Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

হারিয়ে যাওয়া রঙ

  


                হারিয়ে যাওয়া রঙ

                                             
  

                             অর্ঘ্য ঘোষ 

                               

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন রঙ খেলা নিয়ে উদ্দীপনার অন্ত ছিল না। সে সময় তো গ্রামগঞ্জে দোকানপাট ছিল না। থাকলেও সেই সব দোকানে না মিলত রঙ, না মিলত পিচকারী। সর্বোপরি ওইসব কেনার মতো ক্রয় ক্ষমতাই ছিল না অধিকাংশ পরিবারের ছেলেমেয়েদের। কিন্তু রঙ খেলা নিয়ে উন্মাদনার অন্ত ছিল না। মা ঠাকুমাদের কাছে দোলযাত্রার দিনটা কবে জানার পর থেকেই উত্তেজনায় রাতে ঘুমোতে পর্যন্ত পারতাম না। 



                        আমাদের বাড়িতে ঝাড়ুকাকু বলে একজন কাজের লোক ছিলেন, তাকে ধরতাম পিচকারির জন্য। ঝাড়ুকাকু ফাঁপা বাশের নল কেটে লাঠির ডগায় কাপড় জড়িয়ে পিচকারি বানিয়ে দিতেন। মুড়ি ভাজার খোলার কালি, জামা কাপড়ে দেওয়া গোটা নীল গুলে রঙের অভাব পূরণ করা হত। সেইসব রঙের স্থায়িত্ব বাড়াতে মেশাতাম কলাগাছের থেঁতো করা রস। তারপর  বালতিতে রঙ আর পিচকারী নিয়ে বেড়িয়ে পড়তাম পাড়ায় পাড়ায়। কাউকে একবার দেখলেই হত। পিচকারীতে রঙ ভরে ছুটতাম তার পিছু পিছু। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাম্প করার সময় লাঠির ডগায় বাঁধা ন্যাকড়াটি যেত খুলে। তখন কাউকে তাড়া করাই সার হত। রঙ ছুটে গিয়ে তার গায়ে লাগার পরিবর্তে গড়িয়ে পড়ত মাটিতে। 


                              আর তাই দেখে আমারা ফের লাঠির ডগায় ন্যাকড়া জড়াতে জড়াতে হাসতাম নির্ভেজাল হাসি। সেদিন খিদে তেষ্টা সব ভুলে যেতাম। দুপুর গড়িয়ে গেলেও বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করত না। তার মধ্যে রঙ ফুরিয়ে গেলে খুব মন খারাপ করত। যার রঙ তখনও বেঁচে থাকতে তাকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হত। তারপর একসময় অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও ফিরত হত। মা হিড়হিড় টেনে নিয়ে যেতেন পুকুরঘাটে। সাবান ঘষে ঘষে সেই রঙ তুলতে প্রায় বিকেল হয়ে যেত। বিকেলে বড়দের পায়ে আবীর দিয়ে প্রনাম করতাম। 


                                   পিচকারীটা কিন্তু ফেলতাম না। রঙ না হলেও শুধু জল দিয়েও বন্ধুদের মধ্যে দিন কয়েকদিন চলত রঙ খেলার রেশ। একটু যখন বয়েস বাড়ল তখন রঙ খেলার অন্য মানে অনুভব করলাম। উৎসবটাকে অনুরাগের - ভালোবাসার উৎসব মনে হোল। বিশেষজনকে রঙ দেওয়ার ইচ্ছের জন্ম হোল। তখন তো আর আজকের মতো ফোনে হ্যাপি হোলি কিম্বা হোয়ার্টস অ্যাপে  দোলের ভিডিও পাঠিয়ে প্রিয়জনকে রঙিন করে তোলার সস্তা উপায় ছিল না। তাই কাগজে মুড়ে বইয়ের পাতার ফাঁকে লুকিয়ে রাখতাম ভালোবাসার আবীর। সময় এবং সুযোগের অপেক্ষায় সেই আবির থেকে যেত দিনের পর দিন।


                                   তারপর হয়তো কোন এক গোধুলিবেলায় গলির মোড়ে তার হাতে তুলে দিতাম সেই আবীর। একইভাবে সেও তুলে দিয়েছে কাগজে মোড়া তার সযত্নে রাখা আবীর। কেউ কাউকে মাখানোর সুযোগ হয় নি। কিন্তু কাগজে মোড়া সেই আবীর হাতে পেয়েই তার চোখমুখ রঙিন হয়ে উঠতে দেখেছি। তখন আজকের মতো হাত মুঠো করে ইয়া বলতে পারি নি। কিন্তু মনে বিশ্বজয়ের আনন্দ অনুভব করতাম। বাড়ি ফিরে গোপনে সেই আবীর  মেখে অনুরাগে শুধু ভিজেছি আর ভিজেছি। এখনকার  রঙ কি সেই অনুরাগে ভেজায় ?


                    -----০----


No comments:

Post a Comment