Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৬৯






        অন্তরালে 



                  অর্ঘ্য ঘোষ 




      ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 




বেশ কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতার পর বিচারক সরকারি আইনজীবির দিকে চেয়ে বলেন ---- এরপর এই মামলা চালিয়ে যাওয়ার আর কোন যৌক্তিকতা আছে বলে আমার মনে হয় না। আপনার কি মত ? 
---- মি: লর্ড, আমারও তাই মনে হয়।
---- তাহলে এই আদালত ময়ূখবাবুকে স্বসম্মানে মুক্তি দিচ্ছে। আর মিথ্যা অভিযোগ করে পুলিশকে অযথা হয়রানি এবং আদালতকে বিভ্রান্ত করার কারণে অভিযোগকারিণীকে গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা রজু করার নির্দেশ দিচ্ছে এই  আদালত।
এই আশঙ্কাটাই করছিল আর্য। সে সৌগতর দিকে চেয়ে থাকে। সৌগতর মধ্যে কেমন একটা দোনামোনা ভাব লক্ষ্য করে। সৌগত অবশ্য খুব দ্রুত সেটা কাটিয়ে উঠে দাঁড়ায়। বিচারকের দিকে তাকিয়ে বলে -- মি: লর্ড, আমার একটা আর্জি ছিল। যদি অনুমতি দেন তাহলে সেটা উপস্থাপন করতে পারি।
বিচারক প্রথমে সৌগতর দিকে কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। তারপর বলেন , ঠিক আছে অনুমতি দেওয়া হল।
অনুমতি পাওয়ার পর সৌগত ভারিক্কী গলায় বলতে শুরু করে -- মি: লর্ড , আমরা জানি  কখনও কখনও আত্মরক্ষার্থে খুনে অভিযুক্তও আদালতের মার্জনা লাভ করে। আমি মনে করি পেটের ভাতের সংস্থান রক্ষা আত্মরক্ষারই সামিল। কারণ পেটে ভাত না থাকলে কেউই বেশিদিন বাঁচতে পারে না। তাই পেটের ভাতের নিশ্চয়তার জন্য চাপে পড়ে মিথ্যা অভিযোগকারিণীও ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য। সর্বোপরি বিবেকের দংশনে তার সত্যটা প্রকাশ্যে আনার বিষয়টিও সহানুভূতির সঙ্গে  বিবেচ্য। তিনি যদি এটা না করতেন তাহলে হয়তো  ধরাছোঁওয়ার বাইরেই থেকে যেতেন। তাকে শাস্তি ভোগ করতে হত না। তাই এই আদালতের কাছে আমার আবেদন অভিযোগকারিনীকে বেকসুর খালাস দিয়ে যারা তার মতো বিধবার অসহয়তার সুযোগ নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করাতে বাধ্য করেছে তাদের চরম শাস্তি দেওয়া হোক। এর বাইরে আর আমার কিছু বলার নেই মি:লর্ড। 
সওয়াল শেষ হতেই সৌগতর দিকে সবাই সপ্রশংস দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। তার যুক্তির মানবিক দিকটি আকৃষ্ট করে সবাইকে। নাড়া দেয় বিচারককেও। তাই তিনি আরতিকে খালাস দিয়ে তার হলফনামার ভিত্তিতে প্রসাদ মোড়ল আর ভবানী ডাক্তারকে জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেফতার করে মামলা রজুর নির্দেশ দেন। সেই রায় শোনার পর আর্যর বুকের ভিতর জমে থাকা কার্বন ডাই অক্সাইডটা বেরিয়ে যায়। বুক ভরে শ্বাস নেয় সে। তারপরতারা আদালত কক্ষের বাইরে আসে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পর আরতি আর ময়ূখ ছাড়া পায়। বাইরে বেরিয়ে আনন্দে ময়ূখের চোখ জলে ভিজে যায়। সে কৃতজ্ঞতায় আর্যর দু'হাত জড়িয়ে ধরে বলে , আপনার জন্যই মুক্তি পেলাম। এই ঋণ আমি সারাজীবন ভুলব না।
আর্য বলে , না -- না এতে ঋণের কিছু নেই। যা করেছি তা মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই করেছি। তাছাড়া আমি একাও কিছু করি নি। আমরা সবাই মিলে সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলাম।




