Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

সালিশির রায় -- ৮০



              সালিশির রায়


                          

        

                                    অর্ঘ্য ঘোষ

          ( কিস্তি --৮০)




কিন্তু মন্ত্রীর পিছনে গাড়ি থেকে নামতে থাকা লোকটাকে দেখে চমকে যায় অঞ্জলি। ওই মানুষটাকেই কত খুঁজেছে তারা। প্রতি মুহুর্তে তার অভাব অনুভব করেছে সে। আগের তুলনায় অনেকটা ধোপদুরস্ত দেখালেও মানুষটা যে তার বাবা তা নিয়ে কোন সংশয় থাকে না অঞ্জলির।তাই পরিবেশ - পরিস্থিতি সমস্ত ভুলে সে ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। ওই দৃশ্য দেখে উপস্থিত মানুষজন, প্রশাসনিক আধিকারিকরা হতবাক হয়ে যান। বাবাও যেন কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন মেয়ের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন। অঞ্জলি ভাবে বাবা কি তাকে চিনতে পারছে না ? হতেও পারে। কারণ ততদিনে শহুরে জলহাওয়ায় তার চেহারাতে অনেকখানি পরিবর্তন এসে গিয়েছে। তাই কি মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনিও ১০ বছরের আগের সেই মুখচ্ছবিটা খুঁজছেন? একসময় বাবার মুখে হাসি ফুটে ওঠে।  ততক্ষণে দুজনের চোখই জলে ভরে গিয়েছে। বাবা--মেয়ের মিলনদৃশ্যে নির্বাক হয়ে যান উপস্থিত মানুষজন। সেই সময় দাদা আর ভাইও এসে বাবার কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। বাবা পরম মমতায় তিন ছেলেমেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে চলেন। আর সেদিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন মন্ত্রীমশাই। ডি,এম সাহেব এগিয়ে এসে অঞ্জলিকে দেখিয়ে বলেন ,  এই মেয়েটির কথাই আপনাকে জানিয়েছিলাম। ওকেই এই গ্রামে গ্রামসেবিকা নিয়োগ করা হয়েছে। আর কাজে যোগ দিয়েই ও নিজের ফুলশয্যা ফেলে অসাধ্য সাধন করে ফেলেছে। অঞ্জলি  বাবা , মন্ত্রীমশাই আর ডি,এম সাহেবকে প্রনাম করে উঠে দাঁড়াতেই মন্ত্রীমশাই তার মাথায় হাত রেখে আর্শিবাদ করে বলেন -- অসাধ্য সাধনের খবর আমি সকালেই সংবাদমাধ্যমে পেলাম। খুব ভালো কাজ করেছো তুমি মা। কিন্তু এই ভদ্রলোক কে হন তোমার ?
--- স্যর উনি আমার বাবা , বছর দশেক আগে কাজের খোঁজে বর্ধমান গিয়েছিলেন। তারপর বহু খুঁজেও তাকে পাওয়া যায় নি।
--- কি আশ্চর্য ,  ১০ বছর আগেই তো উনি বর্ধমান স্টেশনে ট্রেন থেকে নামার সময় পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পান। আমাদের এক কর্মী তাকে বর্ধমান হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্তু প্রচুর অন্তঃক্ষরণের কারণে তাকে কলকাতায় রেফার করা হয়। সেখানে মাসখানেক থাকার পর সুস্থ হলেও তার স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। সেই থেকে উনি  আমাদের দলের কার্যালয়ের সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবেই রয়ে যায়। এমনিতে কোন অস্বাভাবিকতা নেই , বরং ওর জন্যই আদিবাসী সেলে কাজ করাটা আমাদের অনেক সহজ হয়ে যায়।কেবল নিজের পরিচয়টুকু সে কিছুতেই স্মরণ করতে পারত না।আমরাই ওর নাম দিই সুরেশ। গল্পের মতোঘটনাটা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে যান সবাই। কেবল অঞ্জলির মুখ থেকে আক্ষেপ ঝড়ে পড়ে --ইস ! সেদিন যদি আমরা বর্ধমান থানার সাথে   হাসপাতালে গিয়েও একবার  খোঁজ নিতাম -----!
মন্ত্রী বলেন , সমন্বয় মঞ্চের মাধ্যমে এই এলাকায় আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করার জন্য ওকে নির্বাচন করা হয়। সেইজন্যই ওকে আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছি। এখন মনে হচ্ছে ভাগ্যিস এই কাজের জন্য ওর কথা ভাবা হয়েছিল। নাহলে হয়তো সারাজীবনই দুপক্ষের কেউ কারও সন্ধান পেত না।
---- হ্যা স্যর, এজন্য আমি আর আমার পরিবার সারাজীবন আপনার কাছে ঋণী থাকব।
--- আরে না, না। ও কথা বোল না। আমারই মনে হচ্ছে তোমার বাবাকে এখানে এনে একটা কাজের মতো কাজ হয়েছে। এখন বাপ -- মেয়ে মিলে কাজ করে দেখিয়ে দাও তো তোমরাও পারো।
--- স্যর, আমি প্রাণপণ চেষ্টা করব।
---- চেষ্টা নয় , পারতেই হবে। তুমি পারবেও।তোমার চোখে মুখে রয়েছে দৃঢ়তার ছাপ। বেশ এসো দেখি এবারে ওদিকে কতদূর কি হলো ?



