( কিস্তি -- ৫৯ )
সেই মতো পরের দিনই সকাল সকাল তারা মোটর বাইকে পৌঁচ্ছে যায় সাবিত্রীদিদের গ্রামে। অমলবাবুর কাছে বর্ণনা শুনে হাজির হয় তার দাদাদের বাড়ির দরজায়। সাবিত্রীদির দুই দাদা তখন উঠোনে ধান ঝড়াচ্ছিলেন। ধানের পালা দেখেই অঞ্জলি বুঝে যায় সাবিত্রীদির দাদারা বেশ সম্পন্ন চাষি। তাদের গ্রামের পরাণকাকুদের চেয়ে ধানের গোলা , গোয়াল চালা বেশ বড়ো।
তাদের দেখেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন সাবিত্রীদির দুই দাদা। অঞ্জলিরা হাত জোড় করে জানায়, তার হোম থেকে আসছে। হোমের কথা শুনেই প্রতি নমস্কার কথা ভুলে যান দুইজনেই। অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন তারা। পরিস্থিতিটাকে স্বাভাবিক করার জন্য অঞ্জলিই আগ বাড়িয়ে বলে , কি দাদা বাড়ির ভিতরে যেতেও বলবেন না। হোমের মেয়ে বলে কি আমরা এতই অচ্ছুৎ ? অঞ্জলির কথা শুনে যেন কিছুটা লজ্জিত হয়ে পড়েন দুজনে। তারপর কাজ থামিয়ে গামছায় গায়ের ঘাম মুছতে মুছতে এগিয়ে এসে বলেন -- আসুন আসুন, ভিতরে আসুন।তাদের অনুসরণ করে বৈঠকখানা ঘরে গিয়ে বসে অঞ্জলিরা। দরজার ফাঁক দিয়ে সেখান থেকেই দেখতে পায় আড়চোখে কৌতুহলী দৃষ্টিতে চেয়ে আছে দুজন মহিলা আর চারটি ছেলেমেয়ে। অঞ্জলির বুঝতে অসুবিধা হয় না মহিলা দুজন সাবিত্রীদির বৌদি আর ছেলেমেয়েগুলো ভাইপো -- ভাইঝি। অঞ্জলি ঘর থেকেই তাদের উদ্দেশ্যে নমস্কার জানিয়ে বলে , আপনাদের সঙ্গেও আমাদের কথা আছে। আগে দাদাদের সঙ্গে কথা বলে নিই। তারপর আপনাদের সঙ্গে আলাপ করব। অঞ্জলির কথা শুনে সাবিত্রীদির দাদা--বৌদিদের বিষ্ময় বাড়তে থাকে। বিষ্মিত হন আলাপনবাবুও। বেশিক্ষণ আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারেন না সাবিত্রীদির দাদারা। তারা বলেই ফেলেন , আপনাদের আগমনের উদ্দেশ্য কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু খোলসা করে বলবেন ?
তাদের তাড়া দেখে ভূমিকাটুকুও করার সুযোগ পায় না অঞ্জলি। সাবিত্রীদির দাদাদের সামনে তাদের আসার উদ্দেশ্য খুলে বলে সে। দরজার আড়াল থেকে সব শোনেন বৌদিরাও। শুনে প্রথমেই যেন তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন সবাই। বড়দা বলে ওঠেন , ও তাহলে আপনাদের বুঝি সালিশি করতে পাঠানো হয়েছে। তখন আমাদের মুখ পোড়ানোর সময় মনে ছিল না। আপনারা এসেছেন , চা-জল খান। কিন্তু ওই বিষয়ে আর একটিও কথা বলবেন না।
অঞ্জলি বলে --- আপনারা তো আমাদের কথা সব শুনলেনই না।আর কথাই যদি না শোনেন তাহলে আপনাদের বাড়িতে আমার চা--জলই বা খেতে যাব কেন ?
--- আবার কি বলবেন ? যা বলবেন তা তো আমরা বুঝে নিয়েছি।চা-জল না খেলেই বা কি করা যাবে। নেহাত গৃহস্থের অকল্যাণ হবে বলে বলা।
---- অঃ আমরা কিছু মুখে না দিয়ে গেলে আপনাদের অকল্যাণ হবে আর বাড়ির মেয়ে বছরের পর বছর বাইরে পড়ে থাকাটা বুঝি অকল্যাণ নয় ?
