অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
সে আজ খুশীতে ডগমগ। উচ্ছ্বসিত গলায় বলে , জানো বাবা আজ আমাদের প্রোগাম টিভিতে দেখিয়েছে। আমাকে অনেকক্ষণ দেখিয়েছে। অনেকে দেখে ফোন করেছিল।
---- ইস আমারই দেখা হোল না।
---- কাল নাকি কাগজেও দেবে।
---- তাই ? তুমি খুশী তো মামনি ?
--- খুশী--খুশী, খুব খুশী। বাবা 'ইউ আর দ্য গ্রেট'। বলেই বাবার গালে একটা চুমু খেয়ে নিজের পড়ার ঘরে চলে যায় চৈতী। কলেজে পড়লেও মেয়েটা যেন সেই ছোট্টটিই রয়ে গিয়েছে। তাদের বড়ো আদরের ধন ওই মেয়ে।ওই মেয়েই একদিন যখন পরের ঘরে চলে যাবে তখন কি করে যে সেই বিচ্ছেদ ব্যাথা তারা সইবে তা ভেবে পায় না আর্য।সোমনাথকে বসার ঘরে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসতেই সামনে আসে বৈশাখী। তাকেও খুশী খুশী দেখায়।
আর্য দেখে এই সুযোগেই তার পরিকল্পনার কথাটা বলে ফেলতে হবে বৈশাখীকে। সেই উদ্দেশ্যেই সে বলে , আর তোমাকে মন খারাপ করতে হবে না। এবার আমার অখণ্ড অবসর। সব জায়গায় এবার থেকে দু'টিতেই যেতে পারব।
--- কি ব্যাপার , এ যে দেখি ভূতের মুখে রাম নাম। ব্যাপারটা কি খোলসা কর দেখি ?
স্ত্রীর সঙ্গে মজা করার ইচ্ছা হয় আর্যর। তাই সুর করে গেয়ে ওঠে , চাকরিটা আমি ছেড়েই দিলাম বৈশাখী তুমি শুনছো। এবার দুটিতে সবখানে যাব, যেখানে যাওয়ার দিন তুমি গুনছো।
---- মানে ?
--- মানেটা আর কিছুই নয়, চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছি। শুধু আমিই নয় , সোমনাথও ইস্তফা দিয়েছে।
--- তোমার চাকরি ছাড়া নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ বা অনুযোগ নেই। কিন্তু আমার কারণে যে ছাড় নি তা দু'জনের একসঙ্গে ইস্তফা দেওয়ার কথা শুনেই বুঝেছি। কি কারণে কাজটা ছাড়তে হল জানতে পারি কি ?
---- নিশ্চয় , তোমাকে সব বলব বলেই তো তখন বলে গেলাম না জব্বর খবর আছে ?
স্ত্রীকে সব খুলে বলে আর্য। শুনে বৈশাখী বলে, ঠিক করেছ। যেখানে তোমার মতামতের গুরুত্বই নেই সেখানে কাজ না করাই ভালো। তার চেয়ে নিজেরা সাপ্তাহিকটাই ভালো করে কর।
---- সেইজন্যই তো তোমার সাহায্য চাই।
--- মানে ?
---- মেয়েটাকে আমি কথা দিয়ে এসেছি।শয়তানদের মুখোশ আমি খুলে দেব। তাই রাতারাতি কাগজটা বের করে কাল ভোরে ওই গ্রামে পৌঁছে দিতে হবে।
--- তা এতে আমাকে কি সাহায্য করতে হবে শুনি ?
--- আসলে কাল ভোরের মধ্যে কাগজ বের করতে হলে তো সারারাত জেগে কাজ করতে হবে। তাই আমি কয়েকজনকে আসতে বলেছি। তাদের যদি খাওয়ার ব্যবস্থাটা ------।
---- ওরে বাপরে, সারাদিন খাটাখাটুনির পর আমি ওসব পারব না বাপু ।
আর্য জানে বৈশাখী মুখেই ওইসব বলে। লোককে রান্না করে খাওয়াতে সে ভালোবাসে। কিন্তু প্রথমদিকে না করে দেয়।তাই হতাশার ভাব দেখিয়ে আর্য বলে , না পারলে আর কি করা যাবে। ওরা অবশ্য বাড়িতেই খেয়ে আসবে বলছিল। আমিই ওদের জোর করে খেতে বললাম। ওরা তো তোমার রান্নার খুব সুখ্যাতি করে। নিজের বৌয়ের সুখ্যাতি শুনতে
কার না ভাল লাগে বলো ?
---- ঠিক আছে আমাকে আর তেল দিতে হবে না। ক'জন খাবে শুনি ?
