( কিস্তি --- ৭৮ )
সে ঘরের দরজায় পা রাখতেই বেজে ওঠে আলাপনের ফোন।অঞ্জলি দেখতে পায় ফোনে কথা বলতে বলতেই আলাপনের মুখে ঘনিয়ে আসে দুশ্চিন্তার কালো ছায়া।ফোনটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, ডি,এম সাহেবের ফোন। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। ডি,এম সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অঞ্জলির চোখে-মুখেও দুঃশ্চিন্তার পাশাপাশি ফুটে ওঠে উদ্বেগের ছায়া। হাতের থালাটা টেবিলে নামিয়ে রাখে সে। ফুলশয্যা মাথায় ওঠে , কি করে সে আসন্ন পরিস্থিতির মোকাবিলা করবে তা ভেবে পায় না। অঞ্জলির মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে আলাপন।
অঞ্জলি বলে - কি হলো ?
আলাপনবাবু বলেন -- কি করবে ঠিক করলে কিছু ?
---- ঠিক করার তো কিছু নেই। যেতে তো হবেই। নাও আর বসে থাকলে হবে ? ধড়াচূড়া ছেড়ে তুমি দাদা -অরুণস্যরদের সব ডেকে তোল।
---- আমারও তাই মত। কিন্তু আজ তোমার ফুলশয্যা তাই বলতে সাহস পাচ্ছিলাম না।
---- আর তোমার ফুলশয্যা নয় ? তুমি যদি এতদিনের লালিত স্বপ্ন ত্যাগ করতে পারো তাহলে তোমার স্ত্রী হয়ে আমিই বা তা পারব না কেন গো ? না'ই বা হোল আমাদের ফুলশয্যা , তার বদলে যদি কারও কাজে লাগতে পারি তাহলে আজকের দিনটা সারাজীবন আমাদের কাছে স্মরনীয় হয়ে থাকবে।
--- না , আর আমার কোন সংশয় নেই। তোমাকে স্ত্রী হিসাবে পেয়ে আমি গর্বিত। বলে অঞ্জলিকে দৃঢ় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে কপাল , গাল আর ঠোঁটে একের পর এক চুম্বন একে চলে আলো। অঞ্জলিও তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন ফিরিয়ে দিয়ে বলে - আলো আমার আলো। এমনি করেই তুমি আমায় সারাজীবন ভালোবাসায় জড়িয়ে রেখো। এক তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ভিতরে ভিতরে পুড়তে থাকে অঞ্জলি। তার প্রতিটি লোমকুপে জ্বলে ওঠে কামনার দীপশিখা। বহু কষ্টে নিজেকে সংযত করে আলাপনকে তাড়া লাগায় -- এবার ছাড়ো , আমরা তো কেউ ফুরিয়ে যাচ্ছি না। আর দেরি করা ঠিক হবে না।
আলাপনও বহু কষ্টে নিজেকে সংযত করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তার মুখ দেখেই আলোর কষ্টটা উপলব্ধি করে অঞ্জলি। আপনা থেকেই তার চোখে দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা। ভগবান তার প্রতি এত নির্দয় কেন কে জানে ? আলাপনকে যতই প্রবোধ দিক না কেন , সে তো জানে আজকের দিনটা তো জীবনে আর আসবে না। মুহুর্তেই ওইসব ভাবনা মন থেকে মুছে ফেলতে হয় তাকে। ফুলশয্যার পোশাক ছেড়ে সালোয়ার কামিজ পড়ে ঘরের বাইরে আসে সে। বাইরের বারন্দায় তখন সবাই একে একে এসে জড়ো হচ্ছে।
তাকে ওই পোশাকে বেরিয়ে আসতে দেখে অবাক হয়ে যায় তারা। অঞ্জলি বুঝতে পারে আলাপন ব্যাপারটা এতক্ষণ কারও কাছে খোলসা করে নি। তাই সাবিত্রীদি এগিয়ে আসে তার দুহাত নাড়া দিয়ে বলে -- হ্যা রে , ব্যাপারটা কি বলতো ? ফুলশয্যা ফেলে তোদের নাকি এখনই বেরিয়ে পড়তে হবে ?