--- বাড়ির মেয়ে , কে বাড়ির মেয়ে ? ওকে আর আমরা বাড়ির মেয়ে বলে মনেই করি না।
---- সে আপনারা নাই করতে পারেন। কিন্তু আপনাদের কথা ভেবে সাবিত্রী দুবেলা চোখের জল ফেলেন। সবসময় আপনাদের মঙ্গল কামনা করেন। সেইজন্যই তো আমাদের পাঠালেন।
--- সে আন্দাজ তো আমরা করেইছি। আর বোধহয় হোমে ঠায় হবে না , তাই আপনাদের পাঠিয়েছে সালিশি করতে।
--- ঠিক ধরেছেন। তবে আপনারা যা আন্দাজ করছেন তা কিন্তু নয়।
---- তাহলে ?
---- আসলে সরকার ঠিক করেছে যাদের বাড়িতে আর্থিক সংস্থান রয়েছে তাদের আর হোমে রাখবে না। বাড়িতেই ফেরত পাঠিয়ে দেবে ?
--- মানে ? জোর করে ঢুকিয়ে দেবে ?
--- ধরতে পারেন একরকম তাই। আপনারা জানেন কিনা জানি না , এখন অবিবাহিতা মেয়েদেরও পৈত্রিক সম্পত্তিতে সমানাধিকার আছে।তাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হোমের মেয়েদের সেই ভাগ উদ্ধার করে পুনঃবার্সণের ব্যবস্থা করবে।
ওই কথা শোনার পরই সাবিত্রীদির দাদারা কিছুটা যেন ভড়কে যান। আর আলাপনবাবু ' থ ' হয়ে যান। সে কেবল সঙ্গে এসেছে মাত্র।
তার তো কোন ভূমিকাই নেই। অঞ্জলি একাই একের পর এক ব্যাট করে প্রতিপক্ষকে প্রায় ঘায়েল করে এনেছে। জল কতদুর গড়ায় তা নিয়েই চরম কৌতুহল সৃষ্টি হয় তার মনে।
অঞ্জলির কথা শুনে এবার ছোড়দা বলেন , সেইজন্যই বুঝি আপনাদের পাঠিয়েছে ভাগ বাটোয়ারা বুঝে নিতে। ---- ঠিক ধরেছেন। তবে ভাগ বাটোয়ারা বুঝে নিতে নয় , আপনাদের ভাগ যাতে বেড়িয়ে না যায় তারজন্য আপনাদের সজাগ করতে আমাদের পাঠিয়েছেন উনি।
--- মানে ?
---- সাবিত্রীদি হোম ছেড়ে তার পোড়া মুখ আর আপনাদের দেখাতে চান না। চান না সম্পত্তির ভাগও। তাই সরকার যাতে সম্পত্তি ভাগ করে দিতে না পারে তার জন্য সাবিত্রীদি তার ভাগের অংশটুকু আপনাদের আগেই লিখে দিতে চান। আপনারা সেইমতো কাগজপত্র তৈরি করে দিলেই উনি তাতে সই করে দেবেন।
এবারে আর কথা ফোটে না দুই দাদার মুখে। বেশ কিছুক্ষণ নিঃচুপ থাকার পর কেবল বলতে পারেন -- সাবিত্রী বলেছে এমন কথা ? আমাদের জন্য এত ভাবে ও ?