---- তা ধরো ৬/৭ জন হবে।
---- বেশ।
রান্নাঘরের দিকে চলে যায় বৈশাখী।
আর্য কাজ শুরু করতেই একে একে পৌঁছোয় সবাই। এসে পড়েন ডাক্তারবাবুও।সব শুনে তিনি বলেন , এই মহাযজ্ঞ আমিও না দেখে যাচ্ছি না। তারপর বৈশাখীর উদ্দেশ্যে গলা তুলে বলেন , বৌমা আমার জন্যও দুটো চাল বেশি করে নিও।
রান্নাঘর থেকে বৈশাখী বলে , চিন্তা করবেন না দাদা আপনাকে ধরাই আছে। আপনারা কাজ শুরু করুন। চৈতীকে দিয়ে চা পাঠিয়ে দিচ্ছি।
শুরু হয়ে যায় কর্মযজ্ঞ। ডাক্তারবাবু তার লেখাটা আর্যর হাতে দিয়ে বলে , একটু দেখে নাও। তাড়াহুড়োতে ঠিকঠাক হলো কিনা কে জানে ?
---- কি যে বলেন না আপনি ? আপনার লেখা আমাকে দেখে নিতে হবে ? কেউ না জানুক , আমি তো জানি এককালে আপনি চুটিয়ে লিটিল ম্যাগাজিনে লিখেছেন। নিজে ম্যাগাজিনও বের করেছেন। যাত্রার বইও লিখেছেন। সেইজন্যই তো সর্বাগ্রে আপনার কথা মনে হয়েছে আমার। প্রুফটা আপনাকেই দেখতে হবে।
--- সে না হয় আমি দেখে দিচ্ছি। তবু তুমি লেখাটা একটু দেখে নাও। অনেকদিন লেখার অভ্যাস নেই কিনা। তারপর তুমি আবার দু'ঘন্টা সময় বেঁধে দিয়েছিলে। তাড়াহুড়ো করে কোনরকমে একটা দাঁড় করিয়ে নিয়ে এসেছি। নিজে একবার চোখ বোলানোরও সময় পাই নি।
ডাক্তারবাবুর পীড়াপীড়িতে লেখাটায় চোখ বুলিয়ে নিতে হয় আর্যকে। লেখাটা পড়ে মুগ্ধ হয়ে যায় সে। তারই বর্হ্বিপ্রকাশ ঘটে তার কথায় -- কি লিখেছেন দাদা ! সত্যি খুব সুন্দর হয়েছে। সাহিত্যরসের পাশাপাশি রয়েছে সংবাদধর্মী বিশ্লেষণ। লেখার লাইনে এলে আপনি অনেকের ভাত মেরে দিতেন।
---- ওই যেটুকু পারলাম আর কি, বলে সরাসরি নিজের প্রশংসার বিড়ম্বনা এড়ান ডাক্তারবাবু।
লেখাটা ইকবালকে কম্পোজ করতে দিয়ে আর্য বের করে মনোহরপুরের ডাক্তারের আন্দোলন সংক্রান্ত ফাইল। সেই ফাইল দেখে চন্দনদের আলাদা আলাদা খবর করতে বলে সে। সোমনাথকে আজ সারাদিনের বিষয় নিয়ে একটা 'সিন কপি ' লেখার পরামর্শ দেয়। একটা করে লেখা কম্পোজ হয় আর ডাক্তারবাবু তার প্রুফ দেখে রেডি করেন। আর সে নিজে লিখতে বসে মানবিক দায়বদ্ধতার কথা। একাই লিখে ফেলে পাঁচটা খবর।
তারপর ছবি দিয়ে পাতা সাজিয়ে ফেলা হয়।সব কিছু ঠিকঠাক করে যখন তারা খেতে বসে তখন মধ্যরাত গড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু কারও রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি নেই। বরং সবার চোখে মুখে যেন উপচে পড়ছে যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। ঠিক হয় দশ হাজার কপি কাগজ ছাপা হবে। তার মধ্যে তিন হাজার কপি নিয়ে যাওয়া হবে মনোহরপুরে। বাকিটা চন্দন, অভিষেক, সুখেনরা জেলার বিভিন্ন জায়গায় কাগজের স্টলগুলিতে পৌঁছে দেবে। সুখেনদেরও উৎসাহের অন্ত নেই।
তারা আর্যকে বলে , দাদা তোমার কাগজে যেন আমরা লেখার সুযোগ পায়।
আর্য বলে , নিশ্চয়। তোমাদের নিয়েই তো কাগজটা করব ভেবেছি।
