Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

সালিশির রায় -- ৭৯








              সালিশির রায়


                          

        

                                    অর্ঘ্য ঘোষ

         (  কিস্তি --- ৭৯ )




সে থামতেই সবাই বলে 'হ্যাটস অফ'। তারপরই শুরু হয়ে যায় সৎকারের তোড়জোড়। পাড়ার ছেলেরাই মারাংবুরুর থান থেকে বাঁশ কেটে এনে খাট তৈরি শুরু করে দেয়। দাদা - ভাই আর জামাইদাও তাদের সঙ্গে হাত লাগায়।এই প্রথম কুষ্ঠ আক্রান্তের সৎকারের  জন্য এই পাড়ায় খাট তৈরি হচ্ছে। এর আগে তো সব গলায় খড়ের দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে পুঁতে দেওয়া হয়েছে। ঠিক হয় তাদের গাড়িতে করেই মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হবে। সেই মতো মৃতদেহ বের করে নিয়ে এসে চাপানো হয় গাড়ির ছাদে। অঞ্জলি লক্ষ্য করে মৃতদেহ গাড়িতে নিয়ে এসে চাপানোর সময় বিষ্ময় ঝড়ে পড়ে  সনাতনের বাড়ির সামনে উপস্থিত মানুষগুলোর চোখে মুখে।তারা ভাবতেও পারে নি সালিশির রায় উপেক্ষা করে গ্রামের কেউ সৎকারে অংশ নেবে। এর আগে তো তেমন ঘটনা ঘটে নি। প্রথমে ঠিক ছিল অরুণস্যররাও সবাই শ্মশানে যাবেন। কিন্তু অঞ্জলি জানিয়ে দেয় তাদের আর যাওয়ার দরকার নেই। গ্রামের ছেলের সঙ্গে শ্মশানে যাবে দাদা জামাইদা আর ভাই। অঞ্জলির কথা শুনে  অরুণস্যর, অমলবাবুরাও যেন কিছুটা মনোক্ষুন্ন হয়।  অমলবাবু বলেন -- আমরা  শ্মশানে যাব বলেই তো এসেছিলাম।
অঞ্জলি বলে , সে তো দরকার হলে আপনাদেরই যেতে হতো। ভেবেছিলাম গ্রামের কাউকে পাব না। কিন্তু সাতজন এগিয়ে এসেছে। তাছাড়া দাদারা আছে। আসলে আমি চাইছি এই কাজে গ্রামের মানুষদের অংশগ্রহণ। ওদের দেখাদেখি যেন আরও লোক এগিয়ে আসেন। সেইজন্যই আমি পুরোপুরি গ্রামের ছেলেদের দিয়েই কাজটা করাতে চাইছি।
অঞ্জলির উদ্দেশ্যটা বুঝতে পেরে সবাই তার যুক্তিকেই সমর্থন করে। মৃতদেহ নিয়ে গাড়ি বেড়িয়ে যায়। পিছনে পিছনে যায় পুলিশের জিপও। ডি,এম সাহেবের নির্দেশে পুলিশ শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে সৎকারের সমস্ত ব্যবস্থা করে তবেই থানায় ফিরবে।যাওয়ার আগে ওসি বলেন , ম্যাডাম আপনি আজ অসাধ্য সাধন করেছেন। কোন সাহার্যের প্রয়োজন হলে বলবেন। তাছাড়া কাল সকালে মন্ত্রী সাহেবের অনুষ্ঠানে তো আবার দেখা হচ্ছে।



