Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

সালিশির রায় -- ৭৩


              সালিশির রায়


                          

        

                                    অর্ঘ্য ঘোষ

       ( কিস্তি -- ৭৩ )



অঞ্জলির বুঝতে অসুবিধা হয় না আলাপনবাবু কি বলতে চলেছেন। তাই সে লজ্জায় অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর তখন আলাপনবাবু বলতে শুরু করেন , আমি আর অঞ্জলি পরস্পরকে ভালোবাসি। আমরা বিয়ে করতে চাই। আপনাদের অনুমতি পেলে দিনটা আজই চূড়ান্ত করে ফেলতে পারি।
আলাপনবাবুর কথা শুনে প্রথমে কেউ কোন কথাই বলতে পারে না। অঞ্জলি দিদিদের মুখগুলো দেখে বুঝতে পারে তারা যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না।বিশ্বাস তো না হওয়ারই কথা। কিন্তু পরিস্থিতির সামাল দিতে দিদি বরাবরই পারদর্শিনী। তাই দিদির মুখেই প্রথম কথা ফোটে। দিদি বলে , কি বলছেন আপনি ?
আলাপনবাবু বলেন , কেন আমি কি খুব অন্যায্য প্রস্তাব করলাম ?
--- তা কিছুটা অন্যায্য বটে বই কি ?
দিদির কথা শুনে ভড়কে যায় অঞ্জলি। মনে মনে ভাবে , এই রে দিদি বোধহয় তাদের বিয়ের প্রস্তাবটাই নাকোচ করে দেবে নাকি। ভড়কে যান আলাপনবাবুও। তাই কিছুটা তোতলামিতে পেয়ে বসে তাকে। আমতা আমতা করে বলেন , আমি কি একে বারেই অযোগ্য ? অঞ্জলি অবশ্য এখন আর আগের অঞ্জলি নেই। তবু ভালোবাসার কি কিছুই মুল্য নেই ?
--- কি বলছেন আপনি ? আমি আপনার যোগ্যতার প্রশ্ন তুলি নি।ভাবছিলাম আমাদের বোনটার যোগ্যতার কথা। তার পোড়া কপালের কথা কে না জানে !  তারপরেও তার এত সৌভাগ্য হবে ?
  --- দেখুন, আমি মানুষের অতীত নিয়ে ভাবি না।  অতীতের কথা ভেবে বর্তমানের মাধুর্য্যকে নষ্ট করতেও চায় না। আমি নিজের চোখের সামনে যে মেয়েটাকে তিল তিল করে গড়ে উঠতে দেখেছি সেই মেয়েটাকে সুখী করতে চায়। এখন আপনারা অনুমতি দিলে সেটা সম্ভব হবে ।
  ---- কিন্তু তোমার বাবা -- মা, বাড়ির লোক তারা সবাই অঞ্জলির কথা জানে ?  তারা অনুমতি দিয়েছেন তো ?



