অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
আরতি , বড়বাবুর সঙ্গে আর্য আর সোমনাথকে দেখে চমকে যায় তারা। বেশ কিছুক্ষণ দু'জনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে , কেউ কোন কথা বলতে পারে না।ওষুধের দোকানে ফিরে ভবানী ডাক্তারকে ঝাঁঝিয়ে ওঠে প্রসাদ মোড়ল --- মনে করেছিলাম তোমার বুদ্ধিসুদ্ধি আছে। কিন্তু এখন দেখছি তুমি একটি মহা মাথা মোটা।
---- কেন ?
---- কেন বুঝতে পারছ না ? মেয়েটাকে কোথায় নিজের কব্জায় রাখবে তা নয় , এখন ও যদি সব উগড়ে দেয় তাহলে দেখ কি হয়।
---- আপনিও তো মেয়েটাকে আটকে রাখার কথা কিছু বলেন নি।
---- ওঃ সব বুঝি তোমাকে বলে দিতে হবে ? প্ল্যানটা ভাঁজার সময় কই তখন তো কিছু বলে দিতে হয় নি। বুঝবে মজা , আমার কি ? আমি বলব কিছু জানি না।
--- জানি না বললেই পুলিশ ছেড়ে দেবে আপনাকে ? ফাঁসলে কেউ বাদ যাব না। বিপদের সময় নিজেদের মধ্যে মাথা গরম না করে কি করা যায় ভাবুন।
---- এখন আর কি করা যাবে ? মেয়েটা না ফেরা পর্যন্ত তো আর কিছু করার নেই। তার মধ্যেই যদি সব উগড়ে দেয় তাহলেই হলো।
---- সেটা করবে বলে মনে হয় না। কারণ তাহলে তো আর আমার বাড়িতে কাজ থাকবে না। তখন খাবেটা কি ?
---- তুমি সেই ভরসাতেই থাকো। তুমি কি ওর মুখ দেখে বসে বসে খাওয়াও ? ও খাটে খায়। শুধু কি তাই? আরও কি কর তা তো কারও জানতে বাকি নেই। সেটা অন্য কোথাও করলে ও তোমার বাড়ির চেয়ে ভালো থাকবে।
---- দেখুন আমার কাছা ধরে টানাটানি করবেন না। আমিও কিন্তু কাছা খুলতে জানি। আপনারা রাজনৈতিক নেতারা কে কেমন তা আর আমার জানতে বাকি নেই।
বিধবাভাতার টাকা পাইয়ে দেব বলে আরতিকেই আপনি কি বলেছেন তা সে আমাকে বলে নি ভাবছেন ?
--- এই দেখ তুমিও নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু করে দিলে। বাদ দাও ওইসব কথা। মাগীটা যদি সব কথা উগড়ে দেয় তাহলে তো দুজনের শ্রীঘর বাস অনিবার্য। তাহলে কি করে পরিত্রাণ পাবে ভাবো।
---- কিন্তু সব উগড়ে দিলে ও নিজেও তো পার পাবে না।
---- হ্যা , সেটার জন্যই আমরা বাঁচলেও বাঁচতে পারি।
--- তাছাড়া এমনও তো হতে পারে পুলিশ জবানবন্দী দেওয়ার জন্য ওকে কোর্টে নিয়ে গিয়েছে। আর কালকে কোন কারণে খবরটা হয়নি বলে সেটা আজ করার জন্য সাংবাদিকরা পুলিশের গাড়িতেই কোর্টে যাচ্ছে।
---- সেটা হলে তো ভালোই হয়। তবু কোন ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। মেয়েটা ফিরলেই কব্জা করতে হবে। দেখো কব্জা করতে আর যেন ভুল না হয়। মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওকে তোমার বাড়িতেই আটকে রাখতে হবে। বেগোরবাই করলে প্রয়োজনে পাচার করে দিতে হবে। তাতে উটকো কিছু টাকাও পাওয়া যাবে।
---- খেপেছেন , আর ভুল হয় ? একবার কোর্ট থেকে ফিরলে হয় , খপ ধরে সোজা বাড়ি নিয়ে গিয়ে তুলব। পাচারের প্ল্যানটাও কিন্তু আপনি জব্বর ফেঁদেছেন। এক ঢিলে -- দুই , না-না তিন পাখি মারা হয়ে যাবে।
---- তিন পাখি মানে ?
---- মানেটা বুঝলেন না ? মাগীটাকে বিদেয় করতে পারলে কিছু টাকা আর নিজেরা শ্রীঘর বাসের ভয় থেকে যেমন উদ্ধার পাব , তেমন নতুন একটা ডবকা ছুঁড়িকে কাজে লাগাতে পারব। ও মাগী তো এখন ছিবড়ে হয়ে গিয়েছে।
--- ওঃ তুমি পারো বটে। কেমন সময় কেমন ভাবনা। আমি মরছি টেনশনে। আর তুমি ভাবছো ডবকা ছু্ঁড়ির কথা। এই ব্যাপারে পার্টিও পাশে দাঁড়াবে বলে মনে হয় না।
টেনশনে সেদিন আর দু'জনের বাড়ি যাওয়া হয় না। ওষুধের দোকানেই আরতির ফেরার প্রতীক্ষা করে তারা। আরতিকে নিয়ে পুলিশের জিপটা যখন কোর্ট চত্বরে পৌঁছোয় তখন লকআপ থেকে সবে আদালত কক্ষের খাঁচায় ঢোকানো হয়ছে ময়ূখকে। ওসি গাড়ি থেকে নেমে আর্যকে জিজ্ঞেস করেন - আপনার চেনাশোনা কোন উকিল আছেন ?
