আসবেন বলে গিয়েছেন। কারণ তিনি না ফেরা পর্যন্ত কোন কাজেরই জের মরবে না। প্যান্ডেল -ক্যাটারার সহ অন্যান্যদের টাকা পয়সা মেটাতে হবে। টুকটাক আরও অনেক কাজ রয়েছে। তাকেই তো সব চোকাতে হবে। সে হোমের ভিতরে দিকে এগিয়ে যেতেই দেখে পাতানো ভাইয়ের সঙ্গে গেটের দিকেই আসছে সাবিত্রীদি। যেতে যেতেই অঞ্জলি শুনতে পায় অমলবাবু অভিমান ভরা গলায় বলছেন, কতবার বলেছি, আর তোমাকে হোমে পড়ে থাকতে হবে না। কিন্তু তুমি তো আমার কথা কানেই তোল না।  নিজের ভাই নই বলেই আমার কাছে যেতে চাও না তাই না ?
--- তোর এই এক দোষ , যখন আসবি ওই একটা কথা নিয়েই শুধু ঘ্যান ঘ্যান করবি।
--- বেশ, তাহলে তোমাকে বিরক্ত করতে আর আসব না।
---- না এসে তুই থাকতেই পারবি না। শোন এবারে বোধ হয় হোমে ভালো করে ভাইফোঁটা হতে পারে। তুই যেন আসিস অবশ্যই। হ্যা 'রে তোর সেই ছোটবেলার কথা মনে আছে ?
---- মনে নেই আবার ? আমি বোধহয় তখন থ্রি  কিম্বা ফোরে পড়ি। সেবার ভাইফোঁটায় সবার বাড়িতে কত হইচই। কেবল আমিই কেঁদে ভাসাচ্ছিলাম। হাত-পা ছুড়ে কেবলই বলছিলাম আমার বোন এনে দাও আমি ফোটা নেব। শুনে ঠাকুমা ফোঁটা দিতে এসেছিল। আমি আর জোরে কেঁদে উঠেছিলাম।  আর বলছিলাম --- না না আমি তোমার কাছে ফোঁটা নেব না।
--- আমি বাড়ি থেকেই শুনতে পাচ্ছিলাম তোর কান্না। সেই কান্না শুনেই তো তোকে নিয়ে এলাম। দাদাদের পাশে বসিয়ে তোকেও ফোঁটা দিলাম।
--- তারপর থেকে আর ছেদ পড়ে নি ফোঁটায়।
--- হ্যা , অখিলেশবাবু তো হোমের মেয়েদের মানুষই মনে করতেন না। তাদেরও যে চাওয়া পাওয়া থাকতে পারে তা কোনদিন ভাবেন নি।তাই শুধু ভাইফোঁটা কেন , হোমে কোন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করার কোন মাথাব্যথাই তার ছিল না।
---- তবু আমি তোমার হাতে ফোঁটা নিতে প্রতিবার ছুটে এসেছি।
--- হ্যা, তুইই ধান, দুব্বো, চন্দনবাঁটা, মিষ্টি, শাড়ি সব যোগাড়পাতি করে 
আনতিস। আমি গেটের রেলিঙ-এর ফাঁক দিয়ে তোর কপালে ফোঁটা দিয়ে তোর মুখে মিষ্টি তুলে দিয়েছি।
--- শাঁখ বাজে নি, কেউ উলুও দেয় নি। তবু সেই ফোঁটা নিয়েই আমার মন ভরে গিয়েছে।  
--- তাহলেই বোঝ কে আমার আপন। নিজের মায়ের পেটের  দাদা ফোঁটা  নিতে আসা দুরের কথা, খোজখবর পর্যন্ত নেয় না।