--- তবে আর বলছি কি ? যে বোন আপনাদের জন্য এত ভাবে , তার কি একটু ঠাঁই হতে পারে না এই সংসারে। আপনাদের পরিবারে এত গরু মোষের জায়গা হয় , আর যার সঙ্গে আপনাদের নাড়ীর সম্পর্ক তার কি একটু জায়গা হতে পারে না ? একটা গরু মোষের চেয়েও কি মানুষের ভার বেশি ? পারেন না নিজের বোনকে ফিরিয়ে নিতে ? সবাই নির্বাক হয়ে শোনে অঞ্জলির কথা। কিছুক্ষণ থেমে অঞ্জলি ফের বলে -- সাবিত্রীদির তো বিয়ের বয়েস পেরিয়ে গিয়েছে। হোমে অপুষ্টিতে ভুগে ভুগে ক'দিনই বা আর বাঁচবেন ? তারপর তো সব আপনাদের ছেলেমেয়েদেরই হবে। সেই কথা ভেবে পারেন না কি আপনাদের ছেলেমেয়েদের পিসির আদরের স্বাদ ফিরিয়ে দিতে ? সাবিত্রীদিকে তার দাদা বৌদিদের স্নেহ ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে ?
একা কথা গুলো বলে যায় অঞ্জলি। ততক্ষণে দুই দাদার চোখই জলে ভরে উঠেছে। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছেন আলাপনবাবু। কোন কথা বলতে হলে তিনিও যেন কেঁদে ফেলবেন।বেশ কিছুক্ষণের জন্য সবাই যেন ভাববিহ্বল হয়ে পড়েন। কিছুটা সামলে নিয়ে প্রথমে মুখ খোলেন বড়দা। কান্না মিশ্রিত গলায় বলেন , জানেন আমাদেরও বাপ-মা মড়া বোনটার কথা খুব মনে হয়। মনে ছুটে যায় তার কাছে। কিন্তু আমাদের পা আটকে দেয় কেমন যেন একটা বাধো বাধো ভাব। একটা জেদ কিছুতেই সেই বাধা ডিঙিয়ে আমাদের বোনটার কাছে পৌঁছোতে দেয় না।
ছোটভাই বলেন , কিন্তু বিশ্বাস করুন একটা অপরাধ বোধ সবসময় আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। তাই ইচ্ছা হলেও বোনটার কাছে আমরা যেতে পারি।
---- কিন্তু সে সময় তো শেষ হয়ে যায় নি। এখনও তো যেতে পারেন বোনের কাছে।
--- সাবিত্রী কি সব ভুলে আর আমাদের ক্ষমা করে দিতে পারবে ?
--- একবার গিয়েই দেখুন না। সামনেই ভাইফোঁটা , এবার হোমে ভাইফোঁটার আয়োজন করা হবে। সেদিনই আসুন। এবার তাহলে আমরা উঠি।
ওই কথা শোনা মাত্রই দুই দাদা হইহই করে ওঠেন -- উঠবেন মানে ? আপনাদের এত কথা শুনলাম আর আমাদের একটা কথা না শুনে চলে যাব বললেই হোল ? দরজার আড়াল থেকে বৌদিরা বলে ওঠেন --- উঠি বললেই ছাড়ছে কে ? ভাত বসিয়েছি , না খেয়ে চলে গেলে গৃহস্থের বুঝি অকল্যাণ হবে না ?
--- কিন্তু দরজার আড়াল থেকে ওভাবে বললে তো হবে না , সামনে আসুন। আর আমাকে আপনি আজ্ঞে করে কথা বললেও হবে না। সাবিত্রীদি আমাকে তুই তোকারি করেন। আমি তারই মতো একজন কপাল পোড়া। তারপর আলাপনবাবুকে দেখিয়ে বলে, ইনি অবশ্য মস্ত মানুষ। আমাদের হোমের হর্তা কর্তা বিধাতা বলা যায়।
অঞ্জলির আপন করা কথাবার্তা শুনে আড় ভেঙে যায় বৌদিদের। ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘরে ঢুকে আসেন তারা নিজেদের পরিচয় দিয়ে বড়বৌদি বলেন, সাবিত্রীও কিন্তু আমাদের আপনি আজ্ঞে করত না।তার বোনও নিশ্চয় তার মতোই তুমি তুমি করে কথা বলবে আমাদের সঙ্গে।
--- তোমরা অনুমতি দিলে নিশ্চয় বলব।
অঞ্জলি ব্যাগ থেকে মিষ্টির প্যাকেট এগিয়ে দেয় বৌদিদের দিকে। বাচ্চাগুলোর হাতে তুলে দেয় চকোলেট। এগুলো অবশ্য অঞ্জলি আগেই দেবে ঠিক করেছিল। কিন্তু কে কেমন ভাবে নেবে ভেবেই আর বের করা হয় নি।
মুহুর্তের মধ্যেই পরিবেশটা পাল্টে যায়। দাদা--বৌদিরা তাদের আতিথেয়তায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। যেন কত নিকট আত্মীয় তারা। বৌদিরা অঞ্জলিকে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যান। আলাপনবাবুর সঙ্গে গল্প জুড়ে দেন দাদারা। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে বৌদিরাও অঞ্জলির সঙ্গে নানা গল্পে মেতে ওঠেন। এ কথা সে কথার পর ছোট বৌদি হঠাৎ বলে বসেন -- একটা কথা জিজ্ঞেস করব, কিছু মনে করবে না তো ভাই ?
