Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

সালিশির রায় -- ৫৮





              সালিশির রায়


                          

        

                                    অর্ঘ্য ঘোষ

     (  কিস্তি -- ৫৮ ) 




অঞ্জলির চোখও ঘন ঘন ভিজে যায়। একদিন সম্পন্ন চাষি পরিবারের মেয়ে ছিলেন সাবিত্রীদি। বেশ কিছু জমি জায়গা ছিল তাদের। বাবা-মা, দুই দাদা, বৌদি আর তাকে নিয়ে ছিল তাদের ৭ সদস্যের সাজানো সংসার। সবার ছোট বলে সে ছিল বাবা--মায়ের নয়নের মনি। বাবার কাছে  তার আদর-আবদারের সীমা পরিসীমা ছিল। তাই নিয়ে দাদারা কিছুটা মনোক্ষুন্ন হলেও বাবার ভয়ে টুঁ শব্দটি করতে পারত না। এমনকি  দাদাদের বিয়ে হয়ে গেলেও মা'ই ছিল সংসারের কর্ত্রী। বাবার দাপটে সে সময়  মুখে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস পেত না দাদারা। কিন্তু তারপর তাদের সাজানো সংসারটা একদিন তছনছ হয়ে যায়। সে যখন ক্লাস সিক্সে পড়ে তখন তার পরিবারের উপর নেমে আসে যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। আচমকা একদিন মাঠে কাজ করতে গিয়ে বাজ পড়ে মৃত্যু হয় বাবার। খবর পেয়ে তারা যখন ছুটে যায় তখন সব শেষ। মাঠের মাঝে পড়ে থাকা বাবার মৃতদেহ আঁকড়ে কেঁদে ভাসিয়েছিল সে আর মা। বাবার শ্রাদ্ধশান্তি চুকতেই দাদারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কথায় কথায় মা আর তাকে হুল ফোটাতে শুরু করে। বাবার আর মায়ের হাতে সাজানো সংসারটা কেমন যেন হতশ্রী হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের প্রতি দাদাদের ওই ধরণের আচরণের কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না তারা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে পরিস্কার হয়ে যায় বিষয়টা। প্রকাশ হয়ে পড়ে দাদাদের স্বরূপ। আসলে বাবা তার বিয়ের জন্য বেশ কিছু টাকা জমিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। সেই টাকাটা আত্মসাৎ করার জন্য দুই দাদা উঠে পড়ে লাগে। তাকে আর মাকে কোন কিছু না জানিয়েই পাশের গ্রামের প্রায় বাপের বয়সী এক দোজবরের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করে বসে তারা। তাই নিয়ে মায়ের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ শুরু দাদাদের। দাদারা তখন তাকে কোন রকমে পার করে বাবার জমিয়ে রাখা টাকা ,  জমি ,সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে মরীয়া হয়ে ওঠে। তাই নিয়ে দিনরাত মায়ের সঙ্গে  খিটিমিটি লেগেই থাকে। সেও বলে লেখাপড়া শেষ না করে বিয়ে করবে না। কিন্তু দাদারা কোন কথা কানেই তোলে না। টাকা আর সম্পত্তির মোহে অন্ধ হয়ে একদিন মায়ের গায়ে হাত পর্যন্ত তুলে বসে দুই দাদা। লজ্জায় অপমানে সেই রাতেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে মা।