                                                পুলিশের গাড়িটা বেরিয়ে যেতেই তারা গ্রামের অঙ্গনওয়াড়িকেন্দ্রে পৌঁছোয়। সেখানে তখনও আলো জ্বেলে মঞ্চ বানাচ্ছে ডেকোরেটারের লোকেরা। সেই আলোয় অঞ্জলি দেখতে পায় অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে সদ্য রঙ ফেরানো হয়েছে। মিড ডে মিল রান্নার চালাটাতেও চাপানো হয়েছে নতুন আসবেস্টর টিন।অঞ্জলির এসব দেখে খুব অবাক লাগে। এর আগেও দেখেছে মন্ত্রী বা ভি,আই,পি'রা কেউ এলে রাতারাতি ভাঙা রাস্তা তাপ্পি মেরে ঝা -চকচকে করে দেয় প্রশাসন। সেই রাস্তার উপর দিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে যাওয়ার ওইসব ভি,আই, পি 'রা জানতেও পারেন না রাস্তার বেহাল দশার কথা। জানতে পারেন নারাস্তার বেহাল দশার জন্য এলাকার মানুষজনকে কি ভোগান্তি পোহাতে হয় সারা বছর। প্রশাসনের এ সব ধামাচাপা দেওয়ার প্রবনতা কেন ভেবে পায় না সে। যদি অর্থাভাবের কারণে রাস্তা সংস্কার না হয় তার দায় তো স্থানীয় প্রশাসনের নয়। সেক্ষেত্রে মন্ত্রীদের তো আসল অবস্থাটা দেখা জরুরী। তবেই তো তাদের টনক নড়বে। তা না করে প্রশাসন কেন এত ঢাক ঢাক - গুড় গুড় করে ?  তাহলে কি প্রশাসনেরও কোন গাফিলতি থাকে ? পরে এ নিয়ে সে আলাপনের সঙ্গে কথা বলবে সে। তার ভাবনার মাঝেই বেজে ওঠে আলাপনের ফোন। ফোনে খুলেই আলাপন বলে -- হ্যা স্যর বলুন।
ফোনটা যে ডি,এম সাহেবের তা বুঝতে অসুবিধা হয় না হয় না অঞ্জলির। কিছুক্ষণ কথা বলার পরই আলাপন ফোনটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন -- নাও ডি,এম সাহেব তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। সে  ফোনটা কানে চেপে ধরতেই শুনতে পায় ডি, এম সাহেব বলে চলেছেন , তুমি জেলা প্রশাসনের মুখ রক্ষা করেছো। জীবনের সব থেকে কাঙ্খিত দিনের আনন্দকে তুচ্ছ করে যেভাবে তুমি আদিবাসী সমাজের একটা কুসংস্কারকে কোন রকম প্রশাসনিক জোর খাটানো ছাড়াই আদিবাসীদেরই দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছো তার জন্য তোমায় স্যালুট জানাচ্ছি।
অঞ্জলি বলে, এভাবে বলে আমায় লজ্জা দেবেন না স্যর। আপনি সবদিক আমার চেয়ে বড়ো। তাছাড়া আমি তো স্যর আমার দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র।
------ উহু , ওই কথা ঠিক নয়।ছোটর কাজ যখন বড়োকে ছাড়িয়ে যায় তখন সেই কাজ সম্মান জানানো না হলে বড়র আর বড়ত্ব থাকে না। আর আমরা সবাই তোমার মতো দায়িত্বসচেতন হলে আজ হয়তো আমাদের সমাজের চেহারাটাই পাল্টে যেত।
--- থ্যাঙ্ক ইউ স্যর , বলে ফোনটা ফিরিয়ে দিতেইআলাপন বলেন , ডি,এম সাহেব খুব খুশী হয়েছেন। বললেন, ভাবতেই পারি নি অঞ্জলি এত ভালো ভাবে নিস্পত্তি করতে পারবে।
অরুণস্যররা বলেন -- আমরাও কি ভাবতে পেরেছিলাম নাকি ? গাড়িতে আসতে শুধুভাবছিলাম যেখানে পুলিশ - প্রশাসনকে পিছু হঠতে হয়েছে সেখানে অঞ্জলি পারবে তো ?
অঞ্জলি বলে, সংশয় যে আমারও ছিল না তা নয়। তবে চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলাম কিন্তু পুলিশ প্রশাসনের ভরসায়।ভেবেছিলাম প্রয়োজনে নিজেরাই জোর করে সৎকার করে দেব।কিন্তু মনে মনে চাইছিলাম যেন জোর খাটাতে না হয়। কারণ তাহলে হয়তো আজকেরপরিস্থিতি থেকে উদ্ধার হওয়া যেত, কিন্তু গ্রামের মানুষের মনে কুসংস্কারটা থেকেই যেত। কিন্তু ওই ছেলেগুলোই আমার উদ্দেশ্যটা সার্থক করে দিয়েছে। আশাকরিএরপর থেকে কুষ্ঠে কারও মৃত্যু হলে আর সৎকারের সমস্যা হবে না। ওই ছেলেগুলোই সেইদায় পালন করবে। এভাবেই একের পর এক আদিবাসী সমাজের কুসংস্কারের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে।অমলবাবু বলেন -- যাক, যার সব ভালো তার শেষ ভালো। এখন ওরা সৎকার করে ফিরলেই নিশ্চিন্ত হই।



