অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
তার চোখে মুখে একটা প্রশান্তির ভাব ফুটে উঠতে দেখা যায়। শুধু প্রিয়রই নয় , মনোহরপুরের প্রায় সমস্ত মানুষই সেদিন মহা খুশী। অনেকদিন পর মাচানতলা আবার আগের মতো জমজমাট হয়ে ওঠে। প্রিয়র বাড়ির যাওয়ার পথে সেখানে দাঁড়াতেই সবাই ঘিরে ধরে আর্যকে। ঋজু ,রাজুরা বলে , আসুন দাদা আসুন।আর্যর খুব অস্বস্তিতে লাগে।একদিন এদের সঙ্গে তার কত নৈকট্য ছিল। কিন্তু প্রিয়র খবরটার পর থেকে যেন অনেক দুরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছে। এ গ্রামের মানুষের অবশ্য আন্তরিকতার অভাব নেই। কিন্তু সে দুরত্বটা অতিক্রম করতে পারে নি।সেটা কাটিয়ে উঠতেই সে বলে, বেশ কর চা।
মাচানে বসে সে আর সোমনাথ। সেদিন সবার মুখে শুধু প্রসাদ মোড়ল আর ভবানী ডাক্তারের গ্রেফতারের কথা।তাদের কথাবার্তা থেকেই বোঝা যায় এই দিনটার জন্যই যেন সবাই অপেক্ষা করছিলেন। এটা করতে পেরে আর্যর অপরাধ বোধ কিছুটা হালকা হয়। গ্রামের মানুষের মনেও সে ফের কিছুটা আস্থা অর্জন করতে পারে। সেটা ঋজুদের কথা থেকেই বুঝতে পারে। ঋজুরা বলে , আপনি না লাগলে তো প্রসাদ মোড়লদের টিকিও কেউ ছুঁতে পারত না।ডাক্তারবাবুকেও বিনা দোষে জেল খাটতে হত। চাকরিটাও চলে যেত। তখন আমাদের হাসপাতালটা আবার ডাক্তারহীন হয়ে পড়ত। আমাদের এতদিনে আন্দোলন বৃথা হয়ে যেত। দাদা , প্রিয়র চাকরিটা আর ফেরানো যায় না ?
---- সম্ভাবনা খুব কম। তবে তার আগে ওর মানসিক সুস্থতা ফেরানো দরকার। সেই ব্যাপারেই কথা বলতে যাচ্ছিলাম ওদের বাড়ি।
---- খুব ভালো কথা দাদা। আপনি লাগলেই হয়ে যাবে।
এ গ্রামের মানুষ যে এখনও তার উপরে এতখানি ভরসা করে তা ভাবতে পারে নি আর্য। তাই সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে , যে কোন মুল্যে এই ভরসার মর্যাদা তাকে রাখতেই হবে। প্রিয়কে মুলস্রোতে ফেরাতেই হবে। তাই সে বলে , আমার হাতে তো সব কিছু নেই। তবু আমি সাধ্য মতো চেষ্টা করব।
---- সেটা হলেই হবে। আপনার অসাধ্য কিছু নেই। তদ্বির - তদারকির কেউ নেই বলে প্রাপ্য টাকা পয়সাও তো পায় নি। চাকরি যদি নাই ফেরে প্রাপ্য টাকা পয়সাগুলোও যদি পায় তাহলে পরিবারটা বাঁচে।
ছেলেটা তো বেকার , মেয়েটারও বিয়ে বাকি। বিয়ে তো একরকম ঠিক হয়েছিল। ওই ঘটনার জেরে ছেলের বাবা আর বিয়েতে রাজী হন নি। আর্য জানে বিষয়টি। ছেলের বাবার সঙ্গে একদিন কথা বলতে যাবে বলে ঠিক করেও রেখেছে। ভেঙে যাওয়া সমন্ধটা জোড়া লাগানোর চেষ্টা সে করবে। সেই কথাটা ঋজুদেরও বলে। শুনে ঋজুরা বলে, তাহলে দাদা কাজের কাজ হয়।আচ্ছা দাদা কাল শয়তানগুলোর ছবি সহ খবরটা বড় করে পাব তো ? এবার আমরাও জেরক্স করে দেওয়ালে দেওয়ালে লাগাব।
কথাটা শুনে খুব অস্বস্তিতে পড়ে যায় আর্য। চট করে কোন জবাব দিতে পারে না। বলতে পারে না তার আর খবর করার ক্ষমতা নেই। তাই আমতা আমতা করে বলে -- দেখি কতদুর কি করা যায়।
---- দোহাই দাদা দেখি বলবেন না। আপনি তো প্রথম থেকেই দেখছেন ওরা আমাদের সঙ্গে কি রকম শয়তানি করছে। এবার যখন সুযোগ এসেছে তখন ওর মুখোশটা খুলে দিন।
ওদের মুখোশটা খুলে দিতে আর্যরও হাতটা নিশপিশ করছে। কিন্তু তার হাতটা যে চাপা পড়ে গিয়েছে। অন্য সংবাদ মাধ্যমও তো খবরটা পাবে না। পেলেও যে গুরুত্ব পাবে তার কোন মানে নেই। শয়তান দুটোর এতবড়ো অন্যায়ের কথা কেউ জানতে পারবে না ? কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারে না আর্য। কিন্তু কি'ই বা করতে পারে সে ? একমাত্র যদি সাপ্তাহিকটা বের করতে পারে , তাহলে নিজের ইচ্ছে মতো খবরটা করা যায়। কিন্তু এক রাতের মধ্যে সেটাই বা কি করে সম্ভব ?
