Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

সালিশির রায় -- ৭১




              সালিশির রায়


                          

        

                                    অর্ঘ্য ঘোষ

         (  কিস্তি --- ৭১)




বাড়ির লোকের কথা ভাবতেই অঞ্জলির মনটা আবার খারাপ হয়ে যায়। বাড়ির লোক বলতে আছেই বা কে ?  দাদা -- বৌদি থেকেও তো না থাকা। বাবার যে কি হলো কে জানে। এবার সে বাবার খোঁজ করবে। এই সময় দাদু -- ঠাকুমা বেঁচে থাকলে খুব আনন্দ পেতেন। দাদু--ঠাকুমা আর এই জগতে নেই ঠিকই কিন্তু তারা নামে আজও বেঁচে রয়েছেন। দাদুর নামেই দাদার নাম। আর ঠাকুরমায়ের নামেই নাম দিদির। ভাই আর তার নাম মায়ের বাবা -- মায়ের নামে।  আদিবাসী সমাজের রীতিই হলো পিতামহের নামে নাম রাখতে হয় তার বড়ো নাতির। বড়ো নাতনির নাম রাখতে হয় পিতামহীর নামে। একই ভাবে পরের ভাই বোনের নামকরণ হয় মাতামহ আর মাতামহীর নামে। আদিবাসী সমাজের এই রীতিটা খুব ভালো লাগে অঞ্জলির। কি রকম পূর্বপুরুষেরা বংশ পরম্পরায় বেঁচে থাকেন তাদের সন্তান সন্ততিদের মধ্যে। কিন্তু ওই রীতিটা অবলুপ্ত হতে বসেছে। সরকারি দফতরে নানা বিপত্তির কারণে এখন আর অনেকেই দাদু-ঠাকুমা কিম্বা দিদিমায়ের নাম মিলিয়ে ছেলে মেয়েদের নাম রাখেন না। তাদের ছাড়া গাঁয়ে মাত্র আর দু-চারটি পরিবারে ওই ধারা প্রচলিত রয়েছে। গাঁয়ের কথা মনে পড়তেই কত কথা ভীড় করে আসে তার মনে। আজ কতদিন সে হোমে রয়েছে। কিন্তু গায়ের কথা আজও ভুলতে পারে নি সে। গাঁয়ে আর মায়ে সমান কথাটা যে কতখানি সত্যি তা মর্মে মর্মে অনুভব করে অঞ্জলি। হোক না যতই হতশ্রী, ওই গ্রামেই একদিন তারা প্রথম আলো দেখেছে, ওই গ্রামেই মাটিতে যেন স্পর্শ লেগে রয়েছে তার দাদু-ঠাকুমার মতো প্রিয়জনদের। ওই গ্রামের সঙ্গে শুধু দুঃখেরই নয়, কিছু তো সুখের স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে। সে-সব কি ভোলা যায় ? 


