Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

লুপ্তপ্রায় খেলা --- ৮


                                                              


   
     ( শুরু হল হারিয়ে যাওয়া বা হারিয়ে যেতে বসা বিভিন্ন খেলা নিয়ে ধারাবাহিক লেখা )
                       
                            

                    লুপ্তপ্রায় খেলা -- ৮ 


                                                        
   
                ( ছবি -- সোমনাথ মুস্তাফি )          

                       হেলু দেওয়া 




বছর চল্লিশেক আগেও গ্রীস্মের দুপুরে গ্রামাঞ্চলের মায়েদের একটা কাজ বেড়ে যেত।ছেলেমেয়েদের  গ্রীস্মের স্কুল ছুটির সময় হলে তো কথাই নেই। কাজটা আরও বেড়ে যেত। তখন দুপুর গড়িয়ে গেলেও পুকুর ঘাটে স্নানে করতে যাওয়া ছেলেমেয়েদের বাড়ি ফেরার নাম গন্ধ থাকত না। অগত্যা ছেলেমেয়েদের খোঁজে মায়েদেরই পৌঁচ্ছোতে হত পুকুর ঘাটে। পুকুর পাড় থেকে মা সমানে চিৎকার করে যেতেন , খুঁকি এবার উঠে আয়। ভালো হবে না বলছি। বাবার ফেরার সময় হয়ে এসেছে। এরপর কান ধরে হিড়-হিড় করে টেনে নিয়ে যাবে তখন ভালো হবে তো ? খোঁকা - খুঁকু  তখনও সমানে পুকুর দাপাচ্ছে আর মাঝে মধ্যেই ' হেলু - হেলু ' বলে চিৎকার করে উঠছে। মায়ের সাবধান বানী তাদের কানেই পৌঁছোয় না। আসলে তখন তারা মেতে উঠেছে ' হেলু দেওয়া ' খেলায়। তাই তারা শাসন-  বারণের তোয়াক্কাই করে না। 

                              
                          লুকোচুরি খেলার সঙ্গে মিল রয়েছে ' হেলু দেওয়া ' খেলার । মূল পার্থক্য যা রয়েছে তা হল , লুকোচুরি খেলা হয় ডাঙ্গায় আর হেলু দেওয়া খেলা চলে নদী-পুকুর কিম্বা কোন  জলাশয়ে।গ্রীষ্মের দিনে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে প্যান্ট-জামা খুলে পাড়ে রেখে বহু ছেলেমেয়ে পুকুরে নেমে ওই খেলায় মেতে উঠত। আবার ছুটির দিনে দল বেঁধে স্নান করতে গিয়ে বাগানে বাগানে  আম- জাম খাওয়ার পরও মেতে উঠত ওই খেলায়। তাদের দাপাদাপিতে পুকুরের জল ঘোলাটে থেকে ঘোলাটেতর হয়ে উঠত। তাই কখনও পুকুর মালিক আবার কখনও বা অভিভাবকদের বকুনি খেয়ে অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও চোখ লাল করে হাঁচতে হাঁচতে বাড়ি ফিরত ছেলেমেয়ের দল।


                                       লুকোচুরির মতোই ১০/১২ জন ছেলেমেয়ে একত্রে বা আলাদা - আলাদা ভাবে ওই খেলায় অংশ নিতে পারে। এক্ষেত্রেও পছন্দ সই গণনার মাধ্যমে একজনের ' মোর ' নির্ধারণ করা হয়।খেলার নিয়মানুযায়ী , 'মোরধারীকে ' পুকুর , নদী বা জলাশয়ের মাঝামাঝি জায়গায় দু'হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।বাকি খেলোয়াররা তার হাতে একে একে চাপড় মেরে ' হেলু ' বলে চিৎকার করে সাঁতার বা ডুবসাঁতার দিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।'মোরধারীকে' তাদের ছোঁওয়ার জন্য সাঁতার বা ডুবসাঁতার দিয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করতে হয়। ওই সময় বাকি খোলোয়াড়রা ' মোরধারীকে ' উত্যক্ত করার জন্য চুপিসারে ডুবসাঁতার দিয়ে তার পা ধরে টেনে  দিয়ে কিম্বা ছুঁয়ে দিয়ে দুরে চলে যায়।কিন্তু তা করতে গিয়ে চরম সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।কারণ ' মোরধারী ' তার মাথায় হাত দিয়ে 'তেলু ' চিৎকার করে উঠতে পারলেই বিপদ ঘনিয়ে আসে।তখন তার ' মোর ' দশা শুরু হয়।