                                  বাড়ির প্রসঙ্গ উঠতেই কেমন যেন বিষন্ন হয়ে পড়েন আলাপনবাবু। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বলেন , আমার নিজের বলতে তো কেউ নেই। মা-বাবা কে তাও জানি না। জ্ঞান হওয়ার আগে থেকেই হোমে মানুষ। অঞ্জলির কাছেও সে কথা লুকোয় নি।  এখন আপনারা ভেবে দেখুন আমার মতো এই রকম একটা বাবা-মায়ের পরিচয়হীন ছেলের সঙ্গে আপনাদের মেয়ের বিয়ে দেবেন কিনা। বলেই মুখ নামিয়ে নেন আলাপনবাবু। অঞ্জলি অনুভব করে কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে তার। খুব ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে আলাপনবাবুর মাথাটা বুকে চেপে ধরে আদরে সোহাগে কষ্টটা ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু সবার সামনে তা তো আর সম্ভব নয়। তাই নিজেও কষ্ট পায়। খুব কান্না পায় তার। এরকম একটা ভালো মানুষের কপালেও ভগবান কেন যে এত দুঃখ কষ্ট লেখেন ভেবে পায় না সে। এইসব লোকগুলো ভালো থাকলে যে আরও কিছু মানুষকে ভালো রাখতে পারে তা কি ভগবান বোঝেন না। ভগবানের তো কিছু না বোঝার কথা নয়। কিন্তু অঞ্জলি লক্ষ্য করে দেখেছে বেশিরভাগ ভালো-মানুষই ভালো থাকেন না। ওইসব কথা ভাবতে ভাবতেই অঞ্জলি দেখে দিদি আলাপনবাবুর কাছে এগিয়ে গিয়ে হাত দুটো ধরে তার কাছে টেনে নিয়ে আসে। তারপর আলাপনবাবুর হাতে তার হাত দুটো তুলে দিয়ে বলে, যেদিন বিয়ে হবে সেদিন হবে। আজই আমার এই বোনটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম ভাই। ও এতদিন শুধু কষ্টই পেয়েছে, তুমি ওকে সুখী কোর। এবার কিন্তু আর তুমি বলতে পারবে না তোমারনিজের বলতে আর কেউ নেই। আজ থেকে আমরা সবাই তোমার আপনার জন। কি তাই তো ? না , আমাদের বোনটাকে পেলেই হয়ে গেল , আমাদের আর চাই না ?
মুহুর্তেই পরিবেশটা পাল্টে যায়। লজ্জায় অঞ্জলি কোন কথা বলতে পারে না, সে দিদির পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। অমন সপ্রতিভ আলাপনবাবু কথা হারিয়ে ফেলেন। কোনরকমে বলতে পারেন -- কি যে বলেন দিদি। বলেই মাকে প্রনাম করে দিদি আর জামাইদাকে প্রনামকরতে যেতেই দিদি হাতদুটো ধরে বলে , থাক থাক ভাই আমাদের আর প্রনাম করতে হবে না। আজ যে কি ভালো লাগছে তা বলে বোঝাতে পারব না।



                                        তারপরই খাওয়া দাওয়ার তোড়জোড় শুরুহয়ে যায়। সে আর দিদি বাদে সবাই পাশাপাশি খেতে বসে। তারা দুজনে সবাইকে খেতে দেয়। খেতে খেতেই বিয়ের দিনক্ষণ নিয়ে কথা বার্তা হয়। সামনের মঙ্গলবারই নাকি ভালো দিন। ওইদিনটাই উপযুক্ত দিন হিসাবে বেছে নেওয়া হয়। ঠিক হয় বিয়ের দু-দিন আগে জামাইদা ভাইকে নিয়ে আসবে। তারপর বিয়ের আগের দিন সবাই শহরের একটা হোটেলে গিয়ে উঠবে। সেখান থেকেই হোমে গিয়ে বিয়ের কাজকর্ম করবে ।আলাপনবাবু সেইমতো হোমের কাছাকাছি একটা হোটেল বুক করে রাখবেন। আলাপনবাবুদের খাওয়া দাওয়া চুকতেই মা আর দিদির শাশুড়ি বাসনপত্র গুটিয়ে পুকুর ঘাটে চলে যান। আলাপনবাবুরা খাটিয়ায় বসে গল্পে মেতে ওঠেন। আর তারা দু'বোন খেতে বসে। খেতে খেতেই তাকে নিয়ে পড়ে দিদি।
  --- হ্যা রে , আলাপনকে সব কিছু খুলে বলেছিস তো ?
---- হ্যা, দিদি সব বলেছি। উনি খুব উদার মনের মানুষ।
--- না রে ছেলেটা সত্যিই তোকে খুব ভালোবাসে। তোরা সত্যিই খুব সুখী হবি দেখিস।ওর মতো সবাই যদি হতো তাহলে অনেক কপাল পোড়া মেয়ে সুখের মুখ দেখতে পারত।দিদির কথায় হোমের মেয়েদের কথা মনে পড়ে যায় অঞ্জলির। বিভিন্ন সময় সঞ্চিতা, মালতি, সুলতাদের চোখে সে ঘর সংসারের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা  ফুটে উঠতে দেখেছে। কারও সমাজের মুলস্রোতে ফেরার ঘটনায় দীর্ঘশ্বাস আর হতাশা চেপে রাখতে পারে না অনেকেই। অঞ্জলি ঠিক করে রেখেছে সমন্বয় মঞ্চের মাধ্যমে সে যতজনকে সম্ভব সমাজের মুলস্রোতে ফেরানোর চেষ্টা করবে। তার মধ্যে সঞ্চিতা আর মালতির একটা উপায় সে ভেবেই রেখেছে। তাদের খাওয়া শেষ হতেই বেরনোর তাড়া লাগান আলাপনবাবু। অঞ্জলিও তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে সবার কাছে বিদায় নিয়ে মোটরবাইকে আলাপনবাবুর পিছনে গিয়ে বসে। হাত নাড়তে নাড়তেই তারা ছাড়িয়ে আসে দিদিদের সারিপা গ্রাম।