--- হ্যা , কেন বলুন তো ?
--- আমি ওই মহিলাকে নিয়ে সরকারি আইনজীবির কাছে হলফনামা দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। আপনি বরং ততক্ষণে কোন আইনজীবিকে দিয়ে ডাক্তারবাবুর জামিনের আর্জি জানানোর ব্যবস্থা করুন। হলফনামা দাখিলের পর এমনিতেই মামলা খারিজ হয়ে যাওয়ার কথা। তবু রীতি মেনে জামিনের আর্জি জানানোটাই বাঞ্ছনীয়। বিশেষত হলফনামা দাখিলের পর আরতিকে আদালত তার হেফাজতে নিয়ে ভিন্ন মামলা রুজু করার নির্দেশ দিতে পারে। সেক্ষেত্রে তার জামিনের জন্যও আর্জি জানাতে হবে।
--- বেশ আমি এদিকটা দেখছি বলে সৌগতর খোঁজে বার লাইব্রেরিতে যায় আর্য। সৌগত সান্যাল তার ছোটবেলার বন্ধু। ক্রিমিন্যাল ল'ইয়ার হিসাবে বারে তার নাম রয়েছে। নিয়মিত ফোনে দু'জনের কথা হয়।
সৌগত তাকে আদালতের অনেক খবর দেয়। সেইসব খবর অন্যান্য সাংবাদিকরা পায় না। আর্যও তার চেনাশোনা কেউ আইনী জটিলতায় জড়িয়ে পড়লে তাদের সৌগতর কাছে পাঠিয়ে দেয়। বার লাইব্রেরীতে বসে সৌগত তখন একটা বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিল। আর্য আস্তে আস্তে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখতেই সৌগত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখে উচ্ছস্বিত হয়ে পড়ে। উঠে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে -- আরে আয় আয়। চল ক্যান্টিনে বসে চা খেতে খেতে কথা হবে। তারপর সোমনাথের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।আর্য সোমনাথের পরিচয় দিয়ে বলে -- চা পরে হবে। আগে তোর চেম্বারে চল। কিছু কথা আছে।
---- জরুরি কিছু ?
--- হ্যা , খুব জরুরি।
--- বেশ চল।
আদালতের গায়েই সৌগতর চেম্বার। সেখানে বসে সব কথা সৌগতকে খুলে বলে আর্য। শোনার পরই জুনিয়ারকে ওকালতনামায় ময়ূখ আর আরতির সই করিয়ে নিয়ে সব কাগজপত্র রেডি করে দ্রুত আদালতে জমা করে দিতে বলে সৌগত। ততক্ষণে হলফনামা জমা দিয়ে আর্যর খোঁজে বার লাইব্রেরিতে এসে পড়েছেন ওসি। সৌগতর চেম্বার থেকে বের হতেই তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় ওসির। আর্য তার সঙ্গে সৌগতর পরিচয় করিয়ে দেয়। তারপর তারা ক্যান্টিনে গিয়ে বসে। চা খেতে খেতে আর্য বলে -- হ্যা রে সৌগত আমরা বড়ো আশা নিয়ে এসেছি। ওদের দু'জনকে নিয়ে যেতে পারব তো ? শয়তান দুটোকে জেলে ঢোকাতে পারবি তো ?
