Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

সালিশির রায় --- ৮১




              সালিশির রায়


                          

        

                                    অর্ঘ্য ঘোষ

           ( কিস্তি -- ৮১)




সেদিনই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করে নেয় অঞ্জলি।পরের দিন সকাল থেকেই সে সমন্বয় কাজ শুরু করে দিতে চায়। আজ রাতে টালিপাড়ার পুনঃবার্সন কেন্দ্রের বাড়িতে বসে সে তার কর্মপদ্ধতি ঠিক করে নেবে। সেই জন্য সে সবাইকে টালিপাড়ায়  যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। কিন্তু অরুণবাবু, অমলবাবু, সন্দীপরা সবাই সবিনয়ে সেদিনের মতো অব্যহতি চায়।তবেঁ বিদায় নেওয়ার আগে সবাই বলে যায় এই কর্মযজ্ঞে যোগ দিতে তারা নিয়মিতই আসবেন। তারা বিদায় নেওয়ার পর সঞ্চিতাদের নিয়ে সমস্যায় পড়ে অঞ্জলি।কারণ সঞ্চিতাদের দিকে চাইতেই তারা সাফ জানিয়ে দেয়,  আমরা কিন্তু তোমাকে ছেড়ে আর হোমে গিয়ে থাকতে পারব না। প্লিজ ,আমাদের তোমার সঙ্গেই  থাকতে দাও। ওদের কথা শুনে দোটানায় পড়ে অঞ্জলি। সঞ্চিতারা সঙ্গে  থাকলে তার কাজের অনেক সুবিধা হবে ঠিকই কিন্তু ইচ্ছে করলেই ডি, এম সাহেবের অনুমতি ছাড়া তাদের সে এখানে রাখতে পারে না। সেই কথা কিছুতেই মানতে চায় না সঞ্চিতারা বরং সেইকথা বলতেই সঞ্চিতারা বাচ্চা মেয়ের মতো উহু উহু করে ওঠে। সবাই বলে , সে আমরা জানি না। তুমি যা হয় করো।
অঞ্জলি অসহায়ের মতো তাকায় আলাপনের দিকে।আলাপন তাকে হাত নেড়ে আশ্বস্ত করে ফোনে ধরে ডি,এম সাহেবকে। কিছুক্ষণ কথা বলার পরই তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে হাসির রেখা। তা দেখেই অঞ্জলির বুঝতে পারে ইতিবাচক সাড়া মিলে গিয়েছে। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে আলাপনের মুখের দিকে তাকায়। আলাপন তখন জানায়, ডি,এম সাহেব বলেছেন এতে কোন সমস্যা নেই। খোদ মন্ত্রীমশাই যেখানে অঞ্জলিকে ওইসব মেয়েদের সমাজের মুলস্রোতে ফেরানোর দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন সেখানে আর কিছু বলাটাই বাহুল্য। তাছাড়া ১/২ জন মেয়েকেও যদি মুলস্রোতে ফেরানো যায় তার চেয়ে ভালো আর কিই বা হতে পারে ? অঞ্জলি তো ইতিমধ্যেই সেটা করে দেখিয়ে দিয়েছে।
আলাপনের কথা শুনে উচ্ছাসে হাততালি দিয়ে ওঠে সঞ্চিতারা। কিন্তু ওদের পড়াশোনা ? আলাপন ওদের কাছের কোন কলেজে ভর্তি করে দেওয়ার দায়িত্ব নেয়। পড়াশোনার পাশাপাশি ওরাও এখন থেকে সমন্বয় মঞ্চের কাজ করবে। 