                            
                                      তবে কোথাও কোথাও আর একটি নিয়মও প্রচলিত রয়েছে। সেক্ষেত্রে 'মোরধারী ' কারও মাথা ছুঁয়ে চিৎকার করে উঠলেই সেই খেলোয়াড়কে সঙ্গে সঙ্গে জলে ডুবে থাকতে হয়। আর 'মোরধারীকে' তার মাথায় হাত রেখে আন্দাজে সেই খেলোয়াড়ে নাম বলতে হয়। আন্দাজ সঠিক হলে তবেই ' মোর ' ঘোঁচে তার।কিন্তু আন্দাজ ভুল হলে সেই খেলোয়াড় ' মরা ' হিসাবে চিহ্নিত হলেও ' মোরধারীর ' 'মোর ' দশা কাটে না। একে একে অন্যান্য  খেলোয়াড় ওই ভাবে ' মরার ' পর তবেই নিস্কৃতি মেলে তার। তখন নতুন ভাবে খেলা শুরু হয়।কিন্তু সেটাও খুব সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। কারণ ওইভাবে ' মরা ' খেলোয়াড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার যেমন সম্ভাবনা রয়েছে তেমনই ' মরা ' খেলোয়াড়দের প্রাণ ফিরে পাওয়ারও নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। ওই নিয়ম অনুসারে , ছোঁওয়া পর মাথায় হাত দিয়ে আন্দাজে খেলোয়াড়ের নাম বলার জন্য এক থেকে  একশ পর্যন্ত গণনার সময় কাল নির্ধারিত রয়েছে। সেই সময়ের মধ্যে অন্য কোন খেলোয়াড় যদি সর্ন্তপনে নিজে ছোঁওয়া বাঁচিয়ে পিছন থেকে 'মোরধারীর' পিঠে বা মাথায় চাপড় মেরে ' ধাপপা ' বলে চিৎকার করে উঠতে পারে তাহলেই জলে  ডুবে বসে থাকা খেলোয়াড়টিকে ছেড়ে ' মোরধারীকে 'খেলায় সামিল হতে হয়। প্রতিটি  সফল 'ধাপপা'র জন্য একজন করে ' মরা ' খেলোয়াড় প্রাণ ফিরে পেয়ে খেলায় সামিল হওয়ার সুযোগ পায়।কিন্তু ধাপা দিতে আসা খেলোয়ারটির মাথা যদি  'মোরধারী ' ছুঁয়ে দিয়ে ' তেলু ' বলে চিৎকার করে উঠতে পারে তাহলে সেই খেলোয়াড়ের 'মোর' কেউ আটকাতে পারে না।কারণ তখন তাকে আর আন্দাজে চেনার সমস্যা থাকে না । ' ধাপপা ' দিতে আসার সময় তাকে তো চোখে দেখাই হয়ে যায় ' মোরধারীর '। তাই তার নাম বলতেও সমস্যা হয় না  'মোরধারীর ' ।                
     

                                 একসময় ওই খেলার মাধ্যমেই ছেলেমেয়েরা সাঁতার কাটা শিখে যেত । সেই কারণে ওই খেলার জন্য অভিভাবকদের কাছে থেকে প্রচ্ছন্ন প্রশয়ও মিলত। ছেলেমেয়েরা যাতে জলে তলিয়ে না যায় তা লক্ষ্য রাখার জন্য মাঝে মধ্যে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অভিভাবকদেরও ওই খেলায় সামিল হতে দেখা যেত। সেই সময় লেখাপড়ার পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের সাইকেল চালানো এবং সাঁতার শেখানোটাও একটা রেওয়াজ ছিল।কারণ সে সময় ঘন ঘন বন্যা হত। বন্যার সময় নিরাপদ স্থানে পৌঁছানো  তো বটেই ,  সেতু অভাবে কাঁদর , ছোটখাটো নদী সাঁতরেই পার হতে হত।তাই সাঁতার জানাটা সে সময়  জীবনের জন্য জরুরী বিবেচিত হত।এখন সেই প্রয়োজন অনেকটাই ফুরিয়েছে। তাই আর ছোটদের ওই খেলায় উৎসাহ দিতে দেখা যায় না অভিভাবকদের। এই খেলাটিও তাই আর দেখা যায় না।   

                                             

        (  চলবে )


         নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



    





                      --------০--------
                                      

                                          

No comments:

Post a Comment