Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

সালিশির রায় -- ৭০







              সালিশির রায়


                          

        

                                    অর্ঘ্য ঘোষ

         (  কিস্তি --- ৭০ )




একটা সংবাদ চ্যানেলে গিয়ে তার চোখ আটকে যায়। সে দেখতে পায় নিচে লেখা রয়েছে  ,  আগামী কাল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালের অধীনস্থ কলেজগুলির তৃতীয় বর্ষের ফলাফল প্রকাশিত হতে চলেছে। সকাল ১০ টার পর থেকেই ইন্টারনেটে ফলাফল জানা যাবে। খবরটা জানার পর থেকেই মনটা খুব উতলা হয়ে পড়ে অঞ্জলির। সে তখনই ফোনে আলাপনবাবুকে ধরে। আলাপনবাবু জানান ,  হ্যা আমিও খবরটা দেখলাম। কাল রেজাল্ট বের হলেই  আমি সঙ্গে সঙ্গে হোমে যাব।
অঞ্জলি বলে, কিন্তু আমার যে খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে। কি যে হবে কে জানে ?
আলাপনবাবু বলেন , দুশ্চিন্তা কোর না।এর আগে তো আমাকে হোমে কোন খারাপ খবর নিয়ে যেতে হয় নি। আশাকরি কালও হবে না। দেখো ভালো খবরই নিয়েই যাব।
তবু দুশ্চিন্তা যায় না অঞ্জলির। দুশ্চিন্তায় রাতে দু'চোখের পাতা এক করতে পারে না পর্যন্ত। সকাল থেকেই ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। কিছুতেই আর ১০ টা বাজতে চায় না। ১ টা মিনিট যেন একটা যুগ মনে হয় তার। ৯ টার পর থেকেই কাউণ্টডাউন শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ১০ টার পরেও কোন খবর আসে না।এমন কি আলাপনবাবুকেও ফোনে পাওয়া যায় না। ফোন বেজেই যায় , তবু ফোন ধরেন না তিনি। তবে কি সে যা আশঙ্কা করেছিল তাই হয়েছে ? নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না অঞ্জলি। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।  একসময় গিয়ে বিছানা নেয়। এক গ্লাস জল পর্যন্ত মুখে দেয় না। সঞ্চিতারা সান্ত্বনা দেয় -- দিদি তোমাকে দেখেই আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছি। সেই তুমিই যদি ভেঙে পড়ো তাহলে আমাদের মনের অবস্থা কি হয় বলো তো। তাছাড়া তুমি খারাপটাই বা ধরে নিচ্ছ কেন ? কেউ তো তোমাকে নিশ্চিতভাবে কিছু বলে নি। আগে আলাপনবাবু এসে পৌঁছোতে দাও।


   
                অঞ্জলি মনে মনে ভাবে সঞ্চিতাদের কথাও ঠিক, কিন্তু তার মন মানতে চায় না। মনটা কেমন যেন কু গায়। সেই সময় হোমের বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা যায়। সঞ্চিতারা তাড়াতাড়ি গিয়ে গেট খুলে দেয়। অঞ্জলি ঘরের  দরজা থেকে দেখতে পায় গেট পেরিয়ে আলাপনবাবুর সঙ্গে এগিয়ে আসছেন ডি,এম সাহেব। তাদের দেখেই সবাই অফিস ঘরের দিকে ছুটে যায়। অঞ্জলিই কেবল ঘরের দরজা ধরে আলাপনবাবুর দিকে অভিমান ভরা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। চোখে চোখ পড়তেই চোখ ঘুরিয়ে নেন আলাপনবাবু। খুব রাগ হয় তার। ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে পিঠে গোটা কতক কিল বসিয়ে দেয়।কিন্তু সবার সামনে তো সেটা সম্ভব নয়। তাই মনের ইচ্ছা মনেই চেপে রেখে ডি,এম সাহেবরা কি বলছেন তা শোনার জন্য কান খাড়া করে থাকে সে।বেশিক্ষণ প্রতীক্ষা করতে হয় না। অঞ্জলি ঘর থেকেই দেখতে পায় ডি,এম সাহেব সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলেন, আরে যার জন্য আমি শত কাজ ফেলে ছুটে এলাম সে কই ?
ডি,এম সাহেবের ইঙ্গিতটা বুঝতে কারও কষ্ট হয় না। তাই সঞ্চিতারা ছুটে এসে তাকে ধরে নিয়ে যায় অফিস ঘরে। কেঁদে কেঁদে ততক্ষণে অঞ্জলির চোখ ফুলে গিয়েছে। তা দেখে ডি ,এম সাহেব বলেন -- কি ব্যাপার তুমি ঘুমোচ্ছিলে নাকি ?
তাকে জবাব দিতে হয় না। তার আগেই সঞ্চিতারা বলে ওঠে , ঘুমোবে তাহলেই হয়েছে। রেজাল্টের দুশ্চিন্তায় কাল রাত থেকে দু'চোখের পাতা এক করে নি। তারপর ১০ টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও আলাপন স্যার যখন কোন খবর নিয়ে পৌঁছোলেন না তখন থেকেই কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়েছে।
সঞ্চিতাদের কথা শুনেই ডি,এন সাহেব বলেন -- স্যরি,  আই অ্যাম ভেরি স্যরি।দোষটা আসলে আমার। আলাপন ফোনে খবরটা দিতেই চেয়েছিল , আমিই বলেছিলাম থাক একেবারে গিয়ে সারপ্রাইজ দেব। তারপর হায়ার অথারিটির কাছে খবরটা পাঠিয়ে একই সঙ্গে আরও কিছু ভালো খবর নিয়ে এলাম। সেই জন্যই দেরি হয়ে গেল। আজ অনেকগুলো ভালো খবর দেওয়ার আছে।ডি,এম সাহেবের কথা শুনে আলাপনবাবুর দিকে তাকায় অঞ্জলি। আলাপনবাবু তখন মিটিমিটি হাসছেন।


