( কিস্তি-- ৭২ )
দিদির বাড়ির চৌকাঠে পা রাখতেই চমকে যায় অঞ্জলি। সে দেখতে পায় দিদিদের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে দাদা। দেখেই ভ্রু কুঁচকে যায় তার। দাদা এখানে কেন ভেবে পায় না সে। প্রচন্ড রাগ হয়ে যায় তার। আলাপনবাবুর সঙ্গে দাদার পরিচয় করিয়ে দেওয়া দূরে থাক , একটা কথা পর্যন্ত বলে না অঞ্জলি। দিদি কেন দাদাকে বাড়িতে ঢুকতে দিল ?
যে তাদের বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো দুরের কথা, একবার খবর নেওয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করে নি সে জীবনে তার ছায়াও মাড়াতে চায় না। তার জন্য দিদির বাড়িতে জলস্পর্শ না করেই ফিরে যাবে তারা। দিদিকে সে ছেড়ে কথা কইবে না। তাকে দেখে কথা বলার জন্য কিছুটা এগিয়ে এসেও থমকে যায় দাদা। সম্ভবত তার মনের ভাব আন্দাজ করেই দাদা কেমন যেন অস্বস্তিতে পড়ে যায়। সে'ও প্রচণ্ড রাগে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। সেই সময় তাকে আর আলাপনবাবুকে বাড়ির ভিতরের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এগিয়ে এসে দিদি তার হাত ধরে বলে, আয় ভিতরে আয়।
অঞ্জলি তীব্র রাগে দিদির হাত ছাড়িয়ে দিয়ে বলে , না যে বাড়িতে ওই রকম একটা অমানুষ রয়েছে সেখানে আমি কিছুতেই যাব না। তোর কাছে একটু সুখ, দুঃখের কথা বলতে এসেছিলাম। খুব শিক্ষা হল। তুই যে ঘরে একটা অমানুষকে পুষে রেখেছিস জানলে কিছুতেই তোর বাড়িতে পা দিতাম না। সরাসরি কারও নামে কথাগুলো না বললেও সনমনির বুঝতে অসুবিধা হয় না কথাগুলো আসলে দাদাকে উদ্দেশ্য করেই বলা। দাদাও তখন সেখানে অপরাধীর মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তাই খুব অস্বস্তিতে পড়ে যায় সনমনি। একদিকে দাদার করুণ মুখ অন্যদিকে অঞ্জলির রাগ , তাকে দ্বিমুখী চাপে ফেলে দেয়।
পরিস্থিতির সামাল দিতে সে ফের অঞ্জলির হাত ধরে বলে , তোর রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। আমারও হয়েছিল। কিন্তু সব কথা শোনার পর আর রাগ করে থাকতে পারি না। আমার বিশ্বাস সবকথা শুনলে তুই আর রাগ পুষে রাখতে পারবি না। লক্ষ্মী বোন আমার, আগে সবটা শোন , তারপর যদি চলে যেতে চাস তাহলে যাবি। আমি আর আটকাব না।
আর আপত্তি করতে পারে না। দিদির হাত ধরেই সে বাড়ির ভিতরের দিকে যেতে শুরু করে। দিদি যেতে যেতেই বলে, ভিতরে আয় তোকে সব বলছি। যাওয়ার সময় অঞ্জলি লক্ষ্য করে দাদা যেন তার সামনে থেকে পালিয়ে বাঁচে।
অঞ্জলি ভাবে , দাদা যে নিজেই নিজের মুখটা পুড়িয়ে বসে আছে। নাহলে তাকে চোরের মতো মুখ লুকিয়ে পালাতে হত না। তারা বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই জামাইদা আলাপনবাবু বসার জন্য একটা খাটিয়া এগিয়ে দেয়। আলাপনবাবু সেটাতে বসেই সবার সঙ্গে গল্প জুড়ে দেন। আলাপনবাবুর এই অভ্যাসটা তার খুব ভালো লাগে। খুব সহজেই সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারেন।