                                                  বলে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান মন্ত্রীমশাই। অঞ্জলিরা তখনও তিন ভাইবোন বাবাকে জড়িয়ে ধরে  দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই সময় সেখানে এসে দাঁড়ায় আলাপন। আর অঞ্জলি খুব অস্বস্তিতে পড়ে যায়। নিজে মুখে বাবার সঙ্গে বরের পরিচয় করিয়ে দিতে কেমন যেন বাঁধো বাধোঁ ঠেকে তার। আবার পরিচয় করিয়ে না দেওয়াটাও ভালো দেখায় না। আলাপনের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। ভাই তাকে ওই দোটানা থেকে রক্ষা করে। সে'ই আলাপনবাবুকে দেখিয়ে বলে , বাবা উনি খুব বড়ো অফিসার। পরশু ওনার সঙ্গে দিদির বিয়ে হয়েছে।বাবা অবাক চোখে আলাপনের দিকে চায়। অত বড়ো অফিসারের সঙ্গে মেয়ের বিয়েটা যেন বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না তার। কিন্তু আলাপন পায়ে হাতে দিয়ে প্রনাম করেতেই বাবা আদিবাসী সমাজের রীতি অনুযায়ী হাত মুঠো করে আর্শিবাদ করে।দেখে খুব ভালো লাগে অঞ্জলির। মাঠ ভর্তি লোকের সামনে বাবাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করাটাকে আলাপনের উদার হৃদয়ের পরিচয় বলে মনে হয় তার।
আলাপনই বলে , সাবিত্রীদির বাড়িতে মা-দিদিদের তো এবার একটা খবর পাঠাতে হয়।
ঘটনার আর্কষিকতায় মা-দিদিকে খবর দেওয়ার কথাটা একেবারে ভুলে গিয়েছিল সে। আলাপনের কথায় খেয়াল হয় তার। আলাপনের উদ্দেশ্যে বলে -- এই রে, সত্যি বড়ো ভুল হয়ে গিয়েছে। এতক্ষণ এত ভালো খবরটা তাদের জানানো উচিত। তুমি একটা ফোন করে ওদের আসতে বলে দাও।
মাঠে তখন লোক সমাগম বাড়ছে। বাড়ছে কলরবও। তাই আলাপন ফোন করতে একটু দূরে সরে যায়।সেই সময় একে একে এসে পৌছোয় অরুণস্যর, সন্দীপ, অমলবাবুরা। অরুণস্যর আর সুব্রতবাবু বাবার পরিচিত। তাদের দেখেই বাবা চিনতে পারে। দুপক্ষই কুশল বিনিময় করে।অঞ্জলি অমলবাবু আর সন্দীপের সঙ্গে বাবার পরিচয় করিয়ে দেয়। তারাও বাবাকে প্রনাম করে। তার মধ্যেই অঞ্জলি শুনতে পায় মাইকে বাবা আর তাকে মঞ্চে ডাকা হচ্ছে। ওই ঘোষণা শুনে অরুণস্যররা তাদের মঞ্চে যাওয়ার জন্য তাড়া লাগায়।