---- দেখ এভাবে আগে থেকে কিছু বলা যায় না। সবটাই আইনী প্রক্রিয়া। প্রণববাবু বিষয়টি ভাল বুঝবেন। তবে মহিলার হলফনামা দাখিলের পর তার অভিযোগের আর কোন সারবত্তা থাকে না। তাই মামলা খারিজ হয়ে যাওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে ডাক্তারবাবুরও স্বসম্মানে মুক্তি পাওয়া উচিত। কিন্তু মিথ্যা অভিযোগ করার জন্য মহিলার জেল হওয়াটাই দস্তুর। তবে সবটাই বিচারকের মর্জির উপর নির্ভর করছে। বিচারক মনে করলে মহিলাকে স্বাক্ষী এবং মুল ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে ওই দু'জনকে গ্রেফতার করে মামলা রজু করার নির্দেশও দিতে পারে।
সৌগতর কথা শেষ হয় না। তার হাত দুটো ধরে আর্য বলে, ভাই যে করেই হোক তোকে সেই ব্যবস্থাই করে দিতে হবে।
--- এই দেখ তুই সেই ছেলেমানুষীই থেকে গেলি । আই স্যাল ট্রাই মাই বেষ্ট। চল, আদালতের সময় হয়ে এল ওদিকে যায় দেখি।
আদালতের দিকে এগিয়ে যেতেই দু'জন যুবক এসে ওসিকে নমস্কার জানিয়ে নিজেদের সাংবাদিক হিসাবে পরিচয় দেয়। ছেলে দুটির মধ্যে একজনকে আর্য চেনে। বিভিন্ন কাগজে ফ্রিলান্স করে। ছেলেটি কিন্তু তাকে চিনেও না চেনার ভান করে। তাই সেও আর আগ্রহ দেখায় না। ওসিই তাদের কোন মিডিয়ার লোক জানতে চান। যুবক দুটি নিজেদের 'দৈনিক অন্তরালে ' পত্রিকার সাংবাদিক এবং চিত্র সাংবাদিক হিসাবে পরিচয় দেয়। সেটা শুনে অবাক হয়ে সৌগত আর্যর দিকে তাকায়। এতদিন ওই পরিচয়টা ছিল তার। এক রাতেই তার এতদিনের পরিচয়টা হারিয়ে গেল। বুকের ভিতর কেমন যেন একটা যন্ত্রণা টের পায় আর্য। মনটাও বিষন্ন হয়ে পড়ে। সে ইশারায় সৌগতকে পরে জানাচ্ছি বলে একটু সরে আসে। সেখান থেকেই শুনতে পায় ওসি ছেলেদুটোকে বলছেন ---- কিন্তু ওই কাগজে তো অন্য দু'জন কাজ করতেন বলে শুনেছি।
এবারে সাংবাদিক ছেলেটি একবার আর্যর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে নেয়। তারপর বলে , হ্যা তাদেরকে অফিস বরখাস্ত করে আজ থেকে আমাদের কাজ শুরু করতে বলেছেন। সেইজন্যই ওই খরবটার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আপনার কাছে এসেছি।
---- কোন খবরটা ? ওহো ডাক্তারবাবুর খবরটা তো ? কিন্তু সেই খবরটার বিষয়ে এখনই তো কিছু বলতে পারব না। ডাক্তারবাবুকে আজ কোর্টে তোলা হচ্ছে। শেষপর্যন্ত কি হচ্ছে , না হচ্ছে দেখে কিছু বলা যাবে না।
---- আমরা তাহলে কোর্ট বন্ধ হওয়ার আগে আসছি।
---- হ্যা, তাই আসুন। বলে ওসি তাদের বিদায় দিয়ে সরকারি আইনজীবির চেম্বারে যান। আর আর্যরা আদালত কক্ষে গিয়ে বসে। যথাসময়ে শুরু হয়ে যায় আদালতের কাজ। একটি মামলার পরেই ময়ূখের মামলার জন্য হাঁক পাড়েন আদালত কর্মী। সেই সময় বিচারকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পেসকারের হাতে আরতির হলফনামাটা জমা দেন সরকারি আইনজীবি। সেটা চোখ বোলাতে বোলাতেই ভ্রু কুঁচকে ওঠে বিচারপতির। হলফনামা পড়া শেষ হতেই গম্ভীর গলায় বিচারপতি সরকারি আইনজীবিকে জিজ্ঞাসা করেন --- অভিযোগকারিনী কি আদালতে হাজির আছেন ?
--- আছেন মি : লর্ড।
---- তাহলে ওনাকে কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াতে বলুন।
সরকারি আইনজীবির ইশারায় আরতি কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ায়। গীতা ছুঁইয়ে পেসকার তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান। তারপর বিচারক তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন --- শ্লীলতাহানির অভিযোগ আর হলফনামা দুইই আপনার ?
---- হ্যা হজুর দু'টিই আমার।
----কারও চাপে কিম্বা কোন প্রলোভনে পড়ে এমনটা করছেন না তো ? আপনি জানেন একবার অভিযোগ করার পর হলফনামা দিয়ে তা প্রত্যাহার করার জন্য আপনার শাস্তি হতে পারে ?
---- হ্যা হজুর। যে বাড়িতে ঝিগিরি করে আমার পেট চলত সেই বাড়ির কর্তা ভবানী ডাক্তারের চাপে আমাকে অভিযোগ করতে হয়েছিল। নাহলে সে আমাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবে বলেছিল।
তাই পেটের দায়ে আমি মিথ্যা অভিযোগ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। কিন্তু হলফনামা আমি বিবেকের তাড়নায় দিয়েছি। তাতে আমার যা শাস্তি হবে আমি মাথা পেতে নেব।
আরতির কথা শেষ হতেই আদালতে মৃদু গুঞ্জন ওঠে। বিচারক ' অর্ডার - অর্ডার ' বলে টেবিলে হাতুড়ি ঠুকতেই নিস্তব্ধ হয়ে যায় আদালত কক্ষ। সবাই রুদ্ধশ্বাসে বিচারকের দিকে চেয়ে থাকেন।



No comments:
Post a Comment