অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
সকালে উঠে মনোহরপুর যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করেতেই সামনে এসে দাঁড়ায় চৈতী। মেয়ের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় আর্য। আর তাতেই বাচ্চাদের মতো অভিমান ঝড়ে পড়ে মেয়ের গলায় -- তুমি আজও বেরোচ্ছ ?
--- কেন মা আজ কি ?
--- বাঃ তোমার মনে নেই ? সেদিন বললাম না আজ আমাদের কলেজের বাৎসরিক অনুষ্ঠান। আমার নাচের প্রোগাম আছে।
---- ওহো মামনি একেবারে ভুলে গ্যাছি।
---- তা তো যাবেই। আমার বন্ধুরা ঠিকই বলে।
---- কি বলে তোমার বন্ধুরা ?
---- সে আর তোমার শুনে লাভ নেই।
--- আহা বলোই না শুনি ?
--- বলে তোর বাবা তো শুনি বড়ো সাংবাদিক , কই কোনদিন তো তোর প্রোগ্রামের ছবি ছাপতে দেখি নি কাগজে ?
---- তোমার বন্ধুরা ঠিক বলে না। আমি এমন কিছু বড়ো সাংবাদিক নই। আর নিজের মেয়ের প্রোগাম আমার কাগজে ছাপাটা কি ভালো দেখায় ? অনেকটা নিজের ঢাক নিজে পেটানোর মতো ব্যাপারের মতো মনে হয় না ? আমার মেয়ের ছবি তো অন্য কাগজে ছাপবে , তাই না ?
---- কিন্তু অন্য কাগজের রিপোর্টাররা তো কেউ যায় না।
---- ঠিক আছে আজ যাতে কেউ যায় তা দেখব।
---- তুমি কাউকে বলে দিও যেন।
----- বেশ মামনি তাই হবে। বলে মাথায় হাত বুলিয়ে একটু আদর করে দিতেই মেয়ে চলে যায় নিজের ঘরে। আর্য মনে মনে বলে , মা রে তোর বাবার সাংবাদিকতার চাকরিটা আর নেই। ইচ্ছে করলেই তোর প্রোগ্রামের খবরটা করার ক্ষমতাও আর তার নেই। মনটা খুব বিষন্ন হয়ে যায় তার। চৈতীটা কতবার তাদের কলেজের খবর ছাপার জন্য বলেছে। কিন্তু দোটানায় পড়ে সেই খবর আর ছাপা হয় নি তার। খবরে মেয়ের নাম না দিলে তার অভিমান হবে , আবার দিলে পক্ষপাতিত্ব হতে পারে ভেবে নানা অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে গিয়েছে। অন্য কোন সংবাদ মাধ্যমকে বলতেও পারে নি। কারণ তারাও খবরে মেয়ের নামটাই রাখত। সেক্ষেত্রেও সবাই বলাবলি করত , দেখছ বাবা সাংবাদিক বলেই কেমন মেয়ের নাম ছাপা হয়েছে। কিন্তু আজ সে সকালে মেয়েকে কথা দিয়েছে। সেই কথা তাকে রাখতেই হবে।
আজ তো আর তার সেই বাধ্যবাধকতা নেই। সে তো আজ আর সাংবাদিক নয়। সেই ভেবেই ফোনে ধরে রানাকে। রানা একই সঙ্গে 'অবলোকন ' নামে একটা দৈনিক আর ' প্রতি মুহুর্ত ' নামে একটি সংবাদ চ্যানেলে কাজ করে। তার খুব অনুগত। তাই তাকে বলে , ভাই আজ লোকপাড়া কলেজে একটা অনুষ্ঠান আছে। আমাকে যেতে বলেছিল। কিন্তু আমাকে বিশেষ কাজে বেরিয়ে যেতে হচ্ছে। পরে সব বলব। তুমি ভাই অনুষ্ঠানটা কভার করতে গেলে আমার মুখ থাকে। একবার যাবে ভাই ?