তখন কেউ আন্দাজ করতে পারেন না উনি অতবড়ো একজন অফিসার। দিদি, মা, জামাইদাদের সঙ্গে না হয় আগেই পরিচয় হয়েছে কিন্তু জামাইদার বাবা - মা অন্যান্যদের সঙ্গে আলাপনবাবু যেভাবে গল্প-গুজবে মেতে উঠেছেন তা দেখে কারও বলার সাধ্য নেই একটু আগেই তাদের প্রথম দেখেছেন উনি। তাছাড়া তাদের সমাজের সঙ্গে সহজ ভাবে মেলামেশার জন্য আদিবাসী সমাজের বিভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে রীতিমতো পড়াশোনাও করেছেন। তার কাছে আদিবাসী ভাষা শুনে শুনে শেখার চেষ্টা করছেন। তাই এখন কথার মাঝে দু- একটা ব্যবহারও করছেন। তাই শুনে শ্রোতারা কিছুটা বিষ্মিত হলেও অঞ্জলি লক্ষ্য করে তাদের মুখে হাসি ফুটে উঠছে। কারণ তাদের উচ্চারণের ভিন্নতা স্পষ্ট কানে ঠেকে। আলাপনবাবুর ওই আলাপচারিতা শুনে তার মাথাটা অনেকটা ঠান্ডা হয়। রাগটাও কমে আসে। তাই কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে অঞ্জলি বলে, আপনি বরং উচ্চারণটা ঝালিয়ে নেন, আমি দিদির সঙ্গে একটু কথা বলি আসি।
বলেই সে রান্নাচালায় দিদির কাছে চলে যায়। দিদি তখন তাদের জন্য খাবার তৈরিতে ব্যস্ত। খাওয়া -- দাওয়া করেই বেরিয়ে যাবে তারা। তাই রান্নাশালে চরম ব্যস্ততা। জামাইদা একদিকে বাড়িতে পোষা মুরগি পরিষ্কার করছেন। মা তরকারি কাটছেন। অঞ্জলিও হাত লাগায়। শিল পেতে বাঁটার জন্য মশলা রাখাই ছিল। সে জল ছিটিয়ে বাঁটতে বসে যায়। মশলা বাঁটতে বাঁটতেই সে দিদিকে জিজ্ঞেস করে --- হ্যারে এবার বল তো দাদা তোর বাড়িতে কেন ?
দিদি বলে , তুই মাথা গরম করবি বলে তোকে ফোনে সেদিন বলি নি। দাদা কয়েকদিন ধরেই আমাদের এখানে আছে। বলতে পারিস শ্বশুরবাড়ি থেকে এক রকম গলা ধাক্কা খেয়েই আমার এখানে আশ্রয় নিয়েছে।
---- মানে ?
---- মানে বৌদি দাদাকে ল্যাঙ মেরে পাড়ারই একটি ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায়। তারপর ফিরে এসে দাদার সঙ্গে ছাড়পত্র করে নিয়ে সেই ছেলেটাকে নিয়ে বাপের বাড়িতেই থাকতে শুরু করে। তার ফলে শ্বশুরবাড়ি থেকে এক কাপড়ে বেড়িয়ে আসতে হয়েছে দাদা। এই কয়েক বছর শ্বশুর বাড়িতে গাধার মতো খাটার কোন মূল্য তো পায়ই নি, মুনিশ খেটে কিছু
টাকা জমিয়েছিল সেগুলোও ওর বৌ আর সেই ছেলেটা মেরে ধরে কেড়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।
---- ঠিক হয়েছে , যারা নিজের মা-বাবা, ভাই- বোনেদের কথা না ভেবে ঘরজামাই হতে যায় তাদের ওই রকম ঘাড় ধাক্কা খাওয়াই উচিত, নাহলে ওদের মতো ছেলেদের শিক্ষা হবে না।
--- ও রকমভাবে বলিস না। হাজার হোক নিজের মায়ের পেটের দাদা তো বটে। সেটা কি করে ভুলি বল?
