লুপ্তপ্রায় খেলা -- ৯
ঘর দখল
দখলদারি শুধুমাত্র বিষয়সম্পত্তি কিম্বা রাজনৈতিক কুর্সিতেই নয় , রয়েছে খেলাধুলোতেও। তার প্রমাণ মেলে ' ঘর দখলের ' খেলায়। খেলার নামের মধ্যেই দখলের বিষয়টি স্পষ্ট। তবে এই দখলদারিতে মতানৈক্য থাকলেও হিংসার বর্হ্বিপ্রকাশ নেই। বরং এই দখলদারিতে উভয়পক্ষই খুঁজে পায় নির্মল আনন্দ। তাই একসময় ছেলেমেয়েদের অন্যতম প্রিয় খেলাই ছিল ' ঘর দখল।' চর্চার অভাবে ওই খেলাটিও হারিয়ে যাওয়ার দলে নাম লিখিয়েছে। ১৬ /২০ জন ছেলেমেয়ে একত্রে কিম্বা আলাদা আলাদা ভবেও ' ঘর দখল ' খেলা চলে। তবে সব সময় জোড় সংখ্যক খেলোয়াড় হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। কারণ খেলার জন্য সমসংখ্যক খেলোয়াড় নিয়ে দুটি দল গঠন করতে হয় ওই খেলায়।প্রথমে লাইন দাঁড়িয়ে ক্রমান্বয়ে ডাইনে - বাঁয়ে ভাগ করে অথবা প্রচলিত কোন পদ্ধতি অনুযায়ী দুটি দল গঠন করা হয়।দুটি দলই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একজনকে দলপতি নির্বাচন করে।কোন দল আগে দান নেবে তা ' টসের' মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
খেলার জন্য মাঠেজ দাগ দিয়ে ৩০/৩৫ ফুট দুরত্বের ব্যবধানে মুখোমুখি দুটি বেশ বড়ো আকারের আয়তাকার ঘর তৈরি করা হয়। ওই দুই ঘরে দুই দলের খেলোয়াড়রা আলাদা-আলাদা ভাবে অবস্থান করে। পরস্পরের কাছে বিপক্ষের ঘরটি শত্রু শিবির হিসাবে পরিগনিত হয়। নিজ নিজ শত্রুপক্ষের শিবির দখলই ওই খেলার মুল লক্ষ্য। নিয়ম অনুযায়ী , ওই খেলায় প্রতিটি খেলোয়াড়কে ছদ্মনাম ধারণ করতে হয়। আলোচনার মাধ্যমেই কোন পক্ষ কোন বিষয়ক নাম নেবে তা স্থির করে নেয়।
অর্থাৎ প্রথমপক্ষ ফুল বিষয়ক নাম নিলে দ্বিতীয় পক্ষ নেয় ফল বিষয়ক নাম , অথবা একপক্ষ পাখি বিষয়ক নাম নিলে অন্য পক্ষ পশু বিষয়ক নাম ধারণ করে। একই ভাবে নিজেদের পছন্দ সই অন্যান্য বিষয় নিয়েও ছদ্মনাম নেওয়া চলে।নাম ধারণের ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যমতে পৌঁছোতে না পারলে অর্থাৎ দুটি দলই একই বিষয়ক নামের দাবিদার হলে ' টসের ' মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।
নামের বিষয় নির্ধারণের পর দুই পক্ষের দলপতি নিজ নিজ দলের খেলোয়াড়দের কানে কানে তার নাম নির্বাচন করে জানিয়ে দেয়। অর্থাৎ যে দলের ভাগ্যে ফুল ছদ্মনাম বরাদ্দ হয়েছে সেই দলের দলপতি তার দলের খেলোয়াড়দের কানে কানে জানিয়ে দেয় জবা - বেলি-টগর - মাধবীলতা সহ বিভিন্ন ফুলের নাম। অন্যদিকে ফল ছদ্মনাম যাদের ভাগ্যে জোটে তাদের দলপতি তাদের খেলোয়াড়দের কানে কানে জানিয়ে দেয় আম - জাম - জাম- কাঁঠাল প্রভৃতি নাম।ছদ্মনাম বণ্টনের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ' টস ' জয়ী দলের দলপতি বিপক্ষ দলের ঘরে গিয়ে তাদের একজন খোলোয়াড়ের পিছনে দাঁড়িয়ে তার চোখ দু 'হাত দিয়ে চেপে ধরে।যাতে ওই খেলোয়াড় কিছু দেখতে না পায় তার জন্য ওইভাবে হাত চেপে ধরা হয়। প্রয়োজনে রুমাল বা গামছা দিয়েও চোখ বাঁধা চলে।
তারপর সেই দলপতি ছড়া আউড়ানোর সুরে ' আয়রে আমার টিয়া / যা রে টিপ দিয়া কিম্বা আয়রে আমার গরু / টিপ দিয়ে যা সরু ' বলে নিজের দলের খেলোয়াড়দের আহ্বান করে। সেই ডাক শোনার পর টিয়া কিম্বা গরু ছদ্মনামধারী খেলোয়াড় খুব সর্ন্তপনে পা টিপে টিপে এসে চোখ চেপে ধরে রাখা খেলোয়াড়টির কপালে আঙুলে করে টিপ দিয়ে একই ভাবে নিজের জায়গায় ফিরে যায়। সে ফিরে যাওয়ার পরই দলপতি ছড়ার সুরেই ' আমার দলের খেলুরা সব / ভাত খা গবাগব ' বলে উঠে। আর তাই শুনে টিপ দিয়ে যাওয়া দলের খেলোয়াড়রা সবাই মাটির উপরে কাল্পনিক থালা থেকে ভাতের গ্রাস তুলে গবাগব মুখে ঢোকানোর ভঙ্গি করে। তারপরই বিপক্ষদলের খেলোয়াড়ের চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে দলপতি ছড়া আউড়ানোর মতো করেই জিজ্ঞেস করে -- ' বলো দেখি বাছাধন / টিপ দিল কোন জন ?
