( কিস্তি -- ৫৬ )
মনটা বিষন্ন হয়ে যায় তার। বাড়ির লোকেদের জন্য খুব মন কেমন করে ওঠে তার। কতদিন সে দেখে নি তাদের। তবে শ্রাবণীর বিয়ে উপলক্ষ্যে মা-দিদির সংগে নিশ্চয় দেখা হবে। জামাইদার সঙ্গে নিশ্চয় তারা সেদিন আসবে। বাবার কথাও খুব মনে পড়ে তার। নিজের পায়ে যদি কোনদিন সে দাঁড়াতে পারে তাহলে বাবাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। দেখত দেখতেই শুরু হয়ে যায় শ্রাবণীর বিয়ের ব্যস্ততা। সাবিত্রীদি একদিন নিজে হাতে রান্না করে তাকে আইবুড়ো ভাত খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন। সেদিন সবাই তারা শ্রাবণীকে ঘিরে গোল হয়ে বসে আইবুড়ো ভাত খাওয়ায়। হাসি--ঠাট্টায় খেতে খেতে মাঝে মধ্যেই লাল হয়ে ওঠে শ্রাবণী মুখ। আর তাতে তাকে আরও সুন্দর দেখায়।একদিন আলাপনবাবুর সঙ্গে শ্রাবণীকে নিয়ে গিয়ে তারা কয়েকজন শাড়ি - গয়না সহ অন্যান্য জিনিসগুলো কিনে আনে।
তারই মধ্যে একদিন তার রেজাল্টের খবর নিয়ে আসেন আলাপনবাবু। স্টার নিয়েই পাশ করেছে সে। সেই খবর আসা মাত্র বয়স্কাদের সবাইকে ঘরে ঘরে গিয়ে প্রণাম করে আসে অঞ্জলি। সবাই তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আর্শিবাদ করেন। এমনিতেই শ্রাবণীর বিয়ে ঘিরে হোমে বইছিল খুশীর হাওয়া , তার রেজাল্টের খবর পৌঁছোতেই তা যেন দ্বিগুন হয়ে ওঠে।খুশীর আভাষ মেলে আলাপনবাবুর চোখে মুখেও। তারই বর্হ্বিপ্রকাশ ঘটে তার কথাতে। হঠাৎ তিনি ঘোষণা করেন , অঞ্জলি ভালো রেজাল্ট করার জন্য আজ হোমে মাংসভাত হবে। খরচটা আমিই দেব। সেই মতো বাজার থেকে মাংস নিয়ে আসেন তিনি। সেদিন আলাপনবাবুও তাদের সঙ্গে পাত পেড়ে খান। সবাই খুশী হয়। এক ফাঁকে একা পেয়ে আলাপনবাবু তাকে বলেন , দেখ আমি তোমার মুখ রেখেছি। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তোমাকেও কিন্তু আমার মুখ রাখতে হবে।
সে বলে, চেষ্টা করব।
---- উহু চেষ্টা নয় , আমার মুখ চেয়ে তোমাকে পারতেই হবে।
আলাপনবাবুর মুখের দিকে অঞ্জলি অবাক হয়ে চায়। তার মুখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করে। শুধুই কি কর্তব্যের খাতিরে তাকে উৎসাহ যোগাতেই আলাপনবাবু তাকে কথাগুলো বলেন ? তার বাইরেও কিছু কি উঁকি দেয় না ? তাই বা সে বলে কি করে ? আলাপনবাবু তো হোমের অন্য মেয়েদেরও একই ভাবে উৎসাহ যোগান। সে প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে বলেই না তাকে একটু বেশি উৎসাহ দেন। তারই আসলে দেখার ভুল।