                                        \এবার সে মাথা উঁচু করে গ্রামে ফিরবে। শুরু করবে নতুন করে গ্রাম গড়ার কাজ। শুধুই কি গ্রাম ?  আজ কতদিন নিজের পরিবারের লোকেদেরও কাছ ছাড়া হয়ে রয়েছে। কালই সে পরিবারের লোকের সঙ্গে মিলিত হতে চলেছে। বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে সে আর আলাপনবাবু কালকে দিদির বাড়ি যাবে। সেখানেই দিনক্ষণ সব ঠিক করে একবার থানার পাশে চায়ের দোকানের সেই জ্যেঠুর সঙ্গে দেখা করে আসবে। বিয়েতে আসতে বলবে তাকে। সেদিন যদি উনি পাশে না দাঁড়াতেন তা হলে আজ তার কি যে হতো কে জানে ?   একবার শ্রাবণী আর সাবিত্রীদির বাড়িও যেতে হবে। ইচ্ছে ছিল একবার ভাইয়ের কাছেও যাবে। কিন্তু তা বোধ হয় সম্ভব হবে না। কারণ ভাইতো এখন আর সেই হোস্টেলে থাকে না। এখন তো সে বর্ধমানের একটি হোস্টেলে থাকে। সে তো আর ছোট্টটি নেই। সেও এখন তারই মতো পাশ করতে করতে বি,এ পড়ছে। দেখতে দেখতে  ভাইটাও কেমন বড়ো হয়ে গেল। এই তো সেদিন তাকে সে আর হৃদ----।নিজেকে সামলে নেয় অঞ্জলি। স্বতফুর্ত ভাবেই ওই নামটা মুখে চলে এসেছিল। সে আর ওই নামটা মনে করতে চায় না। তার চিন্তা শুধু ভাইকে নিয়ে। আলাপনবাবুকে সে কেমনভাবে নেবে কে জানে ? তবে অঞ্জলির বিশ্বাস আলাপনবাবুকে ভাইয়ের ভালোই লাগবে। কারণ আলাপনবাবু এমন একজন মানুষ যাকে ভালো না লেগে পারা  যায় না। ওই চিন্তাতেই ডুবে গিয়েছিল অঞ্জলি। সঞ্চিতাদের নাড়া খেয়ে ছিঁড়ে যায় সেই চিন্তাজাল। এবার  তাকে নিয়ে পড়ে সঞ্চিতারা। সঞ্চিতা বলে , কি গো দিদি তুমিও শ্রাবণীদির মতো দিব্যি ডুবে ডুবে জল খেলে আমাদের টেরটি পেতে দাও নি।
অঞ্জলি লজ্জায় কোন কথা বলতে পারে না। তা দেখে মল্লিকা বলে ,  হবে না কেন -- কথায় আছে না ঘি আর আগুন একজায়গা থাকলে অগ্নিকাণ্ড অনিবার্য।
সঞ্চিতা বলে, সে যা বলেছো দিদি। সবার তো আর আমাদের মতো পোড়া কপাল নয়!



                এতক্ষণে মুখ খোলার সুযোগ পায় অঞ্জলি। তার মানে সুযোগ পেলে তোমাদেরও ডুবে ডুবে জল খেতে আপত্তি নেই তো। বেশ বেশ, এবার থেকে সেই চেষ্টায় করা হবে।
সঞ্চিতা বলে , কে না চাই বলো নিজের একটা মনের মানুষের ।
সবাই বলে , দিদি বলো না কি করে তোমাদের মন দেওয়া নেওয়া হল ।
অঞ্জলি বলে, সে কি আর আমি জানি। ওই হয়ে গেল আর কি ?
সঞ্চিতা অভিমান ভরা গলায় বলে, আমাদের বলবে না তাই বলো ?
--- না রে সত্যি বলছি, অত দিনক্ষণ মনে নেই।
মল্লিকা বলে , কে আগে প্রস্তাব দিয়েছিল গো ?
--- তোদের কি মনে হয় ?
সঞ্চিতা বলে, আমার মনে হয় আলাপনবাবুই প্রথম প্রস্তাবটা দিয়েছিলেন। মেয়েদের তো বুক ফাটলেও মুখ ফোটে না। অঞ্জলি বলে , ঠিক বলেছিস। 
সেদিনের আলোচনায় খুব দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে যায়।
সঞ্চিতারা হঠাৎ বলে বসে, আমরা সেদিন খুব সাজব কিন্তু। রজনী গন্ধার মালা দিয়ে খোঁপা বাঁধব।
--- বেশ তো যা মন  হয় তোদের তাই করিস।
---- কিন্তু দিদি , সাজার জিনিস  তোমাকেই কিনে দিতে হবে।
--- বেশ, বেশ সে হবে। বলে ওদের আশ্বস্ত করে অঞ্জলি। গল্প করতে করতে একসময় যে যার বিছানায় এলিয়ে পড়ে ওরা।