                              সবার সঙ্গে ময়ূখের পরিচয় করিয়ে দেয় আর্য। ময়ূখ তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েরকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আরতি আবেগে আল্পুত হয়ে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সেই সময় সকালের সেই সাংবাদিক দু'জন এগিয়ে আসে। তারা ওসি'কে জিজ্ঞেস করে -- কেসে কি 
হলো দাদা ? 
-- কি আর হবে ? কেসটাই ডিসমিস হয়ে গেল। 
--- বলেন কি ! এত বড়ো একটা কেস ডিসমিস হয়ে গেল ? 
--- কি করা যাবে ? অভিযোগকারিনীই যে  হলফনামা দিয়ে জানিয়ে দিল অন্যের প্ররোচনায় মিথ্যা অভিযোগ করতে বাধ্য হয়েছে।
--- অঃ। 
--- খুব হতাশ হলেন না ? আপনারদের পরিভাষায় তো এইসব খবরের কোন নিউজ ভ্যালু নেই।
--- ঠিক বলেছেন। বলেই সাংবাদিক দু'জন যেন পালিয়ে বাঁচে।
সৌগত এবং ময়ূখ তাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। সেটা লক্ষ্য করে ওসি বলেন , আর্যবাবুরা অন্তরালে নামে যে কাগজে কাজ করতেন ওনারা সেই কাগজের রিপোর্টার।
--- কাজ করতেন মানে ? 
--- মানেটা হল ডাক্তারবাবুর খবরটা করবেন না বলে আর্যবাবুরা কাল কাজে ইস্তফা দিয়ে নিজেরা 'দায়বদ্ধ' নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই কাগজ ওদের খবরটা করার জন্য পাঠিয়েছিল। কিন্তু খবর বেলাইন হয়ে গিয়েছে শুনে ওরা রণে ভঙ্গ দিলেন।
ওসির কথা শুনে কেউই কিছুক্ষণ কথা বলতে পারেন না। সৌগতই একসময় আর্যর পিঠ চাপড়ে বলে , সাবাস। এই চ্যালেঞ্জ তোকেই মানায়। তুইই পারিস। এগিয়ে চল , আমার শুভ  কামনা সব সময় তোর সঙ্গে থাকবে।
ময়ূখ বলে , আমি ভাবতে পারছি না অন্যের সম্মান রক্ষার্থে আজকের দিনে কেউ চাকরি ছাড়তে পারে।  আপনাদের কাছে আমার ঋণ আরও বেড়ে গেল।
কথা বলতে বলতে সৌগতর কাছে বিদায় নিয়ে সবাই পুলিশের জীপে ওঠে। মনোহরপুরের অভিমুখে ছুটে চলে জিপ।জিপ গ্রামে ঢুকতেই ঘিরে ধরেন গ্রামের মানুষ।ডাক্তারবাবুকে দেখে স্বস্তি ফেরে তাদের মনে। সবাই আশংকা করেছিলেন আবার বুঝি হাসপাতালের হাল আগের মতো হয়ে যাবে।  তারই মাঝে আক্ষেপও ঝড়ে পড়ে অনেকের গলায় -- প্রিয়র সময়েও যদি এমনটা হত।কেউ কেউ আবার আরতিকে গাড়িতে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা বলে , ওই মেয়েটা এখানে কেন ? ওকে জেলে পুরে দেওয়া উচিত ছিল। ওর জন্য একটা পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল।ওসি তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। গাড়ি ছেড়ে সরে যেতে বলেন। জনতা সেই কথা কানে তোলে না। তারাও গাড়ি ঘিরে আসতে থাকে। তাই গাড়ির গতি কমে যায়। ময়ূখ জনতাকে হাত নেড়ে অভিননন্দন জানায়। জনতাও  হাত নাড়তে থাকে।  হাসপাতালের মোড়ে ময়ূখ আর আরতিকে নামিয়ে দিয়ে জিপটা থানায় ফিরে যায়। 




