( কিস্তি --- ৬০ )
এতদিনে আমরা বেশ বুঝতে পারছি বিষয় সত্যিই বিষ। সেটা অঞ্জলিও ভালোই জানে। বিষয়ের মোহেই তো দাদা তাদের ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে পড়ে রয়েছে। তাদের খোঁজ খবর টুকু পর্যন্ত রাখার প্রয়োজন বোধ করে না। দাদা পাশে থাকলে আজ হয়তো তাদের এই পরিস্থিতি না'ও হতে পারত। সেই দাদাই আজ পর হয়ে গিয়েছে। দাদার কথা ভাবতে ভাবতেই অতীতে হারিয়ে গিয়েছিল অঞ্জলি। মোটর বাইকের শব্দে বাস্তবে ফেরে সে। তাকিয়ে দেখে মোটর বাইকে স্টার্ট দিয়ে তারই দিকে তাকিয়ে রয়েছেন আলাপনবাবু।চোখে চোখ পড়তেই অস্বস্তিতে পড়ে সে। কারণ তাকিয়ে দেখে তাদের বিদায় দিতে তখন সবাই দোরগোঁড়ায় এসে দাঁড়িয়েছেন। বৌদিরা তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। সে আমল দেয় না। বরং তাদের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে আলাপনবাবুর কাঁধে হাত রেখে মোটর বাইকে গিয়ে ওঠে। চোখে পড়ে তাকে ওই ভাবে বসতে দেখে মুখ টিপে হাসেন দুই বৌদি।
এবারে তাকেও মৃদু হেসে প্রত্যুত্তর দিতেই হয় , নাহলে খুব খারাপ দেখায়। তারপর হাত নাড়তে নাড়তে বিদায় নেয় তারা। আস্তে আস্তে গ্রাম ছেড়ে বেড়িয়ে আসে তাদের মোটর বাইক। রাস্তায় আসতে আসতে বৌদিদের কথাগুলো মনের মধ্যে আলোড়িত হতে থাকে অঞ্জলির। সত্যিই কি আলাপনবাবু তার প্রতি অনুরক্ত ? কথাটা ভাবলেই কেমন একটা ভালো লাগাতে ভরে যায় তার মন। এমনিতেই সাবিত্রীদির বিষয়টি নিয়ে মনটা ভালো হয়ে গিয়েছে। এত সহজেই যে দাদা--বৌদিরা তার কথা মেনে নেবে তা সে নিজেও ভাবতে পারে নি। এখন ভালোয় ভালোয় সাবিত্রীদিকে তার দাদাদের সংসারে ফিরিয়ে দিতে পারলে তার প্রচেষ্টা সার্থক হবে। তবে এর জন্য সে আলাপনবাবুর অবদান কোনদিন অস্বীকার করতে পারবে না সে। উনি তার কথা মেনে এগিয়ে না এলে তো শ্রাবণীর বিয়ে, সাবিত্রীদির বাড়ি ফেরার রাস্তাটাই হত না। সেইজন্যই কি সে'ও মনে মনে ক্রমশ আলাপনবাবুর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ছে ?