                                  যতদিন সমন্বয় মঞ্চের বাড়ি তৈরি না হচ্ছে ততদিন টালিপাড়ার বাড়ি থেকেই সবাই যাতায়াত করবে। ডি,এম সাহেব তার জন্য একটা গাড়িও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সেই গাড়িতে করেই টালিপাড়ার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় তারা। যাওয়ার সময় আমোদপুরের একটি ধাবায় গাড়িটা দাঁড় করাতে বলে আলাপন। আর সেখানে মশলার ছোঁকছোঁক  শব্দে আর গন্ধে খিদেটা চাগাড় দিয়ে ওঠে সবার। দিনে তো কারও ভাত জোটে নি। চা- টিফিনেই কেটে গিয়েছে। পাড়ার ছেলেগুলো অবশ্য খাবারের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিল , কিন্তু অত লোকের মধ্যে কাকে ফেলে কাকে  খাওয়াবে ভেবে অঞ্জলিরাই খাবারের ব্যবস্থা করতে বারণ করে। এতক্ষণ নানান কাজের চাপে খাবারের কথা মনে হয় নি কারও। কিন্তু ধাবার সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই সবার যেন হঠাৎ করে খিদে পেয়ে যায়। অঞ্জলি মনে মনে ভাবে, ভাগ্যিস আলাপন বিবেচনা করে ধাবায় গাড়িটা লাগিয়েছিল। কারণ সারাদিন ধকলের পরে এই রাতে বাড়ি গিয়ে রান্না করার মতো উদ্যম  আর কারও থাকত না। তাছাড়া টালিপাড়ার বাড়িতে এখন কোথাই চাল-ডাল, আনাজপাতি,জ্বালানি, বাসনপত্র তার ঠিকঠিকানা নেই।তখ ন সবাইকে উপোস করে থাকতে হলে অঞ্জলির অস্বস্তির আর শেষ থাকত না। সেই অস্বস্তির হাত থেকে আলাপনই তাকে বাঁচিয়ে দিল। এইভাবে আলাপন একের পর এক বিভিন্ন অস্বস্তিকর পরিস্থতি থেকে উদ্ধার করে অন্তরের অন্তঃস্থলে আরও বেশি করে জায়গা করে নিচ্ছে তার প্রিয় মানুষটি। হইহল্লোড় করে খেতে বসে সবাই। দাদা আর ভাইয়ের সঙ্গে এক টেবিলে বসেছে সঞ্চিতারা। মা-বাবা, দিদি আর জামাইদা বসেছে এক টেবিলে। তার দুজনে বসেছে অন্য টেবিলে। কাজের বিষয় ছাড়া তাদের অবশ্য মুখে কোন কথা হয় না। কথা যা হওয়ার হয় চোখে চোখে। খেতে খেতেই অঞ্জলি লক্ষ্য  করে সঞ্চিতারা অবশ্য দিব্যি গল্প করছে। দাদার প্রায় কথাতেই আগ্রহ দেখাচ্ছে সঞ্চিতা।ভাইয়ের  কথাতে কথা দিচ্ছে মালতিও। অঞ্জলির অবশ্য খারাপ লাগে না। কারণ তাদের মতো বন্দীদশায় থাকা মেয়েদের কোন পুরুষ মানুষের সঙ্গে কথা বলার যে কি তীব্র   আকাঙ্ক্ষা থাকে তা তো তার অজানা নয়। সে নিজেই তো তার ভুক্তভোগী। 