---- কেন, সেই সম্পর্কটা আমাদের বিপদের দিনে কোথাই ছিল ? তুই বলে বাড়িতে জায়গা দিয়েছিস। আমি তাকিয়েও দেখতাম না।
--- কিন্তু আমি তোর ভরসাতেই এসেছি অঞ্জু। বিয়ে হয়ে যাওয়া বোনের বাড়িতে কতদিন লজ্জার মাথা খেয়ে পড়ে থাকি বল ? তুই ক্ষমাঘেন্না করে একটা ঠাঁয় না দিলে আমি কোথাই যাব বল ? আমার যে তাহলে গলায় দড়ি দিয়ে মরা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না।
--- আমি কি করে ঠাই দেব ? আমার নিজেরই তো ঠায় এখনও হোম।
--- কিন্তু আর তো তোমাকে হোমে থাকতে হবে না।
অঞ্জলি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে আলাপনবাবু পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। বাকিরাও আলাপনবাবুর দিকে চেয়ে থাকেন।
রান্নাচালার সামনে দাঁড়িয়ে আলাপনবাবু ফের বলতে শুরু করেন, তোমাদের গ্রামেই তো সমন্বয় মঞ্চ গড়ে উঠবে। তোমাকে তো সেখানে থেকেই কাজ করতে হবে। তাহলে সরকার তোমার জন্য টালিপাড়ায় যে বাড়িটা করেছেন সেটার কি হবে ?পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে উনি তো সেখানেই থাকতে পারেন। অঞ্জলি মনে মনে ভাবে সেটাও ঠিক। তাকে যে সব কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাতে টালিপাড়ার বাড়িতে তার আদৌ থাকা সম্ভব হবে কিনা কে জানে ?
সেক্ষেত্রে দাদা মা আর ভাইকে নিয়ে ওই বাড়িতে বাস করলে সে কিছুটা নিশ্চিন্ত হতে পারে। তাছাড়া দাদার বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানার পর তার মাথায় একটা পরিকল্পনা ঘুরপাক খেতে থাকে।সেটা এখনই সে কারও কাছে ভাঙতে চায় না। তাই সে আলাপনবাবুর দিকে চায়। আলাপনবাবুর পাশেই তার দিকে আকুতিভরা চোখে দাদাকে চেয়ে থাকতে দেখে সে। তখন দাদার মুখটা কেমন কাঁদো কাঁদো মনে হয় তার।তা দেখে আর রাগ করে থাকতে পারে না অঞ্জলি। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায় তার। সে আর ভাই দাদাকে কত মেরেছে, কিন্তু দাদা তার বদলা নেয় নি কখনো।এমন কি পাড়ার কেউ তাদের গায়ে হাত তুললে দাদা আর দিদি ছেড়ে কথা বলে নি। কি সুখেরই না ছিল সেইসব দিন। বড়ো হতেই সব কোথাই যেন হারিয়ে গেল। অঞ্জলি বুঝতে পারে তার অজান্তেই কখন জমাট বেঁধে থাকা রাগটা গলে জল হয়ে গিয়েছে।সে গিয়ে দাদার বুকে মাথা রাখে। দাদাও নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। সশব্দে কেঁদে উঠে। অঞ্জলিও কেঁদে ওঠে শব্দ করে। দুজনের কান্নার মাঝে কেউ কোন কথা বলতে পারে না। একসময় মা আর দিদি উঠে এসে দুজনের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে অঞ্জলি বলে , দাদা পুরনো কথা সব ভুলে যা। আবার আমরা সব নতুন করে শুরু করব। বাবাকে খুঁজে বের করব। আর আমাদের সেই দুঃখ ,কষ্টের দিন থাকবে না দেখিস।
অঞ্জলির কথা শেষ হতেই আলাপনবাবু বলেন, বাঃ এই তো চাই। এবার আমি একটা কথা বলতে চাই। আলাপনবাবুর কথা শুনে সবাই প্রথমে তার মুখের দিকে চায়। তারপর তাকিয়ে থাকে অঞ্জলির দিকে। অঞ্জলির বুঝতে অসুবিধা হয় না আলাপনবাবু কি বলতে চলেছেন।



No comments:
Post a Comment