---- কি কথা ?
---- ওনার সঙ্গে তোমার কি সম্পর্ক ?
---- ওই তখন বললাম , উনি আমাদের হোম দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন।
---- সে তো বাইরের সম্পর্ক, কিন্তু ভিতরের সম্পর্কটা কি ?
---- ওই একটাই সম্পর্ক, আলাদা কোন সম্পর্ক নেই।
---- বললেই হোল ? আমরাও মেয়ে, আমাদের চোখকে ফাঁকি দেবে ? তুমি যখন তোমার দাদাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন তখন উনি কেমন মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন তোমার দিকে। ওনার ওই চোখের ভাষাই তোমাদের অন্য সম্পর্কের আভাস দিচ্ছিল।
--- সত্যি বলছি বউদি সেই রকম কোন ব্যাপার নেই।
---- মানতে পারলাম না ভাই। তোমার তরফে না থাকলেও ওনার যে তোমার প্রতি আলাদা আগ্রহ আছে তা বোঝাই যায়। না হলে হোমে এত মেয়ে থাকতে তোমাকেই বা উনি সঙ্গে আনবেন কেন ?
--- বউদি উনি খুব ভালো মানুষ। হোমের সব মেয়ের প্রতিই সমান সহানুভূতিশীল।
উনি আমাকে সঙ্গে আনেন নি। সাবিত্রীদির কথা রাখতে আমিই ওনাকে এখানে নিয়ে এসেছি।
--- দেখ ভাই তুমি এড়িয়ে যাচ্ছ যাও। কিন্তু আমরাও তোমাকে জানিয়ে রাখি তোমরা যখন আমাদের একটা দীর্ঘদিনের ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগাতে এসেছো তখন চাও তো আমরা তোমাদেরও একটা সম্পর্কের সেতু গড়ে দিতে পারি।অঞ্জলির অবচেতন মনেই কেমন যেন আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠে। কিন্তু আলাপনবাবুর সম্মানের কথা ভেবেই বৌদিদের কাছে তা আমল দিতে চায় না। বরং মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে , নিশ্চয় বৌদি তেমন হলে তোমাদেরই বলব।এই রকমই নানা খুনসুটিতে সময়টা বড়ো দ্রুত কেটে যায়। খাওয়া দাওয়ার পর বিদায় নেওয়ার আগে এসে পৌঁছোন সাবিত্রীদির পাতানো ভাই অমলবাবুও। ঠিক হয় কাউকে কিছু জানানো হবে না। তিন ভাই মিলে হোমে ভাইফোঁটা নিতে গিয়ে সাবিত্রীদিকে একেবারে চমকে দেবেন। বাড়ির বাইরে পা রাখার আগে অঞ্জলি একবার খোঁচা দিয়ে বলে , ওইদিনই তাহলে কাগজপত্র করে নিয়ে যাবেন। একবারে সাবিত্রীদির সইটাও করিয়ে নিয়ে চলে আসবেন।
অঞ্জলির কথা শুনে দুই দাদাই জিভ কেটে বলেন , কেন আর আমাদের লজ্জা দিচ্ছ ? যে বোন স্বেচ্ছায় আমাদের সব লিখে দিতে চায় তার কাছে লিখে নেওয়ার কথাটা ভাবাও পাপ। এতদিনে আমরা বেশ বুঝতে পারছি বিষয় সত্যিই বিষ।



No comments:
Post a Comment