সালিশির রায়
সালিশির রায়
অর্ঘ্য ঘোষ
( কিস্তি ---- ৬৯ )
আর অঞ্জলির বুকের ধুকপুকুনি বাড়তে থাকে। এমনিতে তার পরীক্ষা ভালোই হয়েছে।কিন্তু রেজাল্ট আউট না হওয়া পর্যন্ত মনের কোন স্থিরতা পাচ্ছে না সে। চারদিকে যা সব শুনছে , তারপর পরীক্ষা ব্যবস্থাটার উপরেই আর আস্থা রাখতে পারছে না। আজ এখানে খাতা হারাচ্ছে , তো কাল খাতায় নম্বর দিতেই ভুলে যাচ্ছেন পরীক্ষকেরা। শেষে নিজেদের গাফিলতি ঢাকতে গড়পড়তা একটা নম্বর দিয়ে দিচ্ছে। তারপর আদালতে গিয়ে প্রাপ্ত নম্বর পুরোপুরি বদলে যাচ্ছে। আর এসবের মাঝে কত কিছু যে ঘটে যায় তার ঠিক নেই। এই তো গত বছর মেধা তালিকায় ঠাঁয় পায় নি বলে গলায় আত্মহত্যা করেছিল এক ছাত্রী। পরে আদালতের নির্দেশে তার চ্যালেঞ্জ করে দেখা যায় শুধু মেধা তালিকায় ঠাঁই করে নেওয়াই নয়, তালিকার অনেককেই পিছনে ফেলে দিয়েছে সে। কিন্তু তাতে আর কি লাভ হল ? যে যাওয়ার সে তো ততদিনে পৃথিবী ছেড়ে চলেই গিয়েছে। সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে দিন কতক খুব হই চই হয়। পরীক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবিও ওঠে।
কিন্তু শাস্তি হয়েছে কিনা জানা যায় নি। তারপর সব ধামাচাপা পড়ে যায়। তার ক্ষেত্রেও যদি তেমন কিছু ঘটে যায় ? সে নিজে হয় তো সহ্য করে নিতে পারবে, কিন্তু আলাপনবাবু ? তিনি যে তার রেজাল্ট নিয়ে খুব আশাবাদী। তার আশা পূরণ করতে না পারলে খুব খারাপ লাগবে অঞ্জলির। তাছাড়া তার রেজাল্টের উপরেই তাদের বিয়েটাও নির্ভর করছে। রেজাল্ট আউটের পরই বিষয়টা সবাইকে জানানো হবে। জানাতে হবে মা দিদিদেরও।
আলাপনবাবুর সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে তাদের অমত হবে বলে মনে হয় না অঞ্জলির। কিন্তু তাদের না জানিয়ে সে বিয়ে করতে পারবে না। সেই দিনটার প্রতীক্ষাতেই রয়েছে সে। কিন্তু কিছুতেই সময় আর কাটতে চায় না তার। এতদিন পড়াশোনায় ডুবেছিল। কোন চিন্তা মাথার মধ্যে বেশিক্ষণ ঘুরপাক খাওয়ার অবকাশ পেত না। এখন তার অখন্ড অবসর। আলাপনবাবু কতগুলো বই এনে দিয়েছেন। সেগুলো পড়েই বা কতক্ষণ কাটানো যায় ? ভাগ্যিস সাবিত্রীদি মোবাইলটা দিয়েছিলেন তাই। ওই মোবাইলেই এখন মাঝে মধ্যে দিদি - শ্রাবণীর সঙ্গে কথা হয়। শ্রাবণী জানিয়েছে , শীঘ্রিই সে একদিন হোমে আসবে। সে এলে তাও কিছুটা সময় কাটবে। একান্তে আলাপনবাবুকে নিয়ে আলোচনা করতে পারবে। ভালোবাসার এই আর এক রোগ। মনের মানুষটিকে নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করতে না পারলে যেন পেট ফুলে যায়।
আজ একবার সুযোগ পেলে ফোন করবে তার মনের মানুষটিকে। কয়েকদিন সময় সুযোগ করে ফোন করেছে। কিন্তু মন খুলে কথা বলতে পারে না। কথার মাঝে কেউ না কেউ ঠিক জুটে যায়। তখন গ্রুপ, রেজাল্টের মতো নানা কথা আর হু ,হা বলেই সারতে হয়। তবু তার মন ভরে যায়। গলাটা শুনেই মনে হয় মনের মানুষটি যেন তার কাছেই রয়েছে। পরদিন সকালেই হাজির হয় শ্রাবণী। তাকে মোটর বাইকে পৌঁছে দিয়ে বাজারে কাজে যায় সন্দীপ। ফোনেই শ্রাবণী তাকে সন্দীপের মোটরবাইক কেনার কথা বলেছিল। এখন তারা মোটর বাইকে দুজনে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যায়। তারা এখন খুব সুখী। শ্রাবণীর সুখের কথা শুনে তার খুব ভালো লাগে। নিজের যা হবে হোক, সে অন্তত একটি মেয়েকে সুখী করতে পেরেছে ভেবেই তার ভালো লাগে। এগিয়ে গিয়ে শ্রাবণীকে হাত ধরে নিয়ে আসে অঞ্জলি।