আলাপনবাবুর মোটরবাইকের পিছনে যেতে যেতে অঞ্জলির মনটা কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে চায়। মনে হয় এভাবেই যদি আলাপনবাবু সব কাজে তার পাশে থাকেন তাহলে সে কাজ করার প্রেরণা পাবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনের রাশ টেনে ধরে সে। একেই সে তো সমাজের চোখে নষ্ট হয়ে যাওয়া একটা মেয়ে। তাদের সমাজও অন্য সমাজের তুলনায় অনেক নীচে। আরআলাপনবাবু কত বড়ো অফিসার। কোন দিকেই সে আলাপনবাবুর যোগ্য নয়।মনের অলীক কল্পনা পুষে কষ্ট পাওয়া ছাড়া তো কোন লাভ নেই। এমনই নানা সাত পাঁচ কথা ভাবতে ভাবতে উদাস হয়ে যায় অঞ্জলির মনটা। তারই মধ্যে মোটরবাইকটা কখন যে তিলপাড়া ব্যারেজ পৌঁচ্ছে গ্যাছে তা টের পায় নি অঞ্জলি। টের পায় আলাপনবাবুর কথায়।
বাইক থামিয়ে তিনি বলেন -- চলো জলের ধারে গিয়ে একটুক্ষণ বসবে ? তিলপাড়া ব্যারেজের জলে তখন পড়েছে গোধুলির আলো। কিচির মিচির করছে চরে বাসা বেঁধে থাকা পরিযায়ী পাখির দল। আলাপনবাবুর চোখে কেমন যেন ঘোর লাগা আবেশ। যেন বা অতল জলের আহ্বান, ভরাডুবির ভয়। সেই জলে ডুবে যেতে খুব ইচ্ছে হয় অঞ্জলির। ওই জলে ডুবেও যে খুব সুখ। আবেশে তারও গলা বুজে আসে। কোন কথা বলতে পারে না , শুধু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তার ভালোলাগা মানুষটির দিকে। শুধুই কি ভালো লাগা ? ভালোলাগা যে কবে ভালোবাসা হয়ে গিয়েছে তা টের পায় নি অঞ্জলি। আজ আলাপনবাবুর আবেশ ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে অনুভব করে নিজের অজান্তেই মানুষটাকে কবেই সে ভালোবেসে ফেলেছে। তাকে ওই ভাবে চেয়ে থাকতে দেখে আলাপনবাবু বলেন -- চলোই না, বেশ কিছুদিন ধরে তোমাকে একটা কথা বলব ভাবছিলাম। সেই সুযোগ হয়ে ওঠে নি। এসো আজ সেটা বলি।
তারপর সান বাঁধানো সিড়ির শেষ প্রান্তে গিয়ে দুজনে মুখোমুখি বসে। নদীর জলে পা ডুবিয়ে দেয় অঞ্জলি। দুজনের মুখে দিনের শেষ বেলাকার আলো পড়ে অদ্ভুত এক মায়ালোকের সৃষ্টি করে। কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে থেকে আলাপনবাবু বলেন , তোমার হাতটা একটু আমার হাতে রাখবে ?
কথাটা শুনে ভিতরে ভিতরে কেপে ওঠে অঞ্জলি। তাকে যেন স্থবির করে দেয় ভালো লাগার আবেশ। কিছুই বলতে পারে না সে। লজ্জায় আর আলাপনবাবুর দিকে চেয়ে থাকতেও পারে না। মুখ নামিয়ে নেয়। আলাপনবাবু নিজের হাতে তুলে নেন তার হাত। অঞ্জলির শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। সুখানুভূতিতে ভরে যায় তার মন প্রান। মনে হয় এই মুহূর্ত
যেন আর না ফুরোয়।বেশ কিছুক্ষণ পর আলাপনবাবু তার মুখটি তুলে ধরে বলেন, চাও আমার দিকে। আমার চোখের দৃষ্টিতে তুমি কি এতদিন কিছুই খুঁজে পাও নি।
লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে অঞ্জলি। মনে মনে বলে , পেয়েছিলাম তো, মরণের ইশারা। কিন্তু দুষ্টুমি করে বলে --- উহু, কই না তো ?
--- আমি তোমায় ভালোবাসি অঞ্জলি। তোমায় নিজের করে পেতে চায়।
কথাটা শুনেই শিহরণ খেলে যায় অঞ্জলির সারা শরীরে।মনে হয় পৃথিবীর সব সুখ যেন ধরা দিয়েছে তার কাছে পরক্ষণে তাকে মৃয়মান করে তোলে তার অতীত আর সামাজিক অবস্থান। তাই নিজেকে সংযত করে সে বলে -- কিন্তু আমি যে ভালাবাসায় খুব ভয় পায়। আপনার ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার মতো আমার তো আর কিছু নেই।
---- ভালোবাসা তো কোন প্রতিদান চায় না। সবকিছু জেনেই তোমাকে ভালোবেসেছি। তাছাড়া তোমার অতীত নিয়ে আমার কোন মাথাব্যাথা নেই। আমি শুধু তোমার মানুষের দুঃখে কেঁদে ওঠা সমব্যথী মনটাকে চাই।
--- আপনি তো সব জানেন না। আমি শুধু লুণ্ঠিতই হই নি , প্রতারিতও হয়েছি।
তারপর নিজের জীবনের ইতিহাস খুলে বলে অঞ্জলি। সবকিছু শোনার পর আলাপনবাবু বলেন , দুটি ক্ষেত্রেই তো তোমার কোন ভূমিকা নেই। আর সামাজিক অবস্থানের কথা বলছ, তোমার তো তবু একটা সমাজ আছে। আমার সেটাও নেই। আমি আজও জানি না কোনটা আমার সমাজ।
---- মানে , কি বলছেন আপনি ?