                         ঘুম আসে না অঞ্জলির। মাথার মধ্যে কত রকম চিন্তা যে ঘুরপাক খায় তার ঠিক নেই। শেষ পর্যন্ত সে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তার স্বপ্ন সফল করেছে। কিন্তু তার কাজ তো এখনও শেষ হয় নি। হোমের মেয়েগুলোকেও তাকে স্বপ্ন পূরণের রাস্তা দেখাতে হবে। ডি,এম সাহেব তাকে সেই দায়িত্বই দিয়েছেন। একই সঙ্গে আদিবাসী সমাজের কুসংস্কার দূর করারও দায়িত্ব দিয়ে তাকে গ্রামে পাঠাচ্ছেন ডি,এম সাহেব। সে পারবে তো সব ঠিক মতো পালন করতে ?
খুব সংশয় হয় তার। পরক্ষণে আলাপনবাবুর কথা ভেবে মন থেকে সব সংশয় ঝেড়ে ফেলে। এবার থেকে তো সবসময় সে আলাপনবাবুকে পাশে পাবে। কাল সকালেই তো আলাপনবাবুর সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে তার দিদির বাড়ি যাওয়ার কথা। অঞ্জলি মনে মনে ভাবে, আচ্ছা এখনও কি তাকে আলাপনবাবুই বলতে হবে ?  আপনি- আজ্ঞেও করতে হবে ? আর তো মাঝে মাত্র কয়েকটা দিন। তারপরেই তো তারা স্বামী-স্ত্রী হয়ে যাবে। তাদের মাঝে আর কোন বাঁধা--বন্ধন থাকবে না। তাই সে তো এখন থেকে অনায়াসেই আলাপনকে সরাসরি নাম ধরে ডাকতেই পারে , তুমি-তুমি করে কথাও বলতে পারে। কিন্তু তা সে পারবে না, লজ্জায় মরে যাবে তাহলে। সে যেদিন যা হওয়ার সেদিন হবে , সে আগে থেকে ওইসব কিছুই করতে পারবে না। আলাপনবাবুর কথা ভাবতেই ভাবতেই এক সময় ঘুম নেমে আসে অঞ্জলির চোখে। একটা মিষ্টি স্বপ্নের রাজ্যে হারিয়ে যায় সে। ঘুম যখন ভাঙে তখন হোমে হাজির হয়ে গিয়েছেন আলাপনবাবু। সেই রকমই কথা ছিল, সকাল সকাল বেড়িয়ে যাবে দিদির বাড়ির উদ্দেশ্যে। অগত্যা বিছানা ছেড়ে তাকে তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে আলাপনবাবুর মোটরবাইকে গিয়ে বসতে হয়। সঞ্চিতারা অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তাদের দিকে। লজ্জা এড়াতে সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। হোম এলাকা ছাড়াতে অবশ্য সে আলাপনবাবুর কোমর জড়িয়ে ঘন হয়ে বসে। আর আলাপনবাবুও যেন উৎসাহ পেয়ে পক্ষীরাজের মতো বাইক ছুটিয়ে দেন। সে শশব্যস্ত হয়ে বলে , আরে করো কি, এত জোরে চালাচ্ছ কেন ?
---- বারে , আমার বৌকে দেখাব না আমি কেমন বাইক চালাতে পারি।
--- এখনও বৌ হই নি কিন্তু।
--- তাই নাকি ? বলে নির্জন রাস্তা দেখে মুখ ঘুরিয়ে তাকে চুমু খেয়ে নেন আলাপনবাবু।
সে বলে , সাহস খুব বেড়ে গিয়েছে মনে হচ্ছে।
তার কথা শেষ হতেই আলাপনবাবু আবৃত্তির ঢঙ--এ বলে ওঠেন -- তুমিই মোরে সাহসী করেছো ,
করেছো প্রেমধনে ধনী ,
তুমিই মোরে চিনিয়েছো পথ , ওগো সাহসিনী ।।
অঞ্জলিও পিছিয়ে থাকে না। সেও আবৃতি করে -----
যদি কোনদিন আধার নেমে আসে  ,
জেনো আছি আমি তোমা পাশে ।।
যদি গো জীবন হারায় পথ , 
ঠিক খুঁজে নেব, রইল শপথ ।।
আবৃত্তি - গান ,গল্পে কখন যে পথটা ফুরিয়ে আসে তা টের পায় না তারা। দিদির বাড়ির চৌকাঠে পা রাখতেই  চমকে  যায়  অঞ্জলি।

          
         

       ( ক্রমশ )




        নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                   শীঘ্রই আসছে 

           ধারাবাহিক নাটক ----                                 

                                                               


                                    

                -----০----

   

No comments:

Post a Comment