                              আর তারপরেই তাকে বিদায় করার তোড়জোড় আরও বেড়ে যায় দাদাদের। এতদিন মা থাকায়  বৌদিরা গোপনে গোপনে দাদাদের মদত যোগালেও প্রকাশ্যে কিছু বলে নি। এবারে নিঝঞ্ঝাট হতে তারাও মাঠে নেমে পড়ে। সাবিত্রীর তীব্র আপত্তি স্বত্ত্বে ও সেই দোজবরের সঙ্গেই বিয়ের দিন পর্যন্ত ঠিক করে ফেলে দাদারা। অগ্যতা একদিন ভোরে বাড়ি ছাড়তে হয় সাবিত্রীদিকে।  সোঁজা পৌঁছোন থানায়। সেখানে ঘটনার কথা সব খুলে বলেন। বলেন, আমি পড়তে চায়। কিন্তু দাদারা জোড় করে আমার বিয়ে দিচ্ছে। থানা থেকে ডেকে পাঠানো হয় দাদাদের। দাদারা সাফ জানিয়ে দেয় , যে বোন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে তার দায়িত্ব তারা নিতে পারবে না। ততক্ষণে খবর পৌঁচেছে বাল্য বিবাহ রোধ নিয়ে কাজ করা সংস্থার কর্মকর্তাদের কাছে। তাদের মধ্যস্থতায় প্রশাসনের নির্দেশে তার ঠাঁই হয় এই হোমে। প্রশাসন তার পড়াশোনার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয় হোম কর্তৃপক্ষকে। সেদিন বাল্য বিবাহ রোধের কৃতিত্ব দাবি করে প্রশাসন এবং ওই সংস্থার কর্তারা বড়ো বড়ো বিবৃতি দিয়েছিলেন। পরের দিন তাদের ছবি সহ সংবাদ মাধ্যেমে সেই খবর ফলাও করে ছাপাও হয়েছিল। কিন্তু যে কারণে সে ঘর ছেড়েছিল সেই পড়াশোনাটার ব্যবস্থাটা আদৌ হয়েছে কিনা সেই খবর আর কেউ রাখে নি। আর অখিলেশবাবুর তো সেই ধরণের কোন সদিচ্ছাই ছিল না। তারপর থেকে তো সে এই লাঞ্ছনার জীবন বয়ে চলেছে।কিছুটা থেমে সাবিত্রীদি বলেন ,  জানিস আগে মাঝে মধ্যে মনে হত, আমি কি সেদিন ভুল করেছিলাম ? যাই হোক না কেন , চেনা পরিবেশে চেনা মানুষজনের মাঝে তো থাকতে পারতাম। কিন্তু হোমে তো শুধুই চার দেওয়ালের বন্দী জীবনে সব হারানোর ব্যাথায় গুমরে গুমরে ওঠে বোবা কান্না। তাই  সব হজম করেই তো পড়ে থাকতে হয়। কারণ আমাদের মতো মেয়েরা একবার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলে ফেরার আর পথ থাকে না।আজ এত বছর কেটে গেল হোমে, রক্তের সম্পর্কের কেউ একটি রারের জন্যও আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে না। কেবল পাতানো ভাইটাই ছুটে ছুটে আসে। তার মুখেই সে শুনেছে দাদারা  নাকি বলেছে তাদের কোন বোন নেই। যে ছিল সে মরে গ্যাছে। শুনে চোখ ফেটে জল আসে। কিন্তু বাড়ি ফিরতে আর ইচ্ছে হয় না। তাছাড়া বাড়িটা কি আর আদৌ আমার আছে ? যে দাদারা আমাকে মৃত মনে করে , কেন তাদের সামনে গিয়ে অস্বস্তির কারণ হবো ?