                                              ততক্ষণে অঞ্জলি বুঝে গিয়েছে তার পরীক্ষার ফল ভালোই হয়েছে। তাই সবার অলক্ষ্যে আলাপনবাবুকে একটা ভেংচি কেটে দিয়ে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেয় অঞ্জলি। তারপরই ডি,এম সাহেব বলতে শুরু করেন , সামান্য কিছু নম্বরের জন্য ফাষ্ট ক্লাস না পেলেও অঞ্জলি আজ বি,এ পাশ করে আমাদের জেলার মুখ উজ্বল করেছে। এই প্রথম রাজ্যের হোমে থেকে বি,এ পাশের নজির গড়ল অঞ্জলি। আমরা তার জন্য গর্বিত। ডি,এম সাহেবের কথা শেষ হতে না হতেই সঞ্চিতারা তাকে জড়িয়ে ধরে হই হই করে ওঠে।ওদের মুখ দেখেই বোঝা যায় আনন্দে আটখানা হয়ে উঠেছে সবাই। ডি,এম সাহেব না থাকলে হয়তো তাকে কাঁধে তুলে সব নাচতেই শুরু করে দিত। হাত তুলে তাদের থামিয়ে ডি,এম সাহেব ফের বলতে শুরু করেন , যে জন্য আমাদের আসতে দেরি হলো এবার সেটা বলি। আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না,  আমি একদিন এসে আপনাদের বলেছিলাম হোম থেকে যারা বি,এ পাশ করবে তাদের চাকরি দেবে সরকার। সেইজন্য অঞ্জলির পাশের খবর পাওয়ারই পর আমরা এখানে আসার আগে রাজ্য সরকারের কাছে রিপোর্ট পাঠিয়ে ছিলাম। সরকার আজই ওকে গ্রামসেবিকা হিসাবে নিয়োগপত্র দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে ওকে রোল মডেল করে ওদের গ্রাম থেকেই আদিবাসীদের কুসংস্কার দূর করার কাজ করার দায়িত্ব দিয়ে পাঠাচ্ছে। সেখানেই গড়ে উঠবে সংস্কার মঞ্চ। একে একে এই হোমের মেয়েদেরও সেই মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত করে সমাজের মূলস্রোতে ফেরানোর দায়িত্বও  দেওয়া হয়েছে তাকে।
আবার হই হই করে ওঠে সঞ্চিতারা। ডি,এম সাহেব তাদের থামিয়ে দিয়ে বলেন , আরও একটা সুখবর আছে। সেটা কি আজ কি বলব ?
তারপর কৌতুক ভরা দৃষ্টিতে ডি,এম সাহেব একবার আলাপনবাবু আর একবার অঞ্জলির দিকে তাকান। আলাপনবাবু অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেন। আর অঞ্জলি অবাক চোখে ডি,এম সাহেবের মুখের দিকে চেয়ে থাকেন। ডি,এম সাহেব বলতে বলতে থেমে যাওয়ায় ধৈর্যহারা হয়ে সবাই সমস্বরে বলে ওঠে -- না -  না স্যর , আজই বলুন।
  তখন ডি, এম সাহেব বলেন , আর এই কর্মকাণ্ডে অঞ্জলির পাশে পাশে থাকবেন আপনাদের আলাপনবাবু।
সঞ্চিতারা বলে, সে তো স্যর উনি প্রথম থেকেই আছেন। এটা আর নতুন খবর কি ?
--- এ থাকাটা সে থাকা নয় , আলাপনবাবু আমাকে বলেছেন উনি অঞ্জলিকে বিয়ে করতে চান , এখন অঞ্জলির বাড়ির লোকেরা মত দিলে এই হোমেই আবার সানাই বেজে উঠবে।