                                     কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁচ্ছে যায় মোতিপুর থানার সামনে জ্যেঠুর দোকানে। তাকে দেখে প্রথমে অবাক চোখে চেয়ে থাকেন জ্যেঠু। সে গিয়ে প্রনাম করে। তার দেখাদেখি প্রনাম করেন আলাপনবাবুও। ততক্ষণে বিষয়ের ঘোর কাটে জ্যেঠুর।তার চিবুক ছুঁয়ে আর্শিবাদ করতে করতে বলেন , থাক থাক মা, চির সুখী হও। কি সুন্দর দেখতে লাগছে তোমাকে। প্রথমে তো আমি চিনতেই পারি নি। তারপর আলাপনবাবুর দিকে চেয়ে বলেন , এনাকে তো ঠিক  চিনতে পারলাম না।
এবারে খুব অস্বস্তিতে পড়ে যায় অঞ্জলি। কি পরিচয় দেবে সে ? লজ্জার মাথা খেয়ে কি করে বলবে উনি আমার হবু বর। তাই বার কতক -- উনি ,  উনি আসলে বলে হোঁচট খেতে থাকে সে। তার ওই পরিস্থিতি দেখে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন আলাপনবাবু। জ্যেঠুকে বলেন , অঞ্জলির মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি জ্যেঠু। আমি জেলা সমাজ কল্যাণ আধিকারিক।  ডি,এম সাহেব আমাকে ওই হোম দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সে সূত্রেই অঞ্জলির সঙ্গে আমার আলাপ পরিচয় হয়। আগামী মঙ্গলববার আমরা বিয়ে করতে চলেছি। আপনাকে কিন্তু ওইদিন আমাদের বিয়েতে যেতেই হবে।আলাপনবাবুর কথা শুনে অবাক হয়ে যায় অঞ্জলি। কি সুন্দর সাবলীল ভাবে বিয়ের কথাটা জ্যেঠুকে বলে দিলেন। কোন আড়ষ্টতা তাকে ছুঁতেও পারল না।  না সত্যি , আলাপনবাবু ইজ গ্রেট। আর তাকে জীবনসঙ্গী হিসাবে পেয়ে সে'ও গর্বিত।আলাপনবাবুর কথা শুনে জ্যেঠু আবেগ ধরে রাখতে পারেন না। আল্পুত গলায় বলেন , যাব না মানে? আমার অঞ্জলি মায়ের বিয়ে হচ্ছে তোমার মতো একজন অফিসারের সঙ্গে। এর চেয়ে বড়ো খুশীর খবর আর কি হতে পারে ?
  --- খুশির খবর কিন্তু আরও আছে জ্যেঠু।
--- ওরে বাবা, আরও খুশীর খবর? একদিনে এত খুশি আমি রাখব কোথাই ?  বলো বলো শুনি ---।
---- আপনার অঞ্জুমা এবারে ভালো ভাবে বি,এ পাশ করেছে। তারপরই ডি,এম সাহেব ওকে গ্রাম সেবিকার চাকরি দিয়ে রোলমডেল করে শ্রীপল্লীর শ্রী ফেরানোর দায়িত্ব দিয়ে পাঠাচ্ছে।