                                           সেই রাতটা অঙ্গনওয়ারিকেন্দ্রের চেয়ারে বসে ওইভাবে  গল্প করতে করতেই কেটে যায় তাদের। ভোরের দিকে শ্মশান থেকে ফেরে ওরা। অঙ্গনওয়াড়িকেন্দ্রের সামনেই গাড়ি থেকে নামে সবাই। গ্রামের ছেলেগুলোর মধ্যে সঞ্জয়ই বয়সে বড়ো , প্রায় ভাইয়েরসমবয়সী। মঙ্গলকাকার ছেলে সঞ্জয়। সে বলে , দিদি বাড়ি থেকে চা করে আনব ?
তার চা খাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। তবুও না বলতে পারে না সে। আসলে সঞ্জয়ের কথার মধ্যে সে খুঁজে পাই  কেমন একটা আপনকরা ভাব। সেও তো দুরত্ব ঘুচিয়ে সবার কাছাকাছিহতে চায়। নাহলে কি করে সে কাজ করবে।এদের নিয়েই তো তাকে কাজ করতে হবে। তাছাড়াতার ইচ্ছে না হলেও রাত জেগে বাকিদের এসময় মনটা যে চায়ের জন্য ছোঁকছোঁক করছে তাতাদের মুখ দেখেই বুঝতে পারে। তাই সে বলে , এত লোকের চায়ের জিনিসপত্র সব আছে তো ?
এবারে মুখ খোলে চামটাকাকার ছেলে রঞ্জিত। সে একটা প্যাকেট দেখিয়ে বলে, বড়বাবু আমাদের মিষ্টি খাওয়ার জন্য কিছু টাকা দিয়েছিল। সব লাগে নি।ভাবলাম তোমরাও তো সারারাত্রি জেগে রয়েছো সকালে চা হলে ভালোই হবে। তাই মিষ্টির দোকান থেকেই চা- চিনি,দুধ আর কাগজের কাপ কিনে এনেছি।  ছেলেগুলোর এই বিবেচনা বোধটা খুব ভালো লেগে যায় অঞ্জলির। অঞ্জলির মনে মনে ঠিক করে , এই ছেলেগুলোকেই সৈনিক তৈরি করতে হবে তাকে। তাই আজ থেকেই সে শুরু করে দেয় তার যুদ্ধের সৈনিক তৈরির কাজ। চা খেতে খেতেই তার সূচনা হয়ে যায়। ছেলেগুলোকে সে এদিন সমন্বয় মঞ্চের শিলান্যাসের কথাবলে। সমন্বয় মঞ্চের কর্মসূচির কথাও তুলে ধরে তাদের সামনে। শুনেই সবার মধ্যে উৎসাহের সঞ্চার হয়। অঞ্জলি তাদের সবাইকে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বলে। অনুষ্ঠান শেষে সবার সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায় সে।
ছেলেগুলো তাকে জানায় , আরও কয়েকজন তাদের সঙ্গে আসতে পারে। তাদের কি নেওয়া হবে ?
--- অঞ্জলি বলে, নিশ্চয়। এখানে কাউকে নেওয়া না নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এটা আমাদের সবার কাজ , তাই সবাইকেই নিতে হবে।
তার কথা শুনে ছেলেগুলো তখনকার মতো বাড়ি চলে যায়। তারাও প্রস্তুত হয়ে আসার জন্য অরুণস্যারের বাড়ি অভিমুখে রওনা দেয়। কিছুদূর গিয়েই যেন পা আটকে যায় অঞ্জলির। সামনেই ভগ্নস্তুপ হয়ে পড়ে রয়েছে তাদের বাড়ি। সেই বাড়িই যেন  তার পথ আগলে দাঁড়ায়। সেদিকে চাইতেই ভেসে ওঠে হাজারও সুখ দুঃখের স্মৃতি। হাতছানি দিয়ে ডাকে সোনালি শৈশব। সে ডাক উপেক্ষা করতে পারে না সে।পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়ায় জন্মভিটেতে। দেখতে পায় মাটির স্তুপের ভিতর থেকে উকি দিচ্ছে কত গৃহস্থালির সরঞ্জাম, মনসার থান, বাবার একপাটি রাবারের চটি।ঝাপসা হয়ে ওঠে চোখ। বাবার চটিটি কুড়িয়ে সে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে। সেই সময় আলাপন এগিয়ে এসে তার হাত ধরে। তার হাত ধরেই ধীরে ধীরে অঞ্জলি ছেড়ে আসে তার  জন্মভিটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা স্নান --টান করে চলে আসে মঞ্চের কাছে। ততক্ষণে সাংবাদিকরা আসতে শুরু করেদিয়েছেন। এসে পৌঁছোন বি, ডি,ও সহ অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিকরা। সে আর আলাপন সবাইকে হাতজোড় করে আপ্যায়ন করে। গ্রামের আরও তিনজন ছেলে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে। অঞ্জলি তাদের বুকে স্বেচ্ছাসেবকের ব্যাচ পড়িয়ে দেয়। তারই মধ্যে শোনা যায় হুটারের শব্দ। ডি,এম সাহেবের গাড়ির পিছনে পিছনে মঞ্চের সামনে এসে থামে মন্ত্রীর কনভয়। ডি,এম সাহেব ফুলের তোড়া নিয়ে মন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে যান। নিরাপত্তারক্ষীরা মন্ত্রীর গেট খুলে দেন। সাদা পাজামা- পাঞ্জাবী পড়া মানুষটা যে মন্ত্রী তা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না অঞ্জলির ।কিন্তু মন্ত্রীর পিছন গাড়ি থেকে নামতে থাকা লোকটাকে দেখে চমকে যায় অঞ্জলি।

                    

       ( ক্রমশ )




        নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                   শীঘ্রই আসছে 

           ধারাবাহিক নাটক ----                                 

                                                               


                                    

                -----০----

   
       

No comments:

Post a Comment