                         একটানা নিজের জীবনের কাহিনী বলতে বলতে ভিজে যায় সাবিত্রীদির দু'চোখের কোল। কেঁদে ফেলে অঞ্জলিও। সে মনে মনে ঠিক করে যেমন ভাবেই হোক  সাবিত্রীদির আক্ষেপ ঘোচানোর চেষ্টা করবে সে ।পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে সে জিজ্ঞাসা করে -- আচ্ছা সাবিত্রীদি , ধরো কোনদিন তোমার দাদারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তোমাকে যদি ফিরিয়ে নিতে আসে ? 
---- সে আশা আমি আর করি না। প্রথমদিকে ভাবতাম ভুল তো মানুষ মাত্রেই করে , মানুষই সেই ভুল শুধরে নেয়। দাদারাও হয়তো একদিন তাদের ভুল বুঝতে পারবে। কিন্তু আজ এত বছর হয়ে গেল। আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া দুরের কথা , ভাইফোঁটাতে আমার হাতে ফোঁটা নিতে আসার কথা একবার তাদের মনে পড়ল না। তাই আমি আর ও সব কথা ভাবি না।
---- কিন্তু কারও ভুল চট করে ভেঙে যায় ,  আবার কারও কারও ভুল ভাঙতে তো অনেক দেরী লাগে। ধরো তোমার দাদাদের ভুল একটু দেরীতেই ভাঙল ?
---- তুই কি আমাকে লোভ দেখাচ্ছিস ? 
বলেই দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়েন সাবিত্রীদি। নিজের পরিবারের জন্য তার মনে যে একটা ভালোবাসার চোরাস্রোত বইছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না অঞ্জলির। আলাপনবাবু এলে   সে প্রসঙ্গটা তোলে। ঘটনার কথা সমস্ত খুলে বলে জিজ্ঞাসা করে --- কিছু একটা করা যায় না ?
কথাটা শুনেই প্রথমে তার দিকে ভ্রু কুচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন আলাপনবাবু। 
তারপর বলেন ,  তুমি কি এখন পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে একটার পর একটা নিত্য নতুন পরিকল্পনা নিয়েই বেশি মাথা ঘামাচ্ছ ?
--- মোটেই না , আমি পড়াশোনায় ফাঁকি দিই না।পড়াশোনা বজায় রেখেই যা করার করি। একই ছাদের তলায় থেকেও যদি অন্যের সুখ দুঃখের শরিক না হতে পারলাম তাহলে কিসের আমারা মানুষ। অবশ্য জানি না আদৌ আপনারা আমাদের মানুষ ভাবেন কি না ? 
--- এই দেখ , এই তোমার এক মস্ত দোষ। খোঁচা দিয়ে ছাড়া কথা বলতে পারো না। বেশ তা না হয় হোল , কিন্তু সাবিত্রীদির বিষয়টি নিয়ে কি'ই করা যায় বলো ?  এতদিনেও যখন ওনার দাদারা বোনের খবর নেওয়ার কোন প্রয়োজন বোধ করেন নি , তখন আমরা বললেই যে বোনকে ফিরিয়ে  নেবেন বলে মনে হয় না।
---- সেটার সম্ভাবনাই বেশি , কিন্তু আমাদের একবার চেষ্টা করতে ক্ষতি কি ? তাতে কাজ হলে ভালো , না হলে তো সাবিত্রীর আর কিছু খারাপ হওয়ার আশঙ্কা নেই।
 --- তাহলে কি করতে চাও তুমি ?
---- আমি ঠিক করেছি  আমরা সরাসরি সাবিত্রীদির দাদাদের সংগে একবার কথা বলব।
---- আমরা মানে ? 
----আমি আর আপনি। এখনই কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। স্কুলে যাচ্ছি বলে আমরা ওদের গ্রামে পৌঁছে যাব।
--- তাতে বিশেষ কাজ হবে বলে আমার মনে হয় না।
----- প্রথমে খারাপটাই ধরে নিচ্ছেন কেন ? অনেক সময় ইচ্ছা স্বত্ত্বেও দুপক্ষ জেদ আর লজ্জার জন্য কাছাকাছি হতে পারে না। দু'পক্ষই মনে মনে চায় , কেউ একজন মধ্যস্থতা করে তাদের দুরত্বটা ঘুচিয়ে দিক। কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করতে পারে না বলে দুরত্বটা ঘোচে না।অবাক হয়ে অঞ্জলির কথা শোনেন আলাপনবাবু।তার কথা শুনে বেশ কিছুক্ষণ সপ্রশংস দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন তিনি। তারপর বলেন -- তোমার পর্যবেক্ষণ আর বিশ্লেষণ ক্ষমতা দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। অনেক উচ্চ শিক্ষিত মানুষও এভাবে ভাবতে পারবেন না। আমিও ভাবি নি। ঠিক আছে কালই আমরা সাবিত্রীর গ্রামে যাব।অঞ্জলি আগেই সাবিত্রীদির পাতানো ভাইয়ের কাছে তাদের গ্রামের ঠাই ঠিকানা নিয়ে রেখেছিল। সেই মতো পরের দিনই সকাল সকাল তারা মোটর বাইকে পৌঁচ্ছে যায় সাবিত্রীদের গ্রামে।

                

     ( ক্রমশ )




        নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                   শীঘ্রই আসছে 

           ধারাবাহিক নাটক ----                                 

                                                               


                                    

                -----০----

   

No comments:

Post a Comment