                  এবার আর আলাপনবাবুকে কথা শেষ করতে দেয় না জ্যেঠু। বলেন --- দাঁড়াও দাঁড়াও, এত বড়ো সুখবর শোনালে আর তোমাদের আমার বাঁধা গতের  চা খাইয়ে ছাড়ব না। মিষ্টিমুখ করতেই হবে। বলে কাউকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই পাশের দোকান থেকে মিষ্টি আনতে ছোটেন।আবার ছুটতে ছুটতেই এক বাক্স নলেন গুড়ের সন্দেশ নিয়ে ফেরেন। তারপর নিজের হাতে অঞ্জলির মুখের সামনে তুলে ধরেন।অঞ্জলি তাতে আধখানা কামড় বসাতেই বাকিটা তুলে ধরে আলাপনবাবুর মুখের সামনে। আবেগের আতিশয্যে ভুলেই যান তারই উচ্ছিষ্ট সন্দেশ তুলে ধরেছেন আলাপনবাবুর মুখের সামনে। আলাপনবাবুও তার দিকে চেয়ে মুচকি হেসে দিব্যি সন্দেশটা পুরে নেন মুখের ভিতরে।অঞ্জলির খুব লজ্জা করে। তার উচ্ছিষ্ট সন্দেশ খেয়ে  আলাপনবাবু কি ভাবলেন কে জানে!  তার উচ্ছিষ্ট সন্দেশ খেতে হলো বলে রাগ করবেন না তো ?  দোলাচল শুরু হয় অঞ্জলির মনে। আবার পরক্ষণেই ভাবে কিছুদিন পরেই তো তারা স্বামী-স্ত্রী হতে চলেছে। তাদের সমাজে বিয়ের পর বৌকে খাওয়ানো মিষ্টিই বরকে খাইয়ে মুখ দেখার রীতি প্রচলিত আছে। তখন তো আলাপনবাবুকে তার উচ্ছিষ্ট খেতেই হবে। সেই অভ্যাসটা না হয় কয়েকদিন আগে থেকেই হয়ে গেল। তা ছাড়া এর আগেও তো ----------। তিলপাড়া ব্যারেজের সেদিনের সেই সন্ধ্যার কথা মনে পড়তেই ফের লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে অঞ্জলির মুখ। আর সেটা লক্ষ্য করেই আলাপনবাবু দুষ্টুমি ভরা দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসতে থাকেন। সেও জ্যেঠুকে আড়াল করে জিভ বের করে ভেংচি কেটে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আরও কিছুক্ষণ গল্প করে তারা জ্যেঠুর কাছে বিদায় নেয়। মোটরবাইক স্টার্ট নিতেই থানার দিকে দৃষ্টি চলে যায় অঞ্জলির। আর এক লহমায় ফিরে আসে ১০ বছর আগের সেই দিনটির কথা। অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার। সেটা বুঝতে পেরেই আচমকা থানা চত্বরে মোটর বাইক ঢুকিয়ে দেন আলাপনবাবু। তারপর বলেন ,  কয়েকদিন পর থেকেই তো তোমাকে কাজ শুরু করতে হবে। সেক্ষেত্রে পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ থাকাটা জরুরী। এদিকে এলামই যখন , তখন চলো ওসির সঙ্গে আলাপটা সেরেই যায়। তারপর তারা দুজনে অনুমতি নিয়ে ওসির ঘর ঢোকে। ওসির ঘরে ঢুকেই চমকে যায় অঞ্জলি।

                

 ( ক্রমশ )




        নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                   শীঘ্রই আসছে 

           ধারাবাহিক নাটক ----                                 

                                                               


                                    

                -----০----

   
     

No comments:

Post a Comment