               এবারও ডি, এম সাহেবের কথা শেষ হয় না, সবাই হাততালি দিয়ে বলে ওঠে -- এটা স্যর সত্যিই ভালো খবর। তারপর ডি,এম সাহেবের মতোই সবাই একবার অঞ্জলি আর একবার আলাপনবাবুর দিকে ফিরে তাকায়। অঞ্জলি দেখে, আলাপনবাবু এবারেও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন। সেও লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেয়। ডি,এম সাহেব তার দিকে দুটো কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বলেন , একটা তোমার মার্কশিট, অন্যটা নিয়োগপত্র। আলাপন সব রেডি করেই রেখেছিল বলেই নিয়োগপত্র আজকে করে দেওয়া হল। আজ থেকেই তুমি কাজে বহাল হলে। এখন তোমার বাড়ির সম্মতি পেলেই চার হাত এক করে দিতে পারলেই আমার ছুটি।
খবর পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সাংবাদিকরাও  হই হই করে পৌঁচ্ছে যায়। তাকে কখনও হোমের মেয়েদের মাঝে আবার কখনও ডি,এম সাহেব আর আলাপনবাবুর মাঝে রেখে একের পর এক ছবি তুলে যায় তারা। ডি,এম সাহেবের বাইটও নেয়। ডি,এম সাহেব বলেন , আজকের এই সুখবরের পিছনে সব থেকে বড়ো ভূমিকা সংবাদ মাধ্যমের। তারা লেগে না থাকলে অঞ্জলি হয়তো কোথাই হারিয়ে যেত তার ঠিক নেই।
সংবাদ সংগ্রহের কাজ শেষ হলে সাংবাদিকরা ডি,এম সাহেবের উদ্দেশ্যে বলেন, স্যার এতগুলো সুখবরের পর কি মিষ্টি মুখ হবে না ?
তাদের কথা শুনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ডি,এম সাহেব -- নিশ্চয়  নিশ্চয়। আলাপন দেখ তো কাউকে পাঠাও দেখি।
ওই কথা শুনে সঞ্চিতারা বলে , স্যার আজ মিষ্টিটা কিন্তু আমরাই খাওয়াব। বড় বাগানের মেলায় আমাদের হাতে তৈরি জিনিসের স্টল দিয়ে আমরা তিন হাজার টাকা লাভ করেছি। সবই তো স্যার অঞ্জলির জন্যই হয়েছে। তাই তার এত বড়ো সুখবরে আমরাই মিষ্টি মুখ করাতে চাই।
ডি, এম সাহেব বলেন, বাহ্  এটাও তো ভালো খবর।
মিষ্টি আসতে আসতেই টিভিতে অঞ্জলির খবরটা সম্প্রচার হতে শুরু করে। সেখানে নিজেদের দেখে সঞ্চিতারা তো মহা খুশী। মিষ্টি খেয়ে একে একে সাংবাদিকেরা বিদায় নেন। যাওয়ার আগে সবাই অঞ্জলিকে উদ্দেশ্য করে বলে যায় , বিয়ের নেমন্তন্ন পায় যেন। অঞ্জলি হাসি মুখে ঘাড় নাড়ে। লজ্জায় মুখে কিছু বলতে পারে না। সাংবাদিকেরা চলে যেতেই ডি, এম সাহেবও ঊঠে দাঁড়ান। বলেন, তাহলে ওই কথাই রইল। অঞ্জলি তুমি এর মধ্যে তোমার বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলে আমায় জানাও। তারপরই বিয়ের দিনটা ফাইন্যাল করা হবে। প্রয়োজনে তুমি আলাপনের সঙ্গে বাড়ি গিয়েও কথা বলে আসতে পারো।
ঠিক হয় পরদিন সকালেই তারা বাড়ির লোকের সংগে কথা বলতে যাবে। তারপর ডি, এম সাহেবের সঙ্গে চলে যান আলাপনবাবুও। তার সঙ্গে কোন কথাই হয় না। তাই খুব অভিমান হয় অঞ্জলির। পরক্ষণেই বুঝতে পারে বিয়ের কথাটা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর সবার সামনে সরাসরি কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছেন আলাপনবাবু। তবে কাল তো বাড়ির লোকেদের সঙ্গে কথা বলতে যাওয়ার সময় তারা তো একান্তে কথা বলার সুযোগ পাবে। তাই মনটা ভালো হয়ে যায় তার। কিন্তু বাড়ির লোকের কথা ভাবতেই অঞ্জলি মনটা আবার খারাপ হয়ে যায়।

         

       ( ক্রমশ )




        নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                   শীঘ্রই আসছে 

           ধারাবাহিক নাটক ----                                 

                                                               


                                    

                -----০----

   

No comments:

Post a Comment