আলাপনবাবুর মনে সেরকম কোন ব্যাপারই নেই। সেটা ভেবেই মনটা যেন খারাপ হয়ে যায় তার। অবচেতনে তার মনও কি তাহলে আলাপনবাবুর একটু বাড়তি মনোযোগ আশা করেছিল ? পরক্ষণেই মন থেকে ভাবনাটাকে তাড়ায় সে। তবে আলাপনবাবুর প্রত্যাশা সে পূরণ করার চেষ্টা করবে। আলাপনবাবু তো তার কথাতেই শ্রাবণীর বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে এত ভালো একটা কাজ করেছেন। নাহলে মেয়েটার কাছে সে তো মুখ দেখাতেই পারত না। তাছাড়া মানুষের মতো বাঁচার জন্যও তো তার নিজের পায়ে দাঁড়ানো প্রয়োজন। মনে মনে সেই প্রতিজ্ঞাই করে অঞ্জলি। তারই মধ্যে নির্ধারিত দিনে হোমে বেজে ওঠে বিয়ের সানাই। সেদিন সকাল থেকেই সরগরম হয়ে ওঠে হোম। দফায় দফায় পুলিশ প্রশাসনের লোকেরা খোঁজখবর নিয়ে যায়। আসেন সাংবাদিকেরাও। বিয়ের খুঁটিনাটি নিয়ে টিভিতে ঘন ঘন সংবাদ প্রচারিত হতে থাকে। হোমের আবাসিকদের বাড়ির লোকেদের মধ্যে কেবল এসেছেন সাবিত্রীদির পাতানো ভাই, অমলবাবু আর তার দিদি, মা আর জামাইদা।শ্রাবণীর বিয়ের দৌলতেই অনেকদিন পর নিজেদের লোকেদের পেয়ে খুব ভালো লাগে অঞ্জলির। কিন্তু আজ তো তাদের সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা বলার অবকাশ নেই তার। এমনিতেই হোমের সবাই ব্যস্ত, তার ব্যস্ততা তো আরও বেশি। সে'ই তো ওদের চার হাত এক করার ব্যবস্থা করছে। তাই আয়োজনে কোনদিকে কোন ত্রুটি না হয় তার খেয়াল তাকেই রাখতে হয়। এই ধরণের বিয়ের আচার আচরণ সম্পর্কে তার বিশেষ কিছু জানা নেই। তাই সে অন্য সবাইকে ধরে ধরে সব কাজে সামিল করে। খুঁটিনাটি কাজে জন্য হোমের সকলে তার সঙ্গেই আলোচনা করে।
তার এই ব্যস্ততা দেখেই দিদিই বলে, আমাদের জন্য ভাবতে হবে না। সবাই তো তোকেই ভরসা করে। তুই ওই দিকটা দেখ।অঞ্জলি দেখে একসময় মা দিদি , জামাইবাবু আর সাবিত্রীদির ভাইও কাজে হাত লাগিয়েছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে যেন নিজের বাড়ির মেয়েরই বিয়ে হচ্ছে। সবার আন্তরিকতা অঞ্জলিকে মুগ্ধ করে তোলে। সব থেকে ব্যস্ত আলাপনবাবু।
তিনিই যেন কন্যাকর্তা। এই ক্যাটারের লোকদের সঙ্গে কথা বলছেন তো ওই বাজারে ছুটছেন। কখনও বা ছাতনা তলা সাজাতে বসছেন। অঞ্জলিও হাতে হাতে এগিয়ে দিচ্ছে সুতো, ফুল, থার্মোকল।মাঝে মাঝে হাতে হাত ঠেকে যাওয়ায় অন্যরকম একটা স্পর্শানুভূতিতে ভরে উঠছে অঞ্জলির মন। আবেশ ভরা দৃষ্টিতে আলাপনবাবুর চোখের দিকে সে দেখে সে চোখেও যেন হারিয়ে যাওয়ার আহ্বান। আলাপনবাবুর সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে হয় তারও।
কয়েকদিন ধরেই আলাপনবাবুকে ঘিরে তার মনে অন্যরকম একটা ইচ্ছে ঘুরপাক খাচ্ছে।কিন্তু নিজের খুব জানতে ইচ্ছে হয় আলাপনবাবুর মনেও কি তার জন্য কোন জায়গা আছে ? কিন্তু সেটা আর জানার সময় হয় না। সাবিত্রীদি এসে জানায় ছেলের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদের তত্ত্ব নিয়ে লোক এসেছে। তাকে বিদায় দেওয়ার পাশাপাশি গায়ে হলুদের পর্বটা শেষ করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে অঞ্জলিকে যেতে হয় সেদিকে।