--- হ্যা দিদি , ডি,এম সাহেব ফোন করেছিলেন আমাদের গ্রামে নাকি কেউ একজন কুষ্ঠ রোগে মরে পড়ে আছে। সনাতন জেল থেকে ফিরে এসে আবার মোড়ল হয়ে বসেছে। সে'ই আবার নাকি সালিশি সভা ডেকে মৃতের পরিবারের জরিমানা করেছে। জরিমানার টাকা না পেলে তার মৃতদেহ সৎকার করতে দেবে না বলে গোঁ ধরে বসে আসে। পুলিশ গিয়েও কিছু করতে পারে নি। এদিকে রাত পোহালেই ওই গ্রামে সমম্বয় মঞ্চের উদ্বোধন করতে মন্ত্রী আসছেন। ততক্ষণ পর্যন্ত যদি মৃতদেহ পড়ে থাকে তাহলে জেলা প্রশাসনের মুখ পুড়বে।
---- তাই বলে ফুলশয্যা ফেলে তোদেরই ছুটতে হবে ?
---- কি করব দিদি , ডি,এম সাহেব যে বড়ো মুখ করে বললেন , তাই আমি আর না করতে পারি নি। তাছাড়া আমাদের কাজটাই যে এইরকম , ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে মানুষের চাহিদাকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হয়।
--- সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু তোর কথাও যদি ওরা না শোনে ?
---- সেক্ষেত্রে আমাকে প্রশাসনের সাহার্য্যে জোর করেই সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে । দাদা -- জামাইদা আর ভাইতো আছেই , প্রয়োজনে আমি আর আলোও হাত লাগাব।
সঙ্গে সঙ্গে অরুণস্যার, সুব্রতবাবু, সন্দীপ,অমলবাবুরা বলে ওঠেন , না না তোমাদের আজকের দিনে আর শ্মশানে যেতে হবে না , আমরাই সামলে দিতে পারব। সাবিত্রীদির দাদারাও বলেন, প্রয়োজনে আমরাও যেতে পারি। সাবিত্রীদি বলেন , আমিও যাব। শ্রাবণী -সঞ্চিতারাও একই কথা বলে ওঠে।
সে বলে , যেতে তো তোমাদের সবাইকে হবেই , কিন্তু আজ নয়।আজ সন্দীপ , অমলবাবু , আর স্যররা থাকলেই আমরা সামলে নিতে পারব।
সাবিত্রীদি বলেন , কি বলি বলতো ?
অঞ্জলি সাবিত্রীদিকে প্রনাম করে বলে, দিদি তুমি শুধু আর্শিবাদ করো আমি যেন জেলা প্রশাসনের মুখ রাখতে পারি। প্রথম লড়াইটা জিততে পারি।
সাবিত্রীদি তার মাথায় হাত রেখে বলেন , পারবি রে নিশ্চয় পারবি, এত বড়ো ত্যাগ এত বড়ো নিষ্ঠা কিছুতেই বিফলে যাবে না দেখিস।
সবার কাছে বিদায় নিয়ে অঞ্জলিরা গাড়িতে গিয়ে ওঠে। রাতের অন্ধকার চিঁড়ে শ্রীপল্লীর দিকে এগিয়ে চলে তাদের গাড়ি। সারা রাস্তা আলোর হাতটা জড়িয়ে বসে থাকে অঞ্জলি। কেউ কোন কথা বলতে পারে না। বিষয়টি নিয়ে অঞ্জলির মনের মধ্যে একধরণের দোলাচল শুরু হয়। ডি,এম সাহেবের কথা শোনার পরই বিষয়টা সে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নেয়।শেষরক্ষা করতে পারবে তো ? প্রথমে সে প্রশাসনিক জোর খাটাতে চায় না