ডাক্তারবাবু বলেন , আমাকেও মাঝে মধ্যে একটু আধটু লেখার সুযোগ দিও। লেখার চর্চাটাও থাকবে। ছাপার অক্ষরে নিজের নামটাও দেখতে পাব। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার আকাঙ্ক্ষাটা আজও রয়ে গিয়েছে।
---- মাঝে মধ্যে কি বলছেন ? আমি তো ঠিক করেছি আমাদের কাগজে নিয়মিত ''ডাক্তারবাবুর কলম ' শীর্ষক একটি বিভাগই রাখব।
--- ওরে বাবা তাহলে তো আবার ' কেঁচেগণ্ডূষ ' করতে হবে দেখছি।
ইকবাল বলে , দাদা ছাপার দায়িত্বটা যেন আমরা পায়। তোমাকে কোথাও যেতে হবে না , আমরাই এইভাবে শনিবার রাতে তোমার বাড়ি চলে আসব। কাজও হবে , বৌদির হাতের রান্না খাওয়াও হবে।
---- কাজের ব্যাপারটা আমি বলতে পারি। খাওয়ার ব্যাপারটা অবশ্য তোমাদের বৌদির হাতে। দেখ উনি কি বলেন।
বৈশাখী তখন শেষ পাতে চাটনি দিচ্ছিল। কথাটা শুনে বলে , ইকবাল তোমার দাদাকে বলে দাও উনি কাজটা নিয়ে মাথা ঘামালেই চলবে। খাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে হবে না।ওটা আমার ' ডিপার্টমেন্ট '।
হাসি ঠাট্টার মধ্যে খাওয়া শেষ হয়। আসলে চ্যালেঞ্জটা সফল হতে চলেছে দেখে সবার
মেজাজই বেশ হালকা ছিল। খাওয়া শেষেই ইকবাল চলে যায় কাগজ ছাপতে। বলে যায় ভোরের মধ্যেই কাগজ পৌঁচ্ছে দেবে। সুখেনরাও ভোরে এসে কাগজ নিয়ে যাবে বলে বাড়ি ফিরে যায়। চাপ মুক্ত হয়ে ডাক্তারবাবুকে প্রিয়র বিষয়টি খুলে বলে আর্য।সব শুনে ডাক্তারবাবু বলেন , আমার এক বন্ধু খুব বড়ো মানসিক রোগের চিকিৎসক। বর্তমানে এই
শহরেই রয়েছেন। আমি প্রিয়র চিকিৎসার জন্য তাকে বলে দেব। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরেও আমার এক বন্ধু রয়েছেন।
----- বাঃ তাহলে তো সবদিকেই খুব সুবিধা হবে।
----- চাকরি এবং বকেয়ার বিষয়ে তাকে বলা যেতে পারে। তবে বিশেষ কাজ হবে বলে মনে হয় না।এমনিতেই তো সরকারি কাজে আঠারো মাসে বছর।
তার উপরে কোন কাজে যদি একবার গিঁট লেগে যায় , তাহলে সেই গিঁট খোলার ক্ষেত্রে যে ক'মাসে বছর হবে তার কোন ঠিক নেই।
------ যা বলেছেন দাদা।
----- তাই আদালতের আশ্রয় নিতে হতে পারে। তবে চাকরি ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে ওর মানসিক সুস্থতা ফিরে পাওয়া জরুরী। সেই সার্টিফিকেট নিয়েই চাকরি ফেরতের দাবি জানাতে হবে।
---- আমিও সেটাই ভেবেছি।
-----তবে বকেয়া এবং অন্যান্য বিষয়ে আগে স্বাস্থ্য দফতরের বিভিন্ন স্তরে আবেদন জানাতে হবে। সেটা আদালতে যাওয়ার পক্ষে সহায়ক হবে। তাই আগে ওকে নিয়ে এসে সেইগুলো করা হোক।
---- দাদা , কালই ওকে নিয়ে আসব ঠিক করেছি।
--- বেশ , আমাকেও ডেকে নিও। আমি সঙ্গে গিয়ে ওর চিকিৎসার ব্যবস্থাটা করে দেব।
---- বেশ দাদা, তাই হবে।
---- আজ তাহলে আমি আসছি। আমার চেম্বারেও কিছু কাগজ পাঠিয়ে দিও।
--- নিশ্চয় দাদা।
ডাক্তারবাবুকে বিদায় দিয়ে সে আর সোমনাথ বিছানায় গা গড়িয়েছে কি গড়ায় নি , এমন সময় টুংটাং শব্দে বেজে ওঠে ' কলিং বেল '।



No comments:
Post a Comment