                      
                                                তারপরই নাটকীয় ঘটনা ঘটে যায়। আরতিকে কব্জা করে নিয়ে যাওয়ার জন্য তখন ওষুধের দোকানে ঘাপটি মেরে বসেছিল প্রসাদ মোড়ল আর ভবানী ডাক্তার। আরতি পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে বাড়ি অভিমুখে পা বাড়াতেই প্রসাদ মোড়ল আর ভবানী ডাক্তার তার পিছু নেয়। কিছুদুর গিয়েই ভবানী ডাক্তার খপ করে তার হাত ধরে বলে , যাচ্ছিস কোথাই ? অসুখ হয়েছে বলে বেশ তো পুলিশের জিপে হাওয়া খেয়ে এলি। এখন থেকে তোর কোথাও থাকা চলবে না। আজ থেকে তোকে আমাদের বাড়িতে থাকতে হবে।
---- না , আমি আর তোমাদের বাড়িতে থাকব না।
--- থাকব না বললেই হল ? এতদিন খাওয়ালাম পড়ালাম, এখন পাখা গজিয়েছে না ? চল হারামজাদী, খানকি মাগী।  
ভবানী ডাক্তার তার হাত ধরে টানতে থাকে। তার সঙ্গে যোগ দেয় প্রসাদ মোড়লও। তাদের হাত থেকে বাঁচতে আরতি চিৎকার করে ওঠে --- ওগো তোমরা আমাকে শয়তান দুটোর হাত থেকে বাঁচাও।
তার চিৎকার শুনে জনতা বিষ্মিত হয়ে তাকায়। তারপর ওদের মনিব - ঝিয়ের ঝামেলা ভেবে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু চিৎকারটা বাড়তেই থাকে। অগ্যতা একে একে সেখানে পৌঁচ্ছোয় জনতা। আরতি তাদের উদ্দেশ্যে বলে , তোমরা আমাকে যা শাস্তি দেবে দাও। শুধু এই শয়তান দুটোর হাত থেকে বাঁচাও। ওদের চাপেই আমি দেবতুল্য মানুষ দু'টোকে  ফাঁসাতে বাধ্য হয়েছি।
আরতির ওই কথা শুনে মেজাজ হারিয়ে ফেলে প্রসাদ মোড়লরা। তার মুখ বন্ধ করার জন্য  চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করে। আর তখনই বাঁধটা ভেঙে যায়। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আছড়ে পড়ে প্রসাদ মোড়লদের উপর। এতদিন প্রসাদ মোড়লরাই একচেটিয়া মানুষকে মেরে এসেছে। আজ সেই মার ফিরিয়ে দেয় জনতা। শুরু হয়ে যায় গণপ্রহার। মারের চোটে তাদের চোখ মুখ ফুলে ওঠে। খবর পেয়ে পুলিশ তাদের উদ্ধার করতে ছুটে আসে। ততক্ষণে উন্মত্ত হয়ে পড়েছে জনতা। তারা পুলিশকে ঘিরে ধরে প্রসাদ মোড়লদের গ্রেফতারের দাবি জানাতে থাকে। থামে না গণপ্রহারও। উত্তেজিত  জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হিমসিম খেতে হয় পুলিশকে।  ওসি হাত জোড় করে বলেন -- প্লিজ আপনারা শান্ত হোন। আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। তাহলে নিজেরাও আইনী জটিলতায় জড়িয়ে পড়বেন। আরতির হলফনামার ভিত্তিতে আদালতের নির্দেশে এমনিতেই আজ ওদের গ্রেফতার করা হত। আপনাদের দাবি মেনে এখনই দু'জনকে গ্রেফতার করা হল।ওসি'র কথা শেষ হতেই প্রবল হাততালিতে ফেটে পড়ে জনতা। কিন্তু প্রসাদ মোড়লদের জিপে তোলার উপক্রম করতেই পুলিশের গতিরোধ করে দাঁড়ায় তারা। জিপে নয় , ওদের কোমরে দড়ি পড়িয়ে থানা পর্যন্ত হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার দাবি তোলে তারা। প্রবল জনরোষের চাপে সেই দাবিও মেনে নিতে হয় পুলিশকে।তাদের যখন হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন সামনে এসে দাঁড়ায় প্রিয়। কিছুক্ষণ প্রসাদ মোড়লদের অবাক চোখে চেয়ে থাকে সে। তারপর বিড়বিড় করতে করতে চলে যায়। এই প্রথম তার মুখ থেকে দাগ লাগার কথা শোনা যায় না। দাগি লোকেদের গায়ে দাগ লেগেছে বলেই বোধহয় আর দাগের কথা বলে না সে।



            (  ক্রমশ ) 





     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                       ----০---









No comments:

Post a Comment