তখন টিপ প্রদানকারীকে চিহ্নিত করার জন্য তাদের ঘরের সামনে যায় চোখ বাঁধা খেলোয়াড়টি। কিন্তু চিহ্নিতকরণ খুব সহজ ব্যাপার হয় না।
কারণ ততক্ষণে টিপ প্রদানকারী খেলোয়াড়টি দিব্যি ভালোমানুষের মতো বাকিদের সঙ্গে কাল্পনিক থালায় গবাগব ভাত খাচ্ছে।কিন্তু তাস্বত্ত্বেও আন্দাজে অথবা মুখের ভাবভঙ্গি দেখে চোখ বাঁধা খেলোয়ারটি যদি সঠিক ভাবে টিপদানকারীকে চিহ্নিত করতে পারে তাহলে সে নিজের ঘর থেকে শত্রুশিবির অর্থাৎ টিপদানকারী খেলোয়াড়দের ঘরের দিকে এক লাফ দেওয়ার সুযোগ লাভ করে।তখন ঘর ছেড়ে শত্রুশিবিরে পৌঁছোনোর জন্য সেখানেই তাকে প্রতীক্ষা করতে হয়। কিন্তু চিহ্নিতকরণ ভুল হলে টিপদানকারী খেলোয়াড় বিপক্ষদলের খেলোয়াড়দের ঘর অভিমুখে এক লাফ দেওয়ার সুযোগ পায় । এরপর বিপক্ষদলের দলপতিও তাদের শত্রু শিবিরের একজনের চোখ চেপে ধরে একই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে।
ওইভাবে বাকি খেলোয়াড়দেরও প্রথম রাউন্ড চোখ বাঁধা এবং টিপদান পর্ব সম্পূর্ণ হলে দ্বিতীয় রাউন্ড শুরু হয় । দ্বিতীয় বা তার পরবর্তী রাউন্ডগুলিতে ঘরে অবস্থানকারী খেলোয়াড়দের পাশাপাশি লাফ দিতে দিতে শত্রুশিবির অভিমুখে যাওয়া বিভিন্ন দুরত্বে ঘরের বাইরে অবস্থানকারী খেলোয়াড়দের চোখ বাঁধা এবং টিপদান চলে।ধারাবাহিক ওই প্রক্রিয়ায় যে দলের একজন খেলোয়াড় আগে শত্রুশিবিরে পৌঁছে যায় সেই দল ঘর দখলদার হিসাবে বিবেচিত হয়।অর্থাৎ জয়ী হয়। ফের নতুন প্রক্রিয়ায় খেলা শুরু হয়। তবে কোথাও কোথাও ওই প্রক্রিয়ায় সমস্ত খেলোয়াড় শত্রুশিবিরে পৌঁছোতে হয়।যে দলের সমস্ত খেলোয়াড় আগে শত্রুপক্ষের ঘরে পৌঁছোতে পারে তারাই জয়ী হয়। চর্চার অভাবে এই খেলাটিও হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা খেলাটির নাম জানে না বললেই চলে।




খুব সুন্দর দাদা ,শৈশব কে হাতের মুঠোয়
ReplyDeleteখুব সুন্দর দাদা ,শৈশব কে হাতের মুঠোয়
ReplyDeleteধন্যবাদ ভাই
ReplyDelete