। কুসংস্কারটার বিষয়ে গ্রামবাসীদের অবহিত করেই কাজটা সম্পূর্ন করতে চায় সে। তাতে প্রথমবারে যদি খুব কম সংখ্যক গ্রামবাসীকেও সে বোঝাতে পারে তাহলেই অনেকখানি কাজ হয়ে যাবে। কারণ তার ধারণা , সংখ্যাটা দিন দিন বাড়বে। ওইসব কথা ভাবতেই গাড়িটা যে কখন তাদের গ্রামে পৌঁছে গিয়েছে তা টের পায় নি সে।গাড়ি থামতেই টর্চ হাতে এগিয়ে আসে কয়েকজন পুলিশকর্মী। অঞ্জলি গাড়ি থেকে নামতে নামতে দেখতে পায় পুলিশকর্মীদের মধ্যে সেদিনের সেই অফিসারও রয়েছেন।
কিন্তু তার আচার - ব্যবহার পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। মনে হচ্ছিল যেন বিনয়ের অবতার। গাড়ির কাছে এসে টর্চের আলো দেখিয়ে সে বলে , আসুন ম্যাডাম একটু আগেই ডি,এম সাহেব ফোন করেছিলেন।উনিই আপনার আসার কথা বললেন। আমরা বুঝিয়ে সুঝিয়েও কিছু করতে পারলাম না। দেখুন আপনি যদি কি করতে পারেন। লোকটার কথাবার্তার ধরণে অবাক হয় অঞ্জলি। কয়েকদিন আগেই তাকে তুই-তোকারি করে কথা বলছিল। আর আজ একেবারে ম্যাডাম। আসলে ডি,এম সাহেবের ফোনের পরই পটপরিবর্তনটা হয়েছে। শুধু ওই লোকটাই নয় , এখন জগত সংসারের রীতিটাই হয়ে গিয়েছে ওই রকম। প্রভাব-প্রতিপত্তিহীনদের কোন সম্মানই নেই। কিন্তু হাজার ন্যক্কারজনক কাজে যুক্ত থাকলেও প্রভাবশালী লোকেরাই শিরোমনি হয়ে ওঠে। কিন্তু লোকটাকে তার মনের ভাব বুঝতে না দিয়ে সে বলে , হ্যা চলুন দেখি কি করা যায়।
১০ বছর পরে গ্রামে পা রাখল অঞ্জলি। রাতের অন্ধকারে সে বুঝতে পারে না সেদিনের সেই ফেলে যাওয়া গ্রামটি সেই রকমই আছে না বদলে গিয়েছে। কেবল টর্চের আলো লক্ষ্য করে যে বাড়িটার সামনে এসে তারা দাঁড়ায় এত বছর পরেও সে বাড়িটা যে মলিন্দকাকার তা চিনতে অসুবিধা হয় না তার। সে আর আলাপন প্রথমে ঘরের ভিতরে ঢোকে। ঘরে ঢুকতেই দেখে বিছানায় পড়ে কাতরাচ্ছে মলিন্দকাকা। আর মলিন্দকাকার মায়ের মৃতদেহ আঁকড়ে কেঁদে চলেছে কাকী।তার সঙ্গেই কথা বলে অঞ্জলি জানতে পারে দিনকয়েক আগে মাঠ থেকে ধানের বোঝা নিয়ে ফেরার সময় হোচট খেয়ে পড়ে গিয়ে পা ভেঙে বিনা চিকিৎসায় পড়ে রয়েছেন মলিন্দকাকা। আজ সকালে মারা গিয়েছে কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত মা।
সেটা জানার পর সৎকারের জন্য কেউ তো এগিয়ে আসেই নি, উল্টে দুপুরের মধ্যে সৎকারের সময়সীমা বেঁধে দেয় মোড়লসভা। কিন্তু মলিন্দকাকা ছাড়া বাড়িতে কেউ নেই। মলিন্দকাকার তো ওই অবস্থা , কে করবে সৎকার ? তাই নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করে দেয় মোড়লসভা। সে টাকা না দিলে মৃতদেহ সৎকারও করতে দেওয়া হবে না বলে তারা জানিয়ে দিয়েছে। অঞ্জলির মনে পড়ে যায় তার ঠাকুমায়ের কথা।