সেই কথা ভাবতে ভাবতে ঋজুদের সঙ্গে নিয়েই প্রিয়র বাড়ি পৌঁছোয় সে। প্রিয় তখন স্বাভাবিকতা হারিয়ে আবার অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় ফিরে গিয়ছে। বাড়িতে পা দিয়েই আর্য শুনতে পায় প্রিয় বিড়বিড় করে সমানে কি যেন বলে চলছে। আর মালা তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সাস্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। সেই সময় আর্যকে দেখে মেজাজ হারিয়ে ফেলে মালা। রীতিমতো ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে --- এতদিন পর আমরা কেমন সুখে আছি দেখতে এসেছেন ?
দেখুন , আমরা কেমন সুখে আছি দেখুন। ওই দেখুন আমার বাবার অবস্থা, ওই দেখুন আমার মা দেওয়ালে ছবি হয়ে ঝুলছে। সব - সব আপনাদের জন্য হয়েছে। পারবেন আমার মাকে ফিরিয়ে দিতে ? পারবেন আমার বাবার সুস্থতা ফিরিয়ে দিতে ? সেই সুখের দিন , হারিয়ে ফেলা সেই সামাজিক সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে আপনাদের ? ক্ষমতা আছে প্রকৃত শয়তানদের মুখোশ খুলে দিতে ?
একটানা কথাগুলো বলে হাঁফিয়ে ওঠে মালা। আর্য কোন প্রত্যুত্তর করতে পারে না। শঙ্খ এসে তাকে থামায়। বোনকে বলে , কাকে কি বলছিস তুই ?
তারপর সে হাত জোড় করে আর্যর সামনে দাঁড়ায়। বিব্রত গলায় সে বলে , প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আমাদের অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছেন। একের পর এক মানসিক আঘাতে ও এইরকম হয়ে গিয়েছে। আপনি আমাদের পিতৃতুল্য , বোনের আচরণের জন্য আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন।
শঙ্খকে বুকে জড়িয়ে ধরে আর্য বলে , তোমরাও আমার সন্তানসম। তোমার বোনের মতোই আমারও একটি মেয়ে আছে। সেও আমাকে মাঝেমধ্যে এমন করেই বকাঝকা দেয়। তার কথাতেও যেমন আমি কিছু মনে করি না , তেমনি মালা মায়ের কথাতেও কিছু মনে করি নি। তাছাড়া মা আমার যা বলেছে তা তো অন্যায় কিছু বলে নি। তাই ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। আমিই বরং তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি। তারপর মালাকে উদ্দেশ্য করে বলে --
কি রে মা , এই বাবাটাকে পারবি না ক্ষমা করতে ?