                   ভাই--বোনের কথা শুনে সেদিকেই এগিয়ে যায় অঞ্জলি। কাছে গিয়ে বলে , সাবিত্রীদি তুমি ভালো বলেছো তো। হোমে তো আমরাও ভাইফোঁটার ব্যবস্থা করতেই পারি। সবার ভাইদেরই বলা হবে। যারা আসবে না, আসবে না। কিন্তু যারা আসবে তাদের সবাইকেই আমরা ভাইফোঁটা  দেব।
--- সেটাই তো আমি এতক্ষণ ওকে বলছিলাম। অঞ্জলি আছে , ও লাগলে হোমে এবার ভাইফোঁটা হতে পারে। কিন্তু ও খালি ঘ্যান ঘ্যান করছে।
--- দিদি, ওনার কথা আমি শুনেছি। উনি মোটেই কিন্তু ঘ্যান ঘ্যান করেন নি। ক'জন এরকম করে পরের দায় নিজের ঘাড়ে তুলে নিতে চায় বলো ? বিশেষ করে আমাদের মতো মেয়েদের দায় যেখানে নিজেদের লোকেরাই ছেড়ে ফেলে দিয়ে হাত ধুয়ে নেয় , সেখানে এইরকম আবদার ভাবাই যায় না।
তার কথা শেষ হয় না। অমলবাবু উৎসাহের সঙ্গে বলে ওঠেন, বলুন তো  -- বলুন তো। আপনি একটু বুঝিয়ে বলুন তো।
--- সে না হয় আমি বুঝিয়ে বলব ক্ষণ। কিন্তু আপনি আজ্ঞে করে কথা বললে তো হবে না। একে আমি আপনার অনেক ছোট , তার উপরে আপনি সাবিত্রীদির ভাই। সাবিত্রীদি আমাকে তুই তোকারি করে কথা বলেন। আপনি অন্তত তুমি তুমি করে বললে ভালো লাগবে।
--- নিশ্চয়, নিশ্চয়। আমিও তোমার মতো একটা হাটুর বয়সী মেয়েকে আপনি-আজ্ঞে করে কথা বলতে বলতে হাঁফিয়ে উঠেছিলাম। সদ্য হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। তা বোনটি তুমি দিদিকে একটু বুঝিয়ে বলো তো।
এবারে মুখ খোলেন সাবিত্রীদি। কপট রাগ দেখিয়ে বলেন , তুই আর ওকে উসকানি দিস না অঞ্জলি। এই তুই এবার যা তো , বৌমা চিন্তা করবে।
--- এই তো তোমার দোষ। যাওয়ার কথা বললেই বৌমায়ের চিন্তার দোহাই পেড়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। বেশ, আজ আমি যাচ্ছি কিন্তু হাল ছাড়ছি না তা জেন রেখো। বোনটি তুমিও একটু দেখ তো।



                     
                        অঞ্জলি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাতেই সাবিত্রীদিকে প্রণাম করে বাড়ির পথ ধরেন অমলবাবু। সেদিকে তাকিয়ে থাকতেই দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন সাবিত্রীদি। অমলবাবু পথের বাঁকে মিলিয়ে যেতেই  সাবিত্রীদিকে নিয়ে পড়ে সে। সরাসরি বলে -- এটা কিন্তু তোমার বাড়াবাড়ি হচ্ছে সাবিত্রীদি। ভাই অত করে সাধছে তাও তুমি কানে তুলছো না কেন ?  আচ্ছা তোমার সমস্যাটা কি বলোতো ?
--- দেখ , একই গাঁয়ে আমার নিজের দাদারা রয়েছে। তারা কোনদিনই আমাকে ফিরিয়ে নেবে না। কিন্তু পাতানো ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠলে তাদের মান যাবে। কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। তাছাড়া এই বয়সে অন্যের গলগ্রহ হয়ে থাকতেও ইচ্ছে করে না। নাহলে বছরের পর বছর হোমের চার দেওয়ালে বন্দী হয়ে থাকতে কারই বা ভালো লাগে বল ?
--- কিন্তু তোমার নিজের দাদারাই  বা কেন তোমায় ফিরিয়ে নেবে না।
--- সে অনেক কথা।
--- তোমার আপত্তি না থাকলে বলোই না শুনি।
---- না, না। আপত্তি কিসের। আমাদের হোমের মেয়েদের জীবনের ইতিহাস তো গড়পড়তা প্রায় একই। 
তখন  সাবিত্রীদি শুরু করেন তার জীবনের করুণ কাহিনী। সেই কথা বলতে গিয়ে বার বার তার গলা বুজে আসে। অঞ্জলি চোখও ঘন ঘন ভিজে যায়।

            

( ক্রমশ )




        নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                   শীঘ্রই আসছে 

           ধারাবাহিক নাটক ----                                 

                                                               


                                    

                -----০----

   

No comments:

Post a Comment