ঠাকুমারও কুষ্ঠে মৃত্যু হয়েছিল। বাবাকে একাই ঠাকুমায়ের গলায় দড়ি বেঁধে মরা কুকুরের মতো টানতে টানতে শ্মশানে নিয়ে যেতে হয়েছিল। তারা দু'বোন সেদিন মলিন্দকাকার কাছেই ছুটে এসেছিল। কিন্তু বাবার বন্ধু হয়েও মলিন্দকাকা সেদিন তাদের কথা কানেই তোলেন নি। উল্টে শিয়াল কুকুরে ঠাকুমার দেহ ছিঁড়ে খেয়েছিল বলে সালিশিসভায় বাবার জরিমানাতেও মদত যুগিয়েছিল। কথাটা মনে পড়তেই চোয়াল শক্ত হয়ে যায় অঞ্জলি।মনে মনে বলে , ঠিক হয়েছে। পরক্ষণেই ভাবে , এরকম ভাবাটা তার ঠিক হচ্ছে না। মনের মধ্যে রাগ পুষে রাখাটা উচিত নয়। এই মানুষগুলোর উন্নয়নের জন্যই এই গ্রামে তাকে গ্রামসেবিকার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তাই মন থেকে সব মুছে ফেলে সে বাইরে আসে। সেখানে তখন তাদের দেখে গুটিগুটি পায়ে গ্রামের অনেকেই এসে দাঁড়িয়েছে। তাকে দেখে সবাই চোখ কচলায়। ১০ বছর আগেকার সেই মেয়েটাই নাকি ? তাই বা কি করে হয় ? থানার বড়োবাবুও যে মেয়েটাকে ম্যাডাম বলছে।কেমন যেন ধন্দে পড়ে যায় লোকগুলো। সেটা লক্ষ্য করেই মুখ খোলে অঞ্জলি।
হাত জোড় করে নমস্কার করে সে বলে , আপনারা ঠিকই আন্দাজ করেছেন , আমিই এই গ্রামের মেয়ে অঞ্জলি।এই গ্রামে কাজ করার জন্য সরকার আমাকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। সেসব কথা পরে হবে, আজ যেটা বলছি সেটা মন দিয়ে শুনুন। অঞ্জলি একটু থামতেই সবাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করে দেয়। তাদের থামিয়ে সে ফের বলতে শুরু করে , সেদিনও আমি বলেছিললাম কুষ্ঠ কোন পাপ নয়, একটা রোগ মাত্র। যেকোন দিন যে কারও হতে পারে। সেদিন মলিন্দকাকাই আমার ঠাকুমার মৃত্যুর সময় এই কথাটাই বুঝতে চান নি। আজ হাড়ে হাড়ে বুঝছেন। আর আজ যারা বুঝতে চাইছেন না তাদের অবস্থাও আমার বাবা কিম্বা মলিন্দকাকার মতোই হতে পারে। এখন আপনারাই ঠিক করুন কি করবেন আপনারা ? মলিন্দকাকার মায়ের সৎকার আপনারা করবেন কি না ?
তার কথা শেষ হতে ফের গুঞ্জন ওঠে গ্রামবাসীদের মধ্যে। একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তার মধ্যে আড়াল থেকে কেউ কেউ বলে ওঠে -- তাহলে তো সালিশিসভা আমাদেরও জরিমানা করবে।
----- কাল থেকে আর এই গ্রামে সালিশি সভাই থাকবে কিনা ঠিক নেই। তবে আপনারা সৎকারে অংশ নাও নিতে পারেন। তাবলে ভাববেন না, সৎকার আটকে থাকবে।আমরা সবাই তৈরি হয়েই এসেছি। প্রয়োজনে পুলিশ -- প্রশাসনের সহায়তায় রাতের মধ্যেই আমরা সৎকারের ব্যবস্থা করব।অঞ্জলি লক্ষ্য করে সে দৃঢ়তার সঙ্গে সৎকার করার কথা বলার পরই উপস্থিত গ্রামবাসীদের মধ্যে সুক্ষ্ম একটা বিভাজন রেখা তৈরি হয়ে যায়। বিশেষ করে উঠতি বয়েসের ছেলেদের ভিতরে আলোড়ন দেখা দেয়। তাদের মধ্যে ৬/৭ জন ছেলে এগিয়ে এসে বলে -- আমরা সৎকার করতে রাজী। কিন্তু আমাদের জরিমানা করে যদি ?
অঞ্জলি অভয় দেয় -- কোন চিন্তা নেই, পুলিশ-- প্রশাসন, আমরা সবাই তোমাদের পাশে থাকব।
এতক্ষণ সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনছিল। সে থামতেই সবাই বলে ওঠে -- 'হ্যাটস অফ '।



No comments:
Post a Comment