শ্রাবণীর শাশুড়ি তাদের জন্য খেজুরের গুড়ের পাটালি করে পাঠিয়েছে। শ্রাবণী তা সবার হাতে হাতে তুলে দেয়। খেতে খেতে সবাই বলে , শ্রাবণী এত সুখে থেকেও তুমি যে আমাদের টানে হোমে ছুটে আসো তাই আমাদের খুব ভালো লাগে। শ্রাবণী বলে , বারে তোমাদের জন্যই তো আমি আজ সুখের মুখ দেখতে পেয়েছি। সেটা আমি জীবনেও ভুলব না। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সবাই অফিস ঘরে টিভি'তে সিরিয়াল দেখতে চলে যায়। ঘরে তখন শ্রাবণীর আর সে একা। একা পেয়ে তাকে নিয়ে পড়ে শ্রাবণী। ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট থেকে বেশ কিছু ছবি বের করে তার সামনে মেলে ধরে শ্রাবণী।
অঞ্জলি দেখে সেদিন হাজারদুয়ারীতে তোলা সেই ছবিগুলো। দেখতে দেখতে একটা ছবি দেখে অবাক হয়ে যায় সে। দেখে সে আর আলাপনবাবু একেবারে পাশাপাশি রয়েছে। কিন্তু এমন ভাবে তো তারা কখনও কাছাকাছি হয় নি। তাহলে ? অঞ্জলির মনের ভাব বুঝতে পেরে তার নাকটা মুচড়ে দিয়ে শ্রাবণী বলে , কম্পিউটারের যুগে এখন সব সম্ভব। ছবিটা কেমন লাগছে বলো ?
ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ লজ্জা লজ্জা মুখ করে চেয়ে থেকে অঞ্জলি বলে , ধ্যাত, জানি না যা। বলে দ্রুত ছবিটা নিয়ে বাক্সে ঢুকিয়ে রাখে।তারপর অবধারিত ভাবে ওঠে আলাপনবাবুর প্রসঙ্গ। অঞ্জলি সাবিত্রীদির কথাও বলে। শুনে শ্রাবণী বলে, ইঃ-মা, ছিঃ ছিঃ। লজ্জায় আর সাবিত্রী মুখ দেখাতে পারব না।
--- তুই তো বিবাহিতা। বরের সঙ্গে বেরিয়েছিলি। তোরই যদি এত লজ্জা করে তাহলে আমার অবস্থাটা একবার ভাব।
প্রথম যখন শুনলাম তখন লজ্জায় অনেকক্ষণ মুখই তুলতে পারি নি।
--- তবে একপক্ষে ভালোই হয়েছে। সাবিত্রী আমাদের সবার বড়ো। উনি জেনে থাকায় সব দিক সামাল দিতে পারবেন। তবে আমরা ভেবেছিলাম বৌভাতের অনুষ্ঠানটা আমাদের বাড়িতে করব।শাশুড়ি মা'ও সেই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তোমরা যখন সেটা সাবিত্রীদির বাড়িতে হবে বলে কথা দিয়ে দিয়েছো তখন অষ্টমঙ্গলাটা কিন্তু আমাদের বাড়িতেই করতে হবে। না বললে শুনব না।
--- কিন্তু অত সব করার সময় কি আমাদের হবে ? তুই তো জানিস এখান থেকে বেড়িয়েই আমাকে হোমের মেয়েদের সমাজের মুলস্রোতে ফেরানোর কাজ শুরু করে দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে এক একটা দিন আমার কাছে মহা মুল্যবান।
--- হ্যা, তাও বটে। ঠিক আছে তাহলে বরং তোমার ওখানে গিয়েই সবাই আনন্দ করব।
--- ঠিক, তবে শুধু সেদিনই নয়, মাঝে মধ্যে তোরা গেলে আমার কাজটাও সহজ হবে।
---- যাব দিদি, নিশ্চয় যাব। তোমার ওই কাজে নিজেকে সামিল করতে পারলে ধন্য হবো।
কথায় কথায় দিনের আলো মরে আসে। শ্রাবণীকে নিতে হাজির হয় সন্দীপ। তাকে সবাই মিলে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে। আর শ্রাবণী চলে যেতেই অঞ্জলির মনটা উদাস হয়ে যায়। মনটাকে ভুলিয়ে রাখতেই সে অফিস ঘরে গিয়ে টিভির চ্যানেল ঘোরাতে থাকে। একটা সংবাদ চ্যানেলে গিয়ে তার চোখ আটকে যায়।



No comments:
Post a Comment