তাদের সমাজের সঙ্গে এই বিয়ের আচার আচরণের তেমন কোন মিল নেই বললেই চলে। তবু সে ছোটবেলায় বাবা--মায়ের সঙ্গে পরানকাকুদের বাড়ির অনেক বিয়ে দেখেছে। সেই অভিজ্ঞতা বেশ কাজে লেগে যাচ্এংখানে। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে বেশ মজা হয়। যে যাকে পারে আচ্ছা করে হলুদ মাখিয়ে দেয়। বাদ যায় না অঞ্জলিও। মাঝে শ্রাবণী তার উদ্দ্যেশে বলে, মাখাও মাখাও যত পারো , এর পর কিন্তু তোমাকে এভাবেই হলুদ মাখানো হবে। আমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে ভেব না পার পেয়ে যাবে। শ্বশুরবাড়ি থেকে ঠিক হাজির হয়ে যাবে। বলে তার দিকে তাকিয়ে একটা ইঙ্গিতপূর্ন হাসি ছুড়ে দেয়। আর লজ্জা রাঙা হয়ে ওঠে অঞ্জলির মুখ। সে শ্রাবণীকে দূর থেকে কিল দেখায়। আর শ্রাবণী তাকে ভেংচি কেটে স্নান ঘরের দিকে চলে যায়।
সন্ধ্যের মুখেই আলোর মালায় সেজে ওঠে হোম। বক্সে বেজে ওঠে সানাই। হোমের পরিবেশটাই যেন পাল্টে যায়। হোম নয়, মনে হয় যেন কোন গৃহস্থের বিয়ে বাড়ি। প্রথম সন্ধ্যেতেই লগ্ন। তাই কয়েকজন শ্রাবণীকে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মালা চন্দনে শ্রাবণীকে দেখতে অপূর্ব সুন্দর লাগে। অঞ্জলি তার চিবুক ছুঁয়ে বলে , কি সুন্দর লাগছে রে তোকে। আমারই প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করছে।
--- এমা , আগে বলবে তো। তাহলে আর কষ্ট করে বাইরের ছেলেটাকে পাত্তা দিতাম না।
--- ও তাই , সত্যি ?
তাদের দুজনের হাসি ঠাট্টা বাকিরাও উপভোগ করে। সবাই বলে , অঞ্জলি তুমি আসার পর থেকেই হোমের পরিবেশটাই পাল্টে গিয়েছে। আগে মনে হোত হোম ছেড়ে পালায়। এখন মনে হয় হোম ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হবে। তুমি না থাকলে এই হোমে কোনদিনই আলোও জ্বলত না , সানাইও বাজত না।
নিজের প্রশংসায় খুব অস্বস্তিতে পড়ে যায় অঞ্জলি। অস্বস্তি এড়াতে সে বলে শুধু কনেকে সাজালেই হবে ? আমাদের সাজতে হবে না ? এমন সাজার সুযোগ আর পাবে কখনও ?
সবাই বলে , ঠিক ঠিক। চলো এই বারে আমরাও সাজগোজটা সেরে নিই।
আলাপনবাবু হোমের সব মেয়েদের জন্যই একপ্রস্থ করে পোশাক, প্রসাধনী আর একছড়া করে রজনীগন্ধার মালা এনেছেন। তাই নিয়ে সবাই সাজতে বসে যায়। শ্রাবণীই অঞ্জলিকে সাজতে সাহার্য্ করে। সাজাগোজ শেষ হলে শ্রাবণী বলে, দিদি তোমাকে যা লাগছে না , একদম ফাটাফাটি। দেখো একজন তো চোখই ফেরাতে পারবে না। বলেছিলে না আবার কবে সাজার সুযোগ মিলবে তার ঠিক নেই।আমার মন বলে সে সুযোগ তো তোমাকে ঘিরেই শীঘ্রই আসছে গো।
--- তুই কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছিস। এবার গাট্টা খাবি কিন্তু। বিয়ের দিন বলে রেহাই পাবি না।
-- বেশ, মারো না মারো বলে মাথাটা এগিয়ে আনে শ্রাবণী। সে শ্রাবণীর মাথায় দুটো চুমু খায়।
তখনই হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢোকে আলাপনবাবু। বেশ কিছুটা বিরক্তির সুরে বলেন, আচ্ছা তোমাদের কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই নাকি বলো তো ? বরের গাড়ি চলে এসেছে , বরণ করতে হবে তো নাকি ?