                                                           খাওয়া দাওয়ার পর গাড়ি ছোটে টালিপাড়ার দিকে। কিছুক্ষণের মধ্য পৌঁছে যায় তারা সেই বাড়িতে। একদল সিভিক ভলেণ্টিয়ার্স সেই বাড়ির পাহারায় ছিল। অঞ্জলিরা পৌঁছোতেই তারা বাড়ির দরজা খুলে দেয়।একতলা বাড়িটিতে আলো পাখা, তিনটে শোয়ারঘর, রান্নাঘর, কল, বাথরুম সবই আছে।চিলেকোঠার পাশেও একটা ছোট্ট শোয়ারঘর আছে। রয়েছে বিছানাপত্র , রান্নাবান্নার সরঞ্জামও।হাফ ছেড়ে বাঁচে অঞ্জলি। যাক বাবা, বিছানাপত্রের কথাটা তার একেবারেই মনে ছিল না।তাছাড়া সকাল হলেই আর  হাড়ি-বাসন কিনতে বাজারে ছুটতে হবে না। এভাবে  সবদিক বিবেচনা করে পুনঃবার্সনের ব্যবস্থা করার জন্য মনে মনে সে প্রশাসনকে ধন্যবাদ দেয়। ঠিক হয় বাবা- মা একটা ঘরে থাকবে, দাদা, ভাই আর জামাইদারা একটাতে, দিদির সঙ্গে সঞ্চিতারা থাকবে অন্য ঘরটাতে। আর তারা থাকবে চিলেকোঠার ঘরে। বাবা -- দাদারা শুয়ে পড়তেই সঞ্চিতারা তাকে একটু সাজিয়ে দেয়। তারপর দিদি তাকে হাতে ধরে চিলেকোঠার ঘরে পৌঁছে দেয়। সেখানে তখন বিছানায় আধশোওয়া হয়ে খবরের কাগজের পাতা উল্টাচ্ছিল আলাপন। দিদি তার উদ্দেশ্যে বলে , নাও ভাই তোমার ভালোবাসার পাত্রীকে দিয়ে গেলাম। এবার  যত পারো ভালোবাসাবাসি করো। সারা দিনের ক্লান্তিতে আমাদের চোখ টানছে। আমরা ঘুমোতে গেলাম। দিদিরা চলে যেতেই অঞ্জলি দোর দেয়। কিন্তু লজ্জায় সে কিছুতেই আলাপনের কাছে এগিয়ে যেতে পারে না। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। তা দেখে আলাপন ডাকে , কি হলো এসো।   আসবে না আমার কাছে ?
তাও পা নড়ে না তার। তখন আলাপন এসে তার দুই হাতের মধ্য পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে অঞ্জলির কপালে ঠোঁট ছোঁওয়ায়। আর দুহাতে মুখ চাপা দিয়ে লজ্জা ঢাকে অঞ্জলি। একসময় আস্তে আস্তে অঞ্জলিকে বিছানার উপরে বসিয়ে দেয় আলাপন। তারপর সেও মুখোমুখি বসে অঞ্জলির মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। 
অঞ্জলি বলে , অ্যাই কি দেখছ অমন করে ?
আলাপন কোন কথা বলে না। অঞ্জলির কপালে  ঝুলে থাকা চুলগুলো  আলতো হাতে সরিয়ে দিতে দিতে তার গলায় ভর করে জীবনানন্দ। সে আবৃত্তি করে ওঠে  "
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ; অতিদুর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর,
অঞ্জলিও গলা মেলায় --
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে ; বলেছে সে, " এতদিন কোথায় ছিলেন?"
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
আবৃত্তি শেষ হলেও কেউ কোন কথা বলতে পারে না। হাত ধরে একে অন্যের মুখের দিকে চেয়েই থাকে। বাড়তে থাকে রাত। দুজনের চোখে ঘনিয়ে আসে এক ঘোর লাগা আবেশ। সেই আবেশ আচ্ছন গলায় আলাপন গেয়ে ওঠে -- " এবার তোমায় দিতেই হবে, যা আছে সব উজার করে দিতেই হবে "।
অঞ্জলিও গানেই তার প্রত্যুত্তর দেয়  - " আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি ---
আমার যত বিত্ত প্রভু, আমার যত বানী।
আমার চোখের চেয়ে দেখা, আমার কানের শোনা,
আমার হাতের নিপুন সেবা, আমার আনাগোনা -
সব দিতে হবে।
গানের রেশ মিলিয়ে যেতেই দেওয়া-নেওয়ায় হারিয়ে যায় দুজনে। ক্রমে ঘুম নামে দুজনের চোখে। মায়াময় স্বপ্নের জগতে বিচরণ করতে করতেই সকাল হয়ে আসে। ঘুম ভেঙে অঞ্জলি চেয়ে দেখে পাশে দেবশিশুর মতো শুয়ে আছে আলাপন। মুখে পরিতৃপ্তির ছাপ। ঠোটের কোনে লেগে রয়েছে হাসির ছোঁওয়া। দেখে মনে হয় যেন বাচ্ছাছেলে দোয়েলা করেছে। খুব ইচ্ছে করে আলাপনকে  জড়িয়ে ধরে আরও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকে সে। কিন্তু দিদিরা উঠে যদি দরজায় কড়া নাড়ে তাহলে লজ্জার শেষ থাকবে না। তাই আলাপনের কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে উঠে পড়ে অঞ্জলি। পরে আলাপনকেও ডেকে তুলতে হবে। সকাল সকাল তাদের পৌঁছতে হবে শ্রীপল্লী। আজ থেকেই শুরু হবে তার পথ চলা। কিন্তু শুরুতে হোঁচট খেতে হয় তাকে।
           


   

       ( ক্রমশ )




        নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                   শীঘ্রই আসছে 

           ধারাবাহিক নাটক ----                                 

                                                               


                                    

                -----০----- 

   
       

No comments:

Post a Comment