                                             তারা মঞ্চে পৌঁছোতেই মন্ত্রীমশাই তাদের কাছে ডেকে নেন। তারপর মাইক হাতে নিয়ে বলেন , আজ থেকে এই গ্রামে আদিবাসীদের উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়া হল অঞ্জলি এবং তার বাবাকে। সমন্বয় মঞ্চের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে সমাজ থেকে ছিটকে যাওয়া মেয়েদের মুলস্রোতে ব্যবস্থা করবেও তারা। ইতিমধ্যে অঞ্জলি সেই কাজ করে নজির সৃষ্টি করেছে। হোমের চার দেওয়ালের মধ্যে থেকেও পড়াশোনা করে নিজেকে যোগ্য করে তুলেছে। তাই তাকে গ্রামসেবিকা হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে । পুলিশ প্রশাসনকেও সর্বোতভাবে তাদের পাশে থাকার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কাল থেকেই শুরু হয়ে যাবে সমন্বয় মঞ্চ নির্মাণের কাজ। ততদিন অঙ্গনওয়ারিকেন্দ্রেই অস্থায়ীভাবে কাজ চলবে।
মন্ত্রীর ঘোষণা শেষ হতেই হাততালিতে ফেটে পড়ে জনতা। অঞ্জলি লক্ষ্য করে অন্যান্য গ্রাম থেকে আরও বেশ কিছু মানুষ যোগ দিয়েছেন ততক্ষণে। শিলান্যাস করে মন্ত্রী গাড়িতে ওঠার আগে শাসক দলের নেতা সুহাস কবিরাজকে ডেকে বলেন ,  আপনাকে খুঁজছিলাম। এখন থেকে অঞ্জলি আর তার বাবা আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করবেন। আপনি কিছু করতে চাইলে ওদের সঙ্গে পরামর্শ করে নেবেন।
মন্ত্রীর কথা শুনে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারেন না সুহাসবাবু। সে দলের ব্লক কমিটির সম্পাদক। আর তাকেই কিনা দুই আদিবাসীর কথা শুনে চলতে হবে ? মুখে কিছু না বললেও সুহাসবাবুর মনে যে সেই আলোড়ন চলছে তা তার মুখ দেখেই আন্দাজ করতে পারে অঞ্জলি। তাই কথা হারিয়ে যায় তার মুখ থেকে।  তোঁতলামিতে পেয়ে বসে তাকে।কোনরকমে তো তো করে বলেন --- স্যর --- আমি --- মানে ?
মন্ত্রী বলেন, বুঝতে পেরেছি আপনার সমস্যাটা। মানেটাও বুঝিয়ে দিচ্ছি। মানেটা হলো ওদের পরামর্শ নিয়ে যদি চলতে পারেন ভালো , নাহলে আপনাকেই চলে যেতে হবে। এটা আমার কথা নয় , দলের নির্দেশ।
তারপর মন্ত্রী তার হাতে একটা কার্ড দিয়ে বলেন, এটা আমার কার্ড। এতে আমার ফোন নাম্বার  লেখা আছে। যখনই প্রয়োজন মনে হবে আমাকে ফোন করবে।
তারপরই বেরিয়ে যায় মন্ত্রীর কনভয়। অঞ্জলি মনে হয় সুহাসবাবুর  মুখটাতে কে যেন একরাশ কালি লেপে দিয়েছে।তাই মুখ লুকোতে পালিয়ে বাঁচেন তিনি। সেই সময় এসে পৌঁছোয় মা আর দিদি। তাদের সঙ্গে  সঞ্চিতা , মালতি আর প্রতিমাও আসে। বাবাকে দেখে তারাও নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। আনন্দাশ্রুতে তাদেরও চোখ ভিজে যায়।এক অপার্থিব মিলন দৃশ্য সূচিত হয় গোধুলি আলোয়।  দ্রুত বেলা পড়ে আসে। সেদিনই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করে নেয় অঞ্জলি।

               

       ( ক্রমশ )




        নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                   শীঘ্রই আসছে 

           ধারাবাহিক নাটক ----                                 

                                                               


                                    

                -----০----- 

   
       

No comments:

Post a Comment