--- কি বলছেন দাদা , আপনি বললে আমি নরকেও খবর তুলতে যেতে পারি।
---- বেশ ভাই। নিশ্চিন্ত হলাম।
ফোন রাখতেই দেখে চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে বৈশাখী। কাপটা নিতে গিয়ে স্ত্রীর চোখে মুখে যেন আর্দ্রতার আভাষ পায় আর্য। পাওয়াটাই স্বাভাবিক। কথা ছিল দু'জনেই মেয়ের প্রোগাম দেখতে কলেজে যাবে। সেই মতো স্কুলে ছুটি নিয়ে রেখেছিল সে। কিন্তু তাকে চলে যেতে হচ্ছে। তাই বৈশাখীর মুখ ভার হওয়াটাই স্বাভাবিক। শুধু তো এবারই নয় , এর আগেও বহুবার একসঙ্গে যাওয়ার পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছে। বৈশাখী হয়তো সেজেগুজে তৈরি হয়ে বসে আছে , সে রেডি হয়ে বেরলোই হয়। এমন সময় ফোনে কোন খবর এসে পৌঁছেছে। অমনি তাকে ঘটনাস্থলে ছুটে যেতে হয়েছে।আর বৈশাখীকে হয় তখন মেয়েকে নিয়ে একাই যেতে হয়েছে। নয়তো অনেক যত্নে পড়া পোশাক আশাক খুলে রাখতে হয়েছে। শুধু বৈশাখীই নয় , একই কারণে যারা নিমন্ত্রণ করেন তারাও তাকে অসামাজিক মনে করেন। অনেকে তো বলেই দেন , তোমারও মেয়ে আছে। তার বিয়েতে আমরাও যাব না কিন্তু। বৈশাখীর কথাতে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়ে যায়। বৈশাখী বলে, আজও মনোহরপুর যেতে হচ্ছে , কোন খবর আছে বুঝি ?
---- হ্যা , গো জব্বর খবর। এসে সব বলব।
চা খেতে খেতে কথা গুলো বলে সোমনাথকে নিয়ে মনোহরপুরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে আর্য। ফিরে এসে তার চাকরি ছাড়ার খবরটা বলতে হবে বৈশাখীকে। এক হিসাবে জব্বর খবরই বটে।মনোহরপুরের হাসপাতাল মোড়ে ঢুকতেই খবরের কাগজ বিক্রির স্টলটাতে চোখ চলে যায় আর্যর। স্টলে তখনও স্তুপাকার হয়ে পড়ে রয়েছে কাগজ। এত কাগজ নামিয়েছে আজ এজেন্ট ? তাহলে কি কোনভাবে খবরটা বেরিয়েছে কাগজগুলোতে ? কৌতুহলবশেই সোমনাথকে নিয়ে সে স্টলের সামনে যায়।
তাকে দেখেই হাহুতাশ ঝড়ে পড়ে এজেন্টের গলায় -- এত বড়ো খবরটা আপনারা কেউ করলেন না ? আমি তো বাঁশ খেয়ে গেলাম। আগের বার সবাইকে কাগজ দিতে পারিনি বলে এবার অর্ডার দিয়ে ডবল কাগজ বাড়িয়েছিলাম। কিন্তু কোন কাগজই খবরটা করে নি। এখন আমি কি করব এত কাগজ ? অফিস তো অর্ডার দেওয়া অতিরিক্ত কাগজ অবিক্রীত বললে মানবেও না।
--- ফোন করুন অফিসে।
--- করছি তো। তারা বলছে না জেনে অর্ডার বাড়িয়েছেন কেন ? আমাদের করার কিছু নেই।
---- তাহলে আর আমরাই বা কি করতে পারি বলুন ?