---- হ্যা , আমি জানি না কে আমার মা , কে আমার বাবা। ডাষ্টবিন পরিস্কার করতে গিয়ে মেথররা সদ্যজাত একটি শিশুকে পড়ে থাকতে দেখে অনাথ আশ্রমে জমা দেন। সেই শিশুটিই আমি। ওই আশ্রমের ফাদারের প্রেরণায় লেখাপড়া করে আজ এই জায়গায় পৌঁচেছি। এখন তুমি ভেবে দেখ, বাবা--মায়ের পরিচয়হীন এইরকম একটা ছেলেকে ভালোবাসতে পারবে কিনা ?
এবারে অঞ্জলিই আলাপনবাবুর হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে কিছুটা ঘন হয়ে বসে। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কেটে যায়। তারপর অঞ্জলি আবেগ আপ্লুত গলায় বলে, অতীত নিয়ে আমারও কোন মাথা ব্যাথা নেই। আমি এই রকম একটা মানুষকে পাশে নিয়ে সারাজীবন আমারই মতো ভাগ্য বিড়ম্বিতদের নিয়ে কাজ করে যেতে চাই। কি থাকবেন তো আমার পাশে ?
সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিতে পারেন না আলাপনবাবু। অঞ্জলি বুঝতে আলাপনবাবুও তারই মতো অতীতে ডুবে দিয়েছেন।
তাই কিছুক্ষণ সময় তাকে দেয়। তারপর বলে , প্লিজ আজ আর পুরনো কথা ভেবে মন খারাপ করবেন না।
--- না, আজ আর মন খারাপ হয়। কিন্তু জানো , ছোটবেলায় শুধু আমার কেন আশ্রমের সব ছেলেমেয়েরই খুব কষ্ট হত। গেটের ফাঁক দিয়ে যখন আমাদেরই বয়সী কোন ছেলেমেয়েকে বাবা-মায়ের হাত ধরে হেঁটে যেতে দেখতাম তখন আমাদের খুব কষ্ট হতো। চোখ জলে ভরে যেত। ফাদার সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, মাই সান , প্রার্থনা হবে ঘরে যাও। দেখ মন প্রশান্তিতে ভরে যাবে। প্রার্থনার মাধ্যমে আমরা মনকে ভুলিয়ে রাখতাম।
অঞ্জলি দেখে কথা বলতে বলতেই চিকচিক করে উঠেছে অলাপনবাবুর দুই চোখ। পরম মমতায় সেই জল মুছিয়ে দিয়ে সে বলে আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি এখনও?
--- কোন প্রশ্ন ?
--- বারে , এরই মধ্যে ভুলে গেলেন ? ওই যে বললাম না , সব কাজে আমার পাশে থাকবেন তো ?
কোন উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে আলাপনবাবু দুহাতের তালুতে তার মুখটা তুলে ধরে উদাত্ত গলায় আবৃত্তি করে উঠেন --
"আমার দুজনা স্বর্গ খেলনা, গড়িব না ধরনীতে
মুগ্ধ ললিত অশ্রু গলিত গীতে ,
পঞ্চসরের বেদনা মাধুরী দিয়ে ,
বাসর রাত্রি রচিব না মোরা প্রিয়ে ।
ভাগ্যের পায়ে দুর্বল প্রানে ভিক্ষা না যেন যাচি ,
কিছু নাই ভয় , জানি নিশ্চয় --তুমি আছো, আমি আছি "।।
মুগ্ধ হয়ে আলাপনবাবুর মুখের দিকে চেয়ে থাকে অঞ্জলি। কথা হারিয়ে যায়। তার পায়ে নেচে ওঠে নদীর জল।ব্যারেজের মাথায় জ্বলে ওঠে চড়া আলো। সেই আলো কে ম্লান করে দেয় আকাশ ভরা তারা। জ্যোৎস্না মেখে হোমে ফেরে দুজনে।



No comments:
Post a Comment