-- হ্যা হ্যা, যাই চলুন, বলে অঞ্জলি ঘুরে দাঁড়াতেই তাকে দেখে আলাপনবাবু বলে ওঠেন --- বাঃ অপূর্ব। খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তো।
শ্রাবণীর সামনে ওই কথা শুনে মরমে মরে যায় অঞ্জলি। আলাপনবাবুর দিকে থেকে সেও চোখ ফেরাতে পারে না। পাজামা আর পাঞ্জাবিতে হিরো হিরো লাগছে তাকে। কিন্তু লজ্জায় সে কোন কথাই বলতে পারে না। লজ্জা ঢাকতে দ্রুত সে বলে , হ্যা হ্যা চলুন দেখি সাবিত্রীদিদের ডেকে নিয়ে এক্ষুণি যাচ্ছি।
বলে সে বাইরে যাওয়ার উপক্রম করতেই শ্রাবণী তার হাত দুটো ধরে বলে, কি দিদি কি বলেছিলাম, মিলল তো ?
--- ধ্যাত, তুই না! বলে কোনরকমে শ্রাবণীর হাত ছাড়িয়ে সবাইকে ডেকে নিয়ে বর বরণ করতে ছোটে অঞ্জলি।
গেটের মুখে গিয়ে দেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝাঁ চকচকে দুটো গাড়ি। তার একটি থেকে সন্দীপকে নিয়ে নামেন জেলা পুলিশ সুপার, অন্যটি থেকে নামেন জেলাশাসক। তখন তাদের দেখে কে বলবে , দুজনে প্রশাসনের রাশভারী দুই কর্তা। দিব্যি ধুতি পাঞ্জাবিতে দুজনকে মনে হচ্ছিল যেন বিয়ে বাড়ির কর্তা। উলু দিয়ে খই ছড়িয়ে তাদের হোমের ভিতরে নিয়ে আসে অঞ্জলিরা। তারা হোমের ভিতরে পা রাখতেই ঝলসে ওঠে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা। দুজনকেই ছেঁকে ধরে সাংবাদিকের দল। তখন অঞ্জলিকে কাছে ডেকে নেন ডি,এম সাহেব। তার পর তার মাথায় হাত রেখে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন , আজকের এই যুগান্তকারী ঘটনাটিতে অনুঘটকের কাজ করেছে আমাদের এই মেয়েটি। তার জন্য আমরা গর্বিত। ওই কথা শোনার পরই সবাই হাততালি দিয়ে ওঠেন। অঞ্জলির সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আবেগে তার গলা বুজে আসে। কোন রকমে হাত জোড় করে সবাইকে অভিবাদন জানিয়ে বিয়ের আসরে পৌঁছোয় সে। বিয়ের আসরে এসে বসেন প্রশাসনের দুই কর্তাও। প্রথমে ম্যারেজ রেজিস্টার কাছে সই সাবুদের পর শুরু মন্ত্রোচারণের বিয়ে। কন্যাকর্তা হিসাবে শ্রাবণীকে সম্প্রদান করেন ডি,এম সাহেব। পাত্রপক্ষের দায়িত্ব পালন করেন পুলিশসুপার। বিয়ের পাট চুকতেই শুরু হয়ে যায় খাওয়া দাওয়ার পর্ব। ক্যাটারারকে বলা ছিল , তারাই সব ব্যবস্থা করে। খাওয়া দাওয়া শেষ হতে রাতও প্রায় শেষ হয়ে আসে।তারপরই শুরু হয় বিদায় নেওয়ার পালা। পুলিশ প্রশাসনের লোক, সাংবাদিকরা একে একে বিদায় নিয়ে চলে যান। বিদায় দেওয়ার সময় হয়ে আসে শ্রাবণীকেও। হোমের সবাই তাকে ধরে ধরে গাড়িতে তুলে দিতেই প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে শ্রাবণী।তার কান্না সংক্রামিত করে অন্যদের। বেশ কিছুক্ষণ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই চলে। শ্রাবণী তার হাত জড়িয়ে ধরে নিজেকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। অঞ্জলি তাকে সান্ত্বনা দেয়। এক সময় আস্তে আস্তে তার হাত ছাড়িয়ে হোমের গেট ছেড়ে বেরিয়ে যায় গাড়ি।



No comments:
Post a Comment