সেখান থেকে থানা অভিমুখে রওনা দেয় তারা।যাওয়ার পথেই দেখতে পায় ওষুধের দোকানে ডাঁই করে রাখা খবরের কাগজের মাঝে মুখচুন করে ভবানীডাক্তার আর প্রসাদ মোড়ল বসে রয়েছে। তার মানে ডাক্তারবাবুর খবরটা বেরোবে বলে ওরাও কাগজ কিনেছিল। তাদের চোখে চোখ পড়তে প্রসাদ মোড়ল কি যেন বলার চেষ্টা করে। সেটা লক্ষ্য করেই সোমনাথ ' আচ্ছা হয়েছে। ব্যাটারা এবার কাগজগুলো ভেজে ভেজে খা' বলেই মোটরবাইক হাঁকিয়ে দেয়। থানায় পৌঁছে ওসির হাতে ভিডিও ক্লিপিংসটা তুলে দেয় আর্য। সেটা দেখার পর ওসি বলেন -- আরে করছেন কি মশাই ? আমার কাজ তো দেখছি আপনারই করে ফেলেছেন। মহিলা কোর্টে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলে দিলেই তো কেস ডিসমিস হয়ে যাবে।
--- কিন্তু একটা কথা ছিল প্রণববাবু।
---- কি কথা ?
---- আরতির যাতে লঘু পাপে গুরুদণ্ড না হয়ে যায় সেটা আপনাকে দেখতে হবে। আসলে পরিস্থিতির বিপাকে পড়েই সে কাজটা করতে বাধ্য হয়েছে। আর এই ঘটনার পর থেকে ও ঠিক করেছে ভবানী ডাক্তারের বাড়িতে কাজ করবে না। কাজটা অবশ্য এমনিতেই তো আর থাকত না। তাই ওর যদি একটা কাজের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে খুব ভালো হয়। আপনাদের থানা ব্যারাকে তো অনেক কাজ থাকে। দেখুন না ওর জন্য যদি একটা কিছু কাজের ব্যবস্থা করা যায়।
--- আর্যবাবু প্রথম দেখাতেই আপনাকে আমার অন্যরকম লেগেছিল। আজ সেটা মিলে গেল। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট মানুষজনের জন্য এ রকম মানবিক ভাবনা সবার থাকে না। সবাই যদি এ রকম করে ভাবতে পারত তাহলে পৃথিবীটাই অন্যরকম হয়ে যেত। তারপর আজ কাগজ দেখলাম , ঘটনাস্থলে এসেও খবরটা আপনি করেন নি। এ'ও আপনার মানবিক ভাবনারই বর্হ্বিপ্রকাশ। মেয়েটির জন্য চিন্তা করবেন না। শীঘ্রই আমি ফ্যামিলি নিয়ে আসছি।ও চাইলে আমার কোয়ার্টারেই কাজ করতে পারে।
ওসি থামতেই সোমনাথ বলে , স্যার দাদা খবর করতে গিয়ে বহু দুঃস্থ মানুষকে সাহায্য করে আসেন। তাদের কাছে বছরের পর বছর নিয়মিত দাদার সাহায্য পৌঁছে যায়। তার থেকেও বড়ো ব্যাপার কি জানেন ? খবরটা আটকাতে দাদা চাকরি থেকে ইস্তফা পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছেন।
এবারে মুখ খোলে আর্য। সে বলে -- আর কথাটা যে বলছে সে 'ও বুঝি ইস্তফা দেয় নি ?
দু'জনের কথা শুনে বিষ্ময় ঝড়ে পড়ে ও,সি'র গলায় --বলেন কি মশাই ? এই বাজারে একটা সেন্টিমেন্টের জন্য ওই রকম একটা লিডিং কাগজের চাকরি কেউ ছাড়ে ? তা এরপর কি করবেন কিছু ঠিক করেছেন ?