আর্যর কথা শুনে বরফ গলতে শুরু করে। মালা কাছে এসে নম্র হয়ে বলে --- কেমন বাবা আপনি ? বাবা কি কখনও মেয়ের কাছে ক্ষমা চায় ? আমিই রাগের মাথায় আপনাকে উল্টোপাল্টা বলে ফেলেছি , তাই আমাকে ক্ষমা করুন।
--- বাবা-মায়ের কাছেও মেয়েকে ক্ষমা চাইতে হয় বুঝি ? মেয়ের বকা খেতে সব বাবারই ভালো লাগে। মাঝে মধ্যে এই রকম করে বকবি কিন্তু।
---- আপনি না --।
---- বেশ তাহলে ভাব।
আর্য বাচ্চাদের নিজের বুড়ো আঙুলটা বাড়িয়ে ধরে। আর সেটা দেখেই শব্দ করে হেসে ওঠে মালা। তারপর আর্যর বুড়ো আঙুলে নিজের বুড়ো আঙুলটা ছুঁইয়ে দিয়ে বলে --- ভাব, ভাব, ভাব।
মুহুর্তের মধ্যেই পরিবেশটা বদলে যায়। ছন্নছাড়া পরিবারটা যেন ছন্দে ফেরে। আর্য শঙ্খকে বলে, বাবার চাকরি এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র সব ঠিক করে রাখবে। কাল বাবাকে নিয়ে তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। চিকিৎসার পাশাপাশি বকেয়া আর চাকরিটা ফেরানো যায় কিনা দেখতে হবে। আজ আমরা আসছি।
বলে তারা ফেরার উপক্রম করতেই মালা বলে, উহু , শুধু মেয়ের বকা খেয়ে চলে গেলেই হবে না। মেয়ের হাতে কিছু খেয়ে না যাওয়া হবে না।
---- সে আর একদিন হবে রে মা। আজ আমাকে আটকাস না। নাহলে যে শয়তানের মুখোশটা আর খোলা হবে না।
সেই কথা শুনে আর বাধা দেয় না মালা। মনে মনে শয়তানদের মুখোশ খোলার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাড়ি অভিমুখে রওনা দেয় তারা। রাতারাতি পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয় আর্য। সোমনাথকে সেই কথা বলতেই , দাদা তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে ? কোথাও কিছু নেই , আর বলছ কাল সকালের মধ্যে চারপাতার কাগজ বের করবে।
--- তোমার আজও বাড়ি যাওয়া চলবে না।
--- সে না হয় আমি বাড়ি গেলাম না। কিন্তু দুজনে কি পারব দাদা ? প্রেসে কথা বলার ব্যাপার আছে। সব সামলাবে কি করে ?
---- পারতেই হবে সোমনাথ। মেয়েটাকে আমি কথা দিয়ে এসেছি। আচ্ছা তোমার ছবিগুলো সব তোলা আছে তো ?
---- হ্যা দাদা। কাজে লাগুক না লাগুক। ছবি আমি সব তুলে রাখি।
--- ব্যস , তাহলে তো অনেক কাজ এগিয়ে যাবে। যতটা পারি সংবাদ দেব। বাকিটা ছবি দিয়ে ভরিয়ে দিতে হবে।
--- তাহলে হতে পারে।
তারপর ইকবালকে ফোনে ধরে আর্য।ইকবালের প্রেস আছে।প্রেস করার সময় ব্যাংকের লোনের ব্যাপারে তাকে সাহায্য করেছিল সে। সেই থেকে তাকে খুব মান্য করে ইকবাল।অনেকটা ইকবালের ভরসাতেই সে চ্যালেঞ্জটা নেয়। ফোনেও সে ইকবালকে বলে --- তোমার ভরসাতেই একটা চ্যালঞ্জ নিয়ে ফেলেছি ভাই। তোমাকে উদ্ধার করতেই হবে।
---- উদ্ধার কি বলছেন দাদা। আপনার দয়ায় করে খাচ্ছি। আপনি হুকুম করুন , জান লড়িয়ে দেব।
তারপর আর্যর কথা শুনে বলে --- কোই বাত নেহি দাদা, দুটো ল্যাপটপ নিয়ে আমরা এক্ষুনি আপনার বাড়ি রওনা দিচ্ছি। আপনারা কপি দিতে পারলে ভোরের মধ্য কাগজ পেয়ে যাবেন।
ইকবালের কথা শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সে। তারপরই ফোন করে সুশোভন ডাক্তারকে। বলে , ডাক্তারবাবু যত কাজই থাকুক ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে প্রিয়কে নিয়ে পাঁচাশো শব্দের একটা লেখা নিয়ে আমার বাড়ি চলে আসুন। বাকি কথা সাক্ষাতে হবে। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা শেষ করে একে একে চন্দন, অভিষেক আর সুখেনকেও ফোন করে বিষয়টি জানায়। সুখেনরা বিভিন্ন কাগজে ফ্রি-লান্সিং করে। তার কথা শুনে তারা তো এক পায়ে খাড়া। তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসতে বলে। সব দেখেশুনে সোমনাথ বলে , দাদা তুমি পারো বটে।
আর্য মৃদু হাসে , কোন প্রত্যুত্তর করে না। সে মনে মনে ছক সাজাতে শুরু করে। তারই মধ্যে বাড়ি পৌঁছোয় তারা। বাবার মোটরবাইকের শব্দ পেয়ে ছুটে আসে চৈতী।
( ক্রমশ )



No comments:
Post a Comment