---- চূড়ান্ত কিছু হয় নি , ভাবছি দু'জনে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করব।
---- গুড আইডিয়া। স্বাধীন ভাবে কাজ করা যাবে। তবে সাপ্তাহিক চালানো তো খুব দুষ্কর। কখনও কোন সাহায্যের দরকার হলে নির্দ্ধিধায় আমাকে বলতে পারেন।
আমি সব সময় আপনাদের পাশে আছি। বেশ সেসব কথা পরে হবে। আপাতত ওই মহিলাকে নিয়ে এখনই কোর্টে যেতে হবে। ডাক্তারবাবুকে তো পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেখি যদি ওকেও আজকেই কোর্টে তোলা যায় , তাহলে ডাক্তারবাবু ছাড়া পেলেও পেয়ে যেতে পারেন।
---- সেটা হলে খুব ভাল হয়। নাহলে হয়তো আর খবরটা আটকানো যাবে না। আদালত সংবাদদাতা করে দিতে পারেন খবরটা। তাহলে ডাক্তারবাবু , তার বাবা-মা খুব আঘাত পাবেন।
--- ঠিক আছে আপনারা থানায় বসুন। আমি দেখি কি করা যায়।
জিপ নিয়ে বেড়িয়ে যান ও,সি। নিজেদের ওষুধের দোকানে তখনও খবরের কাগজের স্তুপের মাঝে বসে প্রসাদ মোড়ল আর ভবানী ডাক্তার হাহুতাশ করছিল।তাদের সামনে দিয়েই আরতিকে নিয়ে থানার দিকে ফেরে পুলিশের জীপ। আরতিকে পুলিশের জিপে দেখ ভ্রু কুঁচকে যায় প্রসাদ মোড়লের। ভবানী ডাক্তারের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করে --- কি ব্যাপার মাগীটা আজ তোমার বাড়ি যায় নি ?
---- না , বাগালটাকে দিয়ে ডাকতে পাঠিয়েছিলাম। তা বলছে অন্য কাজের লোক দেখতে। ওর নাকি শরীর খারাপ। আর কাজ করতে পারবে না।
--- আরে তুমি তো মহা আহম্মক। এতক্ষণ বলবে তো কথাটা। আরে ও'ই আমাদের তুরুপের তাস। ওকে হাত ছাড়া করলে চলে ? কোথা থেকে কি হয়ে যাবে কে বলতে পারে ? শেষে আমাদের বাঁশ না আমাদেরই পিছনে এসে ঢোকে !
---- সে আশঙ্কায় আমারও হয়েছিল। কিন্তু এতক্ষণ তো কাগজ নিয়েই ল্যাজেগোবরে হয়েছিলাম। তাই কথাটা আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।
---- সত্যি , ডাক্তারের খবরটা বেরোবে বলে গাদা-গুচ্ছের কাগজ কেনা হলো। অথচ সাংবাদিক ব্যাটা আসা স্বত্ত্বেও খবরটা বেরোলোই না। এখন কাগজগুলো ঠোঙাওয়ালাদের ওজন দরে বিক্রি করতে হবে।
--- বেরবো কি করে সাংবাদিক ব্যাটা যে ওদেরই পেয়ারের লোক।
--- সে তো আমি আগে থেকেই জানি। তাই তো সরাসরি ওদের অফিসে ফোন করেছিলাম। কিন্তু অফিস যে ও ব্যাটাকেই পাঠাবে তা কে জানত ? আজকে খবরটা করার জন্য ফোন করে অন্য কাউকে পাঠাতে বলতে হবে।
--- ও ব্যাটারা খরব করে নি। কিন্তু কানাঘুষোয় শুনছি ব্যাটারা নাকি কাল আরতির বাড়ি গিয়েছিল। তারপর থেকেই আরতি বেসুরো গাইতে শুরু করেছে।
---- বলছ কি ? এইসব সাংবাদিকদের কিচ্ছুটি বিশ্বাস নেই। এরা উল্টো কেদেতে ঘাস কাটতেও পারে। চলো চলো , যে করেই হোক আরতিকে আমাদের কব্জা করতেই হবে। নাহলে সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে।
উর্ধশ্বাসে থানার দিকে মোটরবাইক হাঁকায় তারা। থানার গেটে তাদের মোটর বাইক পৌঁছোতেই পুলিশের জিপটা ধোঁওয়া ছেড়ে দ্রুত গতিতে বেরিয়ে যায়। জিপের দিকে চোখ পড়তেই হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় দু'জনের।
( ক